• সাগরদ্বীপ

    রঙ্গন
    ভ্রমণ | ০৫ আগস্ট ২০০৭ | ৩৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ঐ যে কি যে বলে না- একটি ধানের ইয়ের উপর একটি ইসের বিন্দু। এ যাওয়া সেইরকমই যাওয়া। তবে একবার নয়। তিনবার। তাই এখন আর মনে পড়ে না ঠিক কখন, কোনটার পরে কোনটা। শুধু বিদেশের হোটেলের জানলায় যখন কালো মেঘ আর হাওয়ার শোঁ শোঁ, রাস্তায় লোকজন কম, জানলা দিয়ে দূর মসজিদের মিনার দেখা যায় না, তখন বাংলার শেষ জনপদের দুর্গাপূজার শান্ত স্মৃতি নিয়ে বসে থাকি। আসছে কালে আবার হবে।

    প্রথমবার সাগরদ্বীপে যাওয়া দুর্গাপূজায়। নামখানার বাসে করে মাঝরাস্তায় নেমে ভ্যানরিক্‌শায় হারউড পয়েন্ট। তারপর লঞ্চে পেরিয়ে কচুবেড়িয়া। কচুবেড়িয়ায় বাবার আপিসের জিপ পৌঁছে দিল সাগরদ্বীপে। কচুবেড়িয়া থেকে সাগরদ্বীপের রাস্তা পরিষ্কার এবং অক্ষত পাকা। থাকার ব্যবস্থা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে। খুবই মামুলি ঘরদোর। ষষ্ঠীর সকালের ভোগ মন্দিরের ধুলোমাখা চত্বরে। একেবারে গাঁয়ের গন্ধমাখা শত শরীরের হাপ্‌সে খাওয়ার মাঝখানে আমরা কয়েকজন সুশোভিত পেটখারাপের ভয়ে আচ্ছন্ন খুঁতখুঁতে পাবলিক।

    হাত মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা পাশের ঘাট বাঁধানো পুকুরে। জলের মধ্যে বিশাল বপুর কালো কালো মাছ কিল্‌বিল করছে। তখনও দীঘার বাজার রম্‌রম করে চলছে। তাই সাগরে পুজোবার্ষিকী ট্যুরিস্ট খুবই কম। থাকার জায়গাও খুব একটা বেশি নেই। এই জনপদের জেগে ওঠার সময় বছরে একবার সংক্রান্তির সময়। ভারত সেবাশ্রম সংঘ থেকে সমুদ্রের দিকে হেঁটে যেতে বুনো গাছপালায় বাগানে ঘেরা ছোটো ছোটো সাধনকুটীর। বৈরাগ্যের থেকে গার্হস্থ্য শান্তির ভাবই মনে বেশি জাগে। সাগরের এই দক্ষিণপ্রান্তের পুজো বলতে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে। তাই আশ্রম জুড়ে ব্যস্ততা, মুন্ডিতমস্তক সন্ন্যাসীদের ব্যস্তপায়ে চলাফেরা। যাই, পুজো ছেড়ে একটু সাগর দেখে আসি।

    এই শেষবিন্দুতে এসে সমুদ্র ধূসর, শান্ত। সুদীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। পায়ের তলার বালি বেশ শক্ত, ভুরভুরিয়ে পা ডুবে যায় না। দূরে সমুদ্রের মধ্যে ভেসে আসে জম্বুদ্বীপ। গতবারের মেলার কিছু বাঁশ, ছাউনির কিছু শূন্য খাঁচা এদিকে ওদিকে। কিছু জেলে মাঝে মাঝে জাল বুনছে। সৈকতের মধ্যেই কপিলমুনির আশ্রম। ভিতরে কমলা রঙের কপিলমুনি। কোনো দর্শনার্থী নেই এই ভরদুপুরে। বারান্দায় বসে এক সাধুবাবা ঢুলছেন। এর আশেপাশে গজিয়ে উঠেছে কিছু অস্থায়ী দোকানের ছাউনি। নারকেল, সিঁদুর, বাতাসা, পুঁতির মালা বিকোচ্ছে। মোহনা সৈকত থেকে দেখা যায় না। ফিরে যাই এবার নির্জন সৈকত থেকে। দূরে মোহনায় পৌঁছে যাওয়া কোনো আবছায়া জাহাজ। দুপুরের রোদে ছবিটা জলের মতো কাঁপছে। জেলেপাড়ার কোনো কুঁড়েঘর থেকে মা ডাকছে- ও ভগী, কই গেলি?

    শহুরে প্যাখনা প্রতিদিন ধুলোয় মাখা খিচুড়িতে সায় দেয় না। ভারত সেবাশ্রম সংঘের মোড়ে খড়ের চালের রেস্তোরাঁ। গ্রামের এক পরিবার চালান। পরিষ্কার বাঙালী খাওয়া- ভাত, মাছ, ডাল, আলুভাজা, পাশে নুন, লেবু। সামনে দিয়ে কচুবেড়িয়ার বাসের ঘন গতায়াত।

    এর পরে আর পর্যায়ক্রম মনে নেই। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর সন্ধে খুব সম্ভবত:। সেইদিন তর্জাগানের ব্যবস্থা। এ ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের ভোটের মিটিঙে করা শহুরে তর্জা নয়। পাশের গাঁয়ের তর্জাদল। শুরু হতে হতে বেশ রাত। দুর্গামন্দিরের চারদিকের দালানে ভিড় ভেঙে পড়েছে। আমাদের বাকি সবাই শুতে চলে গেছে। শুধু আমি আর আমার এক রসিক মামা দুজনে জেগে। আজ হুবহু সেই তর্জাগানের সব কিছু মনে নেই। শুধু তিনটি জিনিষ-

    ১) গ্রামের সমস্ত রসিকতা-মান-অভিমান-দু:খের ভাষা আমরা বুঝে উঠতে পারি নি। এও এক অধীত বিদ্যা। কেঁদুলির মেলায় দলবল ভিড়ে গাঁজা টেনেও সাক্ষাৎ গ্রামের ভাষা বোঝা আমাদের পক্ষে অতো সহজ নয়। আমরা শুধু হাত বাড়িয়ে দিতে পারি মাত্র।

    ২) অজস্র দৈহিক রসিকতা খিস্তিখেউড় ছিল যা আমাদের মধ্যবিত্ত নীতিবাগীশরা শুনলে কানে আঙুল দেবেন। কিন্তু যে সন্ন্যাসীরা এই অঞ্চলে থেকে কাজ করে যান, তারা বোঝেন নৈতিক ভাষার স্তরভেদ। কাজেই সন্ন্যাসীদের পুজোমন্ডপে এই সব যৌন ফাজলামি করলে কেউ রে রে করে ওঠেন না। আমাদের দুই কলকাত্তাইয়ার শুধু হেসে হেসে মুখ লাল, পেট ব্যথা। মামার ডবল বিপদ। পুঁচকে ভাগনেকে মাঝে মাঝে "চল্‌ চল্‌" বলে বকতে হচ্ছে, এদিকে পেটফাটা হাসিও থামে না।

    ৩) মাথায় এক হাত, কোমরে এক দিয়ে কোমর লটকে লটকে নাচের ভঙ্গি এখনও মনে আছে।

    পরের দিন সংস্কৃতির উল্টোবহর। উত্তম-সুপ্রিয়া জুটির প্রথম ছবি "শুন বরনারী"। এইদিনেও আর তিলমাত্র স্থান নেই। উঠতি বয়সে উত্তম-সুপ্রিয়ার জম্পেস প্রেম বেশ ভালই লাগে। শুধু মাঝে এক সন্ন্যাসী মামাকে মুরুব্বি ঠাউরালেন। মাঝেই মাঝেই কানে কানে এসে বলে যান- "এই বইটার স্পিরিচুয়াল ব্যাপাট্টা ধত্তে পাল্লেন তো?" মামাও তথৈবচ- "হ্যাঁ হ্যাঁ অবিশ্যি অবিশ্যি"। সন্নিসিরা যে কোথায় কখন স্পিরিট দেখতে পান! এর মাঝে অষ্টমী কি নবমীতে অস্ত্রপূজা। ঝাঁ চক্‌চকে তরবারি, বর্শা, বল্লম হাতে নিয়ে লুঙ্গি পরা মুন্ডিতমস্তক সাধুবাবাদের সে কি নাচ! বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় এক বিশাল ঠোঙা গরম জিলিপি নিয়ে সমুদ্রের ধারে। অন্ধকারে সমুদ্রের স্তিমিত গর্জন। দূরে কপিলমুনির মন্দিরেও কোনো আলো জ্বলে না। মামাতো ভাই সদ্য সদ্য আগমনী অনুষ্ঠান করে এসেছে। অতএব যাওয়ার সময় "জাগো তুমি জাগো"। তবে সমুদ্রের হাওয়ায় কিশোর কন্ঠ অন্ধকার শরৎকে বড়ো খ্যাপা করে তোলে। আগে দেখি নি। পাশে এসে চুপ করে গান শুনে গেলেন আরও একটি বাঙালী ট্যুরিস্টদল।

    এবার সমুদ্রের চত্বর থেকে একটু দূরে সাগরদ্বীপের গাঁগঞ্জের ভিতর। প্রথম গন্তব্য সাগরদ্বীপের বাতিঘর। গ্রামের অনেকটা ভিতরে ঢুকে একপায়ে সে খাড়া। বাইরে সরকারী বেড়া। সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। বাবার সরকারী তকমার সুযোগে উপরে ওঠার সুযোগ পাওয়া গেল। পেঁচানো সিঁড়ি অনেকটা উপরে উঠেছে। উপরে উঠেই বিশাল স্ফটিকের মত এক লন্ঠন। এই দিয়েই জাহাজকে আলো দেখানো হয়। বাতিঘরের ভদ্রলোক খুব উৎসাহ নিয়ে জটিল মেকানিক্স বোঝাচ্ছিলেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি আরও দূরে, ধূসর বঙ্গোপসাগর সারা দিগন্ত জুড়ে পড়ে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করতে দেখিয়ে দিলেন মোহনা- সাগরসঙ্গম। মন রোমাঞ্চিত হল বটে কিন্তু খুব একটা চক্ষুসুখ মনে পড়ে না। অন্যদিকে ঘোড়ামারা দ্বীপ- জনপূর্ণ যে দ্বীপকে গঙ্গা ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলছে। তখনও সমস্ত দ্বীপ মৃত্যুর অপেক্ষায়। হাওয়ার দুর্দম ঝাপটে চোখ খুলে রাখা দায়। তবে বাতিঘর নিয়ে অতোশতো রোমান্টিক দূরকল্পনার একেবারেই দফারফা। বেশ গ্রামের ঘন জনবসতির মধ্যে বাতিঘর। তারের বেড়ার ধারে নাকে পোঁটা ন্যাংটো ছেলেপিলে খেলে বেড়াচ্ছে। তবে গভীর রাতে যখন গ্রাম ঘুমিয়ে পড়ে, তখন বাতিঘরের মাথায় উঠে দূর কালো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ........

    সাগরদ্বীপের মূলরাস্তার অন্যদিকে অনেকটা ভিতরে ঢুকে সাগর রামকৃষ্ণ মিশন। রামকৃষ্ণ মিশনের এলিট স্কুলের কোনো আত্মম্ভরিতা নেই। গ্রামের অন্যান্য পাঁচটা স্কুলের মতো সাদামাটা দোতলা বাড়ি। তবে অনেকটা জমিতে বাগান, ক্ষেত, পাশে ছুতোরশালা, আরও অন্যান্য ভোকেশনাল ট্রেনিঙের ওয়ার্কশপ। তখন পুজোর ছুটি। ছাত্ররা কেউ নেই। তবে হেডমাস্টার মহারাজ ছিলেন। অতি আন্তরিক আপ্যায়ন। পরে শুনেছিলাম বিদেশ থেকে পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট করে ফেরা মানুষ। দীর্ঘকাল রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজদের কাছ থেকে দেখেছি। এত অমায়িক, মৃদুভাষী অথচ উচ্চপদস্থ মহারাজ দেখি নি। বড়ো যত্ন করে ছাত্রদের খাবার ঘরে পিঁড়ি পেতে বসিয়ে আমাদের প্রাত:রাশ করালেন। পরের বার সুন্দরবনের অন্যদিকে অন্য এক রামকৃষ্ণ মিশনে ঠিক এই মহারাজের উলটোপানা আর এক হেডমাস্টার মহারাজ দেখেছিলাম। সে অন্য এক গল্প।

    আবার ফিরবো হারউড পয়েন্টে। ঐ যে বলেছি, কোনো ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখা যাবে না। খুব সম্ভবত: দ্বিতীয় যাত্রার সময় হারউড পয়েন্টের চালাঘর খাবারের দোকানগুলোকে আরও ভালোভাবে দেখলাম। যাদের খাবার নিয়ে নিটিপিটি নেই, তারাও দেখতে পারেন। কিলোদরে পরোটা বিক্রি হচ্ছে। সাড়ে নশো হলে অন্য কোনো পরোটার পরত থেকে ছিঁড়ে নিয়ে আরও পঞ্চাশ গ্রাম। কাজেই পরোটার নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই। ছেঁড়াখোঁড়া ময়দাভাজার এক ঢিপি। তার সাথে গুগাবাবার সাইজের রসগোল্লা। একমাত্র এইখানে সত্যি সত্যি গুগাবাবার রসগোল্লা দেখলাম। মানিকবাবু যখন সেগুলো বানিয়েছিলেন, ভিতরে সুজি পুরে সেগুলো বড় করা হয়েছিল। এইখানে সুজির নামগন্ধ নেই। বিশাল একতাল রসেভেজা ছানা। তবে ছানাই বটে, রসগোল্লর পর্যায়ে আর উন্নীত হতে পারে নি। পরের বার যখন হারউড পয়েন্টে পৌঁছেছি, তখন সঘন বর্ষা। নদীর অন্য পাড়ে কচুবেড়িয়া এক আবছা আঁচড়। আকাশে বাতাসে চরম জলের রাজত্ব। আমার শরীরেও, মানে ব্যাপক সর্দি। জল ঝরেই যাচ্ছে। আমি এক বেকুব নাকে তোয়ালে চেপে দাঁড়িয়ে আছি। এইদিকে জলপায়ে ফেরিতে অপার বাংলার জলস্নাত অপার সৌন্দর্য্য। সবই জলের খেলা!

    পরের বার ছিলাম ঊর্মিমুখরে- পাবলিক হেল্‌থ ইঞ্জিনিয়ারিং দফতরের বাংলো। সামনে বাগান নিয়ে ঝক্‌ঝকে দোতলা বাড়ি। ছাদে উঠলেই ধু ধু বঙ্গোপসাগর। দুপুরে রাঁধুনির টাট্‌কা পমফ্রেট মাছ ভাজা। একদিন দুপুরে খেয়ে ফেরার সময় হঠাৎ দেখি একদঙ্গল আমার নাম ধরে ডাকে। একদল কালেজীয় কম্‌রেড সাগরদ্বীপে উপস্থিত। দিব্যেন্দুদা, সুকান্ত, সুচন্দ্রা ইত্যাদি ইত্যাদি। রাত্রে তাদের ডেরায় খাওয়ার নিমন্ত্রণ। সন্ধ্যা হতেই বেরিয়ে পড়া বন্ধুসঙ্গের লোভে। সাগরের একেবারে তীর ঘেঁষে ভাঙাচোরা এক বহু পুরোনো ডি এম বাংলো। সেখানেই বাসা বেঁধেছেন স্যাঙাৎরা। পাশে হাওয়ায় নুইয়ে পড়া ঝাউ গাছের জঙ্গল। আলতো চাঁদ সমুদ্রের স্পর্শরেখায় উঁকি মারে। ঘরদোর বারান্দা অগোছালো বালির বিছানা। বিজলীবাতি নেই। অগত্যা কুপি, লন্ঠন আর কাঠের আগুনে খিচুড়ি আর ডিমভাজা। কলেজে পড়া ছেলেপিলের রান্নার যা বহর! গান আড্ডা খাওয়া শেষ হতে হতে বেশ রাত। সাগরে রাত আট কি ন'টার পরে বিদ্যুৎ বন্ধ। অভিভাবকদের বলা ছিল এই দু ঘন্টা বাদেই ফিরছি। ল্যাদ কাটিয়ে যখন ভাঙা বাংলো থেকে বেরোলাম তখন আর রাস্তাঘাট গাছপালা অন্ধকারে আলাদা করা যায় না। চাঁদ মেঘে ঢাকা। বাতাসে একবিন্দু আলোর স্পর্শও নেই। সাগর বিষহরির বড়োসড়ো ঠেক। অগত্যা বন্ধুর জন্য রাতবিরেতে টর্চ হাতে সুকান্তকে বেরোতেই হল। অভিভাবকেরা গম্ভীর ও বেজার মুখে আপ্যায়ন করলেন। তখন যদিও মদ্যপানের ব্যাপারটা চালু হয় নি কারণ তখন আমরা সবাই শুচিবায়ুগ্রস্ত বাঙালী কম্‌রেড। তখন কলেজে মদ খেলে কেলিয়ে দেওয়াটাই পবিত্র দায়িত্বের মধ্যে পড়ত।

    (সুচন্দ্রার মনে হয় এই শেষ স্মৃতি। যদিও সুচন্দ্রাদি বলেই ডাকতাম। এর পরেও নিশ্চয় কলেজে দেখা হয়েছে। মনে নেই। মনে আছে এই বেড়ানোর বছর ছয় সাত বাদে এক বন্ধুবরের কাছে শুনলাম মাস তিনেক হল সুচন্দ্রা গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে। জোরে ধাক্কা লেগেছিল। ঠিক যেমন ধাক্কা লেগেছিল আনন্দবাজারে টুকুসদা আর পারমিতাদির আত্মহত্যার খবর পড়ে।)

    একেবারে অপ্রসঙ্গ! জল আর বালির খবরে তবে ফিরুন আবার।

    তবে দ্বিতীয়বারের যাত্রায় যত না সাগরদ্বীপ মনে আছে, আরও মনে আছে মৌশুনি। ফেরার সময় হারউড পয়েন্ট দিয়ে না ফিরে কচুবেড়িয়া থেকে লঞ্চে চেপে চললাম কাকদ্বীপ। কাকদ্বীপে যাওয়ার জলপথে ছোটো একটা দ্বীপ মৌশুনি। ট্যুরিস্টির সাথে এই দ্বীপের কোনো সম্পর্ক নেই। এইটি একটি সরকারী মাছপালনের দ্বীপ। তখনও বেশ লাভজনক কেন্দ্র। গুটিকয়েক যুবক সরকারী কর্মচারী কেন্দ্রের দেখভাল করেন। প্রথমে গিয়েছিলাম তাঁদের থাকার জায়গায়। মাটির থেকে অনেকটা উঁচুতে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। উপরে ডর্মিটরি গোছের একটানা বড়ো ঘর, সারি সারি চৌকি, দৈনন্দিন জামাকাপড় চৌকির উপর প্লাস্টিকের দড়িতে মেলা। কাঠের সিঁড়ি কেন জিজ্ঞাসা করতে জানালেন মৌশুনি এই অঞ্চলের সব চেয়ে বেশি সর্পসংকুল দ্বীপ। তাই আত্মরক্ষার প্রথম বেড়া হল এই কাঠের সিঁড়ি। মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা সেইদিন মৌশুনিতেই। মধ্যাহ্নভোজ মানে মৎস্যভোজ। ভাত, ডাল এবং ঝোল ম্রিয়মাণ আনুষঙ্গিক। শুরুতে ধরুন মৌরলা ভাজা, আর পারশে মাছ ভাজা। তার পরে পাবদা, বাগদা চিংড়ি আর কাঁকড়া। যত পারেন তত খান। ভাত একটু কম করে মাছ খান। সদ্য সদ্য ধরে রান্না করা। এই অনাত্মীয় যুবকদের মৎসাপ্যায়ন ভুলতে পারি না। পেট ঢিপি করে যখন কাকদ্বীপ পৌঁছেছি শুনি সেইদিন বাস বন্ধ। শেষে ম্যাটাডোরে চেপে নামখানা। সেইখান থেকে বাসে ডায়মন্ডহারবার এবং অত:পর কলকাতা। কাকদ্বীপ-চন্দনসিঁড়ি-অহল্যা মার সন্তান মনে পড়ে নি। পাতি গঞ্জ শহরের বেশ। কোথাও মনে পড়ে দেখেছিলাম কংসারি হালদারের একটা আবক্ষ মূর্তি। পরে শুনি সেই মৌশুনি চিরাচরিতভাবে ভোগে গেছে। রাজনৈতিক ভেড়িদখলের খেলায় আমাদের এক দুপুরের মাছভোজের জায়গা সম্পূর্ণ শ্মশান। সেই যুবক বন্ধুরাও নিশ্চয় অন্য কোথাও।

    আপাতত: শেষ যাওয়া সঘন বরষায়। আগেই বলেছি, আমার নাক থেকে শুরু করে আকাশ অবধি অবিরত ধারাপাত। এইবার সঙ্গে বন্ধুবর দীপায়ন বসু। সেই পুরোনো হারউড পয়েন্ট-কচুবেড়িয়া। ছেঁড়া পরোটা আর হুমদো রসগোল্লা খাবার মতো তাকৎ ছিল না। থাকার ব্যবস্থা এইবার ইউথ হোস্টেলে। এখন সৌরশক্তিতে সাগরে আলোপাখা চলে। পিট্‌পিট্‌ করে পাখা ঘোরে। পৌঁছেই ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে এক ছুট্টে সমুদ্দু¤র। দু পা যেতে না যেতেই সমুদ্দু¤র ভরে ঝম্‌ঝম করে বৃষ্টি। আমি রোগাভোগা মধ্যবিত্ত যত বলি, ওরেঁ নিমুনিঁ হবেঁ, ঘরেঁ চঁল্‌, কে শোনে কার কথা! বন্ধুর তখন মনে পুলকের শেষ নেই, চোখে ঘোরের শেষ নাই। অনেক বলেকয়ে যেই পিছনপানে হাঁটা দিয়েছি, হঠাৎ ঝুপ্পুস করে বৃষ্টি বন্ধ। ইউথ হোস্টেলে ফিরে স্নান করার সাথে সাথে ম্যাজিক- নাকের জল পুরোনো ইতিহাস। ওজোনের কি মহিমা! এইবার কোনো বাতিঘর নয়, কোনো রামকৃষ্ণ মিশন কি ভারত সেবাশ্রম সংঘ নয়। সমুদ্র, খড়ের চালের রেস্তোরাঁতে পেট পুরে খ্যাঁটন আর মাঝে মাঝে গাঁয়ের হাটে উঁকিঝুঁকি। উঁকিঝুঁকির কারণও আছে মানে কারণই কারণ। এতদিনে মধ্যবিত্ত বাঙালী কমরেডবাজি ছেড়ে দিল্লিবাসীর সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়াম মার্কা আঁতলামিতে অভিষিক্ত হয়েছি। যদি দুই ফোঁটা পাওয়া যায়! তবে পচা আরকের ভয়ও রয়েছে। এর আগে পারমাদনে ইছামতীর ধারে ডিপ্লোম্যাটের ছোটো বোতল- আহা! তবে এইবারে শুধুই নিরাশা। রাত্রে হঠাৎ শুনি পাশের কোনো ঘরে প্রবল চীৎকার। কাঁথি, থুড়ি কন্টাই থেকে আসা দুই বেচারা লোক ঘরে বসে এক ভাঁড় খাসির মাংস আর বাংলা প্যাঁদাচ্ছিল। ইউথ হোস্টেলের লোকজন বুঝতে পেরে সাথে সাথে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাইরে। কে জানত ইউথ হোস্টেলে নেশা করা বারণ। সেই রাত দশটায় দুই বেচারা কোথায় গেল কে জানে! নেশা কেটে যাওয়া হায় পথবাসী হায় গতিহীন হায় গৃহহারা!

    তারপর শুধু মনে আছে বাসের ছাদে বসে হু হু হাওয়া খেতে খেতে কচুবেড়িয়ায় ফেরা। কোন ছোটোবেলায় শারদীয়া অমৃতে বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম- সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার। তিনবার হয়ে গেল। নির্বাণ ঘটে নি বুঝতেই পারছি। নইলে ইউরোপ আর এশিয়ার সন্ধিস্থলে পনেরো তলার উপরে বসে কোন মায়া হাত দিয়ে লিখিয়ে নেয় সেই শান্ত সময়ের কথা। সেই ধূসর সমুদ্র, নির্জন বালিয়াড়ি, খোড়োচেলে রেস্তোরাঁ আর শেষ গঙ্গার কথা।

    আবার যাব। যাবি রে মা?
  • বিভাগ : ভ্রমণ | ০৫ আগস্ট ২০০৭ | ৩৯ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত