• হরিদাস পাল  লিঙ্গরাজনীতি

  • ভুবনমোহিনী

    Ajay Mitra লেখকের গ্রাহক হোন
    লিঙ্গরাজনীতি | ২৫ অক্টোবর ২০২১ | ১০৭ বার পঠিত
  • ভুবনমোহিনী, শুধু এক নাম নয়, এক লড়াই এর নাম।

    আজ লিখছি ভুবন কে নিয়ে। এটা আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগেকার সামাজিক প্রেক্ষাপট। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই লেখাটা কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা পাঠকরাই ঠিক করবেন। সমাজের একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে এ লেখা। তিরিশ বছর পরে সেই মানুষদের জীবন নিশ্চই কিছুটা বদলেছে কিন্তু সেই বদলটা তো সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক, আমরা আলাদা করে তাদের জন্য কিছু করিনি বা তাদের নিয়ে ভাবিনি। আগামী দিনেও কি ভাববো? প্রশ্ন টা কিন্তু থেকেই গেলো।

    ভুবন একটি ছেলের নাম, অনেকেই ভাববেন ভুবন তো ছেলেদেরই নাম হয় তাই এটা আলাদা করে বলার কি আছে, কিন্তু আছে, বলার আছে। ভুবনের শারীরিক গঠন ছিল ছেলেদের মতো কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ছিল পুরোপুরি মেয়েলি, তার চলাফেরা, কথা বলা, আচার, আচরণ দেখলে বোঝা যেত সে সব সময় একটা কিছুর সাথে লড়াই করছে, সে যেভাবে চাইছে সেভাবে কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করতে পারছে না। এটা যখনকার কথা বলছি তখন তার বয়েস নয়, দশ হবে, আমরা চার পাঁচজন একসাথে তখন প্রাইমারি স্কুল এ যেতাম। আমরা তখন এতটাই ছোট ছিলাম যে ওর আচার - আচরণ আমাদের থেকে অনেকটা আলাদা সেটা বুজতাম না। আমরা যখন স্কুলের টিফিন ব্রেক এ ফুটবল, ক্রিকেট খেলতাম, বা অনেক সময় গুলি-ডান্ডা ও খেলেছি ও তখন মেয়েরা যেখানে কিতকিত বা ধরাধরি খেলতো সেখানে চুপ করে বসে বসে ওদের খেলা দেখতো, হয়তো খেলারও ইচ্ছা হতো কিন্তু লজ্জায় বলতে পারতো না। ওর স্কুলব্যাগ এর মধ্যে অনেক সময় মেয়েদের টিপ্, চুল বাধার গার্ডার, ছোট আয়না এসব দেখেছি, আমরা হাসাহাসি করলে ও বলতো এগুলো আমার দিদির, ভুল করে রেখে দিয়েছে। এমন অনেক মেয়েলি কাজ ও করতো যেগুলো তখন ছোট ছিলাম বলে ঠিক করে খেয়াল করিনি, হয়তো মজা পেয়ে কখনো হাসাহাসি করেছি, আজ কিন্তু ভালো ভাবে ভাবলে বুজতে পারি সেগুলো ছিল ওর স্বাভাবিক আচরণ, স্বতঃস্ফূর্ত।

    যখন একটু আধটু ওর ব্যাপার টা বুজতে পারছিলাম তখন আমরা প্রাইমারি স্কুল গন্ডি পেরিয়ে হাই স্কুলে চলে গেছি। এমনিতেই হাই স্কুলে পড়াশোনার চাপ বেশি তার ওপর আমি একটু বেশিই খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম তাই অনেকসময় পারিপার্শ্বিক জগতে যা কিছু হতো তার অনেক কিছুই আমার অগোচরে থাকতো। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় শুনলাম, বন্ধুরা সবাই ভুবন কে নিয়ে আলোচনা করছে। ভুবন কে নিয়ে সবাই খুব হাসাহাসি করছে, ব্যাপারটা প্রথমে না বুজলেও পরে বুজলাম হাসির কারণ টা কি।

    ভুবনের পাশের বাড়ির উমা কাকিমা সন্ধ্যেবেলা ছাদে জামা কাপড় তুলতে গিয়ে দেখেন যে পাশের বাড়ির ছাদে একজন মহিলা পায়চারি করছেন, কাকিমা প্রথমে ভেবেছিলেন বোধহয় ভুবনের মা হবেন কিন্তু পরক্ষনেই মনে হলো বিনাবৌদি তো লম্বায় এতো খাটো নন তার ওপর ওনার হাঁটুর সমস্যা তাই উনি একদমই ছাদে আসেন না, তাহলে কি খুকু মানে ভুবনের দিদি, যদিও খুকুকে কোনোদিন শাড়ি পরা অবস্থায় উমা কাকিমা দেখেন নি। উমা কাকিমা যেই খুকু বলে ডাকলেন, শাড়ি পরা মূর্তিটা চমকে গিয়ে কেমন যেন ভয় পেয়ে একছুটে সিঁড়িঘরের মধ্যে ঢুকে গেছিলো, কিন্তু সিঁড়িঘরের জানলার সার্সি দিয়ে উমা কাকিমা পরিষ্কার সেদিন শাড়ি পড়া ভুবনকে দেখেছিলেন। ভুবন মেয়েদের কাপড়, ব্লাউস পরে, কপালে একটা টিপ্ পরে ছাদে পায়চারি করছিলো। আর তারপর যা হয় ঘটনাটা একজনের মুখ থেকে আর এক জন এই ভাবে গোটা পাড়ার মানুষ জেনে গেলো। এমনিতেই সবাই বলাবলি করতো কিন্তু চাক্ষুস প্রমান এতদিন ছিল না। হঠাৎ করে কিছু মানুষের মনে হলো এবার এটার একটা বিহিত করতে হবে, এমন জিনিস তো আর একসেপ্ট করা যায় না।

    এইভাবেই খবরটা স্কুলের কিছু ছেলেদের কাছে পৌঁছে গেছিলো। তাদের থেকেই প্রথম আমি শুনলাম কিন্তু আমার সত্যি সেদিন কেন জানি না একটুও হাসি পেলো না, হয়তো ব্যাপারটা সেদিন ভালো করে বুজতেই পারিনি। আমার মনে হয়েছিল ভুবনের নিশ্চই মানসিক অবস্থা ভালো নয় তাই ওর সাথে একবার দেখা করা দরকার।

    এমনিতেই আমাদের বাড়ি ভুবনদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ছিল কিন্তু কাজের মাসির মাধ্যমে খবর দেখলাম আমাদের বাড়িতেও পৌঁছেছে তাই বাড়িতে কিছু না বলেই ওই দিন ফুটবল মাঠে না গিয়ে ভুবনের বাড়ির দিকে সাইকেল ছোটালাম।

    ভুবনের বাবা পোস্ট অফিসের পিওনের কাজ করতেন, খুবই নির্বিকার একজন মানুষ যাকে নিয়ে পাড়াতে কোনোদিন কাউকে কোনো আলোচনা করতে শুনিনি, আর কাকিমাও ওই রকমই ছিলেন। নিজের ফ্যামিলি, ছেলে, মেয়ে, ধর্মকর্ম এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। খুকুদি ভুবনের চেয়ে দু বছরের বড়ো ছিল, পাড়ারই আর একটি মেয়ে উর্মির সাথে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল, সবসময় ওদের দুজনকে একসাথে দেখেছি কিন্তু খুকুদি আর ভুবনকে পুজো পাব্বনে ছাড়া একসাথে কোনোদিন দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

    ভুবনদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই ওর বাবা বেরিয়ে এলেন, আমাকে দেখে একটু অবাক ই হলেন কারণ আমি ওদের বাড়িতে আগে কখনো যাই নি। ভুবনের সাথে দেখা করতে চাই শুনে উনি পত্রপাঠ আমায় বিদেয় করে দিচ্ছিলেন কিন্তু কাকিমা আমায় বাড়িতে ডাকলেন। বাড়ির মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা, যেন মনে হচ্ছে বাড়িতে খুব বড় একটা কোনো বিপদ ঘটে গেছে, সবাই একটা শোকের মধ্যে আছেন। ভুবনের ঘরের দিকে যাবার আগেই আমার দুটো হাত ধরে কাকিমার সে কান্না আজও আমার মনে আছে। কাঁদতে কাঁদতে কাকিমা আমায় বার বার বোঝাচ্ছিলেন যে ভুবন আমার মতোই একজন সম্পূর্ণ সুস্থ তরুণ। ও জন্ম থেকে খুকুকে দেখে বড়ো হচ্ছে, তাই ও খুকুর সব কিছুই অনুসরণ করার চেষ্টা করে। মা হিসাবে তিনি এর মধ্যে অন্যরকম কিছু দেখেন নি তাই স্বভাবতই এই ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান নি। খুকু যখন ওর সাজের জিনিস ভুবনের ব্যাগ এ খুঁজে পেয়ে বিনাকাকিমার কাছে অভিযোগ করতো উনি তা নিয়ে গুরুত্ব দেন নি ভেবেছিলেন বড়ো হবার সাথে সাথে যখন ভুবনের একটা নিজের জগৎ হবে তখন এ সব জিনিস ঠিক হয়ে যাবে। যেদিন ভুবন ছাদে শাড়ি পরে ঘুরছিলো, সেদিন নাকি খুকুও বায়না করে প্রথম দিন শাড়ি পরেছিল, এই কথাটা তিনি অনেকবার উমা কাকিমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু উমা কাকিমা বিশ্বাস করেন নি, উল্টে উনি ভুবনের মা কে বলেছিলেন ভুবন তৃতীয়লিঙ্গ তাই ওকে যেন তৃতীয়লিঙ্গদের যে সমাজ আছে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই পর্যন্ত বলে বিনাকাকিমা আমার হাত দুটো ধরে অনুরোধ করলেন আমি যেন ভুবনের সাথে এই সব নিয়ে কোনো কথা না বলি। আমি তো পুরো ব্যাপারটা ভালো করে তখন বুজতে পারিনি, তৃতীয়লিঙ্গ কি তও জানতাম না তাই ওনাকে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে সোজা ভুবনের ঘরে ঢুকে পড়লাম।

    ভুবন চেয়ারে বসে টেবিলে রাখা একটা ড্রয়িং খাতায় একমনে ড্রয়িং করছে, আমি যে প্রায় আধঘন্টা ওদের বাড়িতে এসেছি, কাকিমা যে এতক্ষন আমার সাথে এতো কথা বললেন, মনে হলো না ভুবন তার কিছু জানে। আমাকে দেখে ও বেশ অবাক হয়ে গেলো, কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো, তারপর বললো আয় বস। দেখতো ড্রইংটা কেমন হচ্ছে? ও ছোট থেকেই খুব ভালো ড্রয়িং করতো, আমরা বলতাম তোর জন্য আর্ট কলেজে একটা সিট এখন থেকেই রাখা আছে, তোর আর চিন্তা কিসের। আমি এক ঘন্টা ওর সাথে ছিলাম, আমরা দুজনে স্কুল, সিলেবাস, প্রাইভেট কোচিং ক্লাস আর স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে অনেক কথা বললাম কিন্তু ওর শাড়ি পরে ঘোরার ঘটনাটা একবারও আলোচনার মধ্যে এলো না। কথায় কথায় ভুবন বললো ও খুব স্কুল যেতে চায় কিন্তু বাড়ির লোকেরা ওকে স্কুল তো দূরের কথা বাড়ির বাইরেই যেতে দিচ্ছে না। শুনে মনটা খুব খারাপ হলেও আমার কিছুই করার ছিল না। আমাদের সমাজবাবস্থা তখন এমনই ছিল যে ওই বয়েসে আমরা শুধুই বড়োরা যা বলতো তা শুনে যেতাম, ভালো না লাগলেও শুনতে হতো কিন্তু বড়োদেরকে কোনো কিছু বলার অভ্যাস ছিল না। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।

    তারপর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে, ভুবনের আর কোনো খবর পাচ্ছিলাম না, ও স্কুলেও আসছিলো না। ইচ্ছা হচ্ছিলো ভুবনের বাড়ি গিয়ে ওর সাথে দেখা করার কিন্তু মনের থেকে ওর মা আর বাবাকে ফেস করতে চাইছিলাম না। একদিন অনেক সাহস করে আমার মা কে জিগ্যেস করেই ফেললাম ভুবনের ব্যাপারে কিছু শুনেছে কিনা। মা যা বলেছিলেন সেটা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিলো। মা বলেছিলেন ভুবন বাড়ির বাইরে বেরোতে পারছিলো না, বেরোলেই পাড়ার কিছু লোকজন ওকে দেখে হাসতো, কটূক্তি করতো, মজা করতো। তার ওপর পাড়ার কিছু দাদা টাইপের লোকজন ওর বাবা কে প্রায়ই থ্রেট করতো যাতে ওরা বাড়ি বিক্রি করে পাড়া ছেড়ে চলে যায়। আর সবচেয়ে খারাপ কাজটা করেছিলেন উমা কাকিমা, যিনি জন্ম থেকে ওকে দেখেছেন তিনি নাকি তৃতীয়লিঙ্গ সমাজে খবরটা দিয়ে এসেছিলেন যাতে তারা ওকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে ওদের কাছে রাখে। এরপর থেকে ভুবনদের বাড়ির সামনে প্রতিদিন সকালে হিজড়া মানুষদের আনাগোনা শুরু হলো, ওদের লিডার রানীদি, ভুবনের বাবা মা কে নাকি বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন যে ভুবনের ওপর ওর বাড়ির লোকেদের কোনো অধিকার নেই, অধিকার যদি থেকে থাকে তাহলে সেটা শুধু তৃতীয়লিঙ্গ সমাজের আছে তাই ওরা ওকে ওদের সাথে নিয়ে যাবেই।

    এইসব চলছিল, তারপর হটাৎ একদিন খবর পেলাম ভুবন কে নাকি বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না, ও কোথায় গেছে কেউ বলতে পারলো না। বিনা-কাকিমা, ভুবনের বাবা আর খুকুর কাছ থেকেও কেউ কোনো উত্তর বার করতে পারলো না।

    এইসব ঘটনার পর প্রায় মাস খানেক কেটে গেছে, একদিন আমি স্কুল যাবো বলে রেডি হচ্ছি মা বললেন, বাবু, খুকু এসেছে তোর সাথে দেখা করতে, বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে আস্তে বললাম কিন্তু এলো না। আমি বেশ অবাক হয়ে বাড়ির বাইরে এসে দেখলাম খুকুদি একটু দূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমায় ডাকছে। কাছে গেলাম। ও বললো বাবু তোমায় দেবার জন্য একটা চিঠি আমার কাছে আছে, সেটাই দিতে এলাম। প্রতিদিন ই ভাবি আসবো কিন্তু সময় করে উঠতে পারছিলাম না, আজ বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে ঠিক করলাম তোমায় চিঠিটা দিয়ে কলেজ যাবো। আমার নামে চিঠি কে দিলো? খুকুদি বললো তুমি পড়ে নিও। আমি এবার গেলাম, বলে খুকুদি হাওয়া। খুকুদি তো চলে গেলো কিন্তু আমার তো হাত পা তখন কাঁপছে, বার বার বোঝার চেষ্টা করছি এমন কেউ আছে কিনা যে আমায় চিঠি লিখতে পারে। অনেক চেষ্টা করেও কারোর মুখ সামনে এলো না, কানে এলো মা এর চিৎকার, বাবু স্কুল এর দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে ঢুকে বুজলাম, মা সবটাই দেখেছেন তাই কোনো বিতর্কে গেলাম না। স্কুল থেকে ফিরে এ নিয়ে কথা হবে বলে সাইকেলের প্যাডেল চাপ দিলাম।

    স্কুল পর্যন্ত যাওয়ার অবকাশ হলো না; রাস্তার মধ্যে একজায়গায় দাঁড়িয়ে খাম ছিড়ে চিঠিটা বার করে ফেললাম। ভুবন এর চিঠি । চিঠির কথাগুলো আজও আমার মনে আছে তাই চিঠির আকারেই কথাগুলো লিখছি

    জয়,

    যখন কেউ আমার সাথে দেখা করতে আসে নি, তুই এসেছিলি, যখন কেউ কথা বলে নি, তুই বলেছিলি, যখন সবাই আমাকে আলাদা করেছিল তুই কোনো বিভাজন করিসনি, স্কুলে অনেকেই আমায় নিয়ে হাসাহাসি করতো, মজা করতো, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতো, এক সাথে বসতে গেলে বেঞ্চ ফেলে দিতো, নানাভাবে হেনস্থা করতো, তুই কিন্তু ব্যাতিক্রম ছিলি। তুই সত্যি আমার বন্ধু।
    তাই তোর কাছে আমি কিছু লুকোতে চাই না, যা সত্যি সেটা তোকে আমার বলা উচিত।
    মা আমার সমন্ধে তোকে কিছু কথা বলেছেন, কথাগুলো সত্যি না। মা ওই কথাগুলো শুধু তোকে নয় আরো অনেকেই বলেছেন, আসলে মা আমাকে যে কোনো ভাবে হোক নিজের কাছে রাখতে চেয়েছেন, সন্তান এর প্রতি ভালোবাসায় উনি ওটা করেছেন, হয়তো সব মা ই করবেন।
    কিন্তু আমি, আজ তোকে কিছু লুকাবো না। বিশ্বাস কর, আমি সত্যি ই পুরুষের অবয়বে এক নারী। বুজতে পারলিনাতো, প্রথম প্রথম আমিও পারিনি। অনেক পরে বুঝেছি। আমার শরীর টা তোদের মতো কিন্তু মনটা একদম পুরুষালি নয় বরং পুরোপুরি মেয়েলি। তুই ছোট থেকে দেখছিস আমায়, তুই ভালোভাবেই জানিস আমার কি কি ভালো লাগে, আর কি কি ভালো লাগে না। কিন্তু এতে আমার কি দোষ বল, আমি তো নিজের থেকে এভাবে তৈরি হই নি, আমাকে কেউ ইচ্ছা করে এভাবে তৈরিও করে নি, এটা আমাদের ভাগ্য, এটা ব্যাতিক্রম কিন্তু এর জন্য কেউ দায়ী নয়।
    এ চিঠি যখন তুই পাবি তখন আমি আর তোর গ্রামে নেই, তোর স্কুলে ও নেই। ওই গ্রাম, ওই স্কুল, আমার নয়, ওখানে আমার মতো মানুষদের কোনো স্থান নেই, আমাদের জন্য কোনো শিক্ষা নেই, আমরা শুধুই সমাজের বোঝা, বর্জ।
    অনেক ভেবে আমার মা আমায় দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, আমি ও কাউকে চিনি না। এখানে আর কটা দিন থাকলে হয়তো আমায় রানীদির দল ওদের ডেরায় তুলে নিয়ে যাবে আর তারপর থেকে ওখানেই আমায় থাকতে হবে, ওরাই আমার পরিবার হবে।
    এটা কি কখনো হতে পারে? আমি আমার পরিবার কে ভালোবাসি, আমার পরিবার আমায় ভালোবাসে, শুধুমাত্র সমাজের অদ্ভুত একটা বেআইনি নিয়মের বেড়াজালে আমি নিজেকে তাদের থেকে আলাদা করতে পারবো না।
    কাল ভোর হবার আগেই আমি আব্দুল কাকার সাথে কলকাতার দিকে রওনা দেব। ৩.৫০ এর যে ফার্স্ট লোকাল আছে ওটা ধরবো। আব্দুল কাকা ওনার স্ত্রীর বোরখাটা আজ মা কে দিয়ে গেছেন, মা ওটা সেলাই করে আমার সাইজের মতো করে দিয়েছেন। আমি বোরখা পরে আব্দুল কাকার সাথে যাবো যাতে কেউ সন্দেহ না করে। আমার এক মামা মধ্যপ্রদেশে থাকেন, উনি একা থাকেন। মামাই মা কে বলেছেন, আমাকে ওনার কাছে পাঠাতে। একটা সময় অনেকবার ভেবেছি বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু তখন মা এর কথা ভেবে এগোতে পারিনি। যে মানুষটা সব জেনেও আমাকে বাঁচিয়ে রাখার এতো চেষ্টা করছে তার জন্য আমায় বাঁচতে হবে, আমায় লড়তে হবে। আমি আবার নতুন করে শুরু করবো।
    জানিনা তোর সাথে আর দেখা হবে কিনা। যদি চিঠির উত্তর দিস, খুকুদিকে দিবি, হয়তো কোনো একদিন আমার কাছে তা পৌঁছবে।

    ইতি,
    ভুবনমোহিনী

    এই চিঠি পড়ে সেদিন আমার মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন এসেছিলো কিন্তু সেই সময় উত্তর খোঁজার অবকাশ আমার ছিল না। আমি নিজেও তখন অনেক কঠিন লড়াই করছিলাম। ভুবনকে আমার আর চিঠি লেখা হয়ে ওঠেনি।

    আজ যখন ওকে নিয়ে এই লেখাটা লিখছি তখন আবার প্রশ্নগুলো মনে করার চেষ্টা করছিলাম।
    ভুবনদের দোষ টা কি ছিল ?
    সে কোনো চুরি-জোচ্চুরি করে নি, কাউকে মারে-ধরে নি, এমনকি কাউকে কোনোদিন কটূক্তিও করেনি, কারোর কাছ থেকে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক সাহায্যও চায় নি। তাহলে তাদের ওপর এমন অত্যাচার কেন?

    আজও ভুবনরা পাড়া, প্রতিবেশী, আশেপাশের মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, হেনস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন৷ সেই অতীত স্মৃতি বরাবরই তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক৷
    এর জন্য দায়ী আমাদের সমাজবাবস্থা, দায়ী আমরা সবাই। একটা সভ্য সুস্থ সমাজ আমরা আজও গড়তে পারিনি। শ্রেণিবৈষম্য, উচ্চ-নিচ, জাত, বর্ণ, লিঙ্গের নামে আমরা মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করেছি, মানুষ ই যাতে মানুষকে শোষণ করতে পারে তার সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছি।

    অনলাইন বিভিন্ন জার্নাল পড়া আমার একটা শখ, এরকমই গত নারীদিবসের দিন ট্রান্সজেন্ডার দের নিয়ে লেখা একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম, লেখাটা বেশ ভালো ছিল তাই অথর এর নাম দেখতে গিয়ে দেখলাম লেখা আছে ভুবনমোহিনী। নামটা এতো চেনা লাগলো, একটু ভাবতেই মনে পরে গেলো ভুবন এর চিঠির কথা। আর্টিকেল এর কমেন্ট করার জায়গায় লিখে দিলাম আপনি কি ভুবন চ্যাটার্জী? আমি জয়। এক ঘন্টার মধ্যে ইমেইল id পেলাম। তারপর ইমেইল করে পেলাম হোয়াটস্যাপ নম্বর। দীর্ঘক্ষণ কথা বললাম। মনের ভেতর ভুবনের জন্য যত খারাপলাগা গুলো ছিল সেগুলো একনিমেষে ভালো লাগায় বদলে গেলো।

    মধ্যপ্রদেশের বারাউনী ডিস্ট্রিক্ট এ ভুবনের মামা ছিলেন ফরেস্ট অফিসার। বারাউনির একটা ট্রাইবাল অধ্যুষিত গ্রামে ওরা থাকতো, এখনো আছে। ওখানকার আর পাঁচটা মানুষের মতো ভুবনও প্রতিটা দিন বড় হয়েছে, তার নতুন জীবন গড়ে তুলেছে। নিপীড়ন, হেনস্থা তো দূরের কথা ভালোবাসা আর সম্মান তার জীবনের মানেই বদলে দিয়েছে।
    আর্ট কলেজর পড়াশুনো শেষ করে ও বারাউনি টাউনে একটা আর্ট ষ্টুডিও করেছে, আর নিজের গ্রামে একটা স্কুলও করেছে যাতে পিছিয়ে পড়া মানুষদের সন্তানরা আর পিছিয়ে না যায়।
    কিন্তু এসব ছাড়াও ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ যেখানেই নিয়ে যাক না কেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ও কাজ করতে চায়৷ ভুবনের ভাবনা নতুন প্রজন্মকে ঘিরে৷ ট্রান্সজেন্ডার হলেও যেন কাউকে পড়াশোনা ছাড়তে না হয়৷ সবাই সমান ভাবে যাতে স্কুল কলেজে পড়ার অধিকার পায়৷ ভুবন চায় সরকার, সমাজ এমন কিছু একটা করুক যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিবারের সঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করে বড় হতে পারে৷ তৃতীয় লিঙ্গের কমিউনিটিতে যেন তাদের আসতে না হয়৷

    মানুষে মানুষে বৈষম্য, লিঙ্গভেদ আমি মানি না, এমনকি আমার মনে হয় পুরুষ, নারী এই শব্দগুলো ভীষণভাবে ডিস্ক্রিমিনেটিং। নারী, মহিলা এই শব্দগুলোর মানে আসলে সীমাবদ্ধতা, নিপীড়ন, অবহেলা, অসমবন্টন এগুলো আমাদের ব্রেইনওয়াশ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র তাই এর থেকে মুক্তি ওতো সহজে আসবে না, অনেক লড়াই এখনো বাকি। তাই,

    ভয় পেওনা বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে
    দেখা হবে তোমার আমার অন্য গানের ভোরে

    অজয় মিত্র

     

  • বিভাগ : লিঙ্গরাজনীতি | ২৫ অক্টোবর ২০২১ | ১০৭ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন