• চক্রাতা

    দময়ন্তী ও রঙ্গন
    ভ্রমণ | ০৬ জুন ২০০৭ | ২৭ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • দময়ন্তী:

    আসলে ঠিক ছিল "লা কোয়েন্টা" প্রোজেক্টের অমিতাভদের সাথে জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে যাব ২০০৬ এর ২৬শে জানুয়ারীর ছুটিটায়। তাই ২৭শে শুক্রবার, ছুটিও নিয়ে রেখেছিলাম। ২৩ তারিখ অমিতাভ বলল ওদের গ্রুপের একজনের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাই ওরা কেউই যাচ্ছে না। যা: তাহলে কি হবে? আমার তো মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত তৈরী হয়ে আছে যাবে বলে। কি করা যায়? শুরু করলাম খোঁজখবর। কিন্তু খুব বেশী সুবিধা হল না। অত কম নোটিশে জিম করবেট ব্যবস্থা করা, তাও একলা একলা, প্রায় অসম্ভব।

    ধুত্তোর নিকুচি করেছে। "যদি তোর ডাক শুনে ------ " ইত্যাদি প্রভৃতি --- যে কোন একটা বাসে উঠে দেরাদুন কিম্বা উখীমঠ চলে যাব, তারপর দেখা যাবে। জানা গেল NCR এ বাসেরা সব "বাস-আড্ডা"য় জমা হয় এবং গুরগাঁওতে এরুপ একটি আড্ডা আছে। সেখান হইতে ভোর ৬.৪৫ এ দেরাদুনের বাস ছাড়ে। সকাল ৬ টায় যখন বেরোলাম বাড়ী থেকে, তখনও চারিদিকে গভীর অন্ধকার। পূবদিক নাকি একটু একটু আলো হয়ে থাকে এইসময়? লোকে যে বলে। কিন্তু কোনটা যে পূবদিক সেটাই ঠিক করে উঠতে পারা গেল না। সবদিকই সমান অন্ধকার, কোনদিকেই আলোর কোন আভাস নাই। রাস্তায়ও নাই কোন যানবাহন। বাস অবশ্য সকাল সাতটার মধ্যেই ছেড়ে দিল। তখন আকাশে দিব্বি চালধোয়া জলের রঙ। মোদিনগর অবধি গিয়েই বাস কেৎরে পড়ল। প্রচুর যাত্রী, যারা হরিদ্বার এর আগে কোথায়ও যাবেন, নেমে হরিয়ানা রোডওয়েজের অন্য বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলে গেলেন। আমার বাপু অত কৃচ্ছ্রসাধনের অভ্যেস নেই, অতএব বসেই রইলাম, যতক্ষণ না বাসটা ঠিক হয়। আরে বাবা বাসকে তো দেরাদুন পৌঁছতেই হবে, নাহলে ফিরবে কি করে? তা সে গেল--- বেলা ৩ টে নাগাদ দেরাদুন ISBT তে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

    সেখানে জানা গেল 'চক্রাতা' যাবার সরাসরি কোন বাস নেই। ওখান থেকে যেতে হবে বিকাশনগর, সেখান থেকে ট্রেকারে চেপে চক্রাতা। ট্রেকার!! ওরে বাবা! তাতে তো ছাদখোলা যানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়! ঐ পাহাড়ী পথ দিয়ে! তার থেকে ট্যাক্সি অধিকতর নিরাপদ অপশান। তা এই ঠান্ডার সময়ে তাতে কোন অসুবিধা হল না। কালসী অবধি গিয়ে এক ঘন্টার বাধ্যতামূলক স্টপ। কালসীতে ওপরে যাবার পরের ঘাট ছাড়বে সাড়ে পাঁচটায়। ততক্ষণ অপেক্ষা। ঘাট ছাড়ল যথাসময়েই, শুরু হল সমতল ছেড়ে পাহাড়ী রাস্তা। সরু রাস্তা, চুলের কাঁটা বাঁক, হঠাৎ রাস্তায় ৩০-৪০ টা ছাগল, কানফাটানো বাইক .... আর মাঝে মাঝে সেই ভীতিকর ট্রেকার। তার খোলা চাতালে হাসিখুশী নারীপুরুষ ... কাজ শেষে ফিরছে কোন পাহাড়ী গাঁওতে। একটু করে উঠছে গাড়ী আর হিমালয় দেখাচ্ছে তার একটু করে পাহাড়ের সারি। তখনও পর্যন্ত কোন 'আদিম মহাদ্রুম'এর দেখা নেই, নিতান্তই কচি দ্রুম সব। পাহাড়ের খাতে নদীগুলির অবস্থা করুণ। জল প্রায় নেই বললেই চলে, রুক্ষ পাথরে ভর্তি। 'সেউনি'তে আবার থামতে হল ঘাটের জন্য। যোয়ান দেওয়া আলু পরোটা খেতে খেতেই গাঢ় অন্ধকার ঝাঁপিয়ে নামল পৃথিবীতে, আর ঘাটও ছাড়ল। রাস্তায় বাড়ল বাঁকের সংখ্যা, আর সাথে সাথে বাড়ল গাড়ীর গতি। কারণস্বরুপ চালক বললেন ওপরের দিকে ছোটখাট জন্তুজানোয়ার পা চুলকোলে পাথরের টুকরো গড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের গা দিয়ে, পড়ার সম্ভাবনা থাকে গাড়ীর ছাদে। জোরে চালালে নাকি এই সম্ভাবনা এড়ানো যায়। শুনে যে খুব একটা স্বস্তি পেলাম, তা নয়, তবে আমার হাতে নাই স্টিয়ারিং।কাজে কাজেই ..... কেউই জানে না আমি চক্রাতা আসছি, মা জানে আমি জিম করবেটে গেছি অমিতাভদের সাথে, বন্ধুবান্ধবেরা জানে কোথায়ও একটা যাব---ডানদিকে এবড়ো খেবড়ো খাড়া পাহাড়, পাথরের গায়ে জায়্‌গায় জায়গায় দেওয়া চুনের দাগ গাড়ীর হেডলাইটের আলোয় দাঁত খিঁচিয়ে যাচ্ছে। বাঁ দিকে নি:সীম গভীর কালো অন্ধকার, সামনে শুধু গাড়ীর হেডলাইটের আলো--- আগেপিছে কিচ্ছু নেই----- অনেকটা চলার পরে অনেক দূরে কোন পাহাড়ের গায়ে জোনাকির মতই মিটমিটে এককুচি আলো দেখা দিয়েই ভোঁ---- গাড়ীর আওয়াজ ছাড়া এই পৃথিবীতে নাই আর কোন শব্দরাজি---এই চালক বোধহয় মহাকালের রথেরই সারথী।

    সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার ঘোর অন্ধকারে যা বোঝা গেল, চক্রাতা আসলে খুবই ছোট্ট একটা জায়গা। সাত হাজার ফুট উচ্চতায় ট্যুরিস্ট বিশেষ আসে না - এই শীতে তো আরোই নয়। চালক জিগ্যেস করে কোথায় থাকব? আরে তার আমি কি জানি? নিয়ে চল কোন একটা হোটেলে। সূর্য্যের সাথে জেগে ওঠা জনপদ তখন লেপের আদরের খোঁজে। 'হিমগিরি ট্যুরিস্ট লজ' ---- সামনের ঘরটিতে চেয়ার টেবিলের পাশে একটি সিঙ্গল বেড। তাতে বসে এক গাড়োয়ালী যুবক মাটিতে রাখা তামার পাত্রের মধ্যের জ্বলন্ত আগুনের তাতে হাত সেঁকছে। জালের ঢাকনির নীচে লালচে আগুনও শীতের প্রকোপে একটু যেন ম্রিয়মান। জানা গেল ঘর পাওয়া যাবে। ৩ তলার ঘরটাই মোটামুটি পছন্দ হল। না হলেও কোন উপায় ছিল না অবশ্য। ঘরে রুম হীটার না থাকলেও বাথরুমে গীজার আছে দেখা গেল, আর বিছানায় দুটো লেপ।

    গাড়ীর চালক আসার পথেই জানিয়েছিল, যেহেতু আমাকে আবার গাড়ী ভাড়া করে ফিরতে হবে, সে ওখানে থেকে যেতে প্রস্তুত, আশেপাশের ৮-১০ কিলোমিটার যা আমি ঘোরাঘুরি করব, সে তার জন্য কিছুই নেবে না। আমিও তাতে আপত্তির কিছুই দেখি নি, যদিও "মা" পরে এই কথা শুনে এত ভয় পাবে যে--- সে যাকগে-- সে তো আরো দিন তিনেক পরের কথা। তা সে-ও সেখানেই কোথায়ও থাকবে। গাড়োয়ালী যুবক জানায় তার রিস্তেদার সকলেই কারো শাদী উপলক্ষ্যে উ-ই পাহাড়ের গাঁওতে গেছে। হাত জোড় করে জিগ্যেস করে আমি 'সম্পুর্ণ শাকাহারী' কিনা? আরে না না পাগল নাকি, চিকেন এনে দাও তো বাপু। না: চিকেন এখানে সহজলভ্য নয়, মাটন নাকি খুব ভাল, সে আমাকে মাটন কোর্মা আর খান আষ্টেক রোটি অফার করে। হায় আমাকে দেখে অনেকেই ভীমটিম গোছের কিছু একটা ভেবে নেয়! ভাতের সন্ধান করতে জানা গেল, এখানে তো বাসমতী চাল বিশেষ পাওয়া যায় না, এখন তো যাবেই না - ভাত কিন্তু একটু মোটা চালের হবে। তা তাই সই, নিয়ে এসো। ভাত আর মাটন কোর্মা এলে দেখলাম অমন স্বাস্থ্যবান ভাতের দানা আমি কস্মিন কালেও দেখি নাই। তবে সারাদিনের পাঁউরুটি, বিস্কুট, চিপস খাওয়া মুখ ও জিভের অবশ্য তার স্বাদগ্রহনে কোন অসুবিধা হয় নি।

    ঠান্ডার বহর দেখে দুটো লেপই গায়ে চাপানোই বুদ্ধির কাজ হবে মনে হল। কিন্তু সে লেপেদের টেনে খুলতে বা পাততে আরেকটা সাহায্যকারী বড়ই দরকার। অন্যথায় হাতে ব্যথা অনিবার্য। তো হাতের ব্যথা নিয়েই ঘুমিয়ে তো দিব্বি পড়লাম। হঠাৎই ঘুম ভাঙ্গে দেওয়াল আলমারীর পাল্লার আওয়াজে। খুটখুট, টকটক, খসখস ---- কিসের আওয়াজ রে? আমি তো আলমারী বেশ চেপে বন্ধ করেছিলাম। আবছাভাবে মনে পড়ে স্বপনকুমারের গল্পে দেওয়াল আলমারীর মধ্যে থাকে গুপ্তপথ, খুনী আসে সেই পথ ধরে ভেতর থেকে পাল্লা খুলে --- নাকি সেটা দস্যু মোহনের গল্প? এদিকে অত ওজনদার লেপের নীচে নড়াচড়াও করা যাচ্ছে না --- বহুকষ্টে ছেঁচড়ে মেচড়ে অর্ধেকটা বেরিয়ে লাইট জ্বালানো গেল। ডানদিকে জানালার পরদা উড়ছে হইহই করে, বাঁদিকে পাল্লা মাঝেমধ্যেই দুলে উঠছে। ভুমিকম্প? কিন্তু খাট, চেয়ার টেবিল তো অনড় অচল। বিশেষ অনুসন্ধানের পর বোঝা গেল জানালার ভেতর থেকে জালের পাল্লা বন্ধ থাকলেও বাইরের কাঁচের পাল্লা খোলা, আর বাইরে প্রবল হাওয়া ও অল্পস্বল্প বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এরপরে তো all set . একঘুমে ভোর সাড়ে সাত।

    জায়গাটা এমনিতে চীন সীমান্ত। বিদেশীদের নাকি সেথায় যেতে "পারমিট" লাগে। ওয়েবসাইটে দেখেছিলাম বটে, তবে নয়ন থেকে মরমে তা পশে নাই। চক্রাতা-বাজার আর পাঁচটা ছোট পাহাড়ী বাজারের মতই। মোটেও সুন্দর কিছু নয়, তাই অপেক্ষাকৃত ফাঁকা রাস্তা ধরে হাঁটতেই মন চাইল। রাস্তা আস্তে আস্তে ঘুরে ঘুরে উঁচু হচ্ছে। কিছু নেহাৎ বালকগোছের লোককে দেখি মিলিটারী পোষাক পরে কাঠের বোঝা নিয়ে আসছে। কেউবা আবার মস্ত বস্তা কাঁধে , খোদায় মালুম তাতে কি আছে। মস্ত মস্ত দেওদার গাছ আর সদ্য ঘুম থেকে ওঠা সুয্যিঠাকুর রাস্তাটিকে ভারী সুন্দর একটা চিকরিমিকরি জালিকাটা ছায়ায় ঢেকে রেখেছে। রাস্তার পাশের বেঁটে কার্নিস থেকে অনেকটা ঝুঁকে দেখলে তবে দেখা যায় দেওদার গাছেদের গোড়া, আর ঘাড় বেঁকিয়ে প্রায় আধশোয়া হয়ে গেলে তবে দেখা যায় গাছের ডগা। এঁরাই হলেন সব আদিম মহাদ্রুম। চালক মশাই জানিয়েছিলেন যেখানেই দেখিবে দেওদার, জানিবে সেখানেই তুষারপাত হইয়া থাকে। কেন যে অন্তত একটা ক্যামেরাও সঙ্গে আনলাম না, ভাবতে ভাবতেই "ম্যাডামজী, ম্যাডামজী-ঈ" এই আকস্মিক চিৎকারে চমকে উঠি।

    অপেক্ষাকৃত বয়স্ক গাড়োয়ালী মিলিটারী, কিছু বোঝানো বা মনোযোগ আকর্ষনের আপ্রাণ চেষ্টায় লালচে গাল টুকটুকে লাল হয়ে গেছে। তিনি হিন্দী বলেন গাড়োয়ালী মেশা, আমি বাংলা মেশা। তবে কিনা 'ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়' আর জগতে কমিউনিকেশানের কোন বিকল্প নাই - এই আপ্তবাক্যদের সত্যি প্রমান করে আমরা একসময় একে অপরের কথা বুঝেও ফেললাম। জানা গেল এটি মিলিটারী সংরক্ষিত এলাকা, অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হয়। গেটের কাছেই নাকি আমাকে আটকানোর কথা চিল (আমি কিন্তু কোন গেট দেখি নি আসার সময়ে)। আমি কোথায় থাকি, কেন এসেছি জেনে তিনি ভারী অবাক হলেন। আমার কোন আত্মীয় বা বন্ধু মিলিটারীতে নেই, তাও আমি বেড়াতে এসেছি --- কি আশ্চর্য্য! কতরকমের "আজীব ইনসান"ই যে উপরওয়ালা পয়দা করেন , এই ভাবনায় তিনি বড়ই ভাবিত। সামনেই মিলিটারী ক্যান্টিন। ইতিমধ্যে কচিকাঁচা আরো খান পাঁচেক "মিলিটারী" জমা হয়ে গেছেন। তাঁরা কে? না 'মিলিটারী' --- ঐ তাঁদের পরিচয়। সবাই মিলে প্রচুর পীড়াপিড়ি ক্যান্টিনে আমি যেন এক কাপ চা আর অন্তত দুটো আলু কিম্বা গোবির পরাঠা খেয়ে যাই। আমিও খাব না, তাঁরাও ছাড়বেন না, এদিকে যত বলি চীন বর্ডারটা একবারটি দেখিয়ে দাও, তার বেলা আর ভবি ভুলল না।

    ফেরার সময়ে গেটটা দিব্বি দেখতে পেলাম, কারণ রাগী গেটম্যান আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কোথায় থাকি, কেন এসেছি জিগ্যেস করেই তাঁর ক্রুদ্ধ প্রশ্ন তাঁকে জিগ্যেস না করে ভেতরে গেছি কেন? আমি এবারে দেখলাম "ভোলি সি লড়কি'টা প্লে করাই যাক। ভারী নিরীহ মুখে জানালাম গেটটা তো খোলাই ছিল, আর তিনিও ছিলেন না, আর অনুমতি যে নিতে হয় তা-ও জানা ছিল না, অগত্যা -----। আসলে তো অপেক্ষাকৃত ভাল একটা হোটেল খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, তাও পেলাম না, আর চীন সীমান্তও কেমন সামনে এসেও ফস্কে গেল! হোটেলে ফিরে দু:খ করতেই তারা তাড়াতাড়ি হোটেলের ছাদে নিয়ে গেল, সেখান থেকেই ভিউফাইন্ডারে দেখা চীন সীমান্ত আর চারিদিকে অজস্র স্নো-পীকের সারি। "ওয়াগা বর্ডার" এর মত জমকালো নয়, ভারী নির্জন ছোট্ট একমেটেগোছের সীমান্ত। আশেপাশের পাহাড়গুলো পেরোবার ক্ষমতা থাকলে, "সীমান্ত"র গেটের ধারেকাছেও না গিয়েই দিব্বি এদেশ-ওদেশ করা যায়।

    টাইগার ফলস হেঁটে গেলে নাকি ৬-৭ কিমি, আর গাড়ীতে গেলে ১২-১৪। তা গাড়ীতেই তো যাব। গাড়ী নামতে থাকে ঘুরে ঘুরে। অনেকটা নামতে হবে। পথে হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায় সেইসব ট্রেকারদের। ঠাসবোঝাই হয়ে চলেছে। ক্রমশ: উপস্থিত হওয়া গেল এক জনশূন্য পাহাড়ঘেরা জায়গায়। গাড়ী আর যাবে না। নেমে হন্টন। কিছুদুর তো দিব্বি গেলাম। তারপর দেখি আর কোনরকম রাস্তার বালাই নেই। একটা মাটির পায়েচলা পথ। দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করব, এমন সময়ে এলেন এক বয়স্ক পাহাড়ী। জিগ্যেস করে জানা গেল ঐ খাড়া নেমে যাওয়া রাস্তাটাই টাইগার ফলসের রাস্তা। দেখেশুনে বেশ ভয় লাগল ---- পড়লে আর দেখতে হবে না, অথচ পড়ার সম্ভাবনা বেশ প্রবল। তিনি জানালেন, তিনি ঐদিকেই যাচ্ছেন, আমি আসতেই পারি। তাও আমাকে নড়তে না দেখে, তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তরে যেই না বলেছি পড়ে যাবার ভয় --- সে কি রাগ তাঁর! ওটা নাকি পড়ে যাবার মত রাস্তাই নয়। তাতেও আমাকে সাহস করতে না দেখে, সামনের একটা বেঁটে মত গাছ থেকে একটা ডাল ভেঙ্গে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন তাঁর পেছনে পেছনে আসতে। আর যা তাচ্ছিল্যের একটা দৃষ্টি ছুঁড়লেন, তার পরে আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।

    ওফ্‌ সে কী রাস্তা রে বাবা!! ঠিক একজন লোক যেতে পারে, আর প্রতি মুহুর্তে মনে হচ্ছে গড়িয়ে পড়ে যাব। ঐ টালমাটাল পায়ে টলতে টলতে কাঁপতে কাঁপতে ফলসের কাছে পৌঁছে ---- আহাহা ---- বেশ মাঝারী গোছের মোটাসোটা ফলস, অনেক জল নিয়ে ৫০ মিটার মত ঝাঁপিয়ে নামছে। ফলসের গা বেয়েও নামার রাস্তা আছে, জলের ছাঁটে ভেজা। নীচে তৈরী হওয়া সরোবরটায় পৌঁছানো যায়। কটি মেয়ে এসেছে সেই সরোবর থেকে জল নিয়ে যেতে। ওরা উঠে এলে জানলাম ওরা নাকি খায় না এই জল। এ শুধু অন্য প্রয়োজনে ব্যবহার করে। খাবার জল আনতে যায় আরো দুরে --- "হোগা করিব বিস পঁচ্চিস মাইল" নির্বিকার উত্তর। আশেপাশে বেশ ঘন গাছের সারি। দেওদার বা চীর বলে মনে হল না, এই দুটো ছাড়া অন্য কিছু হবে।

    ফিরতি পথে একাই। কি অদ্ভুত নিস্তব্ধ চারিদিক। নিজেরই জ্যাকেটের খসখস শব্দ আমায় সঙ্গ দেয়, আর মাথার ওপরে সুয্যিমামা। আচমকাই দেখা হয় এক বৃদ্ধের সাথে। তাঁর মুখের অজস্র ভাঁজ, যেন অনেক ওপর থেকে দেখা পর্বতশ্রেনীরই রূপ। কি যে বলেন, কিছুই বুঝি না ----আমার কথাও তিনি বোঝেন না ---- কিন্তু বলেই চলেন, কথার ভঙ্গী দেখে বেশ প্রীত মনে হয়। ইতিমধ্যে এসে গেছে এক যুবক গাড়োয়ালী। সে মোটামুটি ভাঙ্গা হিন্দী বলতে পারে। তাকে বৃদ্ধ খুব দ্রুত কিসব বলে যান। যুবক নিশ্চিত হয়ে নেয় আমি ভারতীয়। অন্য কোন দেশের লোক নই, তারপর সেও মহাখুশী হয়ে যায়। কিরে বাবা! ব্যপারটা কি? না ওঁরা অনেক বিদেশিনী মহিলাকে একলা একলা এখানে আসতে দেখেছেন, কখনও কোন স্বদেশিনীকে দেখেন নি। তাই আমি নিশ্চয় কোন দেবীর অংশ হব, এই তাঁদের বিশ্বাস। ক্কি সব্বনাশ!! ওরে বাবারে দেবী টেবীরা শুনলে ভয়ংকর ক্ষেপে যাবেন যে! এমনকি তাঁদের ভক্তকূলও প্রবল ক্ষেপবেন।

    প্রায় গাড়ীর কাছাকাছি এসে পাওয়া গেল একদল বাচ্চাকে। মানে সাকুল্যে ৬টি। কোথায় থাকে? না "আপনা গাঁওমে"। কি নাম সেই গাঁওয়ের? হেসেই কুটিপাটি। যেন কি একটা অসম্ভব প্রশ্ন করেছি। স্কুলে যায় কিনা? না: যায় না। গাঁয়ের কেউ যায়? হ্যাঁ যারা অনেকটা করে হাঁটতে পারে, তারাই তো যায়। উল্টে জিগ্যেস করে ওরা অতদূর হাঁটবে কি করে? ওরা ছোট না? সত্যিই তো অনেকটা হাঁটতে না পারলে যে স্কুলে যাওয়া যায় না --- এই বোধই তো শখ করে বেড়াতে আসা আমার ছিল না।

    দেওবন যেতে বড় গাড়ী লাগবে, যা পাওয়া গেল না। কানসর যেতে তেমন কোন সমস্যা নেই। অতএব সেদিকপানেই যাওয়া যাক। ৮৫৯৬ ফুট উচ্চতা আর চক্রাতা থেকে ২৬ কিমি মত দূর। দেরাদুন থেকে তিউনি যাবার রাস্তায় পড়ে কানসর। তিউনি থেকে সারা দেশে উচ্চমানের মার্বেলপাথর চালান যায়, তাই ট্রাক বা বাসের চলাচল ভালই, ফলে রাস্তাও বেশ পাকাপোক্ত।

    কানসরের বেশ কিছু অগে একটা বাঁক ঘুরেই --- সামনে ধু ধু সাদা বরফ। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা কোন জলধারা শীতবুড়োর অভিশাপে জমে গেছে। রাস্তার বেশ কিছু অংশ, পাহাড়ের ঢাল, যেখানে সূর্য্যের আলো পৌঁছায় না এপ্রিল মাসের আগে, সেখানেই পুরু বরফ। গাড়ী চলে টলে টলে হেলেদুলে। নারীপুরুষ নীচ থেকে পিঠে করে নিয়ে আসেন শুকনো কাঠ বা ঘাসের বোঝা।

    প্রধান রাস্তা থেকে অল্প একটু নেমে গিয়ে কানসরের ফরেস্ট বাংলো। দাজা জানালা সব বন্ধ। চারিদিকে প্রচুর গাছ, কেমন কালচে সবুজ ছায়ায় ঢাকা এক মন্দির -- 'বাসিক দেব' এর মন্দির। বাসিক কি বাসুকী? কে জানে? মন্দির তালাবন্ধ। পুজারী আসবেন ঘন্টা ৩ বাদে। অতক্ষণ থাকব না। ঐ বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করা গেলে মন্দ হত না! কিন্তু কাউকেই দেখা গেল না কোত্থায়ও। চালক ভয় দেখায় এই জঙ্গলে নাকি অনেক চিতা আছে। বলে কিরে! আমি যে হো হো করে হেসে ফেলি নি, সে তো নিতান্ত ভদ্রমহিলা বলেই----- কিন্তু চালকমশাই মহা দায়িত্ববান। কিছুতেই আমাকে বেশীদূর যেতে দিলেন না। নাকি গাছ থেকে লাফ দিয়ে চিতা নেমে আসে! আমি কিন্তু গাদাখানেক হনুমান ছাড়া কিছুই দেখলাম না।

    চক্রাতা থেকে ফেরার পথে সেউনির ঘাট এড়াতে স্থানীয় লোকেদের পরামর্শে নেওয়া হল অন্য একটা রাস্তা, যা সরাসরি কালসীতে এসে মেশে। চলার পথকেই যদি রাস্তা বলা যায়, তাহলে এটাও রাস্তা। তবে আসলে অধিকাংশ জায়গায়ই মাটির, কোথায়ও কোথায়ও রাস্তা তৈরী হচ্ছে --- ব্যাস। ফলে ৩ ঘন্টার যাত্রাপথে আর দ্বিতীয় কোন গাড়ীর দেখা পাওয়া গেল না। মানুষজনও বড়ই কম। শুধুই আলো ছায়া, রুক্ষ পর্বতশ্রেনী, সবুজ পর্বতশ্রেনী, দলছুট হনুমান, ঝাঁকড়া লেজ আর লাল চোখের পাহাড়ী কুকুর, ঝুম চাষের ছোট ছোট ক্ষেত, কোথায়ও বা শুধুই ছোট ছোট ধাপ কাটা, এখনও বোনা হয় নি তাতে কোন বীজ, শীর্ণকায়া নালা, যাকে বর্ষাকালে 'ঝর্ণা' বলা যাবে। আর তখনই হিমালয় দেখা দেয় এক প্রেমিক পুরুষের বেশে। তাম্রবর্ণ এক আদিম পুরুষ, যার পেশীবহুল কঠোর পৌরুষ তীব্র আকর্ষণে টানে, রুক্ষ প্রকৃতি দূরে ঠেলে, দেওদারের ছায়ায় মেঘের মায়ায় কোমল হয়ে আসে সেই প্রেমিক, কাছে টানে------।

    এই যাত্রায় এমন কিছু দেখলাম কি যা আগে কখনও দেখি নি? না: তেমন কিছুই নয়। সবই কখনও না কখনও, কোথায়ও না কোথায়ও দেখেছি। তবে? বালিকা থেকে কিশোরীবেলায় যেতেই যে বাঁধন আস্তে আস্তে জড়িয়ে গেছে হাতে পায়ে, তার পাকগুলো খুলে যাবার সুখ, যেমন ইচ্ছে ঘোরার সুখ, পরিচিত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার আনন্দ, চাইলেও কেউ খোঁজ পাবে না ---- কোথায় আছি, কি করছি ---- তেমনই আমিও জানাতে পারব না কাউকেই, আ-আ-আ:----

    রঙ্গন:

    চারটে তথ্য:

    ১) দিল্লির বাস গিয়ে যে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ায়, সেখান থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তায় দেরাদুনের অন্য বাসস্ট্যান্ড। সেইখান থেকে চক্রাতার বাস ছাড়ে।
    ২) এই অঞ্চল ভারতের একমাত্র অঞ্চল যেখানে পূজ্য দেবতা কৌরবেরা।
    ৩) বহুপতি প্রথা এখনও প্রচলিত। যৌন অভ্যাসও খোলামেলা। বিল আইটকেনের লেখা পড়ে জানতে পারি, এই একমাত্র ভারতীয় গ্রাম যেখানে তিনি খোলা ক্ষেতে প্রকাশ্যে চুমু খেতে দেখেছেন।
    ৪) এই অঞ্চলেই লাখমন্ডল যেখানে প্রবাদানুযায়ী বারাণাবতের জতুগৃহ।
  • বিভাগ : ভ্রমণ | ০৬ জুন ২০০৭ | ২৭ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত