• হরিদাস পাল  অপার বাংলা

  • চিত্তপ্রসাদের চোখে তেতাল্লিশের মন্বন্তরে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা

    gautam roy লেখকের গ্রাহক হোন
    অপার বাংলা | ২১ জুন ২০২১ | ৬৯৬ বার পঠিত
  • তেতাল্লিশের মন্বন্তর শিল্পী চিত্তপ্রসাদের (জন্ম ১৯১৫ সালের ২১ শে জুন নৈহাটিতে, মৃত্যু ১৯৭৪ সালের ১৩শে নভেম্বর) শিল্প সৃষ্টিকে যেমন সমাজ মনস্কতার এক চরম কেন্দ্রবিন্দুতে উপনীত করেছিল, তেমনি মন্বন্তরের সময় কালে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে দুর্ভিক্ষের কড়াল চিত্রের বাস্তব ছবি দেখার যে বিবরণ তিনি রেখে গেছেন, তার ভিতর দিয়ে মানুষের তৈরি এই ভয়াবহকতাকে ঘিরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নক্কারজনক ভূমিকার এক জান্তব ছবি ফুটে ওঠে। পল গ্রিনো থেকে এমা রথচাইল্ড দুর্ভিক্ষের ইতিহাস রচনায় যাঁরা আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত, তাঁদের ইতিহাসমনষ্কতাকে ও ছাপিয়ে যায় শিল্পী চিত্তপ্রসাদের দুর্ভিক্ষের কালে দেখা গ্রামবাংলায় ত্রাণ বন্টন এবং কালোবাজারিদের সঙ্গে বোঝাপড়ার সম্পর্ক ঘিরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা।

    ১৯৪৩ সালের নভেম্বর মাসে চিত্ত প্রসাদ মেদিনীপুর জেলা সফর করেছিলেন। সেই সফরের বিবরণীতে তিনি লিখছেন "আধঘন্টা খোঁজাখুঁজির পর সেই ঠিকানাতে পৌঁছলাম। এটি আগে কংগ্রেসের অফিস ছিল। এখন হিন্দু মহাসভার কেন্দ্র। দরজায় মহাসভার নারীসমিতি ওইরকম কিছু একটা সাইনবোর্ড ঝুলছিল। অনেকক্ষণ ধরে দরজায় ধাক্কা দিয়েও কোন উত্তর না পেয়ে আমরা সোজা ভেতরে চলে এলাম। গিয়ে দেখি আহাররত এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক (তারাপদর কাছে জানতে পারি ভদ্রলোক আগে কংগ্রেসি ছিলেন -- কিন্তু এখন মহাসভাপন্থী হয়ে গেছেন)।"

    বিবরণের এই সূচনাপর্বেই আমরা বুঝতে পারি, সেই সময়ের কংগ্রেসী এবং হিন্দুমহাসভাপন্থী রাজনীতির চাপান-উতোর এবং তাকে ঘিরে কুখ্যাত তেতাল্লিশের মন্বন্তরের আবর্তনের প্রাথমিক চিত্রটি। এই বিবরণীতেই চিত্তপ্রসাদ লিখছেন, "মেদিনীপুর শহরে সমস্ত পার্টি ও ত্রাণ কর্মীরা বঙ্গীয় ত্রাণ সমিতির তলায় ঐক্যবদ্ধ হলেও নভেম্বরে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ যে সস্তা চাল (সাড়ে পাঁচ টাকা দরে) পাঠিয়ে ছিলেন, তা পাঠানো হয়েছিল গিরিশ দাস নামক জনৈক মহাসভাপন্থী ব্যবসায়ীকে এবং ত্রাণ সমিতিকে নয়"।

    কাঁথিতে অবশ্য বঙ্গীয় ত্রাণ সমিতি শ্যামাপ্রসাদের কাছ থেকে সস্তা চাল ও অন্য কিছু সামগ্রী সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছিল। সমিতির সভাপতিদের সংখ্যা ও প্রভাবের জন্যই হয়তো তা সম্ভব হয়েছিল। তমলুক সাব ডিভিশনের ত্রাণ সমিতিটিও গড়া হয়েছিল সর্বদলীয় প্রতিনিধি নিয়ে। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ এখানে কোন সাহায্যই পাঠায় নি। যত কিছু পাঠিয়ে ছিলেন সে সবই আর্য সমাজের মহেন্দ্র সংঘের কাছে। প্রথমটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক গোষ্ঠী। দ্বিতীয়টির উপর কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রণের কথা আর অপ্রকাশিত ছিল না। 'ক্ষুধার্ত বাংলা'-য় মন্বন্তর কালীন মেদিনীপুর শহরে শ্যামাপ্রসাদের যে ভূমিকার কথা জানা যায়, সেটিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি অত্যন্ত কৌশলে সেই ভূমিকাকে আড়াল করে রাখতে চায়।

    অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা পিপলস ওয়ারে তেতাল্লিশের মন্বন্তর সম্পর্কে চিত্তপ্রসাদ একাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেরকমই একটি প্রবন্ধে তিনি শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে লিখছেন, "গত দুই বছরে কোন বাঙালি যদি ন্যাশনাল ফিগার হিসেবে উঠে এসে থাকেন তাহলে তিনি হলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। হবে নাই বা কেন? তিনি হলেন আশুতোষ মুখার্জির ছেলে। যে আশুতোষ আধুনিক বাংলার অন্যতম স্থপতি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে গভর্নর এর সাথে টক্কর দিয়েছিলেন।"

    ১৯৪৩ সালে বাংলার আমেরির শাসনের প্রতিবাদে পদত্যাগ করে শ্যামাপ্রসাদ রাতারাতি ন্যাশনাল ফিগার হয়ে যান। বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় গভর্নরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ ছিল তাঁরই। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর বেঙ্গল রিলিফ কমিটিতে লাখ লাখ টাকা এসেছিল। বাংলা বাঁচাতে যাঁকে লক্ষ লক্ষ টাকা দেয়া হলো, সেই লোকটি তাঁর নিজের গ্রামে জীবন শাখা জ্বালিয়ে রাখতে কি কি করেছিলেন আপনারা নিশ্চয়ই সে কথা জানতে চাইবেন। অত্যন্ত শ্লেষের ভিতর দিয়ে শিল্পী চিত্তপ্রসাদ বাংলার দুর্ভিক্ষ ঘিরে শ্যামাপ্রসাদের লক্ষ লক্ষ টাকা ত্রাণ সংগ্রহ এবং তাঁর পৈত্রিক গ্রাম জিরাটের সেই সময়ের পরিস্থিতির কথা লিখেছেন।

    চিত্তপ্রসাদ জিরাট পৌঁছানোর স্মৃতিচারণ করে লিখছেন:
    "আমি ধান ভরা মাঠের উচ্ছ্বাস দেখতে পেলাম না। কেবল পতিত জমি। রোদে পোড়া ফাটল ধরছে ইতিউতি। উঁকি মারছে ঘাস আগাছা। এখানে ওখানে কিছু পাট চাষ করেছে সম্পন্ন কৃষকেরা। কিন্তু এবারে বর্ষা দেরিতে এসেছে বলে সেগুলো ঝলসে গেছে রোদে। তাঁরাও (গ্রামের লোক) আমাকে এটাও বললো যে, বিলম্ব বর্ষণের কারনে আলু পিঁয়াজ ইত্যাদি নষ্ট হয়ে গেছে। কলকাতার বাজারের জন্য এসব চাষ করেছিলেন তাঁরা। আমগাছগুলি কে বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে নি। সে কারণে বলাগরের ২৫ শতাংশ পরিবার বেঁচে আছে আমের আঁটি খেয়ে। আম খাবার জিনিস। কিন্তু শুধুমাত্র আম তো মানুষের খাদ্য নয়। ফলে তো যেখানেই যাই দেখি কলেরা, ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত, চর্মরোগ ছেয়ে গেছে। রাজপুর গ্রামে যেমন বাহান্নটা পরিবারের মধ্যে মাত্র ছয়টি পরিবার টিঁকে আছে। তাঁরাও ধুঁকছে ম্যালেরিয়ায় আর অন্ন বস্ত্রের নিদারুণ অভাবে। যতগুলি গ্রামে গেলাম প্রতিটি থেকে এক অবস্থা দেখলাম। নিজের বাড়ির পাশের এই গ্রামগুলিকে সাহায্য করার জন্য শ্যামাপ্রসাদ কি কি করেছেন আমি এদিকে ওদিকে কিছু লোকজন কে জিজ্ঞাসা করি। সত্যি কথা বলতে গ্রামগুলিতে তাঁর সম্পর্কে কাউকে একটি ভালো কথা বলতে শুনলাম না।"

    এই ঘটনার আরো গভীরে পৌঁছে চিত্তপ্রসাদ দেখিয়েছেন কিভাবে সরকারের তরফ থেকে লোপসি খাওয়ানোর জন্যে লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। তিনি লিখছেন, "দুমাস ধরে ৪০০ জনকে দুবেলা খাওয়ানো হয়েছিল সেই সব লোপসি, স্থানীয় মানুষজন বললেন সেসব কথা।"

    চিত্তপ্রসাদ লিখেছেন, কিভাবে সরকার কোনো কোনো গ্রামের কিছু পরিবারকে কিছু সাহায্য করেছিল। তিনি লিখছেন, "পনেরো আনা ও মাথাপিছু দুমুঠো চাল ছেড়ে দিয়েছিল সে সব বললেন সেখানকার মানুষেরা। তারপর ইউনিয়ন বোর্ডের তরফ থেকে পুরুষদের ১৪ পয়সা করে মহিলাদের ১০ পয়সা করে ও শিশুদের ৫ পয়সা করে দেয়া হয়। স্টুডেন্ট ফেডারেশন ও মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ সম্পর্কে অনেক কথা বলেন তাঁরা। বন্যার ঠিক পরেই ওরা জামাকাপড়, ১২ মণ শষ্যবীজ, প্রচুর তরিতরকারি দিয়েছিল। কোন কোন গ্রামে পরিবারপিছু ৫ টাকা করে দিয়েছিল।কমিউনিস্ট পার্টিও দুবার মাথাপিছু এক পোয়া করে চাল ও এক কোয়া করে আটা দিয়েছিল। 'ডুমুরদহ উত্তম আশ্রম' বাড়ি বাড়ি ২ টাকা দেয় এবং আট সের করে আটা কন্ট্রোল রেটে দিয়েছে তিন মাস। এক কথায় সকলেই কিছু না কিছু সাহায্যের চেষ্টা করেছে কেবলমাত্র জেলার সবচেয়ে বিশাল ব্যক্তিটি ও সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন টির ডক্টর মুখার্জি ও তার হিন্দুমহাসভা ছাড়া।"

    চিত্তপ্রসাদ লিখছেন, "শ্রীকান্ত গ্রামের এক গণ্যমান্য ব্যক্তির কাছে আমি সরাসরি প্রশ্নটা করে বসলাম, তাঁদের জন্য 'বেঙ্গল রিলিফ কমিটি' কি কি করেছে? তিনি বেঙ্গল রিলিফ কমিটি বা শ্যামাপ্রসাদের নাম শোনেন নি, কিন্তু আশুতোষের নাম বলতে সাথে সাথে বুঝলেন। ওঁদের কাছ থেকে আমরা কিছু পাই নি - জানালেন তিনি।


  • তারপর জিরাট পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত আমি আর শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে কারো সাথে কোন কথা বলি নি। কিন্তু যতই আমি এগোতে থাকলাম ততো বেশি করে জিরাট লাগোয়া এই গ্রামগুলির অবস্থা আমি বুঝতে পারছিলাম। এক কথায় বললে একটা গ্রামের স্বাভাবিক নেতাটিই যদি বিপদের দিনে পালিয়ে যায়, তাহলে গ্রামের কি অবস্থা হতে পারে তা দেখলাম আমি। শ্যামাপ্রসাদ ওঁদের কোনো সাহায্য করেন নি এবং ওই এলাকায় আর কোনো ক্ষমতাশালী লোক ছিল না যে তাদের সাহায্য করতে পারে। ফলত খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধপত্র ইত্যাদি যেটুকু সাহায্যের বাইরে সাহায্য বাইরে থেকে এসে পৌঁছেছিল, তার বেশিলভাগটাই চোর ছ্যাঁচড়ে লোপাট করে দেয়।

    আরও উদাহরণ এরকম এক ব্যক্তির কাছ থেকে শুনেছিলাম। তিতিবিরক্ত হয়েছিল লোকটা সত্যিই। বলেছিলেন উনি, "একটা গলাকাটা ইউনিয়ন বোর্ডের ত্রাণকার্যে দায়িত্বে আছেন। তিনি তার নিজের লোকজনকে সপ্তাহে দেড় সের করে খাদ্য দিচ্ছিলেন। কিন্তু কদমদাঙা গাঁয়ের কৃষাণেরা যখন তার কাছে সাহায্যের আশায় গেলেন, তখন তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে, এমনি এমনি তো আর চাল পাওয়া যায় না। আমার জমিতে বিনা পয়সায় কাজ করে দাও। আমি কন্ট্রোলে বাড়িতে চাল পৌঁছে দেব।" সারা গ্রাম তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। কিন্তু তবু ইউনিয়ন বোর্ড এই লোকটাকেই ১৫টা থান কাপড় দিল ৮৩ টা পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দিতে। সে যথারীতি আগের মতই করল, গ্রামবাসীদের সে খালি হাতে ফিরিয়ে দিল। আর কাপড়ের পুরোটাই নিজের স্বজনদের মধ্যে উপহার হিসেবে বিলিয়ে দিল।

    এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই শ্যামাপ্রসাদের নিজের গ্রামে গিয়ে হাজির হলেন চিত্ত প্রসাদ। চিত্তপ্রসাদ লিখছেন, "আশুতোষের একজন দূর সম্পর্কের আত্মীয়, কোন এক গোস্বামী, প্রাচীন বাড়িটিকে 'আশুতোষ স্মৃতি' নামকরণ করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বাংলার গর্বিত স্থপতি, যিনি একজন বিরাট মাপের মানুষ ছিলেন এবং বৃহৎ পরিকল্পনা নির্মাণের কাজ করতেন, সেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ভেঙে পড়া ধসে যাওয়া বিষন্ন এক স্মারকগৃহ দেখতে পেলাম আমি। আমি যে স্কেচটি করেছি তা থেকেই আপনারা বুঝতে পারবেন যে, ক্লাসিক ডিজাইনের সুদৃঢ় থাম দিয়ে গঠিত সেই প্রাসাদ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে। সরাসরি অর্ধেক খসে গেছে। বাকি অর্ধেকের ইট বেরিয়ে আসছে, খুলে খুলে পড়ছে। শ্যাওলা আর বুনো ঝোপ ঝাড়ে জানলাগুলো ঢেকে দিয়েছে। আর ফাটলে গজিয়ে ওঠা আগাছা থামগুলির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ফাটিয়ে দিয়েছে।"

    চিত্তপ্রসাদ লিখছেন, "বলাগরের গ্রামগুলিতে এক নতুন হাটের গল্প। জিরাটে এই নতুন হাটের পত্তন করেছেন শ্যামাপ্রসাদ, মহা ধুমধামে অনুষ্ঠান করে, দুর্ভিক্ষের এক বছরে মোট দুবার তিনি যে গ্রামে এসেছিলেন। সব সদাশয় ব্যক্তিই ওই হাটটাকে অভিসম্পাত দেয়। কারন, সিজেই গ্রামে বহুদিন ধরে একটি চালু হাট ছিল। জিরাট থেকে দূর নয়। একটা হাটই যথেষ্ট। বিপদের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে গ্রামবাসীদের ঠকিয়ে মুনাফা না করে, যাতে ন্যায্যমূল্যে জিনিস পায় গ্রামের মানুষ, তার ব্যবস্থা করার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে শ্যামাপ্রসাদ আরেকটি হাট প্রতিষ্ঠা করলেন এবং সিজেই হাট যেদিন করে বসে সেই বুধবার করে নতুন হাট বসার ব্যবস্থা করলেন। বলাই বাহুল্য যে সিজেইয়ের হাটকে ভাঙার জন্যই এই ব্যবস্থা - প্রায় সমস্ত গ্রামবাসী তাই মনে করে।"

    এরপর চিত্তপ্রসাদ খুব খোলামেলাভাবেই হিন্দু মহাসভার তেতাল্লিশের মন্বন্তর ত্রাণ বন্টন সম্পর্কে লিখেছেন।
    "শ্যামাপ্রসাদের বসানো হাটে প্রকাশ্য দিবালোকে মুনাফালোভী কারবার দেখে জিরাটের হিন্দু মহাসভার ত্রাণকার্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল না। কিন্তু তবু আমি আরো খোঁজ খবর নিলাম।কারণ, জিরাটই ছিল একমাত্র গ্রাম, যেখানে মানুষ শ্যামাপ্রসাদের ত্রাণকার্য সম্পর্কে কিছু কথা শুনেছে। এই ত্রাণকার্যকেও আমি এই হাটের মতই এক মুনাফাচক্র হিসেবে আবিষ্কার করলাম, অথবা ঠিক এই দাতব্য চিকিৎসালয়ের মতো। চারটি ত্রাণ কেন্দ্র থেকে সপ্তাহে একদিন মোট যতদূর বুঝলাম ২৮ সের আটা এবং ২৮ সের চাল বিতরণ করত হিন্দু মহাসভা। এছাড়া শ্যামাপ্রসাদের দুই (সম্পর্কিত) ভাই একটি দোকান খুলে বসেন। সেখানে বাজার দরের অর্ধেক দামে চাল বিক্রি করে। কিন্তু তাতে কারো উপকার হয়নি। কারন, তখন বাজার দর ছিল ৪০ টাকা মণ। সেই কারনে গাঁয়ের গরিব কৃষক ও মৎস্যজীবীরা আমাকে বলে যে সব দানই তো বাবুদের জন্য। কুড়ি টাকা মন করে ধান কেনা ওই গুটিকয় লোক ছাড়া বাকিদের কাছে অনেক মহার্ঘ।
    মোটামুটি এগুলোই আমি জানলাম জিরাটের শ্যামাপ্রসাদের বাড়ির গ্রামে। আমি বাংলার অনেক গ্রামে গেছি। যে সব গ্রাম আমাদের অনেক মনীষীদের জন্ম স্থান। কিন্তু ধনীদের বিরুদ্ধে, বিশেষত গ্রামের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এমন তিক্ত ঘৃণা আমি আর কোথাও দেখিনি।"

    চিত্তপ্রসাদ লিখছেন, "আমার ফিরতি পথে আমি আরও এমন কিছু পেলাম যার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। মনে হল মধ্যবিত্ত যুবদের এক পুরো প্রজন্ম বেহায়ার মত মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে তাদের লিডার ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মহিমা কীর্তনে। বলাগড়, জিরাটের সবাই আমাকে বলেছে যে গত দু'বছরে শ্যামাপ্রসাদ দু'বারের বেশি বলাগড়ে আসেন নি। একবার দুর্ভিক্ষের সময় আর একবার হাট বসাতে তিনি এসেছিলেন। তথাপি পাশের কাসালপুর বলে একটি গ্রামের এক ডাক্তার আমাকে বলল যে, শ্যামাপ্রসাদ কোলকাতা থেকে যাওয়া আসা করতেই আছেন। গত দুই মাসে চারবার এসেছে। মানুষটা তাঁর গ্রামকে ভালোবাসে।
    বিমলেন্দু গোস্বামী যিনি জিরাট রিলিফ ক্যাম্পে ময়দা বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করেন, আমাকে বললেন যে, তিনি কেবল রবিবার করে রিলিফের মাল দেন। অথচ হাই স্কুলের ছাত্র, যে কিনা হিন্দু মহাসভা নিয়ে গর্বিত, আমাকে বলল যে, রিলিফ ক্যাম্পে ১০০ থেকে ১৫০ জনের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য প্রতিদিন প্রতিদিন ২৪ জন স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে।"

    এরপর চিত্তপ্রসাদ এর কলম ঝলসে ওঠে, "ধনীরা এভাবে নিজেদেরকে জিরাটে ঘৃণার বস্তুতে পরিণত করেছে এবং অন্য যে কারো থেকে শ্যামাপ্রসাদকে ভয় ও ঘৃণা করে সবাই। কিন্তু আমার ভিজিটের শেষে আমি কিছু কথা শুনলাম যা থেকে বুঝলাম যে, শ্যামাপ্রসাদের সমস্ত অপকর্ম সত্ত্বেও বাংলার প্রাচীন সভ্যতা, আশুতোষের স্পিরিট এখনো শেষ হয়ে যায়নি"।

    শিল্পী চিত্তপ্রসাদের এই দুটি বিবরণ থেকেই বুঝতে পারা যায়, তেতাল্লিশের মন্বন্তর ঘিরে সেই সময় গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং সংবাদ মাধ্যমের একটি প্রভাবশালী অংশ শ্যামাপ্রসাদের একটি ইতিবাচক চরিত্র চিত্রণে কিভাবে আত্মনিবেদন করেছিল।

    (পিপলস ওয়ারে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি পরবর্তীতে 'সম্প্রীতি মনন' নামক একটি পত্রিকাতেও আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল)
  • বিভাগ : অপার বাংলা | ২১ জুন ২০২১ | ৬৯৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন