• খেরোর খাতা

  • মা 

    Mousumi GhoshDas লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ মে ২০২১ | ১০৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মা


                     মা আমার পূর্ববঙ্গের মানুষ। ঢাকা বিক্রমপুরের। দেশভাগের সময় সামান্য কিছু সম্বল নিয়ে পরিবারের সঙ্গে  এপারে চলে আসেন। এপারে এসে প্রথম দিকে কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় রিফিউজি ক্যাম্প বদলে বদলে অবশেষে ময়না গুড়ির নিকটবর্তী পানবাড়ি বলে এক জায়গায় কিছু জমিজমা কিনে কোনো মতে বসবাস শুরু করেন। এই পানবাড়ি থাকাকালীন মায়ের বাবা মানে আমার দাদুর নিমোনিয়া হয়ে আকস্মিক মৃত্যু হয়। মা'য়ের বয়স তখন পাঁচ।


     দাদু মারা যাবার আগে স্ত্রী ছেলেদের বলে গিয়েছিলেন, "কলকাতার বাটানগরে আমার বহু আত্মীয় স্বজন আছে, আমার কিছু হয়ে গেলে তোমরা ওখানে চলে যেও"। তখন মামারা ছোটোই ছিলেন,  দিদাও অল্পবয়সী বিধবা। বিদেশ বিভূঁইয়ে পথঘাট তেমন চেনেন না। তাই হয়তো দিদা তখন তখনই সন্তানদের নিয়ে বাটানগর যাওয়ার সাহস করে উঠতে পারেন নি।   


    দাদু মারা যাবার পর সেখানকার জমিজমা বিক্রি করে মামারা হয়তো বা একটু কাজের আশায় সবাই মিলে ময়নাগুড়ি এসে বসবাস শুরু করেন। 


    আমার মা চার ভাইয়ের এক বোন ছিলেন। তিন দাদা, তারপর মা, পরে ছোট এক ভাই। ভাইদের খুব আদরের এক বোন। যেমন আদর ছিল, তেমন শাসনও ছিল। একা কোথাও বেরোতে দেবেনা বোনকে, সবসময় চোখে চোখে রাখা। 


    তারও বেশ কিছু বছর পর যখন মামারা আরও একটু বড় হয়েছেন, তখন নাকি সবাই মিলে  বাটানগর চলে আসেন। এবং দাদুর খুড়তুতো ভাইয়ের সহায়তায় দুই মামা বাটা ফ্যাক্টরিতে চাকরি পান। 


     মা'য়ের বিয়ে হয় রেলকর্মী আমার বাবার সঙ্গে। স্বামীটি গুরুগম্ভীর, কঠিন অনুশাসনের মানুষ। সংসারে তাঁর কথাই শেষ কথা। 


    জ্ঞান হবার পর থেকে মাকে যতখানি দেখেছি, বুঝেছি– তা হল মা হলেন অত্যন্ত ভীতুটাইপ, মুখ বুজে সবার সব ধরনের অন্যায় মেনে নেওয়া, প্রতিবাদ করতে না পারা এক নিরীহ গোবেচারা প্রানী। সে কারণে মা বলে তাঁকে যে খুব সমীহ করে চলেছি কোনোদিন, মনে পড়ে না। যার ‘সাত চড়ে রা নেই’ যাকে যেমন খুশি তেমন করেই পরিচালিত করা যায়, যার নিজস্বতা নেই, পছন্দ অপছন্দের প্রকাশ নেই, অন্যায়ে সামান্য গর্জে ওঠা নেই  - তাঁকে আর যা হোক করুণা করা যায়, মা বলে ভালবাসা যায়, তবে সমীহ করা যায় না। 


    তাই বাবাকে বাঘের মতো ভয় পেলেও মাকে তেমন পাত্তাই দিইনি কোনদিন। তবুও মা আমার দিনের পর দিন যত্নে রেঁধে বেড়ে খাইয়েছেন, বড়ো করেছেন, অসুখ-বিসুখে পরম মমতায় সেবা যত্ন করেছেন। আজ এই বয়সে এসে নিজে অসুস্থ হলে খুব মিস করি মা'র  সেই যত্ন-আদরগুলো। আজ হারে হারে টের পাই মা-বাবার মতো কেউ হয় না এই পৃথিবীতে, কেউ না।  


                     লেখাপড়া শিখে যখন বড়ো হলাম, তখন ধীরেধীরে বুঝলাম মা কেন এমন ধারা মানুষ? কেন কষ্ট পেলেও গর্জে উঠতে পারেন না? পড়ে বুঝলাম প্রথমত, মার জন্মগত শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট স্বভাব। দ্বিতীয়ত শিশুবেলায় পিতৃহীন। ভাইদের ভালবাসা এবং কঠোর শাসনে মানুষ। বিয়ের পরেও গুরুগম্ভীর স্বামীর কঠিন অনুশাসনে জীবন অতিবাহিত করা। তাঁর মতামত মেনে নিতে বাধ্য হওয়া - যে কারণে একটা দৃঢ় ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার সু্যোগই হয় নি। 


     সংসারে বা পরিজনদের কাছে মায়ের নিজস্ব কোন বক্তব্যই থাকে না। যে যেভাবে চালিয়েছে, সেভাবেই চলেছেন। মোদ্দা কথা অন্যের মুখে ঝাল খেয়েছেন।  


                    স্পষ্ট মনে আছে সংসারের যাবতীয় কাজ প্রায় একা হাতেই সামলাতেন। সেসময় বাড়ি বাড়ি কাজের লোক রাখার তেমন চল ছিল না। আর আমার নিম্নমধ্যবিত্ত পিতার পক্ষে এক্সট্রা পয়সা দিয়ে লোক রাখা মানে বিলাসিতা। যদিও দেখেছি প্রয়োজনে বাবা মা'য়ের হাতে হাতে সাহায্য করতেন নিজের সুযোগ মতো। আমরা তখন অনেক ছোটো। মা আমার খুব ঘুরতে-বেড়াতে,আনন্দ করতে পছন্দ করতেন। কিন্তু রেলওয়ে কর্মী বাবা ফার্স্টক্লাস পাশ পাওয়া স্বত্তেও মাকে কোথাও নিয়ে ঘোরান নি, কেবলমাত্র নিজের ঘোরার শখ নেই বলে। এক বছরে অথবা দুই/তিন বছর পরপর বেশ কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ভাইদের বাড়ি নিয়ে যেতেন। ব্যাস, ওইটুকুই। সেখানে গিয়ে ক’টা দিন মা স্বাধীনভাবে এ বাড়ি ও বাড়ি উড়ে বেড়াতেন  প্রজাপতির মতো।  তখন মাকে দেখতাম দাদা বৌদি, ভাই ভাইয়ের বৌএর সঙ্গে কি আনন্দে দিন কাটাতেন। যেন এক অন্য মা!   


                   ধীরেধীরে বড় হলাম, নিজের সংসার হল, চাকরি পেলাম, সন্তানের মা হলাম- সবেতেই মা আর বাবার সম্পূর্ণ সহযোগিতা, সহমর্মিতা পেয়েছি। কিন্তু তার পরিবর্তে তাঁদের প্রতিও যে আমার সহযোগিতা সহমর্মিতার দায়িত্ব রয়েছে, তা ভুলেই ছিলাম নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থেকে। ভেবেছি ওনারা বাবা-মা, ওনারা তো  করবেনই। ওনাদের তো এটাই কর্তব্য। কি স্বার্থপরের মত ভাবনা- তাই না? আজ নিজে মা হওয়ার পর, এবং সন্তান বড় হওয়ার পর বুঝলাম সন্তানেরও অনেক দায়িত্ব কর্তব্য থাকে। মা বাবাও মনেমনে একটু আশা করেন।


                     বাবা চলে গেছেন গতবছর। আজ আমি যথাসাধ্য করার চেষ্টা করি মা'য়ের জন্য। কিভাবে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন সেই চেষ্টা অবিরত। এখন আমার সাধ্য-সামর্থ্য-ইচ্ছে আছে মা'কে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার, মা'য়ের শখ মেটানোর। কিন্তু এখন মা'য়ের অশক্ত শরীর, হাঁটু কোমরে টান, মন্থর চলাফেরা। শত ইচ্ছে হলেও শহর থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে ভয় হয়। তার মধ্যে এই মহামারী। তাই মনেমনে একটা প্রচ্ছন্ন অপরাধবোধে ভুগি। ভাবি একটা মানুষ পৃথিবীতে এসে শুধু নিজের ঘর বাড়ি সংসার নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন? আর টুকটাক সেলাইফোঁড়াই, রেডিও শুনে, টিভি দেখে, অল্পস্বল্প গল্পের বই পড়েই!! এর বাইরেও একটা জগত আছে- পৃথিবীতে কত সুন্দর জিনিস আছে দেখবার মতো - তার কোনো খবরই রাখলেন না? বা রাখার সুযোগ পেলেন না? 


    কি জানি? এমনভাবেই তো কেটেছে সে যুগের অনেক সাধারন মায়েদের মেয়েদের জীবন। 


                 আজ আমার আন্তরিক প্রার্থনা, মা তুমি যতদিন আছো, সুস্থ থেকো, নিজের খাওয়া-পরা, চলা, ক্রিয়াকর্মগুলো যেন নিজেই করতে পারো, কারো মুখাপেক্ষী হয়ে কারো করুণায় যেন তোমাকে বাকি জীবন কাটাতে না হয়। কারণ, সারাজীবন সংসারের জন্য করে, শেষ বয়সে অন্যের করুনা ও বিরক্তির কারণ হওয়া - সে যে বড় দুর্বিষহ! এ আমরা সবাই বুঝি। 


    আমার মাথায় যেন তোমার আশীর্বাদের হাতখানি অবিচল থাকে মা।


    #মৌসুমী_ঘোষ_দাস

  • ১২ মে ২০২১ | ১০৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন