• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  সমাজ  শনিবারবেলা

  • রক্তের সম্পর্ক

    অমল সরকার
    ধারাবাহিক | সমাজ | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৮৪ বার পঠিত
  • সম্পর্ক-সূত্র

    বীজ বপনে শুরু। তার পর দশ মাস দশ দিন। রক্তের সেই সম্পর্ক ভালবাসা যায়, অবহেলা করা যায়। ছেঁড়া যায় না। পাল্টানোও যায় না। তার পর জীবনভর কত না সম্পর্কের জন্ম। এবং মৃত্যুও।

    কিছু সম্পর্ক শাসনের, অনুশাসনের, বাঁধনের। কিছু সম্পর্ক ভেসে যাওয়ার। চলতি হাওয়ার পন্থী। কিছু সম্পর্ক আঁকড়ে রাখি। কিছু আপনিই বয়ে যেতে দিই। নাম দিতে পারি না এমন অনেক সম্পর্ক থেকে যায় মনের মণিকোঠায়। সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছে নেট মাধ্যমও।

    শুধু কি মানুষ, সম্পর্ক তো চার পাশের কত কিছুর সঙ্গে। পুঁথি বা পর্দার চরিত্র, পুকুর ঘাট বা চিলেকোঠার সিঁড়ি। পাতার ভাঁজে রেখে দেওয়া প্রথম পাওয়া গোলাপ। রাতে গলির মোড়ে আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকা নেড়ি। সম্পর্কের সাগরে ভাসছি, ডুবছি। সম্পর্কের নুড়ি কুড়িয়ে চলেছি। ছুঁড়ে ফেলছি।

    - চলছে, ধারাবাহিক, সম্পর্ক ।
    এগারোটা চল্লিশের লাস্ট রানাঘাট লোকাল সেদিন ঠিক সময়েই ছাড়ল৷ কেউ একজন বললেন, এটা কিন্তু একটা খবর, একেবারে প্রথম পাতার খবর৷’ বাকিরা তাঁর কথায় সায় দেন৷ ফার্স্ট কামরায় নিত্যযাত্রীদের মধ্যে আমরা জনা তিন খবরওয়ালা, মানে সাংবাদিক। তাঁদের উদ্দেশেই বলা হল কথাটি।

    বেশির ভাগ দিনই মাইকে ঘোষণা হয়, রানাঘাট লোকাল ছাড়তে দেরি হবে৷ কোনও কোনও দিন ঘোষক বিলম্বের কারণ জানান। যেমন, ‘ডাউন ট্রেন দেরিতে ঢোকায় আপ ট্রেন ছাড়তে দেরি হবে’, ‘শেষ বনগাঁ লোকাল যান্ত্রিক গোলযোগে বিধাননগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে’ এবং ‘অনিবার্য কারণ’ তো আছেই। কোনও কোনও দিন অনিবা়র্য কারণ টের পাওয়া যায়৷ সিগন্যাল সবুজ৷ ট্রেন তবু ছাড়ে না৷ কোনও যাত্রী চালকের কামরায় উঁকি দিয়ে এসে জানান, ‘বাবু এখনও আসেননি৷’ কোনও দিন আবার চালক হাজির তো, গার্ডের দেখা নেই। তাঁরা এলে সাদর অভ্যর্থনার আয়োজন থাকে৷ বাপ-মা-বউ-বাচ্চা-বংশলতিকা সহযোগে বাছাই করা খিস্তির ফোয়ারা ছোটে নিরীহ যাত্রীর মুখে৷

    লাস্ট ট্রেনের কামরা অনেকটা কফি হাউসের মতো৷ নির্দিষ্ট আসনে চার-পাঁচজনের ঠেক৷ ট্রেন ছাড়ার সময় যত এগোয়, তত জমে ওঠে আড্ডা। আমাদের ঠেকটা তুলনায় বড়৷ জনা তিন সাংবাদিক ছাড়াও পার্ক স্ট্রিটের নামি রেস্তরাঁর ম্যানেজার, একটি থানার বড়বাবু, পুরনো মেট্রো সিনেমার নাইট শিফটের লাইটম্যান, রেস্তরাঁর ওয়েটার এবং শিয়ালদা স্টেশনের এক চা-ওয়ালা৷ ফার্স্ট কামরায় আমাদের আড্ডার মনযোগী শ্রোতা বাকিরা। চা কী ভাবে দিন দিন চা-হীন হয়ে নুন-লেবু-ঝালমশলার শরবতে পরিণত হচ্ছে, সে কাহিনি শোনাতেন মাঝবয়সি চা বিক্রেতা ভদ্রলোক। চেহারা, পোশাক-আশাক দেখে বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু নানা কথায় অনুমান করা যেত লাস্ট ট্রেনের ফার্স্ট কামরায় তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি রোজগেরে। ক্ষুদ্র পুঁজির বৃহৎ কারবার।

    পাঁচতারা রেস্তরাঁর ম্যানেজার ব্যানার্জিদা ফোকটে পাওয়া দামি সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে দেদার বিলোতেনও। তাঁর কাছে শুনতাম শহরের বিত্তশালীদের পান-ভোজনের গল্প। মেট্রোর লাইটম্যান শোনাতেন, কোন সিনেমার বাজার কেমন। হিরো-হিরোইনদের কার কেমন কদর।

    টিভির খবরে তখনও ব্রেকিং নিউজ দেওয়ার চল হয়নি। কিন্তু খবর আগাম জানার বাসনা টের পেতাম। আমরা তিন সাংবাদিক বলতে গেলে খবরের ঝুলি সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। কিন্তু ঝুলি উন্মুক্ত করা ছিল এথিক্স বিরোধী। তবু বলতেই হত কিছু না কিছু। ব্রিগেডে কিংবা শহিদ মিনারের সভায় কেমন ভিড় হয়েছিল, নেতারা কে কী বলেছেন, কিংবা ঘটনা-দুর্ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ—এসব বলে সহযাত্রীদের বায়না রক্ষা করতে হত।

    ব্যাস, ওইটুকুই। সাংবাদিক পরিচয়টি সযত্নে আড়াল করাই ছিল বরাবরের চেষ্টা। তা না হলে সাংবাদিকতার ক্ষতি তো আছেই, আশপাশের মানুষ ভুল ধারনা বয়ে বেড়ায়। তাছাড়া, পেশাটাকে কখনও জার্সি করতে চাইনি। পরিচয় আড়ালের পিছনে এক সহকর্মীর মুখে শোনা লাস্ট ট্রেনের একটি ঘটনাও মাখায় গেঁথে গিয়েছিল। সেটা হাওড়া-শেওড়াফুলি লাইনে। আমাদের মতোই কয়েকজন সাংবাদিক সহকর্মী লাস্ট ট্রেনে এক কামরায় ফিরতেন। এক দিন সেই কামরাতে ছিনতাইবাজেরা উঠল। তাদের ফতোয়া মেনে যাত্রীরা সুবোধ বালকের মতো টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি, ঘড়ি, যার যা আছে এগিয়ে দিল। কিন্তু ছিনতাইবাজেরা সাংবাদিকদের জিনিসপত্র স্পর্শ না করে, ‘দাদা ভালো থাকবেন’ বলে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে যায়। তারপর যা হওয়ার তাই। বাকি যাত্রীদের রোষের মুখে সেই সাংবাদিকেরা। গোটা কামরা পুলিশের কাছে গিয়ে নালিশ ঠোকে, এই সাংবাদিকদের সঙ্গে ছিনতাইবাজদের নিশ্চয়ই সম্পর্ক আছে।

    এই সব ছিনতাইবাজ, গুণ্ডা মস্তানদের শায়েস্তা করা যার কাজ, আমাদের সেই সহযাত্রী বড়বাবু লাস্ট ট্রেনের আড়ায় খুব একটা রা কাড়তেন না। বড়বাবু সুলভ গাম্ভীর্য বজায় রেখে এর-ওর কথায় মাঝেমধ্যে মাথা নাড়তেন। রাতে তাঁর থানার কোয়ার্টারে থাকার কথা৷ আমাদের সহযাত্রী বড়বাবু সে সবের তোয়াক্কা করতেন না৷ কেউ একদিন জানতে চাইলেন, ‘রাতে বড় গোলমাল হলে কী করবেন? ট্রেনে থাকলে খবর পাবেন কী ভাবে? বাড়ি থেকেই বা রাতে কী ভাবে থানায় যাবেন?’

    তখন মোবাইল আসেনি। ল্যান্ড লাইন বেশির ভাগ সময় ‘ডেড’৷ বছর কয়েকের জন্য পেজার নামে একটা যন্ত্র এসেছিল৷ তাতে শুধু মেসেজ আসত৷ সার্ভিস প্রোভাইডারকে ফোন করে পেজারের নম্বর জানিয়ে বলতে হত, কী বার্তা পাঠাতে হবে৷ টেলিগ্রামের মতো ছোট, অসম্পূর্ণ বার্তা৷ সহযাত্রী বড়বাবুর কাছে পেজারও থাকত না৷ তা হলে পথে খবর পান কী ভাবে? একদিন কথায় কথায় বললেন, ‘খবর থাকলে ঠিক এসে যায়৷ পুলিশের নেটওয়ার্ক বলে একটা কথা আছে জানেন তো?’ নেটওয়ার্কের বিষয়টা আমাদের সাংবাদিকদের জানা ছিল। নেটওয়ার্কেই খবর আসে, কোন খুনটা কে করেছে, কোন ডাকাতিতে কোন গ্যাং জড়িত।

    সেদিন চাক্ষুষ করলাম বড়বাবুর বন্দোবস্ত৷ বেলঘরিয়া বা আগরপাড়া, কোনও এক স্টেশনে ট্রেন থামতে জানালার কাছে এসে বছর কুড়ি-বাইশের তরুণ গলা নামিয়ে বলল, ‘স্যার মেজোবাবু খবর পাঠিয়েছেন৷ নেমে পড়ুন৷ গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছি৷’ বড়বাবু ততধিক চাপা স্বরে বললেন, ‘মেজোবাবুকে বল, খানিক পরে আমাকে বাড়িতে ফোন করতে৷’ ট্রেন ছেড়ে দিল৷ কৌতূহল চেপে আমরা যে যার স্টেশনে নেমে গেলাম৷

    এমনই এক রাতে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে রাতের শেষ লোকাল দাঁড়িয়ে৷ অত রাতে এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম লাগোয়া স্টেশন মাস্টারের ঘরের সামনে জটলা। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বলে ছুটছিলাম। ট্রেন ছাড়েনি দেখে দৌড় থামিয়ে হাঁটা দিয়েছি, দেখি সেই ভিড়ে এক তরুণকে আটকে রেখেছে একদল যাত্রী৷ নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়ছে৷ শুনলাম, পকেটমার৷ বমাল ধরা পড়েছে৷ মারমুখী যাত্রীদের চেহারা-পোশাক দেখে মালুম হল, জীবনে একটা আরশোলাও মেরেছে কি না সন্দেহ৷ কিন্তু পকেটমারকে ধোলাইয়ে যেন বীরত্বের পরীক্ষায় নেমেছে। এমন লোকজন আগেও দেখেছি। ট্রেনের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে প্ল্যাটফর্ম অভিমুখে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ কোনও জটলায় দাঁড়িয়ে গিয়ে পকেটমার সন্দেহে আটকে রাখা কাউকে দু-চার ঘা দিয়ে গেলেন। গণধোলাই দেওয়ার সময় ট্রেন ফেল করার কথা মাথায় থাকে না।

    এমন আর পাঁচটা ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে, পকেটমার দলেরই লোকজন ধৃতকে পুলিশে দেওয়ার নাম করে দু’-চার ঘা দিয়ে জনতার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। সে রাতে কোথায় বাকি পকেটমারেরা? মারমুখী ভিড়ের উদ্দেশে বললাম, ‘আর মারবেন না, মরে যাবে৷ পুলিশে দিন৷’ কাছেই দু’-তিন জন পুলিশ দাঁড়িয়ে৷ তাদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই৷ উল্টে আমার কথায় ঘৃতাহুতি ঘটল৷ দু’-একজন আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে যা নয় তাই বলল৷ আমাকেই এ মারে কী সেই মারে অবস্থা৷ পুলিশের কাছে ছুটলাম৷ বললাম, ‘ছেলেটা মরে যাবে৷ আপনারা একটু দেখুন৷’ এক পুলিশ কর্মী বললেন, ‘আপনি কে, ওর দোস্ত?’ বললাম, ‘আমি প্যাসেঞ্জার৷ লোকটাকে আমি চিনি না৷ মারধর করছে, মরে যাবে, তাই বলছিলাম……।’ জবাব এল, ‘আপনার ট্রেন ছেড়ে যাবে, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন৷’ পুলিশ কথা শুনবে না বুঝে সটান ঢুকে পড়লাম স্টেশন মাস্টারের ঘরে৷ সেখানে ঘন ঘন ফোন বেজে উঠছে৷ আগন্তুকের কথা শোনার সময় নেই কারও৷ কিছুক্ষণ পর রিসিভার নামিয়ে রেখে স্টেশন মাস্টার জানতে চাইলেন, ‘কে আপনি? কী চান৷’ ঘরের বাইরে কী হচ্ছে, সব বললাম৷ অনুরোধ করলাম, ‘আপনারা একবার পুলিশকে বলুন৷’ স্টেশন মাস্টারেরও এক প্রশ্ন, ‘আপনি কে? মারছে, মারতে দিন। মরতে দিন৷ আপনার এত দরদ কেন?’ উল্টো দিকের টেবিলে বসা আর একজন বলল, ‘স্যার, হেরোইন পল্টু৷ সে দিন যে ব্লাড দিল৷ ওই ছোকরা৷’ বললাম, ‘চেনেন যখন দেখুন না চেষ্টা করে৷ এর পর হয়তো মরেই যাবে৷’ জবাব এল, ‘মরবে না, নিশ্চিন্তে বাড়ি যান৷ ও যমেরও অরুচি৷’

    বাইরে বেরিয়ে দেখি ভিড় খানিক পাতলা হয়েছে৷ ছেলেটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে৷ লাথি-ঘুষির তখনও বিরাম নেই৷ জনা দশেক মানুষ যেন পণ করেছে, ছেলেটাকে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে তবে বাড়ি ফিরবে৷ আগেই ঘোষণা হয়েছে, রানাঘাট লোকাল ছাড়তে দেরি হবে৷ মারমুখী যাত্রীরা নিশ্চিন্ত, ট্রেন মিস হওয়ার ব্যাপার নেই৷ প্ল্যাটফর্মের ভিতর, তা-ও আবার স্টেশন মাস্টারের ঘরের সামনে পুলিশের উপস্থিতিতে এমন ঘটনার সাক্ষী হইনি আগে৷

  • প্ল্যাটফর্মের বাইরে টিকিট কাউন্টারের সামনে ঘুমিয়ে থাকা কয়েক জনকে ডেকে তুললাম৷ কেন জানি মনে হল, এরা হেরোইন পল্টুকে চিনতে পারে৷ সব শুনে একজন বললেন, ‘মারনে দো, খতম হোনে দো, শালা লিডার বননা চাহতে হ্যাঁয়৷’ কাজ হবে না বুঝে জটলার দিকে এগোলাম৷ কাছাকাছি আসতে কানে এল হেরোইন পল্টুর আর্তনাদ, ‘দাদা একবার স্যারকে খবর দিন৷ ফাস্ট কামরায় আছে৷’ কণ্ঠস্বরটা মুহূর্তে কানে বাজল৷ ভিড় ঠেলে মুখ বাড়িয়ে দেখি, আমার সহযাত্রী বড়বাবুর পরিচিত সেই ছেলেটি৷ কালক্ষেপ না করে কামরায় ছুটলাম৷ ফাস্ট কামরায় উঠে দেখি, বড়বাবু খোশগল্পে ব্যস্ত৷ সব বললাম৷ শুনে বললেন, ‘শান্ত হয়ে বসুন৷ আপনি হাঁপাচ্ছেন৷ ও ঠিক ম্যানেজ করে নেবে৷ যারা মারছে তাদেরও তো বাড়ি ফিরতে হবে৷’

    ট্রেন ছেড়ে দিল৷ কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ছেলেটা কি সত্যিই পকেটমার৷ বড়বাবুর জবাব, ‘ওসব করেই খায়৷’ বললাম আপনার সোর্স? জবাব এল, ‘ওই আর কি৷ ওদের ভরসাতেই রাতে বাড়ির বিছানায় গিয়ে ঘুমোই৷’ পরে একদিন একান্তে পুরোটা খোলসা করেছিলেন৷ বললেন, ‘সব স্টেশনেই এমন দু’-চার জন আছে৷ রাতে বড় কোনও গোলমাল হলে থানা থেকে ওদের নেটওয়ার্কের কাছেই আগে খবর যায়৷ আমার যাওয়ার দরকার বুঝলে বাড়ি পর্যন্ত খবর পৌঁছে দেয়৷ এতটাই বিস্বস্ত, নিজেরা গোলমাল করে ফেললেও জানায়৷’ চমকে দেওয়ার মতো আরও এক স্বীকারোক্তি, ‘রিপোর্টার সাহেব, খবর রাখেন কি ক’জন পুলিশ দিয়ে শহরটা চলে৷ বড় গোলমাল লাগলে ওরাই অনেকটা সামাল দেয়৷ ওরাই তখন সাদা পোশাকের পুলিশ৷’

    বড়বাবুর অনুমানই ঠিক৷ মারমুখী যাত্রীরা সব লাস্ট ট্রেনে ফিরে যান৷ হেরোইন পল্টু বাকি রাত প্ল্যাটফর্মে পড়ে ছিল৷ সকালে কারা যেন এনআরএসে ভর্তি করে দিয়েছে৷ গেলাম এনআরএস৷ আমার মাথায় ঘুরছে, স্টেশন মাস্টারের ঘরের সেই রেলকর্মীর কথাটা, ‘সেদিন যে ব্লাড দিল ওই ছোকরা’৷ এমার্জেন্সিতে খোঁজ করতে দেখি, ড্রেসিং রুমের এক কোনায় বসে৷ চোখ মুখে যন্ত্রণার ছাপ৷ কথা বলার অবস্থায় নেই৷ হাসপাতালের কাগজে লেখা, অ্যাডভাইস আর্জেন্ট অ্যাডমিশন৷ সঙ্গে রবার স্ট্যাম্পের ছাপ, ‘নো বেড ভ্যাকেন্ট৷’ হাসপাতালের সুপারকে চেম্বারে পেলাম না৷ তাঁর পিএ, পরিচিত মানুষ৷ কবিতা-গল্প লেখেন৷ বললাম, একটা বেড ম্যানেজ করা যায়? প্রশ্ন শুনে কৌতুক করে বললেন, ‘কোথায় পাব তারে৷’ সেদিন ফিরে গেলাম৷ দু’-চার দিন পরে ফের গেলাম৷ শুনলাম, এমার্জেন্সিতেই মরে পড়ে ছিল দিন দুয়েক৷ দুর্গন্ধ নাকে আসার আগে কারও টনক নড়েনি৷ বডি মর্গে চালান করে দিয়েছে পুলিশ৷

    মৃত্যুসংবাদ মানুষকে ভারাক্রান্ত করার পাশাপাশি অতীতের দিকে টেনে নিয়ে যায়। চেহারাটা একটু একটু করে মনে পড়তে লাগল৷ শিয়ালদা স্টেশনে সে দিন ঘরমুখী জনতাকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাল পুলিশ৷ দুপুর থেকে গোলমাল৷ বিনা টিকিকের এক যাত্রীকে আটক করেছে চেকাররা৷ তিনি মধ্য কলকাতার এক কলেজের শিক্ষক৷ বিনা টিকিটের যাত্রীই তখন বেশি। কারও অভাব, কারও স্বভাব। বিনা টিকিটে যাত্রা এবং সুযোগ পেলে চেকারকে দু’ঘা দেওয়া তখন চালু ঘটনা। চেকার ধোলাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের বয়সোচিত বিপ্লবিয়ানা৷

    সেই পরিস্থিতিরই সুযোগ নিলেন মাস্টারমশাই। চিৎকার করে ছাত্র খেপালেন। তাঁকে ছাড়াতে দলে দলে ছাত্ররা স্টেশনে হামলে পড়ল৷ শিক্ষককে ছিনিয়ে নিতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায় তাদের৷ ইট-পাটকেল পড়তে লাগল৷ একে একে যোগ দিল মধ্য কলকাতার সব কলেজ। সেগুলি তখনও ছাত্র পরিষদের দখলে।

    গোলমাল ভাঙচুরে গড়াল৷ অফিস খালি করে গা ঢাকা দিলেন রেলকর্মীরা৷ হাতে গোনা ক’জন মাত্র রেল পুলিশ৷ সন্ধ্যার মুখে পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে গেল৷ উড়ালপুলের উপর ঠায় দাঁড়িয়ে ভ্যান বোঝাই কলকাতা পুলিশ৷ তারা নীরব দর্শক৷ গোলমাল হচ্ছে রেল পুলিশের এলাকায়৷ তাদের কাছে রেল স্টেশনের গোলমাল থামানোর নির্দেশ নেই৷ বিচিত্র নিয়ম৷ এক শহর, দুই পুলিশ৷

    স্টেশনের পিছন দিকে ডিআরএম বিল্ডিং৷ খবর পেলাম রেলের পদস্থ কর্তারা সব সেখানে জড়ো হয়েছেন৷ একজন পদস্থ অফিসারের সঙ্গে আলাপ ছিল৷ অফিসেও পুজোআচ্চা নিয়ে থাকতেন৷ টেবিলেই নানা দেবতার ছোট মূর্তি সাজিয়ে পুজো করতেন৷ ঘরে ঢুকলেই নাকে আসত ধূপকাঠির গন্ধ৷ বেশ গর্ব ভরে বলতেন, ‘দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে এই ধূপকাঠিতেই মায়ের পুজো হয়৷’ ড্রয়ার খুলে সন্দেশ, লাড্ডু এগিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘নিন, মায়ের প্রসাদ৷’ সেদিন তাঁর ঘরে ঢুকে দেখি, রেল পুলিশের এক কর্তা দোহারা চেহারার এক তরুণকে বোঝাচ্ছেন, ‘কিছু একটা কর৷ এর পর তো গুলি চালাতে হবে৷’ আমাকে দেখে অফিসারদের ইশারায় ছেলেটি সেখান থেকে চলে গেল৷ গোলমাল কিন্তু থামল না৷ বিকেল-সন্ধে নাগাদ আরও বেড়ে গেল৷ কলাপ্সিবল গেট টেনে দেওয়া হয়েছে স্টেশনের৷ প্ল্যাটফর্মের ভিতরে ও বাইরে হাজার যাত্রীর ভিড়৷ বাইরের ভিড় থেকে উড়ে আসছে ইট-পাথর৷ বহু যাত্রী, পুলিশ আহত৷ তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই৷ গোটা চত্বর রণক্ষেত্র৷ সন্ধ্যা নাগাদ চলল গুলি৷

    বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ৷ বিআর সিং আর এনআরএসে নিয়ে যাওয়া হল তাদের৷ এনআরএসে তখন যন্ত্রণাকাতর যাত্রীদের আর্তনাদ, পরিজনের কান্না৷ রেডিও, টিভিতে খবর পেয়ে বাড়ি না ফেরা যাত্রীর পরিজনের ভিড় থিক থিক করেছে৷ আহতদের রক্ত দরকার৷ হাসপাতালে রক্ত নেই৷ অদূরে মানিকতলার সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বেশ কয়েক জনকে৷ দেওয়ালে দেওয়ালে তখনও সিপিএমের ছাত্র-যুবদের লেখা সবটা মুছে যায়নি, ‘রক্ত দিয়ে গড়ব মোরা সাধের বক্রেশ্বর৷’ বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র রাজ্য সরকারের উদ্যোগে গড়ার অঙ্গীকার৷ কাগজে খবর হয়েছিল, বক্রেশ্বরের জন্য দেওয়া বিপুল রক্ত মজুতের ব্যবস্থা না থাকায় নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়েছে৷ অথচ হাসপাতাল সেদিন রক্তশূন্য৷

    এনআরএসের এমার্জেন্সির ভিড়ে হঠাৎ সেই তরুণের সঙ্গে দেখা, বিকালে যাকে রেলকর্তার ঘরে দেখেছি৷ তার সঙ্গে নানা বয়সের আরও জনা দশ-পনেরো লোক৷ ছেলেটি গলা চড়িয়ে হাঁক পাড়ছে, ‘ডাক্তারবাবু কার রক্ত দরকার? কার দরকার, কার দরকার? আমরা রক্ত দেব৷’

    বডি মর্গে চালান হয়ে যাওয়ার পর কেউ তা এসে দাবি করেনি৷ বেওয়ারিশ লাশ কিছু দিন পর পুড়িয়ে দেয় পুলিশ৷ হেরোইন পল্টুর বডিরও সেই পরিণতি হয়েছিল ধরে নেওয়া যায়৷ যদিও অনেকেই চিনত, জানত কোথায় থাকে৷ বাড়িতে কেউ খবর দেয়নি৷ হাসপাতালেই নানা জনের মুখে শোনা গেল টুকরো স্মৃতি৷ সেটা প্রায় স্মরণসভার চেহারা নিল৷ থাকত ট্যাংরার বস্তিতে৷ প্রায়ই দেখা মিলত কোনও না কোনও ব্লাড ব্যাঙ্কের বাইরে৷ জলের দরে নিজের রক্ত বিক্রি করে টাকা নিয়ে ছুটত হেরোইনের ঠেকে৷ পরিচিত মহলে, পুলিশের খাতায় সেই থেকে হেরোইন পল্টু নামটাই পরিচিতি পেয়ে যায়৷

    সেই কলকাতা এবং আরও অনেক মেট্রোপলিটন শহরে হেরোইনের নেশা এবং তা ঘিরে কারবার পুলিশ-প্রশাসন তো বটেই, বহু বাবা-মায়ের রাতের ঘুম ছুটে গিয়েছে। তার সঙ্গে জুড়েছে এইডসের থাবা। এইচআইভি সংক্রমণের অন্যতম সূত্র রক্তের আদানপ্রদান। প্রায়ই কাগজে খবর ছাপা হয়, অমুক শিবিরে রক্ত দেওয়ার পর সূঁচ থেকে এইচআইভি সংক্রমণের শিকার কেউ। তার প্রভাব পড়ে রক্তদান শিবিরে। এইডসের ভয়ে রক্তদানে অনীহা এমনকী রক্তদান আন্দোলনকারীরও। রক্ত নিতে গিয়েও একই সমস্যা। কী সরকারি, কী বেসরকারি, কোথাও নিশ্চয়তা নেই। প্রাণে মরার আগে সামাজিক ও পারিবারিক বয়কটের মুখে বিপন্ন তখন বহু মানুষ। হাসপাতাল ভর্তি নেয় না। নিলেও ত্রি-সীমানা মারায় না ডাক্তার-নার্স। হাসপাতালের বেডে বিনা চিকিৎসায় মরে পড়ে থাকে মানুষ। লাশ নিতে অস্বীকার করে পরিবার।

    সেই কলকাতায় হেরোইন ছাড়াও ছেলেটার নেশা ছিল আরও একটা৷ কারও রক্ত দরকার শুনলে এগিয়ে যেত৷ বিক্রি নয়, দান৷ হেরোইনের নেশাও কখনওসখনও ছাপিয়ে যেত সেই নেশা৷ ক্রমে রক্তদান শিবিরে লোক জড়ো করার নেশা পেয়ে বসেছিল৷ রাজাবাজার, মানিকতলার খাল পাড়ে রক্তদাতার দল গড় উঠেছিল হেরোইন পল্টুর৷ রক্তদাতা সাপ্লাই করতে শহরের বিশিষ্ট নেতা-মন্ত্রীর রক্তদান শিবিরে ডাক পড়ত ওই তরুণের৷ নাম ফাটত নেতার৷ আর পাঁচজনের মতো টিফিনের ডিম-কলা-পাউরুটি খেয়ে ফিরে যেত হেরোইন পল্টুর দলবল৷ তখনও শিবিরে রক্তদানের বিনিময়ে মিক্সি, ইলেকট্রিক ইস্ত্রি ইত্যাদি দেওয়ার চল হয়নি। উদার অর্থনীতি পরবর্তী ভারতে রক্তদান শিবিরও আসলে কেনাকাটার আনন্দ নিকেতন। দান ছাপিয়ে প্রতিদানের প্রতিযোগিতা। হেরোইন পল্টুর জন্য তাই আক্ষেপ হয়, রক্তদাতা না হয়ে শুধু বিক্রেতা হলে ছেলেটাকে হয়তো পকেটমারির দায়ে গণপিটুনিতে মরতে হত না।

    তার রক্তে অনেকেই হয়তো বেঁচেবর্তে রয়েছেন। তাঁরা জানেনও না সেই রক্তের সম্পর্ক।
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৮৪ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন