• হরিদাস পাল  অপর বাংলা

  • মন খারাপের উৎসব

    Anindita Roy Saha লেখকের গ্রাহক হোন
    অপর বাংলা | ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৬২৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • পনেরোই আগস্ট কাছে এলেই আজকাল মন খারাপ হয়। বুকের কাছে একটা চিনচিনে ব্যথা, গলার ভেতর দলাপাকানো কষ্ট। যেদিন প্রথম হোস্টেলে যাওয়ার জন্য কলকাতা ছেড়েছিলাম, ট্রেনে সারা রাত হু হু করেছিল মনটা। যত বয়স বাড়ছে, সেই রকম ভাবটা ফিরে আসছে। প্রায় পুরো আগস্ট মাসটাই এমন হয়। ছোটবেলার স্বাধীনতা দিবসের উৎসবের ছবিগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ইস্কুলের অনুষ্ঠানে বন্ধুদের মুখগুলো ঘষে গিয়ে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে আমার বাবা, কাকা আর মামাদের মতো। একদল সদ্যতরুণ, ধুতি আর শার্ট পরে মাঝরাতে নতমুখে ফিরে আসছে বাড়িতে। পাড়ার একমাত্র রেডিওতে তারা শুনে এসেছে, ভাগ্যের সাথে মোলাকাত হয়ে গিয়েছে এইমাত্র।

    আজকাল আমি মাঝে মাঝে মায়ের সাথে বেড়াতে যাই, রিক্সা চড়ে রমনা, শান্তিনগর, ইস্কাটন। সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার ধারে বসি। ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াই। ঢাকেশ্বরী মন্দির, ‘বলদা হাউস’ জমিদারবাড়ি, কিংবা ওয়াড়ি ক্লাব, একেকদিন একেক জায়গায় যাই। ছুটি পড়লে নারায়ণগঞ্জ হয়ে চলে যাই মায়ের পিসির বাড়ি গফরগাঁও। কখনো মায়ের বাবার বাড়ি মসূয়া গ্রামে। আবার লম্বা ছুটিতে কখনো বা যাই আমার বাবার বাড়ি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নবীনগর হয়ে ভেলানগর গ্রাম। মূলী বাঁশের লগি ঠেলে ঠেলে বাইতে থাকি নদী, খাল, বিল। কখনো চলে যাই নরসিংদী, কখনো দায়ূদকান্দি। সেই কোন ছোটবেলা থেকে চিনি এই জায়গাগুলো। একঘেয়ে ঝোল-ভাত যখন মুখে রুচতো না, বাবা বসিয়ে দিতেন পদ্মার ওপর স্টিমারে। কখনো বা মাঝিদের নৌকায়। সেখানে টাটকা ধরা ইলিশের নূন-হলুদের ঝোল। স্টিমারে খাওয়া হত মুরগি। আমার ঘোর বৈষ্ণব ঠাকুরদা নাকি বলতেন, ‘রাম পাখি খাইবি! খা, পদ্মার উপরে খাইলে দোষ নাই।’ সেই ভোর রাতে আধোঘুমে আধপেটা খেয়ে রওনা হতে হয়েছে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ছেড়েছে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের ট্রেন। রানাঘাটের সিঙ্গারা আর চমচম খেতে খেতে পৌঁছে যেতাম গোয়ালন্দ স্টিমারঘাট। তারপর পদ্মা। সুরথ যে রাস্তায় মোক্তারদাদুর সাথে বেড়াতে যায়, সে পথে আমিও দ্যাশে গিয়েছি বারবার। আজও যাই। ছেলেকেও নিয়ে গিয়েছি। আমরা তৃতীয় প্রজন্ম উদ্বাস্তু। মাঝে মাঝেই দাদাশ্বশুরের ভিটেয় উঁকি দিই কি জানি কিসের খোঁজে। নাগরপুরের মেঠো পথে হাঁটি, বিনানুইর ঘাটের সাথে কথা কই। মাস্টারমশাইর মুখে শুনি বরিশালের ভাষা, গল্প বলে কীর্তিপাশা। আমি যত দূরেই যাই, আজও আমার বুকের ভিতর বসত করে এক বাস্তুহারা।

    সারা জীবন ঘুরে বেড়াচ্ছি এমনি করে। যখন কোনো পশ্চিমবঙ্গীয় বন্ধু বলেছে, তাদের দেশের বাড়িতে দুর্গাপূজো হয়, তখন কাঙাল হয়ে বলেছি, ‘তোদের বাড়ি নিয়ে যাবি?’ যখন কেউ গল্প বলেছে, বাঁকুড়া জেলায় তার আদি নিবাস, গ্রামের নামটি চন্দ্রহার, পাশে বইছে শালী নদী, পথের দু ধারে কাশবন ভেঙে তারা বাড়ি যায়, বুকটা মুচড়ে উঠেছে। ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়ে’। ভারতবর্ষে তো কত মানুষ, তাদের বেশিরভাগেরই তো একটা গাঁও আছে। কুমায়ুনী বন্ধুটি পাহাড়ে যায় প্রতি দশেরাতে, রাজপূত ছাত্র যায় তিজের সময় রাজকাহিনীর দেশে। কেরালার প্রতিবেশী প্রতি বছর পোঙ্গাল এলে বাড়ি চলে যায়, আর ওড়িষ্যার সহকর্মী তো নিয়মিত চিল্কা যায় চিংড়ির ভেড়ি সামলাতে। আমি বেড়াতে যাই সুদূর মেঘালয়। ডাউকি-তামাবিলের সীমান্তে হাঁটি। দু চোখ মেলে দেখি, ডাউকি নদীর বুকের মাঝখান দিয়ে কুল কুল করে বয়ে চলেছে অদৃশ্য কাঁটাতার।

    এই তো সেদিন, লক ডাউন হতে পারে অনুমান করে ঘরে মজুদ করলাম বেশি করে চাল-ডাল। শৈশবে শোনা সেই দাঙ্গা-বিধ্বস্ত জীবনের গল্প নিজের অজান্তেই কেমন করে যেন সাবধান করে দিল। মা বলতেন, রায়ট হবার সম্ভাবনা থাকলে সবার আগে কী কী যেন ঘরে জোগাড় করে রাখতে হয়। অবাক বিস্ময়ে ভাবি, একটা জাতির ইতিহাস কত ভাবে আর কত দিন ধরে সে জাতির মানুষকে প্রভাবিত করে। আবছা মনে পড়ে, এমনি চাল-ডাল-আলুর পুঁটলি আর পুরোনো জামাকাপড় নিয়ে মা যেতেন মুজিবনগর, একাত্তরের দিনগুলোতে। মনে পড়ে সেই কাকাকে, যিনি বৃদ্ধা মাকে কাঁধে নিয়ে পেরিয়ে এসেছিলেন সীমান্ত। বড়ো হয়ে দেখেছি সেই নুরুল চৌধুরী মামাকে, যিনি রাইফেল হাতে নিজের জীপে বসিয়ে দাদু-দিদিমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের আশ্রয়ে, ঢাকা শহরে রক্তাক্ত দাঙ্গার দিনগুলিতে। পনেরোই আগস্ট এঁরা সবাই আমার কাছে বেড়াতে আসেন।

    আমাদের ধনদাদু, মানে বাবার খুড়োমশাই, কলকাতায় মারা যান। পড়ে গিয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন বহুদিন। তাঁর খাটের চারপাশে রেলিং তুলে দেওয়া হয়েছিল। অশক্ত মুঠিতে স্টিমারের রেলিং ধরে থাকতেন। হাসি হাসি মুখে অনর্গল বলতেন, ‘গোয়ালন্দ! গোয়ালন্দ!’ দিদিমা মৃত্যুশয্যায় শুধু একটি কথাই বলতেন, ‘আমারে ঢাকায় নিয়া চল’। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর কোনো বাড়ি ছিল না। আজও প্রতি রাতে মা ঢাকায় যান। ভোরবেলা ঘুম ভাঙে তাঁতিবাজরের পয়ঁতাল্লিশ নম্বর বাড়িতে। তারপর বেলা বাড়লে তিরাশি বছরের বালিকাটি যান বাংলাবাজার গার্লস স্কুল। মধ্যাহ্নে ইডেন কলেজ। সন্ধ্যাবেলা আরতির ঘন্টা বাজে রাধানাথ জিউর মন্দিরে, দূরের শাঁখারি পাড়া থেকে ভেসে আসে শঙ্খধ্বনি। আমি হাঁটতে থাকি বুড়িগঙ্গার পাড় ধরে। চলে যাই সিংহল সমুদ্র পেরিয়ে, কাশ্মীর উপত্যকা ভেদ করে, সিরিয়ার ঊষর স্থলভূমির দিকে, পৃথিবীর অগণন শরণার্থী শিবিরের অভিমুখে।
  • বিভাগ : অপর বাংলা | ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৬২৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১৪ আগস্ট ২০২০ ১৬:৫৬96239
  • আমাদের বাড়ির তিরাশি বছরের বালিকাটি এতদিনে কিশোরগঞ্জে গিয়ে আবার ইস্কুলে যাচ্ছে হয়ত। বারো তেরো বছরের অনাবিল কৈশোর ফিরে এসেছে হয়ত আবার।
  • রুবি | 103.87.56.70 | ২০ আগস্ট ২০২০ ২২:৫৭96450
  • চমৎকার। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী লেখা। 

  • পার্থ | 103.87.57.5 | ২১ আগস্ট ২০২০ ১৪:২৬96476
  • অসাধারণ লেখা।কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে না এলে এ লেখা কেউ বুঝতে পারবে না।

    চোখে জল এসে গেল।

    দেশ ভাগ নিয়ে পড়ি।বুঝতে চেষ্টা করি তখন কার মানুষের মনস্তত্ত্বকে। মেলাতে পারি না  হিসাব।এলোমেলো হয়ে যায় সব।

  • | 103.87.57.5 | ২১ আগস্ট ২০২০ ১৮:৫২96485
  • আত্রেয়ী নদীর পার ধরে উত্তর বঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, সব জায়গাগুলো ঘুরে এলাম। লেখাটার মধ্যে হারিয়ে গেলাম, আমি উদ্বাস্তু।

  • aranya | 162.115.44.101 | ২১ আগস্ট ২০২০ ২২:৫৬96491
  • ছুঁয়ে যাওয়া লেখা।
  • উজ্জয়িনী | 103.87.57.5 | ২১ আগস্ট ২০২০ ২৩:২৮96493
  • আমিও গুগল ম্যাপ এ পুর্ব পুরুষের গ্রাম খুঁজি, পুরোনো ঢাকার গান্দরিয়া, যেখানে নাকি মামাবাড়ি ছিল, বাবা কলকাতার কলেজ থেকে ছুটিতে যে rail route এ দেশের বাড়ী ফিরত.... খুঁজি।

  • রোমি | 103.87.57.157 | ২২ আগস্ট ২০২০ ০৯:৫৭96505
  • উদ্বাস্তু মানসিকতার মর্মস্পর্শী দলিল। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত