• হরিদাস পাল  আলোচনা  অর্থনীতি

  •  অনুদানের অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্রশিল্প ও স্বনিযুক্তি 

    Somnath Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | অর্থনীতি | ০৫ মে ২০২১ | ১৭৮২ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  •  

     

    তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পরে সম্ভবতঃ তাদের জনভিত্তির উৎসগুলি অনুসন্ধান করার দরকার কিছুটা বেড়ে যায়। আমরা বরং উল্টোভাবে দেখি, তৃণমূলের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগগুলি কী ছিল- দুর্নীতি, মুসলিম তোষণ এবং কর্মসংস্থানের অভাব। আমরা এই আপাতত তিননম্বর পয়েন্টটা দেখি। একথা সত্য সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গে বিশাল কর্মহীনতা দেখা গেছে। এপ্রিল ২০২০তে ১৭% বেকারত্ব ছিল বাংলায়, কিন্তু সে তো লকডাউনের পর্যায়, যখন ভারতের কর্মহীনতা ২৩ শতাংশে ছিল, সারা পৃথিবীতেও সম্ভবতঃ ছিল। বিরোধীরা বুঝেছিলেন যে মানুষ এই পরিস্থিতির দায় সরকারের উপরই চাপাবে, কিন্তু এক বড় অংশের মানুষের কাছে কর্মহীনতার সমস্যা সবচেয়ে বড়ো ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নি, তা ভোটের ফলে দেখলাম। তাহলে, লকডাউনের আগের বেকারত্বের অবস্থা কী ছিল সেটা একবার দেখে নিই। cmieর ওয়েবসাইটে পশ্চিমবঙ্গের বেকারি হার ২০১৬ থেকে ২০১৯ অবধি যা দেখলাম, তা জাতীয় গড়ের থেকে খুব খারাপ নয়। বরং, ডিমনিটাইজেশনের পরের কিছু সময় বাদ দিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় গড়ের থেকে কম এবং তাতে খুব বেশি ওঠা নামা নেই। মোট কর্মক্ষম জনতার মধ্যে কত শতাংশ কাজে অংশগ্রহণ করছেন, সেই হিসেব দেখলে তা জাতীয় গড়ের থেকে বেশ কিছুটা ওপরে, তামিলনাড়ূ বা কর্ণাটকের সঙ্গে তুলনীয়। ২০১১-১২ র তুলনায় ২০১৭-১৮য় কর্মসংস্থান বাড়ার হার বাংলায় বেশি বলে একটা সার্ভে পাচ্ছি, এবং বিশেষ করে মহিলাদের নিযুক্তি বেড়েছে। উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের হার ৭.৬%, যা জাতীয় গড়ের থেকে খুব সামান্য কম। তাহলে, লকডাউনের সমস্যাকে আলাদা করে নিলে, কর্মসংস্থানের সমস্যা সার্বিকভাবে বাংলায় বাকি দেশের থেকে আলাদা নয়, এটুকু দেখা যায়। এরকম হতে পারে, স্বচ্ছল শ্রেণির চাকরির মানের সমস্যা আছে। এইবার, পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে সচরাচর যা অভিযোগ, এখানে নতুন বড় ও ভারি শিল্প বহুবছর হয় নি। শিল্প এলে কর্মসংস্থান হত। বস্তুত, তৃণমূল সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসে সিংগুরের শিল্প উদ্যোগ ব্যর্থ করার ঘটনাক্রমেই। আমরা সত্যিই জানি তারপর সেরকম ভাবে বড় শিল্প এই রাজ্যে আসে নি বরং চা-বাগান থেকে পাটকল অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে কর্মসংস্থান জুটছে কী করে? সেইটাই এই লেখায় দেখার চেষ্টা করব। এবং এ-ও দেখব, কর্মহীনতাই কি আসলে এই রাজ্যের বাস্তব, যা ঢাকা রাখা হয়েছে বিভিন্ন ভাতা ও প্রকল্পের মধ্যে?

  • ভারি শিল্পে প্রচুর চাকরি হয়, এই দাবি নিয়ে বহুদিনই ওয়াকিবহাল মহলকে সন্দেহ প্রকাশ করতে দেখা যায়। বরং তাঁরা বলেন যে ভারি শিল্পের অনুসারী শিল্পই আসলে কর্মসংস্থান দেয়। তাহলে, কর্মসংস্থানের জন্য ছোট উদ্যোগগুলির অবস্থা পর্যালোচনা করা দরকার। আমরা ভারতসরকারের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্প মন্ত্রকের বিগত একদশকের রিপোর্টগুলি দেখার চেষ্টা করলাম। ২০১৯-২০র  রিপোর্টে ২০১৫-১৬র পরিসংখ্যান দেওয়া আছে। সেই তথ্য বলছে বাংলায় ১.৪ কোটি লোক ৮৮ লক্ষ এম এস এম ই ইউনিটে নিযুক্ত। ইউনিটের সংখ্যা উত্তরপ্রদেশের (একনম্বরে, ৮৯ লাখ) থেকে সামান্য কম।  অথছ ২০০৬-৭ এ উত্তরপ্রদেশে ৪৪ লক্ষ ইউনিট ছিল, বাংলায় ছিল ৩৪ লক্ষ, তৃতীয় স্থানে ছিল তামিলনাড়ু (৩৩ লক্ষ)।  তামিলনাড়ূর সাম্প্রতিক ইউনিট সংখ্যা বাংলার প্রায় আদ্ধেক। আমরা অতিসাম্প্রতিক তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারি সাইটে পাইনি। রাজ্যসরকার দাবি করেছে এম এস এম ইর বিকাশ অব্যাহত থেকেছে, তার হার বেড়েছে। তবে এও বিভিন্ন সংবাদপত্রে দেখেছি যে বাংলার ছোট শিল্প লকডাউনে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্য রাজ্যের থেকে বেশি। একটা জিনিস খুবই আকর্ষণীয় যে বাংলায় মহিলা কর্মীর সংখ্যা সর্বাধিক। উত্তরপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে যেখানে ২৭ লক্ষ মহিলাকর্মী, বাংলায় সেই সংখ্যা ৪৩ লক্ষের বেশি। মহিলা মালিকের সংখ্যাও সর্বাধিক বাংলায়, ২৯ লক্ষ, যা দ্বিতীয়স্থানে থাকা তামিলনাড়ুর দ্বিগুণ। সারাভারতের মহিলা ক্ষুদ্রশিল্প মালিকের ১/৪ অংশ বাংলার। এই রিপোর্টগুলি থেকেই এই সরকারের এই ধরণের শিল্প নিয়ে একটা পরিকল্পনা চোখে পড়ে। ২০১১-১২ থেকে ক্ষুদ্রশিল্পে সরকারি সাহায্য পশ্চিমবঙ্গে অনেকটা বেড়েছে। ২০১০-১১তে পশ্চিমবঙ্গ মহারাষ্ট্র উত্তরপ্রদেশে সাড়ে তিন হাজারের মতন ইউনিট সরকারি সাহাযা পেয়েছিল, যেখানে পরের বছর বাংলায় সংখ্যাটা দেড়গুণের বেশি বেড়ে যায় এবং এই সাহায্য পরের বছরগুলিতে বেড়েছে। এখানে আমরা দু-তিনটে জিনিস লক্ষ্য করতে পারি- ক) ক্ষুদ্র অতিক্ষুদ্র শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান প্রচুর হয়েছে এই রাজ্যে, মানে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায়; খ) এই কর্মীগোষ্ঠীতে মহিলাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য; এবং গ) এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ- মালিক শ্রমিক অনুপাত দেড় এরও কম অর্থাৎ এগুলি খুবই ছোট ইউনিট, অনেকক্ষেত্রে একজন মালিক নিজেই সর্বসময়ের কর্মী, একভাবে স্বনিযুক্তিও। এই তিন নম্বর পয়েন্টটা ভাতার আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

    এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে আরেকধরণের কর্মসংস্থানের কথা আমরা শুনি, যা ব্যাপকহারে হয়েছে এবং মহিলাদের অংশগ্রহণ খুব বেশি। তা হল স্বনির্ভর গ্রুপগুলি। মাসিক আয় ১৫০০০ এর বেশি নয় এরকম পরিবারগুলির থেকে স্বনির্ভর গ্রুপ গড়ে তোলার জন্য একাধিক প্রোগ্রাম সরকার নিয়েছেন বিগত দফাগুলিতে। স্বনির্ভর গ্রুপ সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে শুরু করেছিল। তৃণমূলের দুটি দফায় তাদের জন্য ট্রেনিং, এককালীন অনুদান এবং সহজ লোনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও কর্মীদের জন্য ইনিশিওরেন্স ও অন্যান্য সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। ন্যাশনাল ব্যাংক ফর এগ্রিকালচারাল এবং রুরাল ডেভেলেপমেন্টের সমীক্ষা (২০১৮) অনুযায়ী স্বনির্ভর গ্রুপের উদ্যোগ সারা ভারতের মধ্যে বাংলায় সবচেয়ে সফল। এখানে প্রায় সাড়ে আট লক্ষ স্বনির্ভর গ্রুপ আছে, যাদের মাধ্যমে প্রায় দুলক্ষ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হিসেব মতন তারা কুড়ি হাজারেরও বেশি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে গত দশবছরে সাহায্য করেছেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে কোনও পরিবার থেকে একজন সদস্যই সামিল হতে পারবেন এবং এর মধ্যে প্রায় একচেটিয়াভাবে মেয়েদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। পরিশেষে বলার, অনেক ক্ষুদ্রশিল্প স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।

    উপরের আলোচনাগুলো থেকে দেখা যায়, গরিব মানুষের কর্মসংস্থান এবং আয়ের একধরণের নিশ্চয়তা তৃণমূল সরকার দিতে পেরেছে। এবং, বাকি ভারতের তুলনায় সেই উদ্যোগ এখানে খুব পিছিয়ে নেই বরং মহিলাদের অংশগ্রহণ আলাদা করে চোখে পড়ার মতন। এই উদ্যোগগুলি গড়ে তোলার পিছনে সরকারি নানা সাহায্য, ট্রেনিং, ঋণ এবং সরাসরি অনুদানের ভূমিকা আছে। এবার লক্ষ্য করার, এই সবগুলিই স্বনিযুক্তি মূলক বা খুব ছোট সংস্থার মাধ্যমে। এগুলি নিয়মিত চাকরি নয় যে মাসের শেষে বাঁধা মাইনে ধরা থাকবে। তেমনই বড়ো উদ্যোগের মতন কর্মীদের স্বাস্থ্য বাসস্থানের সুবিধে বা পেনশনের ব্যবস্থা এর মাধ্যমে হবে। আবার বাজারের ওঠাপড়া বা লকডাউন ডিমনিটাইজেশনের ফল ঝড়ের মতন এদের উপর আছড়ে পড়বে। বড় সংস্থার মতন বা সরকারি চাকরির মতন একটা ন্যূনতম রোজগারের নিশ্চয়তা এতে নেই। সেইজন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপারটা। ধরুন একজন ক্ষুদ্রতম উদ্যোগীর বাড়িতে একজনের শরীর খারাপ হল, বৃষ্টিতে বাড়ির চাল পড়ে গেল বা যে শিল্পের সঙ্গে তিনি জড়িত, তার কাঁচামাল আসা বন্ধ হয়ে গেল কয়েকমাস। তখন তিনি কীভাবে টিঁকে থাকবেন? এইটুকু ক্ষমতায়নের জন্য স্বাস্থ্যসাথী, গৃহশ্রী বা খাদ্যসাথী মতন প্রকল্প জরুরি হয়ে পড়ে। বড় নিযুক্তির বদলে সরকার নিজেই সেই সুরক্ষা দিচ্ছেন এইখানে। এই ভাতাগুলি না থাকলে এই স্বনিযুক্তির অর্থনীতি চলবে না। আমরা যদি সরকারি প্রকল্পগুলি দেখি, তার অনেকগুলিই আসলে পেশদারি ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এবং সেইজন্যে বিশেষ বিশেষ টার্গেট গ্রুপকে (মহিলা- কন্যাশ্রী রূপশ্রী সবলা, নির্যাতিত মহিলা, যৌনকর্মী- স্বাবলম্বন, গরিব মহিলা- আনন্দধারা, যুবক যুবতী- গতিধারা, যুবশ্রী, অনগ্রসর কিশোর কিশোরী- শিক্ষাশ্রী, এমন কী স্বনিযুক্ত মহিলাদের জন্য শিশুআলয়) লক্ষ্য করে। বর্তমান সরকার দুটি প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে- মহিলাদের ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করা এবং দুয়ারে রেশন (যা হয়ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে হবে)। আমরা খেয়াল করি, এই ভাতাগুলি আসলে সেই সুরক্ষা দেয় যার উপর দাঁড়িয়ে পারিবারিক স্বচ্ছলতার প্ল্যাটফর্ম ব্যতীতই একজন নিজের পেশাদারি জীবন শুরু করতে পারেন।

    এই আলোচনায় আমরা ১০০ দিনের কাজের কথা উল্লেখ করলাম না। তাতেও পশ্চিমবঙ্গের পার্ফর্ম্যান্স দেশের মধ্যে লক্ষ্যণীয়। কিন্তু সেই কাজও যেহেতু ১০০দিনেরই মাত্র, তাও পুরো ১০০ দিন কেউই প্রায় পায় না, বাকি সময়ের জন্য সামাজিক সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়। অনিশ্চিত ছোট অন্যান্য উদ্যোগের মতন এখানেও অনিশ্চিত অংশটুকু সমাজ না দেখলে মানুষ সেটা সামলে উঠে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন কী করে? সরকার সমাজের হয়ে সেই ভূমিকাটা একটা মাত্রা নিচ্ছেন বলেই মনে হয়। অর্থাৎ, আমরা দেখলাম এই রাজ্যে সাধারণ মানুষের রোজগার নেই এরকম না। কিন্তু সেই রোজগার নিশ্চিত করতে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন, যার মধ্যে বিভিন্ন ভাতা অনুদানও এসেছে। সরকারি যেকোনও অনুদানমূলক ব্যবস্থায় দুর্নীতির সম্ভাবনা থাকে। আমরা বিগত সরকারের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ শুনেছি। সেইগুলি নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনার অন্য পরিসর আছে।

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৫ মে ২০২১ | ১৭৮২ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিশ্বেন্দু নন্দ | 45.112.68.214 | ০৫ মে ২০২১ ১৭:১২105522
  • আমরা কারিগর সংগঠনের পক্ষে বার বার বলে এসেছি এমএসএমই এবং কারিগরি ব্যবস্থার চরিত্রের মধ্যে বিপুল পার্থক্য আছে,সেটা কোনওভাবেই বর্তমান সরকারি স্তরে ক্ষুদ্র অতিক্ষুদ্র এই ধারণায় ধরা যায় না। এমএসএমই মূলত বড় পুঁজি নির্ভর উদ্যমের অনুসারী প্রকল্প যা স্বনির্ভর হিসেবে গণ্য হলেও স্বনির্ভর নয় মূলত বড় পুঁজির বিনিয়োগ প্রযুক্তি চাহিদা ইচ্ছে বাজার নির্ভর। ফলে কর্পোরেট পুঁজির প্রযুক্তি বাজার ইত্যাদি পাল্টালে এই উদ্যমগুলির নাভিশ্বাস ওঠে। কলকাতার আশেপাশের হাওড়া অঞ্চলে গত সহস্রাব্দের অনুসারী শিল্পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া আমার এই বক্তব্যকে পুষ্ট করে। অন্যদিকে কারিগরদের প্রযুক্তি নিজের বাজার নিজের কাঁচামাল নিজের ফলে তাকে কারোর ওপর ভরসা করে উৎপাদন করতে হয় না সে নিজের কাজেই স্বরাট। 


    এখন সমস্যা হল সরকারি বাবুরা এ নিয়ে কোনও দিন ভাবেন নি তারা এই দুটি সেক্টরের মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখতে পান না। তাই এমএসএমই বিপুল বরাদ পায় আর কারিগরদের জন্যে কিছু বাঁহাতি মেলা ইত্যাদি বরাদ্দ দিয়ে দায়িত্ব খালাস করে দেন। 


    আরেকটা সমস্যা মহিলা স্বরোজগার দলগুলোর বিপুল পুঁজি প্রায় নিকম্মা হয়ে বিওসে রয়েছে। জেলায় জেলায় বিপুল বিনিয়োগে তৈরি সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল কৃষক মাণ্ডির মতই সেগুলি কোনও কাজের নয় কারন অধিকাংশ স্বরোজগারী সংগঠন এই বিপুল সম্পদ নিয়ে কী করবে জানে না। এ নিয়ে সরকারকে বলতেও ভয় করে কারন তাহলে তারা ম্যাকিনসে টাইপের পরামর্শদাতা সংগঠনকে ভাবার দায়ত্ব দিয়ে এই বিপুল অর্থকে হয়ত শেয়ার বাজারে নিয়ে ফেলবেন বা কর্পোরেটদের ভোগ্য করে তুলবেন। 

  • Somnath Roy | ০৫ মে ২০২১ ১৭:১৫105523
  • পুঁজি বসে থাকলে এদের রোজগার হয় কীভাবে?

  • Ranjan Roy | ০৫ মে ২০২১ ২০:১৫105534
  • বিশ্বেন্দুবাবুর ভ্যালিড পয়েন্ট ও সোমনাথের প্রশ্নের উত্তর শোনায় আগ্রহী।


    তাসত্ত্বেও বলব এই নিবন্ধটি বেশ কর্মসংস্থানের ব্যাপারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষিত তুলে ধরেছে। বিশেষ করে সাপোর্টের পয়েন্টটা। ১৯৮০-৯০ এর সময়  ছত্তিশগড়ের গ্রামীণ ব্যাংকে কাজ করতে গিয়ে  আই আর ডি পি ইত্যাদি স্বরোজগার প্রকল্পের সময় খেয়াল করেছি স্বল্প পুঁজির কারিগরি বা দোকানদারির স্টার্ট আপগুলো ওই সাহায্যের অভাবে কেমন করে অল্প ঝড়েই নেতিয়ে পড়ে। পরিবারের একজনের অসুখ হলে বা কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলে। যেহেতু এদের কোন সঞ্চয় বা ব্যাক আপ নেই, তাই ওরা প্রথমেই ব্যবসায়ের পুঁজি ভেঙে ফেলে এবং এর ভিশিয়াস সাইক্ল এসে ফেঁসে সর্বস্বান্ত হয়।


    আর্গুমেন্টটি একটি গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে বলতে চেষ্টা করছি।


    ধরুন, এই  স্বল্প  পুঁজি বিনিয়োগ এবং তার ফলে আউটপুট বৃদ্ধিকে যদি এই ভাবে দেখাই y=mx , যেখানে x=  পুঁজি বিনিয়োগ(ধরুন ঋণ), y=  উৎপাদন বা ট্রানজাকশন, এবং m= গুণক, যা আসলে ব্যবসায়ে ভ্যালু বৃদ্ধির সূচক, এখানে m>1.


    তাহলে আমরা ঋণ দিয়ে আশা করি যে যতটুকু দিয়েছি বছর ঘুরতে ঘুরতে তাতে ভ্যালু অ্যাড হয়ে ওর আয় এবং সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে । ও ক্রমশঃ গরীবি রেখা পার করার দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু ওর আর্থিক কাজকম্মের আসল গাণিতিক ছবিটি হল


    y= mx+ c;  , যেখানে   c= বেঁচে থাকার জন্যে ন্যূনতম খরচ , এতে খাদ্য, চিকিতসা ও কিছু আনুষঙ্গিক ব্যয় ধরা হয়েছে।


         এখানে আমরা  লোন দেয়ার সময় c কে হিসেবের মধ্যে না ধরে কেবল উৎপাদন ব্যয়ের জন্যে আবশ্যক পুঁজির হিসেব লাগাতাম। ফলে শিগগিরই c= y-mx, হয়ে যেত। অর্থাৎ কনসাম্পশন নীডের সাশ্রয় হত পুঁজি বা আয়ের একটা অংশ পুনঃ বিনিয়োগের বদলে উপভোগে। আর্থিক প্রয়াস যেত মায়ের ভোগে। সোমনাথ এই দরকারটা খেয়াল করেছেন ।


      

  • Somnath Roy | ০৫ মে ২০২১ ২১:১১105537
  • রঞ্জন-দা, বিশ্বেন্দুদার কাছ থেকে আরও বিশদে কারিগরদের নিয়ে জানতে পারলে ভালো হবে। বিশেষতঃ সংজ্ঞা অনুযায়ী তাঁরাও তো এম এস এম ই তে পড়েন, তাহলে প্রকল্পগুলির মধ্যে তাঁদের অ্যাকমডেট করা হয় না কেন, সেটাও। আমার ধারণা ছিল এম এস এম ই নিয়ে সার্বিক উদ্যোগে কারিগররাও পুষ্ট হচ্ছেন।


    সেলফ হেল্পগ্রুপ নিয়ে আমার ধারণা কম, কিছু ডকুমেন্ট পড়েছি কেবলমাত্র। বিশ্বেন্দুদা লিখলে ভালো হয়।

  • স্বাতী রায় | ০৫ মে ২০২১ ২২:০৭105542
  • আমাদের কর্ম সংস্থানের ধারণার মধ্যে কি খানিকটা সামাজিক সমস্যাও লুকিয়ে আছে? গত কয়েক বছরে মুলত কাজ বেড়েছে সেলফ-হেল্প আর স্বনিযুক্তি প্রকল্পে।  সেখানে আয় অনিশ্চিত, সুরক্ষা নেই ,কাজ ও অনেক সময় সিজনাল। প্রেস্টিজও কম বোধহয়। যদিও বেকারত্বের হার ভারতের গড়ের তুলনায় কমই এখনও,তবু কিছু ডেটা এলার্মিং।  বেকারত্ব  ডিপ্লোমাধারীদের মধ্যে প্রায় ৩০%  ,গ্রাজ্যুয়েট ও মাস্টার্স ডিগ্রি ধারীদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ।  লক ডাউন পুর্ব ডেটা।   শিক্ষিতরা বিশেষত শহুরে  শিক্ষিত ছেলেরা চান নিয়মিত আয় , বিভিন্ন সুরক্ষা ।  অনেকেই ভাবেন  সেলফ-হেল্প আর স্বনিযুক্তির কাজ  প্রাইমারি ব্রেড আর্নারের জন্য নয়। ওসব খুচরো কাজ মেয়েদের জন্য।  ছেলেদের চাই নিরাপদ চাকরি চান, আয়ের নিরাপত্তা, সুরক্ষার নিরাপত্তা। 


    এই চাহিদাটা মেটান যাচ্ছে না। সরকারি চাকরির সংখ্যা কমেছে ,পার্মানেন্ট নিয়োগ কমছে।   আই টিতে  নাকি চাকরী বেড়েছে ,তবে সে তো বেশিটাই বেসরকারিতে - সেখানে ইঞ্জিনীয়র পান দশ হাজার টাকা  ( অবশ্য শুনেছি ,সত্যি কিনা জানি না  টো টো চালক নাকি মাসে পান আট হাজার টাকা । )  এদিকে টেট ইত্যাদি বন্ধ। 


    বছর বছর টেট জাতীয় পরীক্ষা নিয়ে চাকরী দেওয়ার জন্য কোষাগারের শক্তি আছে কি? জানা নেই।  এদিকে ভারি শিল্প একেই আসার চান্স নেই আর এলেও কতজনকে চাকরি দেবে  কতটা  পরিবেশের ক্ষতি করবে  সেগুলো ডিবেটেবল।   শিক্ষা কি তাহলে আমাদের বুমেরাং হয়ে গেল?  কর্মসংস্থানেরসমস্যার সঙ্গে কি শিক্ষাকে জড়িয়ে নিয়েই ভাবা উচিত?

  • স্বাতী রায় | ০৫ মে ২০২১ ২২:৩২105543
  • বাই দ্য ওয়ে, আমার আগের মন্তব্যটা  সোমনাথের লেখার বিষয়ের সঙ্গে খুব একটা  প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত না,তবু পরোক্ষ সংযোগ খানিকটা আছে বলে মনে হয়।  অনুদানের প্রয়োজন আরও বাড়বে যদি অসংগঠিত কর্মক্ষেত্র আরও বাড়ে আর সংগঠিত কাজের জায়গা আরও ছোট হয়। কাজেই অনুদানকে গালি না দিয়ে বরং তার এফেক্টিভ ডিস্ট্রিবিউশন  অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট  নিয়ে  মাথা ঘামান যাক।   

  • Somnath Roy | ০৫ মে ২০২১ ২২:৫৬105546
  • স্বাতীদি, আমি একমত। 


    ১) শিক্ষাকে বাজারে টেলর মেড ম্যানপাওয়ার সরবরাহের একটা উপায় করে তোলা হচ্ছে। এইটা খুব বিপজ্জনক। একজন পার্টিকুলার ফিল্ডে এক্সপার্টাইজ করে সেই ফিল্ডের চাকরিই শুধু করবে, প্রযুক্তি পালটে গেলে সে ফালতু হয়ে পড়বে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে শিক্ষা আর পেশা আলাদা হওয়ার দরকার আছে। শিক্ষা একটা ভিত দেবে, যার উপরে বিভিন্ন রকম পেশা, স্বনিযুক্তি বেছে নিতে পারবে।


    ২) আজকের দিনে অনেকে স্টার্ট আপ খুলে এই চেষ্টা করেন, তাঁরা হাতে গোণা। কারণ পারিবারিক সুরক্ষা হাতে গোণা লোকের থাকে। তাই সামাজিক সুরক্ষা অনেককে সেইভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে।

    সামাজিক সুরক্ষাকে ভিক্ষাণ্ন দেখার সভাব সো কলড বামপন্থীদেরও আছে। সেটাকে  ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখলে ভালো। এবং মমতা এই টার্মে সম্পূর্ণ অন্য রাস্তায় যেতে পারেন বা ইমপ্লিমেন্টেশনে ঢিলে দিতে পারেন। সেইখানে ওয়াচডগ থাকার দরকার।

  • Ranjan Roy | ০৬ মে ২০২১ ০০:২০105552
  • সোমনাথ 


    রণবীর সমাদ্দারের ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ (সিআরজি) বঙ্গ, বিহার, দিল্লি, উড়িষ্যা,  ছত্তিশগড়, তামিলনাড়ুর  এই ধরণের সোশ্যাল সাপোর্টিভ সবকিছুর একটা স্টাডি করে রিপোর্ট পাবলিক করেছে। তাতে এগুলোর ইকনমি, সোশ্যাল সিকিউরিটি, প্রান্তিক মানুষের জন্য  কতটুকু কাজে আসে এবং ভোটের বাক্সে প্রভাব  সব বিষয়ে মোটের ওপর পজিটিভ  মনে হয়েছে। আদৌ ভিক্ষান্ন নয়।

  • arin | 161.65.237.122 | ০৬ মে ২০২১ ০১:৪৫105558
  • রঞ্জন বাবু সোমনাথ স্বাতী , এই সমস্যা কোভিড পরবর্তী পৃথিবীতে বাড়বে বই কমবে না | আমরা কয়েকজন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুজ্ঞের পটভূমিকায় এই নিয়ে কিছুটা লিখেছি আপনাদের আলোচনায় কাজে লাগতে পারে হয়তো 


    https://ir.canterbury.ac.nz/rest/bitstreams/10cd1d42-0483-4250-a05d-30e54986d52e/retrieve

  • Ranjan Roy | ০৬ মে ২০২১ ০৯:৪২105579
  • অরিন,


    বড় কাজ করেছেন।  ডাউন লোড  করে কয়েক জনের সাথে শেয়ার করলাম। 

  • Somnath Roy | ০৬ মে ২০২১ ০৯:৫৪105580
  • ধন্যবাদ অরিন, পড়ছি

  • সন্দীপ | 42.110.163.20 | ০৭ মে ২০২১ ১১:১৫105639
  • মূল্যবান লেখাটি এবং প্রতিটি মূল্যবান মন্তব্য খুব মন দিয়ে পড়লাম। আরেকবার পড়ব। বন্ধুদের কাছে শেয়ার করার অনুমতি চাইছি।


    এবার কয়েকটি কথা -


    ১. সোমনাথবাবু লেখাটি অনুচ্ছেদ ভেঙে ভেঙে, কিছু জায়গায় পয়েন্ট করে করে লিখলে আরেকটু সহজবোধ্য করা যেত বলে আমার মনে হয়েছে।


    ২. বিশ্বেন্দুবাবুর MSME এবং কারিগরি পুঁজির পার্থক্যজনিত আলোচনা আরেকটু বিশদে হোক।


    ৩. রঞ্জনবাবুর অসাধারণ আলোচনার প্রেক্ষিতে জানতে চাই রণবীর সমাদ্দারের গবেষণাটি কি ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে? 


    ৩. স্বাতীদির মন্তব্য ধরে নিয়ে বলি, ধরা যাক আইটি ভাইটি মফস্বল থেকে যাওয়া আসায় পাঁচ ঘন্টা পেরিয়ে সেক্টর ফাইভ গিয়ে দশ পেলেন আবার নিজের এলাকায় টোটো চালিয়ে দশ পেলেন, তিনি কি করবেন, সেটা তাঁর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত মাইন্ড সেটআপ।


    ৪. অরিণবাবুর দেওয়া লিংকটি এবার পড়ব। 

  • Somnath Roy | ০৭ মে ২০২১ ১৫:২০105654
  • সন্দীপ, লেখাটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আরও যত্ন নিয়ে লেখা উচিৎ ছিল। বিশেষতঃ, অর্থনীতির মতন বিষয় আসছে যখন।

  • বিশ্বেন্দু নন্দ | 45.112.68.214 | ০৭ মে ২০২১ ২২:৫৬105688
  • কারিগরি ব্যবস্থা আর পুঁজির অনুসারী শিল্পের পার্থক্য করতে গিয়ে চার বছর আগের একটা লেখা ডেওয়টা গেল
    ---

    হস্তশিল্প বনাম শিল্প তালুক
    আদৌ আমরা গ্রামীন উতপাদনের চরিত্র চিনি?
    এমএসএমই আর পরম্পরার গ্রামীন উতপাদন এক নয়
    চার বছর আগের সকালে মা'এর চালানো রেডিওর খবরে শুনেছিলাম দশটা 'হস্তশিল্প'কে শিল্পতালুকে পরিণত করা হচ্ছে। এ নিয়ে এখনও কোন সরকারি সমীক্ষা চোখে পড়েনি বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘের -ফলে তার কি করতে চাইছেন তাও জানা যায় নি। কিন্তু বিষয়টা আলোচনাযোগ্য - কেননা লক্ষ লক্ষ গ্রামীন উতপাদকের রুটি রুজির ভবিষ্যত নির্ভর করছে এই পরিকল্পনায়। সেই জন্য কিছু কথা বলা দরকার বলে মনে করছে বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ।
    আশ্চর্যের বিষয় হল যে, ভারতের এবং রাজ্য সরকারগুলির গ্রাম শিল্পগুলিকে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের মধ্যে ফেলছে।দেখে নেওয়া যাক ক্ষুদ্র আর ছোট শিল্পের সংজ্ঞা কি। এই দপ্তরের নীতিতে যে শিল্প সেবা ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা আর উতপাদনের ক্ষেত্রে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ(এ নিয়ে পরে আলোচনায় আসছি) করতে পারে তাঁরা ক্ষুদ্র শিল্প বলে পরিচিত হয়। ছোট শিল্প তকমা পাওয়া যায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে।
    এবারে বলা যাক গ্রাম শিল্পগুলি বিষয়ে। যে মানুষটি/গুলি সমাজে থেকে মূলত গ্রামের বাজারের জন্য বাঁশের, মাটির, পাটের, কাগজের মণ্ডের, গালার, শীতলপাটির ইত্যাদির জিনিস বানাচ্ছেন, তাদের বিনিয়োগ কি সেই প্রশ্নে ঢোকা যাক। তার কাঁচামাল সংগ্রহ করেন তাদের স্থানীয় এলাকা থেকে - হয়ত তাদের নিজেদের সম্পত্তি থেকেই। কাঁচামাল কিনতে খুব বেশি মানুষকে বাজারে যেতে হয় না - ব্যতিক্রম শাঁখ, গালা, ধাতু ইত্যাদি হাতে গোণা কিছু উতপাদন। ফলে কারিগরেরা কাঁচামালে বিনিয়োগ করলেও তা খুব অল্পই। তাদের শ্রম নিজেদের বা স্থানীয় এলাকা থেকেই পাওয়া যায় - শিক্ষণকেন্দ্রর প্রয়োজন হয় না। দক্ষতা তৈরি হয় পুর্বজর জ্ঞানে, চর্চায় গোষ্ঠী সামাজিকভাবে। হাতিয়ার বলতে কিছু লোহা বা কাঠের যন্ত্রপাতি - যা ব্যবহার করতে বিদ্যুতের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হয় না - সারাতে তার অঞ্চলের বাইরে যেতে হয় না। অর্থাৎ প্রযুক্তি তার নিজের। আর কাজের যায়গা বলতে তার বাড়ির উঠোন। এরা কেউ বড় শিল্পপতি হতে চাননা। কেউ প্রাণান্তকর চেষ্টায় তার পাশের উতপাদন ব্যবস্থা কিনে নিয়ে নিজের তহবিল বাড়াতে চান না - চাইলেও পারেন না। হাজার উতপাদক, হাজার হাজার বিক্রেতা - এই উতপাদন ব্যবস্থার এটাই জোর। এই উতপাদন ব্যবস্থার কোনো কেন্দ্র নেই। তাই বহু চেষ্টায় একে মেরে ফেলা যাচ্ছে না। এরা বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, ব্যাঙ্ক ঋণ নিরপেক্ষ এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাইরে। এদের চেষ্টা হয়েছে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে - কিন্তু খুব একটা সফল হয়নি ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি। আর এরা ব্যাংকের ধার চাওয়া নিয়েও খুব একটা ব্যস্ত বলে শুনিনি। ফলে পশ্চিমি শিল্পবিপ্লবীয় ছাঁচে, ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র থেকে ছোট থেকে মাঝারি শিল্প হয়ে ওঠার বিন্দুমাত্র প্রণোদনা নেই এই শিল্প উদ্যোগীদের। এরা কেউ বড় পুঁজির তৈরি বাজারের সরবরাহ শৃংখল হয়ে উঠতে খুব একটাও যে চেষ্টা করবেন, তারো উপায় নেই এই উতপাদন ব্যবস্থায়। যে কাজটা হকারদের নিয়ে করার চেষ্টা করা হয়েছে - তাদের আইন এনে।
    যে সংগঠনগুলি এই মানুষদের নিয়ে কাজ করেন(যার মধ্যে ব্যতিক্রম সংঘ, সে শিল্পীদের জন্য কাজ করে না, সেটি গ্রামশিল্পী বা গ্রাম উতপাদকেদের নিজস্ব সংগঠন) তারাও কোনোদিন এই বিষয়গুলি নিয়ে ভেবছেন কিনা জানা যায় না। তাঁরা বরাবর চেষ্টা করেছেন সরকারি নীতিতে এই মানুষগুলিকে কিভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায় তার আপ্রাণ চেষ্টা করা। আদতে এই সঙ্গঠনগুলির মূল লক্ষ্য - যে কোন উপায়ে দান সংগ্রহ করে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের চাকরি নিশ্চয় করা।
    একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। আমাদের কাছে এসেছিলেন ভারত সরকারের এনএসডিসির দান পাওয়া এক সংগঠন যারা কর্পোরেটদের জন্যে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে ইচ্ছুক। তাদের প্রশ্ন ছিল আমরা তাদের সঙ্গে মিলে গ্রাম শিল্পীদের দক্ষ করে তুলতে পারি কি না। তাঁরা প্রায় বিনামূল্যে দেওয়া শিক্ষণ শেষে শংসা পত্র দেবনে - যাতে তাই নিয়ে চাকরির বাজারে নামতে পারেন। আমরা বিনীতভাবে বলেছিলাম এই প্রকল্পে আমরা যোগ দিতে পারছি না। কেননা এই প্রকল্পর উদ্দেশ্য প্রশিক্ষিতদের চাকরি যোগ্য করে তোলা। কিন্তু গ্রাম শিল্পীদের চাকরি দরকার নেই। এরা সক্কলে দক্ষ। এদের কি করে নতুন করে দক্ষ করে গড়ে তোলা যাবে। এরা কেউ কর্পোরেট চাকরিযোগ্য হতে চায় না। এরা রোজগারের ব্যবস্থা করেন।
    ফিরি পুরনো কথায়, এই সংগঠনগুলো কেউ সরকারকে বলনা যে এই গ্রাম উতপাদকেদের জন্য প্রয়োজন আলাদা নীতি তৈরি করা। তাঁরা তা জানেন, বোঝেন কিনা জানিনা।সরকার বা সরকারি সংগঠনগুলিকে এই বিষয়ে জানানোর কোনো তাগিদ তাদের আগেও ছিল না আজও নেই। তাদের উদ্দেশ্য যেন তেন উপায়ে সরকার বা বিদেশ থেকে প্রকল্প সংগ্রহ আর তার রূপায়ন। তার পর সক্কলে উচ্ছনে যাক তা নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।
    ফলে রাজ্য সরকার যে ডিআইসির মার্ফত এই শিল্পতালুকএর প্রস্তাব করছেন, তা ভবিষ্যতে মার খেতে বাধ্য। এই শিল্প তালুকের ধারণার সঙ্গে ছোট গ্রামীন উতপাদনের কোনো যোগ নেই। একটি বড় এনজিও চেষ্টা করছেন আমলাদের রসেবশে রেখে যে কোনো উপায়ে কর্মসাধন। তার সঙ্গে গ্রাম শিল্পের উতপাদকেদের ব্যবসার উন্নয়নের কোনো যোগ নেই।
  • বিশ্বেন্দু নন্দ | 45.112.68.214 | ০৭ মে ২০২১ ২৩:০৪105690
  • আরেকটা বড় লেখা থাকল। একদা আমরা গিল্ড তৈরি করেছিলাম। মাসে একটা করে খবরদার(নিউজলেটার) বার করলাম। এটা তৃতীয়টার বিষয়বস্তু।
    --

    উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - হস্তশিল্প বনাম পরম্পরার ছোট উতপাদক
    ১ লক্ষ কোটি টাকার বাংলা বাজার নিয়ন্ত্রণ করা মানুষদের দাবি
    লোকপ্রসার প্রকল্পে গ্রামের পরম্পরার উদ্যমীদের অন্তর্ভূক্তি
    এমএসএমই নয়, আলাদা পারম্পরিক বিশ্ববাংলা দপ্তর
    গাঁইয়া বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার সমাজের সংগঠন বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ বা উইভার্স আর্টিজান এন্ড পার্ফর্মিং আর্টিস্টস গিল্ডের কাছে, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনটা খুব অদ্ভুত ঢাপুয়া বাতাস। সদস্যরা চোখ ফেড়ে ফেড়ে দেখছিলাম বাংলায় পুঁজির তাত্ত্বিক আর অনুগামীদের তাত্ত্বিক হেঁটমুণ্ডউর্ধপদীকরণ। সে এক মজার কান্ড। যে রাজনৈতিক দলের চোখের পাতা না ফেলে বড় পুঁজির ব্যবসার দালালি করার কথা – তারা গ্রামের মূলতঃ শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান এবং অন্যান্য পরপম্পরার ছোট উদ্যমী বা পথের ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে – তেলেভাজা শিল্পকে মদত দেওয়ার কথা বলছে। আদতে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর উদ্যম তৈরি এবং পৃষ্ঠপোষকতা করার কথা বলছে। খুব সাধারণ গ্রামীন শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান এবং অন্যান্য স্বউদ্যমী উতপাদক বিতরক, যাদের নিজের বাজারে দাঁড়িয়ে থাকার দক্ষতা, ধার পাওয়া বা ব্যাঙ্কেবিলিটি বা পুঁজি বিনিয়োগ বা প্রযুক্তি কেনা নয়, বরং পরম্পরা, জ্ঞান, দক্ষতা, প্রজ্ঞা এবং স্থানীয় বাজার নির্ভরতা এবং নতুন সময়ে সেই পরম্পরাকে নতুন করে ব্যবহারের উদ্যমে গ্রামীন অর্থনীতিকে জোরদার এবং শহরের টাকা গ্রামে আনার রাজনীতি করেন - তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন - ঘোমটা পরে নয়, সরাসরি - ভদ্র শিক্ষিত বামপন্থী পুঁজিবাদী কুৎসা সত্ত্বেও।
    আর যাদের তাত্ত্বিকভাবে বড় পুঁজির পাশে দাঁড়াবার কথা নয়, বড় পুঁজির তৈরি শৃঙ্খল ভেঙ্গে যারা সমাজে সাম্য আনার ব্রতী - তারা বড় পুঁজির পাশে দাঁড়াবার কাজ খুব সফলভাবে করে চলেছেন – কোন নেতা উদ্বাহু হয়ে কৃষি থেকে শিল্পায়ন(বড় পুঁজির)এর ‘উত্তীর্ণ’ হওয়ার তত্ত্বের তরফদারি করছেন, কেউ আবার চাষার ছেলে চাষা হবে নাকি এই অশ্লীল বিতর্কে ভোট জমাবার চেষ্টা করছেন, কেউ আবার বড় পুঁজির বাজারে বাতিল চার চাকা চড়ে সেই প্রকল্প থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া অঞ্চলে ভোট প্রচারে ব্রতী - সেই পরিচয় বদলের কম্মটা দেখে শুনে, বোধহয় নতুন সময়ে, নতুন করে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে। সময় এসেছে শূদ্র-বৈশ্য-মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার সমাজের স্বউদ্যমী, জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান, দক্ষ, প্রযুক্তিবিদ এবং নিজের বাজারে নিজে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁচামাল নিয়ে বড় পুঁজির সঙ্গে লড়াই করে চলা মানুষদের জন্য আলাদা মন্ত্রক দাবি করা আর ঔপনিবেশিক হস্তশিল্পী তকমা ঝেড়ে ফেলার। নতুন করে দেশিয় উতপাদন ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়ার।
    আজ সেই দাবির যৌক্তিক বিস্তৃতিতে ঢোকার আগে সময় এসেছে গাঁয়ের অর্থনীতির কুড়টি ধরে বসে থাকা এই মানুষগুলি ব্রিটিশ সময়ের পূর্বে কি ছিল তা বোঝা।
    ***
    পলাশী চক্রান্তের আগে কয়েক হাজার বছর ধরে বাংলা তথা এশিয়ার নানান কৃষি আর শিল্প দ্রব্যই ছিল সমগ্র এশিয়া/আফ্রিকা/ইওরোপ ভোগ্য। ১২০৭/১৮০০র আগের চার শতকে, বংলা/ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া নানান পণ্য ব্রিটেন তথা ইওরোপিয় জীবনযাত্রার মান নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে – যা আমরা এই বিশ্বায়নের সময়ে ভুলতে বসেছি। বিগত দুশ বছর ধরে একটি উলট পুরাণ অভিনীত হয়ে চলেছে ‘ফোরেন গুডস’এর প্রতি ভারতের উচ্চমধ্যবিত্তের আদেখলেপনার দেখনদারিতে – বড় পুঁজির লুঠেরাভূমি ভারতবর্ষের মাটিতে। পলাশির আগে লন্ডনসহ ইওরোপে বাংলার চা, মসলিন ইত্যাদি মূলত বাঙলার ভোগ্যপণ্য ভোগের উচ্চ-মধ্যবিত্তের অসম্ভব আদিখ্যেতার বর্ণনা, জেন অস্টিনের উপন্যাসেরমত রিজেন্সি যুগের নানান সাহিত্যে ফুটে রয়েছে।
    বছরের পর বছর ধরে রপ্তানিমুখী আর বিপুল আভ্যন্তরীণ দেশিয় বাণিজ্যের হাত ধরে কারিগরির যন্ত্রের বিকাশ, ভারতে আর বিশ্বে নতুন নতুন বাজার তৈরি, নতুন নতুন পণ্যদ্রব্যের উদ্ভাবনী দক্ষতায় বাংলার গ্রাম উতপাদকেরা ছিলেন মাহির। মনে রাখতে হবে ভারতের উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ ইওরোপে যেত রপ্তানির জন্য – বাকিটা কিন্তু দেশে/এশিয়ার আভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হত। শুধু বস্ত্র উত্পাদনে অসাধারণ দক্ষতাই নয়, নানান ধরণের ধাতুজ সংকর দ্রব্য(ক্রুসিবল স্টিল – প্রখ্যাত দামাস্কাস তরোয়ালের পিন্ডটি তৈরি করতেন বাংলা/ভারতের ডোকরা কামারেরা। আজও তাঁরা যে লোহার দ্রব্য তৈরি করেন, তাতে মাথা খারাপকরা জং ঢাকতে, বিন্দুমাত্র রংএর প্রয়োজন হয় না – যে প্রযুক্তি আজও প্রযুক্তিগর্বী ইওরোপের অধরা – দিল্লির লৌহ স্তম্ভ অথবা বিষ্ণুপুরের মদনমোহন কামান মাথায় ছাতা ছাড়াই শয়ে শয়ে বছর খোলা আকাশের তলায় পড়ে থাকে মাথা উঁচু করে, কোণার্কের ৮০ ফুটের শোয়ানো বিম আজও বিষ্ময় জাগায়, এখোনো বাংলার যে কোনও পুরোনো পরিবারের ঠাকুর ঘরের কাঁসা-পিতলের তৈরি দেবতা কোনও বিশেষ প্রসাধন ছাড়াই বিরাজমান রয়েছেন কয়েকশ বছর অক্লেশে), খাবারদাবার (পান, সুপুরি, গুড়, চা, নুন, মশলা, চাল, মিষ্টি, ফল, আচার, সাদা চাটনি, চিনি, মদ্য (গৌড়ি বা রাম), মধু, চিনি, গুড় ইত্যাদি), পরিধেয় (চামড়া, সুতো, সিল্ক, তসর, মুগা, এন্ডি, পাট), রং(নীল অর্থাত ইন্ডিগোসহ হাজারো প্রাকৃতিক রং), শিল্প-শিল্পী(মুর্শিদাবাদের হাতির দাঁতের কারুশিল্পী, হাতির দাঁতের তৈরি নানান আসবাব তৈজস রপ্তানি হত পারস্যে ইওরোপে, মস্করী বা পটুয়ারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানান বৌদ্ধ গুম্ফায় ছবি এঁকেছেন, মগধের (পাটনা – সে সময়ের বাংলার সীমানার মধ্যেই ছিল) বঙ্গের পাথর শিল্পীরা অজন্তা ইলোরা বরবুদর, চম্পা (কাম্পুচিয়ায়)মন্দির খোদাই করেছেন, আরব সহ বিশ্বের দামিতম ভারি জাহাজগুলি তৈরি হত সন্দ্বীপ আর হুগলীর বলাগড়ে, বাংলা থেকে তাঁত শিল্পী বস্ত্র শিল্প শেখাতে গিয়েছেন পারস্যে- আজকের বড় পুঁজির প্রয়োজনে ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইরাকে), মাটির বাড়ি তৈরির (পোড়া মাটির মন্দির অন্ততঃ তিনশো বছর ধরে রোদ, জল, ঝঞ্ঝায় দাঁড়িয়ে থেকেছে বাংলার প্রযুক্তির অনন্য বিজ্ঞাপন হয়ে, আজও বিলাসবাহুল বাড়ির ব্রিটিশ নাম কিন্তু বাংলা আঙ্গিকের বাড়ি যার পোশাকি নাম বাংলো) প্রযুক্তি আর পণ্য সরবরাহ করত নিজের জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষতা, প্রজ্ঞা, কাঁচামাল আর বাজার নির্ভর বাংলার গ্রাম শিল্পীরা। অকলঙ্ক খ্যাতি ছিল নানান ধরনের বস্ত্র উত্পাদনে, লৌহ দ্রব্য তৈরিতে, শিল্পীর গুণমানে আর কারিগরীর চূড়ান্ত দক্ষতায়।
    কয়েক হাজার বছর ধরে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলা সুবা শুধু উদ্বৃত্ত অর্থনীতির দেশ ছিল না, প্রযুক্তিতেও বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা জনপদ। বেশকিছু প্রযুক্তি বাংলার নিজস্ব ছিল। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশ্বদ্যালয়সম শিক্ষার্জন সংগঠন খুলে সে তত্ত্ব, দক্ষতা, তথ্য, ব্যবস্থাপনা শিখিয়েছে বিশ্বের নানান সমাজকে। তার নিজের মেধা আর পরিশ্রমে এতই বিশ্বাস ছিল, সে প্রযুক্তি ভাবনা কেউ চুরি করলেও সেই প্রযুক্তি অতিক্রম করে নতুন কিছু সৃষ্টি করার যোগ্যতা বিশ্বাস ছিল, তাই কোনও প্রয়ুক্তিই পেটেন্ট করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে নি। অন্তত ১৫০টির বেশি শিল্পদ্রব্য বাঙলার গ্রামীণেরা তৈরি আর ব্যবসা করে এসেছেন ১৮০০ সাল পর্যন্ত। বিশ্বের শিল্প উত্পদনের প্রায় ৮০ শতাংশ উত্পাদিত হত ভারত, চিন আর পারস্যে (আজকের ইরাকে)।
    ভারতের উতপাদনের মধ্যে বাংলার অবদান খুব কম ছিল না কেননা ১৬৮০ সালে শুধু ইওরোপে রপ্তানি হচ্ছে ভারত থেকে ১০ কোটি গজ কাপড় – যা বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে আগামীদিনে গায়ের জোরে তাঁতিদের শিল্পকর্ম আর তাঁত বোনার পরিকাঠামো ধ্বংস করে ম্যাঞ্চেস্টারের মিলের জন্য ভারতের বাজারের দ্বার খুলে না দেওয়া পর্যন্ত।
    প্রায় প্রত্যেকটি দ্রব্যের বিশ্বজোড়া একচেটিয়া বিশ্ববাজার। অথচ বাঙলার ছোটবড় সব বণিক বা উত্পাদক সমাজের বিধিনিষেধের আওতার মধ্যে থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করতেন। দেশে তাদের একচেটিয়া কারবার করতে ভারতীয় সমাজ কোনওদিনও উত্সাহ দেয় নি। ইওরোপিয় উদ্যমী এবং বণিকদেরমত, নিজের দেশ অথবা সামগ্রিক বিশ্বের সামাজিক গঠন পাল্টে অথবা প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটিয়ে বিশ্ব বাজার দখল করার বিধ্বংসী পরিকল্পনা তৈরি করে নি - বলাভাল সমাজ করতে দেয় নি। এই উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত ছিলেন বিকেন্দ্রিভূত কয়েক কোটি উতপাদক কয়েক কোটি বিক্রেতা – যেন রক্তবীজের বংশধর। আজকের বড় পুঁজির তৈরি করা আইনের মত এঁরা কেউ কারোর শিল্প বা ব্যবসা দখল – যাকে আইনে বলে হোস্টাইল টেকওভার বা জোর করে কিনে নিতে পারতেন না। এই বিকেন্দ্রীকৃত উত্পাদন ব্যবস্থার বড় অংশিদারিত্ব ছিল বাঙলার পারম্পরিক শিল্পী-ব্যবসায়ীদের, যাদের উদ্যমকে পরের দিকে অসংগঠিত অথবা হস্তশিল্প ছাপ মেরে দেওয়া হয়েছে বড় পুঁজির উৎপাদন আর ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য। ফলে লাভের গুড় সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে না গিয়ে, কয়েকটি মানুষের সিন্দুকে কেন্দ্রীভূত হয়ে চলেছে। পেছনে সরে গেছে সামাজিক সাম্য। বেড়ে চলেছে কর্পোরেট পুঁজির এলাকা।
    বাঙালি বলা ভাল শহুরে ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি ব্যবসায়ী থেকে চাকরিজীবী হল দেশের প্রথম কর্পোরেট তাত্ত্বিক দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময়ের কিছু আগে থেকে। ইওরোপিয় আধিপত্য বিকাশের সঙ্গে চাকরি আর দালালির টোপ দিয়ে বাঙালি উচ্চমধ্যবিত্ত সাম্রাজ্যের লুঠের ছোট অংশিদার করে নেওয়া হল। এই চাকুরীজীবীদের হাত দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রথমে বাঙলা-বিহার, পরে সারা ভারতের জনপদে অসীম অত্যাচার, দখল-ধ্বংসমূলক বাণিজ্য এবং উত্পাদনের পরিকাঠামো ধ্বংস করায় অযুত গ্রামীণ কারিগরের স্বনির্ভরতার বিলয়, বাংলার বিশ্বজয়ী বণিকদের পরাধীণতা, বাংলার অর্থনীতি-প্রযুক্তির ধংসের যুগ শুরু হল।
    হাজার হাজার বছরের গ্রামভিত্তিক পঞ্চায়েতি গণতন্ত্র ধ্বংস করে শহরকেন্দ্রিক পশ্চিমি সংসদীয় গণতন্ত্রের বনিয়াদ যত দৃঢ় হচ্ছে, ভারতের মাটিতে ততই গ্রাম-শিল্পী-উদ্যমীরা বিলুপ্তপ্রায় হচ্ছেন। এই কাজের ঋত্ত্বিক ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি সরকারি আর বড় পুঁজির আমলারা। তাদের পরিকল্পনায় আগ্রাসী কর্পোরেট বাজারের বিপুল খাঁই আর বড় পুঁজির নিশ্ছিদ্র লুঠ চাহিদা সফল করতে গ্রামীণ উৎপাদক আর বিক্রেতারা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় হয়ে গেলেন উদ্বৃত্ত। ইংরেজ আমল থেকেই এদের গরীব, আনপড়, অজ্ঞানী, পরনির্ভর, আদিবাসী, প্রান্তিক, তপশিলী জাতি উপজাতি ইত্যাদিরূপে চিহ্নিত করার যে চেষ্টা চলেছে, তার প্রভাব পড়েছে স্বাধীণতার পরের সরকারি-বেসরকারি পরিকল্পনায়। ফলে অদম্য ভারতীয় তথা বাঙলার সভ্যতা সৃষ্টিকারী শিল্পী-উদ্যমী থেকে স্বাধীনতার পর থেকে নানান উদ্যমে, গ্রাম শিল্পীদের পিঠে সাধারণ দিনমজুর, খেটেখাওয়া, গরীব, বিপিএল, অথবা করুণাযোগ্য হস্তশিল্পীর অনপনেয় ছাপ পড়ে গিয়েছে। এরা সকলেই যে দাগি শ্রমিক সরকারি পরিকল্পনা আর অনুদানরাশিতে তা স্পষ্ট। পারম্পরিক শিল্পীরা বিপিএলশ্রমকার্ডধারী, ভারত সরকারের বছরের একশ দিনের কাজের পরিকল্পনার কয়েকশ টাকার মাটি কাটার মজুরমাত্র। সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় শূন্য, রোজগারও তথৈবচ, লুঠ হয়ে যাওয়া সামাজিক সম্মানের কথা যত কম বলাযায় তত ভাল।
    তবুও নতুন সময়ে নতুনভাবে, মধ্যবিত্ত প্রজন্মের একটি অংশ সামাজিকভাবে আবার শেকড়ে ফিরতে চাইছেন, এটিই সব থেকে বল-ভারসার কথা – তাই কলকাতা তথা জেলার নানান শিল্প মেলায় বিক্রি বাড়ছে – নতুন করে তাঁরা তাঁদের ঐতিহ্যকে দেখতে চাইছেন – নতুন করে সম্মান ফিরিয়ে দিতে চাইছেন এই গ্রামীণ উতপাদকেদের। শহরের নতুনতম প্রজন্মের দিকে গ্রাম শিল্পীদেরও নতুন প্রজন্ম তাকিয়ে রয়েছেন বড় আশায়। এই শেকড়ছেঁড়া উদ্দাম সময়ে বৃন্দাবন চন্দ, মধুমঙ্গল মালাকার, গীতা কর্মকার বা নিতাই নন্দীরমত শিল্পীদের এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের সবলে টিকে থাকা একান্ত প্রয়োজন। কেননা তাঁরা আজও ধরে রেখেছেন সেই কয়েক হাজার বছরের আজেয় বাংলার নিজস্ব প্রযুক্তি, যে প্রযুক্তির বলে এই অনবদ্য সম্মানীয় মানুষগুলি বলতে পারেন, তাঁরা বিন্দুমাত্র বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে, স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে, স্থানীয় মানুষকে রোজগার দিয়ে, পরিবেশের কম ক্ষতি করে, কমতম সম্পদ ব্যবহার করে গ্রামীণদের বাজারের চাহিদা পূরণ করছেন। এঁরা নিজেরা তৈরি করেছেন সংগঠন। কারোর দয়ায় নয়, নিজেদেরই বলে বাঁচতে চাইছেন। এঁরা বাঁচলে তবেই বাঙলার শিল্প-প্রযুক্তির ইতিহাস বাঁচবে বাংলার ঐতিহ্য পরম্পরা বাঁচবে, বাংলা তার নিজস্ব পরিচয়ে বাঁচবে। আশ্বাসের কথা মধ্যবিত্ত নতুন প্রজন্ম বোধ হয় সেটুকু বুঝতে পেরেছেন।
    ***
    গত বিধানসভা ভোটের আগে, ভোটের পরেও বলেছিলাম। মমতা সরকার তৈরি হওয়ার পাঁচ বছর ছমাস পরে বিন্দুমাত্র রাখঢাক না করেই বলছি- ১৭৫৭র ঔপনিবেশিক বাংলা তথা ভারতে, ব্রিটিশ আর ইংরেজি শিক্ষিত চাকুরিজীবী বাঙ্গালির হাতে বাংলার বিশিল্পায়ন, ধ্বংস, লুঠের পরে এই প্রথম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একমাত্র সরকার, যারা বাংলার গ্রাম বিকাশকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে। সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা রূপায়িত করছে। বিশ্ববাংলা উদ্যম বিশ্বকে পথ নির্দেশ করছে। সরকারি নীতি সমূহ পরম্পরার বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান গ্রামীণ উদ্যোগীদের বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
    সেটা হয়েছে সেটা বর্তমান সরকারের গ্রাম-প্রাধান্য নীতি নেওয়া এবং প্রয়োগ করার জন্যই। স্বাধীনতা পরবর্তী জাতিরাষ্ট্রীয় বড় পুঁজি এবং পশ্চিমী প্রযুক্তি নির্ভর ভারত এবং রাজ্যগুলির নীতি নির্ধারণের ইতিহাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের গ্রাম-প্রাধান্যের নীতি নির্ধারণ এক্কেবারে নতুন ধরণের ভাবনা চিন্তা নয় সেগুলিকে মধ্যবিত্তের এবং তাঁর সঙ্গে কর্পোরেটদের সক্রিয় বিরোধিতা এড়িয়েও সাধ্যমত প্রয়োগ করে চলেছে। তাতে সরাসরি গ্রাম বাঙলার বিকাশ ঘটছে, সরাসরি গ্রামে সম্পদ যাচ্ছে, আড়াইশ বছর লুঠ আর নিপীড়নে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া গ্রামের মানুষ নতুন করে বাঁচতে চাইছেন, শহরমুখী না হয়েও। আমাদের সঙ্গঠনের অন্যতম সক্রিয় উদ্দেশ্য শহরের অর্থ গ্রামে পাঠানো – কন্যাশ্রী, যুবসাথী, সবুজসাথী,লোকপ্রসার প্রকল্পের মত হাজারো প্রকল্পে কিন্তু গ্রাম থেকে লুঠ হওয়া টাকা আবার গ্রামের সাধারণতম মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
    স্বীকার করা দরকার আমাদের মত গ্রামীন সংগঠকও অন্তত লোকপ্রসার প্রকল্পর মত বৈপ্লবিক কোন প্রকল্প ভেবে উঠতে পারতাম না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনা নতুন বাংলায় আমাদের নতুন করে ভাবার নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
    তাই তিনটি দাবি এই প্রবন্ধে করছি
    ১) বৈশ্য-শূদ্র-মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার গ্রমীন উদ্যোগীদের জন্য আলাদা একটি মন্ত্র ২) লোক প্রসার প্রকল্পে গ্রামীন পরম্পরার উদ্যমীদের অন্তর্ভুক্তি
    এবং
    ৩) ব্রিটিশ আর তার অনুগত শিক্ষিত ভদ্রলোকেদের দেওয়া গ্রামীন পরম্পরার উদ্যমীদের হস্তশিল্পী তকমা মুছে ফেলা
    ***
    এই সারকারের গ্রাম-প্রাধান্য নীতির সুযোগে বাংলা-সরকারের কাছে আমাদের দাবি, বাংলার পরম্পরার গ্রামীন উদ্যোগের জন্য আলাদা মন্ত্রক আশু তৈরি হোক। বর্তমানে গ্রাম শহরের বাজারের প্রজ্ঞা, বংশপরম্পরার জ্ঞান আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত দক্ষতা, নিজস্ব বিদ্যুৎ বিহীন প্রযুক্তি আর স্থানীয় কাঁচামালের ওপর নির্ভর ছোট গ্রামীন উদ্যমীরা আজও সরাসরি নিজেদের কাজকর্মের চালিয়ে যাচ্ছেন সরাসরি নিজেদের পরিকল্পনায় এবং উদ্যমে। সেই উদ্যমকে সরকারি সিলমোহর দেওয়া প্রয়োজন, গ্রাম উদ্যমীদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
    মুশকিল হল, আজও এই গ্রামীন পরম্পরার উদ্যমীদের নিজেদের কোন মন্ত্রক নেই – তাঁরা আজও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর বা এমএসএমইর অধীনে। আমরা মনে করি, এই গ্রামবাংলা পুণর্গঠনের কাজটা এমএসএমই মন্ত্রক দিয়ে হবে না – স্বাধীনতার পর এত দিনেও সম্পন্ন হয় নি – শিল্প উতপাদনে বাংলা যেখানে ছিল তাঁর থেকে ক্রমাগত পিছিয়েছে। তাই পারম্পরিক বিশ্ববাংলা মন্ত্রক তৈরি করার পথেই এগোতে হবে। এমএসএমই উদ্যমী আর পরম্পরার গ্রামীন উদ্যমীদের স্বার্থ, চরিত্র দুটোই আলাদা। যদিও স্পষ্ট করে বলা যাক এই দুই আলাদা চরিত্রের উতপাদকেরা কিন্তু পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়।
    মনে রাখতে হবে, এমএসএমই মন্ত্রকের সৃষ্টি হয়েছিল বড় পুঁজির উদ্যোগীদের অনুসারী হিসেবে, গ্রাম উদ্যমীদের স্বনির্ভর, স্বনিয়ন্ত্রিত বাজার থেকে তাড়িয়ে নিয়ে বড় পুঁজি নির্ভর, বিদ্যুৎ পশ্চিমী শিল্পের অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ সম্পন্ন করতে। অনুসারী শিল্প বাংলায় বলা ভাল কলকাতার আশেপাশের শিল্পাঞ্চলে ছিল কিন্তু আজ সেগুলি অস্তমিত। তাদের উতপাদন, প্রযুক্তি, উদ্যমের নিজস্বতা ছিল না। ছিল বড় পুঁজির ওপর প্রগাঢ নির্ভরতা। ফলে বড় পুঁজির প্রযুক্তি, উতপাদনের চেহারা বদলাতে অনুসারী শিল্পগুলি হারিয়ে গিয়েছে বাংলার বড়পুঁজির শিল্প মানচিত্র থেকে। আমরা যারা বাঙলার গ্রামীন বৈশ্য শুদ্র মুসমমান এবং অন্যান্য পরম্পরার সমাজের ছোট উদ্যমীদের সংগঠন যাঁদের সদস্যদের মূল নির্ভরতা জ্ঞান, দক্ষতা আর নিজস্ব বাজার – পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষমতা বা ব্যাঙ্কেবিলিটি নয়, সরাসরি মনে করি লুঠেরা শিল্পবিপ্লবীয় বড় পুঁজি আদতে গ্রামীন ছোট উদ্যমের স্বার্থের সরাসরি বিরোধী – বাঙলার সরকার যে নীতি নিয়ে চলেছে, গ্রামনির্ভরতা বাড়ানো, সেই নীতির বিরোধী।
    ***
    মূল বিতর্কে ঢোকার আগে দেখে নেওয়া যাক গ্রাম উতপাদকেদের বাংলা বাজার কতটুকু। বাংলায় অন্তত ৫০ লক্ষ ছোট উদ্যমী, ৭ লক্ষর বেশি তাঁতি এবং অন্তত ৩ লক্ষ পরম্পরার অভিকর শিল্পী রয়েছেন – মোট সংখ্যা ৬০ লক্ষ। এবারে বোঝা যাক – যদি প্রত্যেককে মাসে দু-চারহাজার টাকা রোজগার করতে হয়, তাহলে নিশ্চই বছরে ন্যুনতম ১-২ লাখ টাকার উতপাদন এবং ব্যবসা করতে হবে। তাহলে ৬০ লক্ষ গুণ ১.৫ লক্ষ – অর্থাৎ ন্যুনতম ৯০ হাজার কোটির ব্যবসা দেয়। এর সঙ্গে প্রায় ১০ কোটির জনসংখ্যার বাংলায় অপরম্পরাগত ছোট গ্রামীন ব্যবসা, কৃষি ইত্যাদির যোগ করলে সেই পরিমানটি আকাশ ছোঁবে। বাংলার ক্ষেত্রফল এবং জনসংখ্যা ভারতের গড় জনসংখ্যার কাছাকাছি – এই অঙ্কের সঙ্গে যদি আমরা রাজ্যগুলির গুণিতক করে ফেলি তাহলে যে অঙ্কটা দাঁড়াবে তা চোখ কপালে তোলার মতই। কর্পোরেট ব্যবসার উচ্চতার শ্রেষ্ঠতার ফানুষ চুপসে যায়। তাই এই বিশাল বিপুল অর্থনীতির জোরে ২০০৮এর ইওরোপ আমেরিকার বিষকে নীলকণ্ঠের মত ধারণ করে গ্রাম ভারত, কর্পোরেট ভারতকে উদ্ধার করে আর সেই বেল আউটের জেরে কর্পোরেট অর্থিনীতির ফাণ্ডামেন্টাল কত জোরদার সেই ফানুসে বাতাস ভরে বড় পুঁজি পোষিত ফেউয়েরা।
    ফিরি আমাদের বিতর্কে – জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, নিজের বাজার, নিজস্ব প্রযুক্তি, নিজের কাঁচামাল, আর নিজের এলাকায় শ্রম বাজারের ব্যবস্থাপনা নিজের হাতে রাখার বৈশ্য শূদ্র মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার সমাজের গ্রাম উদ্যমের জন্য কেন এমএসএমই মন্ত্রকের বাইরে আমরা একটা আস্ত মন্ত্রকএর দাবি জানাচ্ছি সেই যুক্তি-প্রতিযুক্তিতে। আমাদের প্রতীতি প্রমান করতে আমরা একটা পথ নিয়েছি – দুটি বিষয়ের তুলনা।
    বিতর্কে ঢোকার আগে, আগেই যেটা বলেছি, সেটা নতুন করে বলে নেওয়া দরকার, এমএসএমই উদ্যোগীরা আমাদের ভাই। সেই উদ্যোগীদের সঙ্গে পরম্পরার গ্রামীন উদ্যোগের কোন বিরোধ নেই। কিন্তু দুটি উদ্যম আলাদা। তাদের মধ্যে শুধু উৎপাদন করা ছাড়া কোন কিছুতেই যে মিল নেই তা আমরা এবারে দেখাব।
    ধারণা
    • বাংলার বিপুল বৈশ্য শূদ্র মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার গ্রামীন উদ্যোগীদের সংগঠনের দাবি গ্রামীন পরম্পরারা ছোট উদ্যোগীদের মন্ত্রক তৈরি করা দরকার –নাম হোক পারম্পরিক বিশ্ববাংলা মন্ত্রক। এই পরম্পরার গ্রাম শিল্পের জোরেই ১৭৭০এর আগে বিশ্বে বাংলার কৃষিজ-বনজ দ্রব্য – নীল, আফিম, চাল, পান, সুপারি, মশলা, সুগন্ধি, মধু, চিনি, মোম, পাট, কাঠ, হাতি, গুড় ইত্যাদি; শিল্পজ পণ্য নুন, সোরা, লোহা, ইস্পাত, দস্তা, বস্ত্র(রেশম, সূতি), হাতির দাঁতের কাজ, পাথরের কাজ, কাঠের কাজ, চিত্র শিল্প, পাথ খোদাই, মোষের শিঙের কাজ, আসবাব, দামি পাথর ইত্যাদি একচেটিয়া বিশ্ব বাজারে একচেটিয়া বিক্রি হত।
    • বাংলার বিশ্বে পরিচয় ছিল এই পণ্যগুলিতেই। সারা বিশ্ব বাংলাতে আসত এই পণ্যগুলি কেনার জন্য দুশ কুড়ি তিরিশ বছর আগে। পলাশির পরের অবর্ননীয় লুঠ, ছিয়াত্তরের গণহত্যা আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত বাংলার বৈশ্য শূদ্র মুসলমান এবং অন্যান্য পরম্পরার সমাজের উদ্যোক্তারাই বাঙলাকে উদ্বৃত্ত অর্থনীতি তৈরি করেছিল।
    • পলাশীর এবং ভারত স্বাধীনতার পর পরিকল্পনা করে এই উদ্যমটিকে হতোদ্যম করে দেওয়া হয়েছে – যাতে বড়পুঁজির উতপাদনের বাড়বাড়ন্ত হয়। আজ বঙ্গ সরকার যখন নতুনভাবে উন্নয়নের পথ নজর করে এগোচ্ছে, তখন এই দিকে নজর দিয়ে নতুন মন্ত্রকটির নাম দেওয়া হোক পারম্পরিক বিশ্ববাংলা মন্ত্রক।
    • তাতে গ্রামীন পরম্পরার উদ্যমীদের জন্য নতুন ধরণের নীতি নেওয়া যাবে, গ্রামের বেকার সমস্যার সমাধান হবে, রাজ্যের সম্পদ রাজ্যে থাকবে, শহরের টাকা গ্রামে যাবে, গ্রামের মানুষেরা আরও স্বচ্ছল হবেন – গ্রামের মানুষের হাতে টাকা এলে রাজ্যের রোজগার বাড়বে। মনে রাখতে হবে, এমএসএমই আর গ্রামীন পরম্পরার ছোট উদ্যোগের শর্ত আলাদা, তাদের ভাবনা আলাদা, কাজের দর্শন আলাদা।
    কেন আমরা এসএমএসই দপ্তরের অধীন থাকতে চাই না –
    এসএমএসই ক্ষেত্রের সমস্যা
    ক। ন্যুনতম বিনিয়োগের শর্ত - সেবা ক্ষেত্রে ১০ লক্ষ টাকা, উতপাদনে ২৫ লক্ষ টাকা
    খ। বিনিয়োগ খোঁজার সমস্যা - সাধারণত উদ্যোগীর নিজের বিনিয়োগে সাধারণত ব্যবসা শুরু করতে পারে না। ফলে প্রধানতম বিচার্য সেই ব্যবসা ব্যঙ্ক ঋণের উপয়োগী (ব্যাঙ্কেবল) কি না – সে বিনিয়োগ কোথায় পাবে এবং তা প্রক্রিয়া করে উৎপাদন তৈরি করবে। আদতে বড় পুঁজির ওপর নির্ভরশীল ছোট উদ্যমের বাঁচা মরা কিন্তু বড় পুঁজির আবহেই নিয়ন্ত্রিত হয়। সাধারণত ব্যাঙ্ক যেহেতু বড় পুঁজিরই উদ্যম, সেহেতু বড় পুঁজির অনুসারী আদতে বড় পুঁজির ইচ্ছে অনিচ্ছের(কেউ কেউ বলেন অর্থনৈতিক আর ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব – আদতে তা ইচ্ছেই – যাকে ব্যবস্থাপক আর অর্থনীতিবিদেরা তত্ত্বে রূপান্তরিত করেছেন) ওপরে নির্ভরশীল। আদতে তার অস্তিত্বের ওপর বড় পুঁজির অদৃশ্য হাত সবসময় ক্রিয়া করে। সে বিন্দুমাত্র স্বনির্ভর নয়।
    গ। কাঁচামালের জন্য উদ্যমীকে নির্ভর করতে হয় বড় পুঁজির উতপাদনের বা ক্রিয়ার ওপর। কাঁচামালও সাধারণত তাকে জোগাড় করতে হত কিছু দিন পূর্বে রাষ্ট্রের দয়ায়(যারা আদতে পুঁজি নিয়ন্ত্রিত) আজ বড় পুঁজির দয়ায়।
    ঘ। প্রযুক্তি তার নিজস্ব নয়। তাকে সেটা মূলত বড় পুঁজি জাত। সেটা তাকে কিনতে হয়। তার পিছনে প্রচুর সময় অর্থ পরিশ্রম ব্যয় হয়। আর নতুন প্রযুক্তি এলে তাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তার বিনিয়োগ, শ্রমশক্তি তার জন্য ব্যয় করার পরিকল্পনা করতে হয়।
    ঙ। ব্যবসার দক্ষতা সাধারণত উদ্যমীর থাকে না। তাকে হয় সেটা গাঁটের কড়ি ফেলে অর্জন করতে হয়, না হয় ভাড়া নিতে হয় কর্মীরূপে।
    চ। গত দুদশকে কলকাতার আশেপাশের বড় পুঁজির শিল্পের আবনতির সঙ্গে অনুসারী শিল্পের হ্রাসের মধ্যে একটা তাত্ত্বিক সাজুজ্য রয়েছে – হাতে গোণা ব্যতিক্রম ছাড়া, এমএসএমই উদ্যম বড় পুঁজি শিল্পের অনুসারী। ফলে এলাকায় বড় পুঁজির শিল্পের উচ্চাবচতার সঙ্গে তাঁর ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে।
    ছ। আর যদি যে স্বাধীন উতপাদক হয় – তাহলে তার উৎপন্নের বাজার খুঁজতে হয় নিজেকেই, লড়াই করতে হয় বাজারে থাকা বড় প্রতিযোগীর সঙ্গে, বাজারের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে থাকে না।
    জ। তাকে যন্ত্র চালাতে সরাসরি নির্ভর করতে হয় বিদ্যুতের ওপর। তাঁর দাম, তা পাওয়া, তার গুণমান সব নির্ভর করে বড় পুঁজির ইচ্ছের ওপর।
    কিন্তু এর তুলনায় বাংলার পরম্পরার গ্রামীণ ছোট উদ্যোগীদের নিজস্ব জোরের জায়গাটি দেখি -
    ১। বৈশ্য শূদ্র মুসলমান এবং অন্যান্য গ্রামীন পরম্পরার উদ্যমীদের বিনিয়োগের পুঁজি খুব বড় সমস্যা নয় – সে তার জীবনে ১০ লক্ষ টাকা হয়ত রোজগারই করে না - অথচ সে তার নিজের কারখানার মালিক – সেটা তৈরি করতে সে ব্যাঙ্ক বা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে না। ফলে তাঁর উদ্যম পুঁজি নির্ভর নয় – ব্যাঙ্কের দরজা সে হয়ত তাঁর জীবনে একবারও মাড়ায় না, ফলে চাইলেও ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা মার্ফত বড় পুঁজি তাকে দখল করতে পারে না। সে স্বাধীন। সে নিজের সমাজের সঙ্গে যুক্ত। তাকে রাষ্ট্র পুঁজি কেউই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না।
    ২। কাঁচামাল সমস্যা নয়। শাঁখ, ধাতু আর তাঁতের সুতো(আমরা বাংলায় গ্রামে তুলো চাষ করেছি – ক্রমশঃ তাহলে সুতোর ওপরে তাঁতিদের নিয়ন্ত্রণ এসে যাবে। তাকে আর মিলের খারাপ সুতোর ওপরে নির্ভর করতে হবে না)। ছাড়া কাঁচামাল সাধারণত উদ্যোগী তার গ্রামের আশেপাশ থেকেই সংগ্রহ করে।
    ৩। তাকে দক্ষতা সংগ্রহের জন্য আলাদা করে পাঠ নিতে হয় না। পরম্পরার ছোট উদ্যোগীদের মূল কাঠামো হল তার বংশপরম্পরায়/সামাজিকভাবে বয়ে যাওয়া সামাজিক দক্ষতা, যে দক্ষতা সে চারিয়ে দিয়ে যায় তার উত্তরপ্রজন্মের কাছে বা তার সমাজে।
    ৪। তার জোর বংশপরম্পরার বাপ-দাদার বা সামাজিক জ্ঞান। তার জ্ঞান সে হয় তার পরিবারের লোককে বা তার কর্মচারীকে দিয়ে যায় – ফলে সমাজে নিত্যনুতন দক্ষতা আর জ্ঞানে নতুন নতুন উদ্যোগী তৈরি হয়। এবং সেটা তাকে কিনতে হয় না।
    ৫। প্রযুক্তির জন্যও তাকে কাউকে পয়সা দিতে হয় না, যন্ত্র সারাই করতে তাকে এমন কিছুই খরচ করতে হয় না বা যন্ত্র খারাপ হলে দক্ষ যন্ত্রবিদের জন্য তাকে হাপিত্যেস করে বসে থাকতে হয় না – সে সারাইয়ের দক্ষতা তার নিজের না হয় গ্রামেই না হয় আশেপাশেই থাকে – নতুন প্রযুক্তি এলে পুরোনোকে ফেলে দিয়ে, তা সংগ্রহ করতে দৌড়োদৌড়ি করতে হয় না। নতুন প্রযুক্তি জোগাড় এবং কেনার জন্য বিনিয়োগ আর তা চালাবার জন্য শ্রমিক খুঁজতে হয় না। তার জোর বংশ পরম্পরার নিজস্ব সামাজিক প্রযুক্তি – এখনও জং না পড়া লোহা তৈরি করেন ডোকরা কামার – বড় রোলিংমিল নয়; আজও ভাল সুতো, শাড়ি, জামাকাপড় তৈরি হয় তাঁতে – কাপড় মিলে নয়; আজও সূক্ষ্ম শাঁখে কাজ হয় হাতে, যন্ত্রে নয়।
    ৬। আর বাজার সাধারণত তার নিজের, হাতের কাছের হাট, বাজার বা গঞ্জ, না হলে কাছের শহর।
    ৭। ছোট উতপাদকেদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার নিজস্ব উতপাদনের ইতিহাস, নিজস্ব প্রযুক্তির গর্ব, আর ঐতিহ্য যা বাংলার জ্ঞানচর্চা ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে – একদা বাঙ্গালার বিশ্বপরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে।
    ৮। আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা এই উদ্যমে গ্রামের বা স্থানীয় শ্রমশক্তির নিয়োজন হয়। গ্রামের শ্রমিক আরও বেশি কাজ পায়। তাদের কাজ খুঁজতে গ্রামের বাইরে আর যেতে হয় না। আর বিনিয়োগের হারের তুলনায় গ্রামীন ছোট উদ্যোগে অনেক বেশি মানুষ নিয়োজিত হন, তাতে বেকার সমস্যার সমাধান হয়।
    ৯। আর যেহেতু তার উদ্যম বিদ্যুৎ নির্ভর নয়, রাসায়নিক নির্ভর নয় মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে তাকে উৎপাদন করতে হয় তাই তাকে বড় পুঁজির উতপাদনের সঙ্গে লড়াই করতে হয় না, তার উৎপাদন অনেক বেশি দামে শহুরে বাজারে বিকোয় – তার রোজগার, রাজ্যের রোজগার আর গ্রামের স্বনির্ভরতা বাড়ে। গান্ধীজীর গ্রামস্বরাজের স্বপ্ন সাকার হয়।
    ১০। এরা কেউ রাজ্যসরকার বা কেন্দ্র সরকারের ভর্তুকি বা বিনিয়োগ পেতে উতসাহী নয়। ফলে এই উদ্যোগী তৈরি করতে সরকারের বিন্দুমাত্র অর্থ ব্যয় হয় না; বরং সরকারের সঙ্গে গ্রামে বসে উৎপাদন করা উদ্যোগী গ্রামন্নয়নের কাযে অংশিদার হয়। তাকে আর উতপাদনের জন্য শহরে আসতে হয় না।
    ১১। জ্ঞান প্রযুক্তির প্রজ্ঞা নিজের পরিবারে বা সমাজে থাকে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে যায়। তাই দেশকে জ্ঞান আর প্রযুক্তি কেনার জন্য গাঁটের কড়ি বিনিয়োগ করে বড় পুঁজিকে উৎসাহিত করতে হয় না।
    ফলে তাকে আলাদা করে যদি গ্রামীণ ছোট উতপাদকেদের উতসাহিত করা যায়, তাহলে যেমন গ্রামের টাকা গ্রামে থাকে, রাজ্যের টাকা রাজ্যে থাকে, তেমনি দক্ষ শ্রমিক রাজ্য ছেড়ে বিদেশে রোজগারের জন্য পাড়ি দেয় না।
    ফলে এই মানুষদের উদ্যম কোনভাবেই এমএসএমই দপ্তরের অধীন হতে পারে না। যে দপ্তর ন্যুনতম দশ লাখ টাকা বিনিয়োগ করাকে তাঁর আধীনে থাকার উদ্যমীর চরিত্রভাবে, সেই এমএসএমই দপ্তরের অধীন গ্রাম পরম্পরার জ্ঞান, দক্ষতা, নিজের বাজার আর প্রযুক্তি নির্ভর উদ্যমীরা হতে পারে না। গ্রাম উদ্যমীরা স্বাধীন, তাঁরা পুঁজি নির্ভর নয়। তারাই ভারত – তাঁর ইন্ডিয়া নয়। তারাই গ্রাম ভারতের প্রতিনিধি। বাংলা, ভারতের গর্বের প্রতিনিধি। তাঁরা হস্ত শিল্পী নয়, তাঁরা গ্রাম উদ্যমী।
    ***
    শেষ কথা
    আমরা যাকে হস্তশিল্প বা হ্যান্ডিক্র্যাফট বলছি সেই বলাটা কতটা সামাজিক, বাস্তবসম্মত সেটা ভাবা দরকার। এ বিষয়ে উইভার্স আর্টিজান এন্ড পারফর্মিং আর্টিস্টস গিল্ডের(ওয়াপাগ) একজন হয়ে কিছু কথা বলার অনুমতি চাইছি।
    ১৮০০ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৭০টি শিল্প দ্রব্য(সোরা, লোহা পিণ্ড, দস্তা, জং ছাড়া ইস্পাত মণ্ড ইত্যাদি) আর ১০০টির বেশি কৃষি দ্রব্য(কাপড়, নীল, আফিম, চাল, নুন, মোম, সুপুরি, তামাক, ভোজ্যতেল, অন্যান্য বনজ দ্রব্য, পান, কাঠ, হাতি ইত্যাদি) প্রায় একচেটিয়া রপ্তানি করত বৃহত বাংলা - আজকের পোকায় কাটা বাংলা নয়, সে ছিল পূর্বের মায়ানমারের প্রান্ত থেকে পশ্চিমে উত্তরপ্রদেশের প্রান্ত, উত্তরে তিব্বতের সীমা থেকে দক্ষিণে ওডিসা পর্যন্ত অঞ্চল - কিন্তু এর পশ্চাদভূমি আরও বড় ছিল - পশ্চিমে রাজস্থান পর্যন্ত আর দক্ষিণ পশ্চিমে মহারাষ্ট্র পর্যন্ত - তো ভারতে, এশিয়, আফ্রিকার বাজারে কয়েক হাজার বছর ধরে এই জিনিসগুলি সরবরাহ করেছে গ্রামের ছোট উতপাদকেরা, যাদের আমরা হস্তশিল্পী বলে আসছি উপনিবেশের অনুসরণে। ঔপনিবেশিক বা বড় পুঁজির অর্থনীতিবিদেরা মনে করত, এবং আজও করে, গ্রামীন এই উতপাদকেরা প্রান্তিক, এরা উতপাদন না করলেও অর্থনীতির ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। এরা জাদুঘরের সামগ্রী, এরা যদি না বাঁচে তাহলেও খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। এই অর্থনীতি মৃত। এদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
    এই ভাবনার বেলুনটির গ্যাস নির্গত হতে শুরু হয়েছিল বহু কাল – কিন্তু তাকে শেষ ধাক্কাটা দিয়ে গিয়েছে গিয়েছে ২০০৮-১১ সালের ইওরোপিয় বিষ। আমরা আজও মনে রাখি না যে বৈশ্য শূদ্র মুসলমান এবং অন্যান্য-গ্রামের বংশ পরম্পরার ছোট উদ্যোগীরা ভারতের অর্থনীতির ৮০%র অংশিদার, এখনও তারা বড় পুঁজির ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার বাইরে, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে, ব্যাঙ্ক অর্থনীতির বাইরে। ২০০৮ সালের ইওরোপ আমেরিকার অর্থনীতির মন্থনে উদ্ভুত অতিলোভের বিষ বিষ তাঁদের অর্থনীতিকে পেড়ে ফেলতে পারে নি। বরং গ্রামীন উতপাদকেদের স্থিতিশীল অর্থনীতি ভারতীয় অর্থনীতিকে বাঁচতে সাহায্য করেছিল। অথচ নাম কিনেছিল, ভেঙ্গে পড়তে পড়তে বেঁচে ওঠা রাষ্ট্রীয় বড় পুঁজির অর্থনীতি, পিঠ চাপড়ানি পেয়েছিল ব্যাংক ব্যবস্থার অর্থনীতির মৌলিক চলকগুলির (বেসিক ফান্ডামেন্টালস) ভিত্তিগুলি।
    আমরা এখনও মনে করি, সেটাই বাস্তব। গ্রামের আর্থব্যবস্থার জোরে টিকে রয়েছে ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা - ব্যাংক ব্যবস্থা খুব বেশি হলে ১৫-১৭ শতাংশ মানুষকে জড়িয়ে নিয়েছে নিজের ব্যবস্থায় - উচ্চমধ্যবিত্তের বাইরে কত শতাংশ মধ্যবিত্তের জীবনের কতটা ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে তা কিন্তু গবেষণাযোগ্য; তার বাইরে রয়েছে বিশাল বিপুল গ্রামীন অর্থনীতি, যার পরিমাপ আমরা এঁকেছি আগেই, ফলে এই অঙ্কে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির কঙ্কালসার চেহারাটা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়, বড় পুঁজির বাহ্বস্ফোটকে প্রকাশ্যে এনে ফেলে। এবং সেই গ্রাম্য আর্থব্যবস্থার মূল ভারসাম্য বজায় রাখছে কৃষক আর গ্রামের ছোট শূদ্র বৈশ্য মুসলমান এবং অন্যান্য সমাজের বংশপরম্পরার উদ্যমীরা।
    যদি আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে স্থিতিশীল বাংলা চাই, তাহলে শহরের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের অর্থিনীতির সবলীকরণ করার দিকে এগোতে হবে, শহরের অর্থ গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে, গ্রামের অর্থনীতিকে আঘাত না করে তাকে জোরদার করতে হবে - যে কাজটা আজ বাংলা শুরু করেছে - আর আমরা করতে যাচ্ছি।
    একটা প্রশ্ন উঠবে, যদি গ্রামীন অর্থনীতি এতই সবল হয়, তা হলে আমাদের এই অর্থিনীতিকে নতুন করে সবল করার দরকার কি?
    আমাদের সহজ উত্তর, আমাদের জন্য, ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়ানো বিশ্বকে বাঁচাবার জন্য। আজ প্রমাণিত এই দুষণের রাজা, লুঠের সম্রাট শিল্পবিপ্লবীয় উতপাদন ব্যবস্থা বিশ্বকে ধ্বংস করার মুখোমুখি করে ফেলেছে - সেটা অনেকে বুঝলেও অন্তত ভদ্র মধ্যবিত্তর কিস্যু করার নেই - তারা এই লুঠেরা খুনি অত্যাচারী বড় পুঁজির উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থার চালকের আসনে। দিনের পর দিন এই উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা এই গ্রাম্য অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্বগুলি আলোচনা করার মাধ্যমে, এই অর্থনীতিকে জোরদার করার মাধ্যমে, ধ্বংস হতে বসা মধ্যবিত্ত, এই অর্থনীতি আর সর্বোপরি এই বিশ্বকে বাঁচাতে চেষ্টা অন্তত করতে পারি।
    উইভার্স আর্টিজান এন্ড পারফর্মিং আর্টিস্টস গিল্ডের(ওয়াপাগ) পক্ষ থেকে বন্ধুদের বিনীত নিবেদন, যাদের জোরে আজকের ভারত/ইন্ডিয়া দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের হস্তশিল্পী না বলে গ্রামভিত্তিক ছোট পরম্পরার উতপাদক বলা চালু করি। অন্তত এই নবতম ভাষ্যটা চালু করার আমরা ভগীরথ হওয়ার সম্মান অর্জন করি।
  • Somnath Roy | ০৮ মে ২০২১ ০৬:২২105694
  • ্বিশ্বেন্দুদা, বাকি পয়েন্টে পরে আসছি, কিন্তু এম এস এম ইর ডেফিনেশনে তো ন্যূনতম বিনিয়োগ নেই, ঊর্ধতম মান দেওয়া আছে। ১ কোটির নিচের বিনিয়োগ হলেই এম এস এম ই। আমি মহিষাদলে ব্রাস ক্লাস্টারের সঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছি। তাঁরা তো কারিগর-ই।


    https://msme.gov.in/sites/default/files/MSME_gazette_of_india.pdf

  • বিশ্বেন্দু নন্দ | 45.112.68.214 | ০৮ মে ২০২১ ০৮:১১105695
  • পুঁজি নির্ভর এমএসএমই আর পুঁজি নিরপেক্ষ কারিগর ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য হোক। যে নীতিগুলো নিয়ে এমএসএমইএর পরিকল্পনা হয়,তার সঙ্গে কারিগর ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য আছে। সরকার বা কনসালট্যান্টরা জোর করে মিলিয়ে দিতে পারেন হয়ত কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় না বরং কারিগর ব্যবস্থাকে বাধ্য করা হয় বড় পুঁজিরমত ঢেলে সাজানো ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে। 

  • শমীক সাহা ( কারিগর শমীক) | 182.66.178.26 | ০৮ মে ২০২১ ১৩:১৯105703
  • বিশ্বেন্দু দা আমার সহযোদ্ধা। তিনি অনেক বিষয়কেই খোলসা করেছেন। কিন্তু মুশকিল  হল কারিগর অর্থনীতিকে বুঝতে হলে এই কারিগরি উৎপাদনের ভিতরে থাকতে হয়, বাইরে থাকলে বোঝা যায় না। সত্যিই বোঝা যায় না। 


     এবার যারা কারিগরি ব্যবস্থাপনাকে বুঝতে চাইছেন, আন্তরিক ভাবেই চাইছেন, তাদের সবাইকে তো বলতে পারি না যে - আগে কারিগর হোন তারপর বুঝবেন। সেটা খুবই বাড়াবাড়ি রকমের আবদার হয়ে যাবে। 


    আমি  বরং একটা অন্য রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করি। কিছু প্রশ্ন রাখছি, নিজেরা উত্তর খুঁজুন, তাহলে অনেকটা বুঝতে পারবেন -


     ১। করোনার বিরুদ্ধে কত মাস্ক আর পিপিই সেলাই হয়েছে?  কোটির কম কি? 


    ২। কারা এগুলো বানালো? তাদের এগুলো বানানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল কি? 


    ৩। সরকারকে কোনও ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হয়েছে কি? 


    ৪। এই চাহিদা আচমকা এসে উপস্থিত হয়নি কি? 


    ৫। এই উৎপাদনের পুঁজি কোনও ব্যাঙ্ক যোগায়নি, তাহলে কারা যোগালো? 


    ৬। এই উৎপাদন প্রকৌশলের কোনও মালিকানা বা পেটেন্ট আছে কি? 


    ৭। বাজারে অক্সিজেন কম পড়েছে, অটোমেটিক মেশিনে তৈরি N95 কম পড়েছে,  কিন্তু সেলাই করা মাস্ক কি  এক দিনের জন্যও কম পড়েছে? 


    এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই লুকিয়ে আছে কারিগরি উৎপাদনের অপরাজেয় হয়ে টিকে থাকার সহস্র বছরের ঐতিহ্য।  এই কারণেই আমরা বলি - কারিগরি উৎপাদন = সামাজিক উৎপাদন।                


      

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন