• হরিদাস পাল  অপার বাংলা

  • সমসাময়িকতার প্রেক্ষিতে সেলিনা হোসেন

    gautam roy লেখকের গ্রাহক হোন
    অপার বাংলা | ১৪ জুন ২০২১ | ৫৪৭ বার পঠিত
  • দেশভাগের ঠিক মাস দুয়েক আগে মেয়েটির জন্ম অবিভক্ত বাংলার অবিভক্ত রাজশাহীর শহরে। মেয়েটি যখন পৃথিবীর প্রথম আলো বাতাসে হাত পা মেলে, তখন সেখানকার আকাশ বাতাস, একদিকে যেমন দেশভাগের তীব্র যন্ত্রণার আশঙ্কায় কুঁকড়ে উঠছে,  তেমনি আরেকদিকে কৃষক আন্দোলনের এক সর্বোচ্চ পর্যায়কে বুকে ধারণ করে  বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
                         পাবনার ভারেঙ্গা ভেঙে হওয়া নতুন ভারেঙ্গা থেকে রাজশাহী শহরে পাড়ি জমানো ঘটকেরা  যেন, 'হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে' র  সেই চির পরিযায়ী ভাবনার নিগড়ে, ছোট্ট একটি বাসা খোঁজবার তাড়নায়, মানুষের ধন, মানের প্রাকৃতিক তৃষ্ণার থেকেও, তীব্র করে তুলছে জীবনের সঙ্কটকে। তেভাগার উত্তাপ তখন গোটা বাংলায়, বিশেষ করে, উত্তরবঙ্গে এক জ্বালাময়ী উত্তরণের দিকে গোটা বাঙালি সমাজকে উপনীত করছে।
                        রাজশাহী বিভাগের নাটোরের নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ ঘিরে মানুষের মধ্যে প্রচার ও জনপ্রিয়তার একটা শীর্ষবিন্দু থাকলেও, তেভাগার উত্তাপ গোটা উত্তরবঙ্গ, হ্যাঁ; অবিভক্ত উত্তরবঙ্গ, পূর্বতন সমস্ত কৃষক আন্দোলনের ভিত্তিকে ছাপিয়ে, এক নতুন ইতিহাস তৈরি করছে।
                        সেই ইতিহাসের মর্মমূল থেকে উঠে আসছে এই চরম সত্য যে; ছেচল্লিশের দাঙ্গা কলকাতা, নোয়াখালী এই সব জায়গাতে ছড়ালেও, হিন্দু বা মুসলমান কোন সম্প্রদায়েরই, সাম্প্রদায়িক শিবির, আপামর বাংলায়, সাম্প্রদায়িকতার বিষ-বিদ্বেষের ভয়াবহ হলাহল সেভাবে ছড়িয়ে দিতে পারছেনা। এটা পারছে না, এই তেভাগা আন্দোলন জনিত উত্তাপের দরুন ভেতর থেকে উৎসরিত হয়েছিল আলোর বিচ্ছুরণের ফলেই। হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির একটা অন্য ধরনের এই চেতনা তে এটা সম্ভবপর হয়েছিল।
                   পরবর্তীকালে বিভাগ উত্তর পূর্ব পাকিস্থানে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মানসিকতার বীজ বপন করা হয়েছিল, এই রকম একটি মাটিতে, জন্ম সেলিনা হোসেনের ১৯৪৭ সালের ১৪ই  জুন। রাজশাহী, বগুড়া-র আবাহমান সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশে সেলিনার বেড়ে ওঠা। এই রাঢ়  বিধৌত বাংলার, আপাত লাল গাম্ভীর্য, যেন এক ধরনের প্রেমের মানসিকতা মেয়েটির মনে খুব শৈশবকেই আবৃত করে দিয়েছিল, রেশমি সুতোর আবরণ।
                     পদ্মার অববাহিকা আর করোতোয়া, যমুনার আপামর গাম্ভীর্য, মহাস্থানগড়, নাটোর, মহাস্থানগড়ের সন্ন্যাসী ফকিরের মেলা -- এই সব সেলিনার মানস লোকে খুব শৈশবেই  ফেলে ছিল এক সুগভীর ছায়া। সেই শান্ত শীতল স্নিগ্ধতাই  হয়ে উঠেছে পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখিকা সেলিনা হোসেনের ব্যক্তি, মনন এবং সার্বিক দর্শনে, কৈশোর যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী।
                                সেলিনা হোসেন সেই অববাহিকায় বাঙালিকে শুধু মননশীল চিন্তা চেতনার জগতেই  স্থিত করেন নি। একটি সমাজ বিজ্ঞানের ধারণার ভেতর দিয়ে, আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক,  সমস্ত ধরনের প্রেক্ষিতকে অবলম্বন করে, একটি জাতীর মননশীলতার সার্বিক গড়ে ওঠার মেরুদন্ড জনিত যে বৈশিষ্ট্য, তাকে একটা শক্ত বনিয়াদে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন। যাচ্ছেন ও। এবং আগামী দিনেও যাবেন।
                           সেলিনা হোসেন, সব্যসাচী বাঙালি লেখিকা হিশেবে, বাঙালির বা সমগ্র মানবজাতির মনন জগতের এমন কোনো বিষয় নেই, যে বিষয়গুলি নিয়ে একটা মরমী চিত্রকলা  আঁকেন নি। এইসব সত্ত্বেও সেলিনা হোসেনের সামগ্রিক সৃষ্টির মধ্যে আমার মনে হয় , সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে; দেশভাগজনিত কারণে, ভারতবর্ষ থেকে, একটি বাঙালি পরিবার, যাঁরা জন্মসূত্রে মুসলমান, তাঁদের, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসার সময় কালকে ঘিরে, রাজনীতির আবর্তে, সামাজিকতার ঘূর্ণাবর্তের  ভেতর দিয়ে, সংস্কৃতিক দ্যোতনায়, একটা পরিপূর্ণ সমাজবিজ্ঞানের চিত্র অঙ্কণ, তাঁর, 'গায়ত্রী সন্ধ্যা' উপন্যাসের ভেতর দিয়ে।
                         দেশভাগকে ঘিরে, বহু মানুষ, বহু রকম রচনা করেছেন বাংলাতে। বহু লেখা আছে বাংলার বাইরে। সাদাত হোসেন মান্টোর এই  সম্পর্কিত  লেখাগুলি গোটা সাহিত্য পরিমণ্ডলের এক চিরকালীন সম্পদ। ঋত্ত্বিকের ছবিকে আমরা শুধু ফিল্ম বলবো না, এক এক একটা কবিতা বলবো, না একটা উপন্যাস বলবো, এই  বিতর্ক বোধহয় চিরকালই বাঙালি সমাজের থেকে যাবে, যতদিন বাঙালি টিকে থাকবে, সেই কালক্ষেপ পর্যন্ত।
                    তবু এই সমস্ত পর্যায়কে ছাপিয়ে সেলিনা হোসেনের 'গায়ত্রী সন্ধ্যা'র,  নতুন আঙ্গিক, একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি,  যেখানে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে,  একটি ছিন্নমূল পরিবারকে  উপস্থাপিত করে, তাকে খন্ডিত ভারতের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে, আমাদের কাছে পরিবেশিত হয়েছে, যেখান থেকে আমরা সমস্ত ধরনের মানবিক বোধ এবং সেই বোধের, যেখানে তাপ আছে, উত্তাপ আছে, সেই তাপ থেকে গরল অনুসৃত হয়, আবার অমৃতের ফল্গু ধারাও প্রবাহিত হয়, সেসব গুলি আমরা পাই।
                           হাসান আজিজুল হকের লেখার মধ্যেও দেশভাগজনিত যন্ত্রনা খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় বঙ্গে  যে অংশটি পড়ে, সেই অংশের মানুষ, হাসান আজিজুল হক। তাঁর  'আগুনপাখি'  উপন্যাস এর ভেতরে রাঢ়বঙ্গ থেকে ছিন্নমূল একটি মানুষের যন্ত্রণা ফোটে অত্যন্ত  সুচেতনায়। এটা বাঙালি সমাজকে শুধু নয়, সার্বিকভাবে  মানব সমাজকে অনুরণিত করে।
                          আরো বহু মানুষের লেখার মধ্যেই দেশভাগজনিত এই যন্ত্রণা গুলি ফুটে ওঠে। তা সত্ত্বেও বলতে হয়, সেলিনা হোসেন তাঁর 'গায়ত্রী সন্ধ্যা'  উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যেভাবে ভারতের সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া কিছু মানুষ, কিছু পরিবার, সংখ্যাগুরু হওয়ার প্রত্যাশায় না, বেঁচে থাকার তাগিদে না, জীবন-জীবিকা কে সুরক্ষিত রাখার প্রয়াসে, সংখ্যাগুরুর দেশ বলে, সেই সংখ্যালঘুরা যে দেশটিকে মনে করেছিল, অর্থাৎ সেই পাকিস্তানে চলে যাওয়া, তাঁদের ভিতর যে যন্ত্রণা, তাকে উপস্থাপিত করেছেন তাঁর' গায়ত্রী সন্ধ্যা' র  ভেতরে।
                       হাসান আজিজুল হক রাঢ়বঙ্গের মানুষ। এখান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ার প্রত্যক্ষ যন্ত্রণার এক ধরনের অংশীদার। তার সেই দেখার চোখটা কিন্তু  এখানে উপস্থাপিত। কিংবা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষ। তাঁর পূর্ববঙ্গ থেকে চলে যাওয়ার  যন্ত্রণার কথা, তাঁর লেখাতে ব্যক্তিগত অনুভূতি হয়েই মিলেমিশে  উপস্থাপিত। কিন্তু সেলিনা হোসেন নিজে একজন পূর্ববঙ্গের মানুষ হয়ে, পশ্চিমবঙ্গের একটি ছিন্নমূল পরিবারের যন্ত্রণাকে যেভাবে উপলব্ধি করেন তা এক কথায় অনবদ্য।    
                          ছিন্নমূলের সেই যন্ত্রণাকে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করে, তাকে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন সেলিনা হোসেন একদম নির্মোহ দৃষ্টি ভঙ্গিতে। সেখানে মৌলবাদীদের তান্ডব যেমন আছে, তেমনি আছে, পূর্ব পাকিস্তানের যে সমস্ত পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান থেকে গেছেন, তাঁদের 'বাঙাল'  শ্যভিনিজম বনাম, পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চল থেকে যাওয়া পরিবারের 'ঘটি' শ্যভিনিজম কে তিনি উপস্থাপিত করেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যে এক চিরন্তন সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকবে ।
                   পূর্ব পাকিস্তান থেকে যেসব ছিন্নমূল মানুষেরৃ পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন তাঁদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের যে সংঘাত, সেই সংঘাতকে ঘিরে সাহিত্যগত উপাদান প্রায় নেই বললে চলে। এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় প্রতিভা বসু 'দুকুলহারা' নামক একটি ছোটগল্পের। এই ধরনের দু একটি ছোটখাটো সাহিত্যগত উপাদান ছাড়া, পশ্চিমবঙ্গে আসা , পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের ওপর ,পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের সামাজিক নির্যাতনকে কেন্দ্র করে কিন্তু সাহিত্যগত উপাদান আমরা পাই না।
                        এই দিক থেকে সেলিনা হোসেন তাঁর 'গায়ত্রী সন্ধ্যা'  উপন্যাসের যে ধরনের নির্মোহ দৃষ্টি ভঙ্গি দিয়ে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া  একটি 'ঘটি',  অথচ মুসলমান পরিবার,  যাঁরা  ধর্মপরিচয়ে মুসলমান, কিন্তু ভাষা পরিচয়ে বাঙালি;  এমন একটি কান্নাহাসির-দোল-দোলানো, পৌষ-ফাগুনের পালার ভেতর দিয়ে,  কেবল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সংকট ইস নয়,  বা , পরবর্তীকালে,  স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উৎপত্তিগত যে ধরনের লড়াই, তার প্রতি কাকুতি ই কেবলমাত্র  নয়, সামগ্রিক ভাবে গোটা  মানবসমাজের সংকটকে তুলে ধরেছেন, তা অনবদ্য।
                            যে মানব সমাজ, দেশ-কাল-সময়-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা নির্বিশেষে, একটা সার্বিক পরিচয়ে মানুষ বলে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়। যুগের সামনে উপস্থাপিত হয় ।কালের সামনে নিজেদেরকে মেলে ধরে। সেই মানুষকে চেনবার,  জানবার, এক ধরনের আখ্যান সেলিনা হোসেন কৃত, তা শুধু বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রেই একটা অভিনব ধারা, অভিনব চিন্তা এবং সর্বোপরি একটি দার্শনিক মূল্যবোধ স্থাপন করেছে।
                             দেশভাগকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি, সম্প্রীতি বোঝাতে গিয়ে কিছু কিছু সাহিত্যিক এক ধরনের মোটা দাগের আখ্যান উপস্থাপিত করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য যে অসৎ একথা বলা না গেলেও, এটা বলতেই হয় যে সেই সমস্ত মোটাদাগের আখ্যানের ভেতরে সামাজিক ইতিহাসের উপাদান খানিকটা বিকৃতভাবে থাকে।
                                   উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে হয় প্রফুল্ল রায়ের লেখা, 'কেয়াপাতার নৌকা'  উপন্যাসটির কথা। এই উপন্যাসটির পটভূমিকা সুনামগঞ্জ এলাকা। এই এলাকার বর্ধিষ্ণু হিন্দু অভিজাত পরিবারকে কেন্দ্র করে সেখানে বিষয়বস্তু  আবর্তিত হলেও,  সেখানে দেখা যাচ্ছে, এই বর্ধিষ্ণু অভিজাত হিন্দু পরিবার, তাঁদের বাড়ির নিম্নবর্গীয় কামলা কিষাণের আত্মীয়ের সঙ্গে এক পংক্তিতে বসে বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ নৈশভোজ সারছেন।
                      এটি কিন্তু বিভাগপূর্ব বাংলার বিকৃত চিত্র। অভিজাত ও হিন্দুরা যতই পরমতসহিষ্ণু হিসাবে নিজেদেরকে দেখাতে চেষ্টা করুন না কেন, মুসলমানদের প্রতি বা নিম্নবর্গীয়দের প্রতি তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসা ইত্যাদি দেখানোর চেষ্টা করুন না কেন, নিজের বাড়ির মধ্যাহ্নভোজ বা নৈশভোজ, তাঁরা তাঁদের কোনো  নিম্নবর্গীয় কামলা কিষাণের পরিবারের আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে এক পংক্তিতে বসে সারছেন, এটা সম্পূর্ণ অবাস্তব চিত্র ।
                           এই ধরনের বিষয়  সমাজবিজ্ঞানে  একটা আরোপিত সোনালী দিন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও, বাস্তব কিন্তু তা ছিল না কোনো অবস্থাতেই। এই ধরনের উপন্যাস পড়তে ভালো লাগলো, এই ধরনের উপন্যাসের  ভেতর থেকে আমরা কোন সামাজিক ইতিহাসের উপাদান কখনো খুঁজে পাই না। বরংচ, উচ্চবর্ণ অভিজাত ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের শ্রেণীস্বার্থকে সুরক্ষিত রাখবার তাগিদ, তাঁদের প্রতি একটা আনুগত্য এবং তাঁদেরকে 'ভালো'  হিসেবে দেখিয়ে, নিম্নবর্গীয়দের দিকে বা মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের দিকেই এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীর ভেতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় ।

  •                    সেলিনা হোসেন কিন্তু একটি বারের জন্য এই ধরনের বিকৃত, অর্ধসত্য, সামাজিক আখ্যানকে তাঁর একটি লেখার মধ্যেও নিয়ে আসেন নি। 'গায়ত্রী সন্ধ্যা'তে তো আনেনই নি।এমন কি হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতি বোঝাতে গিয়ে কিছু আরোপিত বিষয়বস্তুর সাহায্য গ্রহণ সিরিয়াস সাহিত্যিকদের ভিতরে দেখা যায় না। এটা চতুল সাহিত্যের উদাহরণ হতে পারে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষ, বা হাসান আজিজুল হক, কিংবা সেলিনা হোসেন কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী এঁদের ভিতরে এমন পূরবণতা নেই।
                                    এঁরা কোনো চটুল, বাজারচলতি বিষয়বস্তুকে ঘিরে খুব একটা তাঁদের সৃষ্টিকে পরিচালিত করেন নি। এঁদের ভেতরে  অনুরণিত হয় নি চটুল হয়ে জনপ্রিয় হওয়ার তাগিদ। এই প্রবণতাটা,পরবর্তীকালে যাঁরা আরোপিত এক ধরনের সত্যকে বিশ্বাস করে, এক ধরনের আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে চান, তাঁদের সাহিত্যে খুব বেশি ভাবে ফুটে ওঠে। সেলিনা হোসেন বা তাঁর সমসাময়িক সৃষ্টিশীল মানুষদের মধ্যে কখনোই এই ধরনের বিকৃত কোন দৃষ্টিভঙ্গিকে দৃষ্টিভঙ্গির দেখা যায় না।
                              নিজের সমাজ বা নিজের পরিপ্রেক্ষিতকে, অহেতুক আলোকিত করার একটা প্রবনতা, যে প্রবনতার মধ্য দিয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করতে পারা যায়, কিন্তু তার ভিতরে কোন অবস্থাতেই ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে না।দেশকালের প্রতি তো নয়ই। সমাজ-সংস্কৃতি, সামাজিক প্রেক্ষিতের কোন অংশের প্রতি কোন রকম দায়বদ্ধতা পরিচয় ফুটে ওঠে না। তেমনটা কিন্তু দেখতে পাওয়া যায় না সেলিনা হোসেন বা ইমদাদুল হক মিলনদের ভিতরে।
                    এই দিক থেকে বিচার করে বলতে হয় 'গায়ত্রী সন্ধ্যা' র সামগ্রিক পটভূমি তে সেলিনা হোসেন যেভাবে,  বিভাগ উত্তর, দুই বঙ্গের অর্থ-সামাজিক অবস্থার একেবারে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন, সাহিত্যের সুষমাকে এতোটুকু বিনষ্ট না করে, তা এককথায় অনন্যতার দাবি রাখে।
                                    সেলিনা হোসেন প্রত্যক্ষভাবে দেশভাগের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কোন পরিবারের সন্তান নন। কিন্তু দেশভাগ যে সার্বিকভাবে কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার মতো বিষয়  নয়, দেশভাগ যে একটা সভ্যতা কে ,একটা সংস্কৃতিকে, গোটা সামাজিক পরিমণ্ডল কে  তার শিকড়  থেকে উপড়ে ফেলে দেওয়া, এটা শৈশব-কৈশোরের পটভূমিকায় সেলিনা হোসেন যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন,  সেই উপলব্ধি উপস্থাপিত করেছেন এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রতে,  প্রতিটি প্রেক্ষিতে,  প্রতিটি ঘনঘটায়, প্রবাহমান দৃশ্যাবলীতে তা অভিনবত্বের দাবি রাখে।
                           এই দৃশ্যগুলি কখনো আমাদের কোন চরিত্রের প্রতি একটু পক্ষপাতী করে তোলে। কখনো বা করে তোলে বিরক্ত। কখনো বা করে তোলে প্রেমে আপ্লুত। কিন্তু সেই প্রেম,  বহু বাজার চলতি লেখকের  মত নিছক দেহজ প্রেম নয়। কারণ  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর 'পূর্ব-পশ্চিম' বা 'প্রথম আলো'র মতো উপন্যাসে ঐতিহাসিক ভূমিকাকে মুখ্য বিষয় হিশেবে রাখা আখ্যানেও প্রেমকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেহজ উপাদান কে, সাহিত্যের উপাদানকে  ছাপিয়ে বড় করে ফেলেছেন।
                   এটা মনে হয় তিনি  পাঠকদের একটা অংশকে মনে রেখে করেছেন।  বিশেষ করে সেই  পাঠকের কথা মনে রেখে, যাঁরা বাজারচলতি কিছু উপাদানে প্রধান বিনোদন বলে মনে করেন। এভাবেই সুনীলেরা কিছু উপাদান  সেখানে দেওয়ার একটা জোরদার তাগিদ দেখিয়েছেন। এভাবেই এক ধরনের যৌনতা, বিশেষ করে অবৈধ যৌন যৌনতাকে, সেখানে বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছেন সুনীল।
                            সেলিনা হোসেন কিন্তু 'গায়ত্রী সন্ধ্যা' থেকে শুরু করে , তাঁর কোন সাহিত্যেই,  কোন অবস্থাতেই অনাবশ্যক যৌনতাকে এনে, তাঁর সাহিত্যকে,  তাঁর সৃষ্টিকে বাজারচলতি করতে চান নি। এটিও কিন্তু সেলিনা হোসেনের একটি অত্যন্ত বড় বৈশিষ্ট্য। সেলিনা হোসেন কিন্তু অত্যন্ত গভীর মমতায় উপলব্ধি করেছেন,  ছিন্নমূল মানুষ,  যখন নতুন মাটিতে, আবার চেষ্টা করে  শেকড় বিস্তারের, সেই মাটির উপাদান জনিত নানা ধরনের প্রেক্ষিত থেকেষ শেষে গ্রহণ করবার ক্ষেত্রে কতখানি সুবিচার পায় --  এই প্রেক্ষাপট সেলিনার 'গায়ত্রী সন্ধ্যা' অন্যতম প্রধান উপজীব্য।
                       এইরকম প্রেক্ষাপট কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সেভাবে আগে  আসে নি। বাংলা সাহিত্যে সেভাবে এই ধরনের প্রেক্ষাপটকে ঘিরে আলাপ আলোচনাও হয় নি ।সেলিনা হোসেন কিন্তু একটি বারের জন্য তাঁর সমস্ত ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস গুলি, যেমন, ধরা যাক 'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড' থেকে শুরু করে 'যাপিত জীবন'  বা 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি'  কিংবা 'কাঁটাতারে প্রজাপতি',  ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে লেখা এই সমস্ত উপন্যাসগুলির ভেতরে, কখনো কখনো প্রেক্ষিত, কখনো অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে এমন ভাবে উপস্থাপিত করেছেন, যা অচিরেই হয়ে উঠেছে কালোত্তীর্ণ ইতিহাস নির্ভর, ইতিহাস আশ্রিত, ইতিহাসকে বুকের গহীনে যাপন করা একটি কথাসাহিত্য। কিন্তু সেইসব ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে, সমাজবিজ্ঞানকে ইতিহাসের গহীনে উপস্থাপিত করার ক্ষেত্রে, সেলিনা হোসেন  যেভাবে ক্ষেত্রসমীক্ষা কে একটা বিশেষ মর্যাদায় উপনীত করেছেন, সেই প্রেক্ষিতে, তাঁর এই ধরনের উপন্যাস এবং উপন্যাসের ক্ষেত্র নির্মাণ জনিত পরিশ্রমের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, একমাত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে।
                           তাঁর সমসাময়িক কালে এইরকম পরিশ্রমসাধ্য উপন্যাস লেখার ভাবনাচিন্তা একমাত্র ইলিয়াস করেছিলেন। সেই ক্ষেত্রসমীক্ষার অনবদ্য ফসল আমরা দেখতে পাই ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' ভেতরে। সেখানে নিজের বোধ জনিত সমস্ত ধরনের প্রেক্ষিতের সঙ্গে, সময়-পটভূমিকা-রাজনীতি এবং নানা ধরনের কল্পকাহিনী, সেই কল্পকাহিনীর ভেতর থেকে উঠে আসা ইতিহাস এগুলিকে, ইলিয়াস যে ভাবে উপস্থাপিত করেছিলেন তাঁর 'খোয়াবনামা'  উপন্যাসের তেমনটাই যেন আমরা সেলিনা হোসেনের মধ্যেও ।
                      একই ধরনের একটা সাযুজ্য, যে সাযুজ্য কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সাম্প্রতিককালের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত অভিনব, সেটা দেখতে পাই এই দুজনের ভিতরে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হট গুলিতে একটা সময়ে নানা ধরনের চটি পুস্তিকা বিক্রি হতো। আমাদের এপার বাংলার প্রেক্ষিতে যেগুলিকে 'বটতলার বই' বলা হয়, সেই ধরনের বই বিক্রি হতো। সেই ধরনের হাজারো পুস্তিকার ভেতরে একটি ছিল, স্বপ্ন বৃত্তান্তের নানা ব্যাখ্যা। এই ধরণের খাবনামা বা খোয়াবনামা থেকে কিন্তু ইলিয়াসের  মধ্যে, সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ থেকে শুরু করে পোড়াদহ  মেলা, সমাজ সংস্কৃতি এবং সেই সমাজ-সংস্কৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে আর্থিকভাবে নিম্নবর্গীয় অংশের যে ধরনের একটা সাধারণ  সমস্যা,  তার প্রতি দৃষ্টিপাত। তার প্রেক্ষিতের  সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িক দেশভাগজনিত নানা ধরনের ঘটনা। মুসলীম লীগ রাজনীতির নানা ধরনের ওঠা পড়া। হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির নানা ধরনের কালবিলম্ব -- এই সমস্ত খোয়াবনামা উপন্যাসের প্রেক্ষিত রচনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।
                             ব্যক্তিগত অধ্যায়নের সাথে সাথে ইলিয়াসের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ক্ষেত্রসমীক্ষা। যে কারণে এই উপন্যাসটি রচনা করতে 'চিলেকোঠার সেপাই' এর পর ইলিয়াসের প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। এই এক দশক সময়কাল ধরে বলা যেতে পারে ইলিয়াস ক্ষেত্রসমীক্ষা এবং ব্যক্তিগত অধ্যায়নের নিবদ্ধ  থেকেছেন।
                           'খোয়াবনামা'-র  রচনার প্রেক্ষিতে  এমনটাই কিন্তু আমরা সেলিনা হোসেনের 'গায়ত্রী সন্ধ্যা' জনিত গবেষণা এবং সেই সময় কালকে ঘিরে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষেত্র সমীক্ষার প্রেক্ষিতকে খুব সহজেই উপস্থাপিত করতে পারি। কারণ সেলিনা হোসেন কিন্তু ক্ষেত্রসমীক্ষা ব্যতীত কোন ইতিহাস নির্ভর ব্যক্তি চরিত্র,  সময়,  সমাজকে  কখনো উপস্থাপিত করেন না। সেই কারণেই সেলিনা হোসেনের প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে একটা নির্ভরতা কাজ করে। নিষ্ঠুর  বাস্তবতাও কাজ করে। যে  বাস্তবতার পরোতে পরোতে,  সময়ের বিবর্তন কালের বিবর্তন, অর্থনীতি-রাজনীতি , সমস্ত কিছু টানাপোড়েনের এক ধরনের বিনি সুতোয় গাঁথা মালা আমরা দেখতে পাই।
                         এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে;  নয়ের দশকের শেষ দিকে,  কোন একটি সময় ঢাকা শহরে বসে সুনীল গাঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আড্ডার একটি প্রেক্ষিত। ঘটনাটি এমনই ;  যেদিনের আড্ডার কথা বলা হচ্ছে,  সেই দিন সকাল বেলায়, বর্তমান নিবন্ধকার, ঢাকা শহরের মগবাজারের এলিফ্যান্ট রোডে, শহিদ জননী জাহানারা ইমামের শূন্য 'কাকলি' ঘুরে এসেছেন। বিকেলবেলা একটি আড্ডায় সুনীলের সঙ্গে সেই বিষয়ে কথোপকথনের সময়, সুনীল  বললেন;  হ্যাঁ, আমি একবার গিয়েছিলাম বটে ওঁর বাড়িতে, উনি মারা যাওয়ার অনেককাল পরে।
                 সেই সুনীলই  কিন্তু জাহানারা ইমামকে, তাঁর একাত্তরের লড়াইকে, এপারের বাজারচলতি পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় করেছেন নিজের 'পূর্ব পশ্চিম'ষ উপন্যাসে। এই সুনীল কিন্তু এ বাড়ি ও বাড়ি যাওয়ার মতো বাংলাদেশে যেতেন। বাংলাদেশের ঘূর্ণায়মান রাজনৈতিক নানা প্রেক্ষিত কিন্তু সুনীলকে কখনো বাংলাদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ফেলেনি।
                        সেই সুনীল কিন্তু জাহানারা ইমামকে ঘিরে তাঁর উপন্যাসের প্রেক্ষাপট রচনা র সময় একটি বারের জন্য জাহানারা ইমামের বাসস্থান 'কাকলি' যেখান থেকেই জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি নামক মুক্তিযুদ্ধের টেস্টামেন্টের যাবতীয় প্রেক্ষিত, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক পটভূমিকা, হানাদার পাক বাহিনীর বীভৎসতা -- এই সমস্ত হয়েছে, সেটা দেখবার কখনো আগ্রহ অনুভব করেননি। সুনীল নিজের অনুকরণীয় লেখনীর মাধ্যমে  জাহানারা ইমামের চরিত্রটিকে বাজার চলতি পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই 'কাকলি'  বাড়ির পরোতে পরোতে জাহানারা ইমামের স্মৃতি,  জাহানারা ইমামের প্রতিদিনের সংগ্রাম,  এবং ব্যক্তি জাহানারা ইমাম জীবিত থাকাকালীন তাঁর ভেতরে যে উত্তাপ,  সেই উত্তাপ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা কখনো অনুভব করেন নি। তাই জাহানারা ইমামের মত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব কে যাঁরা খুব কাছ থেকে দেখবার, চেনবার, বোঝবার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁদের কাছে কিন্তু সুনীলের 'পূর্ব-পশ্চিম' উপন্যাসে জাহানারা ইমামকে যে ভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে,  মাঝে মাঝে সেই উপস্থাপনার মধ্যে একটা আরোপিত,  মেকি কর্মকাণ্ডের আভাস ফুটে ওঠে।
                        এমনটা কিন্তু সেলিনা হোসেনের একটি চরিত্রের মধ্যে কখনো দেখতে পাওয়া যায় নি। 'গায়ত্রী সন্ধ্যা'-র প্রেক্ষিতে সেলিনা হোসেনের মননের পটভূমি  কিন্তু আলগা নয়। সেই  সেলিনা হোসেনই যখন যখন 'কাঁটাতারে প্রজাপতি' লিখছেন, যেখানে ইলা মিত্র কে ঘিরে সমস্ত কর্মকাণ্ড বর্ণিত হচ্ছে সেখানে একটি বারের জন্য আমাদের ইলা মিত্রকে অনুপস্থিত বলে মনে হয় নি। একটিবারের জন্য সেই উপন্যাসের চরিত্রগুলির ভেতর দিয়ে আমরা, সেই চরিত্রগুলির রক্তমাংসের শরীরটাকে স্পর্শ করতে পারছি না, এমনটা কিন্তু মনে হয়নি। যেটা কিন্তু সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ মজুমদারদের অনেক সৃষ্টি এবং সৃষ্ট  চরিত্র গুলির মধ্যে আমরা খুব বেশি ভাবে দেখতে পাই।
                     এক ধরনের আরোপিত বিষয়বস্তুর বিষয়বস্তুর কথা এখানে প্রফুল্ল রায়ের 'কেয়াপাতার নৌকা'-কে ঘিরে উল্লেখ করা হয়েছে। 'হেম কর্তা' নামক চরিত্রটির ভেতর দিয়ে যে আরোপিত, ভালো মানুষের পটভূমিকা প্রফুল্ল রায় উপস্থাপিত করেছেন, সেই উপস্থাপনার ভেতরে কিন্তু ইতিহাসের উপাদান প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ;  জাতপাতের আঘাতে বিদীর্ণ পূর্ববঙ্গের, অভিজাত হিন্দুসমাজ কোন  বীভৎস জায়গায় নিজেদেরকে উপস্থাপিত করেছিল, কি ভয়ংকর অত্যাচার তারা মুসলমান এবং নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের উপরে একই সঙ্গে, ধারাবাহিকভাবে, যুগের পর যুগ ধরে চালিয়ে এসেছিল, তার ইতিহাস আমাদের কারো অজানা নয়।
                        সেই জায়গা থেকে কিন্তু সেলিনা হোসেনের  চরিত্র গুলিকে একটু গভীরভাবে যদি পাঠক অনুধাবন করেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, আরোপিত চরিত্রের অবাস্তব স্বপ্ন  সেলিনা দেখান নি কখনো। এক ধরনের বিষয়বস্তুকে এইরকম কোনভাবেই কিন্তু সেলিনা হোসেন তার একটি চরিত্রকে উপস্থাপিত করেন না। সেলিনা হোসেনের লেখার ভিতর দিয়ে যেমন আমরা ইলা মিত্রকে ছুঁতে পারি, তেমনি ই  তাঁর কিন্তু 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি'  তে সেই প্রান্তিক, মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের মানুষ, সিলেট, চিটাগাং, কক্সবাজার - এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলি কে আমরা খুব বিশেষভাবে ছুঁতে পারি।
                         এই প্রসঙ্গে সেলিনা হোসেনের 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি' উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের অনবদ্য কথাসাহিত্যে হরিশংকর জলদাসের 'জলপুত্র' নামক উপন্যাসটি। নদী, নদীকে কেন্দ্র করে জীবন-জীবিকা সম্পাদন করা মানুষ,  মূলত মৎস্য জীবী সম্প্রদায়ের যে অংশটি, তাঁদের যে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক যন্ত্রণা এবং বৈশিষ্ট্য গুলিকে অদ্বৈত মল্লবর্মণ যেভাবে ধরেছিলেন 'তিতাস একটি নদীর নাম'-এ, যেভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়  'পদ্মানদীর মাঝি'-তে ধরেছেন, একদম এপার বাংলার পটভূমিকায় সমরেশ বসু ধরেছিলেন তাঁর 'গঙ্গা'  উপন্যাসের ভেতর দিয়ে, সেই রকমই একটি আঙ্গিক,  সেই রকমই একটি পর্যায়ক্রম,  কিন্তু সেলিনা হোসেন রচনা করেছেন তাঁর 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি'  উপন্যাসের ভেতর দিয়ে ।
                     সেলিনা হোসেনের উপলব্ধির মতোই এক ধরনের অনুরণন আমরা পাই হরিশংকরের সৃষ্টির ভেতর দিয়েও। এইভাবে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পটভূমি কে যে ধরনের সাবালকত্বের মধ্যে সেলিনা হোসেন উপস্থাপিত করেছেন, যে সাবালকত্ব কখনো আরোপিত নয়, যে সাবালকত্বের ভেতরে ইতিহাস-সমাজতত্ত্ব-অর্থনীতি এবং রাজনীতির একটা নির্মোহ দৃষ্টি  আছে। যেখানে নেই কোন ধরনের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের এতোটুকু ইন্ধন। উস্কানি। নেই কোনরকম বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে, সেই সম্প্রদায়ের প্রতি অত্যাধিক পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে, সেই সম্প্রদায়কে এক ধরনের নায়ক বা দেবত্বে উন্নীত করার কৌশল ।
                           এই বৈশিষ্ট্যগুলির জন্যই কাজী আবদুল ওদুদের 'নদী বক্ষে' থেকে শুরু করে শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সারেং বউ' কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস গুলির ভেতর দিয়ে  আমাদের চেতনার  জীবন্ত হয়ে আছে। সেভাবেই সব সময় আমাদের প্রতিটি বাস্তবতার ভিত্তিতে, সময়কে বিচার করার প্রেক্ষিতে,  সেলিনা হোসেনের সৃষ্টি যেন হলেন এক অত্যন্ত নির্ভুল দাঁড়িপাল্লা।

  • বিভাগ : অপার বাংলা | ১৪ জুন ২০২১ | ৫৪৭ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন