• বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ  বুলবুলভাজা

  • ভালবাসার রঙ কি আজ ফিকে?

    অদ্রিজা রহমান মুখার্জি
    আলোচনা | সমাজ | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২৩৭ বার পঠিত | ৩ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে ভালবাসাবাসির দিন হিসেবে পালন করা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন রয়েছে, বিভিন্ন মহলে। তবে এই দিনটা গত কয়েক বছর ধরে শিরোনামে উঠে আসে ভুল কারণে। স্বঘোষিত সংস্কৃতিরক্ষকদের পালোয়ানি আর গা-জোয়ারিপনা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বেশ কিছু দিন হল। তাদেরকে সময়মত আটকানো যায়নি বলেই, ভিন ধর্মে বিবাহ নিয়ে আইন তৈরি হচ্ছে, অর্ডিন্যান্স পাশ হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই প্রকাশিত হল ভিন ধর্মে প্রেম ও বিবাহ এবং বর্তমান সময়ের সংকট নিয়ে ব্যক্তিগত একটি অনুভবের কথা।

    ফাগুন লেগেছে বনে বনে…রবি ঠাকুরের এই গানের কলি বসন্তের হাওয়ায় কী যেন এক বার্তা নিয়ে আসে। বসন্ত পঞ্চমীতে যত না সরস্বতীর আরাধনা হত, তার থেকে বেশি হত মদন দেবের পুজো। আমাদের ছোটবেলায় 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' শব্দটার তেমন চল ছিল না। কিন্তু ওই সরস্বতী পুজোর দিনে ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় মনের আদান প্রদান হত বৈকি। পরে আর্চির কার্ডের দৌলতে গোলাপের বিক্রিও বাড়ল, ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ নির্ধারিত হল ভ্যালেন্টাইনস ডে, মন দেওয়া নেওয়া দিবস। কিন্তু বাঙালি আজও সরস্বতী পুজোকে বাংলার 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' হিসেবে ধার্য করে রেখেছে।

    প্রেম এমন দিনক্ষণ দেখে হয় না জানি, কিন্তু বসন্ত বাতাসে কিছু একটা থাকে যেখানে মনের আনাচে কানাচে রং ধরায়। সেই রঙে কার মন কার প্রতি রাঙা হবে তা কি তৃতীয় জন বলতে পারে?

    ভালবাসা জাত দেখে না, ধর্ম দেখে না, বয়স দেখে না, লিঙ্গও দেখে না। হয়ে যায়। কেন কখন কার মনে কী অঘটন ঘটে যাবে হয়ত আগের মুহূর্তে সে নিজেও জানে না।

    প্রায় তিরিশ বছর আগে আমার জীবনেও এমন একটা অঘটন ঘটে গিয়েছিল। সে আমার কলেজের সহপাঠী, স্কুলে এক বছরের সিনিয়র। চরিত্রে আমরা বিপরীত, কিন্তু সেটাই বোধহয় আকর্ষণের অন্যতম কারণ ছিল। আমার থেকে বছর দেড়েক'এর বড়, ডাক্তার, বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরীজীবী, পাত্র হিসেবে তো মন্দ হওয়ার কথা নয়, কিন্তু আমার বাড়িতে ঘোর আপত্তি। সমস্যাটা কোথায়? আমার জন্ম হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে। সেই সময়ে অন্য জাতে বিয়ে নিয়েই সমস্যা ছিল, সে জায়গায় আমি একেবারে মুসলমান ছেলেকে পছন্দ করে বসলাম। মা বাবার মুখ গম্ভীর, অনেক আলাপ আলোচনা, অনুনয় বিনয়, কান্নাকাটি চলল। তার আগে পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ আমরা তেমন অনুভব করতাম না। বিভিন্ন ধর্মীয় মতালম্বী বন্ধুরা মিলে একসাথে হৈ হৈ করে দিন কাটিয়েছি। কিন্তু দুটি ধর্মের ছেলেমেয়ের বিয়ে হলে সমাজ কী বলবে এই নিয়ে উদ্বেগের সীমা ছিল না। বলে রাখা ভাল আমাদের দুই পরিবারকে একেবারেই রক্ষণশীল বলা যায় না।

    এরই মধ্যে ভারতের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচিত হয়ে চলেছিল। বাবরি মসজিদ ভাঙার সাথে সাথে ধর্ম আর রাজনীতি গেল গুলিয়ে। তার আঁচ লাগল সাধারণ মানুষের মনে। তখন আমরা পার্ক সার্কাসের ন্যাশনাল মেডিকেলের ইন্টার্ন। একদিকে পাশের বস্তিতে আগুন জ্বলছে, গুলি খেয়ে আহতরা আসছে হাসপাতালে আর কারফিউ এর মধ্যে আমরা আটকা পড়েছি এমার্জেন্সি ডিউটিতে। বলাই বাহুল্য আমাদের সম্পর্ক ঘনীভূত হচ্ছে সেই দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে।

    বিয়ে হল সই সাবুদ করে আদার ম্যারেজ অ্যাক্ট'এ, কোন ধর্ম পরিবর্তনের প্রশ্ন ওঠেনি। দুই বাড়ি প্রথমে মুখ ভার করলেও কিছুদিনের মধ্যে আত্মীয়তা হাসি এনে দিল দুপক্ষের মুখেই। দুই মা বাবা দিব্যি একসাথে বেড়াতে চলে গেলেন আমাদের ফেলে রেখে।

    একসাথে থাকতে গিয়ে ধর্ম কখনও মাঝখানে এসে দাঁড়ায় নি। মতান্তর হয়েছে অনেক সময় অনেক বিষয়ে, যেমন অন্য যে কোন পরিবারে হয়। তাই বলে কেউ কারো ধর্মীয় মত অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দেয় নি। ঈদ বা দুর্গাপুজো দুজনের কাছেই ছিল উৎসব। তাই ঈদে সিমাই রান্না করেছি যেমন আবার পুজো মণ্ডপে বসে ভোগ'ও খেয়েছি সবার সঙ্গে বসে। তবে এটাও ঠিক একটু আলাদা নজরে দেখত অনেকেই, মুখে তমন কিছু বলত না।

    পরে অনেকগুলো বিয়ে এমন দুই ধর্মে হতে দেখেছি। ক্রমে আপত্তি উঠে গিয়ে দেখেছি বেশ ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছে দুই বাড়ির লোক, পেটপুরে নেমন্তন্ন খেয়েছি। তারা এখনও পর্যন্ত সবাই সুখে আছে বলেই শুনেছি।

    সামাজিক ভাবে একদিকে যেমন এই বাধাগুলো ক্রমশ কমে আসছিল, ঠিক তখনই নিঃশব্দে কখন ধর্মীয় বিষ আমাদের মধ্যে দেওয়াল তুলতে শুরু করেছিল আমরা বুঝতেই পারিনি। খাওয়া নিয়ে আমাদের দুজনের কিছু বাছবিচার ছিল না, তবু মা বাবাদের সামনে কখনও তাদের অপছন্দের খাবার নিয়ে বসে খাইনি। বন্ধুরা যারা স্বেচ্ছায় সব কিছু খাবার চেখে দেখতে চেয়েছে, দিয়েছি, কখনও কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না, জোর করার তো প্রশ্নই নেই। তাই যখন আইন করে বিভিন্ন শহরে কোন কোন খাবারে নিষেধাজ্ঞা জারি হল, অবাক হয়েছি, খারাপও লেগেছে। পশ্চিমবঙ্গবাসী এখনও খাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট স্বাধীনতা উপভোগ করেন, কদিন করবেন জানি না।

    কথা হচ্ছিল প্রেম ভালবাসা নিয়ে, তার মধ্যে এই আলোচনা কেন? ইদানিং একটা চিন্তার জায়গা তৈরি হচ্ছে যখন দেখি ধর্মের নামে ভালবাসার জায়গাতেও বেড়ি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি আইনের নাগপাশে জড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে স্বতস্ফূর্ত সম্পর্কগুলোকে। 'লাভ জিহাদ'এর ধুয়ো তুলে দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের বিবাহ বন্ধ করাটিকে আইনের আওতায় আনার জন্য বিশেষ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রদেশে বলবৎ হয়েছে আইনটি। কত 'শো বছর পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা! একদিকে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে আমরা ঘর ভরিয়ে ফেলছি, অন্য দিকে মানসিক চিন্তাধারায় পেছনের দিকে হেঁটে চলেছি, এ কেমন আশ্চর্য কথা!

    ভাবতে চেষ্টা করি যদি আমাকে এমন আইন দেখিয়ে আটকানোর চেষ্টা করা হত ঠিক কী করতাম? মেনে নিতাম? তেমন সহজ মেয়ে তো আমি কোনকালেই ছিলাম না। জেলে যেতাম? হয়ত যেতাম। আমি তো একা নই। আমার মতো এমন হাজার হাজার মেয়ে আছে যারা জাত ধর্ম দেখে ভালবাসে না। তাদের কী পরিণতি হবে? আইন দিয়ে ভালবাসার শ্বাস রোধ কি এই প্রজন্ম মেনে নেবে? নাকি রাজনীতির এমন আফিম আমরা খেয়েছি যেখানে আর সব রঙ ফিকে?



    গ্রাফিক্স- মনোনীতা কাঁড়ার
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২৩৭ বার পঠিত | ৩ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Aparna Banerjee | 2401:4900:314c:d60a:0:4a:272d:a401 | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৭:১২102580
  • Very well expressed Adrija..Love is unconditional. 

  • কল্লোল দে | 2409:4060:21d:ac65::18e8:60a5 | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৭:৩৩102581
  • অদ্রিজা, অজস্র অভিনন্দন জানাই ব্যক্তিগত উপলব্ধির সুন্দর প্রকাশের জন্য ! অত্যন্ত সময়োপযোগী লেখা ! মনকে নাড়া দিল ভীষণভাবে ! প্রার্থনা করি - খুব ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন ! আন্তরিক শুভেচ্ছা আপনাদের জন্য ! ভালোবাসা চিরন্তন !

  • পারমিতা সাহা | 47.29.61.39 | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৯:৩৩102583
  • ভালো থাকুন। ভালবাসুন। বাকি সব শূন্য।

  • ঊর্মিমালা বসু | 103.211.20.146 | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২০:২৩102586
  • ভালোবাসার ধর্ম ভালোবাসা।ধর্মের পিটুলি গোলা খাওয়ালে কিচ্ছু হবেনা।


    ভালো লাগলো,অদ্রিজা।

  • প্রবুদ্ধ বাগচী | 146.196.45.194 | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২১:৫২102599
  • ম্যাডাম 


    আপনার লেখা অত্যন্ত ভালো লাগলো 


    খুব সুন্দর করে নিজের কথা লিখছেন .

  • Asmita DebRoy | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০১:৫১102602
  • অসম্ভব সময়োপযোগী লেখা! 

  • Du | 47.184.54.67 | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০২:৩৯102603
  • লেখা পড়ে খুব ভালো লাগলো .


    আপনাকে দেখিয়ে সেরেছিলাম একদা .

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

Valentines Day, Love Jihad, Hindu Muslim Marriage, Hindu Muslim Love
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন