• খেরোর খাতা

  • ছোট গল্প কাকের অভাব

    Mousumi GhoshDas লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ এপ্রিল ২০২১ | ২৫৭ বার পঠিত
  • জানলার কাঠের পাল্লাটা একটু ঠেলে খুলে দিল পদ্ম। ওপারের আমগাছটার ডাল পাতার ফাঁক দিয়ে হেমন্তের এক মুঠো নরম রোদ এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল স্যাঁতস্যাঁতে বিছানাটার ওপর। বিছানার একদিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছেন অষ্টাশি বছরের প্রাণতোষ বাবু। বার্ধক্যজনিত কারণ ছাড়াও শারীরিক ও মানসিক দুই দিক দিয়েই একেবারে অকেজো হয়ে পড়েছেন তিনি। অথচ একসময়ে পরিবারে তাঁর প্রবল প্রতাপ ছিল। আজ থেকে আঠারো বছর আগে এক শীতের সন্ধ্যায় আচমকাই গিন্নী চলে গেছেন। আর তারপর থেকেই ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়েছেন। সারাদিন শুয়ে বসে থাকতে থাকতে এখন আর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবার জন্য জোর পান না।

    - “সবসময় শুয়ে থাকবেন না তো, উইঠে বসেন”।

    পদ্ম বিছানার ওপর ছড়িয়ে থাকা মশারি চাদর ঠিক করতে করতে চেঁচাল। প্রাণতোষবাবু শুয়েই রইলেন। আজকাল বসার চাইতে শুয়ে থাকতেই বেশি স্বস্তি পান। অথচ এককালে তিনি এমন শুয়ে থাকার মানুষই ছিলেন না। গিন্নী চলে যাবার পর থেকেই কেমন যেন একটা হয়ে গেছেন। তারপর বছর তিনেক আগে বিরাট সাইজের হার্নিয়া অপারেশনের পর থেকে আরও নুয়ে পড়েছেন। ছেলে বউমা নাতি নাতনিরাও সব ব্যস্ত নিজেদের কাজে। তাঁরা কেউই আর দুদণ্ড প্রাণতোষ বাবুর পাশে বসে কথা বলার ফুরসৎ পায় না। শুয়ে শুয়ে দরজার পর্দার নীচ দিয়ে তাঁদের ব্যস্ত চলাফেরা দেখেন আর অভিমান করেন। কিছুতেই বুঝতে চান না যে এই ব্যস্ততার যুগে দুদণ্ড পাশে বসে সময় নষ্ট করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ওনার সমবয়সী বন্ধুদের বেশিরভাগই পৃথিবী ছেড়েছেন, যে দু-একজন আছেন তাঁদের সাথে সেভাবে আর যোগাযোগ নেই। সারাদিন ঘরবন্দি নিঃসঙ্গ শুয়ে থাকাই প্রাণতোষবাবুর কাজ।

    - “উইঠেন বলতেছি। ওষুধ খেতি হবে না নাকি?” পদ্ম হাতের কাজ সেরে প্রাণতোষবাবুর গায়ের কম্বলটা ধরে এক টান মারল। আর অমনিই ভক করে খানিক দুর্গন্ধ এসে লাগল পদ্মর নাকে। পদ্ম ভীষণ চেঁচিয়ে উঠল - “এই না খানিক আগে পরিষ্কার করলাম। মুখে বলতি কি হয়? বেডপ্যানটা দিতাম। যত দিন যাচ্ছে বদমাইশি বাড়তিছে আপনার!”

    প্রাণতোষবাবু বুঝলেন কাল রাতের ওষুধের ফল। কিভাবে যে বেড়িয়ে যাচ্ছে টের পাচ্ছেন না! তিনি বরাবরই কোষ্ঠকাঠিন্যের রুগী। এমনিতেই তিন/চারদিন পরপর পরিষ্কার হত। এখন তো শুয়ে থাকার দরুন তিন/চারদিনেও বেগ আসে না। ওষুধ খেয়ে বেগ আনতে হয়। কিন্তু বাড়ির লোক ওষুধ দিতে চায় না। ওষুধ দিলেই সেদিন বেশ কয়েকবার হয়। আর তাতেই বাড়ির লোক, এমন কি মাইনে করা পদ্মও বিরক্ত হয়। কাল রাতে ছেলে অফিস থেকে ফিরে এঘরে এসেছিল বাবার শরীরের খোঁজ নিতে। তখন করুণ স্বরে কোষ্ঠ পরিষ্কারের আর্জি জানিয়েছিলেন ছেলেকে। নয় দিন ধরে বেগ আসে না দেখে ছেলেও লুকিয়ে একটু ওষুধ দিয়েছিল। আর তাতেই আজ সকাল থেকে - পদ্ম গজগজ করতে করতে লুঙ্গি ছাড়াতে লাগল। প্রাণতোষবাবুর ঘর লাগোয়া ডাইনিঙে বসে মেয়েকে খাওয়াচ্ছিল সুনিতা। সেখান থেকেই বলে উঠল - “দরজাটা বন্ধ করে নাও পদ্মদি। এঘরে গন্ধ আসছে।”

    পদ্ম দরাম করে দরজাটা বন্ধ করতে করতে বলল - “লোক দেখে নিও তোমরা। শীত আসতিছে। ঠাণ্ডার মধ্যি আমি আর এতো গু ঘাইটতে পারব নি। আমিও তো মানুষ নাকি?”

    পদ্মর কথাটা কানে যেতেই খুব ভয় পেয়ে গেলেন প্রাণতোষবাবু। আজ নিয়ে এই তিন দিন ছেড়ে যাবার হুমকি দিল। যদি সত্যিই - চারটি লোক পাল্টে পদ্মকে পাওয়া গেছে। এই পদ্মই তাঁকে খাওয়ানো, স্নান করানো, ওষুধ দেওয়া, বিছানা করা, যাবতীয় করে। সকাল নয়টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত পাশে থেকে দুটো বকাঝকা বা ভালমন্দ কথা বলে। তারপর একাই কাটাতে হয় বাকি সময়টা। যদিও রাতের দেখাশোনার জন্য দুজনকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা এসে মেঝেতে বিছানা করে এমন নাক ডেকে ঘুম লাগাতো যে প্রয়োজনে প্রাণতোষবাবু ডেকেও পেতেন না। তাই ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

    - “তোমার যা বলার দাদাকে বল। আমার মাথা গরম করো না। তাছাড়া সেন্টার থেকে তোমার যা মাইনে, তার ওপরেও উপরি চারশো করে দিই আমরা। এমন বাড়ি কোথাও পাবে বল?”

    হ্যাঁ, পদ্মর হাতে উপরি টাকা গুজে দেয় প্রাণতোষবাবুর ছেলে। এখন প্রাণতোষবাবুর পেনশন বহুগুণ বেড়েছে। বিষয়আষয় প্রচুর। বছর দশেক হল নিজে আর ব্যাংকে যেতে পারেন না। ছেলেই এটিএম দিয়ে তুলে আনে সংসারের জন্য।

    - “টাকা বাড়ানোর খোটা দিবা না বৌদি, এর চেয়ে বাচ্চা ধরার কাজ অনেক ভাল।”

    - “কেন, বাচ্চার বুঝি গু ঘাটতে হয় না তোমায়?”

    - “শোন কতা। বাচ্চার গুয়ের ক্যাঁথা কাচা আর বুড়া মাইনষের গু ঘাটা এক হইল?”

    সুনিতা গজগজ করতে লাগল, “পায়খানা পায়খানা করে রাতদিন জ্বালিয়ে খেল বুড়োটা। বাড়িটাকে একটা হাসপাতাল বানিয়ে রেখেছে।”

    পদ্ম গজগজ করতে করতে লুঙ্গি ছাড়িয়ে বিছানা পরিষ্কার করে প্রাণতোষ বাবুকে শুইয়ে দিল। রমলার কথা বড্ড মনে পড়ছে আজ। "খুব না বলতে, বুড়ো বয়সের জন্য টাকা জমাতে হয়। টাকা থাকলেই শেষ বয়সে ভাল থাকা যায়। কত নির্বোধ ছিলে তুমি রমলা!" আপন মনে বিরবির করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আম গাছটার দিকে পাশ ফিরে শুলেন প্রাণতোষ বাবু।
  • আরও পড়ুন
    বাবা  - Mousumi GhoshDas
    আরও পড়ুন
    বাবা  - Mousumi GhoshDas
    আরও পড়ুন
    মা  - Mousumi GhoshDas
  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৭ এপ্রিল ২০২১ | ২৫৭ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন