• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  সমাজ  শনিবারবেলা

  • সেদিনই রাতে বৌদির ফুলশয্যা

    অমল সরকার
    ধারাবাহিক | সমাজ | ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৪৭০ বার পঠিত
  • সম্পর্ক-সূত্র

    বীজ বপনে শুরু। তার পর দশ মাস দশ দিন। রক্তের সেই সম্পর্ক ভালবাসা যায়, অবহেলা করা যায়। ছেঁড়া যায় না। পাল্টানোও যায় না। তার পর জীবনভর কত না সম্পর্কের জন্ম। এবং মৃত্যুও।

    কিছু সম্পর্ক শাসনের, অনুশাসনের, বাঁধনের। কিছু সম্পর্ক ভেসে যাওয়ার। চলতি হাওয়ার পন্থী। কিছু সম্পর্ক আঁকড়ে রাখি। কিছু আপনিই বয়ে যেতে দিই। নাম দিতে পারি না এমন অনেক সম্পর্ক থেকে যায় মনের মণিকোঠায়। সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছে নেট মাধ্যমও।

    শুধু কি মানুষ, সম্পর্ক তো চার পাশের কত কিছুর সঙ্গে। পুঁথি বা পর্দার চরিত্র, পুকুর ঘাট বা চিলেকোঠার সিঁড়ি। পাতার ভাঁজে রেখে দেওয়া প্রথম পাওয়া গোলাপ। রাতে গলির মোড়ে আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকা নেড়ি। সম্পর্কের সাগরে ভাসছি, ডুবছি। সম্পর্কের নুড়ি কুড়িয়ে চলেছি। ছুঁড়ে ফেলছি।

    - চলছে, ধারাবাহিক, সম্পর্ক ।



    পাড়ায় সে দিন এক বিচিত্র মানববন্ধন৷ পুকুর থেকে বালতি বালতি জল এক-এক জনের হাত ঘুরে আছড়ে পড়ছে আগুনের শিখার উপরে৷ একটা সময় আগুন নেতিয়ে পড়ল৷ জলের কাছে হার মানল আগুন। জিতে গেল মানববন্ধন। 

    ছোটবেলায় মানববন্ধন শব্দটির সঙ্গে খুব একটা আলাপ ছিল না। রাখির দিন রাখিবন্ধন উৎসব কথাটা একটু আধটু খুব শুনতাম। তখনও এখনকার মতো নানা ডিজাইনের রাখি পাওয়া যেত। কেনার সাধ্যি ছিল না। ঘ্রাণে অর্ধভোজনের মতো দেখেই তৃপ্ত থাকতে হত। 

    মানববন্ধন শব্দটির সঙ্গে পরিচয় গভীর হয় গত শতকের নয়ের দশকের গোড়ায়। আজকের মতো তখনও দেশের সামনে জোড়া বিপদ। এক দিকে, কংগ্রেসের মননোহনী অর্থনীতি। অন্য দিকে, বিজেপির মন্দির-মসজিদ বিভাজনের রাজনীতি। দেখতে দেখতে তিনটে দশক পার হয়ে গেল। মনমোহনের জুতোয় পা গলিয়ে নরেন্দ্র মোদী যেন অলিম্পিক দৌড় শুরু করেছেন। তাঁরই প্রেরণায় অর্থমন্ত্রী রেল, বন্দর, বিমানবন্দর ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় সম্পদের বলতে গেলে চৈত্র সেল ঘোষণা করে দিয়েছেন। নয়ের দশকের গোড়ায় দেশের অর্থনীতিতে এই সব নয়া ভাবনা, বাসনা এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি ইত্যাদি বিপদের একেবারে শৈশবাবস্থায় বামপন্থীদের উৎসাহ, উদ্যমে তৈরি হয়েছিল জাতীয় প্রচার কমিটি। ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার, পাহাড় থেকে সমুদ্র মানববন্ধন গড়ে তোলা হত। সংবিধান রক্ষা এবং আসন্ন বিপদের মোকাবিলায় সম্মিলিত শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হত মানববন্ধন উৎসব। 

    সেদিন পাড়াতেও ঘোর বিপদ। মানববন্ধনও যেন নজরকাড়া।  আগুন লেগেছিল ছোবা আর রেক্সিনের গুদামে।‌ গোটা পাড়া পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল না। টিন-টালি-দর্মার ঘরই তখন বেশি। আগুন লাগার দু’-চারটি ঘটনা ফি-বছর তাই লেগেই থাকত। কিন্তু দমকল কী বস্তু জানা ছিল না। এর ওর মুখেই যা শুনতাম। যদিও দমকল স্টেশনটা পাড়া থেকে সাইকেলে মিনিট দশ-পনেরোর রাস্তা বড় জোর। পাড়ায় কোনও দিন দমকল আসতে দেখিনি৷ আগুন লেগে যাওয়া, বা লাগিয়ে দেওয়া, কারণ যা-ই হোক, দমকলের অপেক্ষায় না-থেকে গোটা পাড়া ঝাঁপিয়ে পড়ত জল ঢালতে৷ 

    যে কোনও ঘটনা-দুর্ঘটনাতেই সেটাই ছিল যেন স্বতঃসিদ্ধ৷ অভাব-অনটন, জমি বিবাদ, কংগ্রেস-সিপিএম-নকশাল সংঘাত, পাড়া কমিটির বিবাদ, এ সব নিয়ে হাতাহাতি, মারামারি লেগেই থাকত৷ তবে সে সবই সাময়িক। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে মুহূর্তে বিবাদ ভুলে গোটা পাড়া জোট বাঁধত৷ ভর-দুপুর কিংবা ভোর-রাত, ডাক্তার ডেকে আনা, কাউকে নিয়ে হাসপাতাল ছোটার দরকার হলে মুহূর্তে গোটা পাড়া জড়ো হয়ে যাওয়াটাই যেন ছিল নিয়ম। একদল রোগীকে নিয়ে ছুটতেন, পিছন পিছন বাকিরা৷ পাড়ার ভিড় গিয়ে জড়ো হত হাসপাতালে৷

    দুর্যোগ কেটে গেলে পাড়ার আড্ডায়, চায়ের দোকানে কারও কারও কথায় অভিমান ঝরে পড়ত, ‘সে দিন আমি এত করে যেতে চাইলাম, তোমরা রাজি হলে না৷' কেউ বলতেন, ‘রাতবিরেতে দরকার হলে আমায় ডেকো৷ রাতে  আমি তো জেগেই থাকি। এক দিন না হয় হাসপাতালে বা শ্মশানে রাত জাগব।' তেমন একজনকে এক দিন বললাম, ‘কাকু, আপনাকে তো ফার্স্ট ট্রেনে অফিস ছুটতে হয়৷ আপনি কী করে হাসপাতালে রাত কাটাবেন!’ দার্শনিকসুলভ জবাব এল, ‘জীবনটা অফিস আর বাড়িতেই থমকে আছে বুঝলি৷ মাঝেমধ্যে রুটিন বদল করা ভালো৷ একটু হাসপাতাল-টাসপাতাল গেলে মন্দ কী?’

    রাতে জেগে থাকা সেই প্রতিবেশী কাকুর কথা মনে পড়তে চোখের সামনে ভেসে উঠল অলোক দাশগুপ্তর মুখটা। এন্টালির উল্টোপিঠে ডক্টর্স লেনের বাড়িতে নিয়ম করে রাত জাগতেন অলোকদা। ভোর চারটে-সাড়ে চারটে পর্যন্ত ফোনের সামনে বসে থাককেন। মানিব্যাগে বাড়ির ফোন নম্বর লেখা চিরকুট রাখাই থাকত। পাড়া-প্রতিবেশী, পরিচিত, সদ্য পরিচিতকে চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, 'রাত-বিরেতে কারও জন্য ডাক্তার ডাকতে হলে, হাসপাতালে নিতে হলে ফোন কোরো।' রাতেই বেরিয়ে পড়তেন অলোকদা। কখনও আগেভাগে সরাসরি হাসপাতালে ছুটে গিয়ে ডাক্তার-নার্সদের বলে রাখতেন রোগী-বৃত্তান্ত। 

    সে দিন পাড়ার আগুনে জল ঢালতে তৈরি হওয়া মানববন্ধনে গোটা পাড়ার চোখ আটকে গিয়েছিল এক তরুণীকে দেখে। পরনে নতুন শাড়ি৷ পায়ে আলতার প্রলেপ৷ সিঁথির সিঁদুর ছড়িয়ে কপালে, নাকে৷ মুখে স্নো-পাউডারের অবিন্যস্ত প্রলেপ৷ আগের দিন সন্ধ্যায় এ পাড়ার বধূ হয়ে এসেছেন৷ কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর সে দিন ফুলশয্যা৷ 

    মানিকদা ছিলেন বঙ্গশ্রী কটন মিলের আইটিআই পাশ করা ফিটার। শিফটিং ডিউটি। মাঝেমধ্যেই গোটা পাড়া তাঁর অপেক্ষায় থাকত। কেউ কেউ সাইকেল নিয়ে মিলে গিয়ে তাগাদা দিত। তিনি না-ফেরা পর্যন্ত ভাঙা কল সারাই হবে না। গোটা পাড়ার জল না-খেয়ে কাটাতে হবে, রান্না চড়বে না। রাস্তার একমাত্র হাতকলটা পুরসভার বসানো। মাঝেমধ্যেই কলের এটা সেটা বিকল হয়ে গেলে মানিকদাই ছিলেন ভরসা। ছোটখাটো যন্ত্রপাতি বদলানোর খরচ ভাগ করে নিতেন পাড়ার সকলে। আগুন লেগেছে খবর পেয়ে জল ঢালতে নতুন বউকে সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছিলেন মানিকদা। পাড়ার আগুনে জল ঢেলেই নতুন সংসারে হাতেখড়ি হয়েছিল সেই নববধূর। এই ছিল পাড়া। এ ভাবেই গড়ে উঠত পাড়া। 

    সেই পাড়া এখন কেমন? বছর দুই-তিন আগের একটা অভিজ্ঞতা বলি৷ এক জন অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরে ভোর-রাতে বিছানা ছাড়তে হল৷ উপসর্গ দেখে মনে হল, বাড়িতে ডাক্তার ডেকে সময় নষ্ট করার মানে হয় না৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভালো৷ অ্যাম্বুল্যান্সকে খবর দেওয়া হল৷ নিজে দ্রুত তৈরি হতে হতে ভাবতে লাগলাম, এত সকালে কার কার ঘুম ভাঙানো যায়? যে ক’টা মুখ ভেসে উঠল, কানে বাজতে লাগল তাঁদের সম্ভাব্য জবাব, ‘নতুন চাকরি, অফিস কামাই করা ঝুঁকি হয়ে যাবে’, ‘দিল্লির বস শহরে, অফিসে না গেলেই নয়’, ‘বাড়িতে গেস্ট আসার কথা, তার উপর শরীরটা ভালো নেই, ছেলের পরীক্ষা’, ‘ক’দিন যাবৎ প্রেসার হাই, স্পনডিলোসিসের ব্যথাটাও বেড়েছে, গা ম্যাজ ম্যাজ করছে রে’ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ ও-দিকে, সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স হাজির৷ তাতে অনেকের ঘুম ভেঙে গিয়েছে টের পেলাম৷ হাসপাতালের দিকে রওনা হওয়ার সময় হাজির পাড়ার মাসিমা-পিসিমারা৷ মিনিট কুড়ির মধ্যে অ্যাম্বুল্যান্সের আবির্ভাবে ভালো লাগার পাশাপাশি মন খারাপ করা আর একটা দিনের স্মৃতি জেগে উঠল৷ 

    বছর পঁচিশ আগে, এক সন্ধ্যায় পাশের বাড়ির মেসোমশাই বুকে ব্যথা নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন৷ গোটা পাড়া তাঁকে এক ডাকে চেনে৷ মাঝারি ব্যবসায়ী, পাড়ায় তাঁরই প্রথম দোতলা পাকা বাড়ি, প্রথম রেডিও, প্রথম রেকর্ড প্লেয়ার, প্রথম ইলেকট্রিসিটি, প্রথম টেলিভিশন, প্রথম টেলিফোন৷ দানধ্যানেও তিনিই প্রথম৷ দুর্গাপুজোর মাসখানেক আগে থাকতে ভোর রাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর মহিষাসুর ম‌দির্নীর রেকড চালিয়ে দিতেন৷ গোটা পাড়া আচ্ছন্ন হয়ে শুনত৷ বছরের বাকি সময় দোতলার বারান্দায় বসে কখনও লং প্লেতে শুনতেন নটী বিনোদিনী, কখনও সিরাজদ্দৌল্লা, কিংবা টিপু সুলতান যাত্রাপালা, কোনওদিন শুনতেন উৎপল দত্তের ফেরারী ফৌজ, রাইফেল, ব্যারিকেড। তাঁর বাড়িতেই ফি

    চৈত্রে অষ্টপ্রহর কীর্তনের সঙ্গে থাকত দু’-বেলা খিচুরি খাওয়ানোর আয়োজন। অনেকের কাছেই তা ছিল একটু ভালোমন্দ খাওয়া। অভাবি পরিবারের মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা, পড়াশুনো‒তিনিই হাত বাড়িয়ে দিতেন সবার আগে৷

    সেই তিনি অসুস্থ৷ পুরসভার অ্যাম্বুল্যান্স ডাকতে ফোন করা হল। দীর্ঘক্ষণ বাজার পর ও-পারে একজন তুললেন। ঠিকানা শুনে বিরক্তির সঙ্গে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন৷ তার পর ফোন নট রেসপন্ডিং৷ ঘণ্টাখানেক কাটার পর অগত্যা রিকশ। হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই সব শেষ। 

    আরও পড়ুন
    মালিক - Chayan Samaddar


    দুঃসংবাদটা মাঝরাতেই পৌঁছে গিয়েছিল পাড়ায়৷ টের পেলাম, পাড়াটা বদলে গিয়েছে৷ নিকট প্রতিবেশী দু’-চার জন ছাড়া, বলতে গেলে পরিবারের পাশে কেউ নেই৷ অথচ গোটা পাড়াই জেগে আছে৷ ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে, টিভি চলছে৷ পাড়ার মোড়ে ছেলে-ছোকরাদের আড্ডা, জটলা দিব্যি আছে৷ এক জনও জানতে চাইল না মেশোমশাইয়ের কী খবর কিংবা এত রাতে তোমরা কোথা থেকে এলে?

     

    বছর দশ-বারো হল, অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য অপেক্ষার উত্‍কণ্ঠা অনেকটা কেটে গিয়েছে৷ অনেকেরই মোবাইলে জরুরি নম্বরের তালিকায় দু’-চারটে অ্যাম্বুল্যান্সের কন্টাক্ট নম্বর মজুত আছে৷ এক জনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে দশটা মোবাইল থেকে কল যায়৷ তার পর?

    বছর দশেক আগে এক মাঝরাতে প্রবাসী বন্ধুর ফোন পেয়ে তাঁর এখানকার বাড়িতে গিয়েছি৷ মেসোমশাই অসুস্থ৷ হাসপাতালে নিতে হবে। বাড়ির সামনে অ্যাম্বুল্যান্স দেখে ভরসা পেলাম৷ হাসপাতালে এক কর্তাকে ফোনে ঘুম ভাঙিয়ে বলে রেখেছি, ইমার্জেন্সিতে বলে রাখতে, সিরিয়াস পেশেন্ট নিয়ে যাচ্ছি৷ অ্যাম্বুল্যান্সে চালকের পাশে বসে বললাম, চলুন। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স স্টার্ট দিল না৷ কী ব্যাপার? দেখি, বছর কুড়ি-বাইশের মুখ চেনা তিন তরুণের সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্সের সহকারীর তর্কাতর্কি বেধেছে৷ সহকারীর বক্তব্য, অ্যাম্বুল্যান্সে রোগীর ক্যাবিনে দু’জন যেতে পারবেন৷ কিন্তু তরুণদের সাফ কথা, ‘গেলে তিন জনই যাব, নইলে এক জনও যাব না৷’

    কথাটা শুনে মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল৷ বললাম, ‘এটা কি পিকনিক, না দিঘা বেড়াতে যাওয়া?’ মুখ চোখ দেখে বুঝলাম, কথাটা পছন্দ হয়নি, কিন্তু সিদ্ধান্ত বদল হল না৷ সময় বয়ে যাচ্ছে দেখে বন্ধুর বৃদ্ধা মাসিমাকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স ছোটালাম৷ ভোর-রাতে ইমার্জেন্সিতে চা খেতে খেতে মাসিমা বলবেন, ‘একটু বসতে পারলে ভালো হত৷’ বসার জায়গা পাওয়ার আগে মেঝেতে শুয়ে পড়লেন তিনি৷ ভাগ্যিস, মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি৷ বৃদ্ধাকেও ইমার্জেন্সিতে অবজারভেশনে থাকতে হল কয়েক ঘণ্টা।

    এ-সব পুরনো ঘটনা ভাবতে ভাবতে আবেশ দাশগুপ্তর কথা মনে পড়ে গেল। সেই যে বড়লোক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মরে গেল বছর ষোলোর বাচ্চা ছেলেটা। ভাঙা কাচের বোতল পেটে ঢুকে গিয়েছিল। দুর্ঘটনা নাকি খুন, সে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পুলিশ, মিডিয়া। কেন বাঁচানো গেল না ছেলেটাকে, চাপা পড়ে থাকল সে প্রশ্নটা। টিভি ক্যামেরার সামনে আবেশের এক বান্ধবী বলছিল, ‘ওর শরীর যখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে আবাসনের বড়রা এসে বলছিল, এই করো, তাই করো। হাত লাগায়নি এক জনও। একটা সময় বলেও ফেলেছি, আপনাদের লজ্জা করে না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন৷’ হয়তো তাদের কেউ যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা রক্তাক্ত ছেলেটির একটা সময়ে ঝিমিয়ে পড়ার দৃশ্য ভিডিও-বন্দিও করেছে।

     বালিগঞ্জের সেই মহার্ঘ আবাসন থেকে শহরের যে কোনও দিকে গাড়িতে মিনিট দশেকের পথেই  গুচ্ছ হাসপাতাল। তবু হাসপাতালে নিতে বিলম্বের কারণেই বাঁচানো যায়নি ছেলেটিকে।

    অদূরে বস্তিতে কোনও অপরিচিত আবেশের এমন দশা হলে তাকে নিয়ে বাকিরা ছুটত কোনও সরকারি হাসপাতালে৷ বেড নেই শুনে এ হাসপাতাল, সে হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে হয়তো মরে যেত, বেঁচেও যেতে পারত৷ কিন্তু আবেশের মৃত্যু ছিল অনিবার্য৷ আবাসনের পার্কিং প্লেসে গাড়ির ছড়াছড়ি। নির্দেশ পেলেই ছেলেটিকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতেন রক্ষীরা। কিন্তু রাত পোহালে কাউকে অফিস ছুটতেই হবে, কারও অফিসের বড় কর্তা শহরে, অতএব যেতেই হবে অফিস, কাউকে ব্যবসার কথা সারতে ছুটতে হবে নাইট ক্লাবে, কারও রেঁস্তরায় সিট বুক করা আছে, কারও বাড়িতে গেস্ট আসছেন, কারও জিমের সময় বয়ে যাচ্ছে, কারও আছে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কারও ছেলে বা মেয়ের পরীক্ষা৷ আমরা যে বড় ব্যস্ত৷ তা ছাড়া কে না কে! ছেলেটাকে তো বিশেষ কেউ চিনতই না৷

    দিন কয়েক আগে রেণুদির কথা উঠল এক ঘরোয়া আড্ডায়। পাড়ার আর পাঁচ জনের মতোই রেণুদি ছিলেন খুব সাদামাটা মানুষ। বড় মুখ করে বলার মতো একটাই বিষয়, আমাদের উদ্বাস্তু কলোনির প্রথম কিংবা দ্বিতীয় মহিলা সরকারি চাকুরে তিনি। বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন আগে যৌথ পরিবারের মেয়ে নার্সিং নিয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নার্সিং সার্ভিসে চাকরি অর্জন করেছিলেন। সময়ের ডাক পিয়ন রেণুদি। সেই সেই সব দিনে কারও অসুখ-বিসুখ, কাটাছেঁড়া, প্রসূতির সমস্যায় ডাক পড়ত রেণুদির। বাইরে কোথাও বদলি হলে পাড়ার কপালে ভাঁজ পড়ত। 

    জ্বরজারি, সর্দি-কাশি, ব্যথা-বেদনা, গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় ভরসার নাম ছিল সন্তোষ জেঠু। তিনিও সরকারি চাকরি করতেন। সকাল-সন্ধ্যা বিছানায় সঙ্গী ছিল হোমিয়োপ্যাথির বই আর ওষুধের বাক্স। অসুখের বর্ণনা শুনে মাঝেমধ্যে বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে নিতেন। ফি সন্ধ্যায় পাড়ার লোকজন তাঁর নিখরচার ডিসপেন্সারিতে ভিড় করত।

    আরও কিছু মানুষ ছিলেন পাড়ায়, যাঁদের জীবনচর্যা ছিল যেন জনস্বাস্থ্যের চলমান পাঠশালা। জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেল্‌থ শব্দটা যদিও তখন কারও মুখে শুনিনি। শুনেছি ও অর্থ বুঝেছি অনেক পরে, সাংবাদিকতায় আসার পর। রাস্তার চাপাকলের জল বাড়িতে কী ভাবে নিখরচায় পরিশোধন করে নিতে হবে, পুকুরের জল পরিষ্কার রাখতে বাসিন্দাদের দায়দায়িত্ব কী, যেখানে-সেখানে মল-মূত্র ত্যাগ কেন বিপজ্জনক, শত অসুবিধা সত্ত্বেও থাকার ঘরের আগে কেন শৌচাগারটি পাকা করে নেওয়া দরকার—এ সব বলতেন ওঁরা। শরীর-স্বাস্থ্য ভালো রাখার নানা পাঠ দিতেন। 

    কেএমডিএ-এর স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি করতেন সুকুদা, সু্‌খেন্দুবিকাশ সরকার। বিশ্বব্যাঙ্কের স্বাস্থ্য প্রকল্প ইন্ডিয়া পপুলেশন প্রজেক্টে শিশুদের টিকাকরণের কাগজপত্র আসা মাত্র পাড়ায় হাঁক পেরে যেতেন বাচ্চাদের কবে, কোথায়, কখন কলেরার টিকা দেওয়াতে নিয়ে যেতে হবে। আরও একটা ব্যবস্থা চালু ছিল। স্কুলপড়ুয়া আমরা তখন সাত-দশ দিন পরপর রাস্তা, ড্রেন পরিষ্কার করাটা রুটিন করে ফেলেছিলাম। 

    উদার অর্থনীতির তিন দশক অনেক কিছুই বদলে দিল। ঝলমলে শহর, হাতে হাতে মোবাইল, অনেক ঘরেই কম্পিউটার, পাড়ার গলিতে ব্যাঙ্ক, এটিএম, কংক্রিটের রাস্তা, পাকা ড্রেন, পাড় বাঁধাই পুকুর, রাস্তার ধারে ভ্যাট। কিন্তু পুকুরের টলটলে জল উধাও। সেটির সংস্কার থেমে থাকে বছরের পর বছর। ভ্যাট উপচে ময়লা রাস্তায় গড়াগড়ি খায়। পুরসভার অপেক্ষায় দিন গোনে গোটা মহল্লা। বড় জোর ফেসবুকে কিংবা টিভি চ্যানেল ডেকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে নাগরিক অধিকার নিয়ে সরব হয় পাড়া। নাগরিক কর্তব্যবোধ উধাও। 

    কথাগুলি মনে পড়ল করোনা অতিমারির মোকাবিলায় আমাদের দিশেহারা অবস্থা দেখে। লড়াইটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে দু’টি কারণে। এক, জনস্বাস্থ্যকে চূড়ান্ত উপেক্ষা। দুই, গোষ্ঠীবদ্ধ বা সমষ্টি হিসেবে বাঁচার ভাবনাকে দূরে ঠেলে দেওয়া। উদার অর্থনীতির তিন দশকে খুন হয়ে গেছে গণউদ্যোগ এবং জনস্বাস্থ্যের চলমান অনুশীলন। রাতবিরেতে দরকার হলেই আমায় ডেকো বলার মতো মানুষগুলি আজ কোথায়?


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৪৭০ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্রতিভা | 2401:4900:1049:b54a:0:45:3a62:a701 | ২৮ আগস্ট ২০২১ ১২:৪৪497301
  • ভালো লাগলো। 
  • বিপ্লব রহমান | ২৮ আগস্ট ২০২১ ১৩:১৬497304
  • কোথায় হারিয়ে গেল সেই সোনালী দিন! এখন পাশের দরজার প্রতিবেশী কেউ কাউকে চেনে না! 
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন