• বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ  শনিবারবেলা

  • এত টাকা দিয়ে আমি কী করব!

    অমল সরকার
    আলোচনা | সমাজ | ১৭ জুলাই ২০২১ | ৯১১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • সম্পর্ক-সূত্র বীজ বপনে শুরু। তার পর দশ মাস দশ দিন। রক্তের সেই সম্পর্ক ভালবাসা যায়, অবহেলা করা যায়। ছেঁড়া যায় না। পাল্টানোও যায় না। তার পর জীবনভর কত না সম্পর্কের জন্ম। এবং মৃত্যুও। কিছু সম্পর্ক শাসনের, অনুশাসনের, বাঁধনের। কিছু সম্পর্ক ভেসে যাওয়ার। চলতি হাওয়ার পন্থী। কিছু সম্পর্ক আঁকড়ে রাখি। কিছু আপনিই বয়ে যেতে দিই। নাম দিতে পারি না এমন অনেক সম্পর্ক থেকে যায় মনের মণিকোঠায়। সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছে নেট মাধ্যমও। শুধু কি মানুষ, সম্পর্ক তো চার পাশের কত কিছুর সঙ্গে। পুঁথি বা পর্দার চরিত্র, পুকুর ঘাট বা চিলেকোঠার সিঁড়ি। পাতার ভাঁজে রেখে দেওয়া প্রথম পাওয়া গোলাপ। রাতে গলির মোড়ে আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকা নেড়ি। সম্পর্কের সাগরে ভাসছি, ডুবছি। সম্পর্কের নুড়ি কুড়িয়ে চলেছি। ছুঁড়ে ফেলছি। - চলছে, ধারাবাহিক, সম্পর্ক ।

    তখন স্কুলে পড়ি৷ ক্লাস নাইন কি টেন হবে৷ দিন শুরু হয় ভোর দেখে। ভোর-ভোর উঠে সাজি হাতে বেরিয়ে পড়ি। স্কুলের মুখে বন্ধুরা একে একে জড়ো হই। তার পর শুরু হয় প্রতিযোগিতা। ফুল তোলার প্রতিযোগিতা। মানে এর-ওর বাগানের ফুল ছিঁড়ে সাজি বোঝাই করা। সাজি ভরে উঠলে আবার স্কুলের গেটে ফিরে আসি। গোনা হয়, কার সাজিতে কোন ফুল ক’টা। মানে ক’টা জবা, ক’টা গন্ধরাজ, ক’টা গোলাপ কিংবা গাঁদা। প্রতি দিন এক জন বিজয়ের হাসি মুখে বাড়ি ফিরি। 


    ফুল তখন ফুটত। এখন চাষ হয়। তখন ফুল তুলতে হত। এখন কিনতে হয়। বাজারের ফর্দে সেই কবেই ঢুকে পড়েছে ফুল-বেলপাতা। কত মানুষকে যে তা ভাত জোগায়। সাত-সকালে হাঁক দিয়ে যান ফুল বিক্রেতা। 


    দেশীয় খেলা কথাটা ইদানীং শুনি কম। যখন খেলতাম সেই সব খেলা, তখনও দেশীয় ক্রীড়ার তালিকায় আমাদের খেলাটি ছিল না। ফুল তোলার খেলা! খেলা নয়তো কী? যে যে মানদণ্ডে কোনও কিছু খেলা বলে বিবেচিত হয়, তার সব ক’টি উপাদানই ছিল ছেলেবেলার সেই খেলায়। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ভলি, কাবাডিতে যেমন থাকে খেলার তীব্র নেশা, দস্যিপনা এবং সাহস। কাকভোরে উঠে ফুল তোলা আমাদের স্কুল-বেলার নেশা। গাছে ওঠা, পাঁচিল টপকানো, তাতে হাত-পা ভাঙা, কিছুই অসম্ভব ছিল না। ধরা পড়ে গেলে চড়-থাপ্প‌ড়, কিল-ঘুসি, চোর অপবাদ, গোটা পাড়ায় তা রাষ্ট্র হওয়া, এত সব ঝক্কি সত্ত্বেও কেউ আমাদের দমাতে পারেনি।



    সেই সব দিনে বয়সোচিত বীরত্ব ফলানোর আর কোনও উপায় সহজলভ্য ছিল না আমাদের জন্য। দিগন্ত বিস্তৃত খেলার মাঠ ছিল। খেলার বাসনা ছিল। খেলা মানে ফুটবল। মাসের পর মাস, একটা বলেই লাথালাথি। সেই বল যখন আর লাথি সইতে পারত না, বন্ধ থাকত খেলা। আর একটা নতুন বলের অপেক্ষা কখনও মাস ছাপিয়ে যেত। এমন দুর্ভাগাদের কথা ভেবেই বোধহয় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘একটা বল লইয়া বাইশ জনে কাড়াকাড়ি, মারামারি করে ক্যান, বাইশটা বল দিলেই তো পারে।’



    কলোনির জীবনযাত্রায় ক্রিকেট তখনও বড়লোকের খেলা। সে খেলার উপস্থিতি কদাচিৎ টের পাওয়া যায় রেডিওর ধারাবিবরণী আর খবরের কাগজের পাতায়। অজয় বসুর ধারাবিবরণীতে জীবন্ত হয়ে উঠত ক্রিকেটের নন্দনকানন। ক্রিকেট নয়, নয় কোনও ক্রিকেটার কিংবা ইডেন, এ খেলায় প্রথম ভালোবাসা অজয় বসুর ধারাবিবরণী। আর আমাদের প্রিয় খেলা তখন ফুলচুরি। ভোরের আলো ফোটার আগে এ-বাড়ি, ও-বাড়ির ফুল সাফ করে দেওয়া। আর খেলা ঘিরে প্রতিযোগিতা। 



    সে খেলাতেও প্রায় রোজ হারতে হারতে এক দিন নিয়ম ভেঙে নিজের বাড়ির ফুল চুরি করে প্রথম স্থান হাসিল করলাম৷ প্রথম হলাম সেই প্রথম বার। সেই একবারই। ফুল তোলার প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কোনও কিছুতেই এমন কৃতিত্ব আমার নেই। তাও বাবুদা সে দিন না থাকলে সে কৃতিত্বটুকুও হাতছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। নিজের বাড়ির চুরির ফুল প্রতিযোগিতায় গ্রাহ্য হবে কি না, বিচারের ভার পড়েছিল বাবুদার উপর। আমাদের সেই ফুল চুরি প্রতিযোগিতার সর্বজনমান্য রেফারি৷ ডাকনামেই চিনত গোটা পাড়া। 



    কাকভোরে উঠে বাবুদা পাড়ার এ-মাথা থেকে সে-মাথা ছুটে বেড়াতেন৷ হন হন করে হাঁটতেন। যেন ছুটছেন। অমূল্য কিছু হারিয়ে গেলে মানুষ যেমন উদ্‌ভ্রান্তের মতো ছোটে, বাবুদাকে দেখে ঠিক তেমন মনে হত। আমরা প্রায়ই জানতে চাইতাম, ‘বাবুদা, এত সকালে কোথায় চললে?’ ছুটছ কেন? উত্তর আসত, ‘এই একটু ভোর দেখতে বেরিয়েছি৷’



    বাবুদার মুখ থেকে কথাটা শোনার নেশা লেগে গিয়েছিল আমাদের৷ আবদার করতাম, ‘আর এক বার বলো, আর এক বার বলো৷’ বাবুদা বলতেন, ‘তোরাও দ্যাখ। ভোর দ্যাখ, ভোর৷’ এক দিন, প্রতি দিন, ফুল নিয়ে আমাদের বিবাদে বাবুদাই ছিলেন শেষ কথা৷ এমনই এক দিন, বাবুদা হঠাত্‍ আমার কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘ভাই দু’টো টাকা হবে!’ 



    দু’টাকা! সে তো তখন অনেক টাকা৷ কোথায় পাব? স্কুল গেটে হজমিওয়ালার থেকে পাঁচ নয়ার হজমি, কিংবা কারেন্ট-নুন কিনে গোটা দিন চালাই৷ ‘সাশ্রয়’ শব্দটির সঙ্গে আমাদের তখন পরিচয় হয়নি৷ পরে বুঝেছি, সেই হজমি আর কারেন্ট-নুনেই সাশ্রয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল আমাদের৷ কে কত ক্ষণ জমিয়ে রেখে খেতে পারে, আমাদের প্রতিযোগিতা চলত তা নিয়েও৷ সেই নুনে কী মেশানো থাকত কে জানে৷ জিভে দিলে জ্বালা জ্বালা করত৷ সেটাই ছিল মজা৷ নেশাও বটে। 



    সে দিন বাবুদা দু’টাকা চেয়ে মহা ফ্যাসাদে ফেলে দিয়েছিলেন আমাকে৷ জানতাম, দু’টাকা নিয়ে বাবুদা গোশালার মাঠে ছুটবেন৷ শুনতাম, মদ খাওয়া মহাপাপ৷ বাবুদার আবার সেটাই ছিল প্রিয় ‘খাদ্য’৷ গোশালার গলিতে মদ মানে চুল্লু৷ জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় সে মাঠে মেলা বসে ক’দিনের জন্য। বাকি দিনগুলি পরিত্যক্ত জমি। আনাচে-কানাচে চলে চুল্লুর ঠেক৷ 



    বাবুদাকে মদ খাওয়ার পয়সা জোগালে আমিও পাপের ভাগীদার হব, এমন ভাবনায় মন চঞ্চল৷ কিন্তু মানুষটার কথা ফেলাও ভীষণ, ভীষণ কঠিন৷ নানা জনের মুখে শুনি, বাবুদা বড় বাড়ির ছেলে৷ ভাগ্যের দুর্বিপাকে এমন দশা। নিজেকে ভুলে থাকতেই নাকি নেশায় ডুবে থাকেন। বাবুদা এবং আরও অনেকের সেই দুর্বার নেশাই ভাত জোগায় মহল্লার অনেকগুলি পরিবারকে। খানিক দূরেই লেনিনগড়। চুল্লি তৈরির সবচেয়ে বড় আয়োজন সেখানে। বলতে গেলে ঘর-ঘর কী কহানি। কুঁড়েঘর থেকে পাকাবাড়ি, সারা বছর লালঝান্ডায় মোড়া গোটা তল্লাট। পাকাবাড়ি হাতে গোনা ক’টি মাত্র। তার একটিই মাত্র দোতলা। সেটি পার্টি অফিস। চুল্লুর কারবারি ছাড়া সে তল্লাটে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ। এলাকাটি অর্থমন্ত্রী তথা আবগারী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার অংশ। পুলিশ-প্রশাসন তাই বাড়তি সতর্ক। 



    সেখান থেকে কোন পথে, কী ভাবে চুল্লু পৌঁছে যায় এ-পাড়া, সে-পাড়া, জানে গোটা পাড়া। তা নিয়ে আলোচনা নাস্তি। পার্টি-পুলিশ-মস্তান প্রকাশ্য বোঝাপড়া দেখে কদাচিৎ কেউ বিবেক দংশনের জেরে আলোচনা পেরে ফেললে, বিরক্ত কমরেড নেশাগ্রস্থের মতো কেন্দ্রের আর্থিক নীতি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি টেনে আনেন। এমনও বলতে শুনি, ওটা গরিব মানুষের হেলথ ড্রিঙ্ক। 



    লাল টুকটুকে, সুঠাম চেহারা বাবুদার। বড়রা বলতেন, ‘সাহেবের বাচ্চা’৷ এক বিকেলে পাড়ায় খবর এল, পানিহাটি ফুটবল মাঠে বাবুদার শট জাল ফুটো করে বেরিয়ে গেছে৷ স্কুল টিমেও বাবুদার ফুটবল ভেল্কির সাক্ষী অনেকে৷ 



    সে দিন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাত্‍ বলে ফেললাম, ‘স্কুলে যাওয়ার সময় এসো’৷ ‘ভাই, দিস কিন্তু’, এই বলে বাবুদা গোশালার দিকে হাঁটা দিলেন৷ পাড়ায় বড়দের অনেকেই তখন দিনে-দুপুরে মদ খেয়ে বাড়িতে অশান্তি করে৷ অশান্তি মানে বউ-বাচ্চাকে মারধর, ভাঙচুর। তেঁতুল গোলা জল খাইয়ে বমি করিয়ে নেশা ছাড়ানো হয় তাদের৷ তারা কাজ করে না। করলেও সংসারে একটা পয়সা দেয় না। তাদেরই রোজ আনি রোজ খাই ব্যবস্থাপনায় চুল্লুর রমরমা ব্যবসা। কর্মসংস্থানে বাজিমাত। 



    সেই সকালে, বাবুদা যে দিন দু’টাকা চেয়ে আমাকে বিড়ম্বনায় ফেলে দিয়েছিলেন, আমার হাতে সে দিন অনেক টাকা৷ কিন্তু আমার নয়, স্কুলে এনসিসি-র অনুষ্ঠানের জন্য সহপাঠীদের চাঁদার টাকা৷ রবিবার সকালে এনসিসি স্যারের হাতে তুলে দেওয়ার কথা৷ সাত-পাঁচ না ভেবে, একটু যেন দয়াপরবশ হয়ে স্কুলে ঢোকার মুখে, চার ধারে কেউ কিছু বুঝতে না-পারে, এমন ভাবে বাবুদার হাতে পাঁচ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে হাঁটা দিলাম৷ 



    ওই বয়সে তরুণ বাবুদার প্রতি আমাদের একটা মায়া জন্মেছিল। বাবুদা মদ খেত। আমরা তত দিনে বুঝতে শিখেছি, মদ বাবুদাকে খেয়ে নিচ্ছে। মানুষটা আর বেশি দিন নেই। পা টলে, মুখ ক্রমশ ফুলছে। গায়ে চুল্লুর গন্ধ। সেই বাবুদা টাকাটা হাতে নিয়ে সে দিন চিত্‍কার করতে লাগলেন, ‘ভাই শোন, শোন, দাঁড়া, দাঁড়া, এত টাকা দিয়ে আমি কী করব?’ 



    সবাই জেনে গেল, বাবুদাকে আমি টাকা দিয়েছি৷ সবাই জানে, বাবুদা ওই টাকা দিয়ে কী করবেন৷ মুহূর্তে আমার দিকে তাই সন্দেহের চোখ৷ আমি পাঁচ টাকা কোথায় পেলাম, উঠে এল সেই প্রশ্নও৷ কোনও রকমে বাবুদাকে সামলে এক ছুটে স্কুলে ঢুকে পড়ি৷



    বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরে স্কুল৷ টিফিনে বাড়ি এসে ভাত খেয়ে স্কুলে ফিরতাম৷ দেখি বাবুদাকে ঘিরে সহপাঠীরা দাঁড়িয়ে৷ কাছে যেতেই আমার হাতে তিনটি টাকা গুঁজে দিয়ে বাবুদা বললেন, ‘আমি তো দু’টাকা চেয়েছিলাম, পাঁচ টাকা দিলি কেন? পাগল ছেলে।’ এইটুকু বলে বাবুদা উধাও হয়ে গেলেন৷



    এক দিন মাসিমা এসে বললেন, ‘বাবা কিছু মনে কইরো না, আজ একটু বেশি দিও৷ বারোটা টাকা হইলেই চলব।’ মাসিমা প্রায়ই আসেন৷ এটা-সেটা নিয়ে যান৷ কখনও আমি, কখন ভাই, বাড়ির অন্যেরা, যতটা পারেন দেন৷ মাসিমার কাছে বারো টাকা মানে অনেক টাকা। আমাদের কাছে তা কিছুই না। বড়জোর নামী ব্র্যান্ডের একটা সিগারেটের দাম। পাড়ার আরও অনেকের কাছেই ওই টাকাটা কিছুই না। সে দিন, খুচরো নেই। একটা কুড়ি টাকার নোট এগিয়ে দিতে মাসিমা যেন আঁতকে উঠলেন। সঙ্কোচে বিদ্ধ বৃদ্ধা একপ্রকার হাতজোড় করে বললেন, ‘বাবা, ভুল বুইঝো না, আমারে বারোটা টাকাই দাও৷ বোঝো তো আমার কি আর শোধ দেওয়ার সাধ্যি আসে৷ ইস্‌সা আসে, উপায় নাই।’ 



    বললাম, ‘বারো টাকা নেই, এটাই রাখুন৷’ মাসিমা নাছোড়৷ বললেন, ‘দেখ না বাবা, আমার বারোটা টাকা হইলেই চলব৷’ আমি জোর করতে কুড়ি টাকার নোটটা নিয়ে ধীর পায়ে চলে গেলেন৷ খানিক পর ফিরে এসে আটটা টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এইটা রাখো বাবা, লাগলে আর এক দিন নিমু৷’ বারো টাকায় এক কেজি চাল কিনে বাড়ি ফিরে গেলেন বৃদ্ধা৷ বললাম, ‘একটু ডাল, তেল কিনে নিলে পারতেন’৷ বললেন, ‘আসে, আসে, ফুরাইয়্যা গেলে আসুম৷ তোমরা তো আসো৷’ একটু ভাল একটা সিগারেট, আবার দু’চারটে লোকের একবেলা পেট চালিয়ে নেওয়ার মতো এক কেজি চালও মিলত তখন বারো টাকায়। কী বিচিত্র অর্থনীতি, শুধু জটিল নয়, বড় বিস্ময়ও বটে। 



    বাবুদা কেন চুল্লু ধরেছিলেন, তা নিয়ে নানা কাহিনি বড় হয়ে জেনেছি৷ চুল্লু ছাড়া আর একটা নেশা ছিল মানুষটির৷ গল্পের বই, বিশেষ করে ছোটদের গল্প গোগ্রাসে গিলতেন৷ চাঁদমামা, শুকতারা কেনার সাধ্যি ছিল না আমাদের৷ বাবুদার মুখেই প্রথম মহাকাশ, গ্রহ-নক্ষত্রের নানা কাহিনি শুনেছি৷ চিন-জাপান-রাশিয়া-আমেরিকার গল্প বলতেন৷ আমরা তখন অ্যাথলেটিক্সের জাতীয় কোচ কুন্তল রায়ের কোচিং ক্যাম্প অর্থাত্‍ এসিসি-র মাঠে একশো-দু’শো মিটার দৌড়োই৷ অমল দত্ত মাঝেমধ্যে কোনও ক্লাবের মাঠে প্রজেক্টর বসিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল, অলিম্পিক্সের সাদা-কালো ছবি দেখিয়ে খেলাধুলোর সঙ্গে দেশাত্মবোধও জাগিয়ে দিয়ে যেতেন৷ অনেকটা বড় হয়ে, গড়ের মাঠে যাতায়াত, ফুটবলের সঙ্গে ভালবাসা গাঢ় হলে মানুষটাকে চিনতে পেরেছিলাম। ছেলেবেলায় যাঁকে ‘সিনেমাওয়ালা অমল দত্ত’ বলে জানতাম, জীবদ্দশায়, মারা যাওয়ার পরও তাঁর সেই দিকটি নিয়ে তেমন একটা আলোচনা শুনিনি। আমার উপলব্ধি বলে, অমল দত্তের মূল্যায়নে গড়ের মাঠের ফুটবল যুদ্ধ, পিকে-অমল লড়াই বড্ড ছোট গণ্ডি৷ তিনি ছিলেন যথার্থই ক্রীড়া-সাধক৷ আমরা মুখিয়ে থাকতাম, কবে আসবেন ‘খেলাধুলোর সিনেমাওয়ালা’৷ আর ছিলেন বাবুদা৷ সোভিয়েত দেশ পড়ে এসে শোনাতেন, রাশিয়ায় ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা কী ভাবে তৈরি হচ্ছে অলিম্পিকের জন্য৷ খামার, খামারবাড়ি শব্দগুলির সঙ্গে প্রথম আলাপ সোভিয়েত দেশের পাতায়। 



    হাঁক পেড়ে পুরনো বই, কাগজ কিনতে আসা লোকেদের থেকে বই-ম্যাগাজিন কিনতেন বাবুদা। তাঁদের দাঁড় করিয়ে কেজি দরে কেনা চাঁদমামা, শুকতারা, সোভিয়েত দেশ একটু বেশি পয়সা দিয়ে কিনে নিতেন৷ আর ছিল স্কুলের লাইব্রেরি থেকে আমাদের আনা গল্পের বই৷ আমরা তুলতাম, বাবুদা পড়তেন৷ তার পর গল্প বলতেন আমাদের৷ অনেক দিন পুরনো বই-ম্যাগাজিন কেনার চার আনা, আট আনাও জোগাতে হয়েছে আমাদের৷



    পরের দিকে মাঝেমধ্যেই মুখ নিচু করে এসে চাইতেন, ‘দু’টো টাকা দিবি৷’ বুঝতাম, বাবুদার নেশা চেপেছে, চুল্লুর ঠেকে ছুটবেন৷ বুঝতাম, বাধা দিতাম না৷ তত দিনে, টিউশনের রোজগারে পকেট একটু ভারী৷ বাবুদার বাজেট সেই দু’টাকা৷ জানতাম, আমারই মতো আরও কেউ কেউ দেন৷ এ ভাবেই দিন চলে যায়৷ আরও অনেক দিন, বাবুদা দু’টাকা চাইলে পকেট হাতড়ে হয়তো পাঁচ কিংবা দশ টাকার নোট বেরিয়েছে৷ বাবুদা নিতে চাইতেন না৷ বলতেন, ‘দেখ না, দু’টাকা নেই?’ অনেক দিন, খুচরো না থাকায় পাঁচ, কিংবা দশ টাকা নিয়েছেন, পরে ফেরত দিয়েছেন বাকিটা৷ 



    এ ভাবেই চুল্লু বাবুদাকে গিলে ফেলল৷ একটা সময় এল সামনে দাঁড়ানো যেত না৷ গা থেকে চুল্লুর গন্ধ বেরত৷ তামাটে হয়ে গেল গোটা শরীর৷ মুখের চামড়া দেখে মনে হত যেন রক্ত জমাট বেঁধে আছে৷ মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতাম, গায়ে নানা আঘাতের চিহ্ন৷ বুঝতাম, নেশার ঘোরে এখানে-ওখানে পড়ে গিয়েছেন।



    মাসিমার জীবনে দারিদ্র ছিল হাঁপানির মতো৷ কলোনিতে কত পরিবারের কত কী হল, পাকা বাড়ি, আলাদা রান্নাঘর, অ্যাটাচ্‌ড বাথ, রান্নার গ্যাস, আলো, পাখা, টিভি, টেপ-রেকর্ডার, আরও কত কী! মাসিমার জীবনে কোনও বদল এল না৷ এর-ওর কাছে হাত পাততে হত বলে কুঁকড়ে থাকতেন সর্বদা৷ কিছু দিলেও নিতেন না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাইতেন না৷ বেশি কিছু দিলে বলতেন, ‘কী দরকার, আবার আর এক দিন নিমু খন৷ আইজ অ্যাতেই চলব৷’ 



    এক বার পুজোর মুখে প্রায় জোর করেই ভাই মাসিমার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, ‘একটা শাড়ি কিনে নেবেন’৷ দিন কয়েক পর এসে মুখে মুখে হিসাব পেশ করে গেলেন বৃদ্ধা। পুজোর শাড়ির জন্য বরাদ্দ টাকায় একটু বেশি করে কিনেছেন চাল-ডাল-তেল-নুন, এই সব৷ বললেন, ‘এই মাইসটা চইল্যা যাইব৷ তোমরা বাইচ্যা থাকো৷’



    সময়ের সিঁড়ি বেয়ে আমাদের বন্ধুদের গল্পের আসর আড্ডায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তেমনই এক আড্ডায় এক দিন এক জন মন্তব্য করে বসল, ‘ভগবান, কেউ এতটা কিপটে হতে পারে!’ সেই বন্ধুর হাতেই কাকিমা কাগজের পুটলিটা তুলে দিয়ে বলে গেলেন, ‘মায় আইলে কইস সুক্তো করলে তাতে যেন দেয়৷’ তখনও বাঙালি বাড়িতে সুক্তো রোজ না-হলেও প্রায় রোজের পদ। কাগজে মোড়া বস্তুটি দেখে আমরা তো থ৷ প্রথমে মনে হয়েছিল, শসার টুকরো৷ দু’ভাগের এক ভাগ ফালি যেমন হয় আর কি৷ 



    শসা তখনও আলু-পেঁয়াজ জাতীয় শাক-সবজির মতো সারা বছর ঢেলে বিক্রির ফল নয়। গরমের সময় মাস কয়েক মেলে। মূলত স্কুল-কলেজের গেটে, সিনেমা হলের বাইরে। লোকাল ট্রেনের কামরায় শোনা যায় কোনও হকার হাঁক পারছেন, ‘দেব নাকি ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে।’ ভয়ানক কথার কী অসাধারণ প্রয়োগ। ভিড়ে ঠাসা কামরায় দু’চারজন হাত বাড়ান৷ শসায় ছিয়ানব্বই পারসেন্টই জল। বিস্তর দর কষাকষির পর বড়জোর এক-দু’জন কেনেন৷ মুখ ভার করে কিংবা গালমন্দ করতে করতে নেমে গিয়ে পরের কামরায় ওঠেন বিক্রেতা৷ সেই শসা ট্রেনের কামরায় তেষ্টা মিটিয়ে, ফাস্ট ফুডে, দুপুর-রাতের খাবারে জায়গা করে নিয়ে এখন ডায়াবেটিক ফল। ক’দিন আগে কানে এল ডায়াবেটিক আমের কথা। সে আম নাকি চিনির মতো মিষ্টি, কিন্তু সুগার বাড়বে না এক ছিঁটেও। 



    ডায়াবেটিস? সুগার আছে কি নেই, বেড়েছে, না কমেছে, নাকি নিয়ন্ত্রণে, সেটাই বা তখন জানবে কী করে মানুষ? পাড়ার অলিতে, গলিতে ডায়াগনস্টিক্স সেন্টার তখন কোথায়? ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করতে বললে মাথায় রক্ত ওঠার জোগাড় হয়৷ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বাদে বাকি সরকারি জায়গায় পরীক্ষার সুবিধা নামেই। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, গরিব মানুষের ভরসা সেই সরকারি মেডিক্যাল কলেজ। সুগার রিপোর্ট করাতেই মাস ছয়েকের অপেক্ষা। বেসরকারি ব্যবস্থাও নামমাত্রা। কলকাতার অদূরেও খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার অবস্থা৷ মহানগরীতেও হাতে গোনা ক’টি মাত্র প্যাথলজিক্যাল সেন্টার৷ খরচ বেশির ভাগেরই সাধ্যের বাইরে৷ কাকিমা সে দিন হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন শসার টুকরো সমান এক ফালি লাউ৷ কাকিমা কাকিমা করছি বটে। কলোনির সম্বোধনে মাসিমা, কাকিমারা কেউ কেউ ছিলেন মাসি, কাকি। এই কাকিমা ছিলেন তেমনই এক কাকি।  



    আর এক দিন, আমরা তখনও স্কুলের গণ্ডি পেরোইনি৷ বন্ধুরা এর-ওর বাড়িতে পালা করে গল্প করেই সময় কাটাই৷ গল্পগুজব আর আড্ডা কি এক? কী জানি! আমার কেন জানি মনে হয়, আড্ডা দেওয়ার একটা অলিখিত বয়সসীমা আছে৷ স্কুলের উঁচু ক্লাস কিংবা কলেজে না উঠলে ঠিক আড্ডা বলা যায় না৷ আড্ডাবাজ বাঙালি—বাঙালির সেরা সম্মান। স্কুলের পড়া, মাস্টারমশাইদের পড়ানোর ভঙ্গি, পড়া না-পারলে ধোলাই ইত্যাদি ছিল আমাদের গল্প-আড্ডার অন্যতম বিষয়৷ আর যখন যে খেলা নিয়ে মেতে থাকা যায়, তা-ও থাকত। পেলে, পিকে, চুনি, বলরাম, পতৌদি, বেদি, গাভাসকার, সোবার্স, লয়েড, কালিচরণ, মিলখা সিং, নাদিয়া কোমিনিচি, মার্টিনা নাভ্রাতিলোভাদের নিয়ে যার যা মনে হয়, কল্পনা মিশিয়ে বলাবলি করি৷ জানি কম, বলি বেশি। দেশাত্মবোধ আর আন্তর্জাতিকতা মিলেমিশে একাকার। বিশ্বায়ন, ভুবনায়ন তখন কোনও দল, সরকারের কর্মসূচি নয়। জানার আগ্রহ থেকে ঘরে বসে চলে বিশ্বদর্শন। পেলে না মারাদোনা কে বড় প্লেয়ার, তা নিয়ে তর্ক যেন শেষ হতে চায় না। বলেছিলাম, পেলে তো রূপকথার চরিত্র। বইয়ে পড়েছি, বড়দের মুখে শুনেছি তাঁর কথা। মারাদোনার খেলা টিভিতে দেখেছি। অতএব…..।  গল্পের আসরে কাকি এসে হাজির৷ সে দিনও হাতে কাগজে মোড়া কিছু একটা৷ এক বন্ধুর হাতে সেটা গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘ভাগ কইরা খা৷ চিনির মতো মিষ্টি৷’ পাশের ঘরে গিয়ে মাকে কাকিমা বলছেন, ‘দিদি, এই বার আর সবাইরে দিতে পারলাম না৷ সব পোকায় খাইসে৷’ আমরা প্যাকেট থেকে আবিষ্কার করি, এক টুকরো নারকেল৷ সত্যিই চিনির মতো মিষ্টি৷ কাকিমাদের বাড়িতে দুটি নারকেল গাছ৷ 



    ‘ভগবান, কেউ এতটা কিপটে হতে পারে!’—কথাটা এ বার আর কারও মুখে শোনা গেল না। কিন্তু মুখ দেখে মালুম হল, সবার মনেই কথাটা ঘোরাফেরা করছে৷ পেটে আসছে, বলছে না কেউ। আজকাল রাস্তার ধারে কাঁচা নারকেলের যে টুকরো পাঁচ-দশ টাকা পিস বিক্রি হয়, বেশ মনে আছে কাকির দেওয়া ফালিটা ছিল তার চেয়েও পাতলা৷ ক্রমে বন্ধুরা কেউ কাউকে কিপটে বলতে গিয়ে কাকির তুলনা টানে৷   



    পাড়ায় কাকির মতো ভারী চেহারার আর কেউ ছিলেন না৷ আবার তাঁর মতো হন হন করে হাঁটতেও পারতেন না কেউ৷ জোর দিয়ে বলতে পারি, হাঁটা প্রতিযোগিতায় নাম দিলে কাকির ফার্স্ট প্রাইজ বাঁধা ছিল। ভারী চেহারার জন্যই ছোটরা একটু ভয়ডর করত তাঁকে৷ আমরা গলা চড়িয়ে কথা বললে বা ঝগড়াঝাটি করছি শুনলে, কাকি বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন৷ সুরসুর করে সব কেটে পড়তাম৷ 



    প্রাইমারি থেকে সেকেন্ডারি স্কুল, সেখান থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়— জীবন এগোতে থাকে৷ কাকি মাঝেমধ্যে আসেন৷ উঠোন থেকে হাঁক পারেন, ‘সাড়া শব্দ নাই ক্যান৷ কেমন আসস সব৷’ কোনও দিন কাকি হাতে করে নিয়ে এসেছেন লাউ-কুমড়ো-পুঁইয়ের ডগা, কোনও দিন আস্ত লাউ, কুমড়ো, কুমড়ো ফুল, গোটা কতক লঙ্কা, ঝিঙে, চিচিংঙা, উচ্ছে, বেগুন, ডাঁটা, সজনে ডাঁটা, সজনে ফুল। একটা-দু’টো-তিনটে-চারটে নারকেল, কত দিন, দিনের পর দিন এমন কত কী দিয়ে গিয়েছেন৷ কোনও দিন আঁচলে করে গাঁদা, জবা, শিউলি এনে বলেছেন, ‘ঠাকুররে দিস৷ আমাগো বাড়ির ফুল৷’ তখন সব বাড়িতেই ঠাকুরের আসন পাতা৷ হাড়ি চড়ুক না চড়ুক, দেবতা দু’বেলা পুজো পান৷ শনিবার করে সন্ধ্যায় তুলসিতলায় বড় ঠাকুরের পুজোও বাঁধা৷ বিজয়ার আগে থেকে লক্ষ্মী পুজোর কথা মনে করিয়ে দিতেন কাকি৷ যাতায়াতের পথে দেখা হলেই বলতেন, ‘প্রসাদ খাইয়্যা যাইস কিন্তু৷’ 



    কলেজে বন্ধুদের কাছে কাকির কথা গল্প করি৷ বন্ধুদের মেসে মাছের পিসের সাইজ নিয়ে আলোচনায় মজা করে কেউ কেউ আমার মুখে শোনা কাকির কিপটেমির প্রসঙ্গ তোলে৷ তা শুনে বন্ধুদের মেসের কাজের মাসি এক দিন কথায় কথায় বলেন, ‘তোমরা ছেলেমানুষ৷ হিসাবপত্র বোঝো না৷ মাছ যা আনো তা সবার পাতে দেওয়ার মতো না৷ ছইট্ট ছইট্ট পিস না-করলে চলব কী কইরা৷’ কাকির সেই কথাটা মনে পড়ে, ‘দিদি এইবার আর সবাইরে দিতে পারলাম না৷ সব পোকায় খাইসে৷’ আরও মনে পড়ে যায় সেই একফালি নারকেলের কথা৷ কাকি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভাগ কইরা খা৷ চিনির মতো মিষ্টি৷’ আমরা মুখ টিপে হেসেছিলাম আর মনে মনে বলেছিলাম, ‘ভগবান, কেউ এতটা কিপটে হতে পারে!’ সে দিন কাজের মাসির কথায় কাকিমাকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম৷ 



    এক সন্ধ্যায় কাকি এক বাটি মিষ্টি হাতে হাজির৷ বাড়িতে অতিথি সঙ্গে এনেছেন। কলকাতার নামী দোকানের মিষ্টি৷ কাকি সেই মিষ্টির ভাগ দিয়ে গেলেন। গল্পগুজবের ফাঁকে মাকে বললেন, ‘লাউগুলা তো আগেই চোরে খাইসে৷ এই বার গাছটারেও আর বাঁচাইতে পারলাম না দিদি৷ কাইল রাইতে ছাগলে খাইসে৷’ গলা ভারি হয়ে আসে কাকির৷ যেন প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ দিলেন৷ মা সান্ত্বনা দেয়, ‘আমাগো লাউগাছটারেও খাইসে৷ গোরু-ছাগলের আর দোস কী৷ যারা পালে, তারা খাইতে দেয় না৷’ কলোনির সব বাড়িতেই তখন উঠোনে এটা-ওটা হয়৷ লাউ-কুমড়ো-পালং-পুঁই-লঙ্কা-ডাঁটা, আরও কত কী৷ বছরভর যত্নআত্তি চলে আম, কাঁঠাল গাছের৷ টানাটানির সংসারে সেগুলি অমূল্য৷ সমানতালে চলে চুরিচামারি৷ চোরের হাত থেকে প্রিয় গাছ, গাছের ফল রক্ষা করতে অনেকেই বিছানায় রাত জাগেন৷ ভোরের আলো ফুটতে লেগে পড়েন সেবাযত্নে৷ বন্ধুদের মেসে মাছের টুকরোর সাইজ আর জলের মতো পাতলা ডাল নিয়ে মজা-মস্করার মধ্যে কাকির সেই শসার টুকরো সমান লাউয়ের ফালি, আরও ছোট নারকেলের টুকরো খেতে দেওয়ার রহস্য ভেদ করি আমি৷ সে বার গোরু-ছাগল আর চোরেদের হাত থেকে একটাই লাউ রক্ষা করতে পেরেছিলেন কাকিমা৷ সেটাই ছোটো ছোটো টুকরো করে প্রতিবেশীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন৷ সেই সব দিনে পোকার হাত থেকে নারকেল বাঁচাতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হত৷ যে যে বার পোকা ধরেনি, কাকি, দু’টো-তিনটে-চারটে নারকেল দিয়েছেন৷ আস্ত লাউ, কুমড়ো দিয়েছেন৷ বেশি কিংবা যৎসামান্য, কাকি পাঁচ জনকে না-দিয়ে খাননি৷ 



    বছর কয়েক আগের কথা। এক দুপুরে পাড়ার এক দাদার বাড়িতে কাকি হঠাৎ হাজির৷ গেটের রেলিং ধরে হাঁফাচ্ছেন৷ বয়স আর অসুখ-বিসুখে শরীর অর্ধেক৷ সিঁড়ির পরের ধাপ ওঠার শক্তিটুকু নেই৷ ‘পা আর চলে না…৷’ কথা শেষ করতে পারলেন না, হাঁফ ধরে গেল৷ ধরে ধরে ঘরে এনে বসানো হল৷ তখনও হাঁফাচ্ছেন৷ ডাক্তার ডাকার কথা শুনে এক গাল হেসে বললেন, ‘না, না, ডাক্তার লাগব না৷ আমি তো এ সব নিয়াই আসি৷ একটু বসলেই ঠিক হইয়্যা যাইব৷’ এ ভাবেই তো রান্নাবান্না-স্নান-খাওয়া-বাথরুম সব চলে৷’ এলেন কি রিকশা করে? জানতে চান দাদা৷ কাকি জবাব দেন, ‘কী যে কস্, রিকশায় উঠুম কী কইরা? এক ধাপ সিঁড়ি ভাঙতে জান বাইরইয়্যা যায়৷ এই শরীরে রিকশা?’ 



    সত্যি, চোখের সামনেই তো দেখছি, বৃদ্ধা প্রায় নড়তে চড়তে পারেন না৷ তা হলে এলেন কী করে, কে দিয়ে গেল? নয়-নয় করে পথটা তো নেহাৎ কম নয়৷ জানা গেল পাঁচ-দশ পা চলার পর মিনিট পাঁচ-সাত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন৷ এ ভাবে পাঁচ মিনিটের পথ এক-দেড় ঘন্টায় অতিক্রম করেছেন৷ 



    এত কষ্ট করে ভরদুপুরে কেন এলেন কাকি? কোনও আপদ-বিপদ, সমস্যা-টমস্যার কথা শোনাতে এসেছেন নাকি? বাড়িতে ডেকে নিলেই তো পারতেন৷ ডাকলেই ছুটে যেতাম তা হয়তো নয়৷ কিন্তু যেতাম। নিজে না-পারি, বাড়ির বা পাড়ার কাউকে পাঠাতাম সন্দেহ নেই৷ কাকি একটু সামলে নিয়ে বললেন, আসব আসব করসি অনেক দিন৷ মন চায়, শরীর দেয় না৷ সময় হইয়্যা আইল৷ আর তো কয়টা দিন৷’ তা হলে বেরলেন কেন? জানতে চাইলাম৷ বললেন, ‘ব্যাঙ্কের যা কারবার৷ তাগোরে এক বার দেখা দেওন লাগে। তা না হইলে নাকি টাকা দিব না৷’ 



    ডিমনিটাইজেশনের পর কাকি এক দিন যোগাযোগ করলেন৷ বিছানার নীচে পাঁচশো-হাজারের বেশ কয়েকটা নোট জমে গেছে৷ সেগুলি ব্যাঙ্কে জমা করে দিতে হবে৷ বৃদ্ধা ফ্যামিলি পেনশন পান৷ যৎসামান্য টাকা। কাকু ছিলেন রাজ্য সরকারের কনিষ্ঠ কেরানি। মারা গিয়েছেন বছর চল্লিশ আগে। হাতে গোনা সামান্য ক’টাকা বেতন। না-খেয়ে থাকার দশা না হলেও টানাটানির সংসার। মাসের গোড়ায় ব্যাঙ্কে গিয়ে কাকি পেনশনের পুরো টাকাটা তুলে আনতেন৷ অনটন সত্ত্বেও সবটা খরচ করতেন না৷ এক দিন জানতে চাইলাম, ‘সবটা তোলেন কেন তাহলে? যতটুকু দরকার তুলবেন৷’ কাকি জবাব দেন, ‘কবে কোন দিন চইল্যা যামু ঠিক আসে! মরা মাইনসের টাকা তোলা বড় ঝক্কি৷ বাড়িতে থাকলে বাড়ির লোক পাইব৷ নিজের টাকা নিজের কাছেই সবচেয়ে নিরাপদ৷’



    ব্যাঙ্ক থেকে সে দিন মিষ্টির দোকান ঘুরে তার পর এসেছেন কাকি৷ গল্প-গুজব শুরু হলে আঁচলের আড়াল থেকে বের করে এগিয়ে দিলেন সন্দেশের প্যাকেট৷ সুগার-সতর্কতা মেনে আমরা মিষ্টিকে বিদায় জানিয়েছি, চা-ও চিনি ছাড়া, কাকি তা মনে রেখেছেন৷ এনেছেন সুগার ফ্রি মিষ্টি। কিন্তু মিষ্টি কেন? বললেন, ‘এত দিন পর আইলাম, একটু মিষ্টিমুখ করামু না তগো৷’ কথায় কথায় জানলাম, সে মাসে ডিয়ারনেস রিলিফ বাবদ কাকি কয়েকশো টাকা বেশি পেনশন পেয়েছেন। 



    কাকি চোখে দেখেন না বহু বছর। বাংলা ক্যালেন্ডার দেখে অমাবস্যা, পূর্ণিমা, একাদশী, অম্বুবাচী, বিপত্তারিণী পুজোর দিন-তারিখ জানানোর মধ্য দিয়েই প্রতিবেশী বৃদ্ধার সঙ্গে যোগাযোগটা টিকে ছিল আমার। বছর চার-পাঁচ আগে সেই অশক্ত বৃদ্ধার প্রশ্ন শুনে চমকে উঠলাম। কাকি জানতে চাইলেন, ‘বাজেট কবে কিছু শুনেছিস?’  



    বাজেট পেশের দিন কয়েক আগেই স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার আরও এক দফা কমানো হয়েছে সে বার। অর্থনীতির যে ফর্মুলা মেনে দেশ চলছে, প্রথম সারির প্রায় সব দল তাতে সহমত। আশ্চর্যের বিষয়, তাকে উদারনীতি বলা হলেও আদতে তা উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবনায় জাড়িত। তা না হলে, রাষ্ট্রের আর্থিক মন্দা দূর করার নামে বয়স্কদের সঞ্চয় প্রকল্পগুলিকে এমন নির্মম ভাবে টার্গেট করা হত না। মানব উন্নয়ন সূচকের যে উপাদানগুলিকে অগ্রগতির লক্ষণ হিসাবে গণ্য করা হয়, তার একটি হল গড় আয়ুর বৃদ্ধি। এই সাফল্যের উল্টো পিঠে থাকা সত্যটি হল, দীর্ঘ আয়ু মানে নিজেকে নিজের টেনে নিয়ে চলার দায় বেড়ে চলা। নিজেকে নিজে টানতে টানতে কাকি হার মানলেন করোনার কাছে।

     

  • আরও পড়ুন
    ফেরার - JAYASHREE KONAR
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৭ জুলাই ২০২১ | ৯১১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:9555:9577:2d45:6741 | ১৮ জুলাই ২০২১ ০৫:০৩495890
  • ভাল লাগল 

  • কান্তি | 146.196.45.116 | ২২ জুলাই ২০২১ ০৮:০৬495979
  • সম্পর্কই আসল জীবন বিমা


    বিপদে আপদে টাকা লাগে। জীবন বিমা করি, আমি মরলে পরিবারটা যাতে ভেসে না যায়। স্বাস্থ্য বিমা করি, অসুখে-বিসুখে যাতে চিকিৎসার অসাধ্য খরচ সাধ্যে আনা যায়।


    বিপদে আপদে মানুষও লাগে। সম্পর্ক বিমা করি যাতে, আমি না থাকলেও পরিবারটার পাশে ক'জন অন্তত দাঁড়ায়। অসুস্থ হলে ঘর থেকে তুলে হাসপাতালে ছোটার মানুষ যেন ছুটে আসে।


    মানি ব্যাক পলিসির মতোই, এই ক্ষেত্রে হেল্প ব্যাক পলিসি। প্রিমিয়াম কখনও দু'টি মাত্র টাকা, পাঁচ টাকা দিলে তিন টাকা বা কুড়ি টাকা দিলে আট টাকা ফিরিয়ে দেওয়া, কিংবা গাছের এক ফালি লাউ বা কয়েক কুচি নারকেল।


    টাকার দম্ভে বা আত্মবিশ্বাসে, নগর জীবনে যাবতীয় পণ্য ও পরিষেবা টাকা দিয়ে কিনতে কিনতে অনেকেই একা হয়ে পড়ি।  সন্তান সপরিবার প্রতিষ্ঠিত দূরে, আত্মীয়-স্বজন নিছকই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ ও আপ্যায়নের তালিকায়, আর প্রতিবেশী সব গেটের বা ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে।


    প্রাইভেসির গরাদে বন্দি জীবন। পাঁচশো বা তিন হাজার স্কোয়্যার ফিটে ফ্ল্যটে বা অ্যাপার্টমেন্টে বাথরুমের দরজায় পিছলে পড়লে, ডাকার মতো কেউ নেই। নিজকেই হিঁচড়ে টেনে, গড়িয়ে, হামাগুড়ি দিকে পৌঁছতে হয় ফোনের কাছে। তার পর ভাবতে হয়, ফোনটা কাকে করব? পৃথিবীর অপর প্রান্তে কোনও ভিন্ দেশের নাগরিক হয়ে যাওয়া সন্তানকে? নাকি পাশের দরজার কাউকে? অকারণ নাক গলানোর স্বভাবের জন্য যার ফোন নম্বরটাই সেভ করা হয়নি কোনও দিন!


    পচে দুর্গন্ধ বেরোলেও আজ দরজা ভাঙে না কেউ। পুলিশ এসে যা করার করে। জাপানের কোদুকুশি-কে আপন করেছি আমরা, ভরসা রাখি না সম্পর্ক বিমায়! জীবনটা যখন এমন ছিল না, জীবনটা যেখানে এখনও তেমন নয়, তার মরমি বয়ান তাই এত মন টানে।


    সম্পর্কের এই অনুসন্ধান চলতে থাকুক।

  • কান্তি | 146.196.45.116 | ২২ জুলাই ২০২১ ০৮:১৯495981
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন