• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • নিউ নর্মাল

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৮৪৯ বার পঠিত | ৩ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ছাব্বিশ

    শুকদেব দহলজি আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছেন। পরপর লিস্ট করে রেখেছেন কাজগুলোর। বয়স হয়েছে। প্রায়ই ভুলে যান কাজের তালিকা। কিন্ত গতিবিধি নজরে রাখতে হয়। নাহলে খুব মুশকিল। আচমকা লকডাউন হয়ে যাওয়ার ফলে এইবছর আকাদেমির সব অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেছে।কিছু ভার্চুয়াল রাখা হয়েছে।কিন্ত ভার্চুয়ালে নাচ, গান ও নাটকের কিছুই নির্যাস পাওয়া যায় না। শুকদেব খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন আকাদেমির পরবর্তী কাজ নিয়ে। আনলক শুরু হলেও ইনফেকশন কিছুমাত্র কমে নি। কাজেই অডিটোরিয়াম খুলে অনুষ্ঠান করা এখন সম্ভব না। বুদ্ধিমানের কাজও নয়।
    মেথি ভেজানো জল পান করে , গার্গল করলেন শুকদেব। একটা বড় তামার গ্লাসে তাঁর গরমজল রাখা থাকে। গতরাতে খবর পেয়েছেন আকাদেমির সেক্রেটারি দয়ানন্দ কোলের কোভিড পজিটিভ ধরা পড়েছে।তিনি হসপিটালাইজড। সুগার আছে। দয়ানন্দ ও শুকদেব পুরোনো বন্ধু। যতটা পুরোনো হলে গাছের পাতার মত দেখায়। দূর থেকে একগোত্র। খুব কাছে গিয়ে ঠাহর করে দেখলে পাতার শিরা উপশিরাতে সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যায়। এখন আর শুকদেব মর্ণিং ওয়াকে যাননি। দিল্লি এখন খুব ভয়াবহ হয়ে আছে।দূষণ ও করোনা মিলিয়ে এক অদ্ভুত আতংক। কিন্ত আজ শুকদেব একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। গত তিনদিন আগে মারা গেছেন তাঁর প্রিয় অভিনেতা এবং বন্ধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শুটিং করতে গিয়ে করোনা হয়েছিল। মাসখানেকের যুদ্ধ। চলে গেলেন সত্যজিতের নায়ক। শুকদেব একটি শোকসভা আয়োজন করতে চান আকাদেমির পক্ষ থেকে। চান না বলে বলা উচিত এটা অবশ্য করা দরকার। তাঁদের আকাদেমি সৌমিত্রবাবুকে বছর তিনেক আগে সম্মানিত করেছিল।সেই আয়োজন ভার্চুয়াল না হয়ে একটি ছোট সমাবেশ হোক।দয়ানন্দ হসপিটালাইজড। সেইজন্য শুকদেব সুনন্দিতাকে ফোন করছেন।সুনন্দিতা মেহতা আকাদেমির ডানহাত। তাঁর সঙ্গেই কিছু আলোচনা করা দরকার।পেয়ালা পিরিচে চা দিয়ে গেলেন কোমল। শুকদেব মগে চা বা কফি পানে স্বচ্ছন্দ নন। সবুজ কাপ।সোনালী বর্ডার। সুনন্দিতা একবারেই ফোন ধরলেন। আজ বড্ড ব্যস্ত তিনি। অবশ্যই শুকদেব যেভাবে অ্যারেন্জ করতে বলবেন , তাই করবেন। আজকের দিনটা মাফি চেয়ে নিলেন তিনি। অনুষ্ঠান হবে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুনন্দিতার ভীষণ প্রিয় অভিনেতা। উত্তমকুমার অধিক তিনি সৌমিত্রভক্ত। ভীষণ শক্ড হয়ে আছেন। একটি শ্রদ্ধা অনুষ্ঠান করতেই হবে যত্ন করে। কিন্ত আজ, আজ বড় ব্যস্ত আছেন তিনি । বাস, আজকে দিন মাফ কিজিয়ে শুকদেভছি। কাল ম্যয় সব কর লুঙ্গি।

    হালকা শীত পড়ছে ভোরের দিকে।গায়ে হাউসকোটের ওপর একটা ধূসর চাদর জড়িয়ে নিয়েছেন সুনন্দিতা। নিজের জন্য এক কাপ চা, একটা টোস্ট সাজিয়ে বসেছেন বড় জানালার পাশে। এখানে বসলে কিছুটা রাস্তা দেখা যায়।পাঞ্জাবীবাগের এই বাড়িতে কিছুটা সামনের বাগান।বাগান বলতে ঠিক মাটি, বড় গাছের বিস্তৃত , বিস্তীর্ণ বাগান নয়। একফালি লন। লনের দুধারে টব। এইসময়ে সিজন ফ্লাওয়ারে ভর্তি।প্রচুর গাঁদা।হলুদ গাঁদা।কমলা গাঁদা। গোলাপ দু তিনটে। ক্রিসমথিমাম। সাদা ও হলুদ। ডালিয়া। প্যিটুনিয়া আছে প্রচুর। ক্যাকটাই।
    সুনন্দিতা চায়ের কাপে চুমুক দেবার আগে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন। প্রায় ধ্যানমগ্ন। এটা তাঁর অভ্যেস। চা ঠান্ডা হতে থাকে । সকাল থেকে অনেকগুলো কাজ করেছেন তিনি। লকডাউন বা আনলক , যখন যাই হোক না কেন , তাঁর বরাবরের কিছু অভ্যেস আছে।কিছু কাজ।লকডাউনের পর বাঈ আসতো না। ইদানীং সে আবার আসতে শুরু করেছে।তবু জানালা দরজাগুলো তিনি নিজে মোছেন। পারিবারিক মন্দির মানে ঠাকুরঘর আছে একটি।সেটিও। বিছানাপত্র সব ঝাঁট দিয়ে সাফ করে বালিশ পাশবালিশ খাটগুলোর বক্সে চালান করে দেন । চাদর পাটপাট করে টেনে , গুঁজে, ছাড়া জামাকাপড় গরম জলে চুবিয়ে দেন নিজের হাতে। ওয়াশিং মেশিন চালিয়ে রান্নাঘরে ঢোকেন চায়ের পাট নিয়ে। একমাত্র আম্মাজী 'র বিছানা তোলা হয়না সকালে।কারণ আম্মাজী দেরি করে ওঠেন। সকালের দুধ চা এবং চারটি বিস্কিট ট্রেতে করে তাঁকে দিয়ে আসেন সুনন্দিতা।
    আম্মাজী এখন বিরাশি। টুকটুকে ফর্সা গাত্রবর্ণ কিছুটা ম্লান ত্বক কুঁচকে যাবার দরুণ।কিন্তু চোখের নীলচে রঙ স্পষ্ট বোঝা যায়। চায়ের কাপ তোলার সময় আম্মাজী একবার চোখ তুলে সুনন্দিতার দিকে তাকিয়ে হাসেন। হাসিটা ঠিক কীসের সেটা সুনন্দিতা অনেক মাথা খাটিয়ে ভেবে বের করেছেন।এটা বিছানা চা পেয়ে খুশির হাসি নয়। এই বৃদ্ধ বয়সে পুত্রবধূ নিজের হাতে চা করে এনে দিচ্ছে , তার জন্য কৃতজ্ঞ হাসিও নয়। প্রাতঃকালীন সুপ্রভাত মার্কা হাসিও না। এ হল অ্যাপ্রুভালের হাসি। আই হ্যাভ অ্যাক্সেপ্টেড ইউ ইন মাই হিউসহোল্ড। সো ইট ইজ ইওর ডিউটি টু সার্ভ মি। ইউ ডু ইট ওয়েল। সো আই অ্যাম প্লিজড।

    বিবাহের পঁচিশ বছর পরেও , দুটি সন্তানের জননী সুনন্দিতা মেহতা, বিবাহপূর্বে সুনন্দিতা বাগচি, আদিনিবাস পশ্চিমবঙ্গ, দীনহাটা তাঁর শাশুড়িমাতার কাছে এই অ্যাক্সেপ্টেড স্টেটাস পেতে পেতে অভ্যস্ত হতে থাকেন। যদিও, আমেলিয়া মেহতা, বয়স বিরাশি, আদিনিবাস  অংশত ফরাসিদেশ এখন একেবারেই বিছানাগত, তবু তাঁর একটি অদৃশ্য প্রভুত্ব আছে সারা বাড়ির ওপর । সুনন্দিতা সেটিকে ক্ষুণ্ণ করতে চান না এবং সযত্নে পাশ কাটিয়ে যান প্রথম থেকেই। আমেলিয়া মেহতা ভাবেন যে তিনিই কর্তৃত্ব করছেন যদিও সেটা নিছক ভাবনামাত্র, তাতে সুনন্দিতার কোনো কাজে কোনো অসুবিধে হয় না। অতএব তিনি এই সামান্য ব্যাপার মেনে নেন। ছোটবেলা থেকেই সুনন্দিতার মনে তাঁর মা ঢুকিয়ে দিয়েছেন বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ছোট খাটো ব্যাপার মেনে নিতে হয়।
    সকালে চার রকম চা হয়। আমেলিয়া মেহতা অল্প চিনি দিয়ে অনেকটা দুধ দিয়ে চা খাবেন।কী করে এই আর্মানি মহিলা পাঞ্জাবী চা খাওয়ার ধরণ আয়ত্তে এনেছেন , সেটা আলোচনার বিষয় হতে পারে। পরমজিত মেহতা খাবেন কড়া চা।সিটিসি। সর ভাসবে দুধের। ছেলে সুমন লিকর চা খাবে। মেয়ে নিকি চা খায় না। তার জন্য এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানান সুনন্দিতা। তাঁর নিজের সেকেন্ড ফ্ল্যাশ।সেটি পরে প্রস্তুত করবেন।আয়েশ করে খাবেন একাই । চারটি ঘরে চাররকম প্রাতঃকালীন চা কফি সার্ভ করবেন মালকিন। নিজে হাতে। এটাই এই বাড়ির ট্র্যাডিশন। দ্য ফ্যামিলি অব ভানু প্রতাপ মেহতা। আদিনিবাস লাহোর। পাকিস্তান।

    নতুন দিল্লির এই বাড়িতে বারান্দা দিয়ে ঢুকে একটি প্রশস্ত লম্বাটে হল। ডাইনিং কাম ড্রয়িং। একদিকে বড় ভারী কাঠের সোফা। কালোর ওপর ছোট ছোট সাদা, হলুদ, লাল ফুলের আপহোলস্ট্রি। এই থ্রি সিটার ও দুটি সিংগল সিটার আমেলিয়ার পছন্দের কেনা আসবাব। সেন্টার টেবিলটিও অনুরূপ ভারী কাঠের। তাই বিপ্রতীপে সুনন্দিতা একটি বেতের সোফা সেট রেখেছেন। তাঁদের এই হলে মাঝেমধ্যেই প্রচুর জমায়েত হয়। ফলে একটি নিচু ডিভানও আছে। লকডাউনে সুনন্দিতার সহস্তে প্রস্তুত এমব্রয়ডারি করা উজ্জ্বল লাল কুশনকাভারে সেটি সুসজ্জিত। ডাইনিং টেবলটি গোল। ছ'জনের বসার ব্যবস্থা।সুনন্দিতা সকালেই একবার নিজের হাতে কলিন্স দিয়ে টেবল মুছে , মাঝখানে সসের বোতলসমূহ, চামচকাঁটা হোল্ডার ইত্যাদি গুছিয়ে রাখেন।এইসময় তাঁর নিটোল নখপালিশ পরা হাতে একটি হীরকখন্ড দ্যুতি বিচ্ছুরণ করে। গলায় একটি চেইন ও এক হাতে একটি মোটা সোনার বালা। হাউসকোটের ফিতে বাঁধা টাইট করে।
    সুনন্দিতা প্রথমে আমেলিয়াকে চা দিতে যান। গিয়ে দেখেন শাশুড়ি বিছানাতে উঠে বসে আছেন। একটি নীল রাতপোশাকে তাঁকে বড় কৃশ দেখায়। বিছানার চাদর কুঁচকে এলোমেলো হয়ে আছে। সুনন্দিতা দুচোখে দেখতে পারেন না এই নোংরা বিছানা। সম্ভবত আমেলিয়াও পারতেন না, যখন স্বাস্থ্য অটুট ছিল।কিন্ত জরা ও বার্ধক্যের কাছে সবকিছুই হেরে যায়।তাই ডায়াপার পরিহিত আমেলিয়া মেহতা কোনোমতে ছেঁচড়ে উঠে বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকেন । তাঁর ডায়াপার পাল্টানো এবং বাথরুমে নিয়ে গিয়ে কমোডে বসানোর জন্য একজন আয়া তো আছেন কিন্ত লকডাউনের পর থেকে তাঁকে আর আসতে দেওয়া হয়নি।কাজেই আমেলিয়াকে খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামানো, ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে ডায়াপার খুলে ফেলে দেওয়া , কমোডে বসানো এবং তারপর শৌচকর্মে সাহায্য করে, রাতপোশাক পাল্টিয়ে , নতুন গাউন পরানো , কারণ আমেলিয়া কখনোই রাত ছাড়া রাতপোশাক পরবেন না, কোভিড অর নো কোভিড, নতুন ডায়াপার বাঁধা , এইসব কাজ সুনন্দিতা করেন। জল দিয়ে ধৌত করেন আমেলিয়ার ধবধবে ফর্সা কোমর , পশ্চাদ্দেশ, জানু, জংঘা, উরুসন্ধি। এতে তাঁর কোনো ঘেন্না বা ছুঁচিবাই নেই । যত্ন করে মুছিয়ে দেন। এসমস্তই আমেলিয়া খুব নির্বিকার ভাবে গ্রহণ করেন ।বরং আয়ার সঙ্গেই একটু বেশি বিগলিত থাকতেন।বিছানায় বসে চা য়ের কাপ হাতে নিয়ে হাসিটিও অনুগ্রহের। গলায় ন্যাপকিন গুঁজে দেন আমেলিয়া। কোভিডের ভয়ে কোনো আয়া রাখা যাচ্ছে না । কিন্ত সুনন্দিতা বুঝতে পারছেন যে তাঁর ওপর চাপ পড়ে যাচ্ছে।
    এরপর পরমপ্রতাপের ঘরে চা । পরমজিত পেশায় একজন বিল্ডার। দিল্লির নামকরা বিল্ডারদের মধ্যে একজন পরম প্রতাপ মেহতা। যদিও তাঁর পারিবারিক পেশা কৃষিকাজ এবং পঞ্জাবে এখনো তাঁর কৃষিজমি ও ফার্মহাউস আছে, পরম তাঁর পৈত্রিক পেশা থেকে দূরেই আছেন।তাঁর অধীনে প্রায় তিরিশজন আর্কিটেক্ট কাজ করেন। আনলকের সময় পিছিয়ে পড়া কাজ তাঁরা যতটা পারেন দ্রুত করার চেষ্টা করছেন।
    পরম যোগব্যায়াম সেরে গরমজল পান করেছেন। ঢকঢক করে নয়। খুব ধীরে ধীরে গরমজল শরীরে গ্রহণ করেছেন তিনি। চায়ের প্রত্যাশাতে বসে আছেন। সুনন্দিতা এসে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিতেই পরম প্রতাপ জানালেন আজ তাঁকে জলদি বেরোতে হবে। একটি জরুরি মিটিং আছে তাঁদের গোষ্ঠির।
    পরম প্রতাপ মেহতা আদতে অরোরা। মেহতা তাঁদের গোষ্ঠীনাম। সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে তাঁর পিতৃদেব প্রতাপ ভানু মেহতা পাঞ্জাবে চলে আসেন, হাজার হাজার পাঞ্জাবির মত, মাত্র তিন কাপড়ে। এঁরা সবাই দাঙ্গার বলি। প্রত্যেকে তাঁদের মা, বাপ, ভাই, বোন কাউকে না কাউকে খুন হতে, ধর্ষিত হতে দেখেছেন।প্রতাপ ভানু লাহোরেও কৃষকপরিবারের ছেলে ছিলেন।পঞ্জাবের লোধি গ্রামে ডেরা বাঁধলেন।পনেরোর পাঞ্জাবি বালকের প্রচুর দম। প্রাণপণ খেটে চাষ করে সংসার দাঁড় করালেন ভানু ।একুশের যুবক ভানুপ্রতাপ স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায় আলু বুনলেন।কিন্ত শুধু চাষ আবাদ না।ব্যবসা করতে হবে।খেতিবাড়ির সঙ্গেই অর্থাগম হয়েছে। ভাইদের হাতে খেতিবাড়ির ভার দিয়ে প্রতাপ ভানু শেফ হয়ে চলে গেলেন বিলেতে। বছর চারেক সেখানে থেকে আমেলিয়া আরশাকুনিকে বিবাহ করার পর উনিশশো বাহান্নতে জন্ম হল তাঁর প্রথম পুত্র জয়ন্ত প্রতাপের।ভারতে ফিরে আসার পর জন্ম মেজছেলে সুভাষ প্রতাপের। দুবছর পরে । আর ছোটছেলে আরো পরমজিত চারবছর পর জন্মায় । আর বেশকিছুদিন আলু চাষ করার পর প্রতাপভানুর মেজ ছেলে সুভাষ প্রতাপমেহতা জর্জিয়া চলে গেছিলেন । ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে জর্জিয়া পৃথিবীতে সতেরো নম্বর। প্রচুর সুবিধার কথা শুনেই একটি ভ্যালিড পাসপোর্ট নিয়ে সুভাষ মেহতা জর্জিয়া পাড়ি দেন।সত্যি সেখানে অনেক সুবিধা। কোম্পানি এক একজনকে প্রায় একশো রকম ব্যবসা করার ছাড় দেয়।কৃষিজমির অসামান্য সুলভ দাম। এক একর জমি ষাঠহাজার থেকে একলাখের মধ্যে। সুভাষ মেহতা হাতে স্বর্গ পেলেন।ব্যবসা করবেন জমিয়ে, এইরকম ইচ্ছে।
    কিন্ত অচিরেই ফাঁকি ধরা পড়ল। কিছু মেডিক্যাল ছাত্র এজেন্ট বনে গিয়ে জমি বিক্রি করছিল জর্জিয়াতে। সুভাষ এবং তাঁর সঙ্গে আরো যে পাঞ্জাবী কৃষকরা জর্জিয়া গেছিলেন ব্যবসা বাড়ানোর লোভে, তাঁরা দেখলেন যে জমি কিনেছেন তা উর্বর তো নয় বটেই, জমি থেকে একটা তেল বার হয় ট্র্যাক্টর চালনার ফলে।এই তেলটা ফসলের জন্য বিষাক্ত। সময়ে সব খুঁত ধরা পড়ে। সুভাষ দেখলেন জর্জিয়াতে প্রপার্টি ট্যাক্স অত্যন্ত বেশি। কমার্শিয়াল ইলেকট্রিসিটি অতি মূল্যবান। বীজের দাম আকাশছোঁয়া।সমস্ত যন্ত্রপাতি অগ্নিমূল্যে কো অপারেটিভ থেকে কিনতে হয়।তারপর বাজার নেই।গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বেড়াতে হয় ফসল।হার্বিসাইড, পেস্টিসাইড। ফার্টিলাইজার কিছুই উন্নতমানের নয়। শুধুমাত্র কমদামের জমি দিয়ে হবে কী! তারপর কার্তুলি ভাষা না জানলে ওখানে ব্যবসা করা যাবে না।দোভাষী লাগে। দু হাজার তেরো সালে জর্জিয়ান সরকার ভিসা রিনিউ করা বন্ধ করল।ওপেনডোর পলিসি রিভিউ হবে। ভারতীয়, চিনে, ইরানিয়ান, রাশিয়ান ব্যবসায়ীদের ভীড়ে জর্জিয়া তখন অস্থির। এইসব আঁচ করে সুভাষ মেহতা বহু আগেই ছোট ভাই পরম প্রতাপ আর ছেলে দীপকপ্রতাপকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরম ইউ এস এ থেকে জর্জিয়াতে না ফিরে সোজা দিল্লিতে এসে বিল্ডিং কন্স্ট্রাকশনের কাজ ধরেছেন উনিশশো নব্বই সাল থেকে। ছেলে দীপক প্রতাপ ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়িতে পাঞ্জাবে।বড়ভাই জয়ন্তপ্রতাপ লোধিতেই থাকেন। চাষ আবাদ ছেড়ে অন্য কোনদিকে যাননি তিনি বা তাঁর সন্তানরা । তেরো সালের পর সুভাষ প্রতাপ মেহতা ব্যবসা গুটিয়ে পরিবারসহ ফিরে আসেন। কিন্ত বেশিদিন পারিবারিক সুখ তাঁর সহ্য হল না। চোদ্দ সালে সুভাষ মারা গেলেন।কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।প্রতাপভানু চলে গেছেন আশি বছর পার করে।

    মেহতারা লড়াকু জাত। মহতী শব্দ থেকে মেহতা।ভানু প্রতাপ সগর্বে বলতেন।শূন্য থেকে গড়ে নিতে পারে প্রাসাদ।স্রিফ মেহনত চাহিয়ে। এইরকম একটি মেহনতি পরিবারে পরমপ্রতাপের স্ত্রী হয়ে বাঙালিনী সুনন্দিতা কিভাবে আসেন বা সুনন্দিতার শাশুড়ি মাতা আর্মানি সুন্দরী আমেলিয়া কীকরে ভানু প্রতাপ মেহতার সংসারে প্রণয়িনী ও ঘরণী হয়ে আসেন , সেইসব ব্যাখ্যান আছে। পুরোনো যে রূপোর কেটলি, মিনে করা , জানে। লস্যি খাবার ইয়া বড়বড় রূপোর গ্লাসেরা জানে। কিছুটা জানে বাড়ির সামনে বড় দেওদার গাছটি। বিশালাকৃতি সিন্দুকটি যা লাহোর থেকে কাঁধে করে এনেছিলেন তিনভাই, এবং যাকে সুনন্দিতার কন্যা নিকি একটি সেন্টারপিসে পরিণত করেছে, সেই প্রকান্ড সিন্দুকটি জানে। জানে আমেলিয়ার গয়নার বাক্সে ডালিম আকৃতির ট্র্যাডিশনাল লকেট যা কন্ঠহারটির ঠিক মাঝখানে রক্তাভ দ্যুতি বিস্তার করে।
    আপাতত সুমন , সুনন্দিতার পুত্র লিকর চা খেয়ে জিমে চলে গেল। সুনন্দিতা না করেছিলেন। তাঁর মনে হয় জিমের ম্যাট বা মেশিনে থিকথিক করছে ভাইরাস। এখন না যাওয়াই ভালো। কিন্ত সুমন খুব হেল্থ কনশাস। জিম পাগল ছেলে । শোনে না। আনলক শুরু হতেই সে জিমে যায়। নিকি কফি খেতে খেতে সুনন্দিতার সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসে। সাধারণত সুনন্দিতা নিকিকে কফি দিয়ে ওর কাছে আধঘন্টা বসেন।মা মেয়েতে জোর আড্ডা হয়। তারপর সুনন্দিতার নিজস্ব চা সময়।
    কিন্ত আজকে কিছুই হল না।কারণ পরমপ্রতাপ খুব ব্যস্ত। খুব তাড়াতাড়ি শুরু হবে একটা গন্ডগোল। সরকার কৃষি বিল এনেছে। খুব শিগগিরই একটা প্রতিবাদ ও ধর্ণা শুরু হবে কৃষকদের তরফে । সেই সংক্রান্ত একটি মিটিং হবে মেহতা সম্প্রদায়ের মধ্যে। অন্যরাও যোগ দেবেন।
    সুনন্দিতার হাতেও সময় কম। আপাতত সুমনকে তার নিজস্ব ঘর থেকে উৎখাত করতে হচ্ছে। তাকে চিলেকোঠার ঘরে শিফট করা হল। সব জিনিস আগেই তুলেছেন। আজ গুছিয়ে দেবেন। সুমন নিজেও খানিকটা গুছিয়েছে।ওর ঘরটা ঝেড়েঝুড়ে সাফ করেছেন দু' দিন ধরে। দেওয়ালে সাঁটা পোস্টার খুলে ফেলেছেন। সার্ফজল দিয়ে দেওয়াল ধুয়ে চকচকে । বিছানাপত্র নতুন। একটা ওয়ারড্রোব পুরো খালি করে রেখেছেন।যে থাকবে তার রুচি তো জানেন না, তাই একটা সাধারণ অফফ হোয়াইট চাদর পেতেছিলেন খাদির। কী, মনে হল , একটানে তুলে ফেললেন। মায়ের রুচি ছেলের রুচি যে একরকম হবে তেমন কোনো কথা নেই। একটা ঝকঝকে লাল বেডকাভার পাতলেন। সুনন্দিতা পর্দা, বেডকাভার এইসবে রঙের মাহাত্ম্য খুব মানেন। এই যে লকডাউনের সময় তাঁর সব প্রোগ্রাম বন্ধ, প্র্যাকটিস করছেন না মন দিয়ে , আটকে থাকছেন বাড়িতে, গ্রুপের কারু সঙ্গেই ভালো করে দেখা হচ্ছে না, ভার্চুয়াল মিট তো দুধের স্বাদ ঘোলে, এরপরেও নিজের মুড ঠিক রেখেছেন এটা কম বড় কথা নয়।সুনন্দিতা উচ্ছল প্রকৃতির। আবার কখনো কখনো বরফশীতল।নিজের মুডকে তিনি বিভিন্নভাবে কন্ট্রোল করে পরিস্থিতিকে দখলে আনতে পারেন।
    যে ছেলেটি এ ঘরে পিজি হয়ে থাকবে সে যদি লাল রঙে আপত্তি করে তখন দেখা যাবে। সুনন্দিতা অবশ্য বারবার বলেছেন , পিজি কেন? বন্ধুর ছেলে এমনি থাকবে। ছেলেটি কিছুতেই রাজি নয়। তার অসুবিধে হবে। অস্বস্তি লাগবে। সুনন্দিতা ঘরে কিছু কারনেশান রেখেছেন। কিছু গ্ল্যাডিওলাস। ব্রাইট কালারস চিয়ার আপ ইওর মাইন্ড।
    পরমজিত বেরিয়ে গেলেন গাড়ি নিয়ে। অফিসে পৌঁছে গাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। একটার সময় বেরোবেন সুনন্দিতা। তার আগে রান্না আছে।বাঈ আসতেই বলেছেন আমেলিয়ার ব্রেকফাস্ট আগেভাগে রেডি করতে। নিকির আর সুমনের জন্য একটা করে বড় প্যানকেক বানিয়ে ফেললেন।
    লাঞ্চের জন্য হাত খুলে জমিয়ে বাঙালি রান্না করলেন আজ।নিজে হাতে । পরমজিত বাঙালি খাদ্য খুব ভালোবাসেন। কিন্ত আমেলিয়া ছোঁবেন না। শি স্টিল মেইনটেইন্স হার কলোনিয়াল হ্যাবিটস অ্যান্ড প্রাইড। এক্সেপ্ট ফর দ্যাট টিপিক্যাল পাঞ্জাবি চা।
    দইরুই করেছেন। বাঙালি ছেলেটি নিশ্চয়ই পছন্দ করবে। এটা সুনন্দিতা মাছটা না ভেজেই করেন। বাটার চিকেন। ডাল।আলুভাজা। একটা পাঁচমিশেল সবজি রাখলেন। নিকি পুরো ভিগান। ওর জন্য ব্রকোলি, গাজর , টোম্যাটো দিয়ে একটা স্যালাড।

    স্নান সেরে একটা সবুজ হাঁটু পর্যন্ত কুর্তা পরেছেন । সাদা পালাজো। গাড়ি আসেনি এখনো। পরমকে ফোন করলেন । এয়ারপোর্ট যেতে দেরি করলে হবে না। ফ্লাইট দেড়টায় ল্যান্ড করবে। কিছুটা আগে পৌঁছে যাওয়া দরকার । সুনন্দিতা চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। আজ একটি ইম্পরট্যান্ট দিন।
    তাঁর ও পরমের বন্ধু মালবিকা ও ত্রিদিবের ছেলে দেবরূপ আসছে ফ্লাইটে। সুনন্দিতা খুব উদ্বেল হয়ে আছেন। 


    পর্ব দুই


    আমেলিয়া অনেকটা সময় শুয়ে থাকেন বটে কিন্তু তাঁর জ্ঞানবুদ্ধি বেশ টনটনে এই বিরাশিতেও। বাড়ির কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে, সবদিকে তাঁর পুরো খেয়াল থাকে।তিনি যে মালকিন সেটা একেবারে ভোলেন না।ভুলতেও দেন না । আমেলিয়া একটি বিশাল মেহগনি কাঠের খাটের মাঝখানে একটি পুতুলের মতো নিজেকে দেখছিলেন উল্টোদিকের ডিম্বাকৃতি বেলজিয়ান আয়নাতে। প্রবাদ আছে , বিছানার সামনে আয়না রাখতে হয় না। কিন্ত সেসব না মেনে আমেলিয়া নিজের বিছানার সামনেই মস্ত আয়নাটি টাঙিয়েছেন।তার চারদিকে গ্রিক পরি ও দেবশিশুদের কারুকাজ। যেহেতু বিছানা থেকে উঠে তিনি ড্রেসিং টেবলের সামনে গিয়ে বসতে পারেন না, তাই তাঁর ইচ্ছেঅনুযায়ী সুনন্দিতা, তাঁর পুত্রবধূ আয়নাটি খাটের সামনের দেওয়ালে ফিট করে দিয়েছেন। আমেলিয়ার খাটের দুপাশে দুটি সাইড টেবল। একটিতে তাঁর ওষুধপত্র। জলের গ্লাস। দুয়েকটা বই।চশমা। আরেকটি সাইড টেবলে তাঁর প্রসাধনের বাক্স।আমেলিয়া প্রসাধিত হতে ভালোবাসেন। তাঁর জন্য ত্বক এবং গাত্রের নানারকম ক্রিম ও লোশন সাজিয়ে রাখতে হয় সুনন্দিতাকে । তিনি নিজেও নিজের জন্য অতকিছু করেন না। কিন্ত আমেলিয়ার সবরকম প্রসাধনী ও সুগন্ধী চাই।নাহলে তিনি ছেলেমানুষের মত বায়না জুড়ে দেন।
    আমেলিয়ার বংশগৌরব নিয়ে একটা ব্যাপার ছিল বটে বরাবর।যখন তিনি ফুটফুটে নীলনয়না তরুণী ছিলেন তখন সেটি অত প্রকট ছিল না। বয়স ও সাংসারিক পদমর্যাদা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তিনি তত গরবিণী হয়েছেন। জেনোফেনন তাঁর সাইক্রোফেডিয়া কিতাবে ভারতবর্ষ ও আর্মেনিয়ার ব্যবসায়িক সম্পর্কর কথা লিখেছিলেন খৃষ্টপূর্ব শতকে। সেসব কথা একেবারেই বানানো নয়।বরাবর আর্মেনিয়ানরা ভারতে ব্যবসা করে এসেছে।মুঘল সাম্রাজ্যে তাদের বেশ রমারমা কারবার ছিল। সম্রাট আকবরের তো খোদ আর্মেনিয়ান বেগম ছিলেন মরিয়ম বেগম সাহিবা। সেইসময় থেকে আর্মানিরা ভারতে গভর্নর আর জেনারেলের পদ পেয়ে এসেছে।
    আমেলিয়ার মায়ের বংশ ভারতে প্রথমদিকের আর্মানি বংশ। সেই বংশের মানুষ থমাস ক্যানা মালাবার উপকূলে এসেছিলেন মশলা আর মাসলিনের ব্যবসা করতে। অটোম্যান আর সাফাবিদদের আক্রমণে বিধ্বস্ত আর্মানিরা তখন নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যবসার কাজে। ক্যানা পরিবারের বব গেলেন ফরাসিদেশে।সেখানেই সুগন্ধীর ব্যবসা শুরু করলেন। থমাস ক্যানার পরিবার মালাবারের শাসকদের কাছ থেকে তাম্রপত্র পেয়েছিলেন। তাতে লেখা আছে যে ক্যানার পরিবার বিশেষ বাণিজ্যিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সুযোগ সুবিধা পাবে বংশপরম্পরায়। ক্যানার পরিবার বড় হল। ছেলেরা মাসলিন ও মশলার সঙ্গে সঙ্গেই ধরে নিল বারুদের ব্যবসা। কানাজ থমা বা ব্যবসায়ী টমাসের বংশধররা ছড়িয়ে পড়ল মুম্বাই, আগ্রা, চিনসুরা, সম্রাট, কানপুর, কলকাতাতে। পর্তুগীজ আর ফরাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করছিল তারা। কেউ কেউ বব ক্যানার পরিবারের সঙ্গে যোগ দিল ফ্রান্সে ।এই ক্যানার পরিবারের এক মেয়ের সঙ্গেই বিবাহ হয়েছিল আগ্রার বারুদ ব্যবসায়ী জোনাথন আরশাকুনির। তাঁদের দ্বিতীয় কন্যা শ্রীমতী আমেলিয়া আরশাকুনি রূপোর চামচ মুখে করে জন্মেছিলেন। দেশভাগের পর তাঁদের কোনো অবস্থান্তর ঘটেনি। ব্রিটিশরা বরাবর আর্মেনিয়ানদের খাতির করে এসেছে।অর্থ ও প্রতিপত্তির কোনো অভাব ছিল না।সরকার অনেক সুবিধে দিয়েছে। জোনাথন তাঁর স্ত্রী ও আদরিণী কন্যাদুটিকে খুব ছোটবেলাতেই ফরাসিদেশে পাঠিয়েছিলেন তাঁর দাদার কাছে ফরাসি আদবকায়দাতে চোস্ত হবার জন্য। সেখানে হঠাৎই এক সুঠাম, সুদর্শন দীর্ঘকায় পাঞ্জাবী শেফকে দেখে আমেলিয়া দুম করে তাঁর প্রেমে পড়ে যান।নিয়মিত সেই রেস্তঁরাতে যাতায়াত শুরু হল। প্রতাপভানু নীল নয়না সুন্দরী দেখে অভ্যস্ত কিন্ত আমেলিয়ার মধ্যে প্রাচ্যের উচ্ছাসের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সফিস্টিকেশন। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরশাকুনিদের বহুযুগের কানেকশন। বাবা জোনাথন সেখানেই ব্যবসা করছেন। আমেলিয়া যে পরিবারে জন্মেছেন, তাতে ভারতীয় খানাতে তাঁর জিভ কিছুটা অভ্যস্ত। আর্মানি খাদ্যরুচি ভারতের অনেককিছু নিয়েছে । ফরাসি কান্ট্রিসাইডে সেদ্ধ আলু আর সেদ্ধ মাংস খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে তিনি জোর করেই একটি ভারতীয় রেস্তঁরাতে হানা দেন দিদি ক্যামিলাকে নিয়ে।
    প্রতাপভানু তখন ছাব্বিশের টগবগে যুবা। দীর্ঘকায়।উন্নতনাসা। পার্টিশন তাঁকে বিধ্বস্ত করতে পারেনি। লাহোর থেকে লোধি এসে নিজের হাতে খেতিবাড়ি করেছেন। ফ্রান্সে এসেছেন আরো রোজগারের স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্ন থাকল।কিন্তু আমেলিয়া সেটা খানিক পাল্টে দিলেন। আগুনবাড়ির মেয়ে আমেলিয়া বাপকা বেটি।জিদ্দি ও খামখেয়ালি। প্রতাপভানুকে বিয়ে করে আমেলিয়া ভারতে ফিরলেন। ততদিনে তাঁদের প্রথম সন্তান জয়ন্তপ্রতাপের জন্ম হয়ে গেছে। বাচ্চা নিয়ে আমেলিয়া ওদেশের ঠান্ডাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। আগ্রাতে পৈত্রিক বাড়িতে ফিরলে দুটো আয়া থাকবে হাতের কাছে।তাছাড়া পাঞ্জাবে যে বিপুল ভূসম্পত্তি তা তো কম বড় কথা নয়। তাই বা হাতছাড়া করা কেন? ইউজ ইট।
    সেইজন্য,কথায় কথায় আমেলিয়া প্রতাপভানুকে শোনাতেন, আই অ্যাম মোর ইন্ডিয়ান দ্যান ইউ। আমার দাদু আর ঠাকুরদার পরিবার মুঘল আমল থেকে ইন্ডিয়াতে আছে। ইউ আর আ লাহোরিয়ান। দুদিন হল ইন্ডিয়াতে এসেছো। ইউ কিপ শাট।

    এই কথাগুলো তিনি ছেলে , ছেলের বউ এবং নাতি নাতনিদেরও শুনিয়ে থাকেন। সবাই এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়।তবে আমেলিয়াকে নিয়ে , তাঁর বাতিক ইত্যাদি নিয়ে হাসাহাসি করার প্রচলনও এই বাড়িতে নেই। তাঁকে যথেষ্ট সিরিয়াসভাবেই নেয় সকলে । সকালবেলা তিনি বিছানাতেই ফোল্ডিং টেবলে বেড টি ও ব্রেকফাস্ট নেন। তারপর আবার একটা ছোটখাটো ঘুম। স্নান করিয়ে দিচ্ছেন এখন সুনন্দিতা নিজেই। হলে দুটি হুইলচেয়ার আছে। অবশ্য হুইলচেয়ার ব্যবহার করা আমেলিয়ার পছন্দের নয়।ছেলে বা বউ বা নাতি তাঁকে বিকেলের দিকে প্রশস্ত লিভিংরুমে বসিয়ে দেয়।সন্ধে পর্যন্ত আমেলিয়ার এখানেই অধিষ্ঠান।সাতটার মধ্যে তাঁর খাওয়া হয়ে যায় এখানেই। আটটা সাড়ে আটটার দিকে তিনি নিজের ঘরে চলে যান।
    এই বাড়িতে আর্মানি, পাঞ্জাবী এবং বাঙালী খানার একটা আশ্চর্য সংমিশ্রণ ঘটেছে। এমনিতেই দীর্ঘদিন ভারতে থাকার ফলে আর্মানিদের সাংস্কৃতিক এবং গ্যাস্ট্রোনোমিক বিবর্তন হয়েছে অনেক। তারপর সুনন্দিতার একটা খাঁটি বাঙালি ট্র্যাডিশন আছে। দীনহাটা- কোচবিহার- বিশ্বভারতী- দিল্লি মিলিয়ে তিনি একটি মেল্টিং পট। তদুপরি এই বাড়ির সেবিকাটিও বাঙালিনী। রান্নাবান্নাতে তাই অনেক মিশেল।এবং আমেলিয়া মেহতা সেটা অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। যা কিছু অ্যামালগেমাস তাই আমেলিয়ার পছন্দের। এবং সুনন্দিতারও। এইখানে শাশুড়ি বউয়ের একটা মিল আছে।এবং বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আমেলিয়ার গভীর শ্রদ্ধা ।টেগোর অ্যান্ড রবিশঙ্কর অ্যান্ড রে।
    বরং সুনন্দিতা যাঁকে এই পাঞ্জাবী বাগের বন্ধু বান্ধব সানি বলে ডাকে , তিনিই আর্মেনিয়ানদের সম্পর্কে অত কিছু জানেন না।তাঁর প্যাশন নাচ। যে নাচ তাঁকে দিনহাটা থেকে কোচবিহার এবং সেখান বিশ্বভারতী নিয়ে যায়। বিশ্বভারতীর হস্টেলে মালবিকা মন্ডল তাঁর রুমমেট ছিলেন। মালবিকা একবছরের সিনিয়র কিন্তু এই দুটি কন্যার নাচের জুড়ি খুব খ্যাতি পেয়েছিল। মালবিকা ত্রিদিবকে বিবাহ করে স্কুল ও ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।সুনন্দিতা চলে আসেন স্কলারশিপ নিয়ে দিল্লি। ত্রিদিবের বন্ধু পরমপ্রতাপের সঙ্গে এখানেই তাঁর পরিচয়।বিয়ের পরে নাচ একেবারেই ছাড়েননি সুনন্দিতা। ছেলেমেয়েদের জন্মের ফাঁকেও নাচ চালিয়ে গেছেন। আকাদেমির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অতিথি আসলে সুমনকে তার ঘর ছেড়ে দিতে হত না। কিন্ত পরমপ্রতাপ সুনন্দিতার নাচের স্কুলের জন্য তিনটি বড় ঘর ভেঙে একটি হল করে দিয়েছেন। সুনন্দিতা বাড়িতে নিয়মিত ক্লাস করান। গেস্ট রুম তৈরি হবে নতুন করে। হয়েই যেত এপ্রিলে। করোনার জন্য সব থেমে গেল।আপাতত সুমন বরসাতিতে শিফট হয়েছে। দিল্লির বাড়িতে বরসাতি থাকবেই আর বরসাতি খুব কমফর্টেবল। সুমনের কোনো অসুবিধে নেই। তার শরীরচর্চা ঠিক থাকলেই হল। ছাতেও সে ব্যায়াম করে জিম থেকে ফিরে।ছাতে একটি শেড করে সে জিমের সরঞ্জাম রাখে।

    আয়া। মানি। মানি মালদার মেয়ে। বরের সঙ্গে দিল্লি এসেছিল। বর কন্স্ট্রাকশনের কাজ করে। মানি আয়ার কাজ। লকডাউনের পর থেকে মানি আসছে না। মালদা ফিরে গেছিল। সুনন্দিতা ফোন করেছেন। কবে আসবি মানি? মানি বলতে পারছে না। আসবে না থেকে যাবে তাও ঠিক নেই। পরম অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন। গেট অ্যানাদার আয়া। কোই আউরকো রাখ লো।
    পরম বুঝতে পারছেন না যে ঝট করে নতুন আয়া রাখা যায় না।বিশেষ করে এই করোনাকালে।আমেলিয়ার যথেষ্ট প্যাখনা আছে।তিনি মুডি।মেজাজি এবং অসহায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নার্ভের সমস্যা বৃদ্ধি পায়।ইউরিন এসে যায় কাশলে।হাঁচলে। সঙ্গেসঙ্গে ডায়াপার চেঞ্জ না করলেই রেগে যান।
    মানি দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে সবকিছু জানে ।ধাঁচ বোঝে। যে কোনো আয়া দিয়ে হবে না।দু দিনে ছেড়ে চলে যাবে।
    নিকি গোল চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলে, মাম্মি অনলাইনমে দেখো। মেনশন অল ক্রাইটেরিয়াজ। ইনক্লুডিং গ্র্যানি'জ ট্যানট্রামজ।
    নিকি আমেলিয়াকে আম্মু বলে। কখনোসখনো গ্র্যানি। সুনন্দিতা ঠোঁট চেপে তাকান। এই বাড়িতে দুজনের জন্য আয়া দরকার হয়। একজনের জন্য বেশি। আর একজনের জন্যও, হয়তো কিছুটা কম।তবু দরকার হয়।
    পরমপ্রতাপের কাজের চাপ প্রচন্ড। সকালে বেরিয়ে একেবারে রাতে ফেরেন ইদানিং। খুব বড়সড় কিছু ঘটতে চলেছে । কাজ তো আছেই তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃষকদের দাবী দাওয়া। পরম নিজেই জড়িয়েছেন। পাঞ্জাব এখনো তাঁর খেতি।আসলি মুল্ক তাঁর পাঞ্জাব। তারপর দেবরূপ আসছে। মালবিকা বলেছেন সবকিছুই ফোনে বলেছেন সুনন্দিতাকে। এখন মানির ফিরে আসা দরকার মালদা থেকে।খুব দরকার।নাচের ক্লাস ভার্চুয়াল হচ্ছে।তাছাড়া দুটি তিনটি মেয়ে আসতে শুরু করেছে কাছাকাছি এলাকা থেকে।
    আমেলিয়া ও নিকির জন্য ভয়ে ভয়ে থাকেন সুনন্দিতা। একজনের বয়স।আরেকজনের অসুস্থতা।
    সাত বছর বয়সে মায়াস্থেনিয়া গ্রেভিস ধরা পড়ে। নিকির শরীরে মাসল ও নার্ভের কানেকশনস নেই।সবরকম চেষ্টা হয়েছে। এদেশে।বিদেশে। হাঁটতে পারে না।
    দুটো হুইলচেয়ারের একটা নিকির। সে এখন চব্বিশ। বয়েজ কাট চুল। সুনন্দিতাই করিয়ে দিয়েছেন। এই মেয়ের চুল মেইনটেইন করা খুব ঝামেলা।বিশেষ করে নিকির পক্ষে।যে নিজে দাঁড়াতে পারে না।
    খুব রোগা নিকি।এতটা ফর্সা যে শিরা দেখা যায়। হঠাৎ করে ওকে দেখলে কোনো কিশোর বলে ভ্রম হয়।ওর সব পড়াশোনা বাড়িতেই।ডিসট্যান্সে। নানা কিছু করে ল্যাপটপে।বলতে গেলে ল্যাপটপ সর্বস্ব জীবন ওর।

    মেহতা পরিবারে এই দু' জনের ওপর করোনাকাল তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। একজন আমেলিয়া। আরেকজন নিকি। এঁরা বাড়ির বাইরে যান কদাচিৎ। এবং গেলেও হুইলচেয়ার ছাড়া উপায় নেই।
    মানিকে এখন দরকার।খুব দরকার।
    আমেলিয়া ভুলেই গেছেন যে মানি বাড়িতে নেই।লকডাউনের পর থেকেই নেই। তিনি পাউডার খুঁজে পাচ্ছেন না।জোরে চিৎকার করতে পারেন না।তাও উঁচু গলায় ডাকছেন , মানি!,মানি কাম হিয়ার! 


    পর্ব তিন


    পরমপ্রতাপ তাঁর বড়দাদার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। এই মূহূর্তে তাঁর চার পাঁচটি কন্স্ট্রাকশনের কাজ একসঙ্গে চলছে। আর্কিটেক্টদের সঙ্গে পরপর মিটিং বসবে।টানা। লাঞ্চ করতেও সময় পাবেন কিনা ঠিক নেই। কিন্ত জয়ন্তপ্রতাপের ফোন আরো জরুরী। কৃষি আইনের বিরুদ্ধে জমায়েত শুরু হবে। তাঁরা দিল্লি আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরমের ওপর দায়িত্ব একটি চারপাতার পত্রিকা প্রকাশ করার। যাতে কৃষকদের বক্তব্য, তাঁদের দাবী এবং আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি সব পাওয়া যাবে। এইরকম কাজ পরম আগে কখনো করেননি। একটি টিম তৈরি করতে হবে প্রকাশনার। দুই ভাইতে এইসব কথাবার্তা হচ্ছে। টিমে দিল্লির লোকজন থাকবেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে কয়েকজন সিলেক্টেড মানুষ। জয়ন্ত বলছিলেন, দেশের বহু মানুষ এখনো কৃষি আইন সম্পর্কে কিছু জানেন না। এতে কী ক্ষতি কী লাভ কিছুই বোঝেন না। আমজনতা মলে গিয়ে বাজার করাকে মোক্ষ বলে জেনেছেন। পাইকারি বাজার মার খেলে কী হবে বুঝতেই পারছেন না। এরমধ্যেই সুনন্দিতা ফোন করে জানালেন গাড়ি পাঠিয়ে দিতে। পরম একেবারে ভুলে গেছিলেন। কিষাণকে ফোন করে এয়ারপোর্ট যেতে বলে পরম দিলীপকে ডাকলেন।দিলীপ মেরহোত্রার সঙ্গে প্রেসের যোগাযোগ ভালো। যে পত্রিকা প্রকাশ হবে, তার দাম বেশি হওয়া চলবে না। সাধারণ মানুষ যাতে পড়তে পারে। ঠিকঠাক সাংবাদিক চাই। বিজ্ঞাপন কম। তিনি নিজে দুটো দিয়ে দেবেন। বাকিটা দিলীপ সামলাতে পারবেন। ব্র্যান্ডকে প্রতিহত করা এবং আঘাত করা খুব সহজ কাজ নয়। মিডিয়া একেবারেই সঙ্গ দেবে না। কাজেই খুব ঠিকঠাক প্ল্যানিং চাই। আর্কিটেক্টদের সঙ্গে মিটিং শেষ করেই পরম এইদিকটা নিয়ে বসবেন। জয়ন্তপ্রতাপের ছোট মেয়ে নয়না ইউ এস এ তে পড়াশোনা করে আইন নিয়ে। সে ফিরে আসছে এই আন্দোলনে যোগ দিতে। প্রস্তুতি চলছে সাজো সাজো রবে। পরম নিজেও এক মুহূর্তের জন্য ভোলেন না যে এখনো তিনি মূলত একজন কৃষক। 


    সেক্রেটারি সুহাসিণীকে ডেকে বলে দিলেন মিটিং শুরু করতে বোর্ড রুমে। এখন যান্ত্রিকভাবে কাজ করে যেতে হবে। সামনে কঠিন লড়াই। 


    মেহতাদের একটা আলাদা গোষ্ঠি আছে। পশ্চিম গুজরাতে লেহানা আর সিন্ধি মেহতাদের থেকে তারা আলাদা। পাঞ্জাবের মেহতারা সবাই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অসম্ভব একতা তাঁদের মধ্যে। নয়না যে ফিরে আসছে শুধু আন্দোলনে যোগ দিতে সেজন্য গোটা অরোরা গোষ্ঠি খুশি। বারবার ফোন পাচ্ছেন পরম। প্রতাপ ভানু নিজে পনেরো বছর বয়স থেকে হাল টেনেছেন, ট্র্যাক্টর চালিয়েছেন জমিতে। জয়ন্ত বলছিলেন চাররকমভাবে প্রতিবাদ হবে।ঘেরাও।ধর্ণা। রাস্তা রোকো।তারপর ডেমন্স্ট্রেশন। পরম আজ ছেলের সঙ্গেও কথা বলবেন বাড়ি ফিরে।ইয়ং জেনারেশন শুড কাম আপ।নয়না ইজ ইন্সপিরেশন।এরা যদি এগিয়ে না আসে তাহলে কোনো কাজই ফলপ্রসূ হবে না।


    প্লেন ল্যান্ড করার সময় শরীর হাল্কা হয়ে যায়।ওর পেটে কীরকম অস্বস্তি হল। উইন্ডো সিটে ছিল। বাইরে তাকিয়েছিল একদৃষ্টে। বাইরে কিছু নেই।শূন্য । ছ' মাসের মধ্যেই জীবন এত পাল্টে যেতে পারে! এখনো যেন তার কিছু বিশ্বাস হয় না। প্লেন যেন পুনেতে নামল। আর একঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে তার ছোট ফ্ল্যাটে। কেউ নিশ্চয়ই সকালে পরিস্কার করে রেখেছে সব। এমনকী লাঞ্চ কিছু একটা করে রেখেছে হটপটে।একটা হলুদের ওপর খয়েরিছাপ লং স্কার্ট, প্রান্তভাগ দেখা দিল, নরম ঘুমের ও ঘামের গন্ধ। আবার সেই নিশ্চিন্ত নিভৃত দুপুর।কোথাও পায়রা ডাকছে বকবকম করে। 


    নিভৃত স্বেদগন্ধ মস্তিষ্ককোষকে বিব্রত করতে থাকে।


    ফ্লাইটে পায়রা কেন! পাশের ভদ্রলোকের রিং টোন।কতরকম রিং টোন যে আছে ! চোখ খুলে সব ধোঁয়াটে লাগছে ওর। সাদা, ফ্যাকাশে অন্ধকার। এয়ারপোর্টে নেমে সবকিছু কেমন অজানা লাগে। এখানে মুখ থেকে মাস্ক খোলাও যাবে না। এই মুহূর্তে সে খুব দুর্বল বোধ করছে মানসিক ভাবে।না।কোনোমতেই তার পক্ষে পুনে ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সবসময়ই ভেতরে একটা ভয় কাজ করছে।মানুষের সঙ্গ চাইছে সে। কথা বলবে না নিজে।বই পড়বে। নিজের মধ্যে ডুবে থাকবে।কিন্ত আশেপাশে মানুষ থাকবে কিছু। 


    বাড়িতে এটা সে বুঝেছে। পুনেতে কতদিন একা কাটিয়েছে। কিছু অসুবিধা ছিল না।এখন পারছে না।কলকাতার বাড়িতে হয়তো সব ছাড়াছাড়া।কিন্ত মানুষের উত্তাপ টের পাওয়া যেত।মালবিকা অধিকাংশ সময়েই নিচে।ল্যাপটপের সামনে। ত্রিদিব আসা যাওয়া করছেন। টুপুর এদিক ওদিক যাচ্ছে ।মাঝে মাঝে উপচে এসে কথা বলছে। সবচেয়ে ভাইব্র্যান্ট উপস্থিতি শ্যামার। জোরে, চিৎকার করে কথা বলে।বাবুদাদা, মাগুরমাছ খাবে? পেঁয়াজকলি, টোমাটুর দিয়ে করি? শ্যামা টোম্যাটোকে টোমাটুর বলবেই। আগে তো আলোকে আলা বলতো।নিজে থেকে এসে একটা প্লেটে দুধের সর দিয়ে যাবে। ওপরে পাটালি গুড়। মোটা কড়া সর বাবু ভালবাসে। কিন্ত এখন খাওয়া না। খেতে রুচি নেই। তবু শ্যামার এসে দিয়ে যাওয়াটা ওকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। টুপুর এসে গলা জড়িয়ে ধরছে।আগে এটা করতো না। ইদানিং অনেক পাল্টেছে। ঈশান এসেছে দু একদিন। ও যে খুব কথা বলেছে তা নয়। কিন্ত লোকজন থাকলে ভালো লাগছে। ও যেন উত্তাপ শুষে নিতে চাইছে দূর থেকে। 


    ঈশান বলেছিল, তুমি এখন কিছুদিন একা থেকো না। অ্যাটলিস্ট সারাউন্ডেড থেকো। তিনজনে বেরিয়েছিল ওরা । একটু বাইরের দিকে একটা মেঠো চায়ের দোকানে বসেছিল। নামি দামী কোনো রেস্তঁরাতে যেতে পারছে না ও।দম আটকে আসবে জানে। কথা বলছে না বিশেষ। কিন্ত অন্যেরা কথা বললে ভালো লাগে। মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল ওরা। পায়ের কাছে দুটো কুকুর ঘুরঘুর করছে।টুপুর ভেঙে ভেঙে বিস্কিট দিচ্ছিল। 


    অতুলরা কী স্ট্রে ফিডিং করছে এখনো? হয়তো করছে। ও ফোন করে না। ওরা কখনো করে। অতুল আর রাজেশ । ও জানতে চায় না। একটা বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা কালো কুকুর ছিল। দেখলেই এসে বসে ডানদিকে মাথাটা হেলিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। 


    ঐ দিনটা ভালো লেগেছিল। মাস্ক মুক্ত। খোলা হাওয়াতে। 


    ঈশান বলল, তুমি দিল্লিতে একা থেকো না। গো ফর পি জি অ্যাকোমোডেশন। 


    মাস্ক নামালো মুখ থেকে। সুনন্দিতাই মেসেজ করেছেন। যাস্ট শো ইওর ফেস।আই উইল রিকগনাইজ ইউ।


    এয়ারপোর্টে কেমন নীলচে আঁধার। দূর থেকে এক মহিলার হাতনাড়া দেখতে পেল ও। উনি মুখ মাস্কে ঢেকে রেখেছেন। গুগল মিটে এঁর সঙ্গেই আলাপিত করিয়ে দিয়েছেন মালবিকা। ইনিই তবে সুনন্দিতা মেহতা। ত্রিদিব মালবিকার বন্ধু। সেইসূত্রে পারিবারিক যোগাযোগ এতদিন বাদে।দিল্লি না এলে এঁর কথা কিছুই জানত না সে।মায়ের বন্ধুদের খবর কে রাখে।বাড়িতে যাঁরা আসেন তাঁদের দুচারজনকে চিনত। বাট সুনন্দিতা মেহতা ইজ টোট্যালি আননোওন। এঁর বাড়িতে কীভাবে থাকা যাবে ও জানে না। 


    বেশ লম্বা মহিলা।বাঙালি মেয়েরা এত লম্বা হয় কম। দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছেন ওর দিকে। কী বলবে ও।ভীষণ ঘুম পাচ্ছে?হোক মায়ের বন্ধু। একদম অচেনা এক মহিলা।গুগল মিটে সে প্রায় চুপ করেই বসেছিল।মালবিকা আর সুনন্দিতার কথা কানে ঢুকছিল না।কিন্ত এখন তো কথা বলতে হবে। ইদানীং কথা বলার একটা অনীহা তৈরি হয়েছে তার। এখন কী করবে? খুব অস্বস্তি হতে থাকে। সুনন্দিতা একদম কাছে চলে এসেছেন।ঝটিতি মাস্ক টেনে মুখ ঢেকে নিল সে।মাস্কে একটা সুবিধে। মনের ভাব, বিরক্তি, অনীহা সব ঢেকে ফেলা যায়। 


    সুনন্দিতা সামনে এসে একটু ঝুঁকে ওর কাঁধে হাত দিয়ে সামনে টেনে নিলেন।


    হাই দেবরূপ! মোস্ট ওয়েলকাম।


    বাড়িতে বেশ জাঁকালো দুপুর। আমেলিয়া মাঝেমাঝে কিঞ্চিত স্মৃতিভ্রংশ ব্যতীত যথেষ্ট সজাগ। অন্তত সেটা প্রদর্শন করেন। নিকিকে জিজ্ঞেস করছেন বারবার। হুজ দিস ইয়ং ম্যান কামিং ফ্রম ক্যালকাটা? 


    আমেলিয়ার কাছে এখনো ক্যালক্যাটা। কলকাতা নয়। নিকি ল্যাপটপে ম্যাপিং করতে করতে জবাব দিয়েছে, আই থিংক হি ইজ ফ্রম পুনে। মাম্মীসে পুছ লো। 


    সুনন্দিতার টিকি পাচ্ছেন না আমেলিয়া। ছেলেকে ফোন করলেন।


    - ক্যায় বাত? আর ইউ কামিং ফর লাঞ্চ? 


    পরম ফোন কেটেছেন দুবার। আমেলিয়ার গোঁসা হয়েছে। কে এই ছেলে তাঁর বাড়িতে থাকবে। অ্যান্ড হোয়াই পিজি? পরমের কী টাকার অভাব হয়েছে?মেহতা ফ্যামিলিতে পিজি! 


    - নিকি! তোমার বাবা কী আজ খুব বিজি? 


    নিকি ঘাড় নাড়ল। বাঈ আমেলিয়াকে লিভিংরুমের হাইচেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে। একটা হাইনেক সাদা আর পিংক ফ্লোরাল পোশাক পরেছেন তিনি পছন্দ করে। গলার কুন্চন ঢেকে যায় তাতে। গলায় একটি মুক্তোর ছড়া।


    - অ্যান্ড মে আই নো হোয়াট ইট ইজ অল অ্যাবাউট? 


    - পাপা বহোৎ বিজি হ্যায় আম্মু। উও ফারমার বিল লে কে মুভমেন্ট শুরু হোগা। 


    আমেলিয়া তাঁর সরু সরু আঙুলের মধ্যে আঙুল চালনা করছেন।


    - ইজ ইট রিলেটেড টু ল্যান্ড সিলিং বিল? 


    নিকি ঘাড় ফিরিয়ে আমেলিয়ার দিকে তাকাল গোল চশমার ফাঁকে। আম্মু অনেক পিছিয়ে গেছে। সেভেন্টি সিক্সের ল্যান্ড রিফর্ম বিল ভাবছে। শি ওয়জ ইয়ং অ্যান্ড অ্যাক্টিভ অ্যাট দ্যাট টাইম।সারপ্লাস জমি সরকার টেক আপ করেছিল মেহতা গ্রুপের । ডেমেনশিয়া ইজ টেকিং হার। 


    সারা রাস্তা ও চুপ করে ছিল। প্রাথমিক মাস্কবন্দী সম্ভাষণটুকু শুধু। মুখ থেকে আভরণ সরায়নি। সুনন্দিতা কী খুব ইম্পোজিং? কেমন টাওয়ার করে নিয়ে এলেন যেন। তাহলে মুশকিল হবে। ও নির্জনতা চায়।এবং সেই নির্জনতাকে ঘিরে নন ইন্টারফিয়ারিং মন্যুষ্যবৃত্ত। খুব কঠিন।


    সুনন্দিতা টুকটাক দুয়েকটা কথা বলেছেন। মালবিকা ত্রিদিবের খবর। লাঞ্চে ভাত খাবে কিনা। 


    গাড়ি পর্চে এসে দাঁড়াল। ও নেমে দাঁড়িয়েছিল। আইভিলতা। এবং গোল্ডেন শাওয়ার আচ্ছাদিত । মালবিকা যেন আছেন কোথাও। 


    সুনন্দিতা বললেন, এসো। কাম ইন। 


    ওর কোভিড নাইন্টিন নেগেটিভ টেস্ট রিপোর্ট সঙ্গে। আসার পাঁচদিন আগে করিয়েছে। ইফ করোনা রিপিটস! করোনা একবার হয়ে গেলেও সাবধানের মার নেই। 


    ঢুকেই থমকে গেল। হলটা প্রায়ান্ধকার। পর্দা টানা আছে।গাঢ় নীল রঙের ভারি পর্দা। কোণের দিকে


    হাইচেয়ারে একজন প্রাচীন রাণী বসে আছেন। সাদা চুল চুড়ো করে বাঁধা। নীল চোখ যেন ওর সবটা পড়তে চাইছে দোরগোড়াতেই। 


    আমেলিয়া বেশ জোরে বললেন, 


    সো ইউ আর ফ্রম ক্যালক্যাটা? হ্যাভ ইউ এভার মেট টেগোর?


    পর্ব চার


    মানি আর তার বর বিশু লকডাউনের প্রথম দিকেই মালদা ফিরেছিল।


    পায়ে হেঁটে ।তারপর বাসে।বাস নগদ তিন হাজার টাকা করে নিয়েছিল মাথা পিছু।মানি সুনন্দিতার পছন্দের মানুষ। তার পেছনে অনেক সূক্ষ্ম কারন এবং অকারণ আছে।মানি সেইসব কথা মনে করে দিল্লি ফিরতে চায়।বিশু চায় না।সেই নিয়ে মানিতে বিশুতে একটা মনকষাকষি চলছে। 


    ওরা যখন মালদাতে ফিরেছে তখন ঘোর লকডাউন। কলকাতা পর্যন্ত বাস।তারপর ট্রাক। লুকিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে নেমেছে মায়াবনের কাছে। তারপর হেঁটে সাহাপুর। সেও খুব কম দুর না। তিন নম্বর কলোনি দিয়ে মানির ভাষাতে শট কাট। ছাত থেকে লোক দেখেছে ওরা ঢুকছে। সবাই জানে লেবাররা ফিরছে। কেউ কিছু বলেনি। ওরা চুপচাপ নিজেদের ঘরে ঢুকে গেছে। মানির দুটো ছেলে। শাশুড়ির জিম্মাতে দুটোকে রেখে ওরা দিল্লি গেছিল। প্রথমে গেছিল বিশু। কন্স্ট্রাকশনের কাজেই গেছিল। একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল। বছরখানেক বাদে মানিকে বলল, চলে আয়। একা বড় অসুবিধে। ছেলেরা তখন একটা ফোর। একটা সিক্স। শাশুড়ির কাছে রেখে মানি চলে গেল। শাশুড়ি বড় জাঁদরেল। নাতিদের খুব চোখে চোখে রাখে। দু বাড়ির রান্নার কাজ। তারপর সারাদিন বাড়িতে। ছেলেদের নিয়ে মানির চিন্তা নেই। কিন্ত লকডাউনে শাশুড়ির কাজ গেছে। এখন সে বাড়িতে বসা। কাজের মানুষ বাড়িতে বসলে খিটখিটে হয়ে যায়। বিশু মায়ের কাছে আশি হাজার টাকা চেয়েছিল। টোটো কিনবে। শাশুড়ি ময়না বলেছে দেবে না। বিশু রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। ফোন বন্ধ করে রেখেছে।কোথায় গেছে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।


    এগুলো আসলে দখল করা জমি। নদীর তীরে। ফি বছর জল বাড়লে ঘরে জল ঢোকে। মানিরা জিনিসপত্র বাঁধা ছাঁদা করে ইস্কুল বাড়িতে ঢুকত। আবার জল নামলে জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরত। ইস্কুলবাড়িতে থাকা মন্দ না। সেখানে পাড়াশুদ্ধ ঝাঁপিয়ে উঠত। ভাব ভালবাসা, ঝগড়া, মারামারি মায় প্রেম বিয়েও হয়ে যায় বন্যাকালে। মানি অনেক দেখেছে। বিশুকে ঝাড়ি মারতে দেখেছে মুন্নাকে। একটু আধটুতে মানি কিছু বলে না। কড়া হাতে বিশুর রাশ ধরে থাকে। বিশু তখন মাছ ধরতো। 


    ময়নার দুই ব্যাটা। বড়টা যিশু। আগে বাস কনডাকটর ছিল। এখন টোটো চালায়। ভালোই রোজগার। এক ব্যাটা এক বেটি নিয়ে একবাড়িতে আলাদা খায়। বড়বউয়ের সঙ্গে ময়নার বনে না। দুজনে কথা নেই।কেউ কারু ধার ধারে না। ভাল কিছু রাঁধলে ময়না একটা বাটি ধরে বড় বউয়ের ঘরে দিয়ে আসে। ঘরে ঢোকে না। দরজা থেকে হাঁক পাড়ে। যিশু আর নাতনি নাতির জন্য রাখলাম। যিশু এসে বাটি নিয়ে যায়। বউ ময়নার দেওয়া বাড়ির বস্তু খায়ও না।কিছু বলেও না।তবে ময়না মাঝে মাঝে যিশুকে টাকা ধার দেয়।টোটো খারাপ হলে।পেট খারাপ হলে। ছেলের জ্বর হলে। সেটা নিয়ে বড়বউ কিছু বলে না। মা ছেলের ব্যাপার নিজেরা বুঝে নিক। তার নিজের রোজগার আছে। চার বাড়ির কাজ। লকডাউনের পর তিনটে গেছে। 


    ময়নার টাকা প্রায় পুরোটাই জমতো। তার নিজের খাওয়া কাজের বাড়িতে। সকালে চারটে হাতরুটি আর তরকারি হয়ে যায় ব্যাঙ্কের বাড়িতে। ওরা কত্তা গিন্নি দুজনে অফিস যায়। রান্না সেরে ময়না মেজ বাড়িতে ঢুকত। এরা আবার রিটায়ার করা লোক। ময়নার বয়সীই হবে। তবে ময়না মাসীমা বলে। এখানে রান্নার পরে দুপুরের খাওয়া ।ময়না কাজে ঢুকেই বলেছিল, রান্না খেয়ে দেখো।তারপর বোলো। কাজ করবো।কিন্ত খাওয়া দিতে হবে।নয়তো ময়নার কাজের অভাব নেই। 


    এরা খেতে দেয়।ভালোই দেয়।কারণ ময়না রাঁধে ভালো। বেগুন বাসন্তী হোক বা শিম বেগুন বড়ি দিয়ে চচ্চড়ি, পেঁয়াজকলি দিয়ে সামান্য আলু ছড়িয়ে কুঁচো চিংড়ি কিংবা ল্যাটা মাছের ঝুড়ি ভাজা, ময়নার হাতে খুলে যায়। তাই খেতে যখন দেবে , স্নানটাও করে যাই। এ বাড়িতে তো দেবা আর দেবী। দুজনেই চাকরি করতো।এখন বাড়ি বসা।তাদের ছেলেমেয়েরা দুরে দুরে। ছেলে ব্যাংগালোরে আর মেয়ে লন্ডনে।


    ময়না যখন স্নান করবে তখন তেল সাবান কী বাড়ি থেকে টেনে টেনে নিয়ে আসবে? কাজেই ধুঁধুলের খোসা আর লাক্স সাবান সহযোগে স্নান করে , কাপড় কেচে ছাতে মেলে ময়না আগের দিনের ছোলার ডাল কষে গরম করতো । আর দুটো কিশমিশ ফেলে। মাসী মেসো তখন খেয়ে দেয়ে ঘুম।নয় খবরের কাগজ।সেলাই।


    ময়নার ইচ্ছে হলে খোসাশুদ্ধ আলু ডুমো ডুমো করে কেটে ভেজে নিত, কালজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে। রান্নাঘরে ওরা আসে না। রাতের জন্য আটা মাখতে মাখতে রাসমণি আর সাঁঝের বাতি দেখা শেষ। তিনটের মধ্যে ময়না বাড়ি ফিরে যেত রাতের জন্য রুটি তরকারি টিফিন বাক্সে ভরে। নাতিরা ইস্কুল থেকে আসার আগেই।ছেলেদুটোকে রাতে ডিমের ঝোল ভাত দিলেই খুশি। নয় ডাল আলুভাজা। নাতিদের শাসনে রাখে ময়না। টুকটাক রান্না করতে শিখে গেছে দুটোই। ভাত ডাল মাছের ঝোল নামিয়ে দিতে পারে । ময়নার খরচ বলতে ইলেকট্রিক বিল। ছেলেদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে।আর কেবল টিভি। দুটো চ্যানেল। 


    ইচ্ছে করলে ময়না কী বিশুকে আশিহাজার দিতে পারতো না? দুবাড়ির তিন তিন ছহাজার টাকা তো ব্যাঙ্কে জমে প্রতিমাসে। 


    কিন্ত ময়না এককাট্টা মেয়েমানুষ। তার যেমন জেদ তেমন রাগ।ছোটছেলেকে মুখের ওপর বলে দিয়েছে, একপয়সা দেব না। তোর ছেলেদের দায়িত্ব নিয়েছি বুড়া বয়সে।আবার কী? দুজনে মিলে খাটিস দিল্লিতে। পয়সা জমাস নাই? 


    সত্যি কথা বলতে কী মানির একটু রাগ তো হয়েইছে। দিল্লি থেকে বিশু টাকা পাঠায় ছেলেদের জন্য শাশুড়ির অ্যাকাউন্টে। আর দেখাশোনা যা করে তা সব ঠাকমাই করে। তার ছেলেরা তো দুধের খোকা না।


    বড়ছেলেকে ময়না একটু টানে তার কারণ আছে। হাতের গোড়ায় তো বড়টা। আপদে বিপদে দেখবে শুনবে অন্তত। ফেলে তো দিতে পারবে না। তোরা তো টোনাটুনি কাকের বাসায় কোকিলের ছা রেখে দিল্লি উড়ে যাবি আবার মতলব হলেই। ময়না নামেই ময়না। ভালোমন্দ খেয়ে সে গায়েগতরে মন্দ না। বসলে উঠতে সময় লাগে। বড়বেটার বউ আড়ালে বলে খোদার খাসি। সামনে কিছু বলে না। ময়না তীক্ষ্ণ কন্ঠে চিল চিৎকার করতে পারে। 


    কিন্ত মানির সঙ্গে তো ময়নার সম্পর্ক ভালো। ঝাল করে কাকচী মাছের ঝোল আর পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে কড়কড়ে করে আলুউচ্ছে ভাজা দিয়ে ভাত রেঁধে দিয়েছিল মানি।এমনকী রাতের জন্য গরগরে করে হাঁসের ডিমের ঝোল। তবেই বিশু টোটোর টাকার কথা পেড়েছিল। হারামজাদী মুখের ওপর না বলে দিল। কেমন মা মাইরি। মানি ছাই আর মাটি দিয়ে পোড়া কড়াই থেকে হাঁসের ডিমের ঝোলের দাগ তুলছিল। বিশু মুখ গোমড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আর খোঁজ নেই।


    মানি একবার মুখ নরম করে শাশুড়ির কাছে বলেছিল, কোথায় গেল , ফোন তো বন্ধ। 


    কিন্ত কাজ ছাড়া মানুষের মেজাজ ভালো থাকে না। ঘরের পয়সা ভেঙে ময়নাকে খেতে হচ্ছে।দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিল, তোমার বর রেল লাইনে গলা দেবে না। দ্যাখো গে মামার বেটাদের সঙ্গে বসে নেশা করছে মঙ্গলবাড়িতে। 


    মা বটে একখানা। মানি ফোঁসফোঁস করতে করতে ভাবে।


    একবাড়িতে এতগুলো বেকার লোক থাকলে শান্তি থাকে না। যিশু লকডাউনের সময় টোটো চালাতে গিয়ে দুবার থানায় ঢুকেছিল। এখন আবার সাহাপুরের টোটো ব্রিজ পার হয়ে মালদায় চলতে দেয় না।সাহাপুরে আর কতই বা ভাড়া হয়।যিশু লুকিয়ে চুরিয়ে মালদাতে ট্রিপ মারে।ট্র্যাফিক পুলিশের সঙ্গে রফা আছে। 


    ঠিক বলেছিল ময়না। সন্ধের পর বিশু ফিরল। একগলা নেশা করে এসেছে। মানির গা পিত্তি জ্বলে গেল। 


    বিশু নেশা করলেই মানির মনে হয় এর থেকে দিল্লি ভালো ছিল।বিশু সকালে কাজে যেত। রাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরত। তার নিজের কাজ ছিল ছিমছাম। মেহতাদের বাড়িতে বুড়ি আম্মী আর নিকির দেখাশোনা করে। নিকি তাও অনেকটাই নিজে নিজেরটা করে।আম্মীর সব করে দিত মানি। রাতের বেলায় অন্য আয়া। খাওয়া দাওয়া সব মেহতা হাউসে। এখানে পাড়ার লোকে টোন কাটছে। কী রে দিল্লিওয়ালি? ফিরে এলি? খুব তো দেমাক দেখিয়ে দিল্লি গিয়েছিল? 


    মানি বলে না কিছু। এখন ফিরতে পারলে ভালো ছিল। কিন্ত বিশুর মাথায় ঢুকেছে এখানেই টোটো চালাবে। শাশুড়ি টাকা দেয়নি বলে মানি চটেছে ঠিক কিন্ত বিশুর মালদাতে পড়ে থাকাও তার পছন্দ না।


    মেহতা হাউসে থেকে মানির অনেক নতুন অভ্যেস হয়েছে। বুড়ির ডায়াপার পাল্টাতে হয়, হাগা মোতা সহ্য করতে হয়, এই যা ঝামেলা।তবে বুড়ি নিজে বড় পিটপিটে। একটু নোংরা সহ্য করতে পারে না।মেম বলে কথা।কী সুন্দর সব লেসের ভেতরের জামা প্যান্ট বুড়ির। মানি কয়েকটা সরিয়েছে। বুড়ি খুব খানকি। ঠিক জিজ্ঞেস করেছে, গোলাপিটা কোথায়? লেস বসানো সাদাটা? 


    কিন্ত সবসময়ই এসিতে থাকা। বসে থাকা।বিকেলে হুইলচেয়ার ঠেলে বাগানে। বাঈ চাট বানিয়ে দেয়। ছোলে। একটু হাগা মোতা পরিস্কারের বদলে এতকিছু। টাকাও ভালো। মোটমাট দিল্লিতে মানি সুখে ছিল।মাথার ওপর শাশুড়ির কচকচানি নেই।ছেলেদের দুরন্তপনা সামলাতে হয় না।বর ভালো কামাতো। নিজেও বেশ ছিল। করোনা হয়ে সব বারোটা বেজে গেল।


    মালদাতে লকডাউনের সময় করোনা রোগ ছড়ায়নি।লেবাররা যখন ঢুকতে শুরু করলো অলি গলি দিয়ে তখন লোকের ভয় ঢুকলো। মানি বিশু কেউই কোয়ারান্টাইনে থাকেনি।ময়না চুপচাপ ছিল।পাড়ার অনেক ছেলেরা তো ঐভাবে ফিরেছে। লেভেল ক্রসিংএ ট্রেন যখন দাঁড়ায় তখন নেমে গেছে।থাক না স্টেশনে যতখুশি পুলিশ পাহারা।প্রথম কদিন ঘরে চুপচাপ ছিল। তারপর আর রাখঢাক নেই।দেদার বেরোচ্ছে। যে যার মত। বিশু ঘরে ঢুকে বিছানায় পড়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে।মানি নদীতে গেল। জল অনেক কম এখন। বন্যার সময় এই নদী ফুলে ফেঁপে ওঠে। 


    সাহাপুর থেকে মালদা নৌকা পারাপার করে।নয়তো পায়ে হেঁটে বা টোটোতে ব্রিজ ধরে।লকডাউনের সময় নৌকা বন্ধ ছিল।


    জলে কচুরিপানা ভাসছে। ছেঁড়া কাপড়।ন্যাতাকানি। দুর্গার চালি।উপুড় হয়ে কাদাতে পড়ে আছে। মানি জলে নামতে নামতে আনমনা হয়ে যায়। দিল্লির জলে চুল ওঠে না।মালদার জলে আয়রন বেশি। বড্ড চুল ওঠে। হুপুশ হুপুশ করে মুখ ধোয় মানি কোমর জলে। কোমরের নিচ থেকে ব্যথা করলে তার আম্মী বুড়ির কথা মনে পড়ে। বড় দেমাকি বুড়ি। এককালে সুন্দরী ছিল।দেখে বোঝা যায়। বুড়ির একটা মস্ত সিন্দুক আছে। তালা মারা। সে নাকি সাহেবি আমলের সিন্দুক।বুড়ির বাপের বাড়ির। মানির খুব ইচ্ছে সিন্দুকে কী আছে দেখে। সোনা দানা না টাকা পয়সা? নাকী দামী পাথর , বুড়ি যেগুলো হাতে গলায় পরে? 


    একদিন দেখে ফেলেছিল মানি। দেখে হেসে বাঁচে না। নিকিকে দিয়ে সিন্দুক খুলিয়েছিল বুড়ি। মানি উঁকি দিয়ে দেখেছে। 


    সিন্দুক ভর্তি পুতুল। বড় বড় পুতুল। বার্বি না। ঐ কী বলে আর্মেনিয়া না কী।সেই দেশের পুতুল। রঙ চঙে। মানি এও দেখেছে বুড়ি পুতুলের সঙ্গে কথা বলে।একা একা।( দেখা হবে)


    পর্ব পাঁচ


    এরা সবাই হাতে তৈরি পুতুল।মেশিন থেকে বেরিয়ে আসা চাঁছাছোলা ফর্মূলা পুতুল না।এরা দিব্য আলাদা আলাদা। কাপড়, তার, তুলো, বাঁশ দিয়ে তৈরি আশ্চর্য সব রঙিন মানুষ এরা। আয়রন চেস্টটি যেন এক দুর্গবিশেষ। প্রায় চার প্রজন্ম ধরে ছিল জোনাথন আরশাকুর্নির সংসারে।আমেলিয়ার ডাউরি হয়ে মেহতা হাউসে এসেছে। লিভিংরুমে একটা সিন্দুক আছে ।যেটাকে নিকি একটা সেন্টার টেবল বানিয়েছে। কিন্তু সেটা আমেলিয়ার সিন্দুকের কাছে নস্যি। আমেলিয়ার সম্পত্তি ঐ হালের অ্যান্টিকের চেয়ে অনেক বেশি ভারি।অনেক বেশি মজবুত। অনেক কম চকচকে। তামা আর রূপোর পাতে জড়ানো।মাঝে মাঝে যেসব পাথর বসানো আছে সেসব পাথর আর হালআমলে পাওয়া যাবে না।


    আমেলিয়ার পুতুলদের বেশির ভাগের চুলের রঙ কুচকুচে কালো।সিল্কের মত নরম আর্টিফিশিয়াল চুল ব্যবহার করা হয় এই পুতুল গড়তে।তার দিয়ে আগে কাঠামো তৈরি হয়।তারপর তুলো ওঠে। তুলোর ওপর নরম সাদা কাপড়।তারপরেও আবার কাপড়। এই পুতুলগুলো একদম মানুষের মত দেখতে নয়।এরা পুতুলের মত দেখতে।মাথায় বিভিন্ন রকমের টুপি অথবা হেড স্কার্ফ।এবং এই কাপড় হ্যান্ডলুম। ঈষৎ খসখসে।কালো চুল গোলাপি ত্বকের এই পুতুলগুলোর চোখ নীল।ঠিক বুড়ি আম্মীর চোখের মতো।আলাদা করে নাক নেই।আঙুল নেই। কিন্ত বেশ বড় বড় পুতুল। ছেলে পুতুল ।মেয়ে পুতুল। রাজা রাণী বোঝা যায় না। সব রঙচঙে পোশাক পরা । 


    মানি ভারি লেসের পর্দার আড়াল থেকে দেখেছিল।দেখেছিল আমেলিয়া মেহতা , মাথার চুল ঝুঁটি করে ওপর দিকে বাঁধা , গলার সোনার চেইনটূকু ঝকঝক করছে, একটা করে পুতুল তুলছেন আর খিলখিল করে হাসছে।


    কী বলছে মানি কিছুই বুঝতে পারেনি। একটু একটু কানে আসছিল।বুড়ি দুলে দুলে হাসছিল কচি বাচ্চার মত, ওদিকে মেজাজ ষোলো আনা।


    -আরামাজা, আরামাজা, এই যে তোমার পাশে অনাহিত।কেমন লক্ষ্মী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে নাও।এই বাড়িতেই কিন্ত আরেকটা ভাহগান আছে। সেও মুগুর ভাজে। ব্যায়াম করে। তোমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়তে পারবে। শুধু তার তোমার মত গোঁফ নেই ভাহগান।সেইজন্য তুমি তাকে কিছুমাত্র কম মনে কোরো না ভাহগান। তোমাকে সে এক আছাড় দিতেই পারে, যদিও শেষমেষ তুমিই জিতবে আমি জানি।টির ! ও টির! কোথায় গেলে? সিন্দুকের নিচে ঢুকে বসে আছো নাকি হে? কোথায় গেল তোমার তেজ? তোমার নাকি ঢের ক্ষমতা? আরামাজা শাস্তি দিয়েছে তোমাকে বুঝি? 


    বলে একটা মস্ত টুপি পরা ছেলেপুতুল টেনে বের করেছিল বুড়ি।


    সিন্দুকটা এত বড় আর উঁচু যে খাটে বসেই তার নাগাল পাওয়া যায়।আমেলিয়ার খাটের পায়ের দিকে থাকে ঐ সিন্দুক।বুড়ির প্রাণের ধন। একটা চেন খুলে পরানো হল কোন পুতুলকে। 


    মানির দেখে চোখ ঝলসে যায়। 


    সিন্দুক খুলে দিয়ে নিকি তার হুইলচেয়ার নিয়ে সরে গেছে জানালার দিকে। কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে যেন পেছন করে।বুড়ি নিজের মনে বকবক করে যাচ্ছে পুতুলদের সঙ্গেই। 


    তুমি তো জানো আরামাজা! জমি কত প্রাণের ধন।কত কষ্ট করে, কত মেহনত করে ভানুজি জমি করেছিল। হোক লাহোরিয়ান, তবু হাল তো চালিয়েছে ইন্ডিয়ার মাটিতে। তার জমি সরকার নিয়ে নিল। এসব কী ঠিক হল আরামাজা! আহ্! কী ভালো লোক ছিল ভানুজি তুমি তো জানো! কী ভালো রান্না করতো। আমাকে স্পেশ্যাল সব ডিশেস রেঁধে খাওয়াতো। ছোলের কী খুশবু ! তেমনি কালি দাল। এখানে কেউ অমন রাঁধতে পারে না এরা।ছ্যা! ছ্যা! আরামাজা, তুমি কিন্তু ভানুজির জমি নিতে দিয়ে ঠিক করোনি। মেহতারা ফোকটে কোনো কিছু পায়নি।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা রোজগার করেছে। দিনরাত খেটেছে।পায়ের ওপর পা তুলে বাবুগিরি করতে দেখেছো তুমি ভানুজিকে? বা আমার ছেলেদের? ওরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও মেহনত করার স্বপ্ন দেখে। ওদের সঙ্গে এটা তুমি ঠিক করোনি।কী বলো অনাহিত? ভাহগান? এই যে শরীরের পরিশ্রম দিয়ে ছেলেরা ফসল ফলালো, মেয়েরা ট্র্যাক্টর চালানো, এর কী কোনো দাম নেই গো?


    বলতে বলতে বুড়ির দুচোখ জলে ভরে আসছিল।এই পর্যন্ত দেখে মানি সরে গেছিল পর্দার পাশ থেকে।নিকি বা ভাবিজি দেখে ফেললে গন্ডগোল। আড়াল থেকে লোকের কথা শোনা পছন্দ করেনা এরা। মানির আবার একটু সেই অভ্যেস আছে। দরজার পেছনে, পর্দার ফাঁকে একটু আড়াল আবডাল দেখে কথা শুনে নেয়।কে কী বলছে। একদিন ধরা পড়ে গেছিল ভাবির কাছে। সেইথেকে সাবধান থাকে।ভাবিজি পষ্টো বলে দিয়েছে, এয়সা হরকত মত করনা ইঁহা।বিলকুল নহি। 


    সে হোক। সেদিন আমেলিয়াকে পুতুলদের সঙ্গে বকবক করতে দেখে মানির মনে হয়েছিল এ যেন অবিকল তার দিদা । দিদা অবশ্য পুতুলদের সঙ্গে বকে না। সে বকে তার ঠাকুর দেবতার সঙ্গে। ঠাকুরের আসনের সামনে বসে সে কী আলাপ প্রলাপ। অবিকল যেন বুড়ি আম্মী। 


    এটা কী তুমি ঠিক করলা নারায়ণ? এই যে ছেলেটার পা ভেঙে রাখলা, জোয়ান বয়স, বিছানায় পড়ে থাকল, এখন কী তুমি দেখবা ওকে? চপের দোকানটা চলে কী করে বলো? সংসার টা তো চালাতে হবে আমার।ঠিক কীনা? আর এই যে মেজটা, মেজ নাতি, এত প্রাইভেট পড়ালো বাপ , পাশ দিল, চাকরির পরীক্ষা নাই , এও কী ঠিক , বলো? নাতিটা ইস্কুল মাস্টারি করতে চায়। তারজন্য আবার পরীক্ষা। আমাদের সময় তো এইসব ছিল না।এখন তুমি কী বিপাকে ফেলেছো বলো তো নারায়ণ? 


    বলতে বলতেই ঠাকুরের আসনের সামনে জল বাতাসা দিতে থাকে দিদা। ওপরে একটা করে তুলসীপাতা, আর বকে। 


    বুড়ি আম্মীর পুতুলগুলো কী ওর ঠাকুরদেবতা নাকী? তবে খেরেস্তানির তো ঠাকুরদেবতা নেই। বুড়ি কী খেরেস্তান না হিঁদু? আগে মানি ভাবতে পাঞ্জাবী মানেই শিখ। এখানে এসে তার একটু আধটু ধারণা পাল্টেছে।যদিও অনেকটা বোঝেনা তবু সাহাপুরের লোকের কাছে মানি দিল্লিওয়ালি। 


    দুগ্গা ঠাকুরের খড় আর উপুড় হওয়া আটচালা দেখতে দেখতে মানি ভাবে, বুড়ি আম্মীর পুতুলগুলো হয়তো তার ঠাকুরদেবতা হবে। ইংরেজিতে বা অন্য কোনো ভাষাতে বকে আম্মী। তাই কিছুই বোঝা যায় না। তবে মানি যখন নাইট ডিউটি করেছে মাঝে মাঝে , তখন দেখছে আম্মী রাতেও পুতুলদের সঙ্গে কথা বলে। আসলে বাড়িতে কার সঙ্গেই বা কথা বলবে বুড়ি। সব তো ব্যস্ত। তবে বাবা, সবাই বুড়ির খেয়াল রাখে খুব।বড়সাহেব রোজ সকালে মা' কে প্রণাম করে বেরোয় । ভাবিজি হাঁটু ছুঁয়ে যায়। করোনা হল তো আম্মীর জন্যেই বেশি চিন্তা। অত বয়স। রোগে ধরলে আর বাঁচবে না। 


    এদিকে দু একটা কাজের খোঁজ পাচ্ছে মানি। কিন্ত পছন্দ হচ্ছে না।একবার বেশি টাকার অভ্যেস হয়ে গেলে আর কম টাকায় পোষায়? মালদায় অত টাকার কাজ কোথায়? 


    বিকেলের দিকে দুই জা' তে গল্প হয়। শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে না বটে , কিন্ত বড় বউয়ের সঙ্গে ছোটর গালগল্প চলে।ময়না কান খাড়া করে থাকে। ফোয়ারামোড়ে এক ফুচকাওয়ালার করোনা হয়েছিল। লকডাউনের মধ্যেই ফুচকা নিয়ে বসেছিল লোকটা। আর লোকে খেয়েওছে নাকী। আর রোগ ছড়িয়েছে। 


    ময়না ঘরের মধ্যে টিভি দেখে আর লম্বা প্লাস্টিকের হাত পিঠে ঢুকিয়ে চুলকাতে চুলকাতে বলে, আজকাল সবাই বাড়িতে ফুচকা বানায় দেখি যে! 


    মনের ইচ্ছে ছেলের বউরা কেউ ফুচকা বানাক ।তাকে কয়েকখান দিক।বউরা কথা কানে নেয় না। দুজনে প্ল্যান করে।বিকেলে বাঁধে গিয়ে ফুচকা খাবে। ভুট্টা পোড়া। 


    ময়না সিরিয়ালের সাউন্ড কমিয়ে কান খাড়া করে শোনে।বলে, তোদের করুণা হবে না কার হবে ! 


    পুজোতে এবার বেরোতে পারেনি ময়না।বউদুটো ঠিক ঘুরে এসেছে ট্যাং ট্যাং করে ছানাপোনা নিয়ে। একবার তাকে বললোও না যেতে। পেটের ছেলেও বলে দিল, বয়স্ক মানুষের ডেন্জার বেশি। তোমাকে বেরোতে হবে না।বাড়ি বসে চ্যানেলের ঠাকুর দেখো। তারপর আবার হাত পাততে আসে! তবে পুজোর ভীড় এবার নাকি কম ছিল। অত পিলপিল করে লোক বেরোয়নি। তবে যারা বেরিয়েছিল তারা সাজগোজ করেছিল বলে মাস্ক পরেনি। রোগ তো ছড়াবেই। কাজের বাড়িগুলো ডাকছে না। বেতন দিয়েছে।তবে এইভাবে আর ক' দিন। শেষে না ছাড়িয়ে দেয়। বড় ছেলের বউকে যেমন। মুখের ওপর না বলে দিয়েছে।


    ময়নার মনে খুব ভয়। কাজটা না চলে যায় করুনার দয়াতে।ময়না করুনাই বলে। সারা বাড়ির সবার কাজ চলে গেলে কী হবে শেষে।বসে খেলে কুবেরের ধন ফুরিয়ে যায়। আর তার তো সামান্য কিছু পুঁজি। নিজের জন্য খুব চিন্তা ময়নার। টাকা ক' টা থাকলে তবু ছেলেরা কদর করবে। সবটুকু যদি এখনি ভেঙে খেতে হয় তবে মরার সময় মুখে জলটুকু পাবে ময়না? তার গলা শুকিয়ে ওঠে।( দেখা হবে)


    পর্ব পাঁচ 


    অনেকদিন বাদে আকাদেমির সামনে এসেছে টুপুর। খড়্গপুর থেকে ফেরার পথে নেমে পড়েছে একাই। টুকটুক করে নন্দন, রবীন্দ্রসদন, বাংলা আকাদেমির পাশ দিয়ে চারুকলা ভবন।চায়ের স্টলটা খোলেনি। ক্যান্টিন বন্ধ।
    বেশ ফাঁকা ঠেকছে। আকাদেমিতে দু চারটে নাটকের বিজ্ঞাপন পড়েছে।আগের সেই উপচে পড়া ভিড় নেই কাউন্টারের সামনে, চায়ের স্টলগুলোতে।অনেকগুলো খোলেন । ঝুটো গয়নার দোকানগুলো একটাও নেই। ফাঁকা রবীন্দ্রসদন চত্বর। টুপুর প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করলো। তারপর ধরাতে গিয়েও ধরালো না। আবার মাস্ক খুলতে হবে। টাইট করে বাঁধা আছে।ডিজপোজেবলের ওপরে একটা ডাবল লেয়ারের কাপড়ের মাস্ক। এই চত্বরে এত খাঁ খাঁ পরিবেশ মানায় না। খদ্দরের পাঞ্জাবি আর বেঢপ পাজামা পরা কাঁচা পাকা দাড়ি আর কাঁধে ঝোলা কবি বা নাট্যকার নেই।কপালে চাঁদের মত গোলটিপের নিচে ছোট্ট কালো আসরলরেখা, নাকে নাকছবি, কোমর পর্যন্ত খোলা চুলের মোহময়ী নারী নেই। ডেনিম ট্রাউজার আর চে গেভারার ছবি দেওয়া টি শার্ট, হাতে জুম লেন্স বাঁধা ক্যামেরাবাজ নেই।লিটল ম্যাগাজিনের ঝোলা নিয়ে কবিরা নেই।দঙ্গল দঙ্গল তাপ্পি দেওয়া জিনস ছেলেপুলে ঘুরঘুর করছে না।এর মধ্যেই মেরামতির কাজ চলছে।
    টুপুর সিগারেট ঢুকিয়ে রাখল।
    একটা লোক এগিয়ে আসছে ওর দিকে।ময়লা পোশাক।যদিও শার্ট প্যান্ট পরেছে।হাতে একটা ক্লিপবোর্ড। তাতে অনেক কাগজ।
    কোথায় যেন দেখেছে লোকটাকে টুপুর। হয়ত এই চত্বরেই বা অন্য কোথাও। মনে পড়ছে না।
    লোকটাকে একেবারে মুখের সামনে চলে এসেছে টুপুরের । এক মুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হলদেটে দাঁত বার করে হাসল।এইবার মনে পড়েছে। ইনি পোর্ট্রেট আঁকেন পাঁচ মিনিটে। অনেকেই আঁকায় এখানে। টুপুর পাশ কাটাতে গিয়েও পারল না।ধরে ফেলেছে লোকটা।
    - এই যে ম্যাডাম। একটা পোর্ট্রেট এঁকে দিচ্ছি। মাত্র দুশো টাকা। আঁকান না।আপনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনার ফোটোজেনিক ফেস। মাস্কটা খুলুন না ম্যাডাম। মাত্র তো দুশোটা টাকা। প্লিজ।
    টুপুর রেগে যেতে গিয়েও পারল না।লোকটা তার সঙ্গে সঙ্গেই যাচ্ছে। বলে যাচ্ছে সমানে।
    - আগে কী ভিড় হত ম্যাডাম।লকডাউনের আগে।আঁতে আঁকতে হাত ব্যথা। দিনে সাড়েতিন চারহাজার টাকা হয়ে যেত ম্যাডাম। লকডাউনের পর সব চলে গেল। আঁকান না একটা। দেখবেন অবিকল আপনি।ড্রয়িং রুমে বাঁধিয়ে রাখবেন। দেখবেন হেভি প্রশংসা হবে। দাঁড়ান না ম্যাডাম।
    একদম রোজগার হচ্ছে না। বসে গেছি পুরো । আঁকান না একটা । ও দিদি।পুরো আপনার মুখ এঁকে দেবো মাইরি।
    আমি সবার ছবি আঁকি না ।ছেলেদের চাপদাড়ি দেখলে আঁকি।মেয়েদের নাকফুল, লম্বাচুল দেখলে আঁকি। তবে আপনি আলাদা দিদি। চোখ কথা বলে।ও দিদি।
    ম্যাডাম থেকে দিদি হয়ে যেতে যেতে টুপুর নন্দনের পেছনে পুকুরের কাছে চলে এসেছে।পেছন পেছন লোকটি।এদিকে একেবারেই ফাঁকা। ব্রিজের উপর কেবল কতগুলো স্কুল ড্রেস পরা মেয়ে। স্কুলের পোশাক কেন! স্কুল তো খোলেনি এখনো! টুপুর ভাবছিল। কে জানে।হয়তো প্র্যাকটিকাল ছিল! গোল হয়ে বসেছে মেয়েগুলো। দুতিনজন মিলে গাইছে। " ফির লে আয়া দিল, মজবুত ক্যা কি যে!"
    পোর্ট্রেট আঁকিয়ে একেবারে ডেসপারেট।পিছু ছাড়তে না।টুপুর শেষে দাঁড়াল। মুখ থেকে টেনে খুলল মাস্ক। নাকের ওপর চাপচাপ দাগ রেখে গেছে মাস্ক। রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়াল টুপুর। ওর ঠিক মাথা বরাবর পিছনে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল।
    লোকটা খুশি হয়েছে। কাগজ সেট করে নিল।
    - আপনাকে মধুবালা ক্যাটরিনার মত দেখতে একথা আমি একবারো বলছি না।কিন্ত আপনার মুখের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। আমি তো সবার ছবি আঁকা না দিদি।আপনার চোখ দেখে মনে হল নাকমুখ ভালো। তাই বললাম। স্থির হয়ে দাঁড়ান।নড়বেন না দিদি।
    পাঁচ মিনিট বাদে ছবি এল। সেটা টুপুরের ছবি বটে কিন্ত নিচে নাম লিখে না দিলে অন্য কারু ছবি বলেও চালিয়ে দেওয়া যায়।
    - দেড়শো নিন। আমাকে চেনা যাচ্ছে না।
    - পাঁচমিনিটে আর কী হয় বলুন। পাঁচমিনিটে এর চেয়ে বেশি হয় না।পোর্ট্রেট আঁকা খুব কঠিন বুঝলেন কিনা। একদম রোজগার নেই। দিয়ে দিন দিদি দুশো।
    টুপুর দেড়শোই দিল। কাগজটা রোল করে ব্যাকপ্যাকে ঢোকালো।মেজাজ ভালো লাগছে না।খিদে পেয়েছে।বাড়িতেও যেতে ইচ্ছে করছে না ঠিক এখনি। ঈশানকে এখন ফোন করার মুড নেই ওর। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এক্সাইড মোড়ে পৌঁছে গেল। এখানে চা বড় ভালো করে। বাইরের খাবার খাচ্ছে না বড় একটা। কিন্ত আজ নিয়ম ভাঙবে। চায়ে চুমুক দিয়ে রাস্তা দেখছিল । গাড়ির মিছিল খুব কমেনি। নন্দন চত্বরটা কানা লাগছে শুধু। বড়সড় একটা জ্যাম। অনেক গাড়ি আটকে আছে। আরেক কাপ চা অর্ডার করে ফেলল টুপুর। তারপর চোখ কুঁচকে গেল। একটু সামনের দিকে একটা চেনা সুইফট ডিজায়ার না? ইয়ে! দ্যাট কার। ঐ গাড়ি ভীষণ চেনা যে! মুকুটমণিপুর। দীঘা। ডায়মন্ড হারবার। একটু এগিয়ে গেল চা হাতে নিয়ে। গাড়িতে রক্তিম। পাশে একটি মেয়ে। চুলটা টেনে বাঁধা। নাকছাবি। প্রোফাইলটা মন্দ না।
    রক্তিমের মুখে মাস্ক। অধৈর্য হয়ে স্টিয়ারিং এ হাত নাড়াচ্ছে। জ্যাম ছেড়ে যেতে গাড়ি হুশ করে এগিয়ে গেল। পোর্ট্রেট আঁকিয়ের কথা মনে পড়ল টুপুরের। এই এক নাকছাবি লম্বাচুলের কাস্টমার হতে পারত। কিন্ত রক্তিম কখনও তার বান্ধবীকে নন্দনের পেছনে মডেল হয়ে দাঁড়াতে দেবে না। কখনোই না।
    মনটা খুব হাল্কা লাগল নিমেষে। যাক।রক্তিমের একটা গতি হয়েছে। বেচারা মেয়েটা। জানে না কী চক্কর। কিংবা কে জানে ! ও মেয়ে হয়তোঐ চক্করেই ঘুরতে চায়। সিকিউরিটি কতরকম সংজ্ঞাতে কতজনের মাথা কন্ট্রোল করে! শরীরও ।
    এই মুহূর্তে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছে টুপুর।হোপ অ্যাটলাস্ট রক্তিম হ্যাজ ফাউন্ড হিজ গার্ল। অর মে বি ভিক্টিম।
    ও হাঁটতে লাগল। পার্ক স্ট্রিটের দিকে। কোথাও একটা বসে কিছু খাবে। নিজেকেই নিজে ট্রিট দেবে আজ। ফর ফ্রিইং হারসেল্ফ ফ্রম আ রং কর্ণার। ইয়েস।শি ইজ রাইট।

    আধঘন্টাবাদে একটা রেস্তঁরার নরম কমলা আলোতে ও বসে । হাতে ট্যাটুগুলোর ওপর আলো ছলকাচ্ছে। খুব মেদুর পরিবেশ। মাস্ক বাঁধা ও হেড শিল্ড পরিহিত ওয়েটাররা ঘোরাঘুরি করছে। টেবল ফর টু। ও প্লেটার সামনে নিয়ে বসে আছে।ধূমায়িত খাদ্য।
    টেবল ফর টু। কিন্ত এখন ও ঈশানকে ডাকবে না।কাউকেই ডাকবে না।
    ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে কাউকে কী দেখা যায়?
    - দেখ সকতে হো?
    - পাচ্ছি। তবু পাচ্ছি না।
    - বিলকুল ভাইরাস কে তরহা। হ্যায় পর দিখ নহি যাতা।
    - কেবল সিম্পটম দেখা যায়। জ্বর। র্যাশেজ। কাশি। শ্বাসকষ্ট। এগুলো কেবল সিম্পটম।
    - বিলকুল। দিখ নহি যাতা। এন্ড দিখ সকতে হো। য্যায়সে উন্নাও। য্যায়সে হাথরাস। যিতনি ভি ক্রাইম হো রহা হ্যায়;উও সব সিম্পটমস হ্যায়। জড় কঁহি আওর হ্যায়। আমরা শুধু সিম্পটম দেখতে পাই। উন্নাও পুড়ছে। হাথরাস পুড়ছে। করোনার মৃতদেহ পুড়ছে। তোমার সামনে প্ল্যাটারে দ্যাখো ধোঁয়া। আনআইডেন্টিফায়েড হত্যাকারী। আনআইডেন্টিফায়েড ভাইরাস।মিউটেইটিং অ্যান্ড মিউটেইটিং। কেবল পাল্টে চলছে।
    তুমি, আমি, আমরা কেবল পুড়ে যেতে পারি।
    - নো। নো ইরফান। স্টপ সেইং সো।
    বিষন্ন হাসি মিশে গেল কমলা রঙে। ধোঁয়া নিভে আসছে।
    - তুমি কী চলে গেলে?
    ওয়েটার বিনীতভাবে এসে বলল, কুছ চাহিয়ে ম্যাম?


    পর্ব সাত।


    কেমন একটা হলুদ আলো জ্বলছে।বাইরে। ঘরের ভেতরে অন্ধকার। এখন ওর অন্ধকার ভালো লাগছে। অন্ধকারে সব এক হয় না।কিন্ত নতুনদের অ্যাভয়েড করা যায়।এখন নতুন কোনোকিছূ চোখে সহ্য হচ্ছে না। চোখ।কান।ত্বক। সব অত্যন্ত কাতর।কোভিডের পর শ্বাসক্রিয়াও খুব সবল নয় এখনো।ও টানটান হয়ে শুয়ে আছে। এই নতুন বিছানা।নতুন চাদর।বালিশ।তাতে অচেনা হাতের স্পর্শ। কিন্ত কোনো নির্মোহ তৈরি হচ্ছে না। নির্মোহ হলে অস্বস্তি আসে না।এখন প্রবল অস্বস্তি ও অস্থিরতা। বাড়িতে হোয়াটস অ্যাপ করে জানিয়ে দিয়েছে যে পৌঁছেছে। এখন ফোন করতে নিষেধ করেছে। লিখেছে এভরিথিং ইজ ফাইন।ডোন্ট কল নাউ। পরে আমি কল করবো সুবিধেমত। ইদানীং একটা জিনিস ভালো হয়েছে। কেউ ওকে ঘাঁটাচ্ছে না। বাড়ির লোকজন শান্তভাবে অ্যাক্সেপ্ট করছে। ও বলেছে পুনে ফিরবে না। মালবিকা প্রথমে কিন্ত কিন্ত করেছিলেন। রিসার্চ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এবং সিমবায়োসিস ইজ সিমবায়োসিস। পরে চুপ করে গেছেন। ত্রিদিব কিছু বলেননি।ডু অ্যাজ ইউ লাইক ইট। ও বরাবর ত্রিদিবের মধ্যে এটা লক্ষ্য করেছে। বাবা হিসেবে ত্রিদিব ইম্পোজিং নন। কখনোই জোর করেননা। ও কলকাতাতেও থাকতে চায়নি।বাড়ি। আজন্ম পরিচিত শহর। বাবা।মা।বোন।পুরোনো বন্ধু বান্ধব। কোনকিছু তেমন টানছে না। আবার বিকর্ষণও নেই। 


    একটা লাল বেডকাভার পাতা আছে। ছোট ছোট হলুদ ফুলের অ্যাপ্লিক। হাতে ফুলগুলো কিছুকিছু বাজছিলো। অন্ধকারে অ্যাপ্লিকের স্পর্শ। দরজাটা অল্প খোলা। ঘরটা একটু একটেরে মনে হয়। এটা একদিক থেকে খুব ভালো।ও এখন কাউকেই কনফ্রন্ট করতে চাইছে না। না নতুন।না পুরোনো। একেবারে নিভৃতি।জানালার পর্দা নেই । খস টাঙানো আছে। বাইরে কী আছে সেটাও উঠে দেখতে ইচ্ছে করছে না। পোশাক পাল্টায়নি। সুনন্দিতা নিজেই একটা বড় গ্লাসে কিছু দিয়ে গেছেন। বাতাবিলেবু, লেবু, লঙ্কা, কিছু হজমি, আমচুর মেশানো একটা ড্রিংক।একবার সিপ করে দেখলো ।বেশ ভালো। 


    হলে একটি পুরুষ কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। দুটি তিনটি নারী স্বর। কে যেন একটু চেঁচিয়ে বলল, পাম্প চালা দো।পানি নহি হ্যায়। টেলিভিশন চলল খানিকক্ষণ। সুনন্দিতা কিছু বললেন কাউকে। কী বলে ডাকবে সুনন্দিতাকে! এই এক সমস্যা। বয়স কম হলে আন্টি ইত্যাদি ডাকা যায়।সাধারণত মালবিকার বন্ধুদের এড়িয়েই যায়।দুতিনজন , যাদের খুব ছোটবেলা থেকে দেখেছে, তাদের মাসি বলে। এই মহিলাকে প্রথম দেখল। ঝট করে কোনো সম্বোধন ওর আসে না। খুব বিরক্ত লাগছে। সুনন্দিতাই ঘরে নক করে বললেন, গিজার দেওয়া আছে।তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও বাবু। 


    সুনন্দিতার ভীষণ ভালো লাগছে।শুধু মালবিকার ছেলে তাঁর বাড়িতে থাকতে এসেছে বলে নয়।কতদিন পর বাড়িতে বাংলা বলছেন! ভাবাই যায় না।


    অপরিচিত মুখে নিজের ডাকনাম। কেমন অস্বস্তি হল।কোনোমতে বিছানায় উঠে বসে বলল , হ্যাঁ।গলার স্বর কেমন ধরা ধরা।অচেনা ঠেকল নিজের কাছেই।তবে বোঝা যাচ্ছে, ছেলেটি খুব চাপা। বা পরিস্থিতি ওকে আরো ইন্ট্রোভার্ট করে তুলেছে। 


    যখন ওর কোভিড পজিটিভ ধরা পড়ল, এইভাবেই শরীর ছেড়ে দিয়েছিল।কোথায় আছে এখন ও ঠিক বুঝতে পারছে না। মুম্বাই না দিল্লি? পুনে? মাথার কাছে কোন বইগুলো আছে যেন? ইদানীং একটু স্ট্রেসড হলেই ভীষণ চাপ ।ঘাম হয়। ভেতর থেকে কিছু যেন শুষে নিচ্ছে সব। আলো।হাওয়া।হাসি।যৌনতা। ইচ্ছেগুলো মরে যাচ্ছে। লিম্বো। দিস ইজ দ্য স্টেট অব লিম্বো।দুটো স্যুটকেস। একটা জামাকাপড়ের।


    ইনকিউবেশন পিরিয়ড ইজ ফর ফোরটিন ডেজ। কার গলা? অদিতি না নিশান্ত? নিশান্ত না অদিতি? নিশান্তের হাতের আংটি । মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম । ট্র্যান্সমিটেড ফ্রম ক্যামেলস। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসিপিরেটরি সিন্ড্রোম। ট্র্যান্সমিটেড ফ্রম সাইভেট ক্যাটস। বাট দিস ওয়ান ইজ মোর ট্র্যান্সমিসেবল। 


    ও দুহাত দিয়ে অগুন্তি ঢেউ সরিয়ে যেন উঠে বসল। নো। নো


    ওওওওওও।


    আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু লিসন। আমি শুনতে চাই না।নো মোর কোভিড টকস ফর মি। আমি আর কোভিডের কথা শুনতে চাই না।চলে যাও নিশান্ত।যাস্ট গো অ্যাওয়ে।


    সুনন্দিতা ছুটে এসেছেন হল থেকে।


    -ইজ এনিথিং রং ? কী হয়েছে বলো? হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ? 


    ও বিছানাতেই বসে হাঁপাচ্ছে। অ্যাপ্লিক তোলা ছোট ছোট ফুল দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।


    অল ভাইরাস মিউটেইট।


    কিছু একটা জেনেটিক পরিবর্তন ঘটে ভাইরাসের মধ্যে ।যার ফলে ভাইরাস মিউটেইট করে।বিবর্তনের শর্ত। এই মিউটেইট করার ফলে কিছু কিছু ফ্যাক্টর গ্রো করে, যেগুলো ভাইরাসের নিজের পক্ষেই ক্ষতিকর।আবার কিছু কিছু জেনেটিক পরিবর্তন হয় , যা ভাইরাসটিকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তোলে। সেকেন্ড ওয়েভ করোনা কী আরো বেশি ভয়ঙ্কর হবে? আরো বেশী সংক্রমক? 


    এই ঘরে যে থাকত সে বোধহয় খুব শরীর চর্চা করে।বাথরুমে একটি বড় পোস্টার।


    ঘরের মধ্যেও পোস্টার ছিল। দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছে। খুলে নিয়েছে সম্প্রতি।হয়তো সে থাকবে বলেই খোলা হয়েছে। আলমারিতে অন্য কারু গন্ধ।যদিও ফাঁকা।অস্বস্তি।


    মালবিকা হোয়াটস অ্যাপ করেছেন। ওর এখন কোনো চ্যাটে যেতে ইচ্ছে করছে না। আ সাউন্ড স্লিপ অ্যান্ড দেন টক উইদ ডিপার্টমেন্টাল হেড। এই সামান্য চাওয়াটুকু ।তাও পূর্ণ হবে না ।সামাজিক দায়িত্ব। সোশ্যাল কার্টসি মেইনটেইন করতে হবে।এবং সামাজিক দূরত্ব। একসঙ্গে দূরত্ব ও কার্টসি বজায় রাখার প্লোটোকল কী বিরক্তিকর! দুটোই প্রাচীন ।ও বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার কার্টেন টেনে দিল। এই জায়গাটা সবচেয়ে নিভৃত।


    আমেলিয়া তাঁর প্রিয় হাইচেয়ারে স্থির হয়ে বসে আছেন।কে এই ছেলেটি তাঁর বাড়িতে থাকবে, সেটা সম্পূর্ণ না জানা পর্যন্ত তাঁর শান্তি নেই। আজকালকার ছেলেমেয়েরা খুব উদ্ধত। এই যে তিনি একটা প্রশ্ন করলেন, ছেলেটি তার উত্তর পর্যন্ত দিল না। কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চলে গেল। অবশ্য সানি মানে তাঁর পুত্রবধূ সুনন্দিতা ইশারা করে চলে যেতে বলল।তিনি দেখেছেন।বয়স হয়েছে বটে।কিন্ত আমেলিয়া মেহতার চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় না।ক্যাটারাক্ট অপারেশনের পরে তাঁর চোখে নীল রঙের লেন্স বসানো হয়েছে ফেকো সার্জারি করে।এটা আমেলিয়ার সঙ্গে ডাক্তারের চুক্তি ছিল।তাঁর নিজস্ব আর্মেনিয়ান মুখাবয়ব, হালকা সোনালি চুল ও নীল চোখ তাঁর গর্ব।


    ছেলেটা কথার উত্তর দিল না।কিন্ত একটু সামনের দিকে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে সম্ভাষণ করেছে। এটা আমেলিয়ার পছন্দের । পিপল , এস্পেশ্যালি ইয়ং পিপল শুড লার্ণ কার্টসি। যেমন তাঁর নাতি নাতনিরা সবাই।খুব পোলাইট। এই ছেলেটা যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াল, ওর চোখে দুঃখ দেখেছেন আমেলিয়া। একধরনের উদাসীনতা। আমেলিয়ার নজর খুব তীক্ষ্ণ। ছেলেটার মধ্যে দুঃখ বাসা বেঁধেছে। সাপ যেমন গাছের শিকড়ের নিচে বাসা বাঁধে।করে করে খায়।বিরাশি বছর বয়স হল।চোখে লেন্স। আমেলিয়া আরশাকুনি , এখন মেহতা দুঃখবিলাস সহ্য করতে পারেন না। কীসের দুঃখ! কাজ করে, হেসে গেয়ে উড়িয়ে দাও।এ ছেলের কীই বা বয়স। ঐ বয়সের প্রতাপভানুকে মনে পড়ে আমেলিয়া। কাফে দ্য ইন্ডিয়ানার তরুণ শেফ। কী উজ্জ্বল ঝকঝকে!,থেকে থেকে গান গেয়ে ওঠা পাঞ্জাব কা শের। তাই ই বলতেন আমেলিয়া প্রতাপভানুকে।তাঁর বর। সেই লোকটি জীবনে যা দুঃখ পেয়েছিলেন, তার অধিক দুঃখ কাউকে পেতে দেখেননি আমেলিয়া।


    লাহোরিয়ান প্রতাপভানু। পনের বছর বয়সের প্রতাপভানু। চোখের সামনে দেখেছেন তাঁর নিজের বাবার গলায় কোপের পর কোপ পড়েছে। সেসব কথা প্রতাপভানু বলেছেন স্ত্রীকে।লোধি গ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল ভরদুপুরে। দু চারজন করে গ্রাম ছাড়তে শুরু করেছে। প্রতাপের বাবা সবে ক্ষেত থেকে ফিরেছেন। কোমরে বাঁধা রুটি আর কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ তখনো যায়নি শরীর থেকে। প্রতাপ রক্তের বন্যা দেখেছেন। দেখেছেন বড়ে পাপাজি' র উলঙ্গ শরীর। তাতে তরোয়ালের আঘাত। তাঁর মা আর বোনকে চোখের সামনে ধর্ষিত হতে দেখেছেন। বড়ে ভাইয়া পালিয়ে গেছিল গেহু ক্ষেতে।সেখানেই পুড়ে গেছিল তার দীর্ঘ শরীর। প্রতাপ ছাত বেয়ে পালিয়েছিলেন। এর চেয়ে বেশি আঘাত আর কী হতে পারে! আমেলিয়া অবাক হয়ে শুনেছিলেন এইসব ইতিহাস কথা।জন্ম হয়েছে আগ্রাতে। সম্পূর্ণ ভারতীয় কানেকশন তাঁর।বড় হয়েছেন ফরাসি কান্ট্রিসাইডে।প্রতাপভানুর পারিবারিক ইতিহাস শুনতে শুনতে তাঁর নীল চোখ আর্দ্র হয়ে যেত।ঝরঝর করে কাঁদতেন আমেলিয়া। মাই ব্রেভ ওয়ারিয়র। আই লাভ ইওর স্পিরিট।সত্যিই প্রতাপভানুতে মুগ্ধ ছিলেন আমেলিয়া। ডোন্ট স্ট্যাগনেট। অ্যালাও ইওরসেল্ফ টু রোল অ্যান্ড গ্রো।সি ইওর পাপাজি। উনি যা সম্পত্তি করেছিলেন ক্ষেতি করে, চোদ্দ পুরুষ বসে খেতে পারত। বাট হি ডিডন্ট স্টপ দেয়ার।হি ওয়েন্ট টু ফ্র্যান্স ফর অ্যানাদার প্রোফেশন।হি ডিড ওয়েল দেয়ার। ডোন্ট অ্যালাউ দ্য গ্রোথ অব মস অন ইউ।


    বাস্তবিক, প্রতাপভানুর মত কঠোর পরিশ্রমী এবং আমুদে মানুষ আমেলিয়া আর দুটি দেখেন নি।


    মেজছেলে সুভাষ প্রতাপ যখন জর্জিয়া যেতে চাইল, ভীষণ খুশি হয়েছিলেন আমেলিয়া।লাইক ফাদার লাইক সন।সেই ছেলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে চলে গেল।বুড়ো মা, দাদা, বউ , ছেলে মেয়ে বাড়ি ঘর সব পড়ে থাকল।এই দুঃখও আমেলিয়া সয়েছেন। ঐ ছেলের কী দুঃখ তাঁর জানা চাই।কিন্ত কেই বা তাঁকে বলবে! ( চলছে)


    পর্ব আট।


    এএআইএমেসে তিনটে পোস্ট খালি ছিল।মাইক্রোব্যাকটিরিওলজির ওপর তিনবছর রিসার্চের অভিজ্ঞতা চাই। সেটাতে অ্যাপ্লাই করলেও হয়ে যেত দেবরূপের যা কাজের অভিজ্ঞতা আছে ।কিন্ত ও দিল্লি ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ প্রেফার করেছে । পুনেতেও ওর ইমিউনোলজি নিয়ে কাজ ছিল।এখানে সেই কাজটার একটা সমসাময়িক স্কোপ আছে। মলিকিউলার বেসিস ফর করোনাভাইরাস সাসেপটিবিলিটি। সাসেপটিবিলিটি ফ্যাকটরগুলো খুঁজে বের করা ।নতুন থেরাপটিক অ্যান্টি করোনাভাইরাল টারগেট। 


    ইয়েস ড. জয়সওয়াল। আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক অন দিস। দিস ইজ দ্য সিনপসিস।


    মণীশ জয়সওয়াল খুঁটিয়ে ছেলেটিকে দেখছিলেন। সিমবায়োসিস ছেড়ে দিল্লি ইউনিভার্সিটি! স্ট্রেন্জ! না, তাঁর ডিপার্টমেন্টাল রিসার্চ যথেষ্ট সমৃদ্ধ। কিন্ত সিমবায়োসিস কেউ সহজে তো ছাড়ে না। 


    - আমি ক্লাস নিতেও রাজি।যত দেবেন।আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক ।ডে অ্যান্ড নাইট।


    একটা প্রজেক্ট আছে। ইটজ হিয়ার । কম্পারেটিভ ইনভেস্টিগেশনস অব হিউম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যাল করোনাভাইরাস।ইনফেকশন প্যাটার্ন আইডেন্টিফাই করতে হবে। ইয়েস ।দিজ আর মাই পেপারস স্যর। হাউ দ্য মিউকোজ সেলস আর অ্যাফেক্টেড। হাউ টু ইন্ডিউস মিউকোজাল ইমিউনিটি। অ্যান্টিভাইরাল স্ট্র্যাটেজিজ। কি করে ফার্মাসিউটিক্যালস ভাইরাস রেপ্লিকেশনস বন্ধ করতে পারে।প্লিজ হ্যাভ আ লুক অ্যাট ইট।


    মণীশ জয়সওয়াল তেত্রিশ বছর মাইক্রোবায়োলজি পড়াচ্ছেন। প্রচুর রিসার্চ স্কলার বেরিয়েছে তাঁর কাছে। এত প্যাশন নিয়ে কথা বলতে, প্রজেক্ট সিনপসিস দেখাতে দেখেননি কাউকে। 


    প্রথম আলাপ। পার্সোনাল প্রশ্ন করা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। কিন্ত ছেলেটির চোখে আশ্চর্য প্যাশন। জ্বলছে যেন। পুরো মুখ দেখা যাচ্ছে না।টাইট করে মাস্ক আঁটা । মণীশ একটু কাশলেন। দুটো গ্লাসে জল ঢাললেন। একটি গ্লাস ছেলেটির দিকে এগিয়ে আরেক গ্লাস জল নিজে ঢকঢক করে খেলেন।


    - হ্যাভ অল দ্য ওয়াটার। যত পারবে লিকুইড ইনটেক। 


    - আই নো স্যর। আই অ্যাম আ কোভিড নাইন্টিন সারভাইভার। আই নো দ্যাট।


    - হ্যাভ ইও লস্ট এনিওয়ান ইন কোভিড মাই বয়? 


    জ্বলজ্বলে চোখদুটি স্তিমিত হয়ে এলো। মণীশের মাথার পিছনে একটি বিশাল কাঁচের জানালা। ব্লাইন্ডস অর্ধেক তোলা আছে। কাঁচের জানালা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ সমারোহ দেখা যায়। একটা টিয়ার ঝাঁক উড়ে গেল। কবে কোথায় যেন ঠিক এইরকম বনটিয়ার ঝাঁক উড়েছিল! আগা খান প্যালেস ! স্কুটির চঞ্চল চাকার পাশে তার বাইক। খরদুপুরবেলা।


    জল খেল খানিকটা।প্রজেক্ট সিনপসিস আপডেট করতে সারা রাত জেগেছে।চোখ লাল।


    - নো স্যর। আই হ্যাভ গেইনড। কিছু হারাইনি আমি। আই হ্যাভ গেইনড পেইন। ইনরমাস পেইন। আই হ্যাভ গেইনড ভয়েড। ট্রিমেনডাস ভয়েড। আই হ্যাভ গেইনড ডার্কনেস।


    এত কিছু পেয়েছি স্যর। পেইন।ডার্কনেস।ভয়েড। বিনিময়ে পৃথিবীকে কিছু দিতে চাই। করোনার কোনো প্রতিরোধ। সামান্যতম হলেও দিতে চাই। এত বেদনা, এত অন্ধকার, এত শূন্যতা দিয়েছে আমাকে পৃথিবী দুহাত ভরে। আমি কিছু দেব না? 


    ইন রিটার্ন?আমার একটা কাজের জায়গা চাই শুধু। যেখানে আমি আর কাজ। আর কিচ্ছু না।নাথিং বিয়ন্ড ওয়র্ক।


    এতসব কিছু বলা হল।মণীশ কিছুই শুনতে পেলেন না।


    খালি দেখলেন ছেলেটির ঠোঁট নড়ছে। কী যেন বলছে বিড়বিড় করে।মাস্কের নিচে ঠোঁটের মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে।কিন্ত কিছু শোনা যাচ্ছে না। কী ভয়ানক ! মানুষ কী তাহলে এইভাবেই একে অপরকে ফলো করবে? ইজ দিজ নিউ নর্মাল? 


    খুব অনিচ্ছাতেই ব্রেকফাস্ট টেবলে এসেছিল দেবরূপ। নতুন করে আলাপিত হওয়া, হাই, হেলো, নমস্তে কিছুই ভালো লাগছে না। একরাশ বিরক্তি শুধু। রাত জাগা এখন ভালো না।কিন্ত গতকাল উপায় ছিল না।সিনপসিস প্রতি মুহূর্তেই আপডেট করতে হচ্ছে। 


    এদের ডাইনিং টেবলটা কলোনিয়াল আকৃতির ।মানে লম্বাটে । হেড অব দ্য টেবলে সেই প্রাচীন নারী বসে আছেন। বা রাণী।নীল চোখে তীব্র দ্যুতিময় দৃষ্টি। যেন ভেতর পর্যন্ত দেখে নিতে চাইছেন। মুখোমুখি বসতে গিয়েও সরে গিয়েছিল দেবরূপ। রাণীর ডান পাশে পরমপ্রতাপ। বাঁ পাশে সুমন। পরমপ্রতাপের পাশে সেই কিশোরপ্রতিম মেয়েটি।সম্ভবত হাঁটতে পারে না। সুমনের পাশে সুনন্দিতা। তাঁর পাশে বসেছিল দেবরূপ। একটু একটেরে হয়ে। গতকাল ঘরের বাইরে আসেনি সে। সুনন্দিতা ঘরে খাবার দিয়েছিলেন। 


    নিকি একগাল হাসল। হাই। আই অ্যাম নিকি। টেবলের উল্টোদিক থেকে হাত প্রসারিত করেছিল। সুমন তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে এসে বসল। সুনন্দিতা মাঝখানে। অমৃতসরি কুলচা আর ছোলে ব্রেকফাস্ট। পর্যাপ্ত হেভি। সুমন সুনন্দিতাকে ডিঙিয়ে মাথা বার করল। হাসল। সুমন হিয়ার। হাই! 


    পরমপ্রতাপ এলেন ব্যস্তভাবে। হেলো দেবরূপ! ঠিক তো হো পুত্তর? প্লিজ ফিল অ্যাট হোম। বি ইওরসেল্ফ। অ্যান্ড হোয়াট অ্যাবাউট ক্যালকাটা? এভরিথিং ওকেয় অ্যাট হোম? তারপর ট্যাব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ক্রমাগত ফোন আসতে লাগল। পরমপ্রতাপ খাদ্য, ট্যাব , ফোনকলস একসঙ্গে সামলাতে সামলাতে দেবরূপকে বললেন, টুডে ইজ ইওর ফার্স্ট ডে অ্যাট ভার্সিটি। শুড আই গিভ ইউ লিফ্ট? ম্যায় ছোড় সাকতা হুঁ তুমহে। ও মাথা নাড়ল। থ্যাঙ্কস স্যর। আইল টেক মেট্রো। ইট উইল টেক টেন মিনিটস আই থিংক? 


    যেহারে ফোন আসছিল তাতে দেবরূপ বুঝল এই লোকটি তার বাবার চেয়ে একশোগুণ বেশি ব্যস্ত। 


    নিকি মাথা তুলে দেখল। ও আসলে বই পড়তে পড়তে খাচ্ছিল। হাসল আবার। গজদন্ত আছে মেয়েটার। নেভি ব্লু একটি টি শার্টে আরো উজ্জ্বল। 


    রাণী এইসবকিছুই মন দিয়ে দেখছিলেন।শুনছিলেন। পরে জেনেছে দেবরূপ। রাণী তাঁর ব্রেকফাস্ট নিজের ঘরেই করেন। কিন্ত সবাই যখন খায়, তিনি এসে বসেন। মন দিয়ে কথাবার্তা ফলো করেন। সুনন্দিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, " সানি, আর ইউ গোইং আউট টুডে? " 


    পুত্রবধূ মাথা নেড়ে না বলাতে আমেলিয়া খুশি হলেন।এই অচেনা ছেলে সম্পর্কে কিছু খোঁজ করা যাবে তবে। এরা সব খেয়ে উঠলে নিজের ঘরে গিয়ে একটু ঘুমাবেন তিনি। তারপর দেখা যাবে। ছেলেটি কেমন কোণঠাসা হয়ে বসেছে। ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। আমেলিয়া বেশি ঝুঁকে দেখা আবার পছন্দ করেন না। তাঁর ডিগনিটিতে লাগে। কাজেই তিনি সুনন্দিতাকে বললেন, টেক কেয়ার অব দ্য নিউ বয় সানি। ইজ হি ফিলিং ফাইন হিয়ার? 


    সুনন্দিতা হাসলেন। বাঁদিকে দেবরূপ। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। বড় শান্ত ছেলে।তাঁর নিজের ছেলেটিও শান্ত। তবে অন্যরকম। 


    রাণী আজ একটি ময়ুরকন্ঠী সালোয়ার কামিজ পরেছেন। কানে সোনার রিং। ফুটফুটে দেখাচ্ছে তাঁকে। কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। 


    সুমন বাইকে করে পৌঁছে দিয়েছিল দেবরূপকে। ছেলেটি মিতভাষী। দ্যাটস অ্যাডভান্টেজ। টি শার্টের হাতের মধ্যে ওর দৃঢ় মাসল। রাস্তা চেনানো দুচারটে কথা। তাছাড়া আর কিছু মনে নেই দেবরূপের। এখন ও ক্যাম্পাসের মধ্যে হাঁটছে।একা ফিরবে। দিল্লি ওর কাছে একদম নতুন একটা জায়গা। কিছুটা পায়ে হাঁটতে চায়।পয়দল। কয়েকমাস আগে শ্রমিকরা হেঁটে গেছিল। তাদের উপায় ছিল না। দে হ্যাড নো আদার ওয়ে। দেবরূপেরও কোনো উপায় নেই।নিরন্তর পথচলা।একা। একদম একা। 


    কৃষক জমায়েত শুরু হবে খুব তাড়াতাড়ি। দিল্লির হাওয়াতে, পরমপ্রতাপের ফোনালাপে সেই খবর ভাসছে। দ্যাট ইজ গোইং টু বি হিস্ট্রি। মনকে ঠেলে সেদিকে পাঠাতে চাইল ও। মন বলল, না।এখন না। পাশ দিয়ে স্কুটিতে ঝড় তুলে বেরিয়ে গেল জিনস শার্ট, সালোয়ার কুর্তা, বারমুডা।পালাজো। ও ভাবলো, আমি একটু পিছিয়েই থাকি ।এই ভালো। এই বেশ।


    হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়লো। হুইলচেয়ারে বসে নিজের ঘরে ফিরে যেতে যেতে কেমন তীব্র দৃষ্টিতে আমেলিয়া মেহতা তাকিয়েছিলেন তার দিকে। কিন্ত কেন? 


    ( চলছে)


    পর্ব নয়।


    ইউ নো, সেভেরাল ফারমার্স অর্গানাইজেশনস আর কামিং আপ।ভারতীয় কিষান ইউনিয়ন, অল ইন্ডিয়া কিষান সভা, জয় কিষাণ আন্দোলন, লোক সংঘর্ষ মোর্চা, অল ইন্ডিয়া কৃষক ক্ষেত মজদুর সংগঠন, ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব পিপলস মুভমেন্টস ...একটানা গড়গড় করে বলে যাচ্ছিলেন পরমপ্রতাপ। 


    দেবরূপ ওঁর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। মায়ের মত নীল চোখ পেয়েছেন ভদ্রলোক। হাইট ছয়ের ওপরেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যান। ফেরেন ডিনারে। লাঞ্চ কোনোদিনই বাড়িতে করতে পারেন না।সুনন্দিতা পাঠিয়ে দেন অফিসে।এটাই সিস্টেম। 


    সো ইট ইজ গোইং টু বি আ টাফ ফাইট। দ্য ফারমার্স অব হরিয়ানা অ্যান্ড পাঞ্জাব আর কামিং আপ। আয়াম প্রাউড দ্যাট মাই ফ্যামিলি ইজ অলসো আ পার্ট অব ইট। মেরা ভাতিজা আ রহা হ্যায়।ভাতিজি ভি। সুন উই আর গোইং টু পাবলিশ আ পেপার।ডিটেইলস অব দ্য মুভমেন্ট উইল বি ফাউন্ড দেয়ার।


    দেবরূপ মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে শুনছিল। সম্পূর্ণ অন্য একটা জগত। যার কিছুমাত্র জানে না সে। ভাত খেয়েছে চিরকাল কিন্ত কী চাল জানে না। বাড়িতে খুব সরু চালের ভাত হয়। পুনেতেও দেরাদুন টেবল রাইসের প্যাকেট আসত। অদিতি প্রেফার করত ব্রাউন রাইস । কিন্ত ধান, চাল, গম বা ডালের আদি বৃত্তান্ত কিছুই সে জানে না। সুমন কিন্ত বেশ ওয়াকিবহাল। ব্যাপারটা ওকে অ্যাবসর্ব করে নিচ্ছে। 


    উই আর বেসিক্যালি ফার্মার্স ।


    আমেলিয়া মেহতা বলে উঠলেন। তাঁর নিজের খাওয়া হয়ে গেলেও তিনি অতি অবশ্যই ব্রেকফাস্ট ও ডিনারে পরিবারের খাওয়ার সময় এসে বসেন। দেবরূপ লক্ষ্য করেছে মহিলা সবসময়ই বেশ পরিপাটি। গয়নাও পরেন। ছেলের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন তিনিও ।যদিও মাঝে মাঝেই ল্যান্ড রিফর্ম বিলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। কিন্ত আগ্রহ খুব। পরমপ্রতাপের মুখশ্রী তাঁর মায়ের মতন।


    কয়েকদিনের মধ্যেই দেবরূপ বুঝে ফেলেছে যে এই পরিবারটি তার কোনো ব্যাপারে বিশেষ নাক গলাবে না।এরা সারাদিন নিজের মত থাকে কিন্ত খাওয়া দাওয়ার সময় সবাই একসঙ্গে এবং প্রচুর হৈহৈ করে। সকাল ও রাতের খাওয়ার সময়টা এই বাড়িতে ভাইটাল।


    তার নিজের বাড়ির সঙ্গে এটা একটা কনট্রাস্ট। মালবিকা, শ্যামাদি খুব যত্ন করে রান্না করেন, কিন্ত কী যেন একটা ছাড়া ছাড়া ব্যাপার আছে। সেটা এখানে নেই। একটা উষ্ণ আমেজ আছে। সুনন্দিতা যদিও চাকরি করেন না, তাঁর নাচের স্কুলটি চাকরি অধিক মনোযোগ দাবী করে। সকাল বিকেল প্রায় চারটি ব্যাচ আসে। লকডাউনের পর স্কুল প্রায় বন্ধ। এখন দু চারজন আবার আসতে শুরু করেছে।তবে সুনন্দিতার প্র্যাকটিস শুরু হয়েছে। কথ্থক শিল্পী তিনি।চারবছর বয়সে নাচেখড়ি। 


    উত্তরবঙ্গের ছোট্ট মফস্বলের নাচের স্কুলে মায়ের সঙ্গে নাচ শিখতে যেতেন।পাড়ার সবাই বলতো, মেয়েকে নাচে দিলে কেন? মেয়েদের নাচ থাকে না। গানটা তবু থাকে।বিয়ে হয়ে গেলে কী আর নাচের সময় থাকে? তখন সংসার সকাল সন্ধে নাচাবে।বর নাচাবে।শ্বশুর শাশুড়ি নাচাবে।ছেলেপুলে নাচাবে। দীনহাটার জগবন্ধু মিত্রর ছোট নাতনি চার বছর বয়সে এইসব কথার মানে কিছুই বুঝতো না।কিন্ত বছর আষ্টেক হতেই মাথা চিড়চিড় করতে শুরু করলো।অষ্টমবর্ষীয়া । ততদিনে মেয়েরা বর এবং শ্বশুরবাড়ির সিগনিফিকান্স বুঝে যায়।এখন ভেবে হেসে কুটিপাটি হন সুনন্দিতা। আবার রাগ হয়। নাচ থাকে না! গান যেন কত থাকে! সব তো রসুইয়ের আঁচে জলান্জলি ।গা হাত পা চিড়বিড় করে।ছোটবেলাতে যেমন হত। 


    মেয়েদের জ্ঞান হতে না হতেই কানের কাছে বিয়ে বিয়ে করে বাড়ির লোক, পাড়ার লোক বারোটা বাজিয়ে দেয় । এই করিস না।বিয়ে হবে না। ঐটা কর।ভালো বর হবে।ভাগ্যিস সুনন্দিতার মা কারু কথাতে কান দেননি। প্রতি শনিবার রবিবার গুটগুটে কন্যাকে নিয়ে নাচের ইস্কুলে দু ঘন্টা বসে থাকতেন। ভীষণ দুরন্ত ছিলেন সুনন্দিতা। দীনহাটা তখন ফাঁকা ফাঁকা এক মলিন টিমটিমে মফস্বল। সেখান থেকে নাচের চর্চা করা মুশকিল। সুনন্দিতা গাছে উঠতেন তরতর করে। সাঁতার কাটতেন জলের পোকার মত। বাড়িগুলো দুরে দুরে। টিনের চালের বাড়ি। ঐ অঞ্চলের সব বাড়িতেই তখন টিনের চাল। কাঠের বাড়ি। বৃষ্টির দিনে ঝমঝম শব্দ হয় টিনের চালে আর সুনন্দিতা মায়ের গায়ের ওপর পা তুলে ঘুমিয়ে পড়েন।মেয়ের পেটের মধ্যে ঠেসেঠুসে ঢুকে যাবেন যেন।সন্ধে হলে ঝিঁঝিঁ ডাকে।বর্ষাকালে ঘরে ঢূকে আসে জলঢোঁড়া সাপ।বাড়ির সামনে ছোট মাঠ।পেছনে সবজি বাগান।আরো পেছনে ধান ক্ষেত। লালমেঝেতে চালের গুড়োর আল্পনা পড়ে। মা, পিসি আল্পনা দিয়ে গেলে ছোট্ট সুনন্দিতা ঘুরে ঘুরে আল্পনা দেখেন।তারপর ভিজে আল্পনার ওপর উঠে পড়ে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে নাচতে শুরু করে দেন।তেই তেই তৎ তেই। কচি পায়ের তাল পড়ে ভিজে চালের গুঁড়োর আঁকিবূকিতে।


    বাড়ির সকলে হাঁই হাঁই করে ছুটে আসে। একী করলি লক্ষ্মীছাড়ি! সবাই সুনন্দিতার মাকে গালমন্দ করতে লাগল। কী মেয়ে বানিয়েছিস চন্দ্রা, লক্ষ্মীর পায়ের ওপর উঠে নেচে রেখেছে। সমস্ত আয়োজন নষ্ট।এই মেয়ের কপালে দুঃখ আছে।ঘোর অলক্ষ্মী ! 


    পাড়ার লোকে বলতো ধিঙ্গি মেয়ে।ধিঙ্গির মা শিঙ্গি।সেসব কথা কানে তুলতেন না সুনন্দিতা।পেয়ারা গাছে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতেন।তাঁকে ধরে আনার জন্য বাবা, কাকা গলদঘর্ম।


    এক একটা মানুষ থাকেন , সময়ের আগে তাঁদের জন্ম। সুনন্দিতার মা তেমন মানুষ। জগবন্ধু মিত্রর পুত্রবধূ স্বামীর মৃত্যুর পরে , মাথায় আঁচল দিয়ে শ্বশুরের সামনে গিয়ে বলেছিলেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা এখানে ভালো হচ্ছে না। কোচবিহার শহরে বাড়ি ভাড়া করে তিন ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকবেন।জগবন্ধু দীনহাটার নামকরা ডাক্তার। পাঁচবিঘে ধানের জমি। আম , পেয়ারা কিনে খেতে হয় না। বাড়ির ভেতর উঠোন গোবরছড়া দিয়ে নিকিয়ে দিয়ে যায় ভাষার মা। হ্যাঁ ।তার বেটির নাম ভাষা। ভাষা দুলে দুলে গান করে। বড়লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল/ এমন মাথায় বেন্ধে দিব লাল গেন্দা ফুল। সুনন্দিতা, দাদা আর বোনের সঙ্গে উঠোনে পিঁড়ি পেতে বসে জৈষ্ঠের বিকেলে গদগদে হলুদ কাঁঠাল খায়। পাকা কাঁঠালের রস কনুই বেয়ে গড়িয়ে গেলে চেটে নিতে হয়। কাঁঠালের ভুতির গন্ধে মাছি ভনভন করে।সন্ধে গড়ালে তিনভাইবোন মিটমিটে টেবিল আলোতে পড়তে বসে। মশা কাম


    ড়ালে চটাশ চটাশ শব্দ করে মারে আর তিনজনে গুলতানি করে।ধান আসে জমি থেকে। ফারমার্স ফ্যামিলি কাকে বলে সুনন্দিতার জানা আছে বইকী। আমন ধান জমা হয় বাড়ির পিছনের গোলাঘরে। দীনহাটার সম্পন্ন গ্রন্থাগারের বাড়িগুলোতেও তখন স্যানিটারি পায়খানা ছিল না। মূল বাড়ির বিশাল ভেতরেরউঠোনের একধারে ধানের গোলা।পিছন উঠোনে ইঁদুরের আরেকধারে উঁচু মাচান করে খাটা পায়খানা। পৌষের গভীর রাতে পায়খানা যেতে হলে গা ছমছম করে। পিছনের বাগান থেকে পেঁচা ডাকে ভুতভুতুম করে। ডাক্তার জগবন্ধুর বড়পুত্রবধু সুনন্দিতার মা ঘটিবাড়ির মেয়ে। বলতেন, কোত্থেকে কোথায় এসে পড়েছি।আবার হাসিমুখে দুইবাড়ির রীতিনীতি মিলিয়েজুলিয়ে সেরে ফেলতেন। 


    পাঞ্জাবীবাগের মার্বেলখচিত মেহতা হাউসের মসৃণ মেঝেতে যখন সুনন্দিতার পায়ের ঘুঙুরের বোল ওঠে, তিনি জানেন এই প্রতিটি বোলের পিছনে তাঁর জননীর হৃদস্পন্দন। বাবা উকিল। তেমন পশার নেই। মেজকাকা ধানের জমি দেখাশোনা করে জীবন কাটালেন। তবু দিল্লির আকাশে শীতের ছোঁয়া নামতে না নামতে , সুনন্দিতার দীনহাটার সেই আদিবাড়ির কথা মনে পড়ে। সংক্রান্তির আগের রাতে মা বাউনি বাঁধতেন খড় দিয়ে। পৌষ লক্ষ্মী পুজো। দুপুর থেকে চালের গুঁড়ো নুন জল দিয়ে মেখে, ভেতরে নারকেল আর ক্ষীরের পুর ভরে মাটির উনুনে ফুটো সরা চাপিয়ে সেদ্ধ হচ্ছে।ঢাকা আছে আরেক মাটির সরা দিয়ে। সুগন্ধ ছড়াচ্ছে সারা উঠোনময়। সন্ধের মুখে সুজির পায়েসটুকু বসবে। মা শেখাচ্ছেন কাকিমাকে। দুধটা আরো জ্বাল দে । আরো ঘন কর। ফুটন্ত দুধে গুড় ঢালবি না কিন্তু।নামিয়ে নে।নামিয়ে নে। একটু ঠান্ডা হলে গুড়টা দিবি।নাহলে কেটে যাবে কিন্তু । ভাষার মা বসে বসে চষি বানিয়েছে সারাদুপুর।


    মা খড় দিয়ে সর্বত্র বাঁধন দিচ্ছেন। দাদু বলছেন, বড় বৌমা এক্কেরে ঘটি বাড়ি বানাইয়া তুললা যে! কেউ আপত্তি করতো না।বরং একটা পরবকে আপন করে নিয়েছিল তারা। আশপাশের বাড়িতে পিঠে বিলি হয়। তাদের বাড়ির পিঠে পায়েস আসে এই বাড়িতে। এই তো সেদিন!


    শীত নামতেই সুনন্দিতার নাকে সেই খড় , খেজুরগুড় আর চালের গুড়োর গন্ধ নাকে আসে। চমকে উঠে ভাবেন, তবে বুড়ি হয়ে গেলাম নাকী? নিয়মিত নাচ অভ্যাস করার ফলে ত্বক টানটান। তন্বী শরীর এখনো মেদবর্জিত। সুনন্দিতার আজকে বড়ো পিঠে খেতে ইচ্ছে করছে।এবার মকরসংক্রান্তিতে ঠিক বানিয়ে ফেলবেন। বাড়িতে একটা বাঙালি ছেলে এসেছে।মানিটা থাকলে যে কী ভালো হত! খুব একটা পিঠে পায়েস করেন না। ছেলে সুমন একেবারে মিষ্টি খায় না।ভীষণ শরীর সচেতন। প্রোটিন ডায়েটে থাকে। পরম দুয়েকটা খান । নিকি মিষ্টি পছন্দ করে না।আমেলিয়ার ডায়েট বাঁধা। কার জন্য করবেন! বাঙালি বন্ধুদের পাঠাতে পারেন অবশ্য। কিন্ত নাচ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে কিছু করা হয় না।বরং বন্ধুরাই সেধে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।খাওয়ার লোক নেই।


    এবার সব অন্যরকম। অঢেল সময়।শুধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানটির ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে।দয়ানন্দজীকে রাতে একবার ফোন করে নেবেন তিনি।আজকেই।কাকে কাকে ডাকা হবে।অন স্টেজ কারা থাকবেন। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেইনটেইন করতে হবে সবার আগে।হল স্যানিটাইজ করে নিতে হবে।


    তারপর সব যে যার ঘরে ঢুকে গেলে মা কে ফোন করবেন সুনন্দিতা।দিল্লি থেকে ফোন যাবে সেই দীনহাটার মহকুমা শহরে।কোভিড কী আরো ছড়াল ওদিকে? তুমি কিন্তু একদম বাইরে যাবে না মা। যা লাগবে দাদা এনে দেবে।ঠাকুরবাড়িতেও যাবে না।মা প্রতিবার কোচবিহার যান ।রাসমেলা দেখতে । ঝকঝকে করে সেজে ওঠে সুপ্রাচীন মদনমোহনবাড়ি। এবার যাবেন না।মেলা হবে না এবার। তুমি মন খারাপ কোরো না মা। 


    খাবার টেবিলে দেবরূপের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। 


    তুমি পিঠে খেতে ভালোবাসো তো দেবরূপ? এবার সংক্রান্তিতে ব্যবস্থা করবো তাহলে। ওকে? পরম , মুঝে এক চুলা বানা দো।মিট্টিকা চুলা। বড়াওয়ালা। 


    সংক্রান্তি আসবে। এই বাড়িতে লোহরি। তার আগে আসবে কৃষক মিছিল। পরম সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। হানজি। হো যায়েগা।


    - তুমি লোহরি দেখেছো আগে? বন ফায়ার ভি বনা লো পিছে গার্ডেন মে। পিছলে সাল নহি মানায়া।গতবছর আমেলিয়া অসুস্থ ছিলেন। 


    ঘাড় নাড়ালো দেবরূপ। লোহরি দেখেনি। 


    তার নাকে একটা ঝাঁঝালো গন্ধ আসছিল। ঝাঁঝালো।অথচ মিষ্টি। মৌরী আর জোয়ানের গন্ধ। আমেলিয়া। এইসময় আমেলিয়া একটু ওয়াইন পান করেন।একটি কারুকার্যময় রূপোর ওয়াইনগ্লাস তাঁর হাতে। বেশ গন্ধ। 


    আমেলিয়া পরম তৃপ্তিতে গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, গেহু আয়েগা না ঘরসে? কৌন লায়েগা? দীপক ইয়া সুরিন্দার। বরাবর লোহরির মাসদেড়েক আগে থেকেই পাঞ্জাব থেকে চাল আসতে থাকে।আসে গেহু। আখ। গম। এবার কী হবে? 


    আমেলিয়ার আর্মাণী ওয়াইনের মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধে একটা নেশা আছে।


    আমেলিয়া গলা খাঁকারি দিলেন। লোহরির আগে তাঁর খ্রীস্টমাস। আর্মেনিয়ানদের খ্রীস্টমাস। 



    (চলছে)


    পর্ব দশ।


    আগস্ট। তখন ও আচ্ছন্ন ছিল কোভিডে। ভাইরাস ঢুকেছে শরীর অভ্যন্তরে। কামড়াচ্ছে। অচৈতন্য প্রায়। নির্মাল্য সামন্ত কমিটেড সুইসাইড। কমোডে বসে প্রথম মাথা ঘুরে উঠেছিল ওর।তারপর পা থেকে শরীর শিরশির করে উঠেছিল।জ্বর আসছে টের পাচ্ছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই। সেই আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে কৃষকদের আন্দোলন। না। ও খেয়াল করেনি। কৃষক বিল পাশ হয়েছে। এরকম একটা খবর ক্যাজুয়ালি হেডলাইন হিসেবে পড়েছে পরে।তখন জ্বরে ঘোরের মধ্যে পড়ে থাকা দিন।রাত। নিশান্ত। শালিনী। অতুল।অদিতি স্কুটি নিয়ে একবার যাচ্ছে।একবার বেরোচ্ছে।লং স্কার্টের ঢেউ। উতল হাওয়া । ও জানতো না।এরপর কী হতে চলেছে ও জানতো না।কেউ কোনোদিন জানে না ইন ফ্যাক্ট, এর পরে কী হবে।হরিয়ানা আর পাঞ্জাবের কৃষকরা তখন জোট বাঁধছেন। কজন জানতো এদেশে! 


    যেমন কোভিড নাইন্টিন। লকডাউনের আগে নব্বই শতাংশ মানুষ করোনার নাম শোনেনি।ছাব্বিশে নভেম্বরের আগে কৃষক আন্দোলন তেমন করে সাধারণের দৃষ্টিগোচর হয়নি। সব থাকে অচেতনে। আড়ালে।মৃত্যুচেতনার মত। কখন প্রকাশ পাবে কেউ জানে না।


    এই নভেম্বরে চেতনার স্তর ভেদ করে ফোন আসে। 


    - তুই ঠিক আছিস তো বাবু? 


    - হোয়াট ডু ইউ মিন বাই ঠিক আছিস মা? 


    - তুই কবে থেকে টুপুরের মত হয়ে গেলি বলতো? 


    - আমি কারু মত হই নি মা। প্লিজ ডোন্ট ওরি। আমি কাজে জয়েন করেছি। খাচ্ছি। ঘুমাচ্ছি। হ্যাঁ।স্লিপিং পিলস নিয়েই ঘুমাচ্ছি।বাট ডোন্ট সে ঠিক আছি। গিভ মি টাইম।


    মালবিকা শ্বাস বন্ধ করে থাকলেন। ইদানীং কারু কাছেই আবেগ প্রকাশ করেন না।ডাক্তার বলেছে মন খুলে কথা বলতে। ঈশান । ঐ ছেলেটা বড্ড মনকাড়া। ওকেই যা একটু মনের কথা বলেন মালবিকা।ওর অ্যাকুয়ারিয়ামে সি হর্স স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। 


    - তোমার আমার ঠিক থাকাটা খুব বড় ফ্যাক্টর না মা। আমরা যেমন ছিলাম তেমনি আছি। সেট ব্যাকস ক্যান বি ওভারকাম। আর এরা একদম নন ইন্টারফিয়ারিং। দ্যাটস গুড ফর মি। বেশি বকবক করলে, ইনকুইজিটিভ হলে থাকতে পারতাম না। 


    - ওখানে শীত পড়তে শুরু করেছে বাবু। 


    - আছে সব। রুম হিটার আছে। পর্যাপ্ত গরমজামা। ইউ টেক কেয়ার অব ইওরসেল্ফ।


    - কিছু অসুবিধে হলে মাসিমণিকে বলিস কিন্ত। শরীর টরীর খারাপ যদি লাগে।


    - মাসিমণি? হুজ দ্যাট? 


    - কেন? সুনন্দিতা ! কী বলে ডাকিস তুই? আন্টি? 


    - হাসিও না মা।আমি কী ক্লাস টেন যে অপরিচিত এক মহিলাকে মাসিমণি বলবো? 


    - সো? কী বলিস? 


    - সিম্পল মা। কিছুই বলি না।দরকার হয় না। অ্যান্ড আই থিংক দ্যাট শি ডাজন্ট মাইন্ড। 


    মালবিকা চুপ করে গেলেন। ঈশান আগে তাঁকে মালবিকা বলে ডাকতো। ইদানীং কিছুই বলে না।মালবিকা বুঝে গেছেন এসব নিয়ে অভিমান করে কোনো লাভ নেই। বস্তুত কোনো কিছু নিয়ে অভিমান করেই লাভ নেই। নিজের চোখের জল নিজেকেই মুছে বলতে হবে, চিয়ার আপ।


    বাবু জানে না। জানে না যে মালবিকা সুনন্দিতাকে দুবেলা ফোন করেন। কেমন আছে। অ্যাডযাস্ট করতে পারছে তো? খায় ঠিকমতো? কথা বলে? এসব জানলে বাবু রেগে যাবে। এই এরা রেগে যাবে, সেই ভয়ে ভয়ে কতদিন বাঁচলেন মালবিকা। সুনন্দিতা ঠিক উল্টো। কে কী ভাববে , কে রেগে যাবে কিচ্ছু পরোয়া করেন না।উচ্ছল স্বভাবের সুনন্দিতা। মালবিকার রুমমেট সংগীত ভবনে।দুজনে দুজনের চুল বেঁধে দিতেন। পিঠছাপানো চুল তখন দুজনেরই। ফুল দিতেন চুলে। দুজনেই নাচের মেয়ে।ডিপার্টমেন্টে টিচাররা ওঁদের বলতেন অনসূয়া প্রিয়ংবদা। সুনন্দিতা যখন পরমপ্রতাপকে বিয়ে করবেন ডিসিশন নিয়েছেন, চারদিক থেকে নিষেধ উড়ে আসে।ধুলোর মত।চোখে পড়লেই কড়কড় করে। কত ভয় দেখানো।এই বিয়ে টিকবে না। করিস না। পারবি ঐ পাঞ্জাবী ফ্যামিলিতে অ্যাডযাস্ট করতে ? পুরো আলাদা কালচার। মালবিকাও তো ভয় পেয়েছিলেন। ইন্টারকাস্ট বিবাহ করেই যথেষ্ট কড়া অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। এতো একেবারে সব আলাদা। 


    তুই পারবি মান্তু? 


    সুনন্দিতা পাত্তা দেননি। অবাঙ্গালি কালচার তাঁর বেশ পছন্দ। যা কিছু মিশ্র, যা কিছু সংকর তাই তাঁকে টানে। না হলে বিবর্তন হয় না। সবকিছুই স্ট্যাগনেট করে। পঁচিশের সুনন্দিতা তখন স্কলারশিপ নিয়ে সংগীত নাটক আকাদেমিতে। পরমপ্রতাপ প্রপোজ করেছেন। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের প্রবল না না শুনে যাচ্ছেন। তারপর ঠোঁট উল্টে বলেছেন, বাইশ বছর বয়সে শর্মিলা ঠাকুর যদি পতৌদির নবাবের বেগম হতে পারে, তো!হোয়াটস রং উইদ মি? আমাকে তো বেগম হতে হচ্ছে না তাও। হলে কী ভালো হত। এমনকি সুনন্দিতার মাও ভয় পেয়েছিলেন।মেয়ে পড়াশোনাতে ভালো।নাচে তুখোড়। আচ্ছা চলো। দীনহাটা থেকে কোচবিহার। সুনীতি দেবীর ইস্কুল। বারো ক্লাসের পর বিশ্বভারতী। তারপর দিল্লি। নাচের প্রোগ্রাম পাচ্ছেন। নাম হচ্ছে। সব ঠিক আছে। তাই বলে পাঞ্জাবী ছেলে বিয়ে করবি? 


    সুনন্দিতার মধ্যে একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। নিজে যেটা করবেন সেটা ঠিক করে ফেলেন এবং বেশ হেসে হেসে। কোনো নালিশ নেই।অভিযোগ নেই। অভিমান যদি থেকে থাকে ঘুঙুরের বোলে সেটাকে উড়িয়ে দেন। কাকিমারা বলেছিল, দেখিস , পারবি না। আমাদের বাঙালি ঘরের মেয়ে। ঐসব ফ্যামিলিতে পারে মানিয়ে নিতে? একদম এক্সট্রোভার্ট হয় ওরা। দেখবি। কোনো কালচারাল মিল পাবি না। 


    শত্তুরের এবং আত্মীয়স্বজনদের মুখে ছাই দিয়ে সুনন্দিতা জমিয়ে সংসার ও নাচ করে যাচ্ছেন। বাঙালিদের কালচারাল স্নবারি তাঁর ঘোর অপছন্দ। মাড়োয়ারিকে বলবে মেড়ো। উড়িষ্যার মানুষকে বলবে উড়ে। পাঞ্জাবিকে বলবে পাঁইয়া। এমনকি বাঙালি হিন্দু বাঙালি মুসলমানদের বলবে মোসলা। এত অবজ্ঞা আর অশ্রদ্ধা ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি, সুনন্দিতা ভীষণ রেগে যেতেন। হোয়াট ইজ দিস? কী মনে করো নিজেদের? সবাই রবি ঠাকুর আর সত্যজিতের ঠেকা নিয়ে বসে আছো? সবাই বিশেষজ্ঞ? পন্ডিত?ওদিকে তো কিসুই মেলাতে পারোনা! সুনন্দিতা হ্যাজ নো হ্যাং ওভার ফর ইন্টেলেকচুয়াল স্নবারি। 


    তাঁর মা তখন এক অধ্যাপক পাত্রের সন্ধান এনেছেন আদরের মেয়ের জন্য। বাড়ির সবার খুব পছন্দ। ভীষণ ভালো ছেলে। এক ছেলে। দিদির বিয়ে হয়ে গেছে । বাড়িভর্তি বই।সারাদিন বই মুখে নিয়ে থাকে।মান্তু , এত ভালো ছেলে পাবি না। সবসময় কাছাকাছি থাকবে। ঐ পাঞ্জাবী ছেলে ব্যবসার জন্য কোথায় কোথায় ঘুরবে। দুদিন বাদে দেখিস ছেড়ে চলে যাবে।পারবি না অ্যাডযাস্ট করতে।


    সুনন্দিতা নাচের সরঞ্জাম স্যুটকেসে ভরতে ভরতে বলেছিলেন, আমি সারাদিন বইমুখে বসে থাকা ছেলে বিয়ে করতে পারব না কাকিমা। তারপরে এক ছেলে। শাশুড়ির সঙ্গে টাগ অব ওয়ার করতেও পারব না।সময় নষ্ট হবে। আর সারাক্ষণ বরকে আঁচলে বেঁধে রাখার শখ নেই আমার। বিজনেস ট্যুর ইজ ফাইন উইদ মি। আমি নিজের জন্য সময় পেলেই হল। প্লিজ। ঐ ম্যা ম্যা করা বইমুখো ছেলে, দুটো ক্লাস করে বাড়িতে চলে আসবে আর মেনিমুখোগুলো বদের ধাড়ি হয়, আমার সহ্য হবে না।আই ওয়ান্ট আ কালারফুল লাইফ। ম্যা গো! ঐ যে বললে, বই থেকে চোখ তুলে তাকায় না? ওটা খুব বাজে লক্ষণ। ওগুলো আড়চোখে মেয়ে দেখে। আনহেলথি। তারচে ওপেনলি নাচানাচি করা ভালো।ফ্লার্ট করা ভালো।হেলথি সেক্স ভালো। 


    মেয়ের মুখে এইসব শুনে কাকিমারা মুখ হাঁড়ি করে সুনন্দিতার মাকে বলেছিলেন, কী মেয়ে বানালে! দেখো দুবছরের মধ্যে ফিরে আসবে। আর কথার কী ছিরি। দিল্লি গিয়ে ল্যাজ গজিয়েছে।


    অম্লান মোটেই ম্যা ম্যা করা ছেলে নয়।বস্তুত সে একজন মেধাবী অধ্যাপক। অর্থনীতি পড়ায়।সুনন্দিতার এক কাজিনের সঙ্গে তার সম্বন্ধ হয় শেষ পর্যন্ত এবং তারাও বেশ সুখী দম্পতি বলেই বোধ হয়, কিন্ত সুনন্দিতার কথাবার্তা ঐরকম। আলপটকা। যা মনে হয় তাই বলবেন। কোনো


    রাখঢাক নেই। আবার যখন গুটিয়ে যাবেন তখন একেবারে চুপ। এই নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল।


    সুনন্দিতা কিছু মনে রাখেননি এসব কথা।মানে মনে আছে। গ্রাজেস নেই। আর এই যে পরম ভীষণ ব্যস্ত থাকেন , এটা তাঁর খুব ভালো লাগে। আগেও লাগত ।এখনো লাগে। তিনি নিজের অনেকটা সময় পান। নাচে বুঁদ হয়ে থাকেন। গতবছর তাঁর দাদার ছেলে এসেছিল শীতে ছুটি কাটাতে। জোজো। জোজোকে সুমনের সঙ্গে নিউ ইয়ার্স ইভ পার্টিতে পাঠিয়েছিলেন। ওরা পরদিন সকালে ফিরে এলে সুনন্দিতা জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে জোজো, রুমিদির মেয়েকে দেখলি? সেই ছোটবেলায় যখন এসেছিলি, কী খেলতিস ওর সঙ্গে।আর মারামারি করতি। চিনতে পারছি? কী গর্জাস দেখতে হয়েছে মেয়েটা! জোজো নিপাট ভালোমানুষের মত মুখ করে বলল, তাই ? খেয়াল করি নি তো! সুনন্দিতা গালে হাত দিয়ে চোখ বড় করে বললেন, সেকী রে? অত সুন্দর একটা মেয়ে তোর নাকের ডগা দিয়ে নাচানাচি করল, এফ বি লাইভে দেখলাম, আর তুই খেয়াল করলি না! তোর অসুখ বিসুখ করেনি তো মানে তুই সুস্থ তো? 


    সুনন্দিতার মুখ ঐরকম।ঐরকমই।


    মালবিকা অন্যরকম। কুন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, হ্যাঁরে মান্তু, তোর ভয় করে না? এই যে পরম এত ব্যস্ত ? এত ট্যুওর? সারাদিন আসে না?


    - ডোন্ট বি সিলি রে। আই এনজয় দিস। যখন ছুটিতে যাই , আমাদের তখন হানিমুন। প্রতিবার। আদারওয়াইজ উই আর বিজি উইদ আওয়ার ওন ওয়ার্ক। এতো ঘ্যানাবার কী আছে? 


    - শোন। তোর ছেলে ভালো আছে। বেশি এক্সপেক্ট করিস না। সময় দে। লেট হিম ওভারকাম দ্য ট্রমা। একসঙ্গে অনেকগুলো। বেশি ঘাঁটাস না তো।নিজের মনে থাকতে দে। আমি খেয়াল রাখছি।


    মালবিকা অনেকটা আশ্বস্ত। সুনন্দিতাই পারবে। হয়তো। বাবুর স্থিতি দরকার। যেখানেই হোক। অদিতি মেয়েটিকে তাঁর খুব দেখতে ইচ্ছে করে।কী জানি কেন এক প্রবল রিরংসা কাজ করে। তিনি জানেন খুব নীচতা। দীনতা। কী করে দিলি তুই ছেলেটাকে আমার? কী করে দিলি? মনে মনে বলতে থাকেন। বুক ফেটে কান্না আসে।তারপর শান্ত হন । চোখ মুছে ফের ল্যাপটপ। ফের ডেস্কটপ। শালিনী অরোরা। মুকেশ সিনহা।স্বাতী চন্দ।মেরিলিন ডিসুজা। বনি ত্রিপাঠী। পরপর রোল কল হতে থাকলে মালবিকার মন শান্ত হয়। আবার অপেক্ষা করে থাকেন রাতের। সাড়ে দশটা।


    - মান্তু, ছেলেটা ঠিক আছে তো রে? 


    সুনন্দিতা খুব শান্তভাবে ফোন ধরেন। তিনি বুঝতে পারছেন দেবরূপ অধিক তার মায়ের চিকিৎসা দরকার। ত্রিদিব কী খেয়াল করেন না? 


    র্যালি শুরু হয়ে গেছে। কৃষক মিছিল। পরম এখন দু' দিন বাড়িতেই আসবেন না। সুনন্দিতা অমৃতসরি মছলি বানাবার জন্য ব্যাটার রেডি করছেন। এটা নিকি ভালোবাসে। দেবরূপ মনে হয় পছন্দ করবে। দই নিয়েছেন বড় একবাটি। আদা রসুন বাটা দিয়েছেন। অনেকটা কাশ্মীরি মির্চ। রঙ ভালো হবে। হলুদ। আলগা আঙুলে ছড়াচ্ছেন। নুন।কসৌরি মেথি।কী প্রিয় গন্ধ!আমচুর। লেবুর রস। টুপ টুপ করে রস পড়ছে। বেসনটা পরে দেবেন। মাছগুলো মিনিট দশেক ম্যারিনেট করে ডিপ ফ্রাই করবেন।খেয়াল করেননি।কখন দেবরূপ এসে দাঁড়িয়েছে। খুব মন দিয়ে ব্যাটারটা তৈরি করছিলেন। এটাই ইম্পরট্যান্ট। ভেটকি পেয়েছেন অনেকদিন বাদে। দেবরূপ দেখছে। 


    ঠিক এইভাবে। অদিতিও। 


    জিভ কাটলেন সুনন্দিতা। একদম ভুলে গেছেন। আমেলিয়ার ওষুধ দিতে হবে। এইজন্য আয়া দরকার। 


    - বাবু। প্লিজ ডু মি আ ফেভার। একটু আম্মীর রুমে গিয়ে ওষুধটা দেবে? সাইড টেবলে সামনেই রাখা আছে। একটা ট্যাবলেট। 


    বাবু এগোচ্ছিল। ওই ঘরে? 


    - হ্যাঁ। অ্যান্ড প্লিজ নক ! 


    ও চুপচাপ হেঁটে গেল। শব্দ।নক।নক। ভেতর থেকে আমেলিয়ার গলা ভেসে এল। কাম ইন। 


    ভেতরে একটা রূপকথার ঘর। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে গেল। একটা মস্ত পুতুল আমেলিয়ার কোলে। নীল রঙের একটা পোশাক। নীলের মধ্যে গোলাপি কারুকার্য। কালো চুলে ঘেরা পুতুলটার মুখ। মাথায় একটা নীল টুপি। কাপড়ের পুতুল। আমেলিয়া যেন কী বলছিলেন পুতুলের কানেকানে।ও ঢুকতেই থেমে গেলেন।


    বাইরে বিবর্ণ শীত নামছে। এই মেহতা হাউসের পেছনেই একটা মাঠ আছে।ছাত থেকে ভালো দেখা যায়।আনলকে ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। তাদের চিৎকার সমুদ্রে সীগালের ডাকের মত ভেসে এল ঘরে। দেওয়াল ঘড়ি টিকটিক করে।


    আউ- ট! 


    উইকেট ছিটকে গেল।


    আমেলিয়া অবাক চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, টেল মি, ডু ইউ নো দিজ বিগ বাইয়ার্স? দ্য কর্পোরেটস? মাই সন পরম ইজ আ বিল্ডার। বাট হি ইজ উইদ দ্য ফারমার্স! আই থিংক দিস ইজ নট প্যারাডক্সিক্যাল ? ডু ইউ? 


    তারপর বালিকার মত খিলখিল করে হাসলেন। 


    হ্যাভ আই পাজলড ইউ? কাম অ্যান্ড সিট।মিট ভাহগান।


    ( চলছে)


    পর্ব এগারো।


    করুণা সাহার ডানদিকের চোখটা ফুলে গেছে।তাকাতে পারছে না ভালোকরে। ঠোঁট কেটে গেছে। ঝুলে আছে নিচের ঠোঁট। কালশিরা পড়েছে অনেকটা। শস্তা সুতির শাড়িতে জড়ানো রোগা শরীরে আর কোথায় কী ক্ষত আছে, মারার পর বোঝা যাচ্ছে না।পায়ের বুড়ো আঙুল পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে বাঁধা। 


    - তুমি ডাক্তার দেখিয়েছো করুণা? 


    করুণা মাথা নিচু করে তাকায় না। সোজা তাকিয়ে আছে। দুরের দিকে। ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। ঘাড়েও কালশিরে দেখা যাচ্ছে।


    - কী দিয়ে মেরেছিল দেখতে পেয়েছিলেন? 


    - দেখতে পাই নাই দিদি। ক্ষেত থিকা উঠে আসছিল তো। তিনজন আছিল। পিছন থিকে ধরছিল। 


    টুপুর শিউরে উঠে চোখ বুঁজে ফেলে। মেধা ঘাড় নিচু করে প্রতিমার পিঠের আঘাতগুলো দেখছে। মেয়েটি চিৎ হয়ে শুতেও পারছে না ব্যথাতে। উপুর হয়ে বা পাশ ফিরে শুয়ে থাকছে। 


    বাঁশ দিয়ে মেরেছিল। হাতে চাকু ছুরিও ছিল। জানে মেরেই দিত।নেহাত সময় পায়নি। 


    প্রাণপণে ধাক্কা মেরে ওদের সরাবার চেষ্টা করেছে করুণা। মুখ বেঁধে ফেলেছিল। ধান ক্ষেতে টেনে নামাতে পারলে আর ফেরার সম্ভাবনা ছিল না। রেপ তো হতই। তারপর মেরে রেখে দিত।


    প্রতিমা করুণাকে পেপার স্প্রে রাখতে শিখিয়েছে টুপুর। যখন থেকে ওরা কাজ করছে। আম্ফানের পর থেকে মেয়েরা কাজ করছে নানারকম। পুরুষদের কাজ নেই। কাজ থাকলেও টাকাপয়সা ঠিকঠাক নেই।মেয়েদের হাতে তৈরি আচার, জ্যাম, কাঁথা, বড়ি, পাপোশ, পুতুল। শুকনো মুগ পুলিও রাখছে। করুণারা জিনিস ডেলিভারি দিয়ে ও ফিরছিল। 


    রিলিফের জিনিস আর টাকার অংক বাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই।বিডিও অফিসে গিয়ে নালিশ করে এসেছিল করুণা। 


    কিছুই ঠিকঠাক পাই না আমরা।চাল , আটা আর্ধেক এসেছে। সব আগে নিতাই সামন্তর বাড়ি যায় কেন? ওর চ্যালারা আগেভাগে ভাগ পায় কেন? 


    সবাই জানে সবকিছু।কেউ কিছু বলে না।ওদের হাতে পাওয়ার আছে। পাওয়ার শব্দটা এখন সবাই জানে। লেখাপড়া জানুক, না জানুক, পাওয়ার জানে। ঐটা সবচেয়ে দরকারি বস্তু। নিতাই সামন্তর পার্টি আছে। গুন্ডাবাহিনী আছে।করুণা সাহার মাথা খারাপ হয়েছিল যে ওদের সঙ্গে পাল্লা নিতে গেছিল? 


    পাশ কাটিয়ে, গা বাঁচিয়ে চলতে হয় । করুণাকে এইসব পইপই করে বলা হয়েছে। উপরন্তু নিতাই সামন্তর পার্টির হীরেন সরখেল করুণাকে দু দুবার প্রপোজ করে থকে গেছে। অবশ্যই স্পটে সে ছিল না।কিন্ত তার লোক ছিল।


    টুপুর হাথরাস ভাবে।হায়দরাবাদ ভাবে। তার খুব কাঁপুনি দেয়। 


    করুণার মা খুব কুন্ঠিত ভাবে একটা ছোট বাটিতে মুড়ি চানাচুর আর মোটা কাঁচের গ্লাসে চা এনে সামনে রাখেন। 


    ঐটুকু খেয়ে লাও মা। আজ তো কিছু খাও নাই সকাল থিকা। 


    খুব সকালে আসেনি ওরা।বাড়ি থেকে খেয়েই এসেছে। তবে দুপুরে খায়নি এই মানুষগুলোর ভাগের সামান্য ভাতে ভাগ বসাতে অপরাধ বোধ হয় । 


    করুণারে একটুক বুঝাও। এই যে মাইয়ামানুষ হয়্যা হুটহাট এই অপিস সেই অপিস চলে যায়, মুখে মুখে তর্ক করে পাটির লোকের সঙ্গে , অয়ের জন্য তো এইসব হুজ্জুত হয়।যদি ভালোমন্দ কিছু হয়া যাইত কী হইত? 


    করুণার মা একবেলা দুমুঠো খেয়ে থাকতে রাজি।কিন্ত মেয়ে রেপ হয়ে গেলে মুখ দেখাতে পারবেন না, তাই প্রতিবাদে অরাজি। আর কথায় কথায় রেপ হয়ে যাওয়া এখন জলভাত। আর তারপর তো মেরেও ফেলে আজকাল।প্রমাণ রাখে না 


    চা খেতে খেতে জাহির বলে, এইভাবে হবে না রে। এদের স্বনির্ভর করে তোলার কথাই ভাবতে হবে।


    ত্রাণ বল রিলিফ বল , সব আলটিমেটলি গুন্ডাবাহিণীর হাতেই থাকবে।


    সেটাই তো করতে চেষ্টা করছে ওরা।সেইজন্য এতদূর আসা।কখনো দল বেঁধে।কখনো দুতিনজন। 


    মোটামুটি বিক্রি শুরু হয়েছে। বাইরে প্রচার চালাচ্ছে যতটা পারে।করুণা অনেক কিছু পারে। ধান ক্ষেতের মাঝে আলপথে সাইকেল চালাতে পারে।ঘন্টা দুই সাইকেল চালিয়ে বাসস্ট্যান্ড গিয়ে সাইকেল জমা রেখে বাস ধরে কলকাতা যেতে পারে। কলকাতায় বাস, মেট্রো ধরে চারটে স্টলে সাপ্লাই প্লাস মেধার গ্যারাজে স্টক রেখে আসতে পারে।আবার ফেরত পথে বাসস্ট্যান্ড , সাইকেল , আলপথ। এই কাজ শুরু হয় ভোর চারটে থেকে। সারা সপ্তাহে দুবার। দিনভর মেয়েরা বড়ি দেয়। আচার বানায়। কাঁথা ফোঁড়ে।বেডকাভার। বালিশের ওয়ার বানায়। মাস্ক।ট্রিপল লেয়ার । কিন্ত এও যথেষ্ট নয়। একেকটা সংসারে অনেকগুলো মুখ। ছেলেপুলের লেখাপড়া নেই। কিন্ত পেটে খিদে আছে সবার। অসুখ বিসুখ আছে। বুড়ো হাবড়া আছে প্রতি ঘরে। তাদেরও খিদে লাগে। পরনে কাপড় লাগে। তাই করুণা রিলিফের জন্য ঝগড়া করে। মুখের ওপর কথা বলে। বলে এম এল এর কাছে রিপোর্ট করবো। নিতাই সামন্তর এঁড়ি গেঁড়িরা তক্কে তক্কে থাকে। মাগীদের খুব সাহস বেড়েছে। কড়কে দিলে থামছে না। তাই টেনে নিয়ে যাবে ধান ক্ষেতে। রেপ করে দেওয়ার অধিক শাস্তি তারা ভাবতে পারে না। রড ঢোকানো এখন সবচেয়ে পপুলার প্রতিহিংসা।


    ইতিমধ্যে টুম্পাসোনা গান হিট হয়ে গেছে। নিতাইয়ের অফিসে টুম্পা চালিয়ে নাচ হয়।আজ করুণাকে তুলতে হবে। 


    খুব জোরে লাথি মেরেছিল প্রতিমা। অন্ডকোষে। চোখে ছিটিয়ে দিয়েছিল পেপার স্প্রে।


    রাতবিরেতে যাতায়াত করো। এটা সঙ্গে রাখো। ইস্তেমাল করতে শিখিয়েছিল জাহির । আর লাথি মারতে এখানে। ঠিক দু পায়ের মাঝে। গায়ের যত জোর আছে সব দিয়ে। তারপর সেকেন্ডের মধ্যে দৌড়াতে হবে । পেপার স্প্রে বার করতে যতটুকু দেরি ।তারমধ্যে যত আঁচড় কামড় মার তাতেই বোঝা যাচ্ছে আর দুমিনিট দেরি হলে জানে মেরে দিত।করুণার মা কাঁদতে থাকে। খুনখুনে বুড়ি ঠাকমা ঝিমায়। মাটির মেঝেতে কেমন শিরশিরে ভাব।খুব ভেঙে পড়েছে ওরা। আজ বেঁচে গেছে কিন্ত কাল আছে তো।পরশু আছে। ঠিক ধরবে আবার।তারপর? যদি আবার ধরে? হাত মুখ বেঁধে ফেলে? 


    বিকেল পড়ে এলে করুণার মা বলে, আজ থেকে যাও। কোনোদিন তো থাকো নি আমাগো এখানে। ডাল ভাত ধরে দিব। সন্ধের পর বারাইয়ো না। 


    গাড়িতে এসেছে ওরা। কিন্ত সময়টা ভালো না। সামনে ভোট আছে।দলবদল আছে। কে কাকে কখন মারবে , রেপ করবে ঠিক নেই কিছু।কাজ করে অন্য পার্টির নামে ঠেলে দেবে। গাড়ি থামিয়ে টেনে বের করা কিছু কঠিন না। ওরা নজর রাখছে কে আসছে না আসছে গ্রামে। ঘোঁট পাকাচ্ছে।


    এরা ইতস্তত করে।করুণারা নিজেরাই পাঁচজন।দুটো খুপরি ।তারপর আবার চারজন? 


    করুণাও বলে, থেকে যাও দিদি। ওর চোখের নিচে কালি। এখন মনের জোর ফিরিয়ে আনা দরকার। টুপুর মালবিকার ফোন করে বলল, আজ থেকে যাচ্ছি মা।চিন্তা কোরো না। 


    ভাঙা বেড়ার মধ্যে দিয়েও চাঁদের আলো ঢেকে। এরা একটা খুপরি ছেড়ে দিয়েছে ওদের।


    খালপাড়ের টিমটিমে আলো জ্বলা দোকান থেকে ডিম আর পেঁয়াজ কিনে ফের জাহির আর টুপুর।ভাত আর ডিমের ঝোলের ভোজ হতে পারত মারের চিহ্নগুলো না থাকলে। এখানে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব নেই। প্রতিমার পিঠে, বুকে নখের আঁচড়। একদিনে সিঁটিয়ে গেছে মেয়েটা। লাথি টা মারতে পেরেছে কিন্ত ভয় কাটেনি।


    কতদিন ভয়ে ভয়ে থাকব? করোনার ভয়। আম্ফানের ভয়।খেতে না পাওয়ার ভয়।কেউ এইসব প্রশ্ন করে না। তবু চলা ফেরা, বাসন মাজা, টিপকলের শব্দে এসব প্রশ্ন লেগে থাকে ঘরের কোণে ঝুলের মত। শুধু ঠাকুমা বুড়ি ঝিমায়। ঝিমাতে ঝিমাতে বলে, কী খালি রে তরা? গন্ধ বারায়? 


    ছোট উঠোনের পর উদলা জমি। তারপরে প্রতিমাদের ঘর। সেখান থেকে ডাল দিয়ে যায়। বড়ি ভাজা। ওদেরই হাতে তৈরি বড়ি। জাহির খেতে খেতে বলে, বড়িটা কিন্ত ফাটাফাটি বানাচ্ছে কাকিমা। মা বলছিল এবার ডিজাইন দাও। মেধা বলল, গয়না বড়ি? 


    রাত দশটা এইখানে মধ্যরাত। শুনশান হয়ে যায়। প্রতিমার মা দাওয়াতে কাঁথা সেলাইয়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসে। সাত আট রকমের টুকরো কাপড়। লাচি সুতো। 


    কাঁথার ফোঁড়ে রূপকথা বোনা হয়।হাত ওঠে।হাত নামে।


    এই কাঁথা অনেক চড়া দামে বিক্রি হবে। বোলপুর ছাড়িয়ে কাঁথার কাজ বিস্তৃত হয়েছে। আঞ্চলিক কারুকাজ উঠে আসছে। করুণার ঠাকুমা ফোঁড় তুলতে পারত। বাঘ। রাজপুত্র। মাথার পাগড়ি। ফুল ।পাতা।সাত আট পরত কাপড়ের ওপর ফোঁড়।


    পুতুল মেয়ে বসে থাকে হাত পা মুড়ে। এসব কাঁথা মুড়ি দিয়ে এসি ঘরে ঘুমাবে শহরের লোক। খুব আরাম। 


    টুপুরের ঘুম আসছে না।জাহির পাশ ফিরে শুয়ে এককোণে। মেধা , রূপক গভীর ঘুমে। সারাদিন অনেক পরিশ্রম গেছে। 


    এখানে শেয়ালের ডাক শোনা যায়। টুপুর বলে , নতুন রকম কিছু ডিজাইনও করো না কাকিমা। নতুন ছবি। 


    রাত বাড়ে। করুণার বাপ কাশে খুকখুক করে।এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়েও পড়ে টুপুর। শক্ত চৌকিতে অন্যভস্ত শরীর জেগে যায় মাঝে মাঝে।দেখে আলো জ্বলছে। কাঁথার ফোঁড় তুলছে করুণার মা। সাইকেল চড়া মেয়ে । কাঁধে ব্যাগে। সাইকেল যেন পক্ষীরাজ । উড়ে চলেছে। উড়েই চলেছে।


    কাঁথার ফোঁড়ে নতুন মেয়ে উঠে আসে।মুখে মাস্ক।কাজলনয়না মেয়ে পিঠে ব্যাগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে।পায়ের নিচে ফুল।পাতা।ঘরের চালে খড় দিচ্ছে মেয়ে ।সবুজ সুতো।নীল সুতো।হলুদ সুতো।সূক্ষ্ম কাঁথার ফোঁড়ে গল্প তৈরি হচ্ছে। মাথার মধ্যে ও বাহিরে ক্ষত নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে রাজকন্যে।


    ( চলছে)


    পর্ব বারো।


    কাঁথার ফোঁড় বড় সূক্ষ্ম। প্রত্যেকটি সমান মাপের হতে হবে। আবার প্রতিটি ফোঁড়ের মাপ যেন সমান হয়।কোনো বড় ছোট থাকার গল্প নেই। ঘাড় গুঁজে রাত দুটো আড়াইটে পর্যন্ত সেলাই করে চলে করুণার মা। চোখ খারাপ হচ্ছে বয়সের সঙ্গে। এবং এই সেলাই করার ফলে চোখের যা পরিশ্রম হয়। ঠাকুমা বুনতো একেকটা গল্প। সবুজ সুতোর মাঠের ওপর লাল ফুল ।নীল ফুল। নীল নদী।তাতে হলুদ নৌকা। পারে বসে থাকা মেয়ে।মাথা ভর্তি চুল।চুলে ফুল। নদীর পারে ময়ুর ।হরিণ।কমসে কম তিনটে শাড়ি লাগে একটা কাঁথা বানাতে।আর বড়, মোটা কাঁথা তৈরিতে বাঁশপাতা ফোঁড়, তেজকা ফোঁড় আর বরকা ফোঁড় পড়ে সাত আটখানা শাড়ি জুড়ে।টুপুর সেলাই দেখছে। সকালে করুণার মা ফোঁড় তোলার সময় পান না।পিসি তোলে। লতাপাতা।শঙ্খলতা। সুতো টান করতে করতে বলে, আমরা ছোট ছেলেপিলেদের কইতা ফোঁড় দিয়া কোমরে সুতনি পরাইতাম।


    এইভাবে কখনো ঘুমোয়নি ওরা। উঠে টিউবওয়েল চিপে জল পাম্প করে বাথরুমে গেছে। বাথরুম বলতে ধাড়ার বেড়া দিয়ে ঘেরা একফালি জায়গা।একপাশে কোনোমতে একটা প্যান বসিয়েছে গতবছর।


    ঘরে আয়না বলতে ছোটো একটা আয়না।শস্তা কাঠের ছোট ফ্রেম।কিন্ত ঢাকা।সেটাও কাঁথার কাজ করা।মেধা হাতে নিয়ে তুলে দেখে। পিসি হাসে। কালোকুলো গোল মুখ। ঐ আমাদের রীত আছিলো গো। আয়নায় যখন তখন মুখ দেখতে নাই।আয়না ঢাকি রাখতে হয়।ওরে বলে আরশিলতা আয়না।


    -কী সুন্দর নাম গো! টুপুর মুগ্ধ হয়ে যায়। 


    জাহির খুব ভোরে উঠে কোথ্থেকে নিমগাছের ডাল ভেঙে এনেছে। 


    - এই নে দাঁতন।এটা দিয়ে দাঁত মেজে দ্যাখ। জীবনে তো মাজিসনি এ দিয়ে। 


    করুণার মা গ্লাসে গ্লাসে চা আর মুড়ি দিয়ে যান।ট্রের বদলে একটা থালা।একটা বাটিতে মুড়ি। টুপুর বলল, আলাদা আলাদা বাটিতে দিতে হবে না কাকিমা। একটা বড় বাটিতে দাও।আমরা তুলে খেয়ে নেব।


    মেধা পুরোনো নতুন কাঁথাগুলো স্টাডি করছে। 


    - নাথিং বিকামস এথনিক অ্যান্ড প্রেশাস আনলেস অ্যান্ড আনটিল ফরেনারস টেক ইন্টেরেস্ট ইন ইটস ইন্ডিয়াননেস। লুক অ্যাট কাঁথার কাজ।ইউ অলওয়েজ নিড আ কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় অর সাম আদার পাবলিক ফিগার টু পপুলারাইজ ইট। 


    - ভেরি নেচারাল। নাহলে স্প্রেড করবে কী করে?


    মেধার ঘাড় লম্বা।মেদহীন ঘাড় হংসিণীর মত।


    - আই ওয়জ থিংকিং ইন আদার টার্মস টুপুর।


    - কী?


    - হাউ কাম দিজ কাঁথা আর্টিস্টস ক্যান মেক আউট মোর থ্রু দেয়ার প্রোফেশন!


    জাহির এক খাবলা মুড়ি তুললো।


    - কাঁথা স্টিচ বহুদিন হল পপুলার। মায়ের আলমারি ভর্তি কাঁথা স্টিচের শাড়ি।স্টোল।


    - অ্যান্ড হাউ মাচ ডু দে আর্ণ আউট অব দিস হার্ড লেবার অব স্লিপলেস নাইটস?অ্যান্ড টু স্প্রেড ইট মোর মেথডিক্যালি?


    - মানে? অলরেডি এটা একটা এস্টাবলিশড আর্ট।


    মেধা খুব আস্তে কথা বলে।ওদের বাড়ির সবাই।মৃদুভাষী।


    - আমি তো জানি। সোনাঝুরি হাট থেকে গড়িয়াহাটের ফুটপাথ ।কাঁথা স্টিচের শাড়ি, ব্লাউজপিস, স্টোল আর কাঁথাতে ভর্তি।গলাকাটা দাম। বাট নাথিং ইজ অথেনটিক। এই যে সুতনির কথা বলল পিসি, বা আরশিলতা এগুলো কিন্ত পাবি না।বাট দিজ আর স্মল পিসেস। লেস কস্টলি। গ্লাস ঢাকনা। এটসেটরা। থিংক।


    পিসি মাথা নিচু করে ফোঁড় তোলে। ঘাড় এপাশ ওপাশ করে।মাথা ওপর নিচ হেলায়।বলে,


    - আরো আছে গো। শীতের সময় লেপকাঁথা।বাড়িতে বাচ্চা জন্মালে কুশি কাঁথা।শীতের সময় মানুষ মরলে গায়ে মরণকাঁথা। ও কাঁথাতে আবার গিঁট থাকে না।বাটি ঢাকার জন্যিও কাঁথা আলাদা।সব কাঁথাতে ফোঁড়ের ধরনধারন আলেদা।


    হতদরিদ্র পরিবারের টিনের ফুটো চাল দিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়লে হৃষিকেশ মুখার্জির ছবির কথা মনে পড়ে টুপুরের। মালবিকা খুব দেখতে ভালোবাসেন হৃষিকেশের ছবি।ভাঙা বেড়ার মধ্যে দিয়ে আলো এসে রেখার কপালে টিপ তৈরি করে।


    - এই করোনার বাজারে কত কাঁথাস্টিচ বিক্রি হবে রে? লোকের হাতে পয়সা কোথায়? আর যাদের পয়সা আছে, তাদের কাঁথা স্টিচও আছে।পুরোনো হয়ে হেজে গেছে। সবার কাঁধে কাঁথার ব্যাগ। বোরিং।ড্যাম বোরিং।


    - ইউ পিপল আর হোপলেসলি নেগেটিভ। আমি ছোট ছোট জিনিসপত্রর কথা বলছি। এই বর্তন কাঁথা।কুশি কাঁথা। হ্যাভ ইউ এভার সিন দেম? আমি দেখিনি।টেবলক্লথ।বালিশের ওয়ার। মেক ইট ইনোভেটিভ। লোকে কিনবে।নিউ আইডিয়াজ চাই। এত প্রোগ্রাম হয়।উত্তরীয়।ট্রে কাভার। সুজনি কাঁথা। ডেড আর্ট। রিজুভেনেটেড।


    - পথের পাঁচালি। বিদেশীরা অ্যাপ্রিশিয়েট না করা পর্যন্ত কিস্যু হবে না! কলোনিয়াল হ্যাং ওভার।


    চালের ফাঁক দিয়ে আলো ম্লান হয়ে আসে।


    এই বাড়িতে কোনো রেখা তুল্য লাস্যময়ী নেই।কিন্ত নারীশরীর মাত্রেই সফ্ট টার্গেট।করুণা এসে যখন হাতে হাতে বেগুনপোড়া আর মুড়ি ধরায় বেলা দশটা নাগাদ, তখন ওর মুখ আরো ফুলে গেছে, দেখা যায়। 


    টুপুর বলে, তোমাকে ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। কলকাতা নিয়ে যাব। 


    - এফ আই আর? 


    করুণার মা তেড়ে ওঠে। 


    - জলে বাস করি কুমিরের সঙ্গেই বিবাদ করি থাকা যায় না। খবরদার পুলিশ, থানা এসব কথা তুলবি না। 


    - তালি যদি আবার ধরে কোনোদিন? একবার বেঁচে ফিরিছি। বারবার বাঁচব। এরপর পাঁচজন আসবে।দশজন। 


    করুণার মা কিছু না বলে ঘসঘস করে ডাঁটা কাটে। ওদের ভাত না খাইয়ে যেতে দেবে না।সামান্য আদা।কাঁচালঙ্কা। বাটছে দ্রুত হাতে। একটা ঝাঁঝালো গন্ধ। 


    গন্ধবোধ আছে মানে কোভিড নাইন্টিন নেই। দারিদ্র আর অনটনের সঙ্গে পাল্লাতে কোভিড নাইন্টিন পরাজিত। এরা কেউ ভাবছে না করোনা হলে কী হবে। ভাবছে, কাল কী খাবো? তার মধ্যে অতিথির জন্য যেটুকু সাধ সাধ্য তাই করা। কিন্ত এফ আই আর নয়।কিছুতেই নয়।টুপুর ঘামতে থাকে। এইভাবে জীবন কতদিন চলে? কীভাবে চলে? এরা এইভাবেই বাঁচবে? 


    ঈশান ফোন করলে সে এইসব কথা বলে। ঈশান কোনো উত্তর দিতে পারে না। 


    ইদানীং ঈশানের কাজের চাপ খুব বেড়েছে।তার নিজের চেম্বারের কাজ।হসপিটাল। তার সংগে যোগ হয়েছে পোস্ট কোভিড কেয়ার সেন্টার।


    ঈশানের কিছু প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার বন্ধু মিলে খুলে ফেলেছেন । কোভিড নাইন্টিন যাঁদের আক্রমণ করছে তাঁরা অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠেও ভীষণ মানসিক চাপে আছেন।বিশেষ করে ছোট নিউক্লিয়ার পরিবার। বা ছেলেমেয়ে বিদেশে, বয়স্ক মানুষ। এঁদের জন্য টানা দেড় মাস বা তিনমাসের প্যাকেজ ট্রিটমেন্ট। যে যেটা অ্যাফোর্ড করতে পারেন। বলা বাহুল্য, এটা বিত্তশালীদের জন্য। আরেকটা চেইন তৈরি হল। এখান থেকে ওখানে। ওখান থেকে সেখানে। তারপর কেয়ার সেন্টার। ঈশান বোঝে সব। কিন্ত বন্ধুবৃত্ত থেকে বেরোনো কঠিন।সেও চেইনে জড়িয়েছে। এইসব পাপবোধ মনের ডাক্তারকে ভারাক্রান্ত করে।সে বিষন্ন হয়।


    - জানো টুপুর। এগুলো কিছু দরকার হয় না। যদি পাশে মানুষ থাকে। যদি পাড়াতে একজন পুরোনো ডাক্তার থাকেন। আমাদের ছোটবেলাতে যেমন ছিল। পাড়াতেই। শংকরজ্যেঠু। শরীর , মন সব ঠিক করে দিতেন। এখন স্পেশ্যালিস্ট শুধু। আন এন্ডিং চেইন। টায়ারিং। এই পেশেন্টরা তিনমাস পরেও ডিপ্রেসড থাকবেন। কেয়ার সেন্টার থেকে ফিরেও।


    এই পৃথিবীতে করুণাদের জন্য কোনো কেয়ার সেন্টার থাকে না।


    করুণার মা তাড়াতাড়ি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবার কথা ভাবছেন।যাকে বলে ঘাড় থেকে নামানো।


    তারপর কী হবে? করুণা কী ভাবছে কেউ শুনবে না।


    ( চলছে)


    পর্ব তেরো।


    ঈশান ঘড়ি দেখলো। মাত্র ন' টা বাজে। এখনো চেম্বারে বসতে দেরি আছে। টুপুরকে ফোন করবে নাকী একটা! সেই হিঙ্গলগন্জ গিয়ে বসে আছে। রাতে থেকেও গেছে করুণা সাহার বাড়িতে। এলাকাটা বিপদজনক হয়ে আছে।এইসময় ওখানে যারা যাতায়াত করবে তারাও খুব সেফ নয়।চিন্তার ব্যাপার আছে। 


    গতকাল একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটে গেছে।খবরের কাগজে পড়ে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাচ্ছে না ঈশান। ব্যারাকপুরের অবিনাশ মুখোপাধ্যায়ের করোনা হয়েছিল।বয়স বাহাত্তর। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তাঁর মৃতদেহ পরিবারকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।করোনাতে মৃত রোগী।সারা শরীর প্ল্যাস্টিক মোড়া।বাড়ির লোকে মুখ ভালো করে দেখেনি।কিংবা হয়তো দেখার চেষ্টাও করেনি। কেউ তো কাছে যাবে না! প্রাণের ভয় বলে কথা।যথারীতি দূরত্ব বজায় রেখে দাহ হয়ে গেছে।গতকাল শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ছিল। পুরো হিন্দি ফিল্ম স্টাইলে খবর এসেছে হাসপাতাল থেকে। আপনাদের বাবা অবিনাশ মুখোপাধ্যায় সুস্থ হয়ে গেছেন।


    বাড়িতে শ্রাদ্ধের আয়োজন।ছবি বাঁধিয়ে আলো মালা সব দেওয়া হয়ে গেছে।লোক জানানো শেষ। শ্রাদ্ধের কার্ড বিলি হয়ে গেছে।ধোঁকার ডালনা, ছানার পায়েস, মৎসমুখীতে কাতলা আর ভেটকী সব অর্ডার দেওয়া শেষ। ওদিকে বাবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন টুকটুক করে।


    তাহলে দাহ হল কার? খড়দার শিবমোহন বন্দোপাধ্যায়ের। তিনিও করোনা পজিটিভ। বয়স চুয়াত্তর। হাসপাতাল থেকে খবর গেল , আপনাদের বাবা সুস্থ।বাড়ি নিয়ে যান।বাড়ির লোকে সুস্থ বাবা আনতে গিয়ে দেখলেন, ইনি তাঁদের বাবা তো নন।অন্য কারু বাবা।করোনাকালে এই এক অদ্ভুত কান্ড।তাহলে অবিনাশ বাবুর ছেলেরা দাহ করলেন শিবমোহনবাবুকে। মিডিয়া এটাকে নিয়ে নিয়েছে।প্রায় সব বাংলা কাগজের হেডলাইন। চারদিকে ছড়াচ্ছে।


    ঈশানের কাছে একটি বাংলা দুটি ইংরিজি খবরের কাগজ আসে।কোনো বাংলা কাগজে কৃষক আন্দোলনের ডিটেইলস পাচ্ছে না। দলবদলের আভাস ইলেকশনের এত আগেই।ঈশান বিরক্ত হয়ে খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখল।একেকটা সময় বড় অনুর্বর যায়।অশান্ত। কেমন একটা খাপছাড়া ভাব। ঈশানের বাবা মন দিয়ে টেলিভিশন দেখছেন। খবর এবং সিরিয়াল, দুটোই দেখেন আজকাল মন দিয়ে। দূরদর্শনে কিছু বোকা বোকা ডায়ালগ কানে আসে। সারাদিনরাত রিপিট টেলিকাস্ট চলে বোধহয়।ভীষণ দামী অথচ ক্যাটক্যাটে রঙের কান্জিভরম বা ঢাকাই আর একগাদা গয়না পরা মহিলারা কচকচ করে কুচুটেপনা করে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায়।চেম্বারে বসতেন যখন তখন টেলিভিশনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না । এখন সারাদিনের অনেকটা সিরিয়ালের কথাকাটাকাটি আর কূটকাচালি দেখে যান। এই প্রশস্ত দক্ষিণ বারান্দায় বসে ঈশানের কানে ডায়ালগ ভেসে আসে।


    - একথা তুমি মনে রাখবে যে একবার সিঁদুর পরিয়েছো। কাজেই তুমিই আমার স্বামী।


    - ভাত কাপড়ের আয়োজন করতে হবে। তখন কিন্ত নতুন বউ ঢাক বাজাবে।


    - আমি ঐ মেয়েকে তোমার জীবন থেকে সরাবই।


    - তুমি তো মারা গিয়েছিলে।কী করে ফিরে এলে আবার?


    ঈশান কুলকুল করে হেসে ফেলে। এইসব সংলাপ কারা লেখেন? এই যে এতবড় দুঃসময় গেলো, কোনো সিরিয়ালে তার এতটুকু ছাপ পড়লো না! খালি সাংসারিক ষড়যন্ত্র, পুজোর সরঞ্জাম আর সমবেত নাচ নাহয় সমবেত ভিলেইনি দিয়ে গোটা গোটা সিরিয়াল অজগর সাপের মত হিসহিস করতে করতে চলেছে। ঈশানের বাবা , একজন ডাক্তার। বেশ পরিশীলিত মানুষ , তিনিও কেমন করে এই চলমান বিভীষিকা দেখে যান কে জানে!বয়স হলে যখন অনেক ক্ষমতা কমে আসে, ঘরবন্দি মানুষ তখন নত হয়।সামনে যেটুকু পায় তাই নিয়ে জীবন কাটায়। ঈশানের বাবা বই পত্র পড়েন।মেডিক্যাল জার্ণাল।কিন্ত এখন পড়ার তাগিদ অনেক কম।


    বাতাসে একটা শিরশিরে ভাব। শীত আসছে। দূরে একটা নারকেল গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে।বহুতল আর বড় বড় বাড়ির ফাঁকে এভাবেই একটু প্রকৃতি দেখা দেয় এইশহরে।রোদ পড়ে চকচক করছে পাতাগুলো।দেখতে দেখতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে ঈশান।ছেড়ে গেছে যে মেয়েটি , তার সঙ্গে অনেক দুপুর , সকাল , রাত কেটেছে এই বারান্দাতে।প্রেমে ও অপ্রেমে যৌথজীবন ধরা আছে বারান্দার পুরোনো অথচ নতুনভাবে রঙ করা রেলিং এ।পাম গাছের পাতাতে।বেতের মোড়াতে।অনেকদিন বাদে তার মুখটা ভেসে উঠল।সে এখন ইংল্যান্ডে। দেড়বছরের একটা ছানাও আছে, শুনেছে ঈশান।স্ট্রেইট বাদামি চুল।ঘননীল একটা পোলো নেক সোয়েটার পরা ছবি দিয়েছে সে ফেসবুকে। বাচ্চাটা খিলখিল করে হাসছে।একেবারে সাহেবের বাচ্চা।


    প্রাক্তন স্ত্রী এখনো ফেসবুকে বন্ধুতালিকাতে আছে ঈশানের।ব্লক করতে পারেনি।কোনোরকম দুর্বলতা নয়।যাস্ট অভদ্রতা করতে ওর বাঁধে।কেমন ছোট মনে হয় নিজেকে। নো মিননেস ঈশান।নিজেই নিজেকে বলে।রঞ্জিণী তাই বন্ধু হয়ে থাকে।জন্মদিনে উইশ করে দুজনে দূজনকে।মানে পোস্ট করে ওয়ালে।ভদ্রতা।ব্যস।ঐটুকু। 


    টুপুর এখনো আসেনি এই বারান্দাতে। নিচে চেম্বারে তার গতিবিধি। তাড়াহুড়োতে আর রুচি নেই ঈশানের।অনেক দেখা হয়ে গেল জীবনের এইবয়সেই। যেটা থাকার , যদি থাকার হয় , থাকবে। তার জন্য হাঁকুপাকু করার কোনো প্রয়োজন নেই।


    একটা চড়াই এসে বসল রেলিং এ। এদিক ওদিক দেখল। ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে ঘুরে দেখল এদিক ওদিক।তারপর উড়ে গেল। টুপুর কী খানিক ঐরকম? এখন আর ডেফিনিট কিছু ভাবে না ঈশান।তবু অভ্যেসবেশে ফোন তুলে একটা ফোন করেই ফেলে টুপুরকে।


    - ফিরে গেছো? 


    - না স্যর। আজকেও থাকছি । আপাতত মুড়ি কড়াইশুটি খাচ্ছি। হেভি লাগছে।কড়াশুটিটা খুব মিষ্টি। সঙ্গে কাঁচালঙ্কা। বিশাল ঝাল। লাল চা।ব্রেকফাস্ট। খেয়েছে কখনো? 


    ঈশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খায়নি। সাধারণত তাদের বাড়ির ব্রেকফাস্ট পাউরুটি।পোচ।ফলের রস বা ফল। কখনো সসেজ বা সালামি।ব্রেকফাস্ট যেদিন জলখাবারের মেকওভার নেয়, সেদিন লুচি, সাদা আলুর দম। শীতে কড়াইশুটির কচুরি।ইডলি। বা উত্তাপম। কফি।এইসব। তাকে খাঅংঅয সাজিয়ে দেওয়ার লোক আছে।মা আছেন।তবু এই জলখাবারের কথা শুনে তার বুকের মধ্যে চিনচিন করল। এইমুহূর্তে তার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে । টুপুরের কাছে।নারকেল গাছের পাতার চিকচিকে রোদ গায়ে মেখে।সে তৃষ্ণার্ত।ঠিক একমুহূর্তে সে দেহজ। আর পাঁচজনের মত সে টুপুরকে চাইছে। কিন্ত এখন তাকে যেতে হবে চেম্বারে।


    - তুমি আসবে ঈশান, এখানে আজ? 


    - আজ নয় টুপুর। আজ অনেকগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে।


    আগে হলে টুপুরের রাগ হত। অভিমান হত। ঈশানেরও। এখন হয় না। তার মানে এই নয় যে আবেগগুলো চলে গেছে।এখন ওরা আর আবেগ নিয়ে খেলা করে না।অনেক সংযত।পরিণত। 


    - আজ একজন পেশেন্ট আসবেন, জানো। তাঁর ধারণা যে তাঁর কোভিড হয়েছে। স্বাদ, গন্ধ বোধ চলে গেছে।এবং উনি ভাবছেন যে বাড়ির লোক ইচ্ছে করে ট্রিটমেন্ট করাচ্ছে না, তারা চাইছে উনি বিনা চিকিৎসায় মারা যান। 


    - ইশশশ। বাড়ির লোকেরা কেমন?


    - ভালো।রীতিমত কনসার্নড। কিন্ত বাতিক। কী করবে বলো? 


    - মরতে সবাই কত ভয় পায়, তাই না ঈশান? 


    - হ্যাঁ।এই আশি বছরের মানুষটিকে মৃত্যুর ভয় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কাঁদেন ছেলেমানুষের মত। টিভিতে খবর শুনতে পারে না বাড়ির লোক।ওঁর ধারণা উনি কোভিডেই মারা যাবেন।


    - আজ করুণার পিসি মরণকাঁথার গল্প বলছিলেন, জানো? 


    - হোয়াট? 


    - মরণকাঁথা।


    - সেটা আবার কী?


    - আমিই কী আগে জানতাম নাকী? করুণার পিসি কাঁথা সেলাই করেন তো। স্বনির্ভর প্রকল্পের জন্য।উনি বললেন। কেউ শীতকালে মারা গেলে , তাকে কাঁথা দিয়ে সাজিয়ে দিত আগে। সেলাইয়ে কোনো গিঁট থাকতো না।এই তুমি নকশি কাঁথার মাঠ পড়েনি? 


    পড়েনি।ঈশান বিজ্ঞানের বই পড়েছে।মনস্তত্ত্ব পড়েছে।ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি পড়েছে। সাঁজু রূপাইয়ের কথা পড়েনি। এখন তাকেই ফোন ছাড়তে হবে।স্নানে যেতে হবে।তারপর ফিটফাট হয়ে চেম্বারে বসতে হবে।স্ক্র্যাম্বল্ড এগ আর টোস্ট, কলা রেডি থাকবে টেবলে। খেয়ে সাদা স্ট্রাইপড শার্ট আর টাই পরা মনের ডাক্তারবাবু একরাশ মনখারাপ চেপে রেখে রোগী দেখবে।কাউনসেলিং করবে।


    টুপুর মুড়ির বাটিটা উঠোনের এককোণে নামিয়ে রাখল।এখানে বাথরুম যেতে হলে একটা বড় রঙের হ্যান্ডল দেওয়া কৌটোতে জল ভরতে হয় টিপকল পাম্প করে।টুপুর পাম্প করতে যেতেই করুণার মা হা হা করে উঠলেন।


    - তুমি ছাড়ান দ্যাও মা।আমি দিতেছি।


    উঠোনের পাশে একটা বিব্রত টগরগাছ।সাদা ফুলে ছেয়ে আছে। দারিদ্রের আভরণ। করুণার পিসি একমনে ফোঁড় তুলছেন।মাঝে একটা পদ্ম। অধিকাংশ কাঁথার মাঝে নাকী পদ্ম থাকতো পুরোনো দিনে। মিনতি সাহা। কার সঙ্গে নাকী প্রেম হয়েছিল পিসির কিশোরীবেলাতে। সে কলকাতার বস্তিতে নিয়ে তুলেছিল মিনতিকে।তারপর পালিয়েছিল ফেলে রেখে। আর আসেনি। একদিকে করে জল পাম্পের শব্দ ঘ্যাসঘ্যাস করে।অন্যদিকে কাঁথাতে ফোঁড় ওঠে। টুপুর দেখছে আর এক সাজু নকশা তুলছে। লতাপাতা নয় শুধু।গাছের তলায় বাঁশি বাজাচ্ছে নওল কিশোর।কিশোরী গালে হাত দিয়ে শোনে। ফেরারি রূপাই কবে আসবে? কাঁথা সেলাই করতে করতে পিসি কী ভাবে? সাজুর মত তারওপর তো কাঁথা বিছিয়ে দেবে না কেউ। কাঁথাতে গল্প লেখা হয়।সাজু কাঁথাতে গল্প লেখে।ভালোবাসার দিনের কথা।মাগো, আমার মরণের পরে এই নকশী কাঁথা বিছিয়ে দিও কবরের ওপর। বিষন্ন টগরগাছ দেখতে দেখতে রক্তিমের কথা মনে পড়ল টুপুরের।মন খারাপ হল। এখন আর কেউ প্রেমিক বা প্রেমিকার জন্য গালে হাত দিয়ে বসে মনখারাপ করে না।প্রেমিকার কবরের ওপর বাঁশিই বা বাজাবে কে চাঁদের আলোতে? 


    তবু ঈশানকে সাজু রূপাইয়ের গল্পটা বলবে টুপুর। কোনো রেস্তঁরার বাতানুকুলতাতে নয়। একটা খোলা মাঠের ধারে বসে।চিনে বাদাম খেতে খেতে বলবে কেমন করে কাঁথা সেলাই করতো সাজু।ভালোবাসার কথা লিখতো। বিরহের কথা লিখতো।এই করোনাকালে নিউ নর্মালে সব কিছু ভার্চুয়াল। শিউরে উঠল টুপুর।ঈশানকে ছুঁতে ইচ্ছে করলো দুহাত দিয়ে। 


    এই বুঝি প্রেম? ( চলছে)


    পর্ব চোদ্দ।


    মেইন ল্যাবটা তিনতলাতে। প্রায় সারা তিনতলা জুড়েই তার বিস্তৃতি। এখানে ফ্যাকাল্টির সকলের একটি নিজস্ব ল্যাব আছে।দেবরূপের নিজেকে ভাগ্যবান মনে হল।অবশ্য মেইন ল্যাবেও সবাই খুব কাজে মগ্ন থাকে।খুব একটা বেশি কথাবার্তা হয়না। ল্যাব লাগোয়া একটা বড় সিটিং রুম আছে। সেখানেই ফ্যাকাল্টি মেম্বারস বসেন। কফি খাওয়া হয়। রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটসরা আসে। ডিরেক্টর রুবিনা ত্রিপাঠী বেশ হাসিখুশি মানুষ। বয়েজ কাট চুল।চোখে গোল চশমা।সবসময় ছুটে বেড়াচ্ছেন। একটা ঢাউস ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে ছুটে এসে লিফ্ট ধরেন। নিজেই ড্রাইভ করেন । দেবরূপকে ফ্যাকাল্টির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। 


    এখন সবচেয়ে বেশি রিসার্চ হচ্ছে প্রি সিম্পটোম্যাটিক এবং অ্যাসিম্পটোম্যাটিক কোভিড নাইন্টিন পেশেন্টসদের নিয়ে।রুবিনা কপালের ওপর এসে পড়া কয়েকটা অবাধ্য চুলকে শাসন করতে করতে বললেন। উই হ্যাভ রিসার্চ মনিটরস। ইউ ক্যান জয়েন দ্যাট গ্রুপ অলসো। কিন্ত আমাদের আরো বেশি ভলান্টিয়ারস দরকার। যাঁরা স্বেচ্ছায় ভ্যাক্সিন নেবেন। এক্সপেরিমেন্টাল ভ্যাক্সিন। পোটেনশিয়াল ভলান্টিয়ারস। 


    রুবিনা অনেকটা দুধ আর চিনি দিয়ে কফি খান। বললেন, ইভন আই ওয়জ অ্যান অ্যাসিম্পটোম্যাটিক কোভিড নাইন্টিন পেশেন্ট। কিন্ত আমি পনেরো দিন সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে ছিলাম। আই টুক নো চ্যান্স।বলতে বলতেই ফোনে হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ করছিলেন মহিলা। 


    সো উই আর এনরোলিং পিপল ফ্রম ডাইভার্স জগ্রাফিক এরিয়াস, রেশিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডস, জেন্ডার অ্যান্ড এজেস।


    অ্যাসিম্পটোম্যাটিক পেশেন্টরা মাত্র বিয়াল্লিশ শতাংশ , যাঁরা রোগ ছড়াতে পারেন। প্রি সিম্পটোম্যাটিকদের নিয়েও একটা কাজ চলছে। রুবিনা ক্রুতিকাকে ডাকলেন। 


    ক্রুতিকা কুপ্পালি তাঁর ডানহাত। ইনফেকশাস ডিজিজ রিসার্চার। ক্রুতিকা দেবরূপকে পেপারস বুঝিয়ে দেবে। খুব সাধাসিধে একটি মেয়ে।অনেকটা অভিনেত্রী তিলোত্তমা সোমের মত দেখতে।রোগা। ছোটখাট। দেখে বোঝা যাবে না এতবড় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।


    বিশাল একটি টেবলে তিনটি ডেস্কটপ। দেবরূপ নিজের ল্যাপটপ ক্যারি করছে।


    ওর সামনে ফাইলগুলো পরপর সাজিয়ে রাখা। আপলোডিং চলছে। সিস্টেম্যাটিক রিভিউ অ্যান্ড মেটাঅ্যানালিসিস। উনআশিটা কেস স্টাডি আপাতত।ক্রুতিকা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। চোখের দিকে স্পষ্ট তাকিয়ে কথা বলেন মেয়েটি। দিস ইজ ভাইরাস ডাইনামিক্স। ট্র্যান্সমিসিবিলিটি অব এস এ আর এস কোভ টু। থ্রোট সোয়াবের রিপোর্টের আপলোডিং। ওয়ান।টু। থ্রি। 


    নাম্বার অব ভাইরাল পার্টিকলস প্রেজেন্ট ইন থ্রোট সোয়াব। 


    এটা আরো একটা অ্যাসপেক্ট। অ্যাসিম্পটোম্যাটিক রোগীদের থ্রোট সোয়াবে ভাইরাল পার্টিকলসের সংখ্যা ততটাই, যতটা সিম্পটোম্যাটিক পেশেন্টদের। তাহলে কেউ সুস্থ হচ্ছে, কেউ হচ্ছে না কেন? কোনো কোনো শরীর খুব দ্রুত এই ভাইরাল পার্টিকলস গুলোকে হারিয়ে দিতে পারছে। কেউ কেউ পারছে না।


    টেবলের সামনে কাঁচের জানালা।ব্লাইন্ডস তুলে দিয়েছে ও। দুরের গাছ। প্রায় ফাঁকা ক্যাম্পাস। অদিতি ভাইরাল পার্টিকলসের কাছে হেরে গেছে। সুগার লেভেল হ্যাড শট আপ অ্যাবনর্মালি। ইমিউন সিস্টেম ফেইলড। কিন্ত রিসার্চ বলছে বহু গুরুতরভাবে কোভিড আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তাদের ইমিউন সিস্টেম খুব ভালো। তাহলে? কোভিড ধাঁধাতে ফেলে দিচ্ছে। দেবরূপ অস্পষ্ট অস্ফুট স্বরে বলে উঠল , বাবল্স! 


    ক্রুতিকা অবাক হয়ে তাকাল। 


    - ডিড ইউ সে সামথিং সেনগুপ্তা? 


    গলা খাকড়ি দিয়ে ও বললো, নো। 


    এখন চুপচাপ কাজ নিয়ে বসবে।পুনের ল্যাব হন্ট করছে ওকে।হন্ট করছে ওর একঘরের ফ্ল্যাট।ফ্রিডা কাহলোর ছবি দেওয়া গ্লাস ডোর।গ্যাস ওভেন।ছোট সোফাটা।বুককেসে ঠাসা গুচ্ছের বই।মাথার কাছে খবরের কাগজ।একটা ঘোরের মধ্যে আছে যেন।


    - আর ইউ ফিলিং আনওয়েল? 


    ক্রুতিকা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যি অস্বস্তি লাগছে ওর।


    - জল।একটু জল খাবো। 


    এখানে অ্যাকুয়া গার্ড লাগানো আছে।ক্রুতিকা এক গ্লাস জল এনে দিল ওকে।


    আপাতত কাজে ডুবে যেতে হবে। ইমিউনিটি লিস্ট ভেসে উঠছে মনিটরে। ও চেক করতে শুরু করেছে।ক্রুতিকা বেরিয়ে গেল। 


    মার্কিন মুলুকের রকফেলার ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ফ্যাকাল্টি। ডেস্কটপে একের পর এক রিপোর্ট আসছে।ওখানে কুড়ি জন ভলান্টিয়ার দু দফাতে ভ্যাকসিন নিয়েছেন।মডার্ণা। পি- ফাইজার।বায়ো- এন - টেক।এই ভ্যাকসিনে আর এন এ ইনস্ট্রাকশনস আছে।তাতে মানুষের দেহের কোষগুলি স্পাইক প্রোটিন তৈরি করবে।ঠিক সেই স্পাইক প্রোটিন যেটা করোনা ভাইরাস ব্যবহার করে মানুষের দেহকে আক্রান্ত করে।ভ্যাকসিন নিলে শরীর ইমিউন মলিকিউলস তৈরি করবে।সেই অ্যান্টিবডির খোঁজ চলছে, যারা স্পাইক প্রোটিন চিনে নেবে। ও হুমড়ি খেয়ে পড়েছে স্ক্রিনে ।


    কিন্ত ভ্যাকসিন আপডেট করতে হবে।ভাইরাস মিউটেইট করছে। ক্রমাগত পাল্টাতে থাকছে তার কাজ। 


    ও ঘামছে। কে যেন বসে আছে পাশে। মা? অদিতি? 


    না। কেউ না। ফাঁকা। শূন্য। পাশে কেউ নেই। ইমিউন সিস্টেমের বি মেমোরি সেলস ভাইরাসকে চিনে রাখে ছ'মাস।


    মানুষের স্মৃতির আয়ু কতদিন? কতদিন মনে থাকে সব? আমেলিয়া মেহতা। এখনো সমস্ত পুরোনো কথা মনে আছে তাঁর। ইদানীংকার কথা ভুলে যান।কিছু গুলিয়ে ফেলেন।বাট শি রিমেমবার্স সো মেনি থিংগস। ভদ্রমহিলার নীল চোখদুটো মনে পড়লো। যেন আলো ঠিকরে বেরোয়। চোখ নয়। আঁখি। পরম বিস্ময় চোখে। এখন এই ল্যাবে বসে ওর আমেলিয়ার সুগন্ধীর কথা মনে পড়ল। দ্যাট লেডি। এবং তাঁর পুতুলগুলো। সাধারণ পুতুলের চেয়ে অনেক বড়। অনেক জীবন্ত। প্লাস্টিক না।ফাইবার না। যেন মানুষ। আমেলিয়া খুব টানছেন যেন!এখন ওর প্রায় পাঁচ ছয় ঘন্টা কাটবে ল্যাবে। তারপর বেরিয়ে মেট্রো ধরবে। 


    ফিরবে যখন , তখন সুনন্দিতার নাচের ক্লাস চলবে পুরোদমে। গিজার অন করে দিয়ে ও শুয়ে পড়ে। স্নান করে, চেঞ্জ করে বেরোবে একেবারে। কানে আসে বোল। তেই তৎ তেই তৎ তেই!তেইয়া তেইয়া তৎ তেই । ঘুঙুরের সম্মিলিত শব্দ। একসঙ্গে উঠছে পড়ছে তালবদ্ধ পদক্ষেপ। বাঈ এসে চা দিয়ে গেল। ওর অলস লাগছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। সারাদিন কম্প্যুটারে কাজ করার পর চোখ ক্লান্ত। কিন্ত ওর খুব ইচ্ছে করছে আমেলিয়ার কাছে গিয়ে বসতে। শি ইজ ইন্টেরেস্টিং। ইচ্ছে এবং আলস্যের দোলাচলে দুলছে ও। অনেকগুলো বাঁধা আছে। অনেকগুলো। কিন্ত কী সেগুলো ও নিজেও আইডেন্টিফাই করতে পারছে না। 


    হলের এককোণে টেলিভিশন সেট দেওয়াল জোড়া।একটা কুকিং চ্যানেল খোলা আছে।একজন পাঞ্জাবি শেফ গান গাইছেন , নমক শমক, চমক, দমক। বলছেন , আদ্রক জারা চপ কর দিজিয়ে, রাই কা তেল গরম কর দিজিয়ে। করন্জী দিজিয়ে।হলদি পাউডার আউর নমক ডাল দিজিয়ে । হোয়াইট পাম্পকিন বহত জলদি কুক হো যাতে হ্যায়।ভদ্রলোক লাউ চিংড়ি রান্না করা শেখাচ্ছেন। একটি সবুজ টি শার্ট পরা ছেলে ছবি তুলছে।এ হল ফুড ফোটোগ্রাফার।শেফ বলছেন, ইয়ে হ্যায় বেঙ্গল কা ডিশ। বেঙ্গলমে জনম হুয়া হ্যায় মেরা।


    আজকাল কতরকম প্রোফেশন হয়! 


    আমেলিয়ার ঘরটি ডানপাশে।কাঠের দরজা আধা ভেজানো আছে। আলো জ্বলছে। ওর খুব ইচ্ছে করছে ঐ ঘরে যেতে।


    হলের আর এককোণে প্রচুর কম্বল ভাঁজ করে রাখা।রোজ কেউ না কেউ দুটো তিনটে মোটা কম্বল নিয়ে আসছে।ঐ কোণাতে জমা হচ্ছে। অন্যান্য ঘরেও আছে। এত কম্বল কেন? ও মুখে জিজ্ঞেস করেনি। চোখ কথা বলে।সুনন্দিতা কিছু বলার আগে নিকি বলে উঠেছিল, অল দ্য ব্ল্যাংকেটস আর ফর দ্য ফারমার্স হু আর কামিং ফর দ্য র্যালি। ঠান্ড পর যায়েগি না! কৃষক মিছিল আসছে। সবাই কিছু না কিছু জড়ো করছেন। আন্দোলন সফল করতে হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। 


    নিকির রোগা শরীরকে ছাপিয়ে চকচক করে উজ্জ্বল দুটি চোখ। চশমার আড়ালেও উজ্জ্বল। চোখে পড়ার মত। যেন আমেলিয়ার দৃষ্টির কিছুটা ধরা আছে ওর চোখে।


    ( চলছে)


    পর্ব পনেরো।


    ফার্মার্স ল ইজ নট অ্যাগাইন্স্ট দ্য ফারমার্স। সাম পিপল সে সো। 


    এখন সকাল সাড়ে আটটা।ওরা খাবার টেবলে।


    নিকি বলছিল। একটা গাঢ় বেগুনি রঙের পোলোনেক পরেছে মেয়েটা।সারাদিন ল্যাপটপের সামনে বসে থাকে। নাহয় ডেস্কটপ।


    বাট আই ডোন্ট থিংক সো। 


    দেবরূপ প্রায় কিছুই জানে না কৃষিবিল সম্পর্কে।সুনন্দিতার সঙ্গে একেবারে ঘরোয়া কথা হয়। মহিলার সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল এই যে উনি একদম নন ইন্টারফিয়ারিং। অথচ জেনুইন । বেশি কথা বলেন না। সকালে ব্রেকফাস্ট টেবলে দেখা হয়। আজ বানিয়েছিলেন একদম বাঙালি ধাঁচে সাদা লুচি তরকারি। দেবরূপ আসার পর থেকে বাঙালি পদ একটু বেশিই করাচ্ছেন সুনন্দিতা। মনে বেশ একটা চনমনে ভাব। 


    - ইফ ইউ ওয়ান্ট , সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণসভাতে আসতে পারো। কিছু বেশি আয়োজন নয়। স্মৃতিচারণ। গান। পাঠ। আসবে? 


    ঘাড় নেড়েছিল দেবরূপ। যাবে।সন্ধেবেলা ফিরে চোখ ব্যথা থাকে। এক আধদিন একটু অন্যরকম ইচ্ছে করে।সুনন্দিতার খাওয়া হয়ে গেলে উঠে গেলেন।নাচের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে । পরমপ্রতাপ অনেক ভোরে বেরিয়েছেন। সুমন নেই। 


    নিকি হুইলচেয়ারে বসেই খায়। আরো লুচি আনো বাঈ। ও চেঁচিয়ে বলল। 


    দেবরূপ দেখলো এক মহিলা অনেকগুলো ব্রাউনপেপারের প্যাকেট নিয়ে ঢুকলেন।নিকি বললো, আন্টি উও স্টোরমে রাখ দিজিয়ে। মাম্মি কো বোল দুঙ্গি। আপ আইয়ে টেবলমে।ব্রেকফাস্ট কিজিয়ে হামারে সাথ। 


    মহিলা প্যাকেটগুলো নিয়ে স্টোরের দিকে চলে গেলেন। তারপর খালি হাতে এসে বসলেন। হাঁটাচলা, বসাতে বোঝা গেল যে তিনি এই বাড়ির অতি পরিচিত।স্বচ্ছন্দ। এবং পায়ে বাত আছে। 


    নিকি দেবরূপের সঙ্গে আলাপ করাচ্ছে।


    বসুন্ধরা আন্টি।বসুন্ধরা মেরহোত্রা। শি ইজ আ পেইন্টার। আ নেক্স্টডোর নেবার।


    অ্যান্ড দিস ইজ দেবরূপ। ফ্রম কলকাতা। মাইক্রোবায়োলজিস্ট। ওয়র্কিং ইন ডেলহি ইউনিভার্সিটি। 


    বসুন্ধরার চুল কাঁচাপাকা।কালার করেননি।হাসলে গালে দিব্যি একটি টোল পড়ে। বললেন , স্রিফ চার ব্ল্যাংকেটস লায়ি আজ। কাল আওর দো। 


    ইজ দ্য বিল রিয়ালি হার্মফুল ফর দ্য ফারমার্স? কৃষিবিল কী কৃষকদের পক্ষে সত্যিই ক্ষতিকর? 


    বসুন্ধরা টোল ফেলে হাসলেন। 


    থিওরিটিক্যালি নয়।


    বসুন্ধরা বাংলা বলতে পারেন কিছুটা। কলকাতাতেও ছিলেন অনেকদিন।হিন্দি বাংলা মিশিয়ে কথা বলেন।


    - শুনে মনে হবে কোনো সমস্যা নেই।ইলেকট্রনিক ট্রেডিং হবে।ই কমার্স। কিন্ত স্টেট গভমেন্ট লেভি ফি পাবে না।


    একটা লুচির মধ্যে আলুর তরকারি দিয়ে রোল পাকাচ্ছেন বসুন্ধরা।


    - অ্যাপারেন্টলি অলরাইট। ইট উইল এক্সপ্যান্ড দ্য স্কোপ অব ট্রেড এরিয়াস।দেয়ার ক্যান বি এনি প্লেস অব প্রডাকশন। কালেকশন। অ্যাগ্রেগেশন।


    বাট রিয়ালিটি ইজ ডিফরেন্ট।


    দেবরূপ বুঝতে পারছে না এখনো ঠিক। কখনোই কোনো থিওরি বাস্তবে সম্পূর্ণ রূপায়ণ হয় না।কিন্ত কিছুই কী হয় না? হোয়াই প্রটেস্ট দেন?


    পাশের হলে ঘুঙুরের শব্দ শুরু হয়ে গেছে। এই শব্দ বেশ ভালো লাগে ওর। 


    নিকি কফি ঢালছে।খুব সরু আঙুল। দেবরূপ বসুন্ধরার দিকে এগিয়ে দিতে গেল মাগটা । হাত তুলে কফি দিতে নিষেধ করলেন।মেরে লিয়ে চায়ে।


    ওর উজ্জ্বল চোখদুটো তুলে নিকি বলল, 


    ফার্মার্স লোগোকো কুছ এমপাওয়ারমেন্ট আওর প্রোটেকশন হোতা হ্যায়।সাম লিগাল ফ্রেমওয়র্ক এন্টার দ্য প্রি অ্যারেন্জড কন্ট্র্যাক্টস উইদ বাইয়ার্স। যদি ফার্মিং এর আগেই বাইয়ার আর ফার্মারের মধ্যে এগ্রিমেন্ট করতে হয়,ইট ক্যান বি ডেনজেরাস ফর দ্য ফারমার্স! অ্যান্ড ইট ইজ আ ন্যাশনাল ফ্রেমওয়র্ক। আগর প্রোডাকশন আচ্ছা নহি হুয়া কিসি সাল , ফার্মার তো মর যায়েগা! 


    এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টের ব্যাপারটা দেবরূপ জানে। সিরিয়ালস, ডাল, আলু , পেঁয়াজ,তেল আর নিত্য প্রয়োজনের জিনিস নয়।স্টকহোল্ডিং লিমিট তুলে দেওয়া একটা ভয়ানক কাজ। আই অ্যাডমিট।


    - ইয়েস ।দ্যাট অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট।নাইন্টিন ফিফটি ফাইভ। ইয়েস। 


    তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে এল। আমেলিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। বাঈ হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে এসেছে।বেশ খানিকটা দুরে। 


    বসুন্ধরা মেরহোত্রা দৌড়ে গিয়ে আমেলিয়াকে জড়িয়ে ধরে দুগালে চুমু খেলেন।


    - আমেলিয়ার উদ্ভাসিত মুখে শিশুর হাসি।


    - ইউ নটি গার্ল। কিতনে দিন বাদ আয়ে হো।ইউ লুক রেডিয়ান্ট।


    - মেরে লিয়ে ভি চায়ে।


    বাঈ আমেলিয়াকে ডাইনিং টেবলের কাছে নিয়ে এসে চেয়ারে বসিয়ে দিল। দুরে আমেলিয়ার হাই চেয়ার ফাঁকা এখন।একফালি রোদ এসে পড়েছে। আমেলিয়ার পরণে একটা হাল্কা ভায়োলেট কালারের গাউন।জর্জেট জাতীয় মেটিরিয়াল। একটা শাল জড়ানো গায়ে।হাল্কা ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। ব্রেকফাস্টের পর সাধারণত খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যায় ও । আজ একটু দেরিতে যাবে। কেমন একটা ঝিমঝিমে রোদ উঠেছে। তাপ নেই অত। জানালা দিয়ে টবে গুচ্ছ গুচ্ছ ক্রিসমথিমাম। সাদা।হলুদ।পিংক। অবসাদ কাটিয়ে দেওয়া রঙ সব। আমেলিয়ার বেইজ কালারের শালটার ওপর একটা মথ উড়ে এসে বসল।শ্লথ লাগছে। বসুন্ধরার চা এসেছে। পরিষ্কার তাজা দার্জিলিঙ চা। মালবিকার অনুষঙ্গ যেন। 


    বসুন্ধরা চা ঢালতে ঢালতে বললেন, কভি আ যানা ঘর পর। কাম টু মাই স্টুডিও। ইফ ইউ আর ইন্টেরেস্টেড ইন পেইন্টিং।


    আমেলিয়ার খাবার এসেছে।আজ টেবলে আসতে দেরি হয়ে গেছে তাঁর। তিনি বলে উঠলেন, 


    বসুন্ধরা ইজ আ ভেরি ট্যালেন্টেড বাট আন্ডাররেইটেড পেইন্টার। আই লাইক দ্য সাটলটি অব হার পেইন্টিংস।বাট ভাসু , হোয়াই আর ইউর পেইন্টিংস কনসার্নড উইদ ডেথ ওনলি? ডীপ অ্যান্ড স্টার্ক কালারস। গুড। বাট মেলানকলিক।হোয়াই ডোন্ট ইউ পেইন্ট লাইফ?


    কথাগুলো ঘুরছে ওর মাথার ওপর দিয়ে।মাথার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে ।মস্তিষ্কের কোষে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কেমন আছে পুনে শহর অদিতিকে ছাড়া? সেই হলুদ স্কুটি আর ঘোরে না রাস্তাতে! খুব ইচ্ছে করছে অচ্যুত বা মুমতাজকে একটা ফোন করে।কিন্ত মুমতাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।মুখে কিছু বলেননি। চোখে স্পষ্ট গভীর দোষারোপ। সুনি কেমন আছে! ওর অপারেশন হল? 


    আমেলিয়া বলে উঠলেন , গ্রীন রিভোলিউশন উইল নট বি ডিফিটেড।ফার্মার্স ইউনিটি উইল উইন ! তাঁর গলার শিরা ফুটে উঠেছে।ফর্সা চামড়ার নিচে নীল শিরা। লোলচর্ম ।অথচ প্রশান্ত।কী দৃঢ়তা গলাতে।


    নিকি ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ডু ইউ নো অ্যাবাউট কমিশন এজেন্টস ইন দ্য মান্ডিজ? দে উইল সাফার আ লট।


    দেবরূপ মান্ডি বা কমিশন এজেন্ট সম্পর্কে কিছুই জানে না।সে ব্ল্যাংক তাকালো। নিকি বুঝতে পারছে। বসুন্ধরা বললেন, আইল গেট আটা বাই টুমরো। কব যা রহে হ্যায় গাড়ি? 


    পঞ্চাশ কেজি মত আটা আনবেন বসুন্ধরা।পরজিতের বাড়ি থেকে ট্রাক ছাড়বে।টুওয়ার্ডস সিংঘু বর্ডার। সামনে কঠিন যুদ্ধ।


    দেবরূপ ভাইরাস বোঝে। কমিশন এজেন্ট কী কিছুটা জানে।সেটা যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জানতো না।


    নিকি কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ইন পাঞ্জাব অ্যান্ড হরিয়ানা কমিশন এজেন্টস আর ভেরি অ্যাক্টিভ। ইউভ গট টু হ্যাভ প্লেন্টি অব নলেজ রিগার্ডিং প্রোডাক্ট , ফার্মিং অ্যান্ড সেলস টু বি অ্যান এজেন্ট। শুধু দালালি না।প্যাশন ইজ নিডেড।মার্কেট রিসার্চ করতে হবে,কোল্ড কলিং, ক্রিয়েটিং প্রোপোজালস, সেলস নেগোসিয়েশন ।দ্যাট ইজ টাফ। বসুন্ধরা আন্টি নোজ।


    চা শেষ করে বসুন্ধরা হাসলেন ।ইয়েস।মাই সান ইজ আ কমিশন এজেন্ট। আই অ্যাম ফর দ্য ফারমার্স। 


    এ পি এম সি ফার্মারদের প্রডাকশন, নেগোসিয়েশন , সেল সব রেগুলেট করে। আচ্ছা কাম করতা হ্যায়।সবকো লাইসেন্স দেতা হ্যায়। বাইয়ার্স।কমিশন এজেন্টস।প্রাইভেট মার্কেট কন্ট্রোল করতা হ্যায়।দে অলসো প্রভাইড উইদ নেসেসারি মার্কেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার।ফিরভি করতে হ্যায় এপি এমসি কাম নহি করতা হ্যায়।ইয়ে ক্যায়সি বাত হুয়ি। আরে বাবা ! আচার কে বিনা ক্যায়সে খাতে হো পুরী? এ নিক্কি!!বাঈ কো বোল আচার লানে কে লিয়ে।খাট্ট্ মিঠা উও যো হ্যায় না? আমকি! 


    সুনন্দিতা ক্লাসে একটা রিসেস দিয়েছেন পাঁচ মিনিটের।হাঁপাতে হাঁপাতে এসেছেন। কোমরে লাল বাঁধনির ওড়না।সাদা সালোয়ার কামিজ।বসুন্ধরার কাঁধে হাত দিয়ে আলতো চাপ।তারপর জল খাচ্ছেন। 


    - ভাসু! ইউ আর কামিং টু দ্য প্রোগ্রাম, না? 


    - সেরটেইনলি। 


    বসুন্ধরা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি পোর্ট্রেট এঁকে দিয়েছেন। স্মরণ সভাতে সেটিই সজ্জিত হবে।কলকাতাতে সেদিন বিসর্জন ছিল।যেদিন অপু চলে গেলেন।দেবরূপ হাঁটতে বেরিয়েছিল। একদল ছেলে নাচতে নাচতে যাচ্ছিল বিসর্জনের মিছিলে।বিশ্রী লেগেছিল ওর। সেদিন অন্তত যদি নাচটা বাদ দেওয়া যেত । ঐ মহীরূহ কী এতটুকু সম্মান পেতে পারতেন না সেদিন ! বাঙালি কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে গেছে।ইন্টিগ্রিটিহীন। ছন্নছাড়া। 


    দেবরূপকে ডাকলেন মালবিকা।


    ভাসু অ্যান্ড মি। বুজুম ফ্রেন্ডস। কী ডিসকাস করছিলে তোমরা? 


    নিকি কফি শেষ করে বলল, ফার্মার্স বিল মম। হি ইজ ইন্টেরেস্টেড। 


    মেয়ের পিছনে এসে দাঁড়ালেন সুনন্দিতার।উজ্জ্বল হাসি চোখে। যেমন থাকেন তিনি। চকচকে চোখের নিচে এক কুচি নিথর কষ্ট জমে আছে। মেয়ে হলে নাচ শিখবে , ভীষণ শখ ছিল তাঁর।নিজে ধরে ধরে শেখাবেন। ভারতনাট্যম। কথ্থক। যে কোনো একটা স্ট্রিম। 


    নিকি চার বছর বয়সের পর হাঁটতে পারল না।স্নায়ুরোগ।জটিল থেকে জটিলতর হতে হতে শুকনো পাতার মত প্রাণহীন পা দুটি।সুনন্দিতার প্রতিটি ঘুঙুরবদ্ধ পদক্ষেপে কষ্ট ধ্বনিত হয়। মানুষ কত যন্ত্রণা অতিক্রম করে যে কাজ করে! করেই যায়। সুনন্দিতা সর্বদা উৎফুল্ল।


    আমেলিয়া পরিজ খাচ্ছেন। 


    হোয়েন উইল মানি রিটার্ন? 


    বিফোর দ্য লার্জ প্রাইভেট প্লেয়ার্স আর ইনটু ফার্মিং আই হোপ! 


    আমেলিয়ার গলায় একটা বিব।বাচ্চাদের মত।আয়াটি ভালোই দেখভাল করে।তবু আমেলিয়ার মানিকেই চাই।মানি ওয়জ ভেরি হেল্পফুল।


    - হাউ ইজ মানি? 


    দেবরূপ খেয়াল করলো, আমেলিয়ার গলায় একটা শিশু সুলভ মিষ্টত্ব আছে।অনেকটা বুড়ো হলে বোধহয় এমন হয়।


    ( চলছে)


    পর্ব ষোলো।


    উরারতু। উরারতু। 


    আর্মেনিয়ান হাইল্যান্ডস।সবুজ উপত্যকাভূমি।


    দেবরূপ অবাক হয়ে তাকাল আমেলিয়ার দিকে। এবং তারপর তাঁর ঘরের বর্ণময় উজ্জ্বল তৈলচিত্রটি। সরু কালো ঘেঁষা ব্রাউন ফ্রেম।একটা গোল্ডেন লাইনিং।


    অন দ্যাট ক্যানভাস ইউ ক্যান সি অল মেসোপোটামিয়ান গডস।প্যান্থিয়ন। 


    আমেলিয়ার মুখে একটি স্বর্গীয় হাসি। আকাশি নীল রাতপোশাক এখনো পরিধানে।মাথায় স্কার্ফ বাঁধা। খুকিটি যেন।


    এই নিয়ে দ্বিতীয় দিন দেবরূপ এই ঘরে এল। যেদিন ল্যাব বা ইউনিভার্সিটি যায় সেদিন খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটে। তাছাড়া স্নান না করে, সম্পূর্ণ স্যানিটাইজড না হয়ে আমেলিয়ার কাছে আসা অনুচিত। তার খুব ভয় করে। খুব । সে যদি রোগের ক্যারিয়ার হয়? যদি আবার তার থেকে কোনো ইনফেকশন ছড়ায়! ইতিমধ্যেই কাউকে না জানিয়ে সে টেস্ট করিয়েছে।কোভিড নেগেটিভ। এবার নিশ্চিন্তে সে আমেলিয়ার ঘরে যেতে পারে। সুনন্দিতাই বলেছেন। ইউ মে গো অ্যান্ড টক টু হার, ইফ ইউ ওয়ান্ট। 


    যদি তুমি চাও। ইফ ইউ ওয়ান্ট। দিস ইজ ভাইট্যালি ইম্পরট্যান্ট। মালবিকার মধ্যে এই চয়েস দেবার ক্ষমতা দেখেনি সে। বাবু, আমি এটা চাই আমি চাই তুমি এটা করো।আমি চাই তুমি সিমবায়োসিস যাও।আমি চাই তুমি বিদেশে যাও। রক্তিম চলে যাচ্ছে। আমি চাই তুমি সুখী হও বাবু। 


    যেন চাইলেই সুখ দেওয়া যায়। আপাতত ও অসুখ বেছে নিয়েছে। 


    সুনন্দিতা ফ্লেক্সিবল। একেবারেই ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তোলেন না।যদিও জানেন কিছুটা।ওর ধারণা মালবিকা বলেছেন যতটা জানেন। অ্যান্ড শি ইন্টারপ্রেটস অ্যাজ আ ক্লিশে লাভস্টোরি। ড্যাম! এটা নিতে পারে না ও।অদিতি ক্যাননট বি জেনেরালাইজড।সে সাধারণীকরণ ঘেন্না করে এই ক্ষেত্রে।যে অদিতিকে কখনো না দেখেই তাকে প্রতিপক্ষ তৈরি করে রেখেছে সে কেমন করে বলতে পারে, আমার ছেলের মন ভালো নেই। ওর গার্লফ্রেন্ড মারা গেছে। এই শব্দগুলির কোনোটাই যথেষ্ট নয়।কিছুই বোঝায় না।ওর রাগ হতে থাকে । এর থেকে কিছু না বলা ভালো ছিল। 


    ডিসগাস্টিং। ও হিস হিস করে সেইমুহূর্তগুলিতে।ফাকিংলি ডিসগাস্টিং।


    ও বাথরুমে ঢুকে পাগলের মত শাওয়ারে ভেজে। 


    অনেকটা রিল্যাক্স্ড। স্নানের পর একটা স্নিগ্ধবোধ। স্নায়ু শান্ত। 


    দেয়ার ইউ ক্যান সি দ্য ট্রি অব লাইফ। ও ছবির দিকে তাকিয়েছিল। আমেলিয়া উচ্ছসিত হয়ে ওকে ছবি বোঝাচ্ছেন । কিচ্ছু মূর্তি রয়েছে ছবিতে। কিছুটা বিমূর্ততা।মেসোপোটামিয়ান শিল্প। 


    - আমাদের প্যান্থিয়নে তিন দেবতা। যাস্ট লাইক ইওর রিলিজিয়ন। তোমাদের ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। ক্রিয়েশন, প্রিসার্ভেশন, ডিস্ট্রাকশন। আই নো। হিয়ার অলসো ইউ ফাইন্ড থ্রি গডহেডস। 


    হলদি। দ্য গড অব ওয়ার।যুদ্ধের দেবতা।তৈশেবা। গড অব স্টর্মস। সি দ্য পেইন্টিং? দ্য গড সারাউন্ডেড বাই স্টর্মস! দেন শিভিনি। সান গড। দেয়ার ওয়ের সেভেন্টি নাইন গডস অ্যান্ড গডেসেস ইন আর্মেনিয়ান প্যান্থিয়ন।বিফোর দি অ্যারাইভাল অব ক্রিশ্চিয়ানিটি। 


    সিট ইয়ং ম্যান। দেবরূপ ছবি দেখতে দেখতে বসে পড়েছে।ও আগে ইজিপশিয়ান পেইন্টিং দেখেছে।অনেক মিল খুঁজে পাচ্ছে। কালচে নীল আর কালচে সবুজের সঙ্গে ইয়েলো অকার মেশানো ব্যাকগ্রাউন্ড। ডানাওয়ালা মেয়েরা।এরা কী পরি? ডানাওয়ালা পুরুষ। বার্ডমেন।স্করপিও মেন।মৎসমানুষ। ওর মনে পড়ল ইকথিয়ান্ডারের কথা।উভচর মানুষ।দরিয়ার দানো।সব হাইব্রিড প্রাণী।কেন? 


    আমেলিয়াকে প্রথমে দেখলে একটা ভয় মিশ্রিত সমীহভাব আসে। তাঁর নীল চোখ, তীক্ষ্ণ নাসিকা তাঁর বার্ধক্যকে অতিক্রম করে পারিপার্শ্বিকে প্রভাব ফেলে। 


    ও অবাক হল।এখানেও ত্রিশক্তি! 


    আমেলিয়া বসতে বলছেন।সিট ! ছোট একটা টান।গলাটা সরু হয়ে যাচ্ছে।একটি ছোট পাখি যেন ডাকছে। 


    দেয়ার ইউ ক্যান সি মোভসেস। বাইবেলের মোজস।আমেলিয়ার মোভাসেস।


    নোয়াহ হ্যাড টু সনস। দুই ছেলে। হায়ক অ্যান্ড বেল। হ্যায়ক ভাল। বেল খারাপ। ইভিল। ব্যাবিলনিয়ান টাইর্যান্ট। দুজনে যুদ্ধ হল। ঐ যে ।সি দ্যাট পেইন্টিং। ও পাশের ছবি দেখছে। দু পক্ষে যুদ্ধ হচ্ছে বোঝা যায়।সবখানে ভালো আর মন্দের যুদ্ধ। এটা ট্রয়ের যুদ্ধের ছবি বলে ভাবছিল ও। 


    - বেল অত্যাচার করছিল।হি ওয়জ অপ্রেসিভ। উদ্ধত। অ্যাগ্রেসিভ। হায়ক একদিন বিদ্রোহ করল। তারপর মাউন্ট আরারতে ফিরে এলো।ইন আর্মেনিয়া। ক্যান ইউ সি দ্য পেইন্টিং স্পিকস? 


    আমরা আর্মেনিয়ানরা নোয়ার ডিরেক্ট বংশধর।


    দোজ হু মেড রাইটিয়াস রিবেলিয়ন অ্যাগাইন্স্ট দ্য টিরানি অ্যান্ড অপ্রেশন অব ব্যাবিলন। 


    ছবিতে মাউন্ট আরারত। আর্মেনিয়ানদের প্রতীক।নোয়ার পুণ্য তরী মহাপ্রলয়ের শেষে এসে ঠেকেছে আর্মেনিয়াতে।


    দেবরূপ একটা বেতের চেয়ারে বসেছে। প্যাস্টেল শেডের নরম গদী। ডুবে যাচ্ছে যেন।


    - সো আর্মেনিয়াস হ্যাভ আ প্রি ক্রিশ্চান পাস্ট?



    অব কোর্স। অল ক্রিশ্চানস হ্যাভ আ পেগান পাস্ট।দেখো।ছবি গুলো ।কী জীবন্ত! কী প্রাণবন্ত! আর্মেনিয়ানস আর দ্য চিল্ডরেন অব সান।


    আমেলিয়া কী মনের কথা পড়তে পারেন! 


    বলে উঠলেন,


    - দেখো, দেখো! আমাদের ছবি কথা বলে! ঠিক আমার পুতুলদের মত! 


    বলেই চুপ করে গেলেন।ছোট শিশু যেমন ছোট্ট 


    অন্যায় করে চুপ করে যায়। 


    তাকিয়ে আছেন উজ্জ্বল ভাবে। যেন পুতুলদের কথা বলা ঠিক হয়নি। বিরাশি বছর বয়সে কেউ পুতুল খেলে বুঝি!কী বলবে লোকে!


    দেবরূপ মোহাচ্ছন্ন। যেন এক অন্য জগত।সারাদিন তার মাথায় ভাইরাস, ভ্যাকসিন, রক্তকণিকা, ইমিউনিটি যেন ঘুরপাক খেতে থাকে। গা গুলিয়ে ওঠে শেষে।বমি পায় স্ক্রিনে চোখ রেখে।


    - হোয়াট ইজ গুড? হোয়াট ইজ ইভিল।


    আমেলিয়ার পাশে একটা চায়ের কাপ। ছোট্ট করে চুমুক দিলেন। ঘন্টা রাখা পাশে।বাজালেন। বাঈ দৌড়ে এসেছে। 


    - সাম টি ফর দিস ইয়ং ম্যান।


    - কল মি দেবরূপ ম্যাম।


    - দে...ভরূপ? 


    - অর বাবু। অ্যাজ ইউ প্রেফার! 


    আমেলিয়া মাথা কাৎ করে দেখছেন।


    - দ্য লার্জ রিটেইলার্স। ইভিল। দে উইল ক্রিয়েট কনট্র্যাক্ট অন প্রি- এগ্রিড প্রাইসেস। আগে থেকে চুক্তি করবে। স্মল অ্যান্ড মার্জিনাল ফার্মার্স উইল সাফার। 


    আমেলিয়ার মাথার পিছনে একটা মস্ত পুতুল।হাতে বানানো। গোল চোখ।নীল।মাথায় খড়ের টুপি। এ কী কৃষক পুতুল? কৃষক কী পুতুল? অদ্ভুত চোখ দুটো।কথা বলা চোখ। এই ঘরের জানালা প্রায় সব বন্ধ একটি খোলা।দেবরূপ খুঁজছে কিছু।পাচ্ছে না। তার স্থিতি চাই।আধঘন্টা হোক।এক ঘন্টা হোক।তার ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করে কারু কাছে।যাতে সব অন্তর্গত বিষাদ ধুয়ে যায়। আবার জমবে জানে।কিছু সময়ের মুক্তি।পাচ্ছে না।ছবির দিকে তাকিয়েছিল। ভালো লাগছিল। অন্য সময়।অন্য পৃথিবীর রঙ। 


    রাইটিয়াস রিবেলিয়ন অ্যাগাইন্স্ট টির্যানি। 


    আমেলিয়া আবার বললেন কেটে কেটে । ইদার উইদড্র দ্য থ্রি লেজিসলেশনস। অর গ্যারান্টি এম এস পি।ইন্ট্রোডিউস আ নিউ ল। রাইট। 


    কোলে তুলে নিয়েছেন পুতুলটিকে। তার টুপির খড় ছুঁয়ে যাচ্ছে তাঁর শীর্ণ গাল।


    জানো বাবু! 


    আমেলিয়ার বাবু ডাকটা অন্যরকম । ত্রিদিব, মালবিকা বা সুনন্দিতার মত নয়। বা তে বেশি টান। 


    উরারতু। পিপল অব উরারতু। হি ইজ ওয়ান অব দেম ।


    পুতুল দেখাচ্ছেন ওকে। যেন পুতুল নয়।মানুষ সে।


    - হোয়াই সো মেনি হাইব্রিড ক্রিচার্স ম্যাম? এত হাঁসজারু কেন? 


    আমেলিয়ার চোখে অবাক বোধ।


    - কী বললে তুমি? 


    ও বুঝতে পারে হাঁসজারুটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। 


    চা এল। 


    - হোয়াট ডিড ইউ সে?


    - আই মিন, এত হাইব্রিড প্রাণী কেন ছবিতে? ফিশ ম্যান...


    আমেলিয়া তাকিয়ে আছেন। রহস্য টলটল করছে তাঁর চোখে।


    ( চলছে)


    পর্ব সতেরো।


    মানি বারোটা একটার দিকে একচক্কর বাজার ঘুরে এল। সকালে বাজার যাবার কোনো কথাই ওঠে না। একটা পেটমোটা সাদা বা কালো চিকণ সরু লাউ বলো আর ফ্যাকশা পালংশাক বলো, সব তখন আগুন দাম। সারাবছর বাঁধাকপি , ফুলকপি মেলে এখন।শীতের সবজি বলে আলাদা কিছু নেই।তাই স্বাদও নেই। মটরশুটি পর্যন্ত বছরভর পাওয়া যায়। অনেকদিন বাদে দুটো ভালোমন্দ খাবার শখ কী আর করোনা কেড়ে নিতে পারে! তাই মুখে একটা মাস্ক লাগিয়ে বেশ বেলা করে মানি বাজারে ঢুকল। এখন বাজার পড়ে যায়। পয়সাওয়ালা লোকেরা সাড়ে আটটা থেকে এগারোটার মধ্যে বাজার সারে। সকালে আসে মর্ণিং ওয়াক ফেরত লোকজন। বারোটার পর পড়ে থাকা শাকসবজি অনেক কমে পাওয়ার উপায় থাকে।


    মানি দরদাম করে দুটো শুঁটকো ফুলকপি কিনল।আলু ফুলকপির ডালনা খাবার জন্য মনটা আছাড়িপিছাড়ি করছে বড়।শাশুড়ির জন্য লাউডগা নিল লকলকে দেখে।আলু , লাউডগা, দুচারটে পটল , পাঁচফোড়নে স্যাঁৎলানোর সময় যে গন্ধটা ছাড়ে, সেটা মনে পড়ে জিভে জল এল।শাশুড়ির রান্না ভালো।আগের রাতে ডাল ভিজিয়ে রেখেছে। সকালে বেটেছে একটু হলুদ , নুন আর লঙ্কা দিয়ে। এবার ঐ স্যাঁৎলানো সবজিতে একটু করে জল পড়বে আর শাশুড়ি হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিটোল একটা করে বড়া বানিয়ে ডালবাটা ফেলবে। একটাও এদিক ওদিক হয় না , এমন পরিস্কার বুড়ির হাত।মানি দিল্লিতে মেহতা হাউসে এই জলবড়া রেঁধে খাইয়ে এসেছে পর্যন্ত।সুনন্দিতা চেটেপুটে খেয়ে মাড়িতে জিভ দিয়ে টকাস টকাস করে শব্দ করে বলেছিলেন, বড্ড ভাল বানিয়েছিস রে মানি! আরেকদিন খাওয়াস। মানি হেসে মরে। তাও যদি শাশুড়ির মতো গোল হত বড়াগুলো। পাঞ্জাবিরা বড় ঘি খায়। এই জলবড়াতে তেল ঘি' র কোনো বাড়াবাড়ি নেই। তবে আমেলিয়াকে খাওয়ানো যায়নি।তিনি তাঁর বাঁধা ডায়েটের বাইরে যেতে চান না।


    মানির মেমসাহেব বুড়ির কথা খুব মনে পড়ে। জ্যান্ত বড়সড় পুতুল যেন একটা! কিন্তু মেজাজ আছে ষোলো আনা।নিজের মর্জিতে চলে।


    ভাবতে ভাবতে মানি খানকয় সজনেডাঁটাও নিয়ে নিল।দাম এখন বেশ কম।দোকানিরা ঝাড়াপোঁছা যা কিছু আছে বিক্রি করে চলে যাবে। গতকাল রাতে বিশু তাকে বেদম পিটিয়েছে। কাজ না থাকলে যা হয়। হাতে পয়সা নেই। মানির চুড়িটা চেয়েছিল। মানি দেয়নি। ঐ দুগাছা চুড়ি আর একটা গলার মালাই তো আছে থাকার মধ্যে। সেটাও দিয়ে দিলে স্ত্রীধন বলে আর রইলো কী। বিশু যখন মারছিলো বাড়ির একটা কেউ টু শব্দ করেনি। চুপচাপ বসেছিল সব মেয়েমদ্দাগুলো। মানি চুপচাপ মার খেয়েছে।কিন্ত চুড়ি কোথায় আছে বলেনি। হাত থেকে খুলে রেখেছিল আগেই। বোঝা যাচ্ছিল বিশুর নজর পড়ছে তার হাতে। নিজের বর যদি এমন হয় তবে আর শাশুড়ি, ভাসুর কী করবে? দাঁতে দাঁত চেপে আছে মানি।একটা টেম্পোরারি কাজ খুঁজে পেয়েছে। সকালে রান্না।রাতে রুটি।যে কটা টাকা হবে ছেলেদের ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে দুএকদিন। তারপর আবার দিল্লির ট্রেন ধরবে মানি। বিশু যাক না যাক, পচে মরুক সে তাকাবে না। এখানে এসে আরো বিগড়ে গেছে লোকটা।মাছ তো ধরতে পারতো যে কয়দিন বসে আছে।তা করবে না।শুধু নেশা।শুধু নেশা।আর যার সঙ্গে নেশা করছে তার সঙ্গে আর কিছুদিন থাকলে মেয়েমানুষের নেশাও ধরে যাবে। শাশুড়ি চিৎকার করে, স্বামীকে শুধারাও, শুধরাও। মানি ঠোঁট উলটায়। স্বামী কী কচি খোকা নাকি! কালশিরে পড়েছে বুকে।পিঠে।কোমরে। কাজের বাড়িতে ফ্রিজে বরফ আছে।নিয়ে খানিক ঘষেছে। কিন্ত নখের আঁচড়ে বড় জ্বালা। মনের জ্বালা তার চেয়েও বেশি। লকডাউনের আগে বিশু এমন ছিল না। এই কয়মাসে আমূল পাল্টে গেল মানুষটা। মিস্ত্রির কাজ খুঁজেছে কয়েক জায়গাতে।পায়নি। তাতে আরো মাথা গরম। মালদা থেকে যারা দিল্লি যায় তারা পাকাপাকিভাবে ফেরে না কেউ।ছুটিছাটা নিয়ে আসা। কিন্ত লকডাউনের হিসেব আলাদা হয়ে গেছে।লোকাল মিস্ত্রিরাই কাজ পায় না। দিল্লিওয়ালাদের তারা এন্ট্রি দেবে না।ছুটকো কাজেও না। আর মাছ ধরার ধৈর্য বিশুর নেই। বড় নেতাজি বাজারে মাছের আড়ৎ। চালানি মাছের অভাব নেই।লোকাল মাছের বিক্রেতারা নিজেদের মধ্যেই কম্পিটিশন করে।বিশুর দ্বারা কিসুই হবে না।ভাবলেই গায়ে বিছুটিপাতা লাগে মানির।তাই সে দিল্লি চলো ঠিক করে নিয়েছে।নিজের হাতে টাকা থাকা দরকার। নইলে মেয়েমানুষের কোনো দাম নেই।এই যদি টোটো কেনার টাকাটা বিশুর মুখের ওপর ছুঁড়ে দিতে পারতো, তাহলে বরটি তার গদগদ হয়ে পায়ের তলায় পড়ে থাকতো। প্রেমের বিয়ে করে মানির তো এই হাল হল। বিয়েতে পণ নেয়নি।তাই এখন চুড়ি দে।বালা দে।প্রেম সোহাগ সব বাণে ভেসে গেছে। মদ খেয়ে এসে উবদো হয়ে পড়ে থাকছে। 


    মানি ঠিক করেছে আর বড় জোর একটা মাস ।তারপর সে দিল্লি ফিরে যাবে মেহতা হাউসে। করোনা না হলে কেই বা ফিরে আসতো পড়ে মার খেতে।ছেলে দুটো বই মালদার পিছুটান নেই তার।তারা তাদের ঠাকুমার কাছে দিব্যি থাকবে। টাকা পেলে মুখ খুলবে না শাশুড়ি। মানি এখন বোঝে টাকাতে দুনিয়া চলে। তাই হাতে কিছু রাখল।অনেক দরদাম করে কুচো চিংড়ি নিল একটু।ছেলে দুটো মুরগির মাংস খেতে ভালোবাসে।একদিন নিতে হবে মাইনে পেয়েই। শাশুড়ি গেছে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড করাতে।ছবি তুলতে হবে তার আগে। মেহতা হাউসের মেমসাহেব গিন্নি মা যে সবুজ ফুলকপি সেদ্ধ খান , গোলাপি আঙুলে কাঁটা চামচ নড়বড় করে সেই সবুজ ফুলকপি দেখে মানি আরো আকুল হল ফিরে যাবার জন্য। আরাম বড় বাই।


    তাছাড়া আমেলিয়া মেমসাহেবের হাতটিও দরাজ। দেওয়া থোয়া লেগেই থাকে।


    ফোনে বলছিল বৌদি, একটা বাঙালি ছেলে নাকী বাড়িতে থাকছে এখন।সে থাকগে।মানির তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই।মোটমাট আমেলিয়া আর নিকিবাবার দেখাশোনা করে তার হাতে এন্তার সময় থাকে আরাম করার।টাকাও অনেকটা। কী লাভ সাহাপুরে পড়ে থেকে! 


    বুড়ি মেম একা একা পুতুলদের সঙ্গে কথা বলে। দেখেছে মানি। যখন কেউ বাড়ি থাকে না।কিংবা সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।শুধু নিকিবাবা জেগে থাকে নিজের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে, বুড়ি মেম পুতুলদের গায়ে হাত বোলায়।আর আশ্চর্য ! পুতুলগুলো যেন জ্যান্ত হয়ে ওঠে!


    ঘরের নীল পর্দা নরম আলোতে দোল খেতে থাকে, মনে হয় জলে ঢেউ লেগেছে। উঁকি দিয়ে দেখলে আমেলিয়া টের পান না। হানভার তাঁর প্রিয় পুতুল। তার নীল চোখে পৃথিবীর সব বিস্ময়। ঘুমের ঘোরে মানি স্বপ্ন দেখে আমেলিয়া তাঁর হানভারকে গল্প বলছেন। হানভারের পোশাক সাদামাটা ।সে কৃষক কীনা! 


    আমেলিয়া বলছেন, শোন হানভার, কিছুতে ভয় পাবি না। তুই মাটির কাছাকাছি থাকিস কীনা! তোর বুদ্ধি সবচেয়ে বেশি। তোকে স্বপ্নালু ছেলের গল্প বলি শোন।


    সে ছিল এক স্বপ্নদেখা ছেলে। তার বাপ মা নাম রেখেছিল স্বপ্নকুমার। একদিন সে ঘুম থেকে উঠে তার মা' কে বলল, মা , কাল রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।মা বলল, কী স্বপ্ন বাছা? সে বলল, বলবো না। মা ধরে পিট্টি দিল। বাপের কাছে গিয়ে বলল, স্বপ্ন দেখেছি।কী দেখেছি বলবো না। বাপ ধরে পেটালো।স্বপ্নকুমার বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।লোকে বলল, খাবি কী? সে বলল, যা জুটবে তাই খাবো।ভেবো না গো। 


    ঘুরতে ঘুরতে সে গেল এক রাজপুরিতে। চুপ করে ঢুকে গেল মাটির নিচের ঘরে। সেই সেলারের পাশেই রাজকন্যের ঘর।রাজকন্যের গলায় দুইগাছি মুক্তোর মালা।


    হানভার চোখ বড় বড় করে শুনছে।স্পষ্ট দেখা যায় তার হাবভাব।বড় বড় চোখের পাতা পড়লো।একদম যেন মানুষ। হলুদ সাদামাটা কোট।লাল জামা।


    রাতের বেলা দেওয়ালে সিঁদ কেটে স্বপ্নকুমার রাজকন্যের ঘরে ঢুকল।রাজকন্যের জন্য রাখা খাবারদাবার সব খেয়ে ফিরে এল তার সেলারে।রাজকন্যে তো অবাক! দিন যায়।রোজ খাবার চুরি।একদিন রাজকন্যে ওৎ পেতে থাকল।আর হাতে নাতে ধরেও ফেলল স্বপ্নকুমারকে। কিন্ত কপাল। দুজনের দুজনকে এমন পছন্দ হয়ে গেল যে রাজকন্যের মুক্তোর মালা বদল করে গন্ধর্বমতে বিয়েই করে ফেলল তারা। 


    মানি দেখল, হানভার চোখের পাতা ফেলে বললো, তারপর? 


    রাজা বললেন, এই ছেলে আমার জামাই হবে? দেখি কেমন বুদ্ধি! একটা দুদিন সমান লাঠি আনা হল।বলো দেখি স্বপ্নকুমার? কোন দিকটা মাথা কোনটা পিছন।স্বপ্নকুমার বললো, জলে ডুবিয়ে দাও লাঠি।পিছনদিক জলে ডুবে থাকবে।


    বাহারে কী বুদ্ধি ছেলের!


    এবার রাজকন্যের বাবা বললেন, আনো তিনটে ঘোড়া। বলো দেখি স্বপ্নকুমার,কোনটি মা ঘোড়া, কোনটি একবছরের আর কোনটি দুবছরের? স্বপ্নকুমার বলল, সারারাত ঘোড়াগুলো আস্তাবলে থাকুক। সকালে এক বান্ডিল খড় দাও ওদের।ভিজে।নুন মাখানো। যে আগে খেতে যাবে সে মা ঘোড়া। তার পিছনে যাবে দুবছরেরটি। আর সবার শেষে একবছরের ঘোড়া।


    সবাই তাজ্জব বনে গেল!


    রাজামশাই খুশি হয়ে জামাইবরণ করলেন।স্বপ্নকুমার হল কৃষকরাজা। হানভার খুশি হয়ে মাথা ঝাঁকালো।এই স্বপ্ন দেখেছিল স্বপ্নালু ছেলে।


    তাই বলছি হানভার! স্বপ্ন দেখতে হয় আর পা মাটিতে রাখতে হয়।বুঝলি বেটা! 


    আমেলিয়া তার গলাতে একটি সবুজ স্কার্ফ বেঁধে দিলেন। আর গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়েও পড়লেন।হানভার তাঁর কোলেই থাকল।সেও ঘুমালো বোধহয়। 


    মানির শরীরের জ্বালা কমে এসেছে কিছুটা।স্বপ্ন হাত বোলাচ্ছে যন্ত্রণাতে।


    গল্প শুনতে শুনতে দেবরূপের চোখেও ঘুম এলো । ওষুধ ছাড়াই অনেকদিন বাদে।


    আধোঘুমের মধ্যে মেসেজ এলো।


    চেঙ্গালা থেকে অনিল টমাস লিখেছেন, কেমন আছো দেবরূপ? হাউজ লাইফ?


    ( চলছে)


    পর্ব আঠেরো।


    ইউ পিপল আর ফন্ড অব বার্বি ডলস।প্ল্যাস্টিক ডলস।ফাইবার ডলস। আর্টিফিশিয়াল। কৃত্রিম। আমাদের আর্মেনিয়ানদের পুতুল হল হাতে তৈরি পুতুল। তার দিয়ে গোল করে ফ্রেম তৈরি করা হয়।তার মধ্যেই তার দিয়ে বাঁধা হয় কাঠামো। একহাত সমান পুতুল সব। কোনটা আরো বড়। তুলো, ফেলে দেওয়া কাপড়, কাঠের টুকরো , কোটের টুকরো , পুঁতি, বোতাম, রঙ তুলি এইসব শতেক জিনিস দিয়ে তৈরি হতে থাকে পুতুল। শিল্পীর মনের মাধুরী মিশে থাকে পুতুলের চোখে, নাকে, ঠোঁটের কোণে হাসিতে।একমাথা চুল জেনে রেখো আসল।ঐসব নকলি নাইলনের চুল নয়।বাড়ির মেয়ের মাথার চুল যখন কাটা হয়েছিল, তখন জমিয়ে রাখা হয়েছিল। এই যে দেখছো হ্যানভার। এর মাথার চুল শিল্পীর নিজের মাথার চুল দিয়ে বানানো।শিল্পী কে জানো? মারিয়া কার্শিনোভা! বলতে বলতে আমেলিয়ার চোখে যেন স্বর্গীয় দ্যুতি।


    দেবরূপের পুতুল সম্পর্কে কোনোদিন কোনো আগ্রহ ছিল না।এমনকী সে তার বোন টুপুরকেও কখনো পুতুল খেলতে দেখেনি।ছোটবেলাতে টুপুর বন্দুক ভালোবাসতো। বাড়িতে কোনো পুতুল ছিল কীনা মনে পড়ে না। তবে দিদুনের আলমারিতে দেখেছে।কৃষ্ণনগরের পুতুল।বর কনে। বাউল বাউলনি। সাহেব মেম। 


    মারিয়া কার্শিনোভার নাম সে জীবনে শোনেনি।অথচ আমেলিয়ার মুখ দেখে মনে হচ্ছে নামটা সবার শোনা থাকাই স্বাভাবিক! 


    বার্বি ডলস নয়।বারবার বলছেন। 


    তবে সত্যি আমেলিয়ার পুতুলদের জাত আলাদা।তারা মানুষ মানুষ পুতুল।


    আমেলিয়া মুখটা নিচু করে নামিয়ে আনলেন।শিশুর মত হাতে একটি রুমাল মুঠো করে ধরে রেখেছেন। রুমালের চারপাশে লেস বসানো।চোখ মুছলেন রুমাল দিয়ে।চোখে জল আসছিল।তারপর ফিসফিস করে বললেন, 


    ডু ইউ নো, হোয়াই ডলস ওয়ের মেড ইন দ্য পাস্ট? দে ওয়ের মেড ফর ম্যাজিক অ্যান্ড রিচুয়ালস। 


    বলেই মুখটা আবার তুলে নিয়ে ঘাড়টা ঈষৎ কাৎ করে ভারি গম্ভীর হয়ে গেলেন। 


    দে আর রিপ্রেজেন্টেশনস অব ডিইটিজ। 


    তুমি জিজ্ঞেস করছিলে না, কেন এত হাইব্রিড ক্রিচার্স ইন পেইন্টিংস? দেয়ার আর হাইব্রিড ডলস টু। 


    আবার সেই অতল রহস্যময় হাসি। 


    সি দিজ পার্টলি হিউম্যান ডলস? 


    সিন্দুক থেকে বেরিয়ে আসছে ডানাওয়ালা মানুষ।মৎসনারী। অশ্বমানব। বেড়াল মানুষ।কুকুর মানুষ।


    - মানুষ সবসময়ই নিজেকে অপূর্ণ ভাবে।আরো চাই আরো চাই।


    আমেলিয়ার গা থেকে ভারি মিষ্টি একটা এলাচদানার গন্ধ নির্গত হচ্ছে।


    মানুষ ঘোড়ার মত গতি চায়। পাখির মত উড়তে চায়। মাছের মত জলে ডুব দিয়ে সাগরের গভীরে যেতে চায়। দে ওয়ান্ট টু অ্যাকুয়ার দ্য মেন্টাল অ্যান্ড স্পিরিচুয়াল অ্যাট্রিবিউটস অব ভেরিয়াস বিস্টস অ্যান্ড পাওয়ার অ্যানিম্যালস। তাই তারা হাইব্রিড বানায়।জীবনে যা হয় না তা কল্পনাতে হয়।


    আচ্ছা, ডিড এনিওয়ান ইম্যাজিন করোনা ভাইরাস? 


    হাওয়াতে ভাসছিল দেবরূপ। দুম করে মাটিতে ফিরে এলো।


    না।নো ওয়ান হ্যাড এভার হার্ড অব ইট।কেউ জানতো না। কেউ প্রস্তুত ছিল না।কেউ মানে জনতা।পাবলিক।কেউ মানে জনগণ।তবে কেউ কেউ জানতো।বৈজ্ঞানিক। মাইক্রোবায়োলজিস্ট। রাষ্ট্রনায়ক।ওর বন্ধুরা তর্ক করে কফির গ্লাসে তুফান তুলেছে।প্যান্ডেমিক না প্ল্যানডেমিক? ওয়জ এভরিথিং স্টপড টু গেট হোল্ড অব ওয়র্ল্ড ইকোনমি? চেঞ্জ ইট অ্যাবসলিউটলি! নাহলে এই এত অনলাইনের রমরমা কেন? অনলাইন এজুকেশন।অনলাইন ব্যবসা।অনলাইন কোর্সেস।ওয়েবিনার। হোয়াই? 


    আমেলিয়া ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।যেন উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব ওর। 


    -আই ডোন্নো।জানিনা। বাট অদিতি ডায়েড।শি ওয়জ করোনা পজিটিভ। 


    - হু'জ অদিতি? 


    আমেলিয়া জিজ্ঞেস করলেন।খুব স্বাভাবিক ভাবে।যেমন বাচ্চারা প্রশ্ন করে।এটা কী? ওটা কী? ও কে? 


    ও উত্তর দিতে পারলো না। চুপ করে থাকল। 


    বাঈ ঢুকছে ঘরে ।এখন স্যুপ খাবেন আমেলিয়া। কিন্ত বাঈকে পছন্দ নয় তাঁর।


    মানি কোথায়? মানি? ফোন করো তো ।মানিকে কল করো।কল হার ইমিডিয়েটলি। 


    একটু যেন রেগেই গেছেন মনে হয়।


    দেবরূপ বুঝতে পারছে না মানি কে। তাকে কেন ডাকতে হবে। 


    ফোনে অনিল টমাসের মেসেজ এসে পড়ে আছে। অনিল টমাস মানে মুম্বাই। কোকিলাবেন।অনিল টমাস মানে চেক আপ। ডায়াগনোসিস।অনিল টমাস মানে অদিতি শিবরামণ। কেমন টাল খেয়ে গেল মাথাটা ওর।কাঁপছে যেন। ইউনিভার্সিটি যেতে হবে। ও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে দেখল সুনন্দিতা খবরের কাগজ পড়ছেন । চোখ বোলাচ্ছেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই। একটা গাঢ় নীলের ওপর লালসাদা ফুলছাপ সিল্কের হাউসকোট পরেছেন ।চশমা পরলে সুনন্দিতার চেহারা একদম পাল্টে যায়।


    ও কোনোমতে ধরা গলায় বলল, উনি কাকে যেন খুঁজছেন।সাম মানি। প্লিজ অ্যাটেন্ড। 


    সুনন্দিতা ব্যস্ত হয়ে আমেলিয়ার ঘরের দিকে চলে যেতে যেতে ভাবলেন, এই ছেলেটা তাঁকে কোনো সম্বোধন করে না! মাসি বা আন্টি ! কিছুই বলে না।বড্ড চাপা ছেলেটা ।এত ইন্ট্রোভার্টদের নিয়ে খুব মুশকিল।


    শুধু গাছ। ধুধু দুপুর।ল্যাব থেকে তাকালে ও খা খা শূন্যতা দেখে। নেচার মেটাবলিজম।একটা দীর্ঘ বিতর্কের অবসান। ওর ধাঁধা কাটছে।কোভিড ভাইরাস ক্যান ইনফেক্ট বিটা সেলস ইন হিউম্যান বডি।বিটা সেলস হল প্যানক্রিয়াটিক সেলস।ইনসুলিন তৈরি করে যে সমস্ত কোষসমূহ।কোভিড ইনফেকশন সমস্ত বিটা সেলের কাজ থামিয়ে দিতে পারে।


    প্রচলিত ধারণা ছিল কোভিড নাইন্টিন শুধু ফুসফুসকে আক্রান্ত করে।ভুল।শরীরের বিভিন্ন অরগ্যানকে আক্রান্ত করতে পারে এই ভাইরাস।দ্যাট ইজ হাউ অদিতি শিবরামণ গট ইনফেকটেড।গ্লুকোজ মেটাবলিজম গট ইনফেকটেড।ব্লাড সুগার শট আপ অ্যাবনর্ম্যালি।ইয়েস।ইট ইজ কলড মেটাবলিক ডাইসরেগুলেশন।


    এইভাবেই হয়। সব হিসেব ভন্ডুল হয়ে গেলে সামনে ধুধু মাঠ পড়ে থাকে ।খা খা করা দুপুর। সামনে অনলাইনে গুচ্ছের ডেটা।আপলোড। নিষ্প্রাণ স্ক্রীন।জটিল অংক ও তত্ত্ব গুলি। একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। বেয়াক্কেলেভাবে ডেকে যাচ্ছে একনাগাড়ে। 


    হাউ টু কনসেনট্রেট নাও? চোখ রাখল স্ক্রিনে। মালবিকা ফোন করলেন।


    - বাবু, স্কুল খোলেনি যদিও, আমি মিসেস গোমসের সঙ্গে কথা বলে হোস্টেলে শিফট করছি। আই থিংক ইউ পিপল আন্ডারস্ট্যান্ড। 


    - ইয়েস মা।



    -তোমরা বড় হয়ে গেছো।নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তোমাদের নিজেদের লাইফস্টাইল তৈরি হয়েছে। আমার কিচ্ছু নেই। লেট মি ট্রাই। 


    - চেষ্টা করো মা।সবার স্বাধীনতা আছে নিজের মতো করে বাঁচার।যাও।


    - টুপুরকে এখনো কিছু বলিনি। ও ভীষণ ব্যস্ত সুন্দরবন , ক্যানিং, হিঙ্গলগন্জ নিয়ে।নিজের রিসার্চ কী করছে তাও জানি না। বিয়েটা হলে হয়তো এতটা ছন্নছাড়া হত না।


    - তুমি তোমার মত করে বাঁচো মা। লেট টুপুর বি অন হার ওন। রাখি এখন? 


    ফোন রেখে একটা গভীর শ্বাস নিল ও। মালবিকা তাঁর স্কুলের হোস্টেলের সুপারের দায়িত্ব নিচ্ছেন। এখনো খোলেনি স্কুল। তবু কোয়াটারে শিফট করবেন। 


    টুপুরকে এখনো কিছু বলেননি। আশ্চর্য! সেই তো কাছে থাকে।অথচ দেবরূপকে বললেন। ও জানে। টুপুর ব্যস্ত বলে নয়। পুত্র সন্তানের ওপর একটু বেশি ভরসা আছে মালবিকার। এখনো প্রায় মধ্যযুগের কিছু ধারণা আছে। যাক বাইরে।যদি কিছু বদলায় তো ভালো।


    স্ক্রিনে নেচার মেটাবলিজম ও ইমিউনিটির রেশিও ভেসে উঠছে। ও মন দিতে পারছে না।


    কেমন একটা সংসার তাদের। ত্রিদিব নিজের কাজে ব্যস্ত। রীণা যোশির কথা বাবু জানে। ওর অবাক লাগে।তার বাবা কেন ঐ মহিলার কাছে যায়, এই নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি আগে।প্রোভাইডেড তাদের ফ্যামিলি ইউনিট ইনট্যাক্ট থাকে। সেও কী এসকেপিস্ট ছিল তবে? মালবিকার যন্ত্রণার কথা ভাবেনি কেউ। আজ ভাবছে। কিন্ত এখন সময় পার হয়ে গেছে। এখন প্রত্যেকে তার নিজস্ব যন্ত্রণার আবর্তে বাস করে।মুক্তি নেই। 


    - মা কুড হ্যাভ বিন মোর সিমপ্যাথেটিক উইথ টুপুর।


    ও ভাবলো। 


    - মা নিজে একটা যন্ত্রণাদায়ক বিবাহ সম্পর্কে আছে। তবু টুপুরকে জোর করে ঐরকম একটা জায়গাতেই ঢোকাতে চাইছিল কেন? 


    মনস্তত্ত্ব অতি জটিল।উত্তর পাওয়া গেল না।


    অ্যান্ড বাবা।ত্রিদিব ও রীণা। শুধু শারীরিক সম্পর্ক? নাকী তারও অধিক কিছু পাওয়া আছে। 


    ওর নিজের শরীরচেতনা আধমরা হয়ে আছে। ডেস্কটপের সামনে মাথা নিচু করে বসে থাকল। ক্রুতিকা এসে দেখল , ঘুমিয়ে পড়েছে...দিস নিউ গাই ইজ টায়ার্ড। অর হোয়াট? 


    ( চলছে)


    পর্ব উনিশ।


    টুপুর মেধার বাড়ির গ্যারাজে স্টক রাখতে এসেছিলো।প্রচুর ব্যাগ। মাস্ক কিছু। আনলক পিরিয়ডে মাস্কের চাহিদা কিছু কমে গেছে। ইউজ অ্যান্ড থ্রো আছে। এন ফিফটি ফাইভ কিনছে না কেউ আর। মানে কনফিউজড। প্রথমে বলা হয়েছিল যে এন নাইন্টি ফাইভ ইজ আইডিয়াল ।তারপর বলা হল ওটাই ক্ষতিকর। মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না। ফ্যাশনেবল কাঁথা স্টিচের মাস্ক, কলমকারি মাস্ক, কবিতার লাইন লেখা মাস্ক এখনো কিছুটা চলছে।এমনকী বেনারসী মাস্ক।কোভিডের মোকাবিলায় ফ্যাশন পর্যন্ত এলো চলে ।বিয়েবাড়ির জন্য জমকালো মুখবন্ধনী। কিছু ভালো কোয়ালিটির গামছা। ব্যাগ এখন নানারকম বানাচ্ছে ওরা। করুণাকে বলেছে টুপুর, বাজারের ব্যাগ বানাও কাপড়ের। অ্যান্টি প্ল্যাস্টিক স্ট্যান্ড।প্লাস টেকসই। ওয়াশেবল।দেখতে ভালো। একটু প্রচার দরকার। তার আগে করুণা আর প্রতিমাকে কলকাতাতে শিফট করানো দরকার। যেভাবে নিতাই সামন্ত পেছনে লেগেছে, যে কোনো সময় তুলে নিয়ে যেতে পারে মেয়ে দুটোকে। একবার বেঁচেছে।কিন্ত এখন একেবারেই ঘরবন্দি। আবার বিয়ের চেষ্টা চলছে। কিছু ঘটার আগে ওদের কলকাতাতে নিয়ে আসা খুব জরুরি।


    গ্যারাজটা বিশাল বড়। তাই স্টক রাখা যাচ্ছে।কিন্তু এইভাবে বেশিদিন চলে না।একটা ঠিকঠাক জায়গা চাই।জিনিস এবং মানুষ।উভয়ের। 


    ঈশান ফোন করল। টুপুর স্টক গোছাচ্ছিল। মেধা লিখছে।হিসেব মেলাচ্ছে।টুপুর ফোন কেটে দিল।মেসেজ করল। কলিং ইউ। 


    ঈশান রিপ্লাই করল, টেক ইওর টাইম। হোয়াট অ্যাবাউট মেকিং আ ট্রিপ টু বোলপুর? আই অ্যাম সাফোকেটেড। বহুদিন কোথাও যাওয়া হয় না। যাবে?


    করুণা কোথায় থাকবে? মেধার বাড়িতে একজনকে রাখা যায়।তাহলে প্রতিমা? টুপুরের বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠল।


    মা! মা বাড়িতে থাকলে সহজেই প্রতিমাকে বাড়িতে রাখা যেত। ও খুব শান্ত মেয়ে।মালবিকার অসুবিধে হত না কিছুই। কিন্ত এখন বাড়ি ফাঁকা। মালবিকা নেই। তাঁকে ছাড়া বাড়ির চেহারা একদম অন্যরকম। শ্যামা চলে গেছে নিজের বাড়িতে। দুবেলা এসে কাজকর্ম করে দিয়ে যায়। সকালবেলাটাই বেশিক্ষণ থাকে। খুব ঝকঝকে বাড়িঘর এখনো। রান্নাঘরে হলুদ টাইলসে তেমনি রোদ পড়ে। শ্যামা রান্না শেষ হলে সাদা, সবুজ, গোলাপি ন্যাপকিন সার্ফের জলে কেচে ঝুলিয়ে দেয়। বাটামাছের ঝোল। একদম আদাবাটা , হলুদ দিয়ে কখনো।কখনো চিকেন স্ট্যু। কুচো মাছ টম্যাটো , আলু ঝিরিঝিরি করে কেটে। একটু সুক্তো। ত্রিদিবের ব্ল্যাক আউটের পরে এইরকম রান্না হবে, বলে গেছেন মালবিকা। 


    উইক এন্ডে আসেন। সব দেখাশোনা করেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে একটা রাত কাটিয়ে চলে যান। 


    - হস্টেলে তো কেউ নেই মেয়েরা এখন। অতবড় ফ্ল্যাট সুপারের। তুমি একা একা কী করো? 


    ত্রিদিব জিজ্ঞেস করছেন ।ডাইনিং টেবলে খেতে বসেছেন। সামনে সাদা পোর্সেলিনের প্লেটে দুটো রুটি।সবজি।ডাল।টক দই। 


    মালবিকা উত্তর দিলেন না। এক কাপ চা নিয়ে বসেছেন।


    - বাড়িতে থাকা কী খুব অসুবিধাজনক ছিল? 


    ত্রিদিব খুব কাতর ভাবে প্রশ্ন করছেন। শয়নকক্ষে একা থাকা তাঁর টেনশন বৃদ্ধি করে। পাশে মালবিকা নেই।পরিচিত দেহসৌরভ নেই।প্রয়োজনে অভ্যাসবশে দেহকাতরতাকে রিপ্রেস করতে হচ্ছে। তারপর ভয় করে। যদি আবার ব্ল্যাক আউট হয় কখনো! 


    এইসব ভয়ের মুহূর্তে ত্রিদিবের রীণা যোশিকে মনে পড়ে না কখনো। মালবিকাকে হাতড়ে খুঁজতে থাকেন। আঠাশ ভার্সাস পাঁচ।বলা ভালো তিরিশ ভার্সাস পাঁচ। যদি প্রেমপর্ব ধরা যায় মালবিকার সঙ্গে, তবে তিরিশ। রীণা পাঁচ। সময় সত্যি বলবান। অথবা ত্রিদিব অপারচুনিস্ট। সুযোগসন্ধানী। মালবিকা অভ্যেস ও রীণা বিনোদন! এমন সুবিধাযোগ কেটে গেলে অসুবিধে তো হবার কথা বটেই। ত্রিদিবের ঘাম হতে থাকে। 


    - তুমি কী বাড়ি থেকে কাজ করতে পারো না মালবিকা? 


    ত্রিদিব মালবিকা বলে ডাকেন না বহুদিন। হঠাৎই। মালবিকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নির্বিকারভাবে বললেন, পারি।কিন্ত থাকবো না। উইক এন্ডে আসবো।যেমন এসেছি।আবার চলে যাবো।


    - আমার যদি আবার ব্ল্যাক আউট হয়? রাতে? ঘুমের মধ্যে যদি কিছু হয়? 


    এইসব প্রশ্ন যদি পাঁচবছর আগে করতেন ত্রিদিব, মালবিকা আর্দ্র হতেন। হয়তো কাঁদতেন।ভীষণ বিচলিত হতেন।সেটাই টেকন ফর গ্রান্টেড। সমাজ , সিরিয়াল ও স্বামীরা এটাই আশা করেন।


    চা শেষ করলেন ধীরে সুস্থে। মনে মনে বললেন, ব্ল্যাক আউট হোক আর না হোক, ইউ হ্যাভ নট স্টপ্ড মিটিং রীণা যোশি। ইউ ডু এনজয় হার কম্পানি। 


    মুখে কিছু বললেন না।তাঁর বাঁধে।আত্মসমর্পণ না আর। আত্মরক্ষা করছেন। অফেন্সে খেলবেন না।ডিফেন্স। 


    - হলেও আমি তো আটকাতে পারবো না। তাছাড়া, ধরো আমি যদি দুরে চাকরি করতাম? বা মরেই যাই? হোয়াট উইল ইউ ডু? একাই তো ঘুমাবে? অব কোর্স ইউ ক্যান থিংক অব রিম্যারেজ ইন দ্যাট কেস।


    ইচ্ছে করে খোঁচাটা দিলেন। জানেন।খুব ভালো করে জানেন কাপুরুষরা কখনো রীণা যোশির হাত ধরতে পারে না। 


    - কিছু হবে না। লাইফস্টাইলটা ঠিক রাখো।মদ খাওয়া ছাড়ো। অ্যান্ড কিপ ইন টাচ উইদ দ্য ডক।


    ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লেন মালবিকা। শ্যামা এসেছে তিনি এসেছেন বলে। রাতের রান্না করে গুছিয়েগাছিয়ে যাবে।


    ত্রিদিবের ডাক্তারের সঙ্গে মালবিকা নিজেই যোগাযোগ রাখেন নিয়মিত। বাট টাইম হ্যাজ কাম।এখন ত্রিদিব নিজে বুঝতে শুরু করুন নিজেরটুকু।মালবিকা বুঝে দিয়েছেন অনেকদিন। এমনকি ত্রিদিবের কখন খিদে পায় সেটাও।


    ইনাফ ইজ ইনাফ।


    অদ্ভুতভাবে ক'দিনেই ফ্ল্যাটটার ওপর একটা টান জন্মেছে মালবিকার। ছিমছাম করে গুছিয়ে নিচ্ছেন। অসুবিধে হচ্ছে না কিছু। এমনকী ভয় লাগছে না পর্যন্ত। ইন্টারকম এবং ইন্টারনেট।দুটোই আছে।মেট্রন আছেন। সাবিরা হোসেইন। ইট ইজ ফাইন ওভারঅল।সকালের দিকে নিজের রান্নাবান্না করে নেন।তারপর অনলাইন ক্লাস। ফাঁকফোঁকরে বাজার হাট নয় এখনো।সব অনলাইনে কিনছেন।তবে ফ্ল্যাট সাজিয়ে নিচ্ছেন মনের মত।সন্ধের পর দুটি মেয়ে পড়তে আসে।সেটা খুব ভালো টনিকের কাজ করছে। ফেসবুকে একটা রান্নার ব্লগ লিখতে শুরু করেছেন মালবিকা। বেশ ভালো রেসপন্স পাচ্ছেন। ফেলে আসা ঋতুচক্রের বিরহ আপাতত ভোগাচ্ছে না তাঁকে। ভেবেছেন নাচটা শুরু করবেন আবার।সুনন্দিতাই ইন্সিপিরেশন। একটা একটু করে আর্দ্রতা ফিরছে মনে হচ্ছে।


    - শ্যামা, টুপুর খাবে না রাতে? 


    শ্যামা বাসন তুলে দিচ্ছে দেখে জিজ্ঞেস করলেন।


    - দিদি তো নেই। বোলপুর যাবে বলে বেরিয়েছে। 


    মালবিকা ত্রিদিবের দিকে তাকালেন। 


    - বলে গেছে? 


    ত্রিদিব অন্যমনস্ক ভাবে খেয়ে যাচ্ছেন। সন্ধেটা ফাঁকা যাচ্ছে বড় আজকাল।কী করতে পারেন ত্রিদিব?


    ( চলছে)


    ইন কেরালা ফাইটিং উইদ কোভিড ইজ নট আউট সাকসেস স্টোরি।বাট ইট ইজ নাইদার আ ফেইলিওর।


    একটা নিঃশ্বাস ফেলে অনিল টমাস কথাগুলো বললেন। 


    উহান থেকে প্রথম যে মেয়েটি কোভিড পজিটিভের জীবাণু বহন করে এনেছিল, সে নেহাতই একটি কমবয়সিনী ছাত্রী।এয়ারপোর্টে অনিল দুবাই থেকে ল্যান্ড করার কিছুদিন আগেই সে আসে। তার বাবা মা পিপিই পরে দেখা করতে গিয়েছিলেন মেয়েটির সঙ্গে।তারপর পুরো পরিবার আঠাশদিনের আইসোলেশনে ছিল কোভিড কেয়ার সেন্টারে। সম্প্রতি অনিলের সঙ্গে এই পরিবারটির আলাপ হয়েছে। কী ভয়ানক এবং দুর্বিসহ হতে পারে কোভিডের আইসোলেশন সেটা অনিল হাড়ে হাড়ে জানেন। জানেন পলিও। মুম্বাই থেকে পরিবারে ফিরেও যন্ত্রণা কমেনি। হন্ট করছে সমস্ত অভিজ্ঞতার অন্ধকার। টেনশন। অদিতি।হসপিটাল। অপরাধবোধ। বিবমিষা। বাচ্চাদের কলধ্বনি কানে পৌঁছাতো না। দুজনে চুপচাপ দুরে দুরে দুইঘরে পড়ে থাকতেন।যেন বিসর্জন ঘটে গেছে কোনো প্রতিমার। বাগান আলোকিত করে ফুটে আছে ফুল। পলির মা ও এমিলি শিশু এবং বৃক্ষের যত্নে কোনো ত্রুটি রাখেননি। কৃষ্নকিরীডম হাসছে অগণিত পাপড়ির মধ্যে।তবু দুজনেই পীড়িত।দুজনেই ভারাক্রান্ত। পোস্ট কোভিড কাকে বলে অনিল জানেন।পলিও। দুজনেই অন্ধকারে মুখ গুঁজে পড়ে থেকেছেন। 


    তারপর পলি উঠে দাঁড়িয়েছেন। জোর করে। বাড়ির শিশুদুটি বড় বাধ্য। অনলাইন পড়া ও গৃহবন্দি খেলাধুলা করেও তারা এতটুকু বিরক্ত করে না। তাদের বাইরে যাওয়া দরকার।পলির নিজের দরকার।অনিলের। 


    মুম্বাই যাবার আগে কুরিসিমালা ঘুরে এসেছিলেন পলি। ভেবেছিলেন , অনিল সুস্থ হয়ে উঠলে আবার আসবেন। দুজনে মিলে নয়।সবাইকে নিয়ে। এখন খুব কাছাকাছি সবাইকে জড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তাঁর। অনিল এখনো ট্যুওর শুরু করেননি।বাড়িতে বসে অনলাইনে চলছে কাজ। একবার কুরিসিমালা ঘুরে আসা যায় না সবাই মিলে? 


    পলি বলেছিলেন।এত দমবন্ধকরা বিবমিষা।কিছু যেন বলতে চাইছেন অথচ পারছেন না। 


    অনিল কাজ করছেন পরিমিত।বেশি স্ট্রেইন নেওয়া বারণ। চেক আপ করাতে মুম্বাই যাওয়াও যেন এক অভিশাপ এখন। হোয়াই ডিড আই আস্ক দেবরূপ টু জয়েন মি? হোয়াই ডিড অদিতি কাম ইনস্টিড অব দেবরূপ? 


    অন্তর্গত আর্তনাদ বেশি করে মারে।ক্ষত তৈরি করে। বিষাদ বিস্তৃত হতে থাকে।তখন আর রসমের আস্বাদ পরিতৃপ্তি দেয় না।


    অনিল বললেন , চলো। 


    কুরিসুমালা খৃষ্টমাসের আগে সেজে উঠছে।খুব পরিশীলিত সাজ।এখানে কোনো আড়ম্বর নেই।আশ্চর্যের কথা এই যে এখানে কোভিড থাবা বসাতে পারেনি।একটিও করোনা রোগী নেই এখানে।হয়নি। নাহ্।সাধু সন্ত জনিত কোনো অলৌকিক কারণ নেই এই অতিমারীহীনতার পিছনে।এই নির্জন আশ্রমে মানুষ কম।প্রকৃতি বেশি।জীবনযাপন সাদাসিধে। নিজেদের চাষবাসে নিজেদের উদরপূর্তি এই কুরিসুমালাতেই কেরালার প্রথম কোভিড বয়ে নিয়ে আসা মেয়েটি এবং তার পরিবারের সঙ্গে আলাপিত হলেন টমাস। কী ভয়ানক বেদনা তাদের চোখে মুখে এখনো। যেন এখনো সেই আতঙ্কের পাঁকে নিমজ্জিত গোটা পরিবারটি। আরো বেদনার কথা এই যে , এই পরিবারের বড় ছেলেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সটাইল এন্জিনিয়র হিসেবে বেশ ভালো একটি কাজ করতো। লকডাউনের আগেই সে দেশে ফিরে আসে এবং আটকে যায়। আর ফিরতে পারেনি চাকরিটি চলে গেছে।কর্মহীন অবস্থায় সে ছটফট করছে।ডাক্তারী পড়া অসমাপ্ত রেখেই ফিরেছে তার বোন।সেও আর চীনে ফিরতে পারছে না।


    দুহাজার কুড়ি সালের আগে বাবা মেয়েদের, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের অভিভাবকদের একটা টার্গেট থাকত। ছেলে বা মেয়ে আমেরিকা চলে গেছে।বা ইউ কে।বা চিন।বা যেখানেই হোক।দেশের বাইরে। যেন দেশের চৌহদ্দিতে থেকে যাওয়া একধরনের সীমাবদ্ধতা।বাবামায়েদের কাছে অস্বস্তিকর সীমাবদ্ধতা। দেশ পার হতে পারলেই উজ্জ্বল উদ্ধার। তারপর যাই হোক না কেন।কোভিড নাইন্টিন সেই উজ্জ্বল উদ্ধারের ধারণাকে অনেকটা তছনছ করে দিল। এই রত্না নামক মেধাবী ছাত্রীটির বাবা মা কিছুতেই তাকে আর চিনে ফেরত পাঠাতে চাইছেন না।ছেলে তো যেতেই পারছে না। ধোঁয়াশার মত বিষন্নতা ঘিরে আছে যেন। কুরিসুমালার আশ্রমে এসেছেন শান্তির খোঁজে।আশ্রয় চাইতে।সাম রেইজ অব হোপ।কেউ নিজেই পারে।কেউ বাইরের দিকে চেয়ে থাকে।


    এই আশ্রমের আনন্দ উৎসব হল ইন্ডিয়ানাইজড সেলিব্রেশন অব হোলি মাস।


    মাঝখান দিয়ে পিচের রাস্তা দুপাশে ধাপচাষ। গাছগাছালিতে ভরা।দুধ আর মধু বয়ে যায় কেবল।কুরিসু একটি মালায়লাম শব্দ। অর্থ পবিত্র ক্রশ। মালা , অর্থাৎ পর্বতমালা। পবিত্র ক্রশের পর্বতমালা।আচার্য ফ্র্যানসিস উৎসবের দিনের জন্য প্রার্থনার বই লিখেছেন সিরিয়াক থেকে ইংরেজিতে তর্জমা করে।সবাই উন্মুখ।বড়দিন আসছে।এই আশ্রমের মন্ত্রপাঠ, রিচুয়ালস, প্রতীকচিহ্ন, অনেক কিছুই হিন্দুধর্ম থেকে আহরণ করেছেন যাজকরা।পলি প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন।ঠিক যেমন পলিজ নেস্টে তাঁর প্রিয় নালুকেতুর পাশে প্রদীপ সাজান, তেমন। রত্না এসে বসল পাশে।সেও প্রদীপ জ্বালাতে শুরু করলো। নরম উজ্জ্বল আলোতে দুটি বেদনাদগ্ধ মুখ আলোকিত। 


    বাইরে অনিল একা।হাঁটছেন।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই ফোন করলেন দেবরূপকে। 


    হাউজ লাইফ?


    এটা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম প্রশ্ন।এবং ইউজলেস। 


    তবু অনিল টমাসের মত সহজ , সরল মানুষ যখন এইরকম প্রশ্ন করেন, ভারি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় দেবরূপ। সে কেমন আছে সে নিজেও ঠিক বলতে পারবে না।ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে। খাওয়ার রুচি মোটামুটি আছে। কোনোদিন সে ভোরাশিয়াস ইটার নয়।রিসার্চের কাজে খুব গভীর কনসেনট্রেশন এখনো আসে নি।তবে ডেটা বেসড কাজ অনেকটাই যন্ত্রচালিতের মত করতে হয়।সেটা সে আয়ত্তে এনেছে। ক্লান্তিবোধ খুব গভীর। যৌনতাবোধ শূন্য। হাসি পায় না। অভ্যেস বশে যেটুকু।বা ভদ্রতা। স্নান করে।পরিচ্ছন্ন হয়।পরিচিতদের থেকে দুরে থাকে। এখন দিল্লির অবস্থা সারা পৃথিবীর কনসার্ন। কৃষকরা অবরোধে নেমেছেন। এই বিশাল প্রতিরোধের কাছে তার সামান্য জাগতিক অসুবিধা বা সুবিধা, কিছুই না।কণামাত্রও নয়। এত কথা কী অনিলকে বলা যায়? 


    তাই সে যন্ত্রচালিতের মত বলে, ফাইন।লাইফ ইজ ফাইন। 


    রুবিনাজী একবার তাকিয়ে দেখলেন। দিস বয় সিমস টু বি হার্ড ওয়ার্কিং বাট হি ইজ ইন সাম ক্রাইসিস। 


    মৃদুস্বরে বললেন ক্রুতিকাকে। সে ঘাড় নেড়ে সায় দিল। দেবরূপকে ক্লাস এবং সিলেবাস অ্যালট করে দিয়েছেন ওঁরা।


    অনিল হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়েছেন একটি জবা গাছের সামনে। গাঢ় লাল।কালচে।একটা গন্ধ আছে।যদিও জবা সুগন্ধী ফুল নয়। 


    কুরিসুমালা থেকে এই গন্ধ দিল্লিতে পাঠানো যায় না। দেবরূপ কী কুরিসুমালাতে আসবে একবার? অনিলের মনে হয়, ওর ভালো লাগবে।বিক্ষিপ্ত মন শান্ত হবে। আসবে তুমি দেবরূপ? 


    অনিল খুব গভীর আকুতি নিয়ে জানতে চাইলেন।


    নো। প্রত্যয়ী উত্তর।


    নো স্যর। আই ডু নট ওয়ান্ট স্পিরিচুয়জালিটি অ্যাট প্রেজেন্ট।আই নিড টু ওয়র্ক। অ্যাট ওয়র্ক ইজ মাই পিস।


    ভাইরাসের স্ট্রাকচার পাল্টাচ্ছে। তার কার্য ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটছে। ব্রিটেনে সেকেন্ড ওয়েভ। আবার লকডাউন শুরু হয়েছে। ভারতবর্ষে কী সেকেন্ড ওয়েভ আসবে? করোনার দাপটে অন্যান্য রোগ যেন চাপা পড়ে গেছে। 


    অনন্য ভাসুদেবন। দেবরূপের বন্ধু। সে জানিয়েছে এই কোভিডকালে আরো দু রকমের জটিল লিমফোমা আবিষ্কৃত হয়েছে।হজকিন লিমফোমার এক বিরল রূপান্তর। প্রচন্ড অ্যাগ্রেসিভ নন হজকিন লিমফোমা।এই রোগের হদিশ ছিল না আগে।এবং রোগী মারা যাচ্ছে।ভয় পাচ্ছে কোভিড নাইন্টিনে। এই দুনিয়ায় ভালো থাকার সংজ্ঞা অতি জটিল। অগণিত তারার মত ঘাসফুল ফুটে আছে নিচের বাগানে। অপার্থিব আলো বিচ্ছ্যুরিত হচ্ছে যেন।এদের আগাছা বলে মুড়িয়ে কেটে দেওয়া হবে। অদিতি থাকলে সেটা হত না। আগাছা বলে কিছু নেই। ও বলতো। ওর চোখে আগাছা সুন্দর।স্বতঃস্ফূর্ত। এদের নাকী একটা আলাদা গন্ধ আছে। সেই গন্ধ কী টের পাওয়া যায়? চোখ বুঁজে বুক ভরে শ্বাস নিল ও। 


    সিংঘু বর্ডার যাওগে? 


    আচমকা পিঠে হাত।রুবিনাজী। ওঁর বর, ছেলেরা যাচ্ছে। উইল ইউ গো দেবরূপ? 


    ( চলছে)


    পর্ব একুশ


    ডিসেম্বর।ক্লাবের সমস্ত আয়োজন শুরু হয়ে গেছে।সুনন্দিতা আগে একেবারেই ক্লাব কালচারে অভ্যস্ত ছিলেন না।দীনহাটাতে সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল দুর্গাপুজা।কোচবিহারে রাসমেলা। বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত হবার পর নানা উৎসবে এত মগ্ন হয়ে গেলেন যে অন্য কিছুতে আর মন নেই।নাচ তাঁর জীবনে প্রধানতম উৎসব। কলাভবন , সঙ্গীত ভবনের যে কোনো অনুষ্ঠানে তিনি অন্যতম প্রধান শিল্পী।পরমপ্রতাপ তো নাচ দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন।এবং সুনন্দিতার পরিবারের ভয়ানক আপত্তি সত্ত্বেও বিয়েটা হয়েই গেল, কারণ সুনন্দিতার ক্যালকুলেশন। বাঙালি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারে বিবাহ হলে নাচ কপ্পুর হয়ে উড়ে যাবে।সুনন্দিতা জানতেন। পরমপ্রতাপকে তাই প্রথমেই বলেছিলেন, আই ওয়ান্ট ইনাফ স্পেস ফর মাই প্যাশন।মাই ড্যান্স।ইট শুড নট বি হ্যাম্পার্ড আফটার ম্যারেজ।ইফ ইট ইজ ইয়েস, দেন ইয়েস।আদারওয়াইজ নো। উই ক্যান রিমেইন গুড ফ্রেইন্ডস।
    পরমপ্রতাপ ভদ্রলোক। আপাদমস্তক জেন্টলম্যান। নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করবেন, তারপর সংসার ও শিশুর দোহাই দিয়ে নাচ শিকেয় উঠবে বরের চাপে, এমন বীরপুঙ্গব তিনি নন।আমেলিয়া লিস্ট ইন্টারফিয়ারিং।তবে বিশ্বভারতী ও টেগোর সম্পর্কে তাঁর গভীর শ্রদ্ধা।সুনন্দিতা সুন্দর ভাবে ফিট ইন করা যাকে বলে , তাই করে গেলেন। দিল্লি ক্লাব কালচার আস্তে আস্তে সামনে এল।প্রথমদিকে একটু অস্বস্তি হত।নিতে পারতেন না।তারপর ধীরে ধীরে সব অভ্যেস হয়ে গেল। পরমপ্রতাপ অনেকগুলো ক্লাবের মেম্বার।সুনন্দিতার সেইসব জায়গাতে যেতেই হয়। খুব ভালো লাগে না তাঁর ।আবার খুব খারাপও লাগে না।তাঁর ঝলমলে ফ্লেক্সিবিলিটি দিয়ে তিনি আমেলিয়ার মুড ফ্লাকচুয়েশন, নিকির অসুস্থতা, দিনহাটাতে মায়ের পায়ের ব্যথা, ক্লাবে ওয়ে ওয়ে সানিজি, কিতনি সোড়িয়া লাগ রহি হো , সব সামলে নেন।
    পাঞ্জাবীবাগ ক্লাব ছাড়াও ডেলহি জিমখানা ক্লাব আছে।মার্চ মাস থেকে সব গেট টু গেদার, পার্টি বন্ধ।পাঞ্জাবীবাগের ক্লাবে অফুরন্ত সবুজ। কতদিন যাওয়া নেই সেখানে।ওখানে লাইব্রেরিটা ব্যবহার করেন সুনন্দিতা। তাও বন্ধ। এয়ারোবিকস ক্লাস করেন সুনন্দিতা ওখানে।তবে নাচে তাঁর ঢের বেশি এয়ারোবিকস হয়ে যায়।
    প্রতিবার এইসময় দাস্তকর উইন্টার মেলা হয়। উলের বোনা হরেক জিনিস।সারা উত্তর ভারতের আঞ্চলিক হস্তশিল্পীদের জমায়েত। ওখানে একটা ইনটেন্স শপিং করেন বন্ধুদের সঙ্গেই। এবার হল না।খৃষ্টমাস ক্যারলস ক্যাপিটলের ব্রান্চটাও কী হবে কে জানে।সব মিলিয়ে বিশ্রী লাগছে বড়।
    বাট দিস ডেডলি করোনা টাইম।হোয়েন উইল ইট কাম টু অ্যান এন্ড বাবু?
    বাবু চমকে সুনন্দিতার দিকে তাকালো। তার মায়ের বন্ধু এই নারী। মায়ের সামান্য জুনিয়র হবেন হয়তো। সারাদিন এতো রকম কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন মহিলা। কিন্ত মালবিকার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণোচ্ছল। আজ গলায় কেমন একটা বিষন্নতার রেশ যেন।কী বলবে ও তাঁকে?
    একটা ম্যাথেমেটিকাল মডেল বেসড অ্যানালিসিস আছে বটে।সেটা কী সুনন্দিতা বুঝবেন? পুনেতে প্রফেসর যোশি বলতেন, নেভের আন্ডারএস্টিমেট আ হাউসওয়াইফ।শী ইজ অ্যান এক্সেলেন্ট মার্কেটিং অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ব্রেইন। দুহাজার একুশের সেপ্টেম্বরে কোভিড নাইন্টিন হয়তো ভারতবর্ষ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হবে।যখন সংক্রামিত ব্যক্তির সংখ্যা , সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী এবং মৃত রোগীর সমতুল্য হবে , তখন কো এফিশিয়েন্ট শতকরা একশোভাগ থ্রেশহোল্ডে পৌঁছোবে।
    সুনন্দিতা কী কিছু বুঝলেন? খুব আগ্রহভরে তিনি বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে। কপালের কাছে কোঁকড়ানো দুচারটি কাঁচা পাকা চুল।উজ্জ্বল চোখ দুটি।
    বাবুর ভারি মায়া হল।
    ঠিক বুঝতে পারছেন না? না?
    এটা আসলে বেইলির ম্যাথেমেটিক্যাল মডেল ম্যাম।
    সুনন্দিতা হেসে ফেললেন।
    ডোন্ট কল মি ম্যাম বাবু। র্যাদার ইউ ক্যান কল মি মাসি।
    বাবু লজ্জা পেয়েছে ।
    আসলে কনটিনুয়াস ইনফেকশন তখনি বন্ধ হবে যখন ইনফেকশনের সোর্স বন্ধ হবে।সেটা হবে যখন একহয় পেশেন্ট মারা যাবে নয়তো সুস্থ হবে। এটা রিগ্রেশন অ্যানালিসিস।
    ময়দা মাখতে মাখতে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন সুনন্দিতা।যেন বাধ্য ছাত্রী । দেবরূপ একটু উৎসাহিত বোধ করছিল।
    রিগ্রেশন অ্যানালিসিস নির্ভর করে টোট্যাল ইনফেকশন রেট এবং টোট্যাল রিকাভারি রেটের উপর।
    নিকির গলা শোনা গেল।কখন পেছনে এসেছে হুইল চেয়ারে বসেই কে জানে!
    ইয়েস।আই হ্যাভ রেড অ্যাবাউট ইট।রিমুভ্যাল রেট ইজ ওয়র্কড আউট আফটার ক্যালকুলেটিং দ্য পার্সেন্টেজ অব রিমুভড পার্সনস ইন দি ইনফেকটেড পপুলেশন।ইজনট ইট সো? অ্যাম আই রাইট?
    অ্যাবসল্যুটলি। তুমি পড়েছে?
    নিকি সারাদিন ইন্টেরনেটে কিছু না কিছু পড়ে।ওর বয়সী কোনো মেয়েকে এখনো এত নিবিষ্ট চিত্তে পড়তে দেখেনি দেবরূপ। অদিতি পড়তো।কখন পড়তো বোঝা যেত না। ওর আউটডোর অ্যাক্টিভিটি প্রচুর ছিল টুপুর খানিকটা তাই।তবে অশান্ত।ছটফটে।চন্চল।ওর ক্লাসমেটদের সবার আউটডোর জীবন প্রবল।
    এই মেয়ে বাইরে যায়না।যদি যায় হেল্পার বা আয়া প্রয়োজন হয়। কিন্ত একে কখনো ডিপ্রেসড দেখেনি দেবরূপ। কিছু না কিছু নিয়ে অ্যাবসর্বড থাকে।
    সুনন্দিতা ময়দাতে দই দিচ্ছেন। ধবধবে সাদা টক দই।
    জিরে গুড়ো। ভাজা জিরে।এই গন্ধটা দেবরূপকে বাড়ির কথা মনে পড়িয়ে দেয়।

    ও স্পষ্ট সুনন্দিতার দিকে তাকিয়ে।
    - নো ইলিউশন।এপিডেমিক ডেটার কিন্ত কনটিনিউয়াস রিলিজ হয়। ইম্পরট্যান্ট ইন্ডিকেটরগুলোর মারাত্মক পরিবর্তন হতে পারে যে কোনো সময়। যে কোনো ম্যাথেমেটিক্যাল ক্যালকুলেশন বা তার মডেলের অ্যাসাম্পশান কিছুটা সময়ের জন্য করা যেতে পারে। আসলে অনেক ফ্যাক্টর থাকে তো।পপুলেশন বার্থ রেট। স্বাভাবিক মৃত্যুর হার।কাজেই অত নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না।দিস ইজ দ্য ফ্যাক্ট।এখন যা চলছে তার নিরিখে এইটুকুই বলা যায়।ব্যস।
    সুনন্দিতার মুখ ব্যাজার হল।তাঁর হাসির মত মুখ মলিন করাও খুব ইনফেকশাস এবং স্পষ্ট।
    সব কাজকর্ম কোভিডের জন্য তো বন্ধ ছিলই এখন কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে পরম এত জড়িয়েছেন যে আনলক পরবর্তী ক্লাবের আমোদ অনুষ্ঠান একেবারেই বাতিল।এমন নয় যে সুনন্দিতা গেলে পরম বিরক্ত হবেন।কিন্ত সুনন্দিতার নিজেরই খারাপ লাগছে।
    মুখ বেঁকিয়ে বললেন, তাও তুমি আমাকে মাসি বলে ডাকলেনা ছেলে।
    হেসে ফেলেছে দেবরূপ। অনেকদিন বাদে এই ঝরঝরে হাসি।
    - আসলে আমি ঝট করে কাউকে অ্যাড্রেস করতে পারি না।মাই ফল্ট। প্লিজ গিভ মি সাম টাইম।
    সুনন্দিতার হাসিটি স্ফটিকস্বচ্ছ।
    - ওকে বাবু। টেক ইওর টাইম।তাই বলে তুমি আবার আমাকে ম্যাডামজি বলে ডেকে বোসোনা। কাল শুনলাম সিংঘু যাচ্ছো?

    নভেম্বরের চব্বিশ ঘন্টা বন্ধে আড়াইশ লক্ষ কৃষক যোগ দিয়েছিলেন।যাস্ট দুটো দাবী।ফার্ম ল রিফর্ম। আর শ্রমিক আইন পাল্টানো।
    এম এস পি আইনগতভাবে এনশিওর করো।
    পাঞ্জাব বিধানসভা ইতিমধ্যেই একটা স্পেশ্যাল সেশন করে ফার্ম বিল বাতিল করেছে। সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে।তিনটি বিল পাশ হয়েছে কিন্ত পাঞ্জাবকে কেন্দ্রীয় আইনের আওতা থেকে বাদ রাখা হয়েছে। পরমের মত ইন্ডাস্ট্রিলিস্টরা সাপোর্ট করেছেন।হরিয়ানাতে এটা কৃষকদের দাবী সত্ত্বেও সফল হয়নি।পাঞ্জাব সঙ্গ দিচ্ছে। এইধরনের শ্রমিক একতার কথা দেবরূপ শোনেনি কখনো। কাল সে সিংঘু বর্ডার যাচ্ছে।রুবিনাজী দুদিন থাকবেন সেখানে।তার একধরনের উত্তেজনা হচ্ছে।সুমন নাকী হামেশাই যায়।জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এ এক আশ্চর্য আন্দোলন।দেবরূপ সত্যি রোমাঞ্চিত।কেন যায়নি এতদিন কে জানে।পনেরোই সেপ্টেম্বর থেকে বিশে ডিসেম্বরের মধ্যে যে একচল্লিশজন কৃষক মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে আটত্রিশ জন পাঞ্জাবের।
    বড়দিনের জন্য ক্লাব কালচার প্রস্তুত হচ্ছে।কলকাতাতে পার্কস্ট্রিট সাজবে। মদের ফোয়ারা ছুটবে। ফ্লার্টেশন আর প্রোপোজালের বন্যা বইবে।
    ওদিকে হরিয়ানা সরকার বলেছেন যারাই কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, তাদের ক্রিমিনাল অতীত আছে।তারা আইন শৃঙ্খলা ভাঙছে।জনতার শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।
    কী অদ্ভুত সময়ে বেঁচে আছে তারা।অথবা হয়তো সমস্ত সময়েই এই অদ্ভুত ঘটনাগুলো ঘটে চলে।
    হ্যানভার কে কোলে নিয়ে বসে আছেন আমেলিয়া।
    ও গুড মর্ণিং বলতে গেছিল।
    - আর ইউ গোইং টু সিংঘু? গুড বয়। আই নো দিজ ল'জ উইল গ্র্যাজুয়ালি এন্ড দ্য মান্ডি সিস্টেমস।
    বোলো , হ্যানভার?
    ও স্পষ্ট দেখলো , হ্যানভার চোখের পাতা ফেললো।


    পর্ব বাইশ।


    -কমিশন এজেন্টরা ঠিক কী করেন? হোয়াই আর পিপল, আই মিন দ্য ফারমার্স সো ওয়রিড অ্যাবাউট কমিশন এজেন্টস উইদ দ্য পাসিং অব দ্য ফারমার্স বিল? 


    ও প্রশ্নটা নিকিকে জিজ্ঞেস করেছিল।নিকি এমন একজন মানুষ , যে সারাদিন বাড়িতে থাকে।একহয় নিজের ঘর।বেশির ভাগ সময় বিশাল লিভিংরুমের একপ্রান্তে।যেখানে টেরাকোটার ছোট ছোট টাইলস বসিয়েছেন সযত্নে সুনন্দিতা। যামিনী রায় প্যাটার্ণের মেয়েদের মুখ।টানা চোখ বেরিয়ে আছে কানের পাশটি দিয়ে। পোড়া ইঁটের রঙের সঙ্গে কনট্র্যাস্ট করে উঠিয়ে দিয়েছেন সবুজ ক্রিপার।ভারি মায়াময় একটি কোণ যেখানে নিকির আধুনিকতম ডেস্কটপ রাখা আছে। গোল চশমার পাওয়ার অনেক। নিকি হুইলচেয়ারে বসেই কাজ করে যায়।অক্লান্ত ভাবে।হয়তো বাইরে যাওয়ার ব্যাপার নেই বলে দুনিয়াকে ডেস্কটপে ধরে নিতে চায়।


    নিকিকে প্রশ্ন করা চলে। খুব স্বচ্ছ মেয়েটি।উইদ আ গ্রেট সেন্স অব হিউমার। এবং ও কখনো সেটা মিসইউজ করে না।ঠিকঠাক সময়ে ব্যবহার করে। খুব পেনিট্রেটিভ দৃষ্টি ওর। কথা বলে ঝর্ণার মত।


    - কমিশন এজেন্টস হিসেবে অনেকে কাজ করেন।লাইক বসুন্ধরা আন্টিজ সন। দে অ্যারেন্জ ফিনানশিয়াল লোনস ফর দ্য ফারমার্স। ফির টাইমলি প্রকিওরমেন্ট।অ্যাডিকোয়েট প্রাইসেস। ঠিকঠাক দাম পায় যাতে কৃষকরা।এটা খুব খুব ইম্পরট্যান্ট। কর্পোরেটস অত সিমপ্যাথেটিক হবে না। দ্যাট উইল বি অ্যান এন্ড টু দি অ্যাশিওরড প্রকিওরমেন্ট অব দেয়ার ক্রপস অ্যাট এম এস পি। এক একজন কমিশন এজেন্টের ওপর প্রায় পঞ্চাশ থেকে একশোজন কৃষক নির্ভর করেন। 


    ক্রিপারটির পাতা ঝিরিঝিরি।ডীপ গ্রিন।এটাকে কী বটল গ্রিন বলা চলে? দেবরূপ রঙ চেনে না অত। গাছ, লতা তেমন চেনে না। মালবিকা অনেক বেশি চেনেন।যখন ছোট ছিল, তখন মায়ের কাছে বিশ্বভারতী, কলাভবন, সঙ্গীতভবনের গল্প শুনতো দেবরূপ। 


    কিন্ত নিকির ব্যাকগ্রাউন্ডে ঐ ঝিরিঝিরি পাতার ক্রিপারটা বেশ ভালো লাগছে। টেরাকোটার টাইলসের মেয়েটির টানা নাক। স্বপ্নালু চোখ। যেন কথা বলে উঠল।


    - গ্র্যানি ইজ রাইট। জানো কেন এই আন্দোলন হচ্ছে? দিজ ল' জ উইল গ্র্যাজুয়ালি এন্ড দ্য মান্ডি সিসটেম। 


    হয়তো প্রাইস এক্সপ্লয়টেশন যাতে না হয়, সেজন্য কিছু প্রোটেকশনের ব্যবস্থাও থাকবে কিন্তু প্রাইস ফিক্সেশনের কোনো মেকানিজম থাকবে না।কমিশন এজেন্টদের সঙ্গে ফার্মার্সদের একটা হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। বোঝাপড়া। কর্পোরেটস উইল নট অ্যালাউ দ্যাট। গভমেন্ট গ্যারান্টি উইল বি দেয়ার।বাট ইন রাইটিং অনলি। গট ইট? 


    নিকি আজ একটা সাদা ঢিলে ঢালা শার্ট পরেছে। বয়জ কাট চুলে হাইলাইট আছে।পার্পল। স্ট্রাইপড পাজামা। ওকে স্পষ্ট করে দেখতে কোনো অসুবিধে হয় না।কারণ ও ভীষণ স্বচ্ছ। 


    দেবরূপ হাসল। 


    - গট ইট।


    - মাই ফাদার ইজ আ বিল্ডার। বাট বেসিক্যালি উই আর ফার্মার্স। ফার্মার্স ফ্রম লাহোর। দেন দ্য ফার্মার্স অব পাঞ্জাব। এখনো আমাদের খেতিবাড়ির সঙ্গে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আমরা ছুটিতে লোধি যাই। দেশের বাড়ি। নট ইক্জ্যাক্টলি দ্য ফার্মহাউস টাইপ। ফার্মহাউস আছে।জেঠজির। বাট দ্য মেইন হাউস ইস ইন ভিলেজ। পাক্কা পাঞ্জাবী ঘর। চাইলে যেতে পারো। উইন্টার ইজ গ্রেট ওভার দেয়ার।


    উইন্টার ইজ গ্রেট ওভার দেয়ার। যাবে? 


    কে যেন কবে কোথায় কাকে বলেছিল। ঠিক মনে পড়ছে না অথচ ঝাপসা ভাসছে।শীত পড়ে গেছে বেশ। তাপমাত্রা কমছে।খোলা আকাশের নিচে মাটির মানুষেরা জমায়েত হচ্ছেন কৃষির দাবী নিয়ে। অলিভ গ্রিন টি শার্ট আর কালো ট্র্উজার পরেছে অদিতি। ওর গাঢ় বাদামি চোখে হাল্কা কাজলরেখা।কোঁকড়া চুল পিছনে টেনে পানি টেইল করে বাঁধা।কপালে কয়েকটা উড়োখুড়ো চুল। গলার সোনার চেইন দেখা যায় মাঝেমাঝে। 


    লেটস গো টু কোদাই দিস উইন্টার। খৃষ্টমাসে ওরা কোদাইকানাল গেছিল।সেই প্রথম দুজনের একসঙ্গে বেড়ানো।ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। আর বৃষ্টি মাথায় করে ভিজছিল দুজনে। ছাতা নেই।কে নেবে ছাতা? দৌড়ে দুজনে মিসেস স্টিভেনসনের বেকারির সামনে।এই লম্বা টানা বেকারির সামনের লনে কাঠের গুড়ি ছেঁটে রাখা আছে বসার জন্য। কাঁচের বড় বড় দরজা আর জানালা দিয়ে ভেতরে অসম্ভব ভিড়ের উষ্ণতা নিচ্ছিল ওরা ভিজতে ভিজতে। যে কোনো বেকারির সামনে দিয়ে গেলেই একটা মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। ক্রিম জবজবে।রসালো।লেবু লেবু সুঘ্রাণ।ক্র্যানবেরির গন্ধ।ওয়াইন।ঝাঁঝালো।মেয়োনিজ। র্যাস্পবেরি। ক্রিপারের সবুজ রঙের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অদিতির বটল গ্রিন রঙ।


    কে যেন কাকে কোথায় বলেছিল।


    সুনন্দিতার হাত পিঠে। 


    - খেয়ে দ্যাখো তো কেমন হয়েছে? 


    একটা লেমন কেক বেক করে নিয়ে এসেছেন। 


    ও তখন ভিজছে।ভীষণ ভিজছে।কোদাইকানালের সবুজ ফার্ণের ছোঁয়া গালে। অদিতি রুমাল দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছে চোখ।চশমা।কিন্ত রুমালও তো ভেজা। হাসছে দুজনে।খুব হাসছে। হাসতে হাসতে অদিতির নাকের পাটা লালচে বেগুনি।


    কে যেন কবে কোথায় বলেছিল।শীতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভীষণ ভালো লাগে। 


    নিকি কেক মুখে নিয়ে বলছে, মম ইজ দ্য বেস্ট বেকার।ওর ঠোঁটের পাশে ক্রিম।সুনন্দিতা ওড়না দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছেন যত্ন করে।


    ও হাসছে কিন্ত ভেতরে ভেতরে গলা ধরে যাচ্ছে।


    সুনন্দিতা বললেন, এখানে আসার পরে এই প্রথম তোমাকে এত হাসিখুশি দেখলাম বাবু! কিপ স্মাইলিং লাইক দিস।


    ও চমকে উঠল।জেগে উঠেছে ঘোর থেকে। 


    বড়দিন আসছে। সুনন্দিতার প্রস্তুতি শুরু।কোনো পার্টি হবে না এবার।ছোটখাট গেট টু গেদার। কাজের সঙ্গেই তাঁর নিজস্ব বিনোদন। মালবিকার ছেলেটা বড্ড লাজুক। আজ হাসল দেখে খুশি হলেন সুনন্দিতা। কেক নিয়ে ঢুকলেন আমেলিয়ার ঘরে। অন্য কাউকে দিয়ে পাঠালে গোঁসা হবে তাঁর।এই রিস্ক সুনন্দিতা নেবেন না।নিজেই ট্রে তে করে সাজিয়েছেন। কাঠের ট্রে সাদা কুরুশ কাজের ঢাকনিতে আবৃত। সাদা প্লেটে একটুকরো উজ্জ্বল হলুদ মাখন পেলব কেক। কাঁটা।চামচ ।জলের গ্লাস। 


    আমেলিয়ার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সুনন্দিতার মনে হল, দিনহাটার বাড়িতে মা একা পড়ে আছেন। পায়ের ব্যথার জন্য ইদানীংকার চলাফেরা খুব কম। রাতে শুধু না, দিনেও বেডপ্যান। ঝিকি নামক মেয়েটি আছে বলে মা টিঁকৈ আছেন। দাদা বউদি কোচবিহারের বাড়িতে। অনেকদিন হল।


    মা এখন একা।সুনন্দিতার ছোটবেলাতে মায়ের কাছে বায়না ধরতেন।কেক বানাও মা। তখন অত সরঞ্জাম কোথায়? আভেন, ওটিজি, হুইপ ক্রিম , ব্লেন্ডার কিছুই নেই। 


    তবু মা ময়দা আর ডিম ঘুঁটে, নিউমার্কেট থেকে সংগৃহীত বেকিং পাউডার দিয়ে , স্টোভে প্রেশার কুকার বসিয়ে, তাতে বালি দিয়ে কেক বানাতেন। একটু শক্ত। মোটা। ভেতরটা অত মসৃণ নয়।


    তবু সুস্বাদু।


    আভেনে একশো আশি প্রথমে , পরের কুড়ি মিনিট একশো পঞ্চাশ। ব্লেন্ডারে মাখন মসৃণ উপাদানে লেবুর রস। কেকের সুস্বাদু গন্ধ নিতে নিতে সুনন্দিতার ভীষণ মায়ের জন্য মন খারাপ লাগছিল। মেয়েসন্তান বলে তিনি কোনোদিন বঞ্চিত হননি। মায়ের জন্য। অথচ এখন নিজে কেমন শাশুড়ি, বর , ছেলে মেয়েদের নিয়ে মেতে আছেন! মা একা ঐ বাড়িটাতে। আর ঝিকি। এখন আসে, তখন যায়।


    আমেলিয়ার সামনে ফোল্ডিং টেবল পেতে দিলেন সুনন্দিতা।ট্রে রাখছেন।


    খুব ইচ্ছে করছে নিজের মা কে কিছুদিন অন্তত কাছে এনে রাখেন। এই করোনার সময়ে তাও সম্ভব হবে না। মনের মধ্যে একরাশ কান্না চেপে চোখে হাসি নিয়ে আমেলিয়ার দিকে তাকালেন সুনন্দিতা। ঠিক যেমন বাবু তাকিয়েছিল একটু আগে। 


    অনেক উজ্জ্বল হাসি, আপাত সফলতা আর আনন্দের পেছনেও একবুক দীর্ঘশ্বাস থাকে। গাঢ় অভিমান থাকে। কখনো না বলতে পারা অভিযোগ থাকে।শীত যখন মেহতা হাউসের সদর দরজা বা কিচেন গার্ডেনের পিছন দরজা দিয়ে ঢুকে , কাশ্মীর গালিচার ওপরে হামাগুড়ি দিতে থাকে, ওয়ারড্রোব খুলে পরমের স্যুট, সুমনের উইন্ড চিটার, নিকির পোলোনেকগুলো রোদে দেবার জন্য বাঈকে ডাকেন সুনন্দিতা, তখন মায়ের শীর্ণ মুখটা মনে পড়ে। দুর্বল , কাঁপা হাত। সেই পুরোনো কাঠের সদর দরজা তাঁদের। কী করে সব ভুলে যে এই বৈভবের সঙ্গে মিশে গেলেন তিনি! 


    আমেলিয়া তাঁর দিকে চোখ তুলে বললেন, 


    - হোয়াটস রং সানি? হোয়াই আর ইউ ক্রাইং? 


    সুনন্দিতা খেয়াল করেননি।কখন চোখ বেয়ে বেয়াক্কেলে জল গড়িয়ে পড়েছে দুফোঁটা। 


    আলতো করে হাতের উল্টো পিঠে মুছলেন। 


    - আই থিংক দ্যাট বয় , বাবু ইজ ইন ডিপ গ্রিফ মাম্মিজি।


    - বাট হোয়াই?


    - আই হ্যাভ টোল্ড ইউ মাম্মিজি।হি ইজ ইন আ ট্রমাটিক স্টেজ।ট্রাইং টু রিকাভার।


    আমেলিয়া খাচ্ছেন না।তাকিয়েছিলেন সানির দিকে। 


    সুনন্দিতা দ্রুত নিজের চোখের জল, মনখারাপ ঢেকে ফেলছেন দেবরূপের দুঃখ দিয়ে।নিজেকে বলছেন, শান্ত হও, শান্ত হও।


    সুনন্দিতা একটু ইতস্তত করেছেন। মালবিকার কাছে শুনেছেন কিছুটা। তবে মনে হয়েছে মালবিকার কাছে সবকিছুর হদিশ নেই।বলবেন আমেলিয়াকে? অনেক কিছু ভুলে যান আজকাল।উল্টো পাল্টা বকেন।সোডিয়াম পটাশিয়াম এদিক ওদিক হয়ে যায়।আবার অনেক কিছু স্পষ্ট মনে রাখেন।সেনসিবল কথা বলেন।


    - বোলো সানি? হোয়াট হ্যাপেন্ড টু দ্য বয়? 


    - হি ওয়জ ইন লাভ উইদ আ গার্ল।


    - হোয়াই ওয়জ? হ্যাভ দে সেপারেটেড? 


    আমেলিয়ার অভিধানে ব্রেক আপ শব্দটি নেই। 


    সুনন্দিতার আঙুলে একটি হীরকখচিত আংটি। ঝকঝক করছে।


    - দ্য গার্ল পাসড অ্যাওয়ে। শি ডায়েড ইন কোভিড। 


    আমেলিয়ার চোখে বিস্ময়। বিস্মিত হলে তাঁর চোখে হিরের দ্যুতি। 


    - সো হোয়াই ডু ইউ সে " ওয়জ ইন লাভ"? সে " হি ইজ ইন লাভ।" দ্যাটস হোয়াই হি ইজ ইন গ্রিফ। 


    সুনন্দিতা চমকে উঠেছেন। তাই তো।


    অদিতি নেই।তাইবলে বাবুর ভালোবাসা তো পাস্ট টেন্স হয়ে যেতে পারে না! সে এখনো ভালোবাসে। চেতনে না হোক।অবচেতনে। তাই সে কষ্ট পাচ্ছে।


    - লেট হিম বি ইন গ্রিফ। লেট হিম গেট সোক্ড ইন স্যাডনেস। দেন হিম উইল স্মাইল।


    নিজের মনেই যেন বলছেন আমেলিয়া। 


    ভালোবাসা মানেই তো অনেকটা কষ্ট পাওয়ার কন্ডিশন। হি শুড পাস দ্য ফেজ। 


    অনেকটা ভালোবাসার সঙ্গে অনেকটা কষ্ট।অল্প ভালোবাসার সঙ্গে অল্প কষ্ট। আর যদি সবটাই ভালোবাসার গল্প হয় তখন সবটাই কষ্ট। 


    এই বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই গেটের পাশে একটা দেবদারু গাছ দেখছেন সুনন্দিতা। মস্ত ঝাঁকড়া হয়ে গেছে গাছটা।একটা বুলবুল গান গায় কাছাকাছি কোনো বাগান থেকে।অমলতাস অছে।মার্চ এপ্রিলে ফুলে ভরে থাকে।পন্চশীল মার্গ থেকে সুনন্দিতা নিয়ে এসেছিলেন। কোভিডের পর থেকে আর যান নি ওদিকে । মনে হয় ঐ গাছটি ওর বাসা।আবার দেখাও যায় না।তাঁর পিতৃগৃহেও এমন পাখির ডাক ছিল। আরো অজস্র পাখির ডাক।সব ভুলে গেছেন তিনি। আচমকা মনে পড়ল।বোধহয় মায়ের কথা মনে পড়ছে বলেই।বেচারা মা।একা নিঃসঙ্গ।ফাঁকা বাড়িতে। পরম এত ব্যস্ত যে সুনন্দিতার মায়ের কথা ঠিক সেইভাবে জিজ্ঞেস করেন না। একটু যেন ফর্মাল।উনি এলে খুশি হবেন ঠিক।আদর যত্নের অভাব হবে না।কিন্ত নিজে থেকে কখনো বলেননি যে তোমার মা কে এসে থাকতে বলো কিছুদিন। অনেক চাপা অভিমান গিলে খেতে হয়। ঘুঙুরের বোলে চাপা দিয়ে দেন। পরমকে দোষ দেন না।খুব ব্যস্ত থাকেন মানুষটি। জিজ্ঞেসও করেন, হাউজ শি ? ব্যস।ঐটুকু ।সেইভাবে তো যাননি কখনো দিনহাটা।বিয়ের আগে ঐ তরফে একটা প্রবল প্রতিরোধও ছিল ।এইসব নিয়েই সুনন্দিতা মেহতা হাউসে আটকে গেছেন।এই প্রকান্ড বাড়ির একটি বিষন্ন বিধুরতা আছে।দিনহাটার তাঁর বাবার খোলামেলা টিনের চালের বাড়ি, পিছনে পুকুর, তার পিছনে চাষের জমি ।আরো দূরে রেললাইন। আরো আরো দূরে পরিস্কার দিনে পাহাড় দেখা যায়।চারদিকে বাতাস খেলছে। সেখানে কোনো বিষন্নতা নেই।একটু বড় হবার পর আর সেখানে থাকতে চাইতেন না। এখন বোঝেন, ঐ খোলামেলা বাতাস কোথাও তাঁর ভেতরে থেকে গেছে।মাঝেমধ্যেই মাথা কোটে। মুক্তি চায়। তখন নাচে ঘূর্ণি ওঠে।


    পরমের, নিকির লাঞ্চ তৈরি করবেন।আমেলিয়াকে খাইয়ে বেরিয়ে এলেন সুনন্দিতা।


    স্যান্ডউইচ বানাচ্ছেন নিপুণ হাতে।


    একটা ব্রাউনব্রেডের ওপর মাখন পড়ল।তারপরের রুটির ওপর সালামি।প্রেস করে তার ওপর সালাদ। একটা দুঃখের পরতের পর একটা আনন্দের লেয়ার।একটার পর একটা ব্রেড সাজাচ্ছেন।প্রেস করবেন। লেটুসের সবুজ। মাখনে , চিজে, মেয়োনিজে , সালাদে মিশে প্রেসড হয়ে একটা আশ্চর্য গন্ধ ছড়াচ্ছে।জীবনের গন্ধ। ভালোবাসার। 


    মেয়েরা কী এমন করে ছেড়ে আসে সব না দূরত্ব বাধা হয়ে গেল! কে জানে। নিকি। নিকি কখনো তাঁকে ছেড়ে যাবে না।যেতে পারবে না। হাঁটতেই তো পারে না মেয়ে। ভালো হয়েছে।নিকি তাঁর কাছে থাকবে।সবদিন।ভাবতেই শিউরে উঠলেন সুনন্দিতা।মা হয়ে একী ভাবছেন তিনি! কতরাত বিনিদ্র কাটিয়েছেন তিনি ও পরম ।মেয়ের চিন্তাতে।কী রাক্ষসী মা তিনি।নিকিকে আটকে রাখার কথা এমন করে ভাবে কেউ! 


    একটা পোড়া গন্ধ এলো নাকে। 


    কেউ কী পাচ্ছে গন্ধটা?


    (চলছে)


    বোলপুর স্টেশন বেশ ফাঁকা।ট্যুরিস্ট তেমন নেই।স্টেশন চত্বরেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল হোম স্টে থেকে। শান্তিনিকেতনের রাস্তা ডানদিকে রেখে ওদের গাড়ি ছুটে গেল বাঁদিকে টানা রাস্তা ধরে। দুদিকে চওড়া চাষের জমি।পতিত জমি। তার মাঝে মাঝেই গজিয়ে উঠছে লাক্সারি হোটেল। এগুলো নামেই হোম স্টে।আসলে বিলাস বহুল হোটেল। বহুমূল্য। বিনোদনের কোনো অভাব নেই। যেহারে গজাচ্ছে তাতে আর কিছুদিন বাদে এদিকটাও শান্তিনিকেতনের মত গিজগিজে ভিড় হয়ে যাবে। এইসব রিসর্টে সুইমিং পুল থাকে।মাটির কটেজ থাকে।ভেতরে অবশ্যই এসি ও গিজার থাকতে হবে।অতিথিদের সেইরকম ডিম্যান্ড থাকে। তার সঙ্গে বাসন্তী পোলাও।কুড়মুড়ে আলুভাজা । চিংড়ি মালাইকারী। মাটন কষা। গন্ধরাজ ভেটকি।সন্ধের পর চিকেন পকোড়া আর ভদকা বা হুইস্কি নিয়ে বসে বায়না। সাঁওতালি নাচ দেখবো বনফায়ার করে। 


    ওরা এইসব দামী রিসর্ট চায়নি। সোজা বেরিয়েছিল দ্বারোন্দার দিকে। মাটির বাড়ির পেছন থেকে গরুর ডাক ভেসে আসে।খড় বিচালির গন্ধ।তার মধ্যে লাফিয়ে ওঠে সাতদিনের বাছুরের অনুসন্ধিৎসা। একেবারে মাটির রাস্তা ধরে যেতে যেতে করোনার কোনো আভাস টের পাওয়া যায় না। দু একটা সাইকেল চলে যাচ্ছে ইতস্তত।বউ ঝিরা কোলে কাঁখে বাচ্চা বা বাসনের পাঁজা নিয়ে রাস্তা পার হয়। ছাগল নিজেদের মত চরে বেড়াচ্ছে।দু চারটে খোকা খুকু আধা পরিস্কার সোয়েটার পরে নাকের জল মুছে ওদের দিকে হাঁ করে চেয়ে দেখছিল।


    হোমস্টের পাশে একটা পুকুর।ব্যবহার হয় না। ঘাট আছে বাঁধানো দুদিকেই। ওদের বারান্দা থেকেও পুকুর দেখা যায়। 


    - আমরা কী একটা ঘর নেব না দুটো? 


    - দুটো। 


    টুপুর খুব স্পষ্ট করে বলেছিল। তার মানে এই নয় যে ও খুব ভন্ডামি করছে।বা ন্যাকামি।রক্তিমের সঙ্গে যখন যেত, একটি ঘরেই থাকত ওরা। কিন্ত সময় মানুষকে অনেক কিছু শেখায়।এখন ওরা দুজনেই কিছু নিজস্ব নিভৃত সময় চায়, একেবারে নিভৃত। 


    - আমরা কী বিয়ে করবো কোনোদিন টুপুর?


    - জানি না। এখনো সেইরকম কিছু ভেবে উঠিনি তো। সবেমাত্র একটা এনগেজমেন্ট ভেঙে গেল।এত তাড়াতাড়ি কী অন্য কিছু ভাবা যায়? 


    ঈশান মাথা ঝাঁকালো। ঠিক। ভাবা যায় না।এখনো ক্ষত খুব গাঢ়। রক্তপাত হয়। তার নিজের রক্তপাত কিছুটা হলেও বন্ধ হয়েছে কিন্তু ক্ষীণ ধারা চুঁইয়ে পড়ে এখনো।কখনো প্রবল গর্জন করে। সে বুঝতে পারে যে সে রুষ্ট।শরীর বিদ্রোহ করে।সে ডাক্তার। শরীর আর মনের টানাপোড়েন স্পষ্ট বুঝেও কাঁপতে থাকে।কাঁদতে থাকে। 


    না।এত তাড়াতাড়ি ডিসিশন নেওয়ার কথা নয় তাদের। 


    কেয়ারটেকার একটু টেরিয়ে তাকাল। কাপল রুম আছে স্যর।আলাদা নেবেন কেন? 


    এই বাড়িটি সুসজ্জিত। যথারীতি বাড়ির মালিক কলকাতাতে থাকেন। কেয়ারটেকারের দায়িত্বে সবটাই।এমনকী খাওয়ার মেনুও। 


    - ডিমের ঝোল করে দেব স্যর? মাছের মাথা দিয়ে ডাল? কুমড়োর ছক্কা।


    টুপুর খুব রেগে যাচ্ছে। কথাবার্তা তো সেইই বলছিল প্রথম থেকে।তাও লোকটা স্যর স্যর করে যাচ্ছে। ইডিয়ট। এদেশে মেয়েদের কেউ অ্যাডাল্ট ভাবে না। তারপর বিশ্রী একটা মেনু বললো। টুপুর আফটার অল খানেওয়ালা বাড়ির মেয়ে।মালবিকার কিছু না হলেও কিছুটা তার ভেতরে ঢুকেই গেছে। মাছের মাথার ডাল দিয়ে কুমড়োর ছক্কা হয়তো ঈশান ভালোমানুষের মত খেয়ে নেবে, টুপুর ভাবতেই পারে না।


    - চিকেন করো।আলু দিয়ে ঝোল। মাখোমাখো। আলুভাজা।আর স্যালাড। আর কিচ্ছু না। ঠিক আছে ঈশান? 


    ঈশান কিছু না ভেবেই মাঠের ওপারে দেখছিল। এবছর পৌষমেলা হবে না।খৃষ্টোৎসবেও বিশ্বভারতীর বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়ার কথা নেই।বহিরাগত। কেমন একটা দূর করে দেওয়া ভাব। অথচ মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার মন্ত্রে দীক্ষিত ছিল এই উৎসব। ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে। পড়ে থাকছে নিয়ম। তাও আবার অর্থহীন।


    -এখন চিকেন খাবেন? আমি ভেবেছিলাম রাতে দেব।


    কেয়ারটেকার কেমন একটা ভ্যালভেলে মুখ করে তাকিয়ে আছে। মানে ওর মর্জিমতো চলতে হবে।টুপুরের রাগ হল। আগের টুপুর উশখুশ করছে। ও মাছ খায় না। তবু খুব মিষ্টি হেসে বলল,


    - রাতে মাছের কালিয়া দেবেন কেমন? টাকা দিয়ে রাখছি, এইবেলা বাজার করে রাখবেন। ডিম শুধু ব্রেকফাস্টে। 


    লোকটি আমতা আমতা করে মাথা নাড়ল।


    - এখানে কোভিড কেস হয়েছিল? 


    - না দিদি।একটাও না।তাছাড়া আমরা গেস্ট গেলেই চাদর বালিশের খোল সব কেচে দিই।কোনো চিন্তা করবেন না।


    - ড্রাইভারকে ঘরে খাবার দিয়ে দেবেন।একই মেনু। 


    টুপুর ঘরে ঢুকে পড়ল।স্নানে যাবে। 


    ও জানে ড্রাইভারকে খেতে দেবার সময় হামলে পড়বে কেয়ারটেকার। 


    যতই শীতের হাওয়া আমলকীর ডালে নাচুক, দোয়েল ডেকে যাক, চন্দ্রমল্লিকার হলুদ কুঁড়ি মাথা উঁচিয়ে জানান দিক সে আছে, কেয়ার টেকার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করবে, এরা কী হাজব্যান্ড ওয়াইফ? নাকী লিভ ইন করে? এও জিজ্ঞেস করতে পারে ঈশান ওকে ভাড়া করে এনেছে কীনা।অথবা ও ঈশান কে।আর যদি তাই হয় , তবে আলাদা ঘর কেন। এটা নিয়ে রান্নার মাসির সঙ্গে খিল্লি হবে।অশ্লীল হাসি হবে। আবার নিপাট ভালোমানুষের মত মুখ করে এই লোকটাই বেডটি দিতে আসবে। এইটাই দুনিয়া। 


    স্নান করে উঠে ঈশানের ঘরে ঢুকে টুপুর দেখলো , ও চেঞ্জ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ক্লান্তি ছেলেটার চোখে মুখে। 


    থাক।ঘুমোক। লাঞ্চ দেরি আছে। টুপুর সামনে মোরাম বিছানো রাস্তাতে হাঁটছে। 


    মালবিকা লেসন প্ল্যান বানাচ্ছিলেন। একটা হাল্কা ভায়োলেট তাঁতের শাড়ি পরেছেন। ছোট করে টিপ। আয়নাতে নিজেকে দেখে ভালো লাগছিল। অনেকদিন পর। ফোন এল তখন।


    - আমরা বোলপুর এসেছি মা। তোমাকে বলা হয়নি।


    কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন মালবিকা।গলাটা ধরে এসেছিল।সেটা টের পেতে দিতে চাননি।


    - বাবাকে বলেছো? 


    - না।ফোন করে জানাবো।


    - সেটা তাড়াতাড়ি কোরো। যদি জানাতেই হয়।


    - তুমি কেমন আছো মা? 


    - ভালো আছি। 


    মালবিকার গলায় কেমন ফর্মাল সুর। টুপুরের অস্বস্তি হচ্ছে। মা কতটা বদলে গেল? 


    - তুমি কী অফেন্ডেড হয়েছো মা , আমি ঈশানের সঙ্গে এসেছি বলে? 


    মালবিকা একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলেন। এই সংসারে তাঁর অফেন্ডেড হওয়া কবেই বা পাত্তা পেয়েছে।কে খেয়াল রেখেছে! 


    - আমার খুব ক্লসট্রোফোবিক লাগছিল মা। 


    - সাবধানে থেকো টুপুর। তোমার নিজের দায়িত্ব তোমার নিজের। আর ভুল কোরো না। ওয়ান রক্তিম ইজ ইনাফ।


    ও কেমন চমকে গেল। অনেকদিন বাদে রক্তিমের নাম উঠে এল। ও একদম চাইছিল না এই নাম আসুক। রক্তিমের সবকিছু মুছে যাক ।ব্যস।এইটুকু।মা কেন মনে করিয়ে দিল! 


    গলগল করে কষ্ট উঠে এল। মা কেন মনে করিয়ে দিল।


    ফোনে হিসহিস করে উঠল।বাদুড়ের ট্যাটু জেগে উঠেছে।


    - হোয়াই আর ইউ সো ক্রুয়েল মা? হোয়াই? আমি একটু শান্তিতে থাকতে এসেছিলাম! 


    মালবিকা ফোন রেখে দিলেন।ক্লান্ত লাগছিল।কখন যে কাকে কীভাবে আঘাত দিয়ে ফেলেন তিনি বুঝতেই পারেন না। অথচ আঘাত লেগে যায়।


    একটা টেক্সট করলেন মেয়েকে।


    - আই ডিডনট ওয়ান্ট টু হার্ট ইউ টুপুর।ভুল হয়েছে।আই ডিডনট মিন ইট।


    সময় পাল্টাচ্ছে।পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সৎ থাকতে হলে ভুল স্বীকার করতে হবে।মালবিকা নতজানু হচ্ছেন। কাউকে দুঃখ দিয়ে কিছুই হয় না।


    - যদি পারো সুরেশজির সঙ্গে দেখা কোরো। লিখলেন। হি উইল বি হ্যাপি টু মিট ইউ।গুরুপল্লীতে খোঁজ নিলেই জানতে পারবে। ইফ ইউ ক্যান।


    সুরেশ সারাভাকার তাঁর নৃত্য শিক্ষক। টুপুর আর ঈশান ওঁকে প্রণাম করলে ভারি ভালো লাগবে মালবিকার। 


    ফের অনলাইন ক্লাসের প্রস্তুতি শুরু। প্রশ্নপত্র তৈরি করছেন। এম সি কিউ। পরীক্ষা চলাকালীন স্টুডেন্টদের সবার ভিডিও অন থাকবে। মাইক্রোফোন অফফ। কোনো ফোন আসতে পারবে না।পাঁচবার ওয়ার্ণিং দেওয়া হবে ভিডিওতে না পাওয়া গেলে।তারপর খাতা ক্যানসেল। কাজেই ইনভিজিলেটরকে তটস্থ হয়ে বসে থাকতে হবে। এত যান্ত্রিক সমস্ত প্রসেসটা যে হাঁপ ধরে যায়।মালবিকা প্রেশারে সেদ্ধভাত বসিয়ে দিয়েছেন। আলু, পটল একসঙ্গে। একটা ডিমভাজা।মাখন দিয়ে খেয়ে নেবেন। অনেকক্ষণ কাজে থাকতে হবে। এটাই একমাত্র ওষুধ। বন্ধুদের গ্রুপে লিখলেন, কিছু ভালো মুভি সাজেস্ট করিস তো। 


    সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা যেন এক প্রাগৈতিহাসিক অতীত হয়ে গেছে। নেটফ্লিক্সে টাকা ভরলেন মালবিকা। 


    (চলছে)


    পর্ব চব্বিশ। 


    কোভিডে মৃত্যুর হার কমছে। ষাঠ শতাংশ থেকে ছত্রিশে এসে দাঁড়াল মৃত্যুহার। ড.মনোহর যোশির মৃত্যুর পর এই ডেটাটা পেয়েছে ওরা। ড.যোশির মৃত্যু কল্পনাতীত।এত সচেতন একজন মানুষ, পরিবেশের জন্য যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন, কোভিডের সময় সোশ্যাল মিড়িয়াতে সাধারণ মানুষকে সমানে সতর্ক করে চলছিলেন, তিনি করোনাগ্রস্ত হবেন কেউ ভাবতে পারেনি।অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ট্রাবল। ভীষণ কষ্ট পেলেন শেষ কটা দিন।তারপর ভেন্টিলেশন। অথচ , নাকী মৃত্যুহার কমছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে।


    ইজ ইট ট্রু? ইজ ডেথ রেট রিয়ালি ডিক্রিজিং? আমেলিয়ার মুখে খুশির উচ্ছাস। স্পষ্টতই তিনি বেঁচে থাকতে চান। 


    অ্যাস্ট্রা জেনকা সি নাইন্টিন ভ্যাকসিন। এটা একটি গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ম্যাডাম। কোভ্যাক্স। ইজরায়েল ইতিমধ্যেই সাড়ে তিন মিলিয়ন মানুষকে ভ্যাকসিনেট করেছে।


    - আর দে সেফ? ইজ দ্য মিশন সাকসেসফুল? 


    বাবু কতটুকু বা জানে।যেটুকু রিপোর্ট পায়। হ্যাঁ।কোভ্যাক্স ইনডিভিজুয়ালকে নিরাপদ রাখছে।শুধু তাই না।ভাইরাল শেডিং কমাচ্ছে।ফলে ট্র্যান্সমিশন কমছে। দিস হ্যাজ বিন রিপোর্টেড।


    - সো আই ক্যান গো আউট? 


    আমেলিয়া শিশু যেন।উচ্ছল। বাইরে যাবেন।হুইলচেয়ারে বসে।তবু বাইরে তো! আকাশ দেখবেন। 


    ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউটের প্রফেসর এরম সেগাল কোভ্যাক্সকে প্রচুর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিন্স্ট্রেশনের কাছে জনসন অ্যান্ড জনসন এনেছে তাদের সিংগল ডৌজ ভ্যাকসিন পুশ করার আবেদন। ইমারজেন্সি বেসিসে। 


    এত কিছুর মধ্যে একজন অদিতি শিবরামণের হারিয়ে যাওয়া কেই বা মনে রাখে। স্মৃতি বড় ক্ষণস্থায়ী।


    অচ্যুত একটা ক্ষীণ যোগাযোগ রেখে চলেছেন।সুনির অপারেশন ভালো ভাবে হয়েছে ।ব্যাংগালোরে। অচ্যুত এরমধ্যে কর্মসূত্রে মুম্বাই এসেছেন দু তিনবার।মুমতাজ গুটিয়ে গেছেন আশ্চর্য ভাবে। অচ্যুত লিখেছেন।ছুটিতে ছিলেন প্রায় তিনমাস। একেবারে স্বেচ্ছাবন্দি। কারু সঙ্গেই কথা বলেন না প্রায়। সুনির যত্ন নেওয়ার কাজটা করেন আপ্রাণ চেষ্টায়।বাকী সব স্তব্ধ। 


    অদিতিদের বাড়ির গেট আর বে উইন্ডোটা ভেসে ভেসে যায় চোখের সামনে। কত কতদিন ঐ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে একটা স্কুটি।একটা বাইক।দাঁড়িয়ে গল্প। তারপর হয়তো দুটো ভেহিকল হু হু করে ছুটে গেল আই টি সেক্টরের দিকে। 


    না চাইতেও কিছু গন্ধ, কিছু দৃশ্য, কিছু মন্তাজ ভেসে আসে। মাথার ভেতরে একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। দেবরূপ আমেলিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল।


    -নট নাউ।নট দিস ইয়ার ম্যাম।


    - হোয়াই? ইউ যাস্ট সেইড দ্যাট ভ্যাকসিন ইজ রেডি? 


    অতিমারীর ভ্যাকসিন। কতদিন কার্যকরী থাকবে এখনি বলা যাচ্ছে না।বিশেষ করে আমেলিয়ার বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে আরো বছর দুয়েক খুব সাবধানে থাকতে হবে। এই কথাটা আমেলিয়ার পছন্দ হবে না একেবারে।ও বুঝতে পারছে। জীবনের শেষ কটা দিন হয়তো বদ্ধ ঘরে কাটাতে হবে।কিংবা এই বন্দিদশা আরো ম্রিয়মাণ করে তুলবে।


    কিন্ত আমেলিয়ার মধ্যে ততটা বিমর্ষতা নেই। শি ইজ কিউরিয়াস।


    অনেকটা আগ্রহ এখনো ওঁর মধ্যে।


    - তোমার কী মনখারাপ বাবু?


    দেবরূপ একটি ছোট্ট বিষম খেলো।তারপর তাকালো ওঁর দিকে।


    - নো।আই অ্যাম ফাইন।


    আমেলিয়ার হাসিটি মধুর।এবং বিধুর। কেমন আলো করা।


    - এভরিবডি সেজ দ্যাট দে আর ফাইন।বাট দে আর নট ফাইন।


    কী যেন অন্তর্দাহ বয়ে গেল।


    - সেইং আয়াম ফাইন ইজ হ্যাবিট।সিনিক্যাল হ্যাবিট।টু নড ইওর ফেস অ্যান্ড সে ইটজ ফাইন।


    আর ইউ অ্যাফ্রেইড অব ডেথ? 


    প্রশ্নের অতর্কিত আক্রমণে ঘাবড়ে যাচ্ছে দেবরূপ। 


    -'টেল মি , আর ইউ অ্যাফ্রেইড অব ডেথ? 


    এবার আমেলিয়ার গলা আরো তীক্ষ্ণ। সুতীব্র।সটান।


    ঐ চোখ অবকাশ দিচ্ছে না।ত্বক, মজ্জা ভেদ করে দেখে নিচ্ছে সব কিছু।


    - হোয়েন দ্য কান্ট্রি ইজ র্যাভৃজেড বাই প্লেগ, দ্য নাইট এনকাউন্টার্স ডেথ। দে প্লে আ চেস ম্যাচ।দ্য নাইট ক্যান সারভাইভ অ্যাজ লং অ্যাজ দ্য গেম কনটিনিউস।


    চমকে উঠছে দেবরূপ। কী বলছেন আমেলিয়া! এই মহিলা এত কিছু বোঝেন! শী ইজ অ্যামেজিং! নাইট দাবা খেলে চলেছে মৃত্যুর সঙ্গে। যতক্ষণ খেলা চলবে, বেঁচে থাকবে সে।


    সেভেন্থ সীল। অদিতি দেখিয়েছিল তাকে।বৃষ্টির বিকেল ছিল সেটা। 


    আমেলিয়া ছবির দিকে তাকিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন।


    আপনাকে কথা বলছেন।


    অ্যান্ড হোয়েন দ্য ল্যাম্ব হ্যাড ওপেন্ড দ্য সেভেন্থ সিল, দেয়ার ওয়জ সাইলেন্স ইন হেভেন অ্যাবাউট দ্য স্পেস অব হাফ অ্যান আওয়ার।


    বিস্ময়ের পর বিস্ময়।


    এই মহিলা সেভেন্থ সিল দেখেছেন! আজ কেন বলছেন সেই ছবির কথা? করোনাকাল কী তাঁকে প্লেগের কথা মনে পড়িয়ে দিল! 


    আমেলিয়ার চোখ দুটি যেন প্রার্থনার মন্ত্র হয়ে গেছে। কে দেখালো তাঁকে ঐ ছবি? পরমপ্রতাপ বা সুমন নয় নিঃসন্দেহে। সুনন্দিতা? নিকি? 


    ডেসার্টেড ভিলেজ।পরিত্যক্ত গ্রাম একা হেঁটে যাচ্ছে সে।


    ফেইথ ইজ আ টরমেন্ট।ডু ইউ নো? 


    বিশ্বাস একধরনের যন্ত্রণাবোধ।


    কে বলেছিল? অ্যান্টনিয়াস ব্লক কথা কয়ে উঠলেন বুঝি।


    ডেথ ইজ আ হোপলেস জোক। বলে চলেছেন।


    এই সত্য দেবরূপ জেনে ফেলেছে। তুই থেকে যা পুণেতে দেবরূপ। কয়েকটা দিনের তো ব্যাপার। আমি ঘুরে আসছি।ইন্ট্রো দিয়ে দে। তেমন কিছুই না। অদিতির ব্রাউন চোখ। লিকুইড ব্রাউন।


    - একমাত্র প্রশ্ন। খেলাটা কতক্ষণ হবে আর কে কতটা ভালো করে খেলতে পারবে।


    হাউ ওয়েল উই প্লে ইট।


    টু প্লে ইট ওয়েল। টু লিভ।টু লাভ। নট টু হেট দ্য বডি।


    নট টু হেট দ্য বডি।


    আমেলিয়া ওর হাত হাতে তুলে নিয়েছেন। বিড়বিড় করে বলে চলেছেন, 


    নট টু হেট দ্য বডি।প্লিজ।


    ওর শরীর শান্ত হয়ে যাচ্ছে। টু প্লে ইট ওয়েল। ও শুধু ভাবছে কী করে হয়।


    এই শরীর। যে শরীর একদিন আনন্দ উদ্দীপনাতে অদিতির শরীরে মিশে যেত, তাকে বাঁচানোর জন্য সে অদিতিকে কত সহজে পুণে পাঠিয়ে দিল। এই শরীর এখন জাগে না।ভয়ানক ঘৃণা হয়। গা গুলিয়ে ওঠে। শক্তিহীন।অবশ শরীর।


    আমেলিয়ার হাতে ওর দুর্বল হাত।


    নট টু হেট দ্য বডি।


    প্লে ওয়েল বাবু। টেক দ্য জোক।


    বৃষ্টির শব্দে কান ভরে যাচ্ছিল। একটু আগে ছাতে প্রাণভরে ভিজে এসেছিল । বৃষ্টিবিন্দু পান করেছে শরীরের প্রতি কোষ। প্রাণ মেলে ভালোবেসেছে। গায়ে একটা সুজনি কাঁথা।দুজনে বসেছে ছবি দেখতে। 


    সাবটাইটল পড়তে ওর অসুবিধে হয়। কিন্ত সাদা কালোতে হয় না।


    স্ক্যাট।জোফ।মিয়া। ছোট্ট মাইকেল।


    ডেথ ইজ নট অন দেয়ার মাইন্ডস।


    ওর কানে ছোট একটা চুমু খেয়ে বলেছিল অদিতি, দ্যাখ।দিস ইজ লাইফ।


    মিয়া তখন অ্যান্টোনিয়াস ব্লকের হাতে তুলে দিচ্ছে দুধ আর বুনো স্ট্রবেরি। 


    ভুলে যেও না।ইট ইজ নেভার টু ফরগেট। আলো আছে।এত অন্ধকারেও আলো আছে।


    ডেথ ইজ নট অন দেয়ার মাইন্ডস।


    এই যে লক্ষ লক্ষ কৃষক এসে বসে থাকছেন রাস্তার ওপর, তাঁদের মনে মৃত্যু নেই।এই নাও রুটি।এই নাও সবজি।এই নাও জল। জেগে থাকে যতক্ষণ পারো। লড়ে যাও। ডেথ ড্যান্স দেখা যায় দূরে। খেলে যাও যতটা পারো।থেমে থেকো না।


    অন্ধকার। মাতৃগর্ভের মত অন্ধকার নয়।গভীর কূপ যেন।পিচ্ছিল।উঠে আসার উপায় নেই।ও আমেলিয়ার গলা তো শুনতে পাচ্ছে।


    লাইটনেস অব লাইফ উইল সারভাইভ দ্য ব্ল্যাকেস্ট অব ডেজ। 


    অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলো....


    কে যেন গাইছিলেন। মনে পড়েছে।সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিশ্রদ্ধানুষ্ঠানে ওকে নিয়ে গেছিলেন সুনন্দিতা। সাদা ফুলে সাজানো হলে আকাদেমির কিছু মানুষ।কিছু বাইরের। সুতিথি ঠাকুর চোখ বুজে গাইছিলেন...সেই তো তোমার ভালো ....


    টু প্লে ইট ওয়েল ইজ টু লাভ।


    গায়িকা তন্ময় হয়ে গাইছিলেন।


    সব ফুরালে বাকী রহে অদৃশ্য যেই দান/ সেই তো তোমার দান/ মৃত্যু আপন পাত্রে ভরি বহিছে যেই প্রাণ....


    ও ঘাড় ফিরিয়ে দেখেছিল সবাই চোখ বন্ধ করে শুনছেন। সুতিথির পরনে একটি সম্বলপুরী শাড়ি।বেগুনি পাড়।কপালে ছোট কালো টিপ। 


    সুনন্দিতার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।


    ও অবাক হয়ে ভাবছিল।সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একজন অভিনেতা।তাঁর মৃত্যুতে সুনন্দিতা কাঁদছেন কেন! মৃত্যু কী চেনা অচেনার গন্ডী পার করে দেয়! 


    এই ভারতবর্ষের কত লোক এখন মৃত্যু ভয় ভুলে শুধু বাঁচতে চাইছে! কোভিড কী জলভাত হয়ে গেল! 


    ( চলছে)


    পর্ব পঁচিশ।


    আমেলিয়ার পুতুলদের সকালবেলা ঘুম ভাঙে না।তারা সারাদিন ঘুমায় আর সারারাত জেগে থাকে। আমেলিয়ার ঘরে তারা ফিসফিস করে কথা কয়।চলাফেরা করে। ঘরে দুয়েকটা ফুলদানিতে সবসময়ই কিছু ফুল রাখা থাকে।এটা আমেলিয়ার আবশ্যিক পরিচর্যার মধ্যে পড়ে।নাহলে তাঁর মন খারাপ হয়ে যায়। জারবারা।ল্যাবারনাম।ক্রিসমথিমাম। বিশেষত হলুদ ও সাদা। আমেলিয়ার পুতুলরা রাতের বেলা যখন হাঁটাচলা করে বেড়ায় , তখন মেয়েরা চুলে , ছেলেরা টুপিতে দুয়েকটা ফুল গুঁজে নেয়। খড়ের রঙের চুল।নয়তো কুচকুচে কালো। লাল জারবেরা বা হলুদ ক্রিসমথিমাম ভারি মানায়।আমেলিয়া ঘুমের মধ্যে ওদের স্বপ্ন দেখেন।খৃষ্টমাস আসছে। এখন সাজগোজ, চলাফেরার বহর একটু বেশি।পঁচিশে ডিসেম্বর একটা ফর্মাল বড়দিনের আয়োজন থাকে।তবে আমেলিয়ার আসল খৃষ্টমাসের ব্যবস্থা হয় জানুয়ারির ছয় তারিখে।এপিফ্যানি। আমেলিয়া ঘুমের মধ্যেও উদ্বেল হয়ে থাকেন। এবার বড়দিনে কোনো সেলিব্রেশন হবে না।এটা পরম ও সুনন্দিতার যৌথ সিদ্ধান্ত। তার বদলে তিনদিন সিংঘু বর্ডার কৃষকদের খাওয়ানোর আয়োজন থাকবে।এমনিতে সাপ্লাই তো আছেই কিন্ত ঐ তিনটি দিন সমস্ত দায়িত্ব থাকবে মেহতা পরিবারের। 


    আমেলিয়ার প্রতীক্ষা এপিফ্যানির জন্য।উন্মোচনের দিন।দেবরূপ ছয়ই জানুয়ারি বড়দিন পালনের প্রথা আগে কখনো শোনেনি। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ বহুদিন নেই।পুনেতে সে পঁচিশে ডিসেম্বর কাটিয়েছে বন্ধুদের সঙ্গেই। সেলিব্রেশনে।গুড ফুড।গুড ওয়াইন। ইউজিক।লং ড্রাইভ। কখনো চার্চে একটা চক্কর মেরে আসা।দ্যাটস অল। 


    দি আর্মেনিয়ান অ্যাপোসটোলিক চার্চ। নিকি লল।কেটে কেটে। নিকির মধ্যে অনেকটা আমেলিয়ার ধাঁচ আছে। 


    ইউ নো অ্যাবাউট ইট? 


    দেবরূপ ফাইল গোছাতে গোছাতে মাথা নাড়ছে।নো।অ্যাবসলিউটলি নাথিং। 


    নিকির চোখ হাসছে। 


    আর্মেনিয়ানদের বিশ্বাস আছে যে যিশুর দুই আপোসল বার্থোলোমিউ এবং সেন্ট জুডিয়াস দুজনে মিলে আর্মেনিয়াতে খৃষ্টধর্ম এনেছিলেন।


    অ্যাকচুয়ালি পঁচিশে ডিসেম্বর কিন্তু একটা রোমান হলিডে।সলিস ইনভিচ। 


    ইভন দ্যাট ওয়জ ইনটেন্ডেড টু ওভাররাইট পেগান উইন্টার সল্স্টিস সেলিব্রেশনস। 


    সবাই আগের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলতে চেয়েছে।খৃষ্টানরা পেগান রিচুয়ালস মুছে ফেলতে চেয়েছে।আর্মানি খৃষ্টানরা অর্থোডক্স খৃষ্চিনিয়াটি মুছতে চেয়েছে।নতুন আইডেন্টিটি তৈরি করতে হবে।আমেলিয়া ভীষণভাবে তাঁর দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর্মেনিয়ানদের বড়দিন মেহতা হাউসে আ বিগ ডে। 


    নিকি বলে যাচ্ছে।আজ ওকে কথা বলাতে পেয়েছে। চোখমুখ উজ্জ্বল।


    গ্র্যানি স্পেন্ডস আ লট অন খৃষ্টমাস। আ হিউজ অ্যামাউন্ট। হার ওন মানি।ইভন পাপা কনট্রিবিউটস। বাট শি ডাজনট থ্রো পার্টিজ অ্যান্ড অল দ্যাট। একটা গেট টু গেদার হয়।ছোটোমোটো।বাট শি স্পেন্ডস মানি ফর অরফ্যানস অ্যান্ড ওল্ড হোমস। ইউ নো, গ্র্যানি হ্যাজ অ্যাডপটেড ফোর ফ্যামিলিজ? 


    খুব অবাক হয়ে যাচ্ছে দেবরূপ। তার পরিবার এবং বন্ধুদের পরিবারে এইরকম চল সে দেখেনি। শুনেছে।কিন্ত দেখেনি।


    - শি হ্যাজ টেকন অল দ্য ফিনানশিয়াল রেসপনসিবিলিটি । ইয়েস। শি লিভস ইন দ্য ওয়র্ল্ড অব হার ডলস অ্যান্ড ফোকটেলস।বাট হার ফিট আর স্ট্রংগলি রুটেড টু দ্য গ্রাউন্ড। 


    এই অতিমারীকালে আমেলিয়া তাঁর দত্তক পরিবারগুলিকে চমৎকারভাবে দেখাশোনা করেছেন। এবার বড়দিন পালন হবে একেবারে অন্যরকম ভাবে। দেবরূপ যত দেখছে তত চমকে যাচ্ছে। 


    আমেলিয়ার কোলে আজ একটি রাজা পুতুল। ইয়া বড়াওয়ালা।পাকানো গোঁফ।লাল আপেলের মত গাল। 


    নিকি বলছে, ইয়ে কাহানি তো হো বচপনসে শুনতে আয়ে হ্যায়।


    ছোটাসা ক্ষেত। তাতে ছোটো খেতিবাড়ি। কৃষক অনেক খেটেখুটে এক তরমুজ ফলালো। অমন তরমুজ কেউ কোনোদিন চোখে দেখেনি। কৃষক ভাবলো, তরমুজ নিয়ে বাজারে বিককিরি করবে।তারপর ভাবলো, কী লাভ! তারচে বরং তরমুজটি রাজামশাইকে দেওয়া যাক।তিনি ঠিক এর কদর করবেন! ভেবে কৃষক ঘুমালো। ওদিকে রাজামশাই ছদ্মবেশে দেশের হালহকিকৎ দেখতে বেরিয়েছেন। ঘুরেফিরে এসেছেন কৃষকের জমিতে। রাজার পরনে ছেঁড়া কাপড়। মুখে কালিঝুলি। কৃষককে ডেকে বললেন, হ্যাঁ ভাই, ঐ তরমুজটি আমাকে দেবে? কৃষক নাক শিঁটকে বলল, দুর ব্যাটা ভিখিরী। তোকে কেন দেব? তরমুজ তো দেব রাজামশাইকে! 


    রাজা বললেন, আর যদি রাজামশাই এই তরমুজের কদর না করেন? কৃষক বললে, যদি ঐ তরমুজের কদর না করে রাজা, তবে বুঝব সে বেজায় গবেট।গাধা। 


    বলে পাশ ফিরে ঘুমিয়েও গেল।


    পরদিন সকালে সে গেল রাজসভাতে।কাঁধে পেল্লায় তরমজু।


    রাজার পায়ে তরমুজ রেখে পেন্নাম করলো।


    - পেন্নাম হই রাজামশাই। এই যে দেখুন।কেমন তরমুজ। কেউ কোনোদিন দেখেনি এমন পেল্লায় তরমুজ।যেমন বড়।তেমন রঙ।স্বাদ হবে আরো ভালো! 


    রাজামশাই গম্ভীর হয়ে বললেন, আর যদি এ তরমুজ আমার পছন্দ না হয়? 


    কৃষক মহাচালাক।ঘুমের ঘোরে ছিল বটে, কিন্ত কালকের ভিখিরীকে সে ঠিক চিনে রেখেছে।


    সে বললে, যদি এই তরমুজ আপনি কদর না করেন, তবে আমার উত্তর আপনার জানা আছে রাজামশাই! কাল রাতেই বলেছি! 


    রাজামশাই দেখলেন এ তো মহা করিৎকর্মা লোক।যেমন কাজের তেমন হুশিয়ার।


    তিনি কৃষকের তরমুজ নিলেন দেড়াদামে। তাকে পুরস্কার তো দিলেন বটেই আবার রাজবাড়ির খানা খাইয়ে বললেন, আজ থেকে তুমি রাজবাড়ির কৃষক।


    কৃষক বললো, তবে আমার জমি, আমার গাঁয়ের কী হবে? আমার পুরস্কার হল, আমাকে ছেড়ে দাও।আমি আমার নিজের ক্ষেতে ফসল ফলাবো।


    দেবরূপ আশ্চর্যর পর আশ্চর্য দেখছে।শুনছে।নিকি ঠিক তার ঠাকুমার মত গল্প বলে! ইউ টেল স্টোরিজ ইক্জ্যাক্টলি লাইক হার! 


    - মাই গ্র্যানি ইজ আ ট্রেজারহাউজ। বাট দিস ইজ নট অ্যান আর্মেনিয়ান স্টোরি। দিস ইজ আ পাঞ্জাবী ফোকটেল। অলসো টোল্ড ইন হরিয়ানা। গ্র্যানি নোজ মেনি অব দেম।শী লাভস পাঞ্জাব। 


    দেবরূপ হাসল।বলল, জানি।


    পাঞ্জাবীবাগ থেকে সিংঘু বর্ডার যেতে সময় লাগে ঘন্টা দেড়েক।ন্যাশনাল হাইওয়ে ফর্টিফোর ধরে ওরা যাচ্ছিল। রুবিনাজী সাধারণত নিজেই ড্রাইভ করেন।ডিপার্টমেন্টে নিজে গাড়ি চালিয়েই আসেন। আজ ড্রাইভার নিয়েছেন। রোহিণী হয়ে ছুটছে গাড়ি ।গাড়ি ভর্তি কম্বল।সোয়েটার।শুকনো খাবার।চোদ্দই ডিসেম্বর। অনশন ধর্মঘট ঘোষণা করেছেন কৃষকরা।যদি সরকার কথা বলেন , তবে কথা হবে।কিন্ত তিনটি আইন প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত চলতে থাকবে আন্দোলন।বাট উই উইল ফার্স্ট ডিসকাস দ্য রিপিল অব দ্য থ্রি লেজিসলেশনস। কমলপ্রীত সিং পান্নু বলেছেন।সংযুক্ত কৃষক আন্দোলনের নেতা তিনি। 


    ট্র্যাক্টর মার্চ ঘোষিত হয়েছে।সকাল এগারোটা থেকে। রাজস্থানের শাহানাজপুর থেকে জয়পুর- দিল্লি মেইন রোড পর্যন্ত অবরোধ হবে।


    ছাব্বিশ আর সাতাশে ডিসেম্বর। আরো তিরিশ হাজার কৃষক যোগ দেবেন। ছাব্বিশে খানাউরি থেকে আসবেন পনেরোহাজার কৃষক। সাতাশে ডাবয়লি থেকে আসবেন আরো পনেরো হাজার।এইরকম জমায়েত ওর কাছে কল্পনাতীত।এই প্ল্যানিং। এই ঐক্য।ডিসেম্বরের কুড়ি তারিখে মেমোরিয়াল প্রসেশন বের হবে। যাঁরা শহীদ হয়েছেন খোলা আকাশের নিচে, তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। একুশ, বাইশ, তেইশে ডিসেম্বর গ্রামগুলিতে স্মৃতিতর্পণ হবে শহীদদের উদ্দেশ্যে। তারপর বড় করে ব্লক লেভেলে। 


    এপিসেন্টারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সর্বদা ভীতিপ্রদ।বিশেষ করে যেখানে লেফ্টিস্ট বা মাওইস্ট ট্যাগ লেগে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। 


    -দেবরূপ, আর ইউ নার্ভাস? 


    ঠান্ডায় বাড়ে। উনি হাঁপাচ্ছেন। তাই বোধহয় আজ ড্রাইভ করছেন না। 


    রুবিনাজী ইনহেলার নিচ্ছেন।ওঁর অ্যাস্থমা আছে। বিশে নভেম্বরের আগে মারা গেছেন তেত্রিশ জন কৃষক। অ্যাক্সিডেন্ট।অসুস্থতা। ঠান্ডা। কুড়ি তারিখ প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে শহীদদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানানো হবে।কনডোলেন্স। মানবশৃঙ্খল। মাল্যদান। এই যে চাল, ভাত ফুটিয়ে খাই, যে ভাতের গন্ধ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গন্ধ বলে মনে হয় খিদের সময়, এই যে জোয়ার, বাজরা , আটা , তাদের বিভিন্ন রকম গন্ধ, বিভিন্ন রকম রুটি, এই খাদ্যের জোগান দেন যাঁরা, তাঁদের দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে। কম্বল গায়ে বসে আছেন। মাথার পর মাথা। পাগড়ি এবং পাগড়িবিহীন । প্রাচীন কৃষি যাঁদের উত্তরাধিকার। কৃত্রিম সার, পোকামারা বিষ, জলাভূমি ভরাট করে কৃষি, কর্পোরেট কৃষির বহির্ভূত যে ভারতীয় কৃষি, তার ধারক ও বাহকেরা।অবিশ্বাস্য দৃশ্য । গাড়ি পার্ক করতে হল অনেকটা দুরে। তারপর হেঁটে যাচ্ছেন ওঁরা। অনেক অনেক মানুষের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওরা।কাঁধে , পিঠে যে যতটা পারে জিনিস নিয়েছে। এই এতগুলো মানুষ রাস্তার মধ্যে থাকার ফলে ডিসেম্বরের হিমশীতলতা খানিকটা যেন মার খেয়ে গেছে।যদিও খুব শীত লাগছে ওর, তবু ক্লান্ত লাগছে না।অনেকটা হাঁটার শক্তি আছে শরীরে। রুবিনাজী ভ্রূ তুলে বললেন বললেন, কোই তকলিফ? 


    এই সময়, এইখানে কোনো অসুবিধার কথা মাথায় আসে না। মানুষের উত্তাপ সবচেয়ে শক্তিশালী। 


    রুবিনাজি বললেন,,তুমহারা ওয়েস্ট বেঙ্গলসে ভি লোগ আয়ে হ্যায়। 


    ও চমকে তাকাল।তাই? 


    কৃষক আর রাজ দরবারের গল্পটা মনে পড়ল। আজকেই বলেছে নিকি। কেন মনে পড়ল কে জানে! 


    - ক্যা হো রহা হ্যায় তুমহারে উঁহা? কিষাণ ক্যা সোচ রহা হ্যায়? পলিটিক্যাল লিডার্স? 


    ভীষণ লজ্জিতভাবে মাথা নিচু করল দেবরূপ। ও সত্যিই জানে না। কেই বা জানে! 


    তবে আজ রুবিনাজী একদম ইংরেজিতে কথা বলছেন না।এটা খেয়াল হল।


    ( চলছে)


    পর্ব ছাব্বিশ। 


    হিউম্যান চ্যালেঞ্জ। ইট ইজ নাথিং নিউ।দ্য ট্রায়ালস ইন হুইচ পার্টিসিপ্যান্টস আর ইনটেনশনালি চ্যালেঞ্জড। হোয়েদার অর নট দে আর ভ্যাকসিনেটেড উইদ অ্যান ইনফেকশাস ডিসিজ অরগ্যানিজম। 


    রুবিনা হাঁপাতে হাঁপাতে বলছিলেন। একটু ভারি চেহারার মানুষ।কিন্ত আজ তাঁকে একেবারে অন্য রূপে যেন দেখছে দেবরূপ।


    দ্য ফার্স্ট হিউম্যান চ্যালেঞ্জ ওয়জ ইন সেভেন্টিন থাউজ্যান্ড।ইনোকিউলেশন টু প্রিভেন্ট স্মল পক্স।রুবিনা ফুটপাথে বসেছেন। মুখে মাস্ক আছে। এবার খুললেন।আশেপাশে অচেনা লোক ।সবাই ধর্ণাতে। 


    দেবরূপ আস্তে করে বললো, 


    - ইয়েস ম্যাম।কলেরা।দেন টাইফয়েড।স্মল পক্স।ইনফ্লুয়েন্জা। দেন ডেঙ্গি। 


    - রাইট। কিন্ত আর ভয় পেলে চলবে না।বুঝলে?ইউ হ্যাভ টু ফাইট ব্যাক। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।


    হাজার হাজার মানুষের মাথা দেখতে পাচ্ছে দেবরূপ। দেখতে দেখতে মনে হল , সত্যি।দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই বোধোদয় হয়।শীত খুব । মোটা মোজা ও কেডসের আবরণের মধ্যেও ওর পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।দুর্বলতা। যে কোনো মানসিক দৌর্বল্য শারীরিক ভাবেও দুর্বল করে দেয়।ও প্রাণপণে চেষ্টা করছে সমস্ত দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াতে। কোভিড ওকে নিংড়ে নিয়েছে।শরীরে।মনে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে তো।


    রুবিনার পাশে বসে আছেন তিনজন সর্দার।বোঝা গেল পূর্ব আলাপ আছে।


    রুবিনা হিসেব বুঝিয়ে দিলেন কী কী এনেছেন।শীত দ্রুত ঢুকে পড়ছে ওর শরীরে। কলারের ফাঁকে।জামার হাতার তলায়।


    কমলপ্রীত সিং পান্নু দীর্ঘকায়। একটু টেনে কথা বলেন। সবুজ পাগড়িতে চমৎকার দেখাচ্ছে এই অবরোধেও। 


    - মাই সন ইজ আ ভ্যাকসিন ক্যানডিটেট। 


    খুব গর্বের সঙ্গেই বললেন। দেবরূপ চোখ তুলে তাকালো। এর চেয়ে আনন্দের কী বা আছে।কমলপ্রীতের ছেলে ইউকে তে সেটলড। ওরা আঠেরো থেকে তিরিশ বছর বয়সের মধ্যে নব্বই জন ভলান্টিয়ার নেবে।দে উইল বি এক্সপোজড টু এস এ আর এস কোভ টু।খুব নিরাপদ জায়গাতেই রাখবে তাদের ব্রিটিশ সরকার, পরীক্ষা হবে কী করে এই ভাইরাস স্তরে স্তরে মানুষকে আক্রান্ত করে।


    - সেফটি ইজ প্যারামাউন্ট। 


    রুবিনা কমলপ্রীতের সঙ্গে হাত মেলালেন।


    চব্বিশ ঘন্টা মনিটরিং করবেন ব্রিটেনের সেরা চিকিৎসকরা। ওদের একটা ভ্যাকসিন টাস্ক ফোর্স আছে। 


    প্রথমে ভাইরাসটিকে নাকের কাছে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারপর ভ্যাকসিন ক্যানডিটেট চোদ্দদিন কোয়ারানটাইনে থাকবেন।ফলো আপ টেস্ট হবে একবছর ধরে। কমলপ্রীত বললেন এই কাজের জন্য সাড়ে চারহাজার ডলার পাবেন ভলান্টিয়ারস। 


    ইট উইল অফার ইউনিক ইনসাইটস ইনটু হাউ ভাইরাস ওয়ার্কস।রিয়াল ওয়ার্ল্ড স্টাডিজ রুবিনাজি।ইট ইজ দ্য ব্যাকবোন অব মেডিক্যাল রিসার্চ।


    প্রগ্রেশন অব অ্যান ইনফেকশন ফ্রম দ্য ভেরি মোমেন্ট দ্যাট দ্য ভাইরাস এন্টারস দ্য বডি। 


    ও যেন মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই মুহূর্তেই, পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তঁরার নরম আলোতে হয়তো ত্রিদিব সেনগুপ্ত রীণা যোশির মুখোমুখি বসে আছেন। কাতরভাবে বলছেন, কেন তুই বিয়ে করবি রীণা? এই যে দিব্যি স্বাধীন আছিস , এই তো ভালো! রীণা হয়তো আঙুলে মুক্তোর আংটি দেখতে দেখতে বলছে, আর কত লড়াই করবো বলো ? আই নিড সিকিউরিটি। সাড়ে নিরানব্বই শতাংশ লোকের মতে বিবাহ সিকিউরিটি।নিরাপত্তা বলয়।তবু তার মা আর বাবা এখন আলাদা থাকে। তারা ডিভোর্স করবে না। মালবিকা সপ্তাহান্তে বাড়ি আসবেন।কিন্ত দুজনে মিলবেন কখনো? নিরাপত্তা বলয় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।মা হয়তো এখন অনলাইনে কোনো ক্লাস নিচ্ছে।বা কোর্স করছে।খুব সিরিয়াস হয়ে গেছেন এখন মালবিকা। ফেলে আসা নষ্ট সময়কে কমপেনসেট করতে চাইছেন। টুপুর কী করছে কে জানে! আমেলিয়া বিশ্রাম নিচ্ছেন।নিকি মুখ ডুবিয়ে আছে ল্যাপটপে। আর ঠিক এই মুহূর্তেই কোনো গবেষণাগার সংলগ্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে একটি পাঞ্জাবী যুবক ভাইরাস ক্যানডিটেট হয়ে নিজেকে গিনিপিগ করে তুলছে।নাকে নিচ্ছে মারণ ভাইরাস। আস্তে আস্তে শরীরে ছড়াবেই। কোয়ারেনটাইনে শুয়ে শুয়ে সে হয়তো তার পাপাজিকে ফোন করবে। 


    - ক্যায়সে হো পুত্তর?


    - আয়াম ফাইন পাপাজি । ডোন্ট ওয়রি। বলতে বলতে হাল্কা জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়েও পড়বে হয়তো।


    এক আকাশের নিচে একই সময়ের মধ্যে কত যে কান্ড ঘটে যায়।যাচ্ছে।যাবে।শুধু অদিতি এই এতকিছুর মধ্যেই বাবল্স হয়ে মিশে গেছে।সে কোথাও থাকবে না।


    হিউম্যান চ্যালেঞ্জ। 


    একটি তরুণী এসে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে গেল। গরম আটার রুটি।সদ্য মেশিন থেকে প্রসব হয়ে এসেছে।ভেন্ডির সবজি।দুধ। 


    মালবিকা ফোন করেছেন।


    - তুই সিংঘু বর্ডার গেছিস বাবু? কেন? ওখানে ভীষণ শীত না? আর করোনা? অত লোকের ভীড়? 


    মালবিকাকে বোঝানো যাবে না। হামলোগ আর বুনিয়াদের বাইরে এই গোষ্ঠীর জীবন নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই।একে কূপমন্ডুকতা বললে বলো।তিনি পাল্টাতে পারবেন না। তাঁর কষ্ট হয়। তাঁর ছেলেটা অতদূরে দিল্লির হাড়কাঁপানো শীতে সিংঘুর রাস্তাতে বসে আছে, এ তাঁর একেবারে ভালো লাগে না।সুনন্দিতার ওপর রাগ হয়।জানিস তো ছেলেটার শরীর , মন ঠিক নেই।যেতে চাইল আর যেতে দিলি? যদি অসুখে পড়ে আবার! তুই না লোক্যাল গার্ডিয়ান! 


    যতই বন্ধু হোক, এইসব কথা বলা যাবে না।আফটার অল, সুনন্দিতা যথেষ্ট যত্নে রেখেছেন বাবুকে। 


    মালবিকা হাঁসফাঁশ করতে থাকেন। ক্লাস শেষ।তিনটি মেয়ে সমানে হোয়াটস অ্যাপ করছে।তাদের নাকী অ্যাটেন্ডেস দেওয়া হয়নি।


    বিরক্ত লাগছে তাঁর।একটা ঘিনঘিনে শীত। কামার্ত। কুটিল। বিবমিষা উদ্রেকারী। একটার পর একটা কথা উঠে আসে।কেউ নেই যাকে বলবেন।বাবু ফোন কেটে দিল। কী ইনডিফারেন্ট হয়েছে ছেলেটা! 


    কাকে ফোন করবেন মালবিকা? হাতড়ে কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না। বন্ধুদের কাউকে না।এখন কোনো দায়সারা , লোকদেখানো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।ত্রিদিব যদি পাশে থাকতেন! কিন্ত শরীরী উপস্থিতি ছাড়া ত্রিদিবের কাছ থেকে কিছু কী পাওয়ার আছে? মালবিকা মরে যাচ্ছেন মনে মনে।


    কোপাইতে জল নেই। খুব চিঁ চিঁ করে ফোন এলো কারণ ও ভল্যুম কমিয়ে রেখেছে।এখানে গাঁক গাঁক রিং টোন ভালো লাগে না।


    - টুপুর? কোথায় আছিস বাবু? 


    মালবিকার গলা এত অসহায় শোনাচ্ছে কেন? মায়ের কী কিছু হয়েছে? 


    - তোমার কিছু হয়েছে মা? শরীর খারাপ?


    - না বাবা।আমার কিছু হয়নি। খুব মন খারাপ লাগছে। 


    ঈশান অনেকটা এগিয়ে গেছে। ও পিছনে হাঁটছে ইচ্ছে করেই। 


    - কনসাল্ট আ ডক্টর মা। নিজে থেকে কিছু ভেবে বসে থেকো না।


    - বাবু সিংঘু বর্ডার গেছে টুপাই।


    - জানি তো। গুড।


    - তুই জানিস? এটা ঠিক করলো? সুনন্দিতার উচিত হল ওকে ছাড়া?



    একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলল টুপুর।মা কবে বড় হবে? 


    - তোমার গুরুজীর বাড়িতে সকালে গেছিলাম মা। হি ইজ সো নাইস। ইনভাইটেড আস ফর লাঞ্চ টুমরো। বাড়ির বারান্দায় বসলাম অনেকক্ষণ। হি ওয়জ টকিং অ্যাবাউট ওল্ড ডেজ। পুরোনো।তোমাদের সময়ের শান্তিনিকেতনের কথা বলছিলেন। ভেতরে একটা গান বাজছিল।আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া। দোজ শ্রীনিকেতনী কার্টেইনস।


    - টুপুর! গিয়েছিলি! 


    - ইয়েস মম। আর উনি আমাদের ভেতরে বসতে বললেন।উই ওয়ের নট কোয়ারেনটাইন্ড!!! ঐ গোল বারান্দটা। যেখানে তোমরা নাকী রিহার্সালের পরে মুড়ি মেখে খেতে? কী ওয়ার্ম অ্যাটমসফিয়ার। 


    মালবিকা ফোনের ওপারে চুপ করে আছেন।


    - দাদাকে বড় হতে দাও মা।লেট হিম বি অন হিজ ওন। তুমিও বড় হও। বি হ্যাপি দ্যাট ইওর সন হ্যাজ গান টু সিংঘু। খেয়েছো কিছু? 


    ফোন রেখে এদিক ওদিক তাকাল টুপুর।ঈশান অনেক অনেকটা দুরে।আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে।এখান থেকে ওকে একটা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।যেন এখনি মিলিয়ে যাবে।



    ( চলছে)


    পর্ব সাতাশ।


    এপিফ্যানি হল উপলব্ধির ক্ষণ। রিয়েলাইজেশন। সেই মুহূর্ত যখন প্রতিভাত হয় যে যিশু ঈশ্বরপুত্র। আর্মেনিয়ানদের অ্যাপস্টোলিক চার্চ সেটাই বিশ্বাস করে। গির্জায় গির্জায় স্মরণ করা হয় সেই প্রাচীন মহাজ্ঞানী পুরুষদের কথা। তাঁরা সদ্যোজাত যিশুকে দেখতে এসেছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন এপিফ্যানি হল যিশুর ব্যাপটিজমের মুহূর্ত।নিকি হুইলচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলে যাচ্ছে। নট ওনলি ইন আর্মেনিয়া, বাট ওলসো ইন রাশিয়া, গ্রীস।ইউক্রেইন।ইজিপ্ট।ইথিওপিয়া।ইভন ইন কাজাখিস্তান।মাসেডোনিয়া।সার্বিয়া। 


    দেবরূপ দেখছিল বিভিন্ন দেশের নামগুলো বলার সময় মেয়েটির চোখগুলো কেমন স্বপ্নমেদুর হয়ে যাচ্ছিল। ও যেন মেঘের মধ্যে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। ওর রোগা বিকল পা দুটি ডানার মত উড়ছে। নিকির মাথার ঠিক পিছনে একটা উজ্জ্বল সাদা বাল্ব কলমকারি করা শেডের নিচে। ওকে খুব নরম আর স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। কয়েকটা শ্যামা পোকা ঢুকে পড়েছে। নিকি সেসব গ্রাহ্য না করে কথা বলছে।লকডাউন, আনলক কিছুই ওর কাছে ম্যাটার করে না।ও তো বাড়িতেই থাকে। ও এখন কোনো একটা ঘোরের মধ্যে কথা বলছে। 


    তুমি কী যিশুকে বিশ্বাস করো নিকি? ডু ইউ বিলিভ ইন মিরাকলস?


    নিকির চোখদুটো শান্ত হয়ে গেল। অপার সাগরের জল যেন।তলহীন।


    - নো। আই বিলিভ ইন গুডনেস। জিসাস ইজ যাস্ট আ মেটাফর টু মি। 


    -


    খৃষ্টমাস মিনস আ লট টু মি।টু গ্র্যানি।দ্য খৃষ্টমাস ইভ মিল।খেটুম। রাইস।ফিশ।নেভিক। গ্রিন চার্ড অ্যান্ড চিক পিজ। ইয়োগার্ট।আই লাভ দ্য স্মেল। আ স্পেশাল অ্যাটমসফিয়ার। একজন আর্মেনিয়ান কুক আসেন। আগে থেকে কালেক্ট করে রাখা হয় ড্রায়েড ফ্রুট। নাটস।রেজিক।জানো তুমি রেজিক কাকে বলে? খোসাশুদ্ধ ওয়ালনাট। তারপর সেগুলো একটা সুতো দিয়ে মালার মতো গাঁথা হয়।শেষে পুরোটা গ্রেপ জেলির মধ্যে ভরে রাখা হয়। ইটস আ ডেলিকেসি। বাস্তুখ। গ্রেপ জেলি দিয়ে একটা ডেজার্ট তৈরি হয়। ডিলিশাস। সারা বাড়িতে একটা দারুণ গন্ধ ছড়াবেই তখন। আই ডোন্ট ইট মাচ।বাট আই এনজয় দ্য কোজিনেস স্প্রেড বাই দ্য ফ্লেবারস। অ্যান্ড গ্র্যানি ডিস্ট্রিবিউটস ইট অ্যামাংগ ওল পিপল।আই মিন দোজ শি হ্যাজ অ্যাডপটেড। 


    অনেকটা রাত হয়েছে। সুনন্দিতা লিভিংরুমের একদিকে আইরনিং করছেন।নিকির কথা শুনছিলেন আর হাসছিলেন। বললেন , দুটো স্পেশাল ডিশ তোমাকে খাওয়াবো বাবু। ওয়ান ইজ আনুশাবুর। দি আদার ইজ খুজি বুদ।


    দেবরূপ এইসব খাবারের নাম শোনেনি কোনো জন্মে।সুনন্দিতা আবার হাসলেন। আনুশাবুরটা একদম অন্যধরনের একটা পুডিং। আর অন্যটা ব্লেজড হ্যাম। হ্যাম খাও তো তুমি? 


    বলে ভীষণ হাসতে লাগলেন সুনন্দিতা। সুমন রাতে ওয়র্ক আউট করে। খুব অবাক হয়ে গেছে ফিরেই।- - হোয়াট হ্যাপেন্ড মম? 


    তোরা বুঝবি না।তোরা পেট থেকে পড়েই হ্যাম, বিফ সব খেয়েছিস তো। 


    - টেল আস মম।দেয়ার ইজ সামথিং ইন দি এয়ার। 


    - শোন না। আমরা যখন নর্থ বেঙ্গলে ছিলাম, আমি তখন বেশ ছোট, কিছুদিনের জন্য শিলিগুড়িতে ছিলাম। বাবার ট্রিটমেন্ট চলছিল ।ছমাস আমরা দিনহাটা কোচবিহারের পাট বন্ধ রেখে শিলিগুড়ির একটা বাড়িতে ভাড়া ছিলাম।


    নিকির চোখে কিউরিওসিটি। বেল বাজল।সুমন উঠে দরজা খুলে দিল।পরম ফিরলেন।মুখে একটা বিগ ব্রড স্মাইল।


    - দেন হোয়াট? নিকি বলল।


    - আমরা যে বাড়িতে ভাড়া ছিলাম একতলাতে , তার দোতলায় কে ভাড়া ছিল জানিস? অবশ্য খুব অল্প সময়ের জন্য।নিকির চোখমুখ ঝকঝক করছে। কে? 


    সুনন্দিতার মুখে একটা ভীষণ আনন্দের হাসি।


    যেন একটা খাজানা খুলছেন।


    - অপর্ণা সেন। সঞ্জয় সেন তখন শিলিগুড়িতে পোস্টেড ছিল।


    পরম কোট খুলছেন।ও, দ্যাট বেঙ্গল বিউটি! 


    সুনন্দিতা চোখ নাচালেন।


    ওরা খুব হ্যাম খেত তো।বাড়িওয়ালি আবার মাংস খান না।চিকেন ঢোকে না বাড়িতে। তখন তো অন্যরকম ছিল সব। সন্ধের পর সবাই এর বাড়ি ওর বাড়ি যেত। তো সেই বাড়িওয়ালি বউদি, আমরা সন্ধের পর অপর্ণার ফ্ল্যাটে গেছি। ওরা তখন হ্যাম আনাবে প্ল্যান করছিল।বউদি তো ইনোসেন্ট। না ।ইনোসেন্ট নয় ঠিক।নাইভ।জিজ্ঞেস করে ফেলেছে, হ্যাঁ গো, হ্যাম কী? 


    ওরা তো ভীষণ ফেঁসে গেছে। কী করে বলবে হ্যাম কী।বললে তো বাড়ি থেকে উঠিয়ে দেবে।অপর্ণা তখন তড়িঘড়ি বলে কী, হ্যাম জানো না? হ্যামপাখি!!হ্যামপাখি! 


    সেই থেকে চালু হয়ে গেল, হ্যামপাখি! 


    বউদি অবশ্য বোঝেন নি! 


    সবাই হাসছে। সুনন্দিতার নাকে একটা হিরে।চকচক করছে। বাবু এই গল্পটা শুনেছে।কোনো একটা ইন্টারভিউতে অপর্ণা বলছিলেন। তবে সুনন্দিতার ছোটবেলা যে তার সাক্ষী, এটা একটা ঘটনা।


    বাবু কেমন গুটিয়ে যাচ্ছে।তাদের তো একটা এরকম পরিবার হতে পারতো।হল না কেন কে জানে! কোনভাবে সুর তাল যদি একবার কেটে যায় গোটা গানটাই নষ্ট হয়ে যায়। 


    এরা রাতে একটা হেল্থ ড্রিংক খায় সবাই। সুমন বানাচ্ছে।প্রোটিন আর ক্যালশিয়াম বেসড একটা ড্রিংক।বাবুকেও দেওয়া হয়।সে খুব একটা পছন্দ করছিল না প্রথমে।এখন মন্দ লাগছে না। এদের কথাবার্তা হাসি ঠাট্টা খোলা হাওয়ার মতো ঘরের মধ্যে চলাফেরা করে। সুমন একটা স্যান্ডো গেঞ্জি মতো পরে আছে বারমুডার ওপর।সিক্স প্যাক না হলেও অসম্ভব সুগঠিত শরীর।চওড়া কাঁধ।পেশীবহুল বাহু। লম্বায় পরমপ্রতাপের মাথায় মাথায়। 


    ওকে দেখে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যায় দেবরূপ। ও নিজে ছিপছিপে।একেবারেই পেশীবহুল নয়।দিল্লির এই তীব্র কুয়াশাঘন শীতে সে যখন উলিকট , সোয়েটার ও জাম্পার পরে কাঁপছে তখন তারই বয়সী একটি ছেলে স্যান্ডো গেন্জী পরে দিব্যি চলে ফিরে বেড়াচ্ছে।কোনো ভ্রূক্খেপ নেই। শরীর নিয়ে সুমনের যে খুব দেখনদারী আছে তাও নয়।সে খুব ক্যাজুয়ালি থাকে।শরীরচর্চা তার প্যাশন।দেবরূপের একটা কমপ্লেক্স হতে থাকে। সুমন এরমধ্যে দুতিনদিন তার প্রেমিকাকে নিয়ে এবাড়িতে এসেছে।রাগিণী আর্কিটেক্ট। সে স্বচ্ছন্দে এই বাড়ির সবার সঙ্গেই মেশে।প্রত্যেকের জন্মদিনে চলে আসে।সুনন্দিতার সঙ্গে শপিং এ যায় সময় পেলে। 


    কী স্বাভাবিক! রাগিণী তার সঙ্গেই নিজেই আলাপ করেছে। এমনকী আমেলিয়ার সঙ্গেও তার দারুণ মেলামেশা।দেবরূপ ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকে।সে তো অদিতিকে বাড়িতে এইভাবে পরিচিত করাতে পারেনি।তাদের যৌথ জীবন নিভৃত থেকেছে পুনে শহরের এককামরার ফ্ল্যাটে, রাস্তায়।আইটি পার্কে। যদি সে সুমনের মত শক্তিশালী শরীরের অধিকারী হত, তবে হয়তো কোভিড তাকে স্পর্শ করতে পারতো না। সে দুর্বল হয়ে নিজে বিশ্রাম নেবার জন্য অদিতিকে মুম্বাই পাঠাতো না। এইরকম বিভিন্ন কমপ্লেক্স তাকে ক্লিষ্ট করতে থাকে। হেল্থ ড্রিংক বিস্বাদ লাগে তার।একটু আগে নিকির বকবকানি শুনতে শুনতে বেশ হাল্কা লাগছিল। সুমনের তীব্র পুরুষালি উপস্থিতি তাকে হীনমন্যতা বোধ করায়। অথচ সুমন ছেলেটা খুব সাধাসিদে। শরীরচর্চা করে। বিজনেসে হেল্প করে।প্রেম করে। এমিকেবল এক কথায়। লকডাউনের পর সে একটু বিমর্ষ ছিল বটে কিন্ত আনলক হতেই বিভিন্ন জিমে অ্যাপ্লাই করতে শুরু করেছে কোচ হিসেবে কাজ করার জন্য।ভীষণ ফোকাসড। বাবু কী কম ফোকাসড? না।তার তো গবেষণা আছে।পড়ানো আছে।


    সুমন শরীরটাকে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দোলাতে দোলাতে গোটা লিভিংরুমের হাওয়া পাল্টে দিচ্ছে। এখন সত্যিই ওকে কোনো দেবদূত মনে হচ্ছে।সুনন্দিতার কাছে গিয়ে হাত থেকে ইস্ত্রি নামিয়ে দিয়ে একটা পাক মায়ের সঙ্গেই নেচে নিল। নিকি স্থির। চলচ্ছক্তিহীন। কোনো ওষুধ ইঞ্জেকশন ওকে হাঁটাতে পারবে না।বাট শি ইজ স্মাইলিং ভাইভাশিয়াসলি।


    কীসের জোরে হাসে? ইজ দিস এপিফ্যানি?


    সে ভাবে ।আমার কী লঙ টার্ম কোভিড হল?কাউকে বলে না।মালবিকাকে তো নয়ই।


    অনবরত কোভিড চর্চা তাকে ভীষণ ঘর্মাক্ত করে।পোস্ট কোভিড। পোস্ট অ্যাকিউট কোভিড। লং টেইল কোভিড। লং হাউল কোভিড। লং কোভিড। এই টার্মগুলো মাথার মধ্যে অনবরত ঘুরপাক খেতে থাকলে সে টুপুরের হাতে আঁকা ট্যাটুর জঙ্গল দেখতে পায়। 


    ক্লান্তি।রেসপিরেটরি সিম্পটম। নিউরোলোজিক্যাল সিম্পটম। 


    এইসব কিছুই লং কোভিডের উপসর্গ।দুমাসের বেশি থাকতেই পারে।উহানের সাতাশি শতাংশ রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার ছ মাস পরেও কোভিড উপসর্গে ভুগেছে।তারও কী তাই হল?নিজেও বুঝতে পারে না।নিউরোলজিক্যাল প্রবলেম? ঈশানকে বলতে ইচ্ছে করে না।যদি কখনো মালবিকার কানে যায়।শি উইল ক্রিয়েট আ ফাস। ও এখন কোনো ঘ্যানঘ্যানানি চায় না। বাড়াবাড়ি চায়। যাস্ট সাম রিলিজেজ আর নিডেড। 


    সুমন নাচতে নাচতে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। হাত প্রসারিত। ইউ টিউবে গান বাজছে।একটা ট্র্যাডিশনাল পাঞ্জাবী ধুন। 


    দেবরূপ নাচে না।কখনো সখনো অদিতি জোর করতো।তখন যা খুশি তাই। 


    ওর কান ঝাঁঝাঁ করছে।সারাদিন সিংঘুতে কেটেছে আজ।একেবারে অন্য জগত।ভালো ছিল ওখানে। একটা যেন ট্র্যান্সফর্মেশন।মিলে মিশে যাচ্ছিল।একটা আন্দোলনের এটা পজিটিভ দিক।সম্মিলিত শক্তি দেয়।


    এখন ওর সব শক্তি নিঃশেষ। সুনন্দিতার ইস্ত্রি শেষ।পাট পাট করে জামাকাপড় তুলছেন। গেরস্থালীর গন্ধ ছড়াবেই এইসময় মেহতা হাউসে। পরমপ্রতাপ টোস্ট আর সবজিসেদ্ধ ডিমসেদ্ধ খেয়ে উঠে যাচ্ছেন।নিকি ডুবে যাচ্ছে ল্যাপটপে।নিজের ঘরে।সুমন ইজ ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন।


    ও আবার একা হয়ে যাচ্ছে।


    ওর মাথার মধ্যেই কে যেন বলছে, লাইসেন্সড ভ্যাকসিনস উইল নট বি সাফিশিয়েন্ট টু স্টপ দ্য প্যান্ডেমিক। 


    দেন হোয়াট? ইজ দিস নিউ নর্মাল?


    ( চলছে)


    পর্ব আঠাশ।


    পিছনদিকের পুকুরের ঘাট বেশ বড়।এবং লাল সানে বাঁধানো। কিন্ত এইপর্যন্ত ঘাটে গরু এবং


    ছাগল ছাড়া কাউকে দেখেনি ও।গরুগুলো নেমে স্নানও করছে।


    -এখানে করোনা হয়েছিল কারু? মানে আশেপাশে গ্রামে?


    - নাহ্।করোনা হয় নাই তো। জ্বরজারি আছিল।সারি গ্যাছে। এমনি সারি গ্যাছে।


    এখানে জ্বর হয়।কাশি হয়।এমনি এমনি হয়।এমনি সেরে যায়।ভাইরাস শব্দটা ওরা জানে না।কেউ মরে গেলে কাজ থেমে থাকে না এখানে।ঘাস কাটতেই হবে।


    -আমারো জ্বর হইছিল।


    ছাগল চরাতে চরাতে ছেলেটি অক্লেশে উত্তর দিল।তার থুৎনিতে একটি কাটা দাগ।বাপে ঘাস কাটে।মা মেঝেনের কাজ করে হোমস্টে তে । গরম জল এনে দেয় অতিথিদের।চাইলে ঘরে খাবার দিয়ে যায়।ওরা অবশ্য ডাইনিং হলে খেয়েছিল। কাঁসার বাসনে খেতে দেওয়া এখন স্টাইল।বা ফ্যাশন। ছোট ছোট কাঁসার বাটিতে ডাল।সোনামুগ।কুরকুরে আলুভাজা।ধোকার ডালনা।মাছ মাংস নেয়নি ওরা দুপুরে।কম খেয়েছে।যাতে ঘুম না পায়।তারপর এলোমেলো হাঁটা।শীত পড়ছে নরম করে। তাই ক্লান্তি আসে না। পায়ে ধুলো ঢুকে যাচ্ছে মোটা কেডস ভেদ করে।কিচকিচ করছে ধুলোতে।এখন রোদটা মিঠে।


    ওরা খৃষ্টোৎসবে যেতে পারেনি।অনুমতি ছিল না।এই প্রথম এমন নিয়ম।


    বাইরে অনেকটা দুরে বসেছিল ও আর ঈশান। ঘন্টাঘর ভেঙে গেছে আমফানে।এখনো পুনর্নিমাণ হয়নি। মাঝে খুব রটেছিল কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের মাননীয় নেতা আসছেন, তাই ব্যারিকেড তৈরির জন্য ঘন্টার ঘর ভাঙা হয়েছে।ব্যাপারটা বোধহয় সেরকম নয়। ঈশান বলছিল। সন্ধের সময় একেক করে মোমবাতি জ্বলে উঠছে।ছেলেমেয়েরা মোমবাতি দিয়ে সাজাচ্ছে উপাসনাগৃহকে। মন্ত্রোচ্চারণ শুরু হল ভেতরে।সাদা পোশাকে ছাত্রছাত্রীদের আসা যাওয়া দেখা যায়। মালবিকা আগে খুব আসতেন। টুপুর তখন ছোট। এখনো স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় শুরু করেন গান।টুকটাক ভীড় জমছে এদিক ওদিক।অন্যান্য বছরের মত নয়। 


    - তুমি প্রথম এলে, না?


    ঈশানের খিদে পেয়েছে। লাঞ্চের পর সারাদুপুর বনের পুকুরে ঘুরেছে ওরা। যেন কতদিন বাদে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।মাস্ক পরতে হচ্ছে না এখানে।খুব কম লোকজন।মাটির দোতলা বাড়ি দেখিয়েছিল ওকে টুপুর।ঈশান খুব উদ্দীপ্ত। 


    - এখানে জমির দাম কত? 


    কুটকুট করে হাসল টুপুর। বাঙালিদের এই এক বাতিক।পাহাড়ে গেলে, ডুয়ার্সে গেলে, শান্তিনিকেতনে এলেই জমির দাম করে। ভাবে এখানে একটা বাড়ি হলে বেশ হত। মাঝেমধ্যেই এসে থাকতাম।সন্ধের পর চাঁদের আলোতে জ্যোৎস্না জ্যোৎস্না ফিলিং। গান টান।পান।


    - তুমি কী সেইরকম ভাবছো ঈশান? বাগানবাড়ি বানাবে?


    ঈশান ম্লান হাসলো।


    -না না। ওরকম না। মাঝেমাঝে মনে হয় চাষাআবাদ নিয়ে থাকি। ভিড়ভাট্টা ভালো লাগে না আর।ব্যাক টু দ্য বেসিকস।


    - আর মনের ডাক্তারি কী হবে স্যর? 


    টুপুরের চোখে হাসি চিকচিক করছে।ও জানে এই সবকিছুই ভাব বিলাস। কলকাতা যেতে যেতে রাস্তাতেই ফুরিয়ে যাবে।একের পর এক রোগীদের কল ঢুকতে থাকবে।ঈশান হারিয়ে যাবে তার নিজের বৃত্তে। সেও।এইসব কথা কিছু না।কিচ্ছু না।তবু এইসব কথা, খামখেয়ালি দিয়েই একটা গল্প তৈরি হয়। 


    - তুমি চাষবাসের কী জানো ঈশান? 


    - এখনো পর্যন্ত কিছুই জানি না।শিখে নেবো। মনের ডাক্তারি বা কত আর জানি! শুনেছি তো ছোটবেলা থেকে, মন রে কৃষি কাজ জানো না! 


    আবার হাসল টুপুর।খুকখুক করে।বাদুড়ের জঙ্গলের ঝুলের মত অন্ধকার সরে গেছে। এই ছুটিটা একদম রক্তিমের সঙ্গে কাটানো ছুটির মত নয়।বাধ্যতামূলক , হিংস্র আগ্রাসী যৌনতা নেই। ঘরের মধ্যে মদ নিয়ে বসে থাকা নেই।গালিগালাজ নেই।তবে তাদের বয়সী দুটি ছেলেমেয়ে কামগন্ধহীন সাহচর্যে থাকবে এটা বোধহয় কেয়ারটেকারটি ভাবতে পারছে না।সে নানা অছিলায় ওদের ঘরের কাছ দিয়ে ঘুরে যায়।একেবারে টিভি সিরিয়ালের মাসি পিসির মত ।প্রচন্ড কিউরিয়াস। কিন্ত তাকে দিয়ে মদের বোতল বা কন্ডোম কিছুই আনানো হয়নি।এতে সে বেশ মর্মাহত। বিস্মিত। 


    এখনো রক্তিম পুরোটা মুছে যায়নি মন থেকে।এত সহজ নয়।কে জানে।হয়তো ঈশানের প্রাক্তন স্ত্রীও সবটা হারিয়ে যায়নি ঈশানের মন থেকে।তার পার্ফ্যুমের গন্ধ বা শাড়ির রঙ, চুলের ছাঁট বা কড়ে আঙুলের নখের গঠন এখনো ঈশানকে বিভ্রান্ত করে , যেমন টুপুরের মনে পড়ে যায় রক্তিমের হাসি, স্বেদগন্ধ বা চোখের তারার রঙ। এইসব কাটিয়ে ওঠা যাবে কীনা কোনোদিন , ওরা জানে না।তার আগে কী পরস্পরকে গ্রহণ করা যায়! টুপুর এগোতে পারছে না। যদিও কেউ কারু সামনে নিজেদের অতীত সঙ্গীর কথা উল্লেখ করে না ওরা, তবু , তবু ছায়ার মত তারা ভেসে থাকে মনের আনাচে কাণাচে। উঁকি দেয়। লাল চোখ দেখায়।সে বড় ভয়ানক।


    - কাসাহারা যাবে ঈশান? 


    - কাসাহারা কী?


    - তোমার খিদে পেয়েছে বললে।কাসাহারা একটা ক্যাফে। -


    - ওয়জ হি সামবডি? 


    টুপুর চোখ গোলগোল করে তাকালো।


    ও নিজেও খুব একটা জানে না।


    প্রব্যাবলি হি ওয়জ আ মাস্টার জ্যাপনিজ আর্টিসান হু কনট্রিবিউটেড আ লট টু শান্তিনিকেতন। রথী ঠাকুরকে কাঠের কাজ শিখিয়েছিলেন বোধহয়। আমি অত জানি না ঈশান।তুমি মা কে জিজ্ঞেস কোরো। দ্য ক্যাফে ইজ আ ট্রিবিউট টু হিম। খাবারটা বেশ ভালো। যাবে? 


    এই মুহূর্তে গান শোনা যাচ্ছে উপাসনাগৃহ থেকে।বাইবেল পাঠ। ওরা ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কাসাহারা বিশ্বভারতীর মধ্যে।একটু ভেতরের দিকে।রাস্তায় আলো নেই তেমন। টুপুর একটা ঘন্টা বাঁধা জ্যাকেট পরেছে কলমকারির।টুংটুং শব্দ হচ্ছে।একটা লং স্কার্ট। কালো।কাঁচ বসানো। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে প্রথম হাত বাড়িয়ে দিল ঈশান। টুপুর আপত্তি করলো না ।হাত ধরলো ।


    কাসাহারাতে দড়ির খাটিয়াগুলো বড়।ফাঁকাই ছিল।একটা খাটিয়াতে গোল হয়ে বসলো ওরা।বেবি কর্ণ ফ্রাই আর কফি সামনে রেখে। কাসাহারা বেশ খোলামেলা ক্যাফে।


    পাশের টেবল থেকে একজন হৈহৈ করে উঠল। 


    - নৈঋতা না?কবে এলি? 


    টুপুর তাকিয়ে দেখল দীপ্তেশ। স্কুলের বন্ধু। অনেকদিন বাদে দেখা।


    দীপ্তেশ শখের সিনেমাওয়ালা।মানে ছবি বানায়।ডকু ছবি।শর্ট ফিকশন।নদীভাঙন নিয়ে কী একটা কাজ করছিল যেন। সেটা বেশ কিছু অ্যওয়ার্ড পেয়েছে। 


    - তুই কী ফিল্মের কাজ নিয়ে এসেছিস নাকী দীপু?


    দীপু হো হো করে হাসল।সে দেদার বড়লোকের ছেলে।তবে ফিল্মের সেন্সটা ভালো। নিরেট নয়।


    - এই লকডাউনের পর আনলকের বাজারে কে আমার ছবি প্রডিউস করবে সোনা? বাপ ক্যামেরা কেনার পয়সা দিয়ে দিয়েছিল এককালে।ঐ ঢের।এখন আমি ক্যামেরা ভাড়া দিই। 


    টুপুর তাজ্জব হয়ে গেল। 


    -সেকীরে।


    - ইয়েস বস।বাপ রেড ড্র্যাগন কেনার পয়সা দিয়েছিল। ওটা ডেইলি বারোহাজারে ভাড়া দিই। নিজের প্রাইজ মানিতে একটা সোনি এ সেভেন থ্রি কিনেছি। সিপিটু লেন্স দিয়ে ডেইলি সাড়ে ছহাজারে ভাড়া দিই।শালারা মান্ধাতার আমলের সিনেমা বানায় এখনো। ধ্যাবড়া প্লট।ততোধিক ধ্যাবড়া অ্যাক্টিং।ক্যামেরার কেয়ারটেকার হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি আর মনে মনে হাসি।


    শালা গাধায় রেসে দৌড়ায় আর এরা ফিলিম বানায়। 


    তুই কী করছিস? রক্তিম কোথায়? 


    ঈশান কেমন যেন অপ্রতিভ হয়ে গেল।একটু আগেই অন্ধকার রাস্তার মধ্যে দিয়ে পরস্পরের আঙুল জড়িয়ে আসার সময় , অনেকদিন বাদে সে প্যাশন অনুভব করে। নিজের মন থেকে শরীরে প্রবাহিত এক উষ্ণতা ।ঈশান তার হারিয়ে যাওয়া পৌরুষ ফিরে পাচ্ছিল যেন। শুধু শরীরে নয় ।মনে। একটা নিরাপত্তার বোধ তৈরি হচ্ছিল টুপুরকে ঘিরে।


    সেটা হোঁচট খেল। 


    টুপুর আলাপ করিয়ে দিচ্ছে।


    ঈশান, এ হল দীপ্তেশ। রাইজিং ফিল্ম মেকার।


    অ্যান্ড ঈশান ইজ আ সাইকিয়াট্রিস্ট দীপু। মাই পার্টনার। 


    রক্তিমের কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল টুপুর।দীপ্তেশের প্রশ্নটা খাটিয়ার কোণাতে লেগে ঠক করে পড়ে গেল মেঝেতে।তারপর গড়াতে গড়াতে চলে গেল বাগানের প্রান্তে।দোলনার নিচ দিয়ে ।অন্ধকারে।


    দীপ্তেশ বোকা না।প্রশ্নটাকে গড়িয়ে যেতে দিল।


    তারপর চোখ নাচালো।


    হোয়াই শান্তিনিকেতন? এই ভিড়ভাট্টাতে এসেছিস কেন? 


    - ভীড় কোথায় এবার অত? তাছাড়া আমরা এদিকে উঠিনি ।দ্বরোন্দার দিকে আছি।একদম নির্জন।


    দীপ্তেশ মাথা ঝাঁকালো। ভালো।


    ঈশান ফোনে ব্যস্ত হয়ে গেছে।মোবাইল ফোন যে মানুষকে কত বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা করছে তার ঠিক নেই।


    - খৃষ্টোৎসবে এসেছিস? দীপ্তেশের চোখ হাসছে।


    - হ্যাঁ।বলতে পারিস।আবার তাও ঠিক না। এমনিতেই এসেছি বলতে পারিস ।যাস্ট আনলকিং।


    দীপ্তেশ মুখটা প্যাঁচার মত বানালো।


    - কেন যে মাইরি এই বালের উৎসব করে! আর তোরা প্যাঁচপেঁচিয়ে দেখতেও আসিস। ভারভারা রাওকে যে এই কোভিডের মধ্যে জেলে ভরে রেখেছে, আশি বছরের লোকটা , তা নিয়ে তো কিছু করিস না? 


    টুপুর রেগে গেল।যা বাবা! কী থেকে কী? 


    - এর মধ্যে ভারভারা রাও আসে কেন রে? 


    - আসে ।আসে। রবি ঠাকুরও এই সময় অচলায়তন লিখলে জেলে যেত। 


    - তুই বাজে বকছিস।হাতে কাজ টাজ নেই নাকী? 


    দীপ্তেশের মুখে দুটো চিকেন পকোড়া পুরলো। ছোট ছোট বানায় এখানে।


    - গেছিলাম ডকুমেন্টারি বানাতে। রাওয়ের ওপর। রাণাদা'র অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে।শালা কেউ মুখ খুলল না।


    জুনের মাঝামাঝি ভারভারা রাও বেইলের জন্য আবেদন করেছিলেন।হাইলি ভালনারেবল টু কোভিড নাইন্টিন। সরকারী আদেশনামা আছে।বয়স্ক জেলবন্দি, যাঁদের কোমর্বিডিটি আছে, তাঁদের রিলিজ করা হোক।চোদ্দজন এমপি সমর্থন করেছন।চিঠি লিখেছেন উদ্ধত ঠেকরেকে। প্রাক্তন চিফ ইলেকশন কমিশনাররা সমর্থন জানিয়েছেন।ষোলোই জুলাই থেকে কবি মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে। কোভিড পজিটিভ। 


    দীপ্তেশের পেটে জলীয় পদার্থ ঢুকে গেছে অনেকটা।তবে তাতে সে ভাঁট বকে না।আরো বেশি সত্যনিষ্ঠ হয়ে যায়।চোখ বেশ লাল। 


    ঈশান বোধহয় বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা সেরে নিচ্ছে একটু পাশ ফিরে।


    - তুই ওঁর ক্যাপটিভ ইমাজিনেশন পড়েছিস বন্ধু? বা অনুবাদটা? প্রিজন ডায়েরি? 


    টুপুর পড়েনি।এখন ওর এইসব বলতে ভালো


    ও লাগছে না।ও চেয়েছিল ঈশানের সঙ্গে কিছু নিভৃত মুহূর্ত কাটাতে।ভেবেছিল কাসাহারা সেফ হবে।এ ব্যাটা এখানে ঝুলে আছে।আবার এড়ানোও যায় না।ছোটবেলার বন্ধু।


    - তুই বল, বিদ্রোহী কবিদের চ্যাম্পিয়ন করে গেছে রবিবাবু? গেছে কিনা! 


    দীপ্তেশ খুব হাই হয়ে আছে। মুডে আছে।


    - তারপর কেন যে লোকটা অ্যাসোসিয়েশন অব রিবেল পোয়েটস করে , ভিরাসন করে তাকে জেলে কোভিডের ইনফেকশন পেতে হবে? তারপর শালা তোরা খৃষ্টোৎসব করবি? চার্জ অব ইনসাইটিং ভায়োলেন্স মানে কী? বাঁধ ভেঙে দাও মানে কী? তুই বোঝা আমাকে? 


    টুপুর এবার উঠে পড়ে ইশারা করে ঈশানকে ডাকল। অনেকটা দুরে ফিরতে হবে।রাত হয়ে যাচ্ছে। কাউন্টারে বললো খাবারটা প্যাকেট করে দিতে।


    একবুক দুঃখ , প্রিজন ডায়েরি আর দীপ্তেশকে খাটিয়ার ওপর ফেলে আসতে কষ্ট হচ্ছিল।কিন্ত কিছু করার নেই আপাতত। টুপুর এখন অন্ধকারে যেতে চায় না।অন্তত আপাতত। এগিয়ে ঈশানের হাত ধরলো। 


    ( চলছে)


    -পর্ব উনত্রিশ।


    অনলাইন পড়ানো। এটা একটা জেনেরাল অ্যায়েরনেস কোর্স। যে কোনো গ্র্যাজুয়েট করতে পারে ।মেহতাহাউসে থেকেই পড়ানো যায়।দেবরূপের ঘরটি এতটাই একটেরে যে কোনো শব্দ কানে আসে না।এমনকী সুনন্দিতার ও ছাত্রছাত্রীদের ঘুঙুরের আওয়াজও আসে না।করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে ঘর। মাতৃগর্ভের মত নির্জন।নিরাপদ যেন ।ওর এটা ভালো লেগেছে।করিডোর পার হয়ে এলে ঘুঙুরের শব্দ, টেলিভিশনের আওয়াজ বা ময়ুরের ডাক কানে চলে আসে। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয় একটা করে ফুটস্টেপের সঙ্গে সঙ্গে। ভালো লাগে।


    তবু ও ডির্পাটমেন্টেই ক্লাস নেয়।অনেকটা সময় কাটায় ল্যাবে।তারপর অনলাইন টিজিং গুগলমিটে ইনস্ট্যান্ট মিটিং শেয়ার হয় হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে।একজন করে অ্যালাউড হতে থাকে। টুং টুং শব্দ। ভিডিও অফফ। মাইক্রোফোন অফফ।ছাত্রছাত্রী ঢুকছে ভার্চুয়াল ক্লাসে। কে কোথায় আছে জানা নেই।সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত যুক্ত হচ্ছে গুগল মিটে।


    সায়েন্টিস্টস হ্যাভ ইনঅ্যাক্টিভেটেড এস এ আর এস কোভ টু বাই ট্রিকিং ইট উইদ পেপটাইডস। 


    আজকে এটাই ওর আলোচনার বিষয়।ওহিও ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে পেপার। 


    ওদের কিছু বেসিক প্রশ্ন ছিল। দেবরূপ সেগুলো সামলাচ্ছিল আগে। 


    কীভাবে ইনফেকশন হয় সেটা আগে জানা দরকার তো।এস এ আর এস কোভ টু ইনফেকশন ঘটায় ওর স্পাইক প্রোটিনগুলো দিয়ে।ও ছবি দেখিয়ে বোঝাচ্ছিল । স্পাইক প্রোটিনগুলো কোষের ওপরে এসিই টু' রিসেপটরের সঙ্গে জুড়ে যায়।ওরা জুড়ে যেতে ভালোবাসে।যত আপদ অভ্যাসের মত।ইজ ইট ক্লিয়ার? 


    অনেক দূর থেকে একটা ফিনফিনে গলা ভেসে এল।


    - মেক ইট মোর ক্লিয়ার স্যর। আই অ্যাম স্টিল কনফিউজড। এর প্রোফাইলে একটা খরগোশের ছবি দেওয়া আছে।


    সায়েন্টিস্টস হ্যাভ ডিসাইন্ড পেপটাইডস দ্যাট রিসেম্বল এসিঈটু রিসেপটরস। 


    ও স্লাইড শো দেখাচ্ছে।গতকাল রাত জেগে স্লাইড গুলো বানিয়েছে।


    পেপটাইডগুলো ভাইরাসকে ট্রিক করে।মানে বোকা বানায়।কোষের সঙ্গে জুড়ে যাবার বদলে ওরা জুড়ে যাবে পেপটাইডসের সঙ্গে।আর পেপটাইডস ওদের পোটেনশিয়ালি ইনঅ্যাক্টিভেট করে দেবে। বিফোর দ্য ভাইরাস ক্যান ট্রিগার ইনফেকশন। আন্ডারস্ট্যান্ড নাউ? 


    ফিনফিনে গলাটা আবার ভেসে এলো।


    - ইয়েস স্যর। বাট দ্য ভাইরাস হ্যাজ টু এন্টার দ্য বডি।ইজন্ট ইট? 


    হঠাৎই ওর চোখের সামনে কোকিলাবেনের গেস্টহাউস। সেই পাম গাছ।দোতলার ব্যালকনিতে একটা সিল করা ঘর। ছবিটাকে ও মুছতে চাইছে প্রানপণে। হচ্ছে না।


    চোখ ঝাপসা।ও চশমা পরিস্কার করে নিল।গলাও।


    - ইয়েস।দ্যাট ভাইরাস হ্যাজ টু এন্টার দ্য বডি ।তাহলেই সে বডিসেলের এসিইটু রিসেপটরের কাছে পৌঁছাতে পারবে।


    এই রিসেপটরগুলো সারা শরীরে থাকে।স্লাইডে হিউম্যান বডি আসছে। ভ্যাসকুলার সিস্টেম।নাক।থ্রোট। অ্যাবান্ডান্ট এক্সপোজার ইন দ্য লাংগস অ্যান্ড স্মল ইনটেসটাইনস। 


    প্রবলেম হচ্ছে এস এ আর এস কোভ টু যখন নাক বা মুখের মধ্যে দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।


    ইনসাইড দ্য বডি, দ্য ভাইরাস ইউজেস ইটস স্পাইক প্রোটিন টু অ্যাটাচ ইটসেল্ফ টু এসিইটু রিসেপটরস। 


    তারপর ওরা সেলের সঙ্গেই মিশে যায়।জেনেটিক মেটিরিয়াল রিলিজ করে।হোস্ট সেলকে শেখায় কী করে নতুন ভাইরাস তৈরি করতে হবে।


    এই ভাইরাস ভীষণ প্রফিশিয়েন্ট।টু বন্ড টাইটলি অ্যান্ড কুইকলি টু এসিইটু।


    যদি ইমিউন সিস্টেম ক্যাচ করে নিতে পারে ইটস ওয়েল অ্যান্ড গুড।নাহলে কোষ নষ্ট হতে শুরু করবে।এটাই কোয়ারেনটাইন পিরিয়ড। দ্য ভাইরাস রেপ্লিকেট অ্যান্ড ডেস্ট্রয় দ্য সেলস।


    একটানা বলে জল খেল দেবরূপ। এটা একটা প্রিলিমিনারি ক্লাস। রুবিনাজি অসুস্থ। হাঁপানি বেড়েছে। ওঁর চেম্বার ফাঁকা।নাহলে ঠিক কফি এসে যেত।


    প্যাথোজেন ইজ কম্বিনেশন অব সেল ডেস্ট্রাকশন অ্যান্ড ড্যামেজ ইনিশিয়েটেড বাই দ্য ভাইরাস। ইমিউন সিস্টেম কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে তার ওপর সিম্পটম ডিপেন্ড করে। 


    প্রিভেন্টিং ইজ মোর অ্যাডভানটেজিয়াস দ্যান কিওর। 


    - সো পেপটাইডস আর ইম্পরট্যান্ট? আরেকজন প্রশ্ন করলো।এর প্রোফাইলে ক্যাটরিনা কাইফ। নাম ফ্লোরাল বিউটি ।


    ইয়েস । উই হ্যাভ টু গেট দ্য ভাইরাস হোয়াইল ইট ইজ স্টিল আউট অব দ্য সেল। কোষের মধ্যে ঢুকে পড়ার আগেই অ্যারেস্ট করতে হবে।


    ওর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।অদিতির শরীরে ঠিক কোন সময়ে ঢুকেছিল ভাইরাসটা? চুপচাপ। নিঃশব্দে। 


    - যাস্ট লাইক ফলিং ইন লাভ। প্রেমে পড়ার মত।তাই না স্যর? মনের মধ্যে ঢুকে পড়ার আগেই অ্যারেস্ট করতে হয়।আদারওয়াইজ ইউ আর ডান।


    ফিনফিনে গলা বলে উঠল আবার। 


    - হোয়াট ডু ইউ মিন? 


    - আই মিন দি এনটায়ার প্রসেস।হাউ দ্য ভাইরাস ওয়ার্কস। নাক , মুখ দিয়ে ঢুকে পড়ে । শরীর কিছু বোঝে না। সেল গুলোকে জড়িয়ে ধরে।তারপর সেগুলো ডেস্ট্রয় হতে থাকে। লাইক লাভ। সো ডেসট্রাকটিভ । অ্যান্ড স্টিল ইউ ক্যাননট গেট আউট অব ইট।অ্যান্ড ইউ ডোন্নো হাউ ইট এন্টারস ইউ।


    সব মাইক্রোফোন বন্ধ। নাহলে খুকখুক হাসি শোনা যেত ঠিক।


    দেবরূপ কী বলবে ঠিক বুঝে পাচ্ছে না।কে ত্যাঁদরামো করছে? 


    ফিনফিনে গলার নাম সিন্ডেরেলা।


    ছবিতে দুটো গ্লাস স্লিপার। 


    উই আর ইউজিং নিউ টেকনোলজি ইন ক্রিস্ট্যালাইজিং প্রোটিনস অ্যান্ড মাইক্রোস্কপি। ওরা এস এ আর এস কোভ টু আর এসিই টুর ছবি তুলে রাখছে। সায়েন্টিস্টরা পয়েন্ট অব অ্যাটাচমেন্ট খুঁজে পেয়েছেন। এসিঈটু রিসেপটরের একটা স্পাইরাল টেইল আছে।সেইখানে গিয়ে জুড়ে যায় ভাইরাস।সেলের ইকিলিস পয়েন্ট ঠিক খুঁজে নেয়।


    - ইক্জ্যাক্টলি স্যর।প্রেম তো তাই।ইকিলিস হিল খুঁজে নেয়।তারপর মারে।


    - আয়াম টকিং অ্যাবাউট শর্টেস্ট পসিবল পেপটাইডস।বি অ্যাটেনটিভ।পেপটাইডগুলো ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন খুঁজে নেয়।কনট্যাক্ট পয়েন্ট গুলো নষ্ট করে। যাতে রোগ স্প্রেড না করে।


    - লাইক আওয়ার ক্রেজি পেরেন্টস। ভেবে দেখুন স্যর।সিন্ডেরেলা সরব হয়েছে।


    লাভ ইজ এন্টারিং। ইন ইওর বডি।অ্যান্ড মাইন্ড।ইট ফাইন্ডস আউট ইওর ইকিলিস হিল।তারপর জড়িয়ে ধরবে। ডেস্ট্রয় করবে।ফাইনালি লাভ ইজ ডিস্ট্রাকটিভ। লাইক এস আর এস কোভ টু।তাই না স্যর?


    সিন্ডেরেলা লিভ করলো। ক্রুতিকা কুপ্পালী কফি রেখে গেল।


    ইউ আর টেকিং আ লং ক্লাস দেভরূপ। টেক আ ব্রেক।টেক আ ব্রেক।


    একটা অদ্ভুত সোনালী রঙ বিকেলটার। সোনালীর সঙ্গে আপেলের লালচে রঙ মিলেমিশে মুচমুচে হতে পারতো। কিন্ত শীতের দাপট তাকে অনেকটা স্তিমিত করে দিয়েছে। দিস কাইন্ড অব কালার উড স্যুট অদিতিস কমপ্লেক্শন।ভেরি মাচ।


    ( চলছে)


    পর্ব ত্রিশ।


    গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল ওরা।তারপর হাঁটছিল। একটু অলস গতি।এখানে কোনো তাড়া নেই। ঈশানের চেম্বার নেই।সকালে উঠে বাবা মায়ের প্রেশার চেক করা নেই। টুপুর বাড়ির কথা ভাবতে চায় না।মালবিকা স্কুলের হস্টেলে শিফ্ট করার পর থেকে আরো শান্ত।আরো নির্জন যেন।ঘুমিয়ে থাকে বাড়িটা। শ্যামা এলে যেটুকু জেগে ওঠে।সে আর কতটা। বরং টুপুর করুণা বা প্রতিমার কথা ভাবে।


    - ছেলেটার সঙ্গে বড্ড রুড ব্যবহার করলে টুপুর! 


    টুপুর একটু আশ্চর্য হল।এরকম জাজমেন্টাল কথা সে ঈশানের কাছ থেকে আশা করে না। কেমন একটা ডমিনেটিং টোন।তবে কী সব পুরুষের মধ্যেই একটা ডমিনেশনের টেনডেন্সি থাকে? আগে হলে বা রক্তিমের সঙ্গে হলে গালিগালাজ হয়ে যেত একচোট। ইদানীং ও অনেক শান্ত। ঝট করে রিঅ্যাক্ট করে না।অন্ধকারের অনেক সুবিধে।ভ্রূ কুঁচকানো দেখা যায় না। 


    - মানে? কী বলতে চাইছো? 


    - ও কিছু বলতে চাইছিল তোমাকে। ওর ক্ষোভ। হতাশা। তুমি এড়িয়ে চলে এলে।এটা কী ঠিক হল? 


    টুপুর দাঁড়াল। সিগারেট দরকার।সিগারেট। মাথাটা টগবগ করে ফুটছে। 


    তারপর শ্বাস নিল।দীর্ঘ। গভীর। 


    - আমি এখানে ওর দুঃখের কথা শুনতে আসিনি ঈশান। আই হ্যাভ কাম হিয়ার টু স্পেন্ড কোয়ালিটি টাইম উইদ ইউ। আর তুমি বলছো?


    - কোয়ালিটি টাইম কী টুপুর? শুধু নিজেদের নিয়ে মশগুল হয়ে থাকা? কতক্ষণ পারবে? 


    ভীষণ রাগ হচ্ছে টুপুরের। মাই ফুট বোলপুর ট্যুওর।


    - শোনো ঈশান। দীপ্তেশের সঙ্গে আমার হঠাৎ দেখা হয়েছে। সাধারণ হাই হেলো ইজ ইনাফ। আমি বসে বসে ওর ইডিওলজিক্যাল গ্রিভান্সেস শুনতে যাব কেন? অনেক কষ্টে অনেক দিন পরে একটা আউটিং এ এসেছি। দ্যাট টু আফটার আ লট অব পার্সোনাল সাফারিং। আর ও যে বিষয়ে বকবক করছে তাতে তো আমার ইন্টেরেস্ট নাই থাকতে পারে। 


    হোম স্টে এসে গেছে। কেয়ার টেকার একগাল হেসে গেট খুলে দিল।


    টুপুর দ্রুত হাঁটছে। অনেকটা মোরাম বিছানো পথ হেঁটে কটেজ।


    - আমি খুব অবাক হচ্ছি ঈশান।আই ওয়ান্টেড টু স্পেন্ড দ্য টাইম উইদ ইউ। হঠাৎ দেখা হওয়া ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারতে আসিনি আমি।


    হোমস্টে তে দুটো হৃষ্টপুষ্ট বেড়ালনি আছে।তাদের তিনটে ছানা।গুড়গুড় করছে রাস্তার আশেপাশে ফুলের টবের এদিক ওদিক। ঈশান উবু হয়ে একটা ছানাকে তুলে নিল। 


    - দীপ্তেশের কথাগুলো কিন্ত ঠিক। আসলে কবিদের আদর্শ বা ফিলোসফি আমরা উদযাপন করি না।উই যাস্ট সেলিব্রেট দ্য রিচুয়ালস। দ্যাট টু গ্ল্যামারাইজড ইন আ সাটল ওয়ে।


    টুপুর বারান্দার সিঁড়িতে পা দিয়ে বলল, আমি কাল ফিরে যাচ্ছি।সময় নষ্ট করে লাভ নেই। 


    তারপর বাথরুমে ঢুকে গেল গিজার চালিয়ে।যতই ঠান্ডা হোক।শি নিডস আ হট শাওয়ার। 


    পেছন থেকে ঈশানের কথা ভেসে এল।বেড়ালটা কোলে গ্যাট হয়ে বসেছে। যেন কতদিনের চেনা।


    - ভদ্রলোক তেলেগু সাহিত্যকে তুলোধুনো করেছেন।ফর ইটস ডিসএনগেজমেন্ট উইদ পলিটিক্স। 


    - তুমি ফোনে বাড়িতে কথা বলছিলে না এদিকে কান খাড়া করে শুনছিলে? 


    - দুটো কাজ একসঙ্গেই করা যায়।মাল্টিটাস্কিং কী শুধু মেয়েদের প্রায়োরিটি? দীপ্তেশ ছেলেটি বেশ ব্রাইট মনে হল। একা একা বসে মদ খাবে।বেচারা।


    - তোমার কষ্ট হচ্ছে ঈশান? তাহলে যাও ।ওকে ধরে নিয়ে বসে বসে ওর ফ্রাস্ট্রেশনের গল্প শোনো। কাউনসেলিং করো। 


    ঢুকে গেল ভেতরে।


    ঈশান ভেতরে গেল না।বেড়ালগুলোর সঙ্গে খেলতে শুরু করল।কেয়ারটেকার দু একবার কথা বলার চেষ্টা করল।ঈশান খেলায় মত্ত। ডিনার স্যর ? 


    - ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করো।


    অনেকক্ষণ স্নান করলো টুপুর।ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকালো। হাতের ট্যাটুর বাদুড়গুলো জাগছে নাকী আবার? সাপ হিসহিস করছে? 


    একটা মোটা পুলওভার গায়ে দিয়ে ভেতরের বারান্দার বেতের চেয়ারে বসলো।ঈশান এলো খানিক বাদে। 


    টুপুর মুখ ফুলিয়ে আছে।বিরক্তি স্পষ্ট।


    - কাল চলো কেন্দুলি ঘুরে আসি। বেড়ালটা ঈশানের পায়ে ঘুরঘুর করছে।


    - তুমি যেও।আমি ফিরবো কলকাতা।


    ভয় পাচ্ছে টুপুর। ঈশানও কী তবে আদতে সেই পুরুষ যার জিনে অধিকারবোধ আর ডমিনেশন ঢুকে আছে? সে কী আবারো ভুল করলে? এবার কী হবে তাহলে! 


    ঈশান ম্লান হাসলো। 


    - আমি বোধহয় একটু বেশি বলে ফেলেছি।না টুপুর! আসলে ছেলেটাকে দেখে খারাপ লাগছিল। বাট ইউ আর রাইট।


    নিজেরা সুখী হতে হলে একটু স্বার্থপর হতে হয়। তাই না? 


    টুপুরের কেমন বিরক্ত লাগছে।


    - এতে স্বার্থপর হবার কী হল! আমি একটা বিশেষ মন নিয়ে এসেছি। সেটার বারোটা বাজিয়ে উটকো তর্ক করতে আমার ভালো নাই লাগতে পারে তো। আই হ্যাভ টু হীল মাইসেল্ফ।


    ঈশান চেয়ারটা কাছে টেনে বসল।


    - ঠিক। আমি বাজে বকছিলাম।


    - ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু বি অ্যাপোলোজেটিক। বলে হাঁক দিয়ে কেয়ারটেকারকে ডাকল।


    - সিগারেট আছে? 


    - এনে দিচ্ছি ম্যাডাম। কেয়ারটেকার রাস্তা পেয়েছে।


    টুপুর স্পষ্ট ঈশানের চোখের দিকে তাকালো। 


    - শোনো ঈশান।আমি এখানে কোনো থার্ড পার্সনের সঙ্গে আড্ডা দিতে আসিনি। এসেছি নিজেদের ভালো করে জানতে। টু কাম ক্লোজার।


    ঈশান ক্লান্তভাবে হাসল। 


    - থার্ড পার্সন বলে কিছু হয় না টুপুর। শুধু তুমি আমি দিয়ে পরস্পরের কাছে আসা যায় না।চেনাও যায় না।বেসিক্যালি যাদের থার্ড পার্সন ভাবছো বা বলছো , তাদের থ্রু দিয়ে যে ইন্টের্যাকশন হয়, তাতেই পরস্পরকে বেটার চেনা যায়। এনি ওয়ে।ফিরতে চাইলে ফেরো। 


    টুপুর চুপ করে বসে থাকলো।


    ফিরতে চাইলে ফেরো।এই কথার অনেক মানে হয়। ঈশান কী কলকাতায় ফেরার কথা বলল? না অন্য কোনো রিট্রিটের কথা? 


    কেয়ারটেকার সিগারেট এনে দিয়ে চলে গেছে। 


    ঈশান কিছুই বলছে না।এত নিস্তব্ধ যে পাতা পড়ার শব্দ কানে আসে।


    - আমি খুব পিছিয়ে পড়া লোক টুপুর। তেমন কঠিন অ্যাম্বিশন নেই।থাকলে বন্ধুদের সঙ্গেই কোনো মেডিক্যাল সেন্টার জয়েন করতাম।চেইন থাকে ওখানে।প্রচুর রোগী। আমাশা হলেও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠাবে। কোভিডের পরে তো আরো বেড়েছে।ট্রমা সেন্টার।বছরে চারটে ফরেন ট্রিপ। আমার ভালো লাগে না। আই লাভ প্রপার হিউম্যান ইন্টারেকশন। ওয়ার্মথ। উষ্ণতা। ইট মে টেক টাইম। ধীরে ধীরে আসুক।বাট ইন দ্য প্রপার ওয়ে । আমি কোন পার্টি অ্যাটেন্ড করি না। হুল্লোড় করতে পারি না।হয়তো এগুলো খুব বোরিং লাগতে পারে। বাট আই অ্যাম ফেইথফুল।


    তোমার যদি আমাকে ভালো না লাগে , তাহলে বোলো। 


    সিগারেটের প্যাকেট হাতে ধরা।টুপুর ঘুমিয়ে পড়েছে। (চলছে)


    খাঁটি আর্য রক্ত। পিওর এরিয়ান ব্লাড। বুঝেছো তো? ককেশিয়ান।ওরিজিন ইজ লস্ট ইন দ্য মিস্ট অব টাইমস। এডি দুশো ছিয়াত্তর। গোটা আর্মেনিয়ান জাতি খেরেস্তান হল।দি ওল্ডেস্ট খৃশ্চিয়ান চার্চ ইন দ্য ওয়ার্লড।


    আমেলিয়ার মুখে ভারি পরিতৃপ্তির একটি হাসি।


    স্পষ্টতই তিনি খাঁটি আর্য রক্তের ধারক ও বাহক হবার গর্বে আজো উচ্ছল।বাকী বিশাল ভারতবর্ষের কথা তাঁর অজানা।কী অসম্ভব অহংবোধ! সিলি! ইডিওটিক! 


    তবু দেবরূপ যায় ।রাগ করতে পারে না। আজকাল ডিনার সেরেই তিনি নিজের ঘরে চলে যান না।অনেকক্ষণ হলে বসে থাকেন তাঁর হাইচেয়ারে।যেখানে প্রথম তাঁকে দেখেছিল দেবরূপ।নিকি থাকে। তার ল্যাপটপে নিমগ্নতা ভেঙে মাঝেমাঝেই গল্পে যোগ দেয়।সুনন্দিতা, পরম আসার পরে নিজেদের ঘরে চলে যান।সুমন তো একদম লেট নাইট করে না।সে ভীষণ স্বাস্থ্য সচেতন।এগারোটার মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ে।


    বিশাল হলটা তখন একদম অন্যরকম দেখতে মনে হয়।ওলিভ গ্রীণ পর্দাতে ছায়া।কালোর ওপর ছোট ছোট সাদা, হলুদ, লাল ফুলের আপহোল্স্ট্রি। যেন অন্ধকারের বাগান।স্তিমিত জ্যোৎস্না । সব বড় আলোগুলো নিভিয়ে দুটো মস্ত শেডযুক্ত টেবলআলো জ্বলে।তার একটার আলোতে দেখা যায় আমেলিয়ার অবয়ব। বৃদ্ধ।কুন্চিত ।তবু উজ্জ্বল। আরেকটি নিকির ল্যাপটপ টেবলের পাশে। দেবরূপ বসে আমেলিয়ার হাইচেয়ারের পাশে লম্বা ডিভানে।


    আমেলিয়া বলে যাচ্ছেন। আজ তাঁকে কথায় পেয়েছে।কোনো কোনোদিন চুপ করে থাকেন।


    হু ডিডনট কাম? হু ডিডন'ট ট্রাই টু ডেস্টয়? 


    খালিফস অব বাঘদাদ। সুলতানস অব ইজিপ্ট।খানস অব তার্তারি। শাহ্স অব পার্শিয়া।ওটোম্যান টার্কস। কিন্ত কেউ নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। আর্মেনিয়ানস হ্যাভ দেয়ার ওন পার্টিকুলার ফর্ম অব খৃশ্চিয়ানিটি। কী কাজ করে জানো? টেনাসিটি।টেনাসিটি।


    শব্দটা বলার সময় আমেলিয়ার শরীর কেমন উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।চুলগুলো একটু উশকোখুসকো।এলোমেলো।


    এখানে বসলে ভারি নিবিড় একটা উত্তাপ টের পাওয়া যায়।সেটা টেবল ল্যাম্পের কলমকারি শেড আচ্ছাদিত নরম আলো, না ডিভানে পাতা কাঁথার কাজের নরম সুজনি প্রসূত, না দেওয়ালে ঐ বিশাল ইতালীয় পেইন্টিংএর উজ্জ্বল রঙ , সেটা ঠিক বোঝা যায় না।কিন্ত সারাদিন ক্লাস, ভাইরাস ও ভ্যাকসিনের আবর্তে ডুবে থেকে ক্লান্ত দেবরূপ যে শূন্য শৈত্য অনুভব করে , তার থেকে মুক্ত হতে ও এখানে এসে বসে। গল্পের উষ্ণ উত্তাপে গা সেঁকে নেয়।


    ইউ আর নট লাইক আদার্স।


    ও চমকে তাকায়।


    মানে?


    ক্রুতিকা কুপ্পালী তিলোত্তমা সোম একেবারে।হাসিটাও।


    মিনস ইউ আর নট লাইক আদার মেন। 


    কী বলতে চাইছো? 


    -আই মিন, তুমি কেমন যেন টিমিড টাইপ। 


    - পুরুষ হলেই কী লিবিডোবান হতে হবে নাকী? অবশ্যই এটা ও মনে মনে বলে। 


    ক্রুতিকা কী কিছু চায় ওর কাছে? ও সাড় পায় না।ল্যাপটপের সামনে বসে মাথা থেকে পা মাঝেমাঝে অসাড় হয়ে যায়।ও মাথা নিচু করে বসে থাকে।রুবিনাজী বেশ অসুস্থ। এখনো জয়েন করেন নি। দুপুর কেমন ঝপ করে গড়িয়ে যায়।ক্যাম্পাসে বিকেল নামে নির্জনতার হাত ধরে।বিষন্ন চড়ুই ও দোয়েলরা গাছে গাছে দোল খেয়ে গেলে 


    ওর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে।ঠিক কোনটা ওর বাড়ি ও বুঝতে পারে না।কলকাতার বাড়ি না পুনের ফ্ল্যাট না এখানে মেহতা হাউস? 


    তবে এই রাত্রিকালীন আলাপচারিতাটুকু ও জানিয়ে নেয় বালাপোশের মত সারা মনে। 


    নিকি ওর হুইলচেয়ার পুরো একশোআশিতে ঘুরিয়ে বসেছে।


    -ইউ নো গ্র্যানি, মীনা হ্যারিস ইজ অ্যাস্কিং ফর দ্য রিলিজ অব নোদীপ কাউর। 


    পঁচিশ বছরের নোদীপ। ইন্ডিয়ান লেবার রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট। দলিত। টর্চার্ড। সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজড। ডিটেইনড ওভার বেইল ফর ওভার টুয়েন্টি ডেজ। কেউ প্রতিবাদ করবে না। সাগরের ওপার থেকে মীনা হ্যারিস বা মিয়া খলিফা করতে পারেন।দে আর ইন সেফ ডিস্ট্যান্স ।


    - সেফ ডিস্ট্যান্সে বসে অনেক কিছু বলা যায়।


    - নো দেবরূপ। উইমেন হ্যাভ কাম ডাউন টু দ্য স্ট্রিটস। ওভার ফর্টি থাউজ্যান্ড।ফার্মার উইমেন। পাঞ্জাব হরিয়ানাতে কৃষির একটা ইনডিভিজুয়াল জায়গা আছে।আ প্লেস অব প্রাইড। 


    কোর্ট বলেছে। কোর্ট বলেছে মেয়েরা বাড়ি ফেরত যাও। বলেছে উইমেন আর কেয়ার ওয়র্কার্স। চুলা জ্বালাও।সাফাই করো।বাচ্চে পালো।ব্যস। 


    আমেলিয়ার চোখে রাগ। রাখলে চোখে জল এসে যায়। নাক লাল।


    দিস ইজ নট যাস্ট মেনস প্রোটেস্ট। উই টয়েল ইন দ্য ফিল্ড। হু আর উই, ইফ নট ফার্মার্স? 


    প্রতাপভানুর সঙ্গেই হাতে হাত মিলিয়ে মাঠে নামতেন আমেলিয়া। সেই সব দুঃসময় সংঘর্ষের সময়।কঠিন সময়।বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিষাণের সঙ্গে কিষাণি। মাথায় ফেল্ট হ্যাট, পরনে খালি শার্ট আর ট্রাউজার। আমেলিয়া মেহতা মাঠে নেমেছেন গ্রামের মেয়েদের নিয়ে। মেহনতকা কোই জবাব নহি হ্যায়। নো বডি ক্যান ডেস্ট্রয় ইউ, ইফ ইউম ওয়র্ক হার্ড। 


    ওকে কী কিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত? স্মৃতিকাতরতা বা মেদুরতা নয়। একধরনের অলস বৈকল্য ওকে পেয়ে বসে যেন।চোরাবালির মধ্যে ডুবে যাবার অভিজ্ঞতা। অথচ ও প্রাণপণে উঠতে চাইছে।


    গতকাল সিন্ডেরেলা আবার এসেছিল ক্লাসে।ফিনফিনে গলায় কিছু প্রশ্ন করে গেছে। ভারি ফাজিল। আবার সিরিয়াসও বটে।


    - লাভ ইজ দ্যাট ভাইরাস হুইচ এন্টার ইওর সেলস, টেক ওভার ইওর সেলস মেশিনারিজ, দেন রিপ্রোডিউসেজ ইটস ওন জেনেটিক মেটিরিয়াল, আর এন এ। 


    এই মেয়েটা পাগলি নাকী? কী অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে চলেছে।যেহেতু এটা একটা জেনেরাল ক্লাস , পাবলিক অ্যায়েরনেসের , সেজন্য আইডেন্টিফাই করা যাচ্ছে না।তিনদিন এলো ভয়েসটা। এখন এই রাত্রিবেলা আমেলিয়ার পাশে বসেও মনে পড়ল তাকে।আশ্চর্য! কতরকম যে মানুষ হয় ! ভাইরাস আর প্রেম নিয়ে গবেষণা করে চলেছে ।লাভ ইজ দ্যাট ভাইরাস হুইচ এন্টারস ইওর সেলস।অ্যান্ড সোওলস। 


    সোওলস। আত্মা।অন্তরাত্মা। এইসব নিয়ে কোনোদিনই মাথা ঘামায়নি সে। নিকির পাশের ছোটো টেবল ভর্তি খেজুর, স্ট্রবেরি।নানারকম কুকিজ।তাদের পেলব একটা গন্ধ আছে । গন্ধটা ওকে ঐ কন্ঠস্বরটি মনে করিয়ে দিল। ভাইরাস সংক্রান্ত জেনেরাল ক্লাস করতে এসে প্রেমের প্যারালেল খুঁজে পেয়েছে।


    সিন্ডরেলা।


    গ্লাস স্লিপার্স।


    নিকি পিছন ফিরে কাজ করছিল।বলল, তোমাকে আমার কাজিন নয়নার সঙ্গে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দেব। আই অ্যাম সো প্রাউড অব হার।শি হ্যাজ কাম টু জয়েন দ্য মুভমেন্ট।নয়না।শি ইজ ইন গাজীপুর বর্ডার।


    চল্লিশ হাজার মেয়ে আছেন এই আন্দোলনে। ফাইট অ্যাগাইন্স্ট পেট্রিয়ার্কাল, ব্রাহ্মিনিকাল নেশন স্টেট। 


    অ্যান্ড ফরগেট অ্যাবাউট গ্র্যানিজ ককেশিয়ান ব্লাড এটসেটরা। 


    আমেলিয়ার মাথা নড়ে উঠল। পুতুলের মত। পুতুল নিয়ে থাকতে থাকতে কী তিনি পুতুল হয়ে গেছেন? সেই ছোটবেলাতে মামাবাড়িতে দেখা কাঁচের গোল পুতুল।মাথাটা টিকটিক করে নড়ে। 


    এরিয়ান ব্লাড! পিওর ! 


    দুঃশালা। দেবরূপ উঠে বসেছে।


    নিকি বলল, তুমি কী গ্র্যানির ওপর রেগে গেলে? উনি ঐসব বলেন। শি ডাজনট প্র্যাকটিস ইট। ছেড়ে দাও। বুড়ো হয়েছেন না? আমেলিয়া কাঁচ তুল্য স্বচ্ছতায় তাকিয়েছিলেন। 


    এইসব কিছুর মধ্যেই গলার স্বরটা ওকে ছাড়ছে। ভালোবাসা ভাইরাসের মত। কোষ ও অন্তরাত্মা খেয়ে যায়। তারপর বিস্তৃত হয়। ওর কী তাই হয়েছিল? 


    পর্ব বত্রিশ।


    এবার শীত বড় জ্বালাচ্ছে। ময়না তীক্ষ্ণ চোখে বড়বউয়ের হাঁটা চলা দেখছিল। হাতে কাজ নেই তবু চলনবলনে এত চমকদমক কেন ? তার ছেলে জান কবুল করে পয়সা আনছে আর মেয়েমানুষটা পায়ে গয়না লাগিয়ে ছমছম করে সত্যনারাণের সিন্নি খেতে চলে গেল! একবার বললো না ময়নাকে! ময়নার দম বন্ধ লাগছে। কাজটা যাবো যাবো করে চলেই গেল। ভেবেছিল লকডাউনের পর ওরা ডেকে নেবে। কবে যাব ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, এইরকম ভাবছিল ময়না।তো ওরা বলে দিল, আর আসতে হবে না।


    দুম করে এইরকম একটা কান্ড হবে ময়না ভাবেনি।কাজটা হালকা ছিল। খাইদাই ভালো। সে মেজাজ দেখালেও ওরা তেমন কিছু বলতো না। সব হিসেব গুলিয়ে গেছে ময়নার। বয়স তো হল।হিসেব যদিও রাখেনা ময়না, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে পঁয়ষট্টি, তবে মনে মনে জানে সত্তর পার হয়েছে তার। এখন আর আগের মত খাটতে পারে না। লকডাউনে যাদের যাদের কাজ গেছিল, সবাই নতুন কাজ খুঁজে নিয়েছে। তারা সব জোয়ান মানুষ।খাটতে পারবে। ময়না এখন আর ভারি কাজ পারবে না।শরীরে নেয় না। একে তো ওজন বেশি। তারপর খাওয়ার মুখ হয়ে গেছে ভালো। নিজের টাকাতে রোজ রোজ বোয়াল সর্ষে, দই রুই, টোম্যাটো দিয়ে পমফ্লেট জুটবে না। মনটা তাই ভালো নেই।কাজ খুঁজতে বেরোতে হবে।বড়বউয়ের বাপের বাড়ি সত্যনারাণ। একবার বললো না পর্যন্ত। ময়নার দুটো শখ।খাওয়া।আর কীর্তন শোনা। দুটোতেই ভাঁটা পড়েছে।


    ছোটো ছেলের বউ তো দিল্লি দিল্লি করে উঠে পড়ে লেগেছে। বিশু একটা বিল্ডিং এর কাজে আপাতত লেগেছে বটে কিন্ত মদ খাওয়া খুব বেড়ে গেছে। ফলে মেজাজও বেড়েছে। রোজ ঠোকাঠুকি। চিৎকার। মারামারি। গতরাতেও হয়েছে।মার খেয়ে মানি গাল ফুলিয়ে পাশের বাড়ি কাঁদুনি গাইতে গেছে।ময়না পষ্ট দেখেছে মানির কোমরে কালশিরের দাগ। হাঁটতে পারছে না ভালোমতো। তবু ডেকে কিছু বলেনি। খাক মার।মাগীর বড় দেমাক। 


    বড়ছেলে ময়ামাছ ধরেছে।দয়া করে ময়নার ঘরে দিয়েছে কিছু।সকালে উঠে ময়না তার আদ্যিকালের লেপ তোষক বালিশ সব রোদে দিয়েছে। ঘর খানা মুছেছে কোনোমতে। ঝুল ঝেড়েছে। এবার ময়ামাছের টক রাঁধবে তেঁতুল দিয়ে।ভালোমন্দ খাওনের জন্য মন বড় আনচান করে। 


    মানি পাশের বাড়িতে কাঁদতে যায়নি। এখন তার হাতে কিছু পয়সা চাই।পাশের বাড়ির দাদা শ্রমজীবী ইনডিস্ট্রিয়াল কো অপারেটিভ সোসাইটির কর্মচারী। ওখানে হ্যান্ড ওয়াশ, স্যানিটাইজার, ফিনাইল, ডিটারজেন্ট , সাবান এমনকী আচার, বড়ি সব মেলে।ওখানে একটা কাজ চাই।মানি ফ্যাক্ট্রিতে কাজ করতে পারে, সেলসে কাজ করতে পারে, হোম ডেলিভারি র কাজও করতে পারে।যে করে হোক কাজ চাই।হাতে টাকা থাকা দরকার।যে টাকার জোরে তার শাশুড়ি কাউকে তোয়াক্কা করে না।ডাল ভাতের টাকা ব্যাঙ্কে মজুত আছে।তবে কীনা মানিকে ছেলের কথা ভাবতে হয়। তার জন্যও তো কিছু রাখা চাই। কোমরে কাঠ দিয়ে মেরেছে বিশু।জায়গাটা টনটন করছে।পাল্টে মানিও ছেড়ে দেয়নি।কিল চড় ঘুষি।যা পারে মেরেছে। ব্যাপারটা ময়না টের পেয়েছে।কিছু উচ্চবাচ্চ্য করেনি।ওরা যা করছে করুক। সে মরছে নিজের জ্বালাতে। তারপর আবার সিন্নিটুকুও জুটল না।


    মানির কাজ জুটে গেল আশাপাড়া শ্রমজীবী কোঅপারেটিভে। সেলসের কাজ।এও দিল্লির গুণ। মানি বাংলা আর হিন্দি দুটোই বলতে পারে তরতর করে।দু চারখানা ইংরিজি শব্দ জানে। যাকে বলে স্মার্ট। কো অপারেটিভের দিদিমণি সুপ্রভা মিত্র বারবার করে বলে দিল, কামাই করবে না। সান ডে ছুটি। তাছাড়া টাইমলি আসবে। 


    ফেরার সময় মানির জ্বালা একটু কমলো।মেহতা হাউসে কাজ করার পর আর অন্য কোথাও কাজে মন টিকবে না ঝট করে।সে বেশ জানে।তার চেয়ে এই ভালো হল।বাড়ির বাইরে যতটা থাকা যায়। বিশুর মুখের দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করে না তার। সুপ্রভাদি বলেছে সামনের মাসে এক্সিবিশন হবে। তাতেও মানিকে রাখা হবে। যদি ভালো কাজ দিতে পারে। 


    মানি ফিরে দেখে ময়না মুখ শুকিয়ে বসে আছে। জাঁদরেল শাশুড়ির দিকে তেমন ফিরে তাকায় না সে।কিন্ত এখন মন ভালো আছে।মানির বুকের ভেতর মোচড়। আহা।মানুষটা একটু নেমন্তর আশাতে ছিল! তাও জুটল না!তারপর বুড়ির কাজটাও গেছে। ঘরে বিশু নেই।মানি ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল।পাশেই মুদীর দোকান। ময়দা আর গুড় কিনল আধাকিলো করে।অর্ধেক নারকেল রাখা আছে।খেজুর নিল একটু। যদিও তেমন সরেশ না।তবু।কাজু নাহয় নাই ছুটল। ঘরেই সিন্নি বানাবে মানি।ছেলেটাও ভালোবাসে।বুড়ির মুখেও রুচবে। হোক খান্ডারনি।তবু মেয়েমানুষ তো! জীবনে কতকিছু যে না পাওয়া থাকে! 


    শ্বশুরকে জীবনে দেখেনি। সে নাকী দুটো ব্যাটা একটা বেটীর জন্ম দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে গেছিল। দুঃখ বেশি হলে ময়না গজরায়।হারামজাদা গেলি তো গেলি ব্যাটা বেটির জন্ম না দিয়েই যেতি।আমার পায়ে বেড়ি পড়িয়ে গেলি কেন।


    বরকে আর কোনোদিন দেখেনি ময়না। শুনেছে মারা গেছে।শাঁখা সিঁদুর জলে দিয়ে কাজে লেগে গেছে।একসময় চপ ঘুগনির দোকান দিয়েছিল ময়না।যিশু বড় হয়ে যেই দোকান চালাতে গেল, সব লাটে উঠেছে।সেই থেকে লোকের বাড়ির কাজ ধরেছে ময়না। আহা! দুটো সিন্নিই তো খাবে! ভেবে ময়দাতে কাঁচা দুধ ঢালে মানি।


    আর মেহতাদের কথা ভাবে। সুনন্দিতার হাতের সিন্নি।কতরকম যে ফল পড়ে তাতে আর কী স্বাদ।আমেলিয়ার জন্য আলাদা পিরিচে করে সিন্নি যায়।চামচ দিয়ে খাইয়ে দেয় মানি। আর বুড়ি সুরুৎ সুরুৎ করে খায়। মেমসাহেবের মুখে হিন্দি শুনে খুব অবাক লাগতো মানির।পরের দিকে সয়ে গেছিল। 


    কলাগুলো ভাঙতে ভাঙতে মানির আমেলিয়ার ঘরের কথা মনে পড়ে। দেরাজভর্তি কাপড়জামা।সিন্দুক ভর্তি পুতুল। আহা গো! তাও নড়তে চড়তে পারে না! তার শাশুড়ি তো তবু চলে ফিরে খেতে পারে।কী কপাল! 


    এই বড়দিনে মেহতাহাউসে কত আয়োজন।চোখ বুজে মানি যেন দেখতে পায়।টাটকা খেজুর আর স্ট্রবেরির গন্ধে মানির ভাঙা ঘর ম ম করে।ঘরের কোন কোণাতে একটু কিশমিশ রাখা ছিল।খুঁজে পেতে তাও দিল মানি সিন্নিতে। আমেলিয়ার পরিজ বানাতো সে নিজে হাতে।এখন কে করছে কে জানে।নিকিবাবার ফরমাসের খাবার। মানির টিনের চালের মধ্যে দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে। আর ঢোকে স্যাঁৎস্যাঁতে মদের গন্ধ। বিশু। ভর সন্ধেবেলা গিলে এসেছে। দশদিনের কাজ ছিল।আজ শেষদিন। তাই রাগ।তাই ফূর্তি। মানির চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে ফেলে বিশু। তারপর একলাথি দিয়ে সিন্নির বাটি ফেলে দেয়। 


    - কার সঙ্গে শুতে গেলি কাজ পাবার জন্য? 


    মানির মাথাতে আগুন জ্বলে।কোমরের ব্যাথা দপদপ করছিল এমনিতেই। আঁচড় কামড়ের জ্বালা।সব মিলিয়ে অন্যরকম হয়ে ওঠে মানি।মানুষ নয় যেন। ঋতুকালীন যন্ত্রণা, অস্বস্তির সঙ্গে মিশে যায় প্রবল গাঢ় রাগ।যার রঙ লাল।ঠান্ডা হাওয়া ঝাপটা মারে শরীরে। 


    বিশুর মাতলামির আওয়াজে ফিরেও তাকায়না ময়না।লেপ তোশক নিয়ে ঘরে ঢোকে। রোদ পড়ে গেছে।নদীর হাওয়ায় বড় শীত।


    সিন্নির মোটা স্টিলের বাটি তুলে বিশুর মাথাতে এক ঘা বসিয়ে দেয় মানি। বিশু চিৎ হয়ে পড়ে যায়।


    বহু কষ্টের সঞ্চিত টাকাতে কেনা আধাকিলো দুধ, ময়দা, খেজুর, গুড়ের সঙ্গে মিশে গড়াতে থাকে রক্ত।কোনটা বেশি ঘন বোঝা যায় না।


    পর্ব তেত্রিশ।


    কাউর।রুপিত।


    বয়স পঁচিশ। অ্যারেস্টেড ইন ডেলহি বর্ডার।তাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।পুলিশ কাস্টডিতে অসংখ্য অত্যাচারের চিহ্ন শরীরে। নারী শরীর। তাকে অত্যাচার করে মজা আছে।সুবিধেমত। তারপর দলিত।দলিত মেয়েদের রেপ করলে, অত্যাচার করলে অত কেউ মাথা ঘামাবে না।তবু নামটা মিডিয়া তুলে আনল কেন? 


    নয়না মেহতা ইস্যুটাকে পাবলিক করেছে। সে ল ইয়ার।বাট নট প্র্যাকটিসিং ইন ইন্ডিয়া।তাই গীতাঞ্জলি সিন্ধে টেক আপ করেছে। মেন লাইক ইউ, ইয়ং মেন আর ইনডিফেরেন্ট ।ইন জেনরেল।তাই না? মাথা ঘামাও না।


    নিকি সোজা তাকিয়েছিল ওর দিকে।ও এখন ঠিক এই আলোচনায় যেতে চাইছিল না।এখন অন্য কথা চাই।আমেলিয়া! প্লিজ টেল মি সামথিং এলস।


    ফরচুন ডে।জানো কাকে বলে? 


    ও এইরকম কোনো নাম শোনে নি।কস্মিনকালেও না।ভ্যালেন্টাইনস ডে, বাবা ডে, মা ডে বাদ দিয়ে হাজার গন্ডা দিন আছে।বাট নেভার হার্ড অব ফরচুন ডে।


    আমেলিয়ার পরনে আজ দুধ সাদা গাউন।লেসের ফ্রিল বসানো।আজ খৃষ্টমাস। আমেলিয়ার খৃষ্টমাস আরো কয়েকদিন পরে। কিন্ত তিনি ছেলেমানুষের মত খুশি।বাক্স থেকে পুতুল বার হয়েছে।হ্যানেভার।ডিকো।বুগচয়।সামেমিরা।তিনি আজ চমৎকার মুডে আছেন।শীতকালে হঠাৎই পাওয়া রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের মত প্রফুল্ল তিনি। 


    দ্য ফর্টিয়েথ ডে আফটার খৃষ্টমাস। ইট ইজ মাচ ওল্ডার দ্যান খৃশ্চিয়ানিটি। ডে অব সায়লেন্স।একটা দিন।কোনো কথা নেই।শুধু ঝর্ণার জলের শব্দ।পাখির ডাক।বনের মর্মমূল থেকে ভেসে আসা পশু পাখির ডাক।ঘাসের ওপর বাতাসের শব্দ।


    আমেলিয়া যখন গল্প বলেন তখন তাঁর মুখে এক আশ্চর্য বিস্ময় খেলা করে।মুখের ওপর রোদ।ছায়া।ঝুরোঝুরো পাতা পড়ে।তখন তিনি ককেশিয়ান রক্ত নিয়ে গর্ব করা মেমসাহেব নন।তিনি এক প্রাচীন বৃক্ষ। 


    গ্রামের মেয়ে সাত ঝর্ণা নামের ঝর্ণা থেকে জল আনতে যায়।বুঝলি? এই যে সামেমিরা।এ যায়।কিন্ত যাতায়াত কালে একটিও কথা বলা চলবে না।বুঝলি? 


    ঠোঁটের ওপর হাত রেখে চুপ বোঝাতে চাইলেন আমেলিয়া।মেয়েদের কাঁখে কলসী থাকে।সেভেন স্প্রিংগস থেকে পূত জল নিয়ে সে যায়।একটি কথা বললেই কাজ নষ্ট। ঐ কলসীভরা জল মেয়েরা পুঁতে রাখে মাটির নীচে।কোন গাছের নিচে, কোন বাগানে, কেউ জানে না।সাক্ষী থাকে শুধু তারায় ভরা রাত।পরেরদিন সকালে গাঁয়ের ছেলেরা ঐ কলসী খুঁজে মরে।বুঝলি ছেলে? কেউ পায় না।মেয়েরা যে কোথায় রাখে তাদের, কেউ জানে না।ঐ মেয়ের দল তারপর তাদের কলসী খুঁড়ে বার করে।তাদের সাজায় ফুল আর ফুলের মালা দিয়ে। এই দ্যাখ ।এমন কলসী।


    আমেলিয়ার রত্নভান্ডার থেকে বেরিয়ে আসা একটি মাটির কলসের দিকে মোহমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দেবরূপ।কী সুন্দর কারুকার্য করা কলসীটি।কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো।কোন নারীর গোপন সঞ্চয় এই কলস কে জানে! 


    আমেলিয়া কলসীর গায়ে হাত বোলাতে থাকেন।তাঁর কুন্চিত হাত যেন তরুণীর করকমল হয়ে ওঠে চালনার সঙ্গে। ল্যাভেন্ডারের গন্ধ ভাসে।


    -এই কলসীর জলে বুঝলি, যে যার খুশি ছোট ছোট জিনিস এনে ফেলবে।তামার পয়সা।রূপোর টাকা। সোনার আংটি। ছোট খেলনা। তারপর ছোট এক চারবছরের খুকিকে চোখ বেঁধে সেই কলসীর সামনে ছেড়ে দিতে হবে।সে কলসী থেকে জিনিস তুলে যার হাতে যা দেবে, সেই তার ভাগ্য! তাকে ঘিরে গাঁয়ের মেয়েরা গান গাইবে।বেগুনি।হাল্কা বেগুনি রঙের মার্শমেলো ফুটে আছে চারদিকে। বুগনভোলিয়া রাশি রাশি।বরফ পড়তে শুরু করেছে।তাই স্নো ফ্লাওয়ারে ঢেকে গেছে রাস্তার দুপাশ।ধবধবে সাদা স্নো ফ্লাওয়ার।লিখি হরেক রকম।জারবেরা।


    আমেলিয়া তাকিয়ে আছেন ওর মুখের দিকে। কেমন সজল দৃষ্টি যেন।মনে হচ্ছে আপনজন। 


    - ডু ইউ নো মাই সন, দেয়ারস অ্যানাদার ফ্লাওয়ার ইন আর্মেনিয়া। ইট ব্লুমস এভরিহোয়ার। ইন দ্য গার্ডেনস।ইন দ্য স্ট্রিটস। ইন দ্য বুশেস।হোয়াইট।ব্লু।পিংক।ইয়েলো। ইট ইজ কলড ফরগেট মি নট! 


    ও কেমন কেঁপে উঠল । আর্মেনিয়ানদের জেনোসাইড। উনিশশো পনেরো। তারপর থেকে আর্মেনিয়ানদের জাতীয় ফুল।ফরগেট মি নট। এথনিক ক্লিনসিং এর নামে দেড়লাখের বেশি আর্মেনিয়ানদের মেরেছিল অটোম্যানরা। সিস্টেম্যাটিক কিলিং।স্টেট স্যাংশনড প্রোগ্রাম। ইনফাইডেলসদের মারো।আব্দুল হামিদের হুকুমত। তাঁকে সরিয়ে যখন নব্য তুর্কীরা এলো, তখনো কিছু ভালো হল না আর্মেনিয়ানদের! টার্কিফাইং দ্য কান্ট্রি!


    ভাবতে পারো দেবরূপ? একটি জনজাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে বলে, তাদের খাদ্য , বস্ত্র এবং জল ছাড়া হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে।দ্য গ্রেট আর্মেনিয়ান ম্যাসকার। পুরুষদের হত্যা করা হচ্ছে।শিশুদের বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে মুসলমান পরিবারে।মেয়েদের ধর্ষণ করা হচ্ছে যাতে তারা গর্ভবতী হয়। তারপর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হারেমে। 


    নট আ সিঙ্গল খৃশ্চিয়ান উইল বি অ্যালাউড টু সারভাইভ। 


    দিস ইজ দ্য জেনোসাইড দিস ফ্লাওয়ার স্পিকস অব।ফরগেট মি নট। নিকি বলছে।


    ফরগেট মি নট কী মনে করাচ্ছে? ইতিহাস কী পুনরাবৃত্ত হবে ইয়েটসিয়ান জায়ারের রূপকল্পে? নিকি ঘাড় গুঁজে পড়ছে।কী পড়ছে কে জানে। ওর বয়েজ কাট চুল আর অ্যাশ কালারের টি শার্টের মাঝে ছোট্ট ফর্সা ঘাড়ে একফালি আলো পড়েছে।মনে হচ্ছে কোনো স্নো ফ্লাওয়ার ফুটে আছে।ও চোখ সরিয়ে নিল।


    বুঝতে পারছে দেবরূপ। কথা কোন দিকে যাচ্ছে। কিন্ত একটা জেনোসাইডের প্রত্যুত্তর কী আরেকটা জেনোসাইড? নো।ইট ক্যাননট বি।


    এনিথিং ফ্যাসিস্ট হ্যাজ টু বি ডান উইদ। 


    আমেলিয়া ঘাড় নিচু করে আছেন। যেন ঘোরের মধ্যে। 


    - নাথিং ক্যান বি ডান উইদ অ্যাকচুয়ালি। হিস্ট্রি উইল টেক ইটস ওন টার্ন। 


    স্পেশ্যাল অর্গানাইজেশন।


    কিলিং স্কোয়াডস।


    বুচার ব্যাটালিয়নস।


    আর্মেনিয়ানস।যারা প্রথম খৃষ্টধর্মকে তাদের ওফিশিয়াল রিলিজিয়ন হিসেবে গ্রহণ করেছিল।তিনহাজার বছর ধরে ককেশাসে যাদের বসবাস। বেশিদিন আগের কথা নয় তো।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ঘটনা।তুমি খৃষ্টান।তুমি বেশি ট্যাক্স দেবে।তুমি খৃষ্টান।তোমার আইনি অধিকার নেই। তুমি খৃষ্টান ।দেশ ছেড়ে চলে যাও।না খেয়ে মরো।


    ডোন্ট ইউ থিংক ইটস হরিবল? 


    - আর ইউ রিভেন্জফুল ম্যাম? 


    আমেলিয়ার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি। 


    - নো ।নো ডিয়ার। আই যাস্ট সে দ্যাট হোয়াট ইজ ডান ইজ ডান।রেস্ট ইজ ডেস্টিনি।ইউ ক্যাননট ফাইট ইট।ডোন্ট থিংক আয়াম অ্যান্টি মুসলিম। আই অ্যাম নট।কিন্ত এই যে ইতিহাস, নির্যাতনের ইতিহাস, এ বড় রিভেন্জফুল।গ্রিক ট্র্যাজেডির ফিউরিদের মত ফিরে ফিরে আসে।ব্লাড থার্স্টি স্পিরিটস। 


    - এর শেষ হবে না? এই যে আপনি ফুলের গল্প বললেন। আমি জানতাম না ফরগেট মি নট ফুলের এই ইতিবৃত্ত। আপনি বললেন।শুনলাম।


    - কজন জানে বলো? অ্যান্ড হু কেয়ারস? স্টোরিজ অব অ্যাট্রোসিটিজ।টর্চার।অ্যাবিউজ।তুমি টেগোরকে বলবে দেখা হলে? হি মাস্ট হ্যাভ সাম সলিউশন! 


    উনি এরকম প্রায়ই বলেন।নিকি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।


    কখন কোন সময়ে থাকেন কোনো ঠিক নেই।কিন্ত টেগোরে অবিচলিত ভক্তি আছে। সুনন্দিতার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে খুব খুশি।মাই ডটার ইন ল ইজ ফ্রম টেগোরস ইউনিভার্সিটি।


    ওর খুব শীত করছে।কানের কাছে কে যেন বলছে " ফরগেট মি নট"। কে বলছে? অদিতি? ও ঘুমের মধ্যে হাতড়াচ্ছে।


    মালবিকা ফোন করেছিলেন আজ।


    -আমি তোর কাছে যাবো বাবু?এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে যাই? 


    - নো ।এখন এসো না মা।আমাকে দূরে থাকতে দাও। একা। অনেকের মধ্যে একা।


    - আমার যে ভীষণ ইচ্ছে করছে তোকে দেখতে বাবু।


    - ইচ্ছে করুক মা।এখানে মোস্ট অব দ্য টাইম আই স্পেন্ড ইন দ্য ডিপার্টমেন্ট। তুমি পাবেই না আমাকে। 


    বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা। অস্বস্তি। ওর ভয় করে।কোভিড নাইন্টিন ইজ নট অনলি ফেটাল ফর লাঙ্স।বাট অলসো ফর হার্ট।অ্যান্ড মে বি ফেটাল ফর গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইন প্রবলেমস।


    তার কী হার্টের কোনোরকম অসুখ হল কোভিড নাইন্টিনের জন্য? কেন এত শ্বাসকষ্ট? কোভিড এনহ্যান্সেস কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজেস। মেডিক্যাল সায়েন্স বলছে।


    পর্ব চৌত্রিশ।


    তিন পাহাড়ের দেশ।থাঙ্গাল।মুরুগান।কুরিসুমালা। এবার অনিল ও পলির সঙ্গে পলির মা , বোন এমিলি আর বাচ্চারাও এসেছে।বড়দিনের এই ট্যুর অনেকটাই নিশ্চিন্তির হওয়ার কথা ছিল।অনেকটাই প্রাপ্তির। অন্তত পলির মা , বোন এমিলি আর বাচ্চারা সেইরকম মুডেই এসেছে।বড়দিনের কুরিসুমালা অনন্য।সবুজের উৎসব। হাজার হাজার মানুষ আসেন কিন্ত ভিড় বলে মনে হয় না।নিঃশব্দ ভাবে হাঁটাচলা।বাতাসের শব্দ আর পাইনবনের আশ্চর্য মায়াময় বাতাস।সবমিলিয়ে এটি একটি প্রাকৃতিক উৎসব।অনিল সমস্ত শরীর মন দিয়ে এই প্রকৃতিকে গ্রহণ করছেন।পলিও।তবে অংশত।মনের কোন কোণাতে যেন একটা কাঁটা বিঁধে আছে।খচখচ করে লাগে।একটা বাদামি ত্বকের স্পর্শ।একটা শ্যামলা মুখ।কোঁকড়া চুল টানটান করে বাঁধা। 


    কুরিসুমালা।মাউনটেইন অব দ্য ক্রস। কোডোঙ্গালুরে এসে নোঙর ফেলেছিলেন সেন্ট থমাস। ইভান্জেলিক্যাল কাজকর্ম শুরু করেছিলেন এখান থেকেই।


    কিস ইট। প্রে অ্যাট কুরিসুমুন্ডি। তীর্থযাত্রীরা এইভাবেই এগিয়ে যান। এবার বড়দিনে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা অনেক কম। যে রাজ্য কোভিড নাইন্টিনকে আটকে দিয়েছিল সমূহ প্রত্যুৎপন্নমতিতায়, সে রাজ্য আবার কোভিডে ছেয়ে গেছে।


    বাচ্চাদের নিয়ে পলির মা থেকে গেছেন কটেজেই।অনিল, পলি আর এমিলি অতিক্রান্ত করছেন সেই দুরূহ পথ।


    পাহাড় বেয়ে ওঠা।বড় কষ্ট।আবার বড় আনন্দ।প্রভুর কাছে সমর্পণ করতে যাচ্ছেন। তীব্র ঠান্ডা বাতাসে গাল কেটে যায়।পায়ের গোছে টনটন করে ব্যথা। মাসলে টান ধরে। তবু চলা থামে না।


    পুন্নুম কুরিশু মুথাপ্পা/ পোনমালা কোট্টায়াম। 


    ও পেট্রিয়ার্ক অব দ্য গোল্ডেন ক্রস/ ক্লাইম্ব উই শ্যাল/ দ্য গোল্ডেন হিল।


    সোনালী পাহাড়।তাঁদের হাতে, পিঠে কাঠের ক্রস। চারপাশে বিস্তৃত চা বাগান ।লেক। 


    ভাগামান হাইটসে পৌঁছাতে আর কতদূর? ইন্দো সুইশ প্রজেক্ট ডেয়ারি ফার্ম বাঁ হাতে রেখে হেঁটে গেল দলটি। গাভী ও বাছুরের হাম্বাধ্বনি। আরেকটু পরেই দুধ দোয়ানো শুরু হবে।দুশো একর জমির ওপর ছড়ানো পাইনবন। কোনো লোকালয় নেই।তাই কোভিড হানা দিতে পারেনি। সরসর করে হাওয়া ওঠে পাইনের বনে। ছোট দলটি হেঁটে যায়।এগারোহাজার একশদশ ফিট উচ্চতার উদ্দেশ্যেই যায়। অন্য সময় হলে পলি ছেলেমানুষের মত পাইনের ফল কুড়াতেন।এবার যাচ্ছেন না।মনের মধ্যে একরাশ অন্ধকার। অদিতি ।ক্ষমা কোরো। দেবরূপ। প্লিজ ফরগিভ আস। উই সাফার।ইচ অ্যান্ড এভরি মোমেন্ট উই সাফার। আমরা ঘুম থেকে উঠি ক্লান্তিতে।শুতে যাই বিবমিষাতে।খাদ্যে রুচি নেই। কাজ করি অভ্যাসে।কোভিড নাইন্টিন এ কী করে গেল! 


    পলির চোখ দিয়ে জল পড়ছিল হু হু করে। এমিলি খানিক এগিয়ে।অনিল থমকে দাঁড়ালেন। 


    - আর ইউ ক্রাইং পলি?


    - নোহ্। ঠান্ডায় চোখ দিয়ে জল পড়ছে।চলো।উঠে যাই। 


    পলির গাঢ় চকোলেট রঙের কার্ডিগানে বিষাদের ছায়া। অনিল অনুসরণ করেন। দেবরূপ। প্লিজ ফরগিভ আস।বিড়বিড় করছেন। আমরা কী নিজেদের দায়ভার নিজেরাই নিতে পারতাম না? কী দরকার ছিল ছেলেটাকে বিব্রত করার।হোয়াই ডিড অদিতি কাম? হোয়াই? 


    পাইন বনের হাওয়া কানের পাশ দিয়ে শনশন করে চলে যায়।বলে , ক্ষমা কোরো।ক্ষমা কোরো।এমিলি অনেকটা এগিয়ে গেছিল।দাঁড়িয়ে পড়েছে ওদের জন্য।


    চোদ্দটি সাংকেতিক চিহ্ন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে। অনিল ভাবছেন, যে কোনো তীর্থস্থান কেন দুর্গম জায়গাতেই হয়।দুর্গম অথচ সুন্দর। অদ্ভুত সুন্দর। সুন্দর বা ক্ষমা সহজলভ্য নয় বলেই কী? অবশ্য ভাগামন হাইটসকে খুব দুর্গম বলা চলে না।এখনো কানে আসছে গরু , বাছুরদের গলাতে বাঁধা ঘন্টার মিষ্টি শব্দ।হাঁফ ধরে।দাঁড়িয়েছেন আবারো।বার বার। ক্রুশ বহন করার সময় খ্রাইস্ট দাঁড়িয়েছেন যেমন।অনিল আর পলি এসে দাঁড়িয়েছেন এনলাইটেনিং সানের নিচে। এখানে দাঁড়ালে নিচে পুরো উদার সবুজ উপত্যকা দেখা যায়। পার্থিব সব কিছু ফিকে পড়ে যায় এই অনন্ত উদারের কাছে।পাইন গাছের গাঢ় সবুজ পাতা।নিচে পাইনফল পড়ে আছে অজস্র।ধাপে ধাপে।


    অন্য সময় হল পলি , এমিলি বাচ্চাদের মত হুড়োহূড়ি করে পাইনের ফল সংগ্রহ করতেন।বাড়ি গিয়ে সাজিয়ে রাখবেন নালুকেতুর আশেপাশে ছড়ানো অজস্র গাছের পায়ে।সাবাই ঘাসের ট্রি প্লান্টার । অদ্ভূত একটা গন্ধ তাতে।ঘাসের। আজ পলি বা এমিলি কেউ পাইনের কৌণিক ফলগুলির দিকে চেয়েও দেখলেন না।তারা পড়ে রইল গাছের পায়ে।কালচে খয়েরি রঙের ফল সব। 


    - আমি কী এখান থেকে একবার ত্রিদিবকে ফোন করব? বা মালবিকাকে? দেবরূপকে?


    - বাট হোয়াই? 


    - জানি না।একবার ফোন করে বলতে ইচ্ছে করছে।প্লিজ ফরগিভ ফর হোয়াটেভার হ্যাপেন্ড।


    - কী লাভ? 


    পলি পোশাক থেকে শুকনো শীতের বাতাসে উড়ে আসা ঘাস, খড় ফেলে দিচ্ছেন। 


    এবার কেরলে নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন হবে না।প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ড.এ. জয়তিলক পুলিশ চিফ এবং জেলা শাসকদের কাছে হুকুমনামা পাঠিয়েছেন এরমধ্যেই। যেটুকু যা হবে, রাত দশটার মধ্যে শেষ করতে হবে।


    নতুন ঢেউ আসছে কোভিডের।মহারাষ্ট্র ইতিমধ্যেই নাইট কার্ফ্যু জারি করেছে।সব জমায়েত বন্ধ।অনিলের খুব সমস্যা হচ্ছে। অনেকদিন ওয়র্ক ফ্রম হোম তো হল।কিন্ত এবার তাঁর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন।এক্সপোর্টে মন্দা দেখা যাচ্ছে।কিন্ত একা বাইরে যাবার মানসিক জোর তাঁর এখনো হয়নি। কেমন অসহায় লাগে।নিজের জন্য যতটা , তার চেয়ে অনেক বেশি পলি ও সন্তানদের জন্য।


    - লাভ নেই হয়তো।বাট আই থিংক স্পিকিং উইল হেল্প।


    - কাকে? তোমাকে না দেবরূপ কে?


    অনিল বসে পড়ে একটা শ্বাস ছাড়লেন। এত সবুজের মধ্যে, সঙ্গতির মধ্যে শ্বাস নেওয়া বড় সহজ।এখানে সব কিছু বড় অরগানাইজড।নির্মল।সহজ। তাঁর চেঙ্গালার বাড়িতেও এমনি পরিবেশ।খানিকটা অন্তত।কিন্ত মুম্বাই। দুবাই। এইসব জায়গা, যেখানে তাঁর ব্যবসা ফ্লারিশিং, সেইসব জায়গার কথা ভাবলেই ভেতর থেকে কাঁপুনি আসে।তিনি দোষমুক্ত হতে চান।তিনি কী সত্যি কোনো অন্যায় করেছিলেন দেবরূপকে দুঃসময়ের সঙ্গী হতে বলে? 


    পলি একটু পিছিয়ে এসে হাত ধরলেন।


    - ডোন্ট ফীল গিল্টি। দ্যাট ওয়জ ডেস্টাইন্ড ফর হার।


    ডেস্টিনি।ভাগ্য।ঝর্ণার শব্দ কানে আসে।ভাগামন হাইটসে পৌঁছানোর দেরি নেই খুব।


    এখানে ডেস্টিনিকে মেনে নেওয়ার কোনো অসুবিধে নেই।কিন্ত মধ্যরাতের নিঃসঙ্গতা বা দ্বিপ্রহরের ওয়র্ক ফ্রম হোমের মাঝখানে, সন্তানের গালে চুমু খাবার সময়, সম্বরের উষ্ণ গন্ধে ,এমনকী পলির সঙ্গে মিলিত হবার কালেও কানের কাছে কে ফিসফিস করে, ওয়জ ইট নেসেসারি টু ড্র্যাগ অদিতি টু মুম্বাই? 


    - তুমি এগিয়ে যাও পলি।আমি আসছি। একটু বসি এখানে।


    ঘ্যানঘ্যান করে এসি চলছে।শীতকালেও এসি দরকার এখানে।ত্রিদিবের সামনে একটা চিনি দুধ ছাড়া কড়া কালো কফি।একটা নিতান্ত গোবেচারা ভেজ স্যান্ডউইচ। খানিকটা চিজ কেতরে বেরিয়ে আছে। গ্রিল টা একটু কড়া হয়েছে। 


    রিংগোর সামনে বেশ বড় একটা প্ল্যাটার।সে খেতে ভালোবাসে খুব। একটা গ্রিক চিকেন স্যালাড আর মিল্কশেক নিয়ে খুব ব্যস্ত সে।পাশে মোবাইল খোলা।তাতে গেম চলছে। 


    রীণা রোগা হয়েছে আরো।কলার বোন স্পষ্ট। তাই জন্যই বোধহয় একটা ব্যাকলেস চোলি টাইপ জামা পড়েছে। খদ্দরের শাড়ি।দেখেই বোঝা যায় বেশ দামি।বুটিকের জিনিস। গলাতে একটা রূপোর হাঁসুলি টাইপ। শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে পরেছে যে শরীর অনেকটাই দৃশ্যমান। শাড়ি এমনি এক পোশাক যা অফিসিয়াল ভাবে শালীন এবং আনঅফিসিয়ালি প্রচন্ড অশালীন হতে পারে ।রীণা রোগা হয়েছে কিন্ত তার জৈব আকর্ষণ যেন আরো তীব্র।


    আরো উত্তেজক।ত্রিদিব এই মুহূর্তেই খুব কামার্ত বোধ করছেন।রীণাকে হাতের মুঠোতে নেবার জন্য শরীর চঞ্চল। ঠোঁট উদ্বেল।রিংগো না থাকলে রীণাকে দুরে কোথাও নিয়ে যাওয়া যেত।ত্রিদিব আবার তেত্রিশের উদ্দাম যুবক হয়ে উঠতে পারতেন।রীণা কী এইভাবে তাঁকে প্রলুব্ধ করছে? ইচ্ছে করে রিংগোকে নিয়ে এসেছে? যাতে ত্রিদিব ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ না পান? চুলগুলো স্ট্রেইট।কোমর ছাপানো।খোলা।কোমরে একটা গয়না পরেছে। ইদানীং মডেলিং শুরু করেছে রীণা।শুধু ব্ল্যাক কফি নিয়ে বসেছে তাই।কিন্ত অন্যমনস্ক কিছুটা।


    অত্যন্ত তাড়িত ও ব্যথিত ত্রিদিব জিজ্ঞেস করলেন


    - তুই কী বোর হচ্ছিল রীণা? আগে তো এত চুপচাপ ছিলি না? 


    - আগের মত আর থাকা গেল না ত্রিদিবদা। তবে আগের চেয়ে ভালো আছি।এটুকু বলতে পারি।


    ত্রিদিবের কানে খট করে লাগল।রীণা তাঁকে ত্রিদিবদা বলল! 


    এইসব কী পূর্ব প্রস্তুতি? রীণা যোশি ।স্পষ্টতই দূরত্ব বাড়াতে চাইছে। বিয়ে করবে রীণা, শুনেছেন ত্রিদিব। বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ভাব। রীণা তাহলে চললো।


    - লকডাউন পিরিয়ডটা অনেককিছু শিখিয়ে দিল ত্রিদিবদা। আই হ্যাভ লার্ন্ট আ লট। আগেও অনেককিছু শিখেছি।কিন্ত এই কোভিডটাইমটা আমার দশবছর বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে।


    ত্রিদিব নিজেকে সামলাতে পারলেন না।


    - তাই বিয়ে করে ফেলবি ঠিক করলি? 


    রীণা রাগ করল না। ফিকে হাসল। চুল ঠিক করলো বাঁ হাত দিয়ে।ঠিক যেভাবে ফ্যাশনদুরস্ত মেয়েরা চুল সরায়। ছোট ব্যাগ খুলে লিপ গ্লস লাগাচ্ছে।


    - একবার বিয়ে করে তো ঠকেছিস। আবার রিস্ক নিচ্ছিস? রিংগোর কথা ভাবলি না? ও মেনে নিতে পারবে? 


    ত্রিদিব হঠাৎই যেন ভীষণ কনসার্নড অভিভাবক।


    রীণা স্পষ্ট চোখে চোখে তাকালো। 


    - আমি বিয়ে করছি তোমাকে কে বললো ? আমি তো বলিনি? 


    - যারা তোকে আমাকে একসঙ্গে রেস্তঁরা বা আইনক্সে দেখে তাদেরই কেউ কেউ বলেছে। 


    রীণা আবার হাসলো।শাড়ি গুছিয়ে নিল। রিংগোকে ছোট করে বলল, তাড়াতাড়ি খাও। 


    - তোর তাড়া আছে নাকী রীণা? 


    ত্রিদিবের কোনো তাড়া নেই। সারা সকাল অফিসের কাজ করেছেন।হেড অফিস ভিজিট করে মিটিং কমপ্লিট।বাড়িতে কেউ নেই।টুপুর ব্যস্ত।মালবিকা এই উইক এন্ডে আসেননি।এলেও দুজনের কথা হয়না তেমন আর।বাড়িটা খা খা করে।শ্যামা সকালে একটা কাতলা মাছের ঝোল আর সুক্তো করে রেখে গেছে। রাতে আর সেটা খাওয়ার ইচ্ছে নেই ত্রিদিবের। ভেবেছিলেন রীণাকে নিয়ে ইকো পার্কের কটেজে চলে যাবেন।ডাব চিংড়ি দিয়ে ডিনার করে ফিরবেন।মালবিকা বাড়ি ছেড়েছেন পর থেকে ভালোমন্দ খাওয়া নেই। শ্যামাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন মালবিকা।একদম ডায়াবিটিক ডায়েট ত্রিদিবের জন্য।


    রীণা লিপগ্লস লাগানো শেষ করে আবার হাসল।


    - একটু তো তাড়া আছেই ত্রিদিবদা। তুমি ঠিকঠাক শুনেছো।বিয়ে করছি। কিন্ত কোনো রিস্ক নেই জানো? কারণ আমার একটা চাকরি আছে। রিংগোর ফিউচার একদম সিকিউরড।আমার সেভিংস ওর জন্যই তো।আর প্রদ্যুম্ন নিজেই প্রোপোজ করেছে।ও রিংগোর সঙ্গে বেশ ফ্রেন্ডলি।বিয়ে করেছিল আগে। গট ডিভোর্সড। আর ও বিয়ে করছে শুনে ওর বাড়ির লোক খুব প্লিজড। কিন্ত মেয়েরা সেকেন্ড টাইম বিয়ে করলে তোমার মত ফ্যামিলি ম্যানরা এত আপসেট হয় কেন বলো তো? সমস্যাটা কোথায়? তুমি তো আমাকে বিয়ে করতে না অ্যাটলিস্ট। প্রদ্যুম্ন গেভ অ্যান অনারেবল প্রোপোজাল। 


    - তুই বিয়েকে অনারেবল ভাবিস রীণা? এখনো? তুই যে বলেছিলি বিয়েতে আর বিশ্বাস নেই তোর? 


    রীণা একটা টিস্যু দিয়ে রিংগোর মুখ মুছিয়ে দিল।চীজ লেগেছিল।


    - স্যান্ডউইচটা খাও।ল্যাতাপ্যাতা হয়ে যাবে এরপর। বলেছিলাম এককালে।এখন আর বলছি না।আই হ্যাভ চেঞ্জড। 


    - ছেলেটি ভালো তো? 


    রীণা হো হো করে হেসে ফেলল। 


    - ছেলেসমেত মহিলাকে বিয়ে করতে চাইছে। তারপর আবার কর্পোরেট অফিসে কাজ করি।মডেলিং করি। মন্দ হবে কেন? 


    তারপর একটু আনমনা হয়ে গেল রীণা।


    - রাগ কোরো না ত্রিদিবদা। তোমাকে আমিই টেনেছিলাম। তুমি তো নিজে থেকে আসেনি । খুব ভালনারেবল ছিলাম সেইসময়। বোকাও। ফূর্তি করতে চাইতাম খুব। তুমিও বোধহয় ঐটুকুই চাইতে আমার কাছে। ওসব ফুরিয়ে গেছে। লকডাউনে যখন জ্বর হয়ে পড়ে থাকলাম, তখন অনেক কিছু বুঝলাম।শিখলাম। আফটার অল, রিংগোকে বড় করতে হবে তো। আর আমার তো বাপের বাড়ির জোরটাও নেই।


    একটা ফোন বেজে উঠল।ত্রিদিবের। অনিল টমাস। ফোনটা নিলেন ত্রিদিব। আগে হলে হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে সুইচ অফফ করে দিত রীণা। এইসময়টা শুধু তোমার আর আমার তিনুদা। বলে একটা ছয়েলছবিলি হাসি হাসতো। 


    আজ কিছুই রিঅ্যাক্ট করলো না।বরং রিংগোকে খাইয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।


    - কেমন আছো? হাউ আর ইউ ত্রিদিব? 


    কুরিসুমালা পর্বতমালা থেকে গলার স্বর ভেসে এলো। অনেকদিন বাদে অনিলের সঙ্গে কথা হচ্ছে।


    ত্রিদিব কফিতে চুমুক দিয়ে যা বলতে হয় , তাই বললেন, 


    - আয়াম অ্যাবসলিউটলি ফাইন অনিল। ভালো আছি। চমৎকার। 


    ত্রিদিবের সুদৃশ্য, সুশোভন , ঝকঝকে দোতলা বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে, অনিলকে সে কথা বলা হল না।ছাতবাগান শূন্য।শ্যামা জলটল দেয়।কিন্ত ফাঁকা।বলা হল না মালবিকা মন্ডল সেনগুপ্ত এখন আর ত্রিদিবের বাড়িতে থাকেন না। মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেছে।সে ঠিক কোথায় ত্রিদিব জানেন না।ছেলের গার্লফ্রেন্ড মারা গেছে। কী যেন নাম মেয়েটির? ত্রিদিব মনে করতে পারছেন না।ছেলে ট্রমাটাইজড হয়ে দিল্লিতে ।বলা হল না।এইসব বলার মত জায়গা নয় এটা।বলার সময় নয়। মনটা আবার মুচড়ে উঠল। ভেবেছিলেন অনেকদিন বাদে।হয়তো রীণা নরম হয়েছে। অভিমান হয়েছিল। এখন সব ঠিকঠাক করে নেওয়া যাবে।নিছক একটি মেয়েশরীরের জন্য ছটফট করছেন ত্রিদিব।অথচ তিনি ব্রথেলগমনের জন্য প্রস্তুত নন । মালবিকাহীন বাড়ি যে এতটা ভয়াবহ হতে পারে ধারণা ছিল না। এখন বুঝতে পারছেন।ঠাকুমাও তেমন আসেন না আর। নেটফ্লিক্স দেখেন কাজের ফাঁকে।তাতে আরো উত্তপ্ত হন। ভেবেছিলেন ওয়েব সিরিজের নায়কের মত রীণাকে নিয়ে বাথটাবে ডুব দেবেন।সাবানের ফেনা, টো ম্যাসাজ আর ওয়াইন। ত্রিদিবের কাছে এটাই চূড়ান্ত রিল্যাক্সেশন। রীণাকে বলতে চাইলেন তিনি পারফেক্ট টো ম্যাসাজ দেবেন।ইট উইল ইভন গ্রেটার দ্যান সেক্সুয়াল প্লেজার। হল না।কিছু হল না।রীণা সবকিছুতে জল ঢেলে দিল।রিংগো মন দিয়ে মিল্ক শেক খাচ্ছে।রীণা এত মন দিয়ে দেখছে যেন এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। 


    - আই উইল কল ইউ লেটার অনিল। টুনাইট।ইফ পসিবল। 


    রীণা উঠে দাঁড়িয়েছে। রিংগোর হাত ধরে টানছে।


    - চললাম গো।তুমি শরীরের যত্ন নিও। আমি একটু প্রদ্যুম্নর সঙ্গে বেরোবো।বেরিয়েছে যখন তখন শপিং করেই ফিরি। মুখে একটা ডিজাইনার মাস্ক বেঁধে নিল রীণা।ওকে মিশরীয় নারীদের মত লাগছে।রহস্যময়ী। পুরোটাই ত্রিদিবের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ও ।পিরামিডিয় ঘেরাটোপে, বিবাহের বৃত্তে।


    ত্রিদিব মন দিয়ে কেতরে যাওয়া স্যান্ডউইচ দেখছিলেন। ঠিক তাঁর নিজের মত। ভ্যাবলা। বিস্বাদ। হেরো। রীণা একটা সুগন্ধীর ঢেউ তুলে বেরিয়ে গেল। 


    ত্রিদিবের গাড়ি একটু দুরে পার্ক করা আছে। শমিত সিগারেট খাচ্ছিল। তাঁকে দেখে সিগারেট ফেলে দিল। কোনো দরকার ছিল না।তিনি এমনিতেই একজন ব্যর্থ মানুষ। 


    তবু শমিতকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন ত্রিদিব। অনেকদিন বাদে খেয়াল করে দেখছেন।খুঁটিয়ে। অথচ ও প্রায় রোজ আসে । মুখটা বুড়িয়ে গেছে অল্প বয়সে। 


    - তোর ছেলে কেমন আছে রে? 


    - ব্লাড লাগবে স্যর।প্লেটলেট আবার নেমে গেছে। তেত্রিশ। 


    শমিত বছর দশেক হল ত্রিদিবের গাড়ি চালায়। ওর ছেলের প্লেটলেট কাউন্ট কম। লকডাউনের পর ও আরো দুটো কাজ নিয়েছে।


    ত্রিদিবের এখন খুব কথা বলা দরকার। ফোনে না।জ্যান্ত মানুষ।


    - টাকা পয়সা আছে তো রে? ব্লাড জোগাড় হয়েছে? 


    - দশ বোতল জোগাড় হয়েছে স্যর।


    শমিত নিজে থেকে কখনো নিজের সুবিধে অসুবিধের কথা বলে না। ত্রিদিব খেয়াল করেছেন।মালবিকা নিয়মিত খোঁজ নেন। 


    - বাড়ি যাব স্যর? 


    শমিত বাঁ দিকে টার্ণ নিল। 


    ত্রিদিব আঁতকে উঠলেন।


    - না না।বাড়ি যাব না। রেড রোডের দিকে নিয়ে চল। 


    রেড রোডে আধঘন্টা চক্কর দিল গাড়ি। আপাতত রীণার মুখটা ভুলে যাবার চেষ্টা করছেন ত্রিদিব। খিদে পাচ্ছে।


    - তোর বাড়িটা বাইপাসের দিকে না শমিত? 


    - খালপারে স্যর। আগে মুকুন্দপুর ছিল। 


    - তোর বাড়িতে নিয়ে যাবি? খুব খিদে পাচ্ছে। 


    শমিত খুব লজ্জিত হল।স্যর তার বাড়িতে যাবে? খাবে? কী খাবে? ডিম আছে বোধহয় বাড়িতে। 


    - খাবার কিনে নেব স্যর ? চাউ মিন? সামনে কৃষ্টাল বল আছে। চায়না হাট।থামবো? 


    - ভাত খাব।ভাত। ডাল দিয়ে মেখে।একটা ভাজা হলেই হবে। অসুবিধে হবে?


    শমিত মনে করার চেষ্টা করল।আজকে মাছের চচ্চড়ি হয়েছিল।কিছুটা থাকার কথা। স্যারের কী হয়েছে? বৌদির এভাবে চলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। রীণা সম্পর্কে শমিতের একটা আবছা ধারণা আছে। যদিও রীণাকে নিয়ে বেরোলে ত্রিদিব ওলা বা উবের করতেন, তবু শমিত কয়েকবার গেছে বৈকি। 


    শমিতের বাড়ির সিমেন্টের বারান্দার চৌকিতে গোল হয়ে বসে ভাত দিয়ে মুসুরির ডাল মেখে খেলেন ত্রিদিব। ছোটমাছের চচ্চড়ি। ত্রিদিবের জন্য স্পেশ্যাল ডিমভাজা। শমিতের বউ নীতা দিব্যি রেঁধেছে। বেশ হাসিখুশি। ছেলের অসুখটা মেনে নিয়েছে বোধহয়। নাকী মুখটাই ওরকম হাসিহাসি? শমিতের ছেলে ঘরে শুয়ে।জ্বর আছে।তার পাশে বসে আছে শমিতের মা । ত্রিদিবের মনে হল এখানেই শুয়ে যেতে পারলে যেন ভালো ছিল। কিন্ত সেটা হবে না। হয় না।একটু পরে বিশ্রী লাগবে।গন্ধ সহ্য হবে না।আরো অনেক কিছু।


    - আমি নিজে ড্রাইভ করে চলে যাবো শমিত। তোমাকে আর যেতে হবে না আজ। চাবিটা দাও।


    হস্টেলের ফ্ল্যাট খুব ছিমছাম।মালবিকার মনের মত সাজ। ইক্কতের পর্দা। দেওয়ালে অমৃতা শেরগিলের ছবির প্রিন্ট । নরম আলো জ্বালিয়ে ফোন হাতে নিলেন মালবিকা।জনৈক নেতা বলেছেন , ভোটে জিতে গেলে পশ্চিমবঙ্গকে মির্জাপুর বানাবেন। মির্জাপুর ওয়েব সিরিজটা দেখে ফেলতে হবে।পঙ্কজ ত্রিপাঠি নাকি দারুণ অভিনয় করেছেন।কুলভূষণ খারবান্দা। সিরিজ ডাউনলোড করতে দিয়ে জল খাচ্ছিলেন মালবিকা। ফোন এল।মালবিকা গ্লাস নামিয়ে দেখলেন, ত্রিদিব।


    ছাব্বিশ
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৮৪৯ বার পঠিত | ৩ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
নীল  - Jeet Bhattachariya
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন