• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • নিউ নর্মাল

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৪৭২ বার পঠিত | ৩ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • 20092

    শুকদেব দহলজি আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছেন। পরপর লিস্ট করে রেখেছেন কাজগুলোর। বয়স হয়েছে। প্রায়ই ভুলে যান কাজের তালিকা। কিন্ত গতিবিধি নজরে রাখতে হয়। নাহলে খুব মুশকিল। আচমকা লকডাউন হয়ে যাওয়ার ফলে এইবছর আকাদেমির সব অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেছে।কিছু ভার্চুয়াল রাখা হয়েছে।কিন্ত ভার্চুয়ালে নাচ, গান ও নাটকের কিছুই নির্যাস পাওয়া যায় না। শুকদেব খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন আকাদেমির পরবর্তী কাজ নিয়ে। আনলক শুরু হলেও ইনফেকশন কিছুমাত্র কমে নি। কাজেই অডিটোরিয়াম খুলে অনুষ্ঠান করা এখন সম্ভব না। বুদ্ধিমানের কাজও নয়।
    মেথি ভেজানো জল পান করে , গার্গল করলেন শুকদেব। একটা বড় তামার গ্লাসে তাঁর গরমজল রাখা থাকে। গতরাতে খবর পেয়েছেন আকাদেমির সেক্রেটারি দয়ানন্দ কোলের কোভিড পজিটিভ ধরা পড়েছে।তিনি হসপিটালাইজড। সুগার আছে। দয়ানন্দ ও শুকদেব পুরোনো বন্ধু। যতটা পুরোনো হলে গাছের পাতার মত দেখায়। দূর থেকে একগোত্র। খুব কাছে গিয়ে ঠাহর করে দেখলে পাতার শিরা উপশিরাতে সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যায়। এখন আর শুকদেব মর্ণিং ওয়াকে যাননি। দিল্লি এখন খুব ভয়াবহ হয়ে আছে।দূষণ ও করোনা মিলিয়ে এক অদ্ভুত আতংক। কিন্ত আজ শুকদেব একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। গত তিনদিন আগে মারা গেছেন তাঁর প্রিয় অভিনেতা এবং বন্ধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শুটিং করতে গিয়ে করোনা হয়েছিল। মাসখানেকের যুদ্ধ। চলে গেলেন সত্যজিতের নায়ক। শুকদেব একটি শোকসভা আয়োজন করতে চান আকাদেমির পক্ষ থেকে। চান না বলে বলা উচিত এটা অবশ্য করা দরকার। তাঁদের আকাদেমি সৌমিত্রবাবুকে বছর তিনেক আগে সম্মানিত করেছিল।সেই আয়োজন ভার্চুয়াল না হয়ে একটি ছোট সমাবেশ হোক।দয়ানন্দ হসপিটালাইজড। সেইজন্য শুকদেব সুনন্দিতাকে ফোন করছেন।সুনন্দিতা মেহতা আকাদেমির ডানহাত। তাঁর সঙ্গেই কিছু আলোচনা করা দরকার।পেয়ালা পিরিচে চা দিয়ে গেলেন কোমল। শুকদেব মগে চা বা কফি পানে স্বচ্ছন্দ নন। সবুজ কাপ।সোনালী বর্ডার। সুনন্দিতা একবারেই ফোন ধরলেন। আজ বড্ড ব্যস্ত তিনি। অবশ্যই শুকদেব যেভাবে অ্যারেন্জ করতে বলবেন , তাই করবেন। আজকের দিনটা মাফি চেয়ে নিলেন তিনি। অনুষ্ঠান হবে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুনন্দিতার ভীষণ প্রিয় অভিনেতা। উত্তমকুমার অধিক তিনি সৌমিত্রভক্ত। ভীষণ শক্ড হয়ে আছেন। একটি শ্রদ্ধা অনুষ্ঠান করতেই হবে যত্ন করে। কিন্ত আজ, আজ বড় ব্যস্ত আছেন তিনি । বাস, আজকে দিন মাফ কিজিয়ে শুকদেভছি। কাল ম্যয় সব কর লুঙ্গি।

    হালকা শীত পড়ছে ভোরের দিকে।গায়ে হাউসকোটের ওপর একটা ধূসর চাদর জড়িয়ে নিয়েছেন সুনন্দিতা। নিজের জন্য এক কাপ চা, একটা টোস্ট সাজিয়ে বসেছেন বড় জানালার পাশে। এখানে বসলে কিছুটা রাস্তা দেখা যায়।পাঞ্জাবীবাগের এই বাড়িতে কিছুটা সামনের বাগান।বাগান বলতে ঠিক মাটি, বড় গাছের বিস্তৃত , বিস্তীর্ণ বাগান নয়। একফালি লন। লনের দুধারে টব। এইসময়ে সিজন ফ্লাওয়ারে ভর্তি।প্রচুর গাঁদা।হলুদ গাঁদা।কমলা গাঁদা। গোলাপ দু তিনটে। ক্রিসমথিমাম। সাদা ও হলুদ। ডালিয়া। প্যিটুনিয়া আছে প্রচুর। ক্যাকটাই।
    সুনন্দিতা চায়ের কাপে চুমুক দেবার আগে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন। প্রায় ধ্যানমগ্ন। এটা তাঁর অভ্যেস। চা ঠান্ডা হতে থাকে । সকাল থেকে অনেকগুলো কাজ করেছেন তিনি। লকডাউন বা আনলক , যখন যাই হোক না কেন , তাঁর বরাবরের কিছু অভ্যেস আছে।কিছু কাজ।লকডাউনের পর বাঈ আসতো না। ইদানীং সে আবার আসতে শুরু করেছে।তবু জানালা দরজাগুলো তিনি নিজে মোছেন। পারিবারিক মন্দির মানে ঠাকুরঘর আছে একটি।সেটিও। বিছানাপত্র সব ঝাঁট দিয়ে সাফ করে বালিশ পাশবালিশ খাটগুলোর বক্সে চালান করে দেন । চাদর পাটপাট করে টেনে , গুঁজে, ছাড়া জামাকাপড় গরম জলে চুবিয়ে দেন নিজের হাতে। ওয়াশিং মেশিন চালিয়ে রান্নাঘরে ঢোকেন চায়ের পাট নিয়ে। একমাত্র আম্মাজী 'র বিছানা তোলা হয়না সকালে।কারণ আম্মাজী দেরি করে ওঠেন। সকালের দুধ চা এবং চারটি বিস্কিট ট্রেতে করে তাঁকে দিয়ে আসেন সুনন্দিতা।
    আম্মাজী এখন বিরাশি। টুকটুকে ফর্সা গাত্রবর্ণ কিছুটা ম্লান ত্বক কুঁচকে যাবার দরুণ।কিন্তু চোখের নীলচে রঙ স্পষ্ট বোঝা যায়। চায়ের কাপ তোলার সময় আম্মাজী একবার চোখ তুলে সুনন্দিতার দিকে তাকিয়ে হাসেন। হাসিটা ঠিক কীসের সেটা সুনন্দিতা অনেক মাথা খাটিয়ে ভেবে বের করেছেন।এটা বিছানা চা পেয়ে খুশির হাসি নয়। এই বৃদ্ধ বয়সে পুত্রবধূ নিজের হাতে চা করে এনে দিচ্ছে , তার জন্য কৃতজ্ঞ হাসিও নয়। প্রাতঃকালীন সুপ্রভাত মার্কা হাসিও না। এ হল অ্যাপ্রুভালের হাসি। আই হ্যাভ অ্যাক্সেপ্টেড ইউ ইন মাই হিউসহোল্ড। সো ইট ইজ ইওর ডিউটি টু সার্ভ মি। ইউ ডু ইট ওয়েল। সো আই অ্যাম প্লিজড।

    বিবাহের পঁচিশ বছর পরেও , দুটি সন্তানের জননী সুনন্দিতা মেহতা, বিবাহপূর্বে সুনন্দিতা বাগচি, আদিনিবাস পশ্চিমবঙ্গ, দীনহাটা তাঁর শাশুড়িমাতার কাছে এই অ্যাক্সেপ্টেড স্টেটাস পেতে পেতে অভ্যস্ত হতে থাকেন। যদিও, আমেলিয়া মেহতা, বয়স বিরাশি, আদিনিবাস  অংশত ফরাসিদেশ এখন একেবারেই বিছানাগত, তবু তাঁর একটি অদৃশ্য প্রভুত্ব আছে সারা বাড়ির ওপর । সুনন্দিতা সেটিকে ক্ষুণ্ণ করতে চান না এবং সযত্নে পাশ কাটিয়ে যান প্রথম থেকেই। আমেলিয়া মেহতা ভাবেন যে তিনিই কর্তৃত্ব করছেন যদিও সেটা নিছক ভাবনামাত্র, তাতে সুনন্দিতার কোনো কাজে কোনো অসুবিধে হয় না। অতএব তিনি এই সামান্য ব্যাপার মেনে নেন। ছোটবেলা থেকেই সুনন্দিতার মনে তাঁর মা ঢুকিয়ে দিয়েছেন বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ছোট খাটো ব্যাপার মেনে নিতে হয়।
    সকালে চার রকম চা হয়। আমেলিয়া মেহতা অল্প চিনি দিয়ে অনেকটা দুধ দিয়ে চা খাবেন।কী করে এই আর্মানি মহিলা পাঞ্জাবী চা খাওয়ার ধরণ আয়ত্তে এনেছেন , সেটা আলোচনার বিষয় হতে পারে। পরমজিত মেহতা খাবেন কড়া চা।সিটিসি। সর ভাসবে দুধের। ছেলে সুমন লিকর চা খাবে। মেয়ে নিকি চা খায় না। তার জন্য এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানান সুনন্দিতা। তাঁর নিজের সেকেন্ড ফ্ল্যাশ।সেটি পরে প্রস্তুত করবেন।আয়েশ করে খাবেন একাই । চারটি ঘরে চাররকম প্রাতঃকালীন চা কফি সার্ভ করবেন মালকিন। নিজে হাতে। এটাই এই বাড়ির ট্র্যাডিশন। দ্য ফ্যামিলি অব ভানু প্রতাপ মেহতা। আদিনিবাস লাহোর। পাকিস্তান।

    নতুন দিল্লির এই বাড়িতে বারান্দা দিয়ে ঢুকে একটি প্রশস্ত লম্বাটে হল। ডাইনিং কাম ড্রয়িং। একদিকে বড় ভারী কাঠের সোফা। কালোর ওপর ছোট ছোট সাদা, হলুদ, লাল ফুলের আপহোলস্ট্রি। এই থ্রি সিটার ও দুটি সিংগল সিটার আমেলিয়ার পছন্দের কেনা আসবাব। সেন্টার টেবিলটিও অনুরূপ ভারী কাঠের। তাই বিপ্রতীপে সুনন্দিতা একটি বেতের সোফা সেট রেখেছেন। তাঁদের এই হলে মাঝেমধ্যেই প্রচুর জমায়েত হয়। ফলে একটি নিচু ডিভানও আছে। লকডাউনে সুনন্দিতার সহস্তে প্রস্তুত এমব্রয়ডারি করা উজ্জ্বল লাল কুশনকাভারে সেটি সুসজ্জিত। ডাইনিং টেবলটি গোল। ছ'জনের বসার ব্যবস্থা।সুনন্দিতা সকালেই একবার নিজের হাতে কলিন্স দিয়ে টেবল মুছে , মাঝখানে সসের বোতলসমূহ, চামচকাঁটা হোল্ডার ইত্যাদি গুছিয়ে রাখেন।এইসময় তাঁর নিটোল নখপালিশ পরা হাতে একটি হীরকখন্ড দ্যুতি বিচ্ছুরণ করে। গলায় একটি চেইন ও এক হাতে একটি মোটা সোনার বালা। হাউসকোটের ফিতে বাঁধা টাইট করে।
    সুনন্দিতা প্রথমে আমেলিয়াকে চা দিতে যান। গিয়ে দেখেন শাশুড়ি বিছানাতে উঠে বসে আছেন। একটি নীল রাতপোশাকে তাঁকে বড় কৃশ দেখায়। বিছানার চাদর কুঁচকে এলোমেলো হয়ে আছে। সুনন্দিতা দুচোখে দেখতে পারেন না এই নোংরা বিছানা। সম্ভবত আমেলিয়াও পারতেন না, যখন স্বাস্থ্য অটুট ছিল।কিন্ত জরা ও বার্ধক্যের কাছে সবকিছুই হেরে যায়।তাই ডায়াপার পরিহিত আমেলিয়া মেহতা কোনোমতে ছেঁচড়ে উঠে বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকেন । তাঁর ডায়াপার পাল্টানো এবং বাথরুমে নিয়ে গিয়ে কমোডে বসানোর জন্য একজন আয়া তো আছেন কিন্ত লকডাউনের পর থেকে তাঁকে আর আসতে দেওয়া হয়নি।কাজেই আমেলিয়াকে খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামানো, ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে ডায়াপার খুলে ফেলে দেওয়া , কমোডে বসানো এবং তারপর শৌচকর্মে সাহায্য করে, রাতপোশাক পাল্টিয়ে , নতুন গাউন পরানো , কারণ আমেলিয়া কখনোই রাত ছাড়া রাতপোশাক পরবেন না, কোভিড অর নো কোভিড, নতুন ডায়াপার বাঁধা , এইসব কাজ সুনন্দিতা করেন। জল দিয়ে ধৌত করেন আমেলিয়ার ধবধবে ফর্সা কোমর , পশ্চাদ্দেশ, জানু, জংঘা, উরুসন্ধি। এতে তাঁর কোনো ঘেন্না বা ছুঁচিবাই নেই । যত্ন করে মুছিয়ে দেন। এসমস্তই আমেলিয়া খুব নির্বিকার ভাবে গ্রহণ করেন ।বরং আয়ার সঙ্গেই একটু বেশি বিগলিত থাকতেন।বিছানায় বসে চা য়ের কাপ হাতে নিয়ে হাসিটিও অনুগ্রহের। গলায় ন্যাপকিন গুঁজে দেন আমেলিয়া। কোভিডের ভয়ে কোনো আয়া রাখা যাচ্ছে না । কিন্ত সুনন্দিতা বুঝতে পারছেন যে তাঁর ওপর চাপ পড়ে যাচ্ছে।
    এরপর পরমপ্রতাপের ঘরে চা । পরমজিত পেশায় একজন বিল্ডার। দিল্লির নামকরা বিল্ডারদের মধ্যে একজন পরম প্রতাপ মেহতা। যদিও তাঁর পারিবারিক পেশা কৃষিকাজ এবং পঞ্জাবে এখনো তাঁর কৃষিজমি ও ফার্মহাউস আছে, পরম তাঁর পৈত্রিক পেশা থেকে দূরেই আছেন।তাঁর অধীনে প্রায় তিরিশজন আর্কিটেক্ট কাজ করেন। আনলকের সময় পিছিয়ে পড়া কাজ তাঁরা যতটা পারেন দ্রুত করার চেষ্টা করছেন।
    পরম যোগব্যায়াম সেরে গরমজল পান করেছেন। ঢকঢক করে নয়। খুব ধীরে ধীরে গরমজল শরীরে গ্রহণ করেছেন তিনি। চায়ের প্রত্যাশাতে বসে আছেন। সুনন্দিতা এসে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিতেই পরম প্রতাপ জানালেন আজ তাঁকে জলদি বেরোতে হবে। একটি জরুরি মিটিং আছে তাঁদের গোষ্ঠির।
    পরম প্রতাপ মেহতা আদতে অরোরা। মেহতা তাঁদের গোষ্ঠীনাম। সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে তাঁর পিতৃদেব প্রতাপ ভানু মেহতা পাঞ্জাবে চলে আসেন, হাজার হাজার পাঞ্জাবির মত, মাত্র তিন কাপড়ে। এঁরা সবাই দাঙ্গার বলি। প্রত্যেকে তাঁদের মা, বাপ, ভাই, বোন কাউকে না কাউকে খুন হতে, ধর্ষিত হতে দেখেছেন।প্রতাপ ভানু লাহোরেও কৃষকপরিবারের ছেলে ছিলেন।পঞ্জাবের লোধি গ্রামে ডেরা বাঁধলেন।পনেরোর পাঞ্জাবি বালকের প্রচুর দম। প্রাণপণ খেটে চাষ করে সংসার দাঁড় করালেন ভানু ।একুশের যুবক ভানুপ্রতাপ স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায় আলু বুনলেন।কিন্ত শুধু চাষ আবাদ না।ব্যবসা করতে হবে।খেতিবাড়ির সঙ্গেই অর্থাগম হয়েছে। ভাইদের হাতে খেতিবাড়ির ভার দিয়ে প্রতাপ ভানু শেফ হয়ে চলে গেলেন বিলেতে। বছর চারেক সেখানে থেকে আমেলিয়া আরশাকুনিকে বিবাহ করার পর উনিশশো বাহান্নতে জন্ম হল তাঁর প্রথম পুত্র জয়ন্ত প্রতাপের।ভারতে ফিরে আসার পর জন্ম মেজছেলে সুভাষ প্রতাপের। দুবছর পরে । আর ছোটছেলে আরো পরমজিত চারবছর পর জন্মায় । আর বেশকিছুদিন আলু চাষ করার পর প্রতাপভানুর মেজ ছেলে সুভাষ প্রতাপমেহতা জর্জিয়া চলে গেছিলেন । ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে জর্জিয়া পৃথিবীতে সতেরো নম্বর। প্রচুর সুবিধার কথা শুনেই একটি ভ্যালিড পাসপোর্ট নিয়ে সুভাষ মেহতা জর্জিয়া পাড়ি দেন।সত্যি সেখানে অনেক সুবিধা। কোম্পানি এক একজনকে প্রায় একশো রকম ব্যবসা করার ছাড় দেয়।কৃষিজমির অসামান্য সুলভ দাম। এক একর জমি ষাঠহাজার থেকে একলাখের মধ্যে। সুভাষ মেহতা হাতে স্বর্গ পেলেন।ব্যবসা করবেন জমিয়ে, এইরকম ইচ্ছে।
    কিন্ত অচিরেই ফাঁকি ধরা পড়ল। কিছু মেডিক্যাল ছাত্র এজেন্ট বনে গিয়ে জমি বিক্রি করছিল জর্জিয়াতে। সুভাষ এবং তাঁর সঙ্গে আরো যে পাঞ্জাবী কৃষকরা জর্জিয়া গেছিলেন ব্যবসা বাড়ানোর লোভে, তাঁরা দেখলেন যে জমি কিনেছেন তা উর্বর তো নয় বটেই, জমি থেকে একটা তেল বার হয় ট্র্যাক্টর চালনার ফলে।এই তেলটা ফসলের জন্য বিষাক্ত। সময়ে সব খুঁত ধরা পড়ে। সুভাষ দেখলেন জর্জিয়াতে প্রপার্টি ট্যাক্স অত্যন্ত বেশি। কমার্শিয়াল ইলেকট্রিসিটি অতি মূল্যবান। বীজের দাম আকাশছোঁয়া।সমস্ত যন্ত্রপাতি অগ্নিমূল্যে কো অপারেটিভ থেকে কিনতে হয়।তারপর বাজার নেই।গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বেড়াতে হয় ফসল।হার্বিসাইড, পেস্টিসাইড। ফার্টিলাইজার কিছুই উন্নতমানের নয়। শুধুমাত্র কমদামের জমি দিয়ে হবে কী! তারপর কার্তুলি ভাষা না জানলে ওখানে ব্যবসা করা যাবে না।দোভাষী লাগে। দু হাজার তেরো সালে জর্জিয়ান সরকার ভিসা রিনিউ করা বন্ধ করল।ওপেনডোর পলিসি রিভিউ হবে। ভারতীয়, চিনে, ইরানিয়ান, রাশিয়ান ব্যবসায়ীদের ভীড়ে জর্জিয়া তখন অস্থির। এইসব আঁচ করে সুভাষ মেহতা বহু আগেই ছোট ভাই পরম প্রতাপ আর ছেলে দীপকপ্রতাপকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরম ইউ এস এ থেকে জর্জিয়াতে না ফিরে সোজা দিল্লিতে এসে বিল্ডিং কন্স্ট্রাকশনের কাজ ধরেছেন উনিশশো নব্বই সাল থেকে। ছেলে দীপক প্রতাপ ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়িতে পাঞ্জাবে।বড়ভাই জয়ন্তপ্রতাপ লোধিতেই থাকেন। চাষ আবাদ ছেড়ে অন্য কোনদিকে যাননি তিনি বা তাঁর সন্তানরা । তেরো সালের পর সুভাষ প্রতাপ মেহতা ব্যবসা গুটিয়ে পরিবারসহ ফিরে আসেন। কিন্ত বেশিদিন পারিবারিক সুখ তাঁর সহ্য হল না। চোদ্দ সালে সুভাষ মারা গেলেন।কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।প্রতাপভানু চলে গেছেন আশি বছর পার করে।

    মেহতারা লড়াকু জাত। মহতী শব্দ থেকে মেহতা।ভানু প্রতাপ সগর্বে বলতেন।শূন্য থেকে গড়ে নিতে পারে প্রাসাদ।স্রিফ মেহনত চাহিয়ে। এইরকম একটি মেহনতি পরিবারে পরমপ্রতাপের স্ত্রী হয়ে বাঙালিনী সুনন্দিতা কিভাবে আসেন বা সুনন্দিতার শাশুড়ি মাতা আর্মানি সুন্দরী আমেলিয়া কীকরে ভানু প্রতাপ মেহতার সংসারে প্রণয়িনী ও ঘরণী হয়ে আসেন , সেইসব ব্যাখ্যান আছে। পুরোনো যে রূপোর কেটলি, মিনে করা , জানে। লস্যি খাবার ইয়া বড়বড় রূপোর গ্লাসেরা জানে। কিছুটা জানে বাড়ির সামনে বড় দেওদার গাছটি। বিশালাকৃতি সিন্দুকটি যা লাহোর থেকে কাঁধে করে এনেছিলেন তিনভাই, এবং যাকে সুনন্দিতার কন্যা নিকি একটি সেন্টারপিসে পরিণত করেছে, সেই প্রকান্ড সিন্দুকটি জানে। জানে আমেলিয়ার গয়নার বাক্সে ডালিম আকৃতির ট্র্যাডিশনাল লকেট যা কন্ঠহারটির ঠিক মাঝখানে রক্তাভ দ্যুতি বিস্তার করে।
    আপাতত সুমন , সুনন্দিতার পুত্র লিকর চা খেয়ে জিমে চলে গেল। সুনন্দিতা না করেছিলেন। তাঁর মনে হয় জিমের ম্যাট বা মেশিনে থিকথিক করছে ভাইরাস। এখন না যাওয়াই ভালো। কিন্ত সুমন খুব হেল্থ কনশাস। জিম পাগল ছেলে । শোনে না। আনলক শুরু হতেই সে জিমে যায়। নিকি কফি খেতে খেতে সুনন্দিতার সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসে। সাধারণত সুনন্দিতা নিকিকে কফি দিয়ে ওর কাছে আধঘন্টা বসেন।মা মেয়েতে জোর আড্ডা হয়। তারপর সুনন্দিতার নিজস্ব চা সময়।
    কিন্ত আজকে কিছুই হল না।কারণ পরমপ্রতাপ খুব ব্যস্ত। খুব তাড়াতাড়ি শুরু হবে একটা গন্ডগোল। সরকার কৃষি বিল এনেছে। খুব শিগগিরই একটা প্রতিবাদ ও ধর্ণা শুরু হবে কৃষকদের তরফে । সেই সংক্রান্ত একটি মিটিং হবে মেহতা সম্প্রদায়ের মধ্যে। অন্যরাও যোগ দেবেন।
    সুনন্দিতার হাতেও সময় কম। আপাতত সুমনকে তার নিজস্ব ঘর থেকে উৎখাত করতে হচ্ছে। তাকে চিলেকোঠার ঘরে শিফট করা হল। সব জিনিস আগেই তুলেছেন। আজ গুছিয়ে দেবেন। সুমন নিজেও খানিকটা গুছিয়েছে।ওর ঘরটা ঝেড়েঝুড়ে সাফ করেছেন দু' দিন ধরে। দেওয়ালে সাঁটা পোস্টার খুলে ফেলেছেন। সার্ফজল দিয়ে দেওয়াল ধুয়ে চকচকে । বিছানাপত্র নতুন। একটা ওয়ারড্রোব পুরো খালি করে রেখেছেন।যে থাকবে তার রুচি তো জানেন না, তাই একটা সাধারণ অফফ হোয়াইট চাদর পেতেছিলেন খাদির। কী, মনে হল , একটানে তুলে ফেললেন। মায়ের রুচি ছেলের রুচি যে একরকম হবে তেমন কোনো কথা নেই। একটা ঝকঝকে লাল বেডকাভার পাতলেন। সুনন্দিতা পর্দা, বেডকাভার এইসবে রঙের মাহাত্ম্য খুব মানেন। এই যে লকডাউনের সময় তাঁর সব প্রোগ্রাম বন্ধ, প্র্যাকটিস করছেন না মন দিয়ে , আটকে থাকছেন বাড়িতে, গ্রুপের কারু সঙ্গেই ভালো করে দেখা হচ্ছে না, ভার্চুয়াল মিট তো দুধের স্বাদ ঘোলে, এরপরেও নিজের মুড ঠিক রেখেছেন এটা কম বড় কথা নয়।সুনন্দিতা উচ্ছল প্রকৃতির। আবার কখনো কখনো বরফশীতল।নিজের মুডকে তিনি বিভিন্নভাবে কন্ট্রোল করে পরিস্থিতিকে দখলে আনতে পারেন।
    যে ছেলেটি এ ঘরে পিজি হয়ে থাকবে সে যদি লাল রঙে আপত্তি করে তখন দেখা যাবে। সুনন্দিতা অবশ্য বারবার বলেছেন , পিজি কেন? বন্ধুর ছেলে এমনি থাকবে। ছেলেটি কিছুতেই রাজি নয়। তার অসুবিধে হবে। অস্বস্তি লাগবে। সুনন্দিতা ঘরে কিছু কারনেশান রেখেছেন। কিছু গ্ল্যাডিওলাস। ব্রাইট কালারস চিয়ার আপ ইওর মাইন্ড।
    পরমজিত বেরিয়ে গেলেন গাড়ি নিয়ে। অফিসে পৌঁছে গাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। একটার সময় বেরোবেন সুনন্দিতা। তার আগে রান্না আছে।বাঈ আসতেই বলেছেন আমেলিয়ার ব্রেকফাস্ট আগেভাগে রেডি করতে। নিকির আর সুমনের জন্য একটা করে বড় প্যানকেক বানিয়ে ফেললেন।
    লাঞ্চের জন্য হাত খুলে জমিয়ে বাঙালি রান্না করলেন আজ।নিজে হাতে । পরমজিত বাঙালি খাদ্য খুব ভালোবাসেন। কিন্ত আমেলিয়া ছোঁবেন না। শি স্টিল মেইনটেইন্স হার কলোনিয়াল হ্যাবিটস অ্যান্ড প্রাইড। এক্সেপ্ট ফর দ্যাট টিপিক্যাল পাঞ্জাবি চা।
    দইরুই করেছেন। বাঙালি ছেলেটি নিশ্চয়ই পছন্দ করবে। এটা সুনন্দিতা মাছটা না ভেজেই করেন। বাটার চিকেন। ডাল।আলুভাজা। একটা পাঁচমিশেল সবজি রাখলেন। নিকি পুরো ভিগান। ওর জন্য ব্রকোলি, গাজর , টোম্যাটো দিয়ে একটা স্যালাড।

    স্নান সেরে একটা সবুজ হাঁটু পর্যন্ত কুর্তা পরেছেন । সাদা পালাজো। গাড়ি আসেনি এখনো। পরমকে ফোন করলেন । এয়ারপোর্ট যেতে দেরি করলে হবে না। ফ্লাইট দেড়টায় ল্যান্ড করবে। কিছুটা আগে পৌঁছে যাওয়া দরকার । সুনন্দিতা চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। আজ একটি ইম্পরট্যান্ট দিন।
    তাঁর ও পরমের বন্ধু মালবিকা ও ত্রিদিবের ছেলে দেবরূপ আসছে ফ্লাইটে। সুনন্দিতা খুব উদ্বেল হয়ে আছেন। 


    পর্ব দুই


    আমেলিয়া অনেকটা সময় শুয়ে থাকেন বটে কিন্তু তাঁর জ্ঞানবুদ্ধি বেশ টনটনে এই বিরাশিতেও। বাড়ির কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে, সবদিকে তাঁর পুরো খেয়াল থাকে।তিনি যে মালকিন সেটা একেবারে ভোলেন না।ভুলতেও দেন না । আমেলিয়া একটি বিশাল মেহগনি কাঠের খাটের মাঝখানে একটি পুতুলের মতো নিজেকে দেখছিলেন উল্টোদিকের ডিম্বাকৃতি বেলজিয়ান আয়নাতে। প্রবাদ আছে , বিছানার সামনে আয়না রাখতে হয় না। কিন্ত সেসব না মেনে আমেলিয়া নিজের বিছানার সামনেই মস্ত আয়নাটি টাঙিয়েছেন।তার চারদিকে গ্রিক পরি ও দেবশিশুদের কারুকাজ। যেহেতু বিছানা থেকে উঠে তিনি ড্রেসিং টেবলের সামনে গিয়ে বসতে পারেন না, তাই তাঁর ইচ্ছেঅনুযায়ী সুনন্দিতা, তাঁর পুত্রবধূ আয়নাটি খাটের সামনের দেওয়ালে ফিট করে দিয়েছেন। আমেলিয়ার খাটের দুপাশে দুটি সাইড টেবল। একটিতে তাঁর ওষুধপত্র। জলের গ্লাস। দুয়েকটা বই।চশমা। আরেকটি সাইড টেবলে তাঁর প্রসাধনের বাক্স।আমেলিয়া প্রসাধিত হতে ভালোবাসেন। তাঁর জন্য ত্বক এবং গাত্রের নানারকম ক্রিম ও লোশন সাজিয়ে রাখতে হয় সুনন্দিতাকে । তিনি নিজেও নিজের জন্য অতকিছু করেন না। কিন্ত আমেলিয়ার সবরকম প্রসাধনী ও সুগন্ধী চাই।নাহলে তিনি ছেলেমানুষের মত বায়না জুড়ে দেন।
    আমেলিয়ার বংশগৌরব নিয়ে একটা ব্যাপার ছিল বটে বরাবর।যখন তিনি ফুটফুটে নীলনয়না তরুণী ছিলেন তখন সেটি অত প্রকট ছিল না। বয়স ও সাংসারিক পদমর্যাদা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তিনি তত গরবিণী হয়েছেন। জেনোফেনন তাঁর সাইক্রোফেডিয়া কিতাবে ভারতবর্ষ ও আর্মেনিয়ার ব্যবসায়িক সম্পর্কর কথা লিখেছিলেন খৃষ্টপূর্ব শতকে। সেসব কথা একেবারেই বানানো নয়।বরাবর আর্মেনিয়ানরা ভারতে ব্যবসা করে এসেছে।মুঘল সাম্রাজ্যে তাদের বেশ রমারমা কারবার ছিল। সম্রাট আকবরের তো খোদ আর্মেনিয়ান বেগম ছিলেন মরিয়ম বেগম সাহিবা। সেইসময় থেকে আর্মানিরা ভারতে গভর্নর আর জেনারেলের পদ পেয়ে এসেছে।
    আমেলিয়ার মায়ের বংশ ভারতে প্রথমদিকের আর্মানি বংশ। সেই বংশের মানুষ থমাস ক্যানা মালাবার উপকূলে এসেছিলেন মশলা আর মাসলিনের ব্যবসা করতে। অটোম্যান আর সাফাবিদদের আক্রমণে বিধ্বস্ত আর্মানিরা তখন নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যবসার কাজে। ক্যানা পরিবারের বব গেলেন ফরাসিদেশে।সেখানেই সুগন্ধীর ব্যবসা শুরু করলেন। থমাস ক্যানার পরিবার মালাবারের শাসকদের কাছ থেকে তাম্রপত্র পেয়েছিলেন। তাতে লেখা আছে যে ক্যানার পরিবার বিশেষ বাণিজ্যিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সুযোগ সুবিধা পাবে বংশপরম্পরায়। ক্যানার পরিবার বড় হল। ছেলেরা মাসলিন ও মশলার সঙ্গে সঙ্গেই ধরে নিল বারুদের ব্যবসা। কানাজ থমা বা ব্যবসায়ী টমাসের বংশধররা ছড়িয়ে পড়ল মুম্বাই, আগ্রা, চিনসুরা, সম্রাট, কানপুর, কলকাতাতে। পর্তুগীজ আর ফরাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করছিল তারা। কেউ কেউ বব ক্যানার পরিবারের সঙ্গে যোগ দিল ফ্রান্সে ।এই ক্যানার পরিবারের এক মেয়ের সঙ্গেই বিবাহ হয়েছিল আগ্রার বারুদ ব্যবসায়ী জোনাথন আরশাকুনির। তাঁদের দ্বিতীয় কন্যা শ্রীমতী আমেলিয়া আরশাকুনি রূপোর চামচ মুখে করে জন্মেছিলেন। দেশভাগের পর তাঁদের কোনো অবস্থান্তর ঘটেনি। ব্রিটিশরা বরাবর আর্মেনিয়ানদের খাতির করে এসেছে।অর্থ ও প্রতিপত্তির কোনো অভাব ছিল না।সরকার অনেক সুবিধে দিয়েছে। জোনাথন তাঁর স্ত্রী ও আদরিণী কন্যাদুটিকে খুব ছোটবেলাতেই ফরাসিদেশে পাঠিয়েছিলেন তাঁর দাদার কাছে ফরাসি আদবকায়দাতে চোস্ত হবার জন্য। সেখানে হঠাৎই এক সুঠাম, সুদর্শন দীর্ঘকায় পাঞ্জাবী শেফকে দেখে আমেলিয়া দুম করে তাঁর প্রেমে পড়ে যান।নিয়মিত সেই রেস্তঁরাতে যাতায়াত শুরু হল। প্রতাপভানু নীল নয়না সুন্দরী দেখে অভ্যস্ত কিন্ত আমেলিয়ার মধ্যে প্রাচ্যের উচ্ছাসের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সফিস্টিকেশন। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরশাকুনিদের বহুযুগের কানেকশন। বাবা জোনাথন সেখানেই ব্যবসা করছেন। আমেলিয়া যে পরিবারে জন্মেছেন, তাতে ভারতীয় খানাতে তাঁর জিভ কিছুটা অভ্যস্ত। আর্মানি খাদ্যরুচি ভারতের অনেককিছু নিয়েছে । ফরাসি কান্ট্রিসাইডে সেদ্ধ আলু আর সেদ্ধ মাংস খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে তিনি জোর করেই একটি ভারতীয় রেস্তঁরাতে হানা দেন দিদি ক্যামিলাকে নিয়ে।
    প্রতাপভানু তখন ছাব্বিশের টগবগে যুবা। দীর্ঘকায়।উন্নতনাসা। পার্টিশন তাঁকে বিধ্বস্ত করতে পারেনি। লাহোর থেকে লোধি এসে নিজের হাতে খেতিবাড়ি করেছেন। ফ্রান্সে এসেছেন আরো রোজগারের স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্ন থাকল।কিন্তু আমেলিয়া সেটা খানিক পাল্টে দিলেন। আগুনবাড়ির মেয়ে আমেলিয়া বাপকা বেটি।জিদ্দি ও খামখেয়ালি। প্রতাপভানুকে বিয়ে করে আমেলিয়া ভারতে ফিরলেন। ততদিনে তাঁদের প্রথম সন্তান জয়ন্তপ্রতাপের জন্ম হয়ে গেছে। বাচ্চা নিয়ে আমেলিয়া ওদেশের ঠান্ডাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। আগ্রাতে পৈত্রিক বাড়িতে ফিরলে দুটো আয়া থাকবে হাতের কাছে।তাছাড়া পাঞ্জাবে যে বিপুল ভূসম্পত্তি তা তো কম বড় কথা নয়। তাই বা হাতছাড়া করা কেন? ইউজ ইট।
    সেইজন্য,কথায় কথায় আমেলিয়া প্রতাপভানুকে শোনাতেন, আই অ্যাম মোর ইন্ডিয়ান দ্যান ইউ। আমার দাদু আর ঠাকুরদার পরিবার মুঘল আমল থেকে ইন্ডিয়াতে আছে। ইউ আর আ লাহোরিয়ান। দুদিন হল ইন্ডিয়াতে এসেছো। ইউ কিপ শাট।

    এই কথাগুলো তিনি ছেলে , ছেলের বউ এবং নাতি নাতনিদেরও শুনিয়ে থাকেন। সবাই এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়।তবে আমেলিয়াকে নিয়ে , তাঁর বাতিক ইত্যাদি নিয়ে হাসাহাসি করার প্রচলনও এই বাড়িতে নেই। তাঁকে যথেষ্ট সিরিয়াসভাবেই নেয় সকলে । সকালবেলা তিনি বিছানাতেই ফোল্ডিং টেবলে বেড টি ও ব্রেকফাস্ট নেন। তারপর আবার একটা ছোটখাটো ঘুম। স্নান করিয়ে দিচ্ছেন এখন সুনন্দিতা নিজেই। হলে দুটি হুইলচেয়ার আছে। অবশ্য হুইলচেয়ার ব্যবহার করা আমেলিয়ার পছন্দের নয়।ছেলে বা বউ বা নাতি তাঁকে বিকেলের দিকে প্রশস্ত লিভিংরুমে বসিয়ে দেয়।সন্ধে পর্যন্ত আমেলিয়ার এখানেই অধিষ্ঠান।সাতটার মধ্যে তাঁর খাওয়া হয়ে যায় এখানেই। আটটা সাড়ে আটটার দিকে তিনি নিজের ঘরে চলে যান।
    এই বাড়িতে আর্মানি, পাঞ্জাবী এবং বাঙালী খানার একটা আশ্চর্য সংমিশ্রণ ঘটেছে। এমনিতেই দীর্ঘদিন ভারতে থাকার ফলে আর্মানিদের সাংস্কৃতিক এবং গ্যাস্ট্রোনোমিক বিবর্তন হয়েছে অনেক। তারপর সুনন্দিতার একটা খাঁটি বাঙালি ট্র্যাডিশন আছে। দীনহাটা- কোচবিহার- বিশ্বভারতী- দিল্লি মিলিয়ে তিনি একটি মেল্টিং পট। তদুপরি এই বাড়ির সেবিকাটিও বাঙালিনী। রান্নাবান্নাতে তাই অনেক মিশেল।এবং আমেলিয়া মেহতা সেটা অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। যা কিছু অ্যামালগেমাস তাই আমেলিয়ার পছন্দের। এবং সুনন্দিতারও। এইখানে শাশুড়ি বউয়ের একটা মিল আছে।এবং বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আমেলিয়ার গভীর শ্রদ্ধা ।টেগোর অ্যান্ড রবিশঙ্কর অ্যান্ড রে।
    বরং সুনন্দিতা যাঁকে এই পাঞ্জাবী বাগের বন্ধু বান্ধব সানি বলে ডাকে , তিনিই আর্মেনিয়ানদের সম্পর্কে অত কিছু জানেন না।তাঁর প্যাশন নাচ। যে নাচ তাঁকে দিনহাটা থেকে কোচবিহার এবং সেখান বিশ্বভারতী নিয়ে যায়। বিশ্বভারতীর হস্টেলে মালবিকা মন্ডল তাঁর রুমমেট ছিলেন। মালবিকা একবছরের সিনিয়র কিন্তু এই দুটি কন্যার নাচের জুড়ি খুব খ্যাতি পেয়েছিল। মালবিকা ত্রিদিবকে বিবাহ করে স্কুল ও ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।সুনন্দিতা চলে আসেন স্কলারশিপ নিয়ে দিল্লি। ত্রিদিবের বন্ধু পরমপ্রতাপের সঙ্গে এখানেই তাঁর পরিচয়।বিয়ের পরে নাচ একেবারেই ছাড়েননি সুনন্দিতা। ছেলেমেয়েদের জন্মের ফাঁকেও নাচ চালিয়ে গেছেন। আকাদেমির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অতিথি আসলে সুমনকে তার ঘর ছেড়ে দিতে হত না। কিন্ত পরমপ্রতাপ সুনন্দিতার নাচের স্কুলের জন্য তিনটি বড় ঘর ভেঙে একটি হল করে দিয়েছেন। সুনন্দিতা বাড়িতে নিয়মিত ক্লাস করান। গেস্ট রুম তৈরি হবে নতুন করে। হয়েই যেত এপ্রিলে। করোনার জন্য সব থেমে গেল।আপাতত সুমন বরসাতিতে শিফট হয়েছে। দিল্লির বাড়িতে বরসাতি থাকবেই আর বরসাতি খুব কমফর্টেবল। সুমনের কোনো অসুবিধে নেই। তার শরীরচর্চা ঠিক থাকলেই হল। ছাতেও সে ব্যায়াম করে জিম থেকে ফিরে।ছাতে একটি শেড করে সে জিমের সরঞ্জাম রাখে।

    আয়া। মানি। মানি মালদার মেয়ে। বরের সঙ্গে দিল্লি এসেছিল। বর কন্স্ট্রাকশনের কাজ করে। মানি আয়ার কাজ। লকডাউনের পর থেকে মানি আসছে না। মালদা ফিরে গেছিল। সুনন্দিতা ফোন করেছেন। কবে আসবি মানি? মানি বলতে পারছে না। আসবে না থেকে যাবে তাও ঠিক নেই। পরম অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন। গেট অ্যানাদার আয়া। কোই আউরকো রাখ লো।
    পরম বুঝতে পারছেন না যে ঝট করে নতুন আয়া রাখা যায় না।বিশেষ করে এই করোনাকালে।আমেলিয়ার যথেষ্ট প্যাখনা আছে।তিনি মুডি।মেজাজি এবং অসহায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নার্ভের সমস্যা বৃদ্ধি পায়।ইউরিন এসে যায় কাশলে।হাঁচলে। সঙ্গেসঙ্গে ডায়াপার চেঞ্জ না করলেই রেগে যান।
    মানি দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে সবকিছু জানে ।ধাঁচ বোঝে। যে কোনো আয়া দিয়ে হবে না।দু দিনে ছেড়ে চলে যাবে।
    নিকি গোল চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলে, মাম্মি অনলাইনমে দেখো। মেনশন অল ক্রাইটেরিয়াজ। ইনক্লুডিং গ্র্যানি'জ ট্যানট্রামজ।
    নিকি আমেলিয়াকে আম্মু বলে। কখনোসখনো গ্র্যানি। সুনন্দিতা ঠোঁট চেপে তাকান। এই বাড়িতে দুজনের জন্য আয়া দরকার হয়। একজনের জন্য বেশি। আর একজনের জন্যও, হয়তো কিছুটা কম।তবু দরকার হয়।
    পরমপ্রতাপের কাজের চাপ প্রচন্ড। সকালে বেরিয়ে একেবারে রাতে ফেরেন ইদানিং। খুব বড়সড় কিছু ঘটতে চলেছে । কাজ তো আছেই তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃষকদের দাবী দাওয়া। পরম নিজেই জড়িয়েছেন। পাঞ্জাব এখনো তাঁর খেতি।আসলি মুল্ক তাঁর পাঞ্জাব। তারপর দেবরূপ আসছে। মালবিকা বলেছেন সবকিছুই ফোনে বলেছেন সুনন্দিতাকে। এখন মানির ফিরে আসা দরকার মালদা থেকে।খুব দরকার।নাচের ক্লাস ভার্চুয়াল হচ্ছে।তাছাড়া দুটি তিনটি মেয়ে আসতে শুরু করেছে কাছাকাছি এলাকা থেকে।
    আমেলিয়া ও নিকির জন্য ভয়ে ভয়ে থাকেন সুনন্দিতা। একজনের বয়স।আরেকজনের অসুস্থতা।
    সাত বছর বয়সে মায়াস্থেনিয়া গ্রেভিস ধরা পড়ে। নিকির শরীরে মাসল ও নার্ভের কানেকশনস নেই।সবরকম চেষ্টা হয়েছে। এদেশে।বিদেশে। হাঁটতে পারে না।
    দুটো হুইলচেয়ারের একটা নিকির। সে এখন চব্বিশ। বয়েজ কাট চুল। সুনন্দিতাই করিয়ে দিয়েছেন। এই মেয়ের চুল মেইনটেইন করা খুব ঝামেলা।বিশেষ করে নিকির পক্ষে।যে নিজে দাঁড়াতে পারে না।
    খুব রোগা নিকি।এতটা ফর্সা যে শিরা দেখা যায়। হঠাৎ করে ওকে দেখলে কোনো কিশোর বলে ভ্রম হয়।ওর সব পড়াশোনা বাড়িতেই।ডিসট্যান্সে। নানা কিছু করে ল্যাপটপে।বলতে গেলে ল্যাপটপ সর্বস্ব জীবন ওর।

    মেহতা পরিবারে এই দু' জনের ওপর করোনাকাল তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। একজন আমেলিয়া। আরেকজন নিকি। এঁরা বাড়ির বাইরে যান কদাচিৎ। এবং গেলেও হুইলচেয়ার ছাড়া উপায় নেই।
    মানিকে এখন দরকার।খুব দরকার।
    আমেলিয়া ভুলেই গেছেন যে মানি বাড়িতে নেই।লকডাউনের পর থেকেই নেই। তিনি পাউডার খুঁজে পাচ্ছেন না।জোরে চিৎকার করতে পারেন না।তাও উঁচু গলায় ডাকছেন , মানি!,মানি কাম হিয়ার! 


    পর্ব তিন


    পরমপ্রতাপ তাঁর বড়দাদার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। এই মূহূর্তে তাঁর চার পাঁচটি কন্স্ট্রাকশনের কাজ একসঙ্গে চলছে। আর্কিটেক্টদের সঙ্গে পরপর মিটিং বসবে।টানা। লাঞ্চ করতেও সময় পাবেন কিনা ঠিক নেই। কিন্ত জয়ন্তপ্রতাপের ফোন আরো জরুরী। কৃষি আইনের বিরুদ্ধে জমায়েত শুরু হবে। তাঁরা দিল্লি আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরমের ওপর দায়িত্ব একটি চারপাতার পত্রিকা প্রকাশ করার। যাতে কৃষকদের বক্তব্য, তাঁদের দাবী এবং আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি সব পাওয়া যাবে। এইরকম কাজ পরম আগে কখনো করেননি। একটি টিম তৈরি করতে হবে প্রকাশনার। দুই ভাইতে এইসব কথাবার্তা হচ্ছে। টিমে দিল্লির লোকজন থাকবেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে কয়েকজন সিলেক্টেড মানুষ। জয়ন্ত বলছিলেন, দেশের বহু মানুষ এখনো কৃষি আইন সম্পর্কে কিছু জানেন না। এতে কী ক্ষতি কী লাভ কিছুই বোঝেন না। আমজনতা মলে গিয়ে বাজার করাকে মোক্ষ বলে জেনেছেন। পাইকারি বাজার মার খেলে কী হবে বুঝতেই পারছেন না। এরমধ্যেই সুনন্দিতা ফোন করে জানালেন গাড়ি পাঠিয়ে দিতে। পরম একেবারে ভুলে গেছিলেন। কিষাণকে ফোন করে এয়ারপোর্ট যেতে বলে পরম দিলীপকে ডাকলেন।দিলীপ মেরহোত্রার সঙ্গে প্রেসের যোগাযোগ ভালো। যে পত্রিকা প্রকাশ হবে, তার দাম বেশি হওয়া চলবে না। সাধারণ মানুষ যাতে পড়তে পারে। ঠিকঠাক সাংবাদিক চাই। বিজ্ঞাপন কম। তিনি নিজে দুটো দিয়ে দেবেন। বাকিটা দিলীপ সামলাতে পারবেন। ব্র্যান্ডকে প্রতিহত করা এবং আঘাত করা খুব সহজ কাজ নয়। মিডিয়া একেবারেই সঙ্গ দেবে না। কাজেই খুব ঠিকঠাক প্ল্যানিং চাই। আর্কিটেক্টদের সঙ্গে মিটিং শেষ করেই পরম এইদিকটা নিয়ে বসবেন। জয়ন্তপ্রতাপের ছোট মেয়ে নয়না ইউ এস এ তে পড়াশোনা করে আইন নিয়ে। সে ফিরে আসছে এই আন্দোলনে যোগ দিতে। প্রস্তুতি চলছে সাজো সাজো রবে। পরম নিজেও এক মুহূর্তের জন্য ভোলেন না যে এখনো তিনি মূলত একজন কৃষক। 


    সেক্রেটারি সুহাসিণীকে ডেকে বলে দিলেন মিটিং শুরু করতে বোর্ড রুমে। এখন যান্ত্রিকভাবে কাজ করে যেতে হবে। সামনে কঠিন লড়াই। 


    মেহতাদের একটা আলাদা গোষ্ঠি আছে। পশ্চিম গুজরাতে লেহানা আর সিন্ধি মেহতাদের থেকে তারা আলাদা। পাঞ্জাবের মেহতারা সবাই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অসম্ভব একতা তাঁদের মধ্যে। নয়না যে ফিরে আসছে শুধু আন্দোলনে যোগ দিতে সেজন্য গোটা অরোরা গোষ্ঠি খুশি। বারবার ফোন পাচ্ছেন পরম। প্রতাপ ভানু নিজে পনেরো বছর বয়স থেকে হাল টেনেছেন, ট্র্যাক্টর চালিয়েছেন জমিতে। জয়ন্ত বলছিলেন চাররকমভাবে প্রতিবাদ হবে।ঘেরাও।ধর্ণা। রাস্তা রোকো।তারপর ডেমন্স্ট্রেশন। পরম আজ ছেলের সঙ্গেও কথা বলবেন বাড়ি ফিরে।ইয়ং জেনারেশন শুড কাম আপ।নয়না ইজ ইন্সপিরেশন।এরা যদি এগিয়ে না আসে তাহলে কোনো কাজই ফলপ্রসূ হবে না।


    প্লেন ল্যান্ড করার সময় শরীর হাল্কা হয়ে যায়।ওর পেটে কীরকম অস্বস্তি হল। উইন্ডো সিটে ছিল। বাইরে তাকিয়েছিল একদৃষ্টে। বাইরে কিছু নেই।শূন্য । ছ' মাসের মধ্যেই জীবন এত পাল্টে যেতে পারে! এখনো যেন তার কিছু বিশ্বাস হয় না। প্লেন যেন পুনেতে নামল। আর একঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে তার ছোট ফ্ল্যাটে। কেউ নিশ্চয়ই সকালে পরিস্কার করে রেখেছে সব। এমনকী লাঞ্চ কিছু একটা করে রেখেছে হটপটে।একটা হলুদের ওপর খয়েরিছাপ লং স্কার্ট, প্রান্তভাগ দেখা দিল, নরম ঘুমের ও ঘামের গন্ধ। আবার সেই নিশ্চিন্ত নিভৃত দুপুর।কোথাও পায়রা ডাকছে বকবকম করে। 


    নিভৃত স্বেদগন্ধ মস্তিষ্ককোষকে বিব্রত করতে থাকে।


    ফ্লাইটে পায়রা কেন! পাশের ভদ্রলোকের রিং টোন।কতরকম রিং টোন যে আছে ! চোখ খুলে সব ধোঁয়াটে লাগছে ওর। সাদা, ফ্যাকাশে অন্ধকার। এয়ারপোর্টে নেমে সবকিছু কেমন অজানা লাগে। এখানে মুখ থেকে মাস্ক খোলাও যাবে না। এই মুহূর্তে সে খুব দুর্বল বোধ করছে মানসিক ভাবে।না।কোনোমতেই তার পক্ষে পুনে ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সবসময়ই ভেতরে একটা ভয় কাজ করছে।মানুষের সঙ্গ চাইছে সে। কথা বলবে না নিজে।বই পড়বে। নিজের মধ্যে ডুবে থাকবে।কিন্ত আশেপাশে মানুষ থাকবে কিছু। 


    বাড়িতে এটা সে বুঝেছে। পুনেতে কতদিন একা কাটিয়েছে। কিছু অসুবিধা ছিল না।এখন পারছে না।কলকাতার বাড়িতে হয়তো সব ছাড়াছাড়া।কিন্ত মানুষের উত্তাপ টের পাওয়া যেত।মালবিকা অধিকাংশ সময়েই নিচে।ল্যাপটপের সামনে। ত্রিদিব আসা যাওয়া করছেন। টুপুর এদিক ওদিক যাচ্ছে ।মাঝে মাঝে উপচে এসে কথা বলছে। সবচেয়ে ভাইব্র্যান্ট উপস্থিতি শ্যামার। জোরে, চিৎকার করে কথা বলে।বাবুদাদা, মাগুরমাছ খাবে? পেঁয়াজকলি, টোমাটুর দিয়ে করি? শ্যামা টোম্যাটোকে টোমাটুর বলবেই। আগে তো আলোকে আলা বলতো।নিজে থেকে এসে একটা প্লেটে দুধের সর দিয়ে যাবে। ওপরে পাটালি গুড়। মোটা কড়া সর বাবু ভালবাসে। কিন্ত এখন খাওয়া না। খেতে রুচি নেই। তবু শ্যামার এসে দিয়ে যাওয়াটা ওকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। টুপুর এসে গলা জড়িয়ে ধরছে।আগে এটা করতো না। ইদানিং অনেক পাল্টেছে। ঈশান এসেছে দু একদিন। ও যে খুব কথা বলেছে তা নয়। কিন্ত লোকজন থাকলে ভালো লাগছে। ও যেন উত্তাপ শুষে নিতে চাইছে দূর থেকে। 


    ঈশান বলেছিল, তুমি এখন কিছুদিন একা থেকো না। অ্যাটলিস্ট সারাউন্ডেড থেকো। তিনজনে বেরিয়েছিল ওরা । একটু বাইরের দিকে একটা মেঠো চায়ের দোকানে বসেছিল। নামি দামী কোনো রেস্তঁরাতে যেতে পারছে না ও।দম আটকে আসবে জানে। কথা বলছে না বিশেষ। কিন্ত অন্যেরা কথা বললে ভালো লাগে। মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল ওরা। পায়ের কাছে দুটো কুকুর ঘুরঘুর করছে।টুপুর ভেঙে ভেঙে বিস্কিট দিচ্ছিল। 


    অতুলরা কী স্ট্রে ফিডিং করছে এখনো? হয়তো করছে। ও ফোন করে না। ওরা কখনো করে। অতুল আর রাজেশ । ও জানতে চায় না। একটা বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা কালো কুকুর ছিল। দেখলেই এসে বসে ডানদিকে মাথাটা হেলিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। 


    ঐ দিনটা ভালো লেগেছিল। মাস্ক মুক্ত। খোলা হাওয়াতে। 


    ঈশান বলল, তুমি দিল্লিতে একা থেকো না। গো ফর পি জি অ্যাকোমোডেশন। 


    মাস্ক নামালো মুখ থেকে। সুনন্দিতাই মেসেজ করেছেন। যাস্ট শো ইওর ফেস।আই উইল রিকগনাইজ ইউ।


    এয়ারপোর্টে কেমন নীলচে আঁধার। দূর থেকে এক মহিলার হাতনাড়া দেখতে পেল ও। উনি মুখ মাস্কে ঢেকে রেখেছেন। গুগল মিটে এঁর সঙ্গেই আলাপিত করিয়ে দিয়েছেন মালবিকা। ইনিই তবে সুনন্দিতা মেহতা। ত্রিদিব মালবিকার বন্ধু। সেইসূত্রে পারিবারিক যোগাযোগ এতদিন বাদে।দিল্লি না এলে এঁর কথা কিছুই জানত না সে।মায়ের বন্ধুদের খবর কে রাখে।বাড়িতে যাঁরা আসেন তাঁদের দুচারজনকে চিনত। বাট সুনন্দিতা মেহতা ইজ টোট্যালি আননোওন। এঁর বাড়িতে কীভাবে থাকা যাবে ও জানে না। 


    বেশ লম্বা মহিলা।বাঙালি মেয়েরা এত লম্বা হয় কম। দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছেন ওর দিকে। কী বলবে ও।ভীষণ ঘুম পাচ্ছে?হোক মায়ের বন্ধু। একদম অচেনা এক মহিলা।গুগল মিটে সে প্রায় চুপ করেই বসেছিল।মালবিকা আর সুনন্দিতার কথা কানে ঢুকছিল না।কিন্ত এখন তো কথা বলতে হবে। ইদানীং কথা বলার একটা অনীহা তৈরি হয়েছে তার। এখন কী করবে? খুব অস্বস্তি হতে থাকে। সুনন্দিতা একদম কাছে চলে এসেছেন।ঝটিতি মাস্ক টেনে মুখ ঢেকে নিল সে।মাস্কে একটা সুবিধে। মনের ভাব, বিরক্তি, অনীহা সব ঢেকে ফেলা যায়। 


    সুনন্দিতা সামনে এসে একটু ঝুঁকে ওর কাঁধে হাত দিয়ে সামনে টেনে নিলেন।


    হাই দেবরূপ! মোস্ট ওয়েলকাম।


    বাড়িতে বেশ জাঁকালো দুপুর। আমেলিয়া মাঝেমাঝে কিঞ্চিত স্মৃতিভ্রংশ ব্যতীত যথেষ্ট সজাগ। অন্তত সেটা প্রদর্শন করেন। নিকিকে জিজ্ঞেস করছেন বারবার। হুজ দিস ইয়ং ম্যান কামিং ফ্রম ক্যালকাটা? 


    আমেলিয়ার কাছে এখনো ক্যালক্যাটা। কলকাতা নয়। নিকি ল্যাপটপে ম্যাপিং করতে করতে জবাব দিয়েছে, আই থিংক হি ইজ ফ্রম পুনে। মাম্মীসে পুছ লো। 


    সুনন্দিতার টিকি পাচ্ছেন না আমেলিয়া। ছেলেকে ফোন করলেন।


    - ক্যায় বাত? আর ইউ কামিং ফর লাঞ্চ? 


    পরম ফোন কেটেছেন দুবার। আমেলিয়ার গোঁসা হয়েছে। কে এই ছেলে তাঁর বাড়িতে থাকবে। অ্যান্ড হোয়াই পিজি? পরমের কী টাকার অভাব হয়েছে?মেহতা ফ্যামিলিতে পিজি! 


    - নিকি! তোমার বাবা কী আজ খুব বিজি? 


    নিকি ঘাড় নাড়ল। বাঈ আমেলিয়াকে লিভিংরুমের হাইচেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে। একটা হাইনেক সাদা আর পিংক ফ্লোরাল পোশাক পরেছেন তিনি পছন্দ করে। গলার কুন্চন ঢেকে যায় তাতে। গলায় একটি মুক্তোর ছড়া।


    - অ্যান্ড মে আই নো হোয়াট ইট ইজ অল অ্যাবাউট? 


    - পাপা বহোৎ বিজি হ্যায় আম্মু। উও ফারমার বিল লে কে মুভমেন্ট শুরু হোগা। 


    আমেলিয়া তাঁর সরু সরু আঙুলের মধ্যে আঙুল চালনা করছেন।


    - ইজ ইট রিলেটেড টু ল্যান্ড সিলিং বিল? 


    নিকি ঘাড় ফিরিয়ে আমেলিয়ার দিকে তাকাল গোল চশমার ফাঁকে। আম্মু অনেক পিছিয়ে গেছে। সেভেন্টি সিক্সের ল্যান্ড রিফর্ম বিল ভাবছে। শি ওয়জ ইয়ং অ্যান্ড অ্যাক্টিভ অ্যাট দ্যাট টাইম।সারপ্লাস জমি সরকার টেক আপ করেছিল মেহতা গ্রুপের । ডেমেনশিয়া ইজ টেকিং হার। 


    সারা রাস্তা ও চুপ করে ছিল। প্রাথমিক মাস্কবন্দী সম্ভাষণটুকু শুধু। মুখ থেকে আভরণ সরায়নি। সুনন্দিতা কী খুব ইম্পোজিং? কেমন টাওয়ার করে নিয়ে এলেন যেন। তাহলে মুশকিল হবে। ও নির্জনতা চায়।এবং সেই নির্জনতাকে ঘিরে নন ইন্টারফিয়ারিং মন্যুষ্যবৃত্ত। খুব কঠিন।


    সুনন্দিতা টুকটাক দুয়েকটা কথা বলেছেন। মালবিকা ত্রিদিবের খবর। লাঞ্চে ভাত খাবে কিনা। 


    গাড়ি পর্চে এসে দাঁড়াল। ও নেমে দাঁড়িয়েছিল। আইভিলতা। এবং গোল্ডেন শাওয়ার আচ্ছাদিত । মালবিকা যেন আছেন কোথাও। 


    সুনন্দিতা বললেন, এসো। কাম ইন। 


    ওর কোভিড নাইন্টিন নেগেটিভ টেস্ট রিপোর্ট সঙ্গে। আসার পাঁচদিন আগে করিয়েছে। ইফ করোনা রিপিটস! করোনা একবার হয়ে গেলেও সাবধানের মার নেই। 


    ঢুকেই থমকে গেল। হলটা প্রায়ান্ধকার। পর্দা টানা আছে।গাঢ় নীল রঙের ভারি পর্দা। কোণের দিকে


    হাইচেয়ারে একজন প্রাচীন রাণী বসে আছেন। সাদা চুল চুড়ো করে বাঁধা। নীল চোখ যেন ওর সবটা পড়তে চাইছে দোরগোড়াতেই। 


    আমেলিয়া বেশ জোরে বললেন, 


    সো ইউ আর ফ্রম ক্যালক্যাটা? হ্যাভ ইউ এভার মেট টেগোর?


    পর্ব চার


    মানি আর তার বর বিশু লকডাউনের প্রথম দিকেই মালদা ফিরেছিল।


    পায়ে হেঁটে ।তারপর বাসে।বাস নগদ তিন হাজার টাকা করে নিয়েছিল মাথা পিছু।মানি সুনন্দিতার পছন্দের মানুষ। তার পেছনে অনেক সূক্ষ্ম কারন এবং অকারণ আছে।মানি সেইসব কথা মনে করে দিল্লি ফিরতে চায়।বিশু চায় না।সেই নিয়ে মানিতে বিশুতে একটা মনকষাকষি চলছে। 


    ওরা যখন মালদাতে ফিরেছে তখন ঘোর লকডাউন। কলকাতা পর্যন্ত বাস।তারপর ট্রাক। লুকিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে নেমেছে মায়াবনের কাছে। তারপর হেঁটে সাহাপুর। সেও খুব কম দুর না। তিন নম্বর কলোনি দিয়ে মানির ভাষাতে শট কাট। ছাত থেকে লোক দেখেছে ওরা ঢুকছে। সবাই জানে লেবাররা ফিরছে। কেউ কিছু বলেনি। ওরা চুপচাপ নিজেদের ঘরে ঢুকে গেছে। মানির দুটো ছেলে। শাশুড়ির জিম্মাতে দুটোকে রেখে ওরা দিল্লি গেছিল। প্রথমে গেছিল বিশু। কন্স্ট্রাকশনের কাজেই গেছিল। একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল। বছরখানেক বাদে মানিকে বলল, চলে আয়। একা বড় অসুবিধে। ছেলেরা তখন একটা ফোর। একটা সিক্স। শাশুড়ির কাছে রেখে মানি চলে গেল। শাশুড়ি বড় জাঁদরেল। নাতিদের খুব চোখে চোখে রাখে। দু বাড়ির রান্নার কাজ। তারপর সারাদিন বাড়িতে। ছেলেদের নিয়ে মানির চিন্তা নেই। কিন্ত লকডাউনে শাশুড়ির কাজ গেছে। এখন সে বাড়িতে বসা। কাজের মানুষ বাড়িতে বসলে খিটখিটে হয়ে যায়। বিশু মায়ের কাছে আশি হাজার টাকা চেয়েছিল। টোটো কিনবে। শাশুড়ি ময়না বলেছে দেবে না। বিশু রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। ফোন বন্ধ করে রেখেছে।কোথায় গেছে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।


    এগুলো আসলে দখল করা জমি। নদীর তীরে। ফি বছর জল বাড়লে ঘরে জল ঢোকে। মানিরা জিনিসপত্র বাঁধা ছাঁদা করে ইস্কুল বাড়িতে ঢুকত। আবার জল নামলে জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরত। ইস্কুলবাড়িতে থাকা মন্দ না। সেখানে পাড়াশুদ্ধ ঝাঁপিয়ে উঠত। ভাব ভালবাসা, ঝগড়া, মারামারি মায় প্রেম বিয়েও হয়ে যায় বন্যাকালে। মানি অনেক দেখেছে। বিশুকে ঝাড়ি মারতে দেখেছে মুন্নাকে। একটু আধটুতে মানি কিছু বলে না। কড়া হাতে বিশুর রাশ ধরে থাকে। বিশু তখন মাছ ধরতো। 


    ময়নার দুই ব্যাটা। বড়টা যিশু। আগে বাস কনডাকটর ছিল। এখন টোটো চালায়। ভালোই রোজগার। এক ব্যাটা এক বেটি নিয়ে একবাড়িতে আলাদা খায়। বড়বউয়ের সঙ্গে ময়নার বনে না। দুজনে কথা নেই।কেউ কারু ধার ধারে না। ভাল কিছু রাঁধলে ময়না একটা বাটি ধরে বড় বউয়ের ঘরে দিয়ে আসে। ঘরে ঢোকে না। দরজা থেকে হাঁক পাড়ে। যিশু আর নাতনি নাতির জন্য রাখলাম। যিশু এসে বাটি নিয়ে যায়। বউ ময়নার দেওয়া বাড়ির বস্তু খায়ও না।কিছু বলেও না।তবে ময়না মাঝে মাঝে যিশুকে টাকা ধার দেয়।টোটো খারাপ হলে।পেট খারাপ হলে। ছেলের জ্বর হলে। সেটা নিয়ে বড়বউ কিছু বলে না। মা ছেলের ব্যাপার নিজেরা বুঝে নিক। তার নিজের রোজগার আছে। চার বাড়ির কাজ। লকডাউনের পর তিনটে গেছে। 


    ময়নার টাকা প্রায় পুরোটাই জমতো। তার নিজের খাওয়া কাজের বাড়িতে। সকালে চারটে হাতরুটি আর তরকারি হয়ে যায় ব্যাঙ্কের বাড়িতে। ওরা কত্তা গিন্নি দুজনে অফিস যায়। রান্না সেরে ময়না মেজ বাড়িতে ঢুকত। এরা আবার রিটায়ার করা লোক। ময়নার বয়সীই হবে। তবে ময়না মাসীমা বলে। এখানে রান্নার পরে দুপুরের খাওয়া ।ময়না কাজে ঢুকেই বলেছিল, রান্না খেয়ে দেখো।তারপর বোলো। কাজ করবো।কিন্ত খাওয়া দিতে হবে।নয়তো ময়নার কাজের অভাব নেই। 


    এরা খেতে দেয়।ভালোই দেয়।কারণ ময়না রাঁধে ভালো। বেগুন বাসন্তী হোক বা শিম বেগুন বড়ি দিয়ে চচ্চড়ি, পেঁয়াজকলি দিয়ে সামান্য আলু ছড়িয়ে কুঁচো চিংড়ি কিংবা ল্যাটা মাছের ঝুড়ি ভাজা, ময়নার হাতে খুলে যায়। তাই খেতে যখন দেবে , স্নানটাও করে যাই। এ বাড়িতে তো দেবা আর দেবী। দুজনেই চাকরি করতো।এখন বাড়ি বসা।তাদের ছেলেমেয়েরা দুরে দুরে। ছেলে ব্যাংগালোরে আর মেয়ে লন্ডনে।


    ময়না যখন স্নান করবে তখন তেল সাবান কী বাড়ি থেকে টেনে টেনে নিয়ে আসবে? কাজেই ধুঁধুলের খোসা আর লাক্স সাবান সহযোগে স্নান করে , কাপড় কেচে ছাতে মেলে ময়না আগের দিনের ছোলার ডাল কষে গরম করতো । আর দুটো কিশমিশ ফেলে। মাসী মেসো তখন খেয়ে দেয়ে ঘুম।নয় খবরের কাগজ।সেলাই।


    ময়নার ইচ্ছে হলে খোসাশুদ্ধ আলু ডুমো ডুমো করে কেটে ভেজে নিত, কালজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে। রান্নাঘরে ওরা আসে না। রাতের জন্য আটা মাখতে মাখতে রাসমণি আর সাঁঝের বাতি দেখা শেষ। তিনটের মধ্যে ময়না বাড়ি ফিরে যেত রাতের জন্য রুটি তরকারি টিফিন বাক্সে ভরে। নাতিরা ইস্কুল থেকে আসার আগেই।ছেলেদুটোকে রাতে ডিমের ঝোল ভাত দিলেই খুশি। নয় ডাল আলুভাজা। নাতিদের শাসনে রাখে ময়না। টুকটাক রান্না করতে শিখে গেছে দুটোই। ভাত ডাল মাছের ঝোল নামিয়ে দিতে পারে । ময়নার খরচ বলতে ইলেকট্রিক বিল। ছেলেদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে।আর কেবল টিভি। দুটো চ্যানেল। 


    ইচ্ছে করলে ময়না কী বিশুকে আশিহাজার দিতে পারতো না? দুবাড়ির তিন তিন ছহাজার টাকা তো ব্যাঙ্কে জমে প্রতিমাসে। 


    কিন্ত ময়না এককাট্টা মেয়েমানুষ। তার যেমন জেদ তেমন রাগ।ছোটছেলেকে মুখের ওপর বলে দিয়েছে, একপয়সা দেব না। তোর ছেলেদের দায়িত্ব নিয়েছি বুড়া বয়সে।আবার কী? দুজনে মিলে খাটিস দিল্লিতে। পয়সা জমাস নাই? 


    সত্যি কথা বলতে কী মানির একটু রাগ তো হয়েইছে। দিল্লি থেকে বিশু টাকা পাঠায় ছেলেদের জন্য শাশুড়ির অ্যাকাউন্টে। আর দেখাশোনা যা করে তা সব ঠাকমাই করে। তার ছেলেরা তো দুধের খোকা না।


    বড়ছেলেকে ময়না একটু টানে তার কারণ আছে। হাতের গোড়ায় তো বড়টা। আপদে বিপদে দেখবে শুনবে অন্তত। ফেলে তো দিতে পারবে না। তোরা তো টোনাটুনি কাকের বাসায় কোকিলের ছা রেখে দিল্লি উড়ে যাবি আবার মতলব হলেই। ময়না নামেই ময়না। ভালোমন্দ খেয়ে সে গায়েগতরে মন্দ না। বসলে উঠতে সময় লাগে। বড়বেটার বউ আড়ালে বলে খোদার খাসি। সামনে কিছু বলে না। ময়না তীক্ষ্ণ কন্ঠে চিল চিৎকার করতে পারে। 


    কিন্ত মানির সঙ্গে তো ময়নার সম্পর্ক ভালো। ঝাল করে কাকচী মাছের ঝোল আর পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে কড়কড়ে করে আলুউচ্ছে ভাজা দিয়ে ভাত রেঁধে দিয়েছিল মানি।এমনকী রাতের জন্য গরগরে করে হাঁসের ডিমের ঝোল। তবেই বিশু টোটোর টাকার কথা পেড়েছিল। হারামজাদী মুখের ওপর না বলে দিল। কেমন মা মাইরি। মানি ছাই আর মাটি দিয়ে পোড়া কড়াই থেকে হাঁসের ডিমের ঝোলের দাগ তুলছিল। বিশু মুখ গোমড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আর খোঁজ নেই।


    মানি একবার মুখ নরম করে শাশুড়ির কাছে বলেছিল, কোথায় গেল , ফোন তো বন্ধ। 


    কিন্ত কাজ ছাড়া মানুষের মেজাজ ভালো থাকে না। ঘরের পয়সা ভেঙে ময়নাকে খেতে হচ্ছে।দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিল, তোমার বর রেল লাইনে গলা দেবে না। দ্যাখো গে মামার বেটাদের সঙ্গে বসে নেশা করছে মঙ্গলবাড়িতে। 


    মা বটে একখানা। মানি ফোঁসফোঁস করতে করতে ভাবে।


    একবাড়িতে এতগুলো বেকার লোক থাকলে শান্তি থাকে না। যিশু লকডাউনের সময় টোটো চালাতে গিয়ে দুবার থানায় ঢুকেছিল। এখন আবার সাহাপুরের টোটো ব্রিজ পার হয়ে মালদায় চলতে দেয় না।সাহাপুরে আর কতই বা ভাড়া হয়।যিশু লুকিয়ে চুরিয়ে মালদাতে ট্রিপ মারে।ট্র্যাফিক পুলিশের সঙ্গে রফা আছে। 


    ঠিক বলেছিল ময়না। সন্ধের পর বিশু ফিরল। একগলা নেশা করে এসেছে। মানির গা পিত্তি জ্বলে গেল। 


    বিশু নেশা করলেই মানির মনে হয় এর থেকে দিল্লি ভালো ছিল।বিশু সকালে কাজে যেত। রাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরত। তার নিজের কাজ ছিল ছিমছাম। মেহতাদের বাড়িতে বুড়ি আম্মী আর নিকির দেখাশোনা করে। নিকি তাও অনেকটাই নিজে নিজেরটা করে।আম্মীর সব করে দিত মানি। রাতের বেলায় অন্য আয়া। খাওয়া দাওয়া সব মেহতা হাউসে। এখানে পাড়ার লোকে টোন কাটছে। কী রে দিল্লিওয়ালি? ফিরে এলি? খুব তো দেমাক দেখিয়ে দিল্লি গিয়েছিল? 


    মানি বলে না কিছু। এখন ফিরতে পারলে ভালো ছিল। কিন্ত বিশুর মাথায় ঢুকেছে এখানেই টোটো চালাবে। শাশুড়ি টাকা দেয়নি বলে মানি চটেছে ঠিক কিন্ত বিশুর মালদাতে পড়ে থাকাও তার পছন্দ না।


    মেহতা হাউসে থেকে মানির অনেক নতুন অভ্যেস হয়েছে। বুড়ির ডায়াপার পাল্টাতে হয়, হাগা মোতা সহ্য করতে হয়, এই যা ঝামেলা।তবে বুড়ি নিজে বড় পিটপিটে। একটু নোংরা সহ্য করতে পারে না।মেম বলে কথা।কী সুন্দর সব লেসের ভেতরের জামা প্যান্ট বুড়ির। মানি কয়েকটা সরিয়েছে। বুড়ি খুব খানকি। ঠিক জিজ্ঞেস করেছে, গোলাপিটা কোথায়? লেস বসানো সাদাটা? 


    কিন্ত সবসময়ই এসিতে থাকা। বসে থাকা।বিকেলে হুইলচেয়ার ঠেলে বাগানে। বাঈ চাট বানিয়ে দেয়। ছোলে। একটু হাগা মোতা পরিস্কারের বদলে এতকিছু। টাকাও ভালো। মোটমাট দিল্লিতে মানি সুখে ছিল।মাথার ওপর শাশুড়ির কচকচানি নেই।ছেলেদের দুরন্তপনা সামলাতে হয় না।বর ভালো কামাতো। নিজেও বেশ ছিল। করোনা হয়ে সব বারোটা বেজে গেল।


    মালদাতে লকডাউনের সময় করোনা রোগ ছড়ায়নি।লেবাররা যখন ঢুকতে শুরু করলো অলি গলি দিয়ে তখন লোকের ভয় ঢুকলো। মানি বিশু কেউই কোয়ারান্টাইনে থাকেনি।ময়না চুপচাপ ছিল।পাড়ার অনেক ছেলেরা তো ঐভাবে ফিরেছে। লেভেল ক্রসিংএ ট্রেন যখন দাঁড়ায় তখন নেমে গেছে।থাক না স্টেশনে যতখুশি পুলিশ পাহারা।প্রথম কদিন ঘরে চুপচাপ ছিল। তারপর আর রাখঢাক নেই।দেদার বেরোচ্ছে। যে যার মত। বিশু ঘরে ঢুকে বিছানায় পড়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে।মানি নদীতে গেল। জল অনেক কম এখন। বন্যার সময় এই নদী ফুলে ফেঁপে ওঠে। 


    সাহাপুর থেকে মালদা নৌকা পারাপার করে।নয়তো পায়ে হেঁটে বা টোটোতে ব্রিজ ধরে।লকডাউনের সময় নৌকা বন্ধ ছিল।


    জলে কচুরিপানা ভাসছে। ছেঁড়া কাপড়।ন্যাতাকানি। দুর্গার চালি।উপুড় হয়ে কাদাতে পড়ে আছে। মানি জলে নামতে নামতে আনমনা হয়ে যায়। দিল্লির জলে চুল ওঠে না।মালদার জলে আয়রন বেশি। বড্ড চুল ওঠে। হুপুশ হুপুশ করে মুখ ধোয় মানি কোমর জলে। কোমরের নিচ থেকে ব্যথা করলে তার আম্মী বুড়ির কথা মনে পড়ে। বড় দেমাকি বুড়ি। এককালে সুন্দরী ছিল।দেখে বোঝা যায়। বুড়ির একটা মস্ত সিন্দুক আছে। তালা মারা। সে নাকি সাহেবি আমলের সিন্দুক।বুড়ির বাপের বাড়ির। মানির খুব ইচ্ছে সিন্দুকে কী আছে দেখে। সোনা দানা না টাকা পয়সা? নাকী দামী পাথর , বুড়ি যেগুলো হাতে গলায় পরে? 


    একদিন দেখে ফেলেছিল মানি। দেখে হেসে বাঁচে না। নিকিকে দিয়ে সিন্দুক খুলিয়েছিল বুড়ি। মানি উঁকি দিয়ে দেখেছে। 


    সিন্দুক ভর্তি পুতুল। বড় বড় পুতুল। বার্বি না। ঐ কী বলে আর্মেনিয়া না কী।সেই দেশের পুতুল। রঙ চঙে। মানি এও দেখেছে বুড়ি পুতুলের সঙ্গে কথা বলে।একা একা।( দেখা হবে)


    পর্ব পাঁচ


    এরা সবাই হাতে তৈরি পুতুল।মেশিন থেকে বেরিয়ে আসা চাঁছাছোলা ফর্মূলা পুতুল না।এরা দিব্য আলাদা আলাদা। কাপড়, তার, তুলো, বাঁশ দিয়ে তৈরি আশ্চর্য সব রঙিন মানুষ এরা। আয়রন চেস্টটি যেন এক দুর্গবিশেষ। প্রায় চার প্রজন্ম ধরে ছিল জোনাথন আরশাকুর্নির সংসারে।আমেলিয়ার ডাউরি হয়ে মেহতা হাউসে এসেছে। লিভিংরুমে একটা সিন্দুক আছে ।যেটাকে নিকি একটা সেন্টার টেবল বানিয়েছে। কিন্তু সেটা আমেলিয়ার সিন্দুকের কাছে নস্যি। আমেলিয়ার সম্পত্তি ঐ হালের অ্যান্টিকের চেয়ে অনেক বেশি ভারি।অনেক বেশি মজবুত। অনেক কম চকচকে। তামা আর রূপোর পাতে জড়ানো।মাঝে মাঝে যেসব পাথর বসানো আছে সেসব পাথর আর হালআমলে পাওয়া যাবে না।


    আমেলিয়ার পুতুলদের বেশির ভাগের চুলের রঙ কুচকুচে কালো।সিল্কের মত নরম আর্টিফিশিয়াল চুল ব্যবহার করা হয় এই পুতুল গড়তে।তার দিয়ে আগে কাঠামো তৈরি হয়।তারপর তুলো ওঠে। তুলোর ওপর নরম সাদা কাপড়।তারপরেও আবার কাপড়। এই পুতুলগুলো একদম মানুষের মত দেখতে নয়।এরা পুতুলের মত দেখতে।মাথায় বিভিন্ন রকমের টুপি অথবা হেড স্কার্ফ।এবং এই কাপড় হ্যান্ডলুম। ঈষৎ খসখসে।কালো চুল গোলাপি ত্বকের এই পুতুলগুলোর চোখ নীল।ঠিক বুড়ি আম্মীর চোখের মতো।আলাদা করে নাক নেই।আঙুল নেই। কিন্ত বেশ বড় বড় পুতুল। ছেলে পুতুল ।মেয়ে পুতুল। রাজা রাণী বোঝা যায় না। সব রঙচঙে পোশাক পরা । 


    মানি ভারি লেসের পর্দার আড়াল থেকে দেখেছিল।দেখেছিল আমেলিয়া মেহতা , মাথার চুল ঝুঁটি করে ওপর দিকে বাঁধা , গলার সোনার চেইনটূকু ঝকঝক করছে, একটা করে পুতুল তুলছেন আর খিলখিল করে হাসছে।


    কী বলছে মানি কিছুই বুঝতে পারেনি। একটু একটু কানে আসছিল।বুড়ি দুলে দুলে হাসছিল কচি বাচ্চার মত, ওদিকে মেজাজ ষোলো আনা।


    -আরামাজা, আরামাজা, এই যে তোমার পাশে অনাহিত।কেমন লক্ষ্মী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে নাও।এই বাড়িতেই কিন্ত আরেকটা ভাহগান আছে। সেও মুগুর ভাজে। ব্যায়াম করে। তোমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়তে পারবে। শুধু তার তোমার মত গোঁফ নেই ভাহগান।সেইজন্য তুমি তাকে কিছুমাত্র কম মনে কোরো না ভাহগান। তোমাকে সে এক আছাড় দিতেই পারে, যদিও শেষমেষ তুমিই জিতবে আমি জানি।টির ! ও টির! কোথায় গেলে? সিন্দুকের নিচে ঢুকে বসে আছো নাকি হে? কোথায় গেল তোমার তেজ? তোমার নাকি ঢের ক্ষমতা? আরামাজা শাস্তি দিয়েছে তোমাকে বুঝি? 


    বলে একটা মস্ত টুপি পরা ছেলেপুতুল টেনে বের করেছিল বুড়ি।


    সিন্দুকটা এত বড় আর উঁচু যে খাটে বসেই তার নাগাল পাওয়া যায়।আমেলিয়ার খাটের পায়ের দিকে থাকে ঐ সিন্দুক।বুড়ির প্রাণের ধন। একটা চেন খুলে পরানো হল কোন পুতুলকে। 


    মানির দেখে চোখ ঝলসে যায়। 


    সিন্দুক খুলে দিয়ে নিকি তার হুইলচেয়ার নিয়ে সরে গেছে জানালার দিকে। কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে যেন পেছন করে।বুড়ি নিজের মনে বকবক করে যাচ্ছে পুতুলদের সঙ্গেই। 


    তুমি তো জানো আরামাজা! জমি কত প্রাণের ধন।কত কষ্ট করে, কত মেহনত করে ভানুজি জমি করেছিল। হোক লাহোরিয়ান, তবু হাল তো চালিয়েছে ইন্ডিয়ার মাটিতে। তার জমি সরকার নিয়ে নিল। এসব কী ঠিক হল আরামাজা! আহ্! কী ভালো লোক ছিল ভানুজি তুমি তো জানো! কী ভালো রান্না করতো। আমাকে স্পেশ্যাল সব ডিশেস রেঁধে খাওয়াতো। ছোলের কী খুশবু ! তেমনি কালি দাল। এখানে কেউ অমন রাঁধতে পারে না এরা।ছ্যা! ছ্যা! আরামাজা, তুমি কিন্তু ভানুজির জমি নিতে দিয়ে ঠিক করোনি। মেহতারা ফোকটে কোনো কিছু পায়নি।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা রোজগার করেছে। দিনরাত খেটেছে।পায়ের ওপর পা তুলে বাবুগিরি করতে দেখেছো তুমি ভানুজিকে? বা আমার ছেলেদের? ওরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও মেহনত করার স্বপ্ন দেখে। ওদের সঙ্গে এটা তুমি ঠিক করোনি।কী বলো অনাহিত? ভাহগান? এই যে শরীরের পরিশ্রম দিয়ে ছেলেরা ফসল ফলালো, মেয়েরা ট্র্যাক্টর চালানো, এর কী কোনো দাম নেই গো?


    বলতে বলতে বুড়ির দুচোখ জলে ভরে আসছিল।এই পর্যন্ত দেখে মানি সরে গেছিল পর্দার পাশ থেকে।নিকি বা ভাবিজি দেখে ফেললে গন্ডগোল। আড়াল থেকে লোকের কথা শোনা পছন্দ করেনা এরা। মানির আবার একটু সেই অভ্যেস আছে। দরজার পেছনে, পর্দার ফাঁকে একটু আড়াল আবডাল দেখে কথা শুনে নেয়।কে কী বলছে। একদিন ধরা পড়ে গেছিল ভাবির কাছে। সেইথেকে সাবধান থাকে।ভাবিজি পষ্টো বলে দিয়েছে, এয়সা হরকত মত করনা ইঁহা।বিলকুল নহি। 


    সে হোক। সেদিন আমেলিয়াকে পুতুলদের সঙ্গে বকবক করতে দেখে মানির মনে হয়েছিল এ যেন অবিকল তার দিদা । দিদা অবশ্য পুতুলদের সঙ্গে বকে না। সে বকে তার ঠাকুর দেবতার সঙ্গে। ঠাকুরের আসনের সামনে বসে সে কী আলাপ প্রলাপ। অবিকল যেন বুড়ি আম্মী। 


    এটা কী তুমি ঠিক করলা নারায়ণ? এই যে ছেলেটার পা ভেঙে রাখলা, জোয়ান বয়স, বিছানায় পড়ে থাকল, এখন কী তুমি দেখবা ওকে? চপের দোকানটা চলে কী করে বলো? সংসার টা তো চালাতে হবে আমার।ঠিক কীনা? আর এই যে মেজটা, মেজ নাতি, এত প্রাইভেট পড়ালো বাপ , পাশ দিল, চাকরির পরীক্ষা নাই , এও কী ঠিক , বলো? নাতিটা ইস্কুল মাস্টারি করতে চায়। তারজন্য আবার পরীক্ষা। আমাদের সময় তো এইসব ছিল না।এখন তুমি কী বিপাকে ফেলেছো বলো তো নারায়ণ? 


    বলতে বলতেই ঠাকুরের আসনের সামনে জল বাতাসা দিতে থাকে দিদা। ওপরে একটা করে তুলসীপাতা, আর বকে। 


    বুড়ি আম্মীর পুতুলগুলো কী ওর ঠাকুরদেবতা নাকী? তবে খেরেস্তানির তো ঠাকুরদেবতা নেই। বুড়ি কী খেরেস্তান না হিঁদু? আগে মানি ভাবতে পাঞ্জাবী মানেই শিখ। এখানে এসে তার একটু আধটু ধারণা পাল্টেছে।যদিও অনেকটা বোঝেনা তবু সাহাপুরের লোকের কাছে মানি দিল্লিওয়ালি। 


    দুগ্গা ঠাকুরের খড় আর উপুড় হওয়া আটচালা দেখতে দেখতে মানি ভাবে, বুড়ি আম্মীর পুতুলগুলো হয়তো তার ঠাকুরদেবতা হবে। ইংরেজিতে বা অন্য কোনো ভাষাতে বকে আম্মী। তাই কিছুই বোঝা যায় না। তবে মানি যখন নাইট ডিউটি করেছে মাঝে মাঝে , তখন দেখছে আম্মী রাতেও পুতুলদের সঙ্গে কথা বলে। আসলে বাড়িতে কার সঙ্গেই বা কথা বলবে বুড়ি। সব তো ব্যস্ত। তবে বাবা, সবাই বুড়ির খেয়াল রাখে খুব।বড়সাহেব রোজ সকালে মা' কে প্রণাম করে বেরোয় । ভাবিজি হাঁটু ছুঁয়ে যায়। করোনা হল তো আম্মীর জন্যেই বেশি চিন্তা। অত বয়স। রোগে ধরলে আর বাঁচবে না। 


    এদিকে দু একটা কাজের খোঁজ পাচ্ছে মানি। কিন্ত পছন্দ হচ্ছে না।একবার বেশি টাকার অভ্যেস হয়ে গেলে আর কম টাকায় পোষায়? মালদায় অত টাকার কাজ কোথায়? 


    বিকেলের দিকে দুই জা' তে গল্প হয়। শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে না বটে , কিন্ত বড় বউয়ের সঙ্গে ছোটর গালগল্প চলে।ময়না কান খাড়া করে থাকে। ফোয়ারামোড়ে এক ফুচকাওয়ালার করোনা হয়েছিল। লকডাউনের মধ্যেই ফুচকা নিয়ে বসেছিল লোকটা। আর লোকে খেয়েওছে নাকী। আর রোগ ছড়িয়েছে। 


    ময়না ঘরের মধ্যে টিভি দেখে আর লম্বা প্লাস্টিকের হাত পিঠে ঢুকিয়ে চুলকাতে চুলকাতে বলে, আজকাল সবাই বাড়িতে ফুচকা বানায় দেখি যে! 


    মনের ইচ্ছে ছেলের বউরা কেউ ফুচকা বানাক ।তাকে কয়েকখান দিক।বউরা কথা কানে নেয় না। দুজনে প্ল্যান করে।বিকেলে বাঁধে গিয়ে ফুচকা খাবে। ভুট্টা পোড়া। 


    ময়না সিরিয়ালের সাউন্ড কমিয়ে কান খাড়া করে শোনে।বলে, তোদের করুণা হবে না কার হবে ! 


    পুজোতে এবার বেরোতে পারেনি ময়না।বউদুটো ঠিক ঘুরে এসেছে ট্যাং ট্যাং করে ছানাপোনা নিয়ে। একবার তাকে বললোও না যেতে। পেটের ছেলেও বলে দিল, বয়স্ক মানুষের ডেন্জার বেশি। তোমাকে বেরোতে হবে না।বাড়ি বসে চ্যানেলের ঠাকুর দেখো। তারপর আবার হাত পাততে আসে! তবে পুজোর ভীড় এবার নাকি কম ছিল। অত পিলপিল করে লোক বেরোয়নি। তবে যারা বেরিয়েছিল তারা সাজগোজ করেছিল বলে মাস্ক পরেনি। রোগ তো ছড়াবেই। কাজের বাড়িগুলো ডাকছে না। বেতন দিয়েছে।তবে এইভাবে আর ক' দিন। শেষে না ছাড়িয়ে দেয়। বড় ছেলের বউকে যেমন। মুখের ওপর না বলে দিয়েছে।


    ময়নার মনে খুব ভয়। কাজটা না চলে যায় করুনার দয়াতে।ময়না করুনাই বলে। সারা বাড়ির সবার কাজ চলে গেলে কী হবে শেষে।বসে খেলে কুবেরের ধন ফুরিয়ে যায়। আর তার তো সামান্য কিছু পুঁজি। নিজের জন্য খুব চিন্তা ময়নার। টাকা ক' টা থাকলে তবু ছেলেরা কদর করবে। সবটুকু যদি এখনি ভেঙে খেতে হয় তবে মরার সময় মুখে জলটুকু পাবে ময়না? তার গলা শুকিয়ে ওঠে।( দেখা হবে)


    পর্ব পাঁচ 


    অনেকদিন বাদে আকাদেমির সামনে এসেছে টুপুর। খড়্গপুর থেকে ফেরার পথে নেমে পড়েছে একাই। টুকটুক করে নন্দন, রবীন্দ্রসদন, বাংলা আকাদেমির পাশ দিয়ে চারুকলা ভবন।চায়ের স্টলটা খোলেনি। ক্যান্টিন বন্ধ।
    বেশ ফাঁকা ঠেকছে। আকাদেমিতে দু চারটে নাটকের বিজ্ঞাপন পড়েছে।আগের সেই উপচে পড়া ভিড় নেই কাউন্টারের সামনে, চায়ের স্টলগুলোতে।অনেকগুলো খোলেন । ঝুটো গয়নার দোকানগুলো একটাও নেই। ফাঁকা রবীন্দ্রসদন চত্বর। টুপুর প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করলো। তারপর ধরাতে গিয়েও ধরালো না। আবার মাস্ক খুলতে হবে। টাইট করে বাঁধা আছে।ডিজপোজেবলের ওপরে একটা ডাবল লেয়ারের কাপড়ের মাস্ক। এই চত্বরে এত খাঁ খাঁ পরিবেশ মানায় না। খদ্দরের পাঞ্জাবি আর বেঢপ পাজামা পরা কাঁচা পাকা দাড়ি আর কাঁধে ঝোলা কবি বা নাট্যকার নেই।কপালে চাঁদের মত গোলটিপের নিচে ছোট্ট কালো আসরলরেখা, নাকে নাকছবি, কোমর পর্যন্ত খোলা চুলের মোহময়ী নারী নেই। ডেনিম ট্রাউজার আর চে গেভারার ছবি দেওয়া টি শার্ট, হাতে জুম লেন্স বাঁধা ক্যামেরাবাজ নেই।লিটল ম্যাগাজিনের ঝোলা নিয়ে কবিরা নেই।দঙ্গল দঙ্গল তাপ্পি দেওয়া জিনস ছেলেপুলে ঘুরঘুর করছে না।এর মধ্যেই মেরামতির কাজ চলছে।
    টুপুর সিগারেট ঢুকিয়ে রাখল।
    একটা লোক এগিয়ে আসছে ওর দিকে।ময়লা পোশাক।যদিও শার্ট প্যান্ট পরেছে।হাতে একটা ক্লিপবোর্ড। তাতে অনেক কাগজ।
    কোথায় যেন দেখেছে লোকটাকে টুপুর। হয়ত এই চত্বরেই বা অন্য কোথাও। মনে পড়ছে না।
    লোকটাকে একেবারে মুখের সামনে চলে এসেছে টুপুরের । এক মুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হলদেটে দাঁত বার করে হাসল।এইবার মনে পড়েছে। ইনি পোর্ট্রেট আঁকেন পাঁচ মিনিটে। অনেকেই আঁকায় এখানে। টুপুর পাশ কাটাতে গিয়েও পারল না।ধরে ফেলেছে লোকটা।
    - এই যে ম্যাডাম। একটা পোর্ট্রেট এঁকে দিচ্ছি। মাত্র দুশো টাকা। আঁকান না।আপনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনার ফোটোজেনিক ফেস। মাস্কটা খুলুন না ম্যাডাম। মাত্র তো দুশোটা টাকা। প্লিজ।
    টুপুর রেগে যেতে গিয়েও পারল না।লোকটা তার সঙ্গে সঙ্গেই যাচ্ছে। বলে যাচ্ছে সমানে।
    - আগে কী ভিড় হত ম্যাডাম।লকডাউনের আগে।আঁতে আঁকতে হাত ব্যথা। দিনে সাড়েতিন চারহাজার টাকা হয়ে যেত ম্যাডাম। লকডাউনের পর সব চলে গেল। আঁকান না একটা। দেখবেন অবিকল আপনি।ড্রয়িং রুমে বাঁধিয়ে রাখবেন। দেখবেন হেভি প্রশংসা হবে। দাঁড়ান না ম্যাডাম।
    একদম রোজগার হচ্ছে না। বসে গেছি পুরো । আঁকান না একটা । ও দিদি।পুরো আপনার মুখ এঁকে দেবো মাইরি।
    আমি সবার ছবি আঁকি না ।ছেলেদের চাপদাড়ি দেখলে আঁকি।মেয়েদের নাকফুল, লম্বাচুল দেখলে আঁকি। তবে আপনি আলাদা দিদি। চোখ কথা বলে।ও দিদি।
    ম্যাডাম থেকে দিদি হয়ে যেতে যেতে টুপুর নন্দনের পেছনে পুকুরের কাছে চলে এসেছে।পেছন পেছন লোকটি।এদিকে একেবারেই ফাঁকা। ব্রিজের উপর কেবল কতগুলো স্কুল ড্রেস পরা মেয়ে। স্কুলের পোশাক কেন! স্কুল তো খোলেনি এখনো! টুপুর ভাবছিল। কে জানে।হয়তো প্র্যাকটিকাল ছিল! গোল হয়ে বসেছে মেয়েগুলো। দুতিনজন মিলে গাইছে। " ফির লে আয়া দিল, মজবুত ক্যা কি যে!"
    পোর্ট্রেট আঁকিয়ে একেবারে ডেসপারেট।পিছু ছাড়তে না।টুপুর শেষে দাঁড়াল। মুখ থেকে টেনে খুলল মাস্ক। নাকের ওপর চাপচাপ দাগ রেখে গেছে মাস্ক। রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়াল টুপুর। ওর ঠিক মাথা বরাবর পিছনে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল।
    লোকটা খুশি হয়েছে। কাগজ সেট করে নিল।
    - আপনাকে মধুবালা ক্যাটরিনার মত দেখতে একথা আমি একবারো বলছি না।কিন্ত আপনার মুখের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। আমি তো সবার ছবি আঁকা না দিদি।আপনার চোখ দেখে মনে হল নাকমুখ ভালো। তাই বললাম। স্থির হয়ে দাঁড়ান।নড়বেন না দিদি।
    পাঁচ মিনিট বাদে ছবি এল। সেটা টুপুরের ছবি বটে কিন্ত নিচে নাম লিখে না দিলে অন্য কারু ছবি বলেও চালিয়ে দেওয়া যায়।
    - দেড়শো নিন। আমাকে চেনা যাচ্ছে না।
    - পাঁচমিনিটে আর কী হয় বলুন। পাঁচমিনিটে এর চেয়ে বেশি হয় না।পোর্ট্রেট আঁকা খুব কঠিন বুঝলেন কিনা। একদম রোজগার নেই। দিয়ে দিন দিদি দুশো।
    টুপুর দেড়শোই দিল। কাগজটা রোল করে ব্যাকপ্যাকে ঢোকালো।মেজাজ ভালো লাগছে না।খিদে পেয়েছে।বাড়িতেও যেতে ইচ্ছে করছে না ঠিক এখনি। ঈশানকে এখন ফোন করার মুড নেই ওর। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এক্সাইড মোড়ে পৌঁছে গেল। এখানে চা বড় ভালো করে। বাইরের খাবার খাচ্ছে না বড় একটা। কিন্ত আজ নিয়ম ভাঙবে। চায়ে চুমুক দিয়ে রাস্তা দেখছিল । গাড়ির মিছিল খুব কমেনি। নন্দন চত্বরটা কানা লাগছে শুধু। বড়সড় একটা জ্যাম। অনেক গাড়ি আটকে আছে। আরেক কাপ চা অর্ডার করে ফেলল টুপুর। তারপর চোখ কুঁচকে গেল। একটু সামনের দিকে একটা চেনা সুইফট ডিজায়ার না? ইয়ে! দ্যাট কার। ঐ গাড়ি ভীষণ চেনা যে! মুকুটমণিপুর। দীঘা। ডায়মন্ড হারবার। একটু এগিয়ে গেল চা হাতে নিয়ে। গাড়িতে রক্তিম। পাশে একটি মেয়ে। চুলটা টেনে বাঁধা। নাকছাবি। প্রোফাইলটা মন্দ না।
    রক্তিমের মুখে মাস্ক। অধৈর্য হয়ে স্টিয়ারিং এ হাত নাড়াচ্ছে। জ্যাম ছেড়ে যেতে গাড়ি হুশ করে এগিয়ে গেল। পোর্ট্রেট আঁকিয়ের কথা মনে পড়ল টুপুরের। এই এক নাকছাবি লম্বাচুলের কাস্টমার হতে পারত। কিন্ত রক্তিম কখনও তার বান্ধবীকে নন্দনের পেছনে মডেল হয়ে দাঁড়াতে দেবে না। কখনোই না।
    মনটা খুব হাল্কা লাগল নিমেষে। যাক।রক্তিমের একটা গতি হয়েছে। বেচারা মেয়েটা। জানে না কী চক্কর। কিংবা কে জানে ! ও মেয়ে হয়তোঐ চক্করেই ঘুরতে চায়। সিকিউরিটি কতরকম সংজ্ঞাতে কতজনের মাথা কন্ট্রোল করে! শরীরও ।
    এই মুহূর্তে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছে টুপুর।হোপ অ্যাটলাস্ট রক্তিম হ্যাজ ফাউন্ড হিজ গার্ল। অর মে বি ভিক্টিম।
    ও হাঁটতে লাগল। পার্ক স্ট্রিটের দিকে। কোথাও একটা বসে কিছু খাবে। নিজেকেই নিজে ট্রিট দেবে আজ। ফর ফ্রিইং হারসেল্ফ ফ্রম আ রং কর্ণার। ইয়েস।শি ইজ রাইট।

    আধঘন্টাবাদে একটা রেস্তঁরার নরম কমলা আলোতে ও বসে । হাতে ট্যাটুগুলোর ওপর আলো ছলকাচ্ছে। খুব মেদুর পরিবেশ। মাস্ক বাঁধা ও হেড শিল্ড পরিহিত ওয়েটাররা ঘোরাঘুরি করছে। টেবল ফর টু। ও প্লেটার সামনে নিয়ে বসে আছে।ধূমায়িত খাদ্য।
    টেবল ফর টু। কিন্ত এখন ও ঈশানকে ডাকবে না।কাউকেই ডাকবে না।
    ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে কাউকে কী দেখা যায়?
    - দেখ সকতে হো?
    - পাচ্ছি। তবু পাচ্ছি না।
    - বিলকুল ভাইরাস কে তরহা। হ্যায় পর দিখ নহি যাতা।
    - কেবল সিম্পটম দেখা যায়। জ্বর। র্যাশেজ। কাশি। শ্বাসকষ্ট। এগুলো কেবল সিম্পটম।
    - বিলকুল। দিখ নহি যাতা। এন্ড দিখ সকতে হো। য্যায়সে উন্নাও। য্যায়সে হাথরাস। যিতনি ভি ক্রাইম হো রহা হ্যায়;উও সব সিম্পটমস হ্যায়। জড় কঁহি আওর হ্যায়। আমরা শুধু সিম্পটম দেখতে পাই। উন্নাও পুড়ছে। হাথরাস পুড়ছে। করোনার মৃতদেহ পুড়ছে। তোমার সামনে প্ল্যাটারে দ্যাখো ধোঁয়া। আনআইডেন্টিফায়েড হত্যাকারী। আনআইডেন্টিফায়েড ভাইরাস।মিউটেইটিং অ্যান্ড মিউটেইটিং। কেবল পাল্টে চলছে।
    তুমি, আমি, আমরা কেবল পুড়ে যেতে পারি।
    - নো। নো ইরফান। স্টপ সেইং সো।
    বিষন্ন হাসি মিশে গেল কমলা রঙে। ধোঁয়া নিভে আসছে।
    - তুমি কী চলে গেলে?
    ওয়েটার বিনীতভাবে এসে বলল, কুছ চাহিয়ে ম্যাম?


    20092
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৪৭২ বার পঠিত | ৩ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন