• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • যোজনগন্ধ্যা - দ্বিতীয় খণ্ড

    Tanwi,. Halder
    বিভাগ : ধারাবাহিক | ০২ মার্চ ২০২০ | ৭৯৬ বার পঠিত
  • যোজনগন্ধ্যা

    দ্বিতীয় খণ্ড

    ২১

    যে কোনও কিছুর শুরু আর শেষের মধ্যে একটা বর্ণময় আলো-আঁধারি থাকে। থাকে এক অনন্য প্রাপ্তি। অসীম নীলাকাশ। আর সীমাহীন বারিধি। যেখানে জীবন ঢ্যালা মাটির সাথে মণিমাণিক্যও কুড়িয়ে নেয়। রোদের কস্তূরী ভেঙে ভেঙে ঐরাবত মেঘগুলো ধেয়ে আসে বাঁধনের শিকল কেটে। মুক্তি। উল্লাস। চাওয়া পাওয়ার বাষ্প জমলেই ক্লান্তি নামবে বুকের পাঁজর ঘেঁষে। রোমকূপে বাসা বাঁধে তখন মন খারাপের ঢেউ। মহাবিশ্ব জুড়ে জমতে থাকে চাপ চাপ রক্তের মতো আলকাতরা অন্ধকার। হয়তো বা এটাই সেই উলঙ্গ সত্য। নির্মম বাস্তব।
    মেয়ে যখন বিয়ের পরে বাপের বাড়ি থেকে কনকাঞ্জলি করে বিদায় নেয় তখন তাকে বাড়ির বড়রা পইপই করে বলে দেয় সে যেন আর পিছু ফিরে না তাকায়। শেখরও কি তেমনটাই ভাবছে? সেই রাত থাকতে কালু বাউরিদের সাথে রওনা দিয়ে পালকি করে কলকাতার মেস বাড়িতে সূর্য নিভুনিভু বিকেলে এসে পৌঁছেছে। অত ভোরে আন্না ঘুম ঘোরে বোধহয় ঠিক ঠাহর করতে পারে নি শেখর সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছে। বৈঁচি যখন নিজের মেয়েকে ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করে বলে, ‘ওরে মুখপুড়ি তোকে কি কালঘুমে পেয়েছে? বাবাজীবন তো চলে যাচ্ছে’, তখনও আন্না ঘুমের ঘোরে উ উ করে কি যেন বলে পাস ফিরে শোয়। বিজয় বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আঃ ওকে ছেড়ে দাও না আন্নার মা। মেয়েটা ঘুমোচ্ছে, ঘুমোতে দাও’। শেখরও ভেবেছিল এই বুঝি আন্না উঠে হাত-পা ছুঁড়ে শেখরের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না করে কান্না জুড়ে দেয়। কিন্তু তা না হতে শেখরেরও পুরুষত্ব কোথায় যেন টাল খায়। স্বামিত্বে আঘাত লাগে। বৈঁচি সারারাত ধরে আঁচলে চোখ মুছে শেখরের জন্য প্রচুর মুড়ি-মুড়কী নাড়ু ফলপাকুড় গুছিয়ে দেয়। বিজয়কে সে বারবার অনুরোধ করেছিল আন্নাকে শেখরের সঙ্গে পাঠাতে। কিন্তু শেখরের নিজেরই কলকাতায় নিজস্ব ঠাই না থাকায় মেস বাড়িতে কেমন করে মেয়েকে পাঠাবে। সেজন্য বৈঁচির এই অনুরোধ বিজয় রাখতে পারে নি। তবে আশার কথা এই যে শেখর বৈঁচিকে কথা দিয়ে এসেছে যত শীঘ্র সম্ভব বাসা বাড়ি দেখে সে পত্র মারফৎ খবর দেবে। আর তখন বিজয় গিয়ে আন্নাকে সেখানে রেখে আসবে।

    কলকাতা শহরে সুন্দরবনের মতো ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আঁধার ঘনিয়ে আসে না। এখানে কলকারখানার বাঁশীর সাথে বিকেল শেষ হয়। বাতাসে ধোঁয়ারা ভেসে বেড়ায়। রাস্তায় রাস্তায় গ্যাসবাতির আলো রাতের কালিমাকে মুছে দিনের আলোর গরিমা দান করে। সাহেব সুবোদের ঘোড়ার গাড়ির ফিটন গাড়ির শব্দে নিস্তব্ধতা ভাঙে। কখনও কখনও বাঙালী বাবুসমাজও সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টাকার জোরে রাতকে দিন করার চেষ্টা করে। বাইজী, খ্যামটা নাচগানে হুল্লোড় তোলে বারমহল। সেখানে প্রতিযোগিতা চলে কোন বাবু বা জমিদার একরাতে কত টাকা ওড়াতে পারল। কিম্বা নিজের বাঁধা মেয়েমানুষটিকে কত দামী গয়না দিতে পারলো। বিমান একদিন রাগে দুঃখে ফেটে পড়ে বলেছিল, ‘জান ভাই শেখর, নীলকর সাহেবেরা আমাদের যত না শত্রু তার থেকে ঢের বেশি শত্রু এই আমাদের দেশীয় রাজাগজারা। তারা যদি দেশীয় মানুষদের কথা ভাবতো তবে আজ আমাদের এই দুর্গতি দাঁড়াতো না। কথায় বলে না দশের লাঠি একের বোঝা। তারা যদি একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াতো তাহলে আজ আমাদের পরাধীন থাকতে হয়? ঐ সাদা চামড়ার কতগুলো মাত্র মানুষ এসে আমাদের উপর কর্তামি ফলিয়ে যাচ্ছে আর আমরা মুখ বুজে তা দিনের পর দিন মেনে নিচ্ছি। আর তারা রায়বাহাদুর খেতাব পাওয়ার জন্য ইংরেজের পদলেহন করতে ব্যস্ত। তাদের দিনের পর দিন উপঢৌকন পাঠিয়ে যাচ্ছে। ধিক এইসব রাজাগজার দলকে’। সেদিনের বিমানের উষ্মার বিষয় শেখর অনুধাবন করতে পারেনি কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিশেষত আন্নাদের বাড়িতে কয়েক মাস থাকার ফলে বিজয়ের সংস্পর্শে এসে শেখরের মনেও এক নতুন চেতনার আলোর জন্ম হয়েছে। শেখর যেন একটু একটু সাদা কালোর প্রভেদ বুঝতে শিখে গেছে। ইংরেজরা তাদের শুধু পরাধীন করে রাখে নি, পরাধীনতার আড়ালে ক্রীতদাস বানিয়ে রেখেছে। সমস্ত অর্থেই শেখরের মনে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু যার জন্য শেখরের এই আমূল পরিবর্তন সেই আন্না শেখরের চিন্তাভাবনার জগতে কোথাও এতটুকু আঁচড় কাটতে পারছে না। কলকাতার এইসব দেশীয় বাবুরা বেশী বেশী মুনাফা লাভের আশায় সুন্দরবনের অনাবাদী জমির লাটকে লাট ইজারা নিয়ে পত্তন করার ব্যবস্থা করছে। তারা নিজেরা সারা বছরে একবারও হয়তো যায় না। দেশীয় একজন গোমস্তাকে নায়েব হিসেবে সেখানে বহাল করে মৌমাছির চাকের বিশুদ্ধ মধুটুকু পান করে যাচ্ছে। আর এইসব নায়েবরা বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় প্রমাণ করতে সেখানকার সাধারণ মানুষদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। যত রকম অত্যাচার, লুম্পেনবাজি, শঠতা করা যায় করে যাচ্ছে। মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না। বনের পশুরাও সেখানে যেটুকু মর্যাদা পায় এই কালো কেলো, গরীব গুর্বো, অসহায় মানুষগুলো সেটুকুও পায় না। শেখরের জীবনের এই কয়েক মাসের উথাল পাতাল জীবনে বুঝতে পেরে গেছে যে এতদিন প্রকৃত অর্থেই নাবালক ছিল সে। কলকাতার হিন্দু কলেজে পড়তে আসা নবচেতনায় জাগ্রত এইসব শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে শেখর যেন ঠিক বুঝতে পারতো না। সে ভোগবিলাসী না হয়েও তার চেতনার জগতে কোথাও যেন ভোগেরই পাঁকে ডুবে ছিল। তার মনের ভেতর এতদিন আন্না ভিন্ন আর কেউ বাসা বাঁধতে পারে নি।

    কালুর দলবল হেঁদুয়ার কাছে শেখরদের মেস বাড়ির সামনে যখন পালকি নামায় তখন সূর্য নিভুনিভু। কালু খুব আন্তরিক গলায় বলে, ‘সাবধানে থেকো গো বাবুমশাই। তোমার উপর দিয়ে খুব ঝড় বয়ে গেছে’। কিন্তু যে কথা গোপন করে তা হল কিছুদিনের মধ্যেই সে পুনরায় রোজিপুর গ্রামে ফিরে যেতে চায়। ‘ধর্মগোলা’ স্থাপনে সে বিজয়ের পাশে দাঁড়াতে চায়।
    মেস বাড়ির সদর দরজার ভেতরে পা দিয়ে উঠোনের ডান দিকে বারোমেসে কাঁঠালি চাঁপা ফুল গাছের ফুলের গন্ধে শেখরের মনের ভেতরে এই দোতলা মেস বাড়িটার আনাচ কানাচ সবকিছু ছবির মতো ভেসে ওঠে। প্রথমে রাঁধুনি উড়ে বামুন বলরামের নজরে পড়ে সে। এতদিন পর শেখরকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। কয়লা ভাঙছিল সে। সেইভাবেই উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে আসে, ‘ওমা শেখর বাবু যে’ বলে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
    শেখর যেদিন এখান থেকে যায় এই রান্নার ঠাকুরটি তাকে বারবার করে সুন্দরবনের খাঁটি মধু আনতে বলে দিয়েছিল। কিন্তু শেখরের হাতে একটি তোরঙ্গ ও একটি পুটুলি ভিন্ন অন্য কিছু না থাকায় বেচারি খুব মুষড়ে পড়ে। ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করেই ফেলে, ‘শেখর বাবু আমার মধু আনো নি?’
    কিন্তু শেখরের সেখানে গিয়ে অব্দি যা যা ঘটে গেছে রান্নার ঠাকুরের মধু আনার কথা বেমালুম কপ্পুরের মতো উবে গেছে। তবু এখন মনে করে যাওয়ার সময় রান্নার ঠাকুরকে সে কথা দিয়ে গেছিল মধু এনে দেবে। তাই কুণ্ঠার সঙ্গে বলে, ‘না বলরামদা। সেখানে গিয়ে পর্যন্ত আমি খুব সমস্যার মধ্যে ছিলাম। তাই মধু আনতে পারি নি। তবে তোমায় কথা দিচ্ছি এবার দেশে যাওয়ার আগে ঠিক মধু আনিয়ে দেবো। আচ্ছা বিমান ঘরে আছে?’
    বলরাম জানায়, ‘হ্যাঁ, কোথায় যেন গেছিল। একটু আগেই ফিরল’।
    শেখর আর এক মুহূর্ত কাল বিলম্ব না করে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে পড়িমরি করে দৌড় লাগায়।
    বলরাম চেঁচায়, ‘আস্তে যাও গো। হোঁচট খেয়ে পড়বে’।
    সিঁড়ির ধাপগুলো শেখরের কাছে অনন্ত মনে হয়। মনে হয় এই ধাপ অতিক্রম করে সে কি কোনোদিন তার প্রিয় সখা বিমানের কাছে পৌঁছতে পারবে!

    ভুলু কুকুরটাও কোথায় ছিল। শেখরকে দেখে ছুটে এসে ঘেউউ – কেউউ করে ডেকে লেজ নাড়াতে থাকে। ভুলু এতদিন বাদেও তাকে চিনতে পেরেছে দেখে শেখরের আহ্লাদের সীমা থাকে না। ভুলু শেখরের সামনে দাঁড়িয়ে সমানে লেজ নাড়তে থাকে। শেখর আনন্দের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘ওমা দেখ বলরামদা ভুলু আমাকে মনে রেখেছে’।
    মধু না পাওয়ার দুঃখ তখন কিঞ্চিৎ অভিমানের রঙ নিয়েছে বলরামের। সে উনুনের মুখে তালপাতার বাতাস দিতে দিতে বলে, ‘হ্যাঁ মানুষেরাই শুধু ভুলে যায়’।
    এ কথার গভীর অর্থ অনুধাবন করার মতো অবস্থা তখন শেখরের নেই। সে তার নিজের পরিচিত পরিবেশে পরিচিত মানুষদের বাড়িতে ফিরে এসে আনন্দে বিভোর। সে নিজের মনেই ভুলুকে বলে, ‘রাগ করিস না ভুলু তোর জন্যও কিছু আনা হয় নি। যে অবস্থার ভেতর দিয়ে দিনগুলো পার করলাম’।

    হিতেন মজুমদার কোন একটা অফিসে ইংরেজের অধীনে খাস কর্মচারী। সে অফিস থেকে ফিরছে। হাট করা সদর দরজা দেখে বলরামের মুণ্ডুপাত করতে করতে ঢুকে রীতিমত তাজ্জব বনে যায়। খুব দিল খোলা দরাজ মনের মানুষ। হেঁকে ডেকে সবসময় কথা কয়। শেখরকে দেখে হাতে ঝোলানো শোওয়া দুই কেজি ওজনের বোয়াল মাছটাকে দিয়েই উঁচু করে অভিনন্দন করে উঠে বলে, ‘আরে ইয়ং ম্যান, কখন এলে? এদ্দিনে তোমার বাড়ির সব ভালোয় ভালোয় মিটল?’
    কি বলবে শেখর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছিল না। শেখরের এতদিন বাড়িতে পড়ে থাকার কারণ এখানে আর কেউ না হোক বিমান যে জানে সেটা এখানকার সকলেই জানে। কিন্তু বিমান যে এখানে সকলের কাছে শেখরের অন্তর্ধান সম্পর্কে ঠিক কি বলেছে তা শেখরের অজানা। তাই সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতোই নিজেকে বোধ করে। শেখর ভাবনার আতান্তরে পড়ে, ঠিক কি যে বলেছে বিমান এখানকার সকলের সাথে কে জানে! সে কি শেখরের দ্বিতীয় বিবাহের কথা সকলকে বলে দিয়েছে, ছি ছি ছি তালে তো লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। এখানে একমাত্র তারিণী ভট্টাচার্য্য বাবু ছাড়া কেউই প্রায় কুলীন প্রথা সমর্থন করে না। এখানে তারই একমাত্র তিনটে বিবাহ। হিতেন তো মানেই না। সে প্রচণ্ডই কেতাদুরস্ত। চলনে বলনে সাহেবদের মতোই হাবভাব। সবসময় স্যুট বুট টাই পরে থাকে। ইংরেজদের গুণগান করতে পারলেই যেন জীবন ধন্য। বিমান এই বাঙালী বাবুদের টাই পরা নিয়ে প্রায় মশকরা করে বলে, ‘বুঝলে ভাই শেখর এই টাই হচ্ছে বকলেস। মনিব যেমন তার পোষা সারমেয়টির গলায় বকলেস পরিয়ে রাখে এও ঠিক তেমনি। একটু ব্যাগরবাই করেছো তো বকলেস ধরে মারো টান’। হিতেনের গলায় ঝোলানো নীল রঙের সাটিনের কাপড়ের টাইটির দিকে তাকিয়ে এসব হিবিজিবি ভেবে যাচ্ছিল শেখর।
    হিতেন আবার বলে ওঠে, ‘কি ইয়ং ম্যান তা তোমার গ্র্যান্ড ফাদারের পারলৌকিক ক্রিয়াদি ভালোয় ভালোয় মিটল তো?’
    শেখর কিছু বুঝতে না পেরে ঘাড় নাড়ে।
    হিতেন হাতে ঝোলানো বোয়াল মাছখানা বলরামকে দিয়ে বলে, ‘নে দেখি। আচ্ছা করে কষিয়ে রাঁধ তো। তোর ঐ চারা পোনার ঝোল খেতে খেতে পেটে চরা পরে গেছে। শেখরের সৌজন্যে আজ রাতে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া হোক দেখি। আমি মুখ হাত পা ধুয়ে তাস খেলতে যাব। তখন নিবারণের বৌয়ের কাছ থেকে খান কতক রুটি নিয়ে আসবো। আমি রুটি খাবো। তুই রুটি বানানো মানে ভারতবর্ষের মানচিত্র বানাস আর তা দাঁত দিয়ে ছেঁড়া মানে ভীষণ গায়ের জোরের ব্যাপার’।
    বলরাম মাছটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলে, ‘তা বাবু মাছ দিয়ে রুটি খেতে কি ভালো লাগবে?’
    হিতেন বেশ জোরের সঙ্গেই বলে, ‘আলবাৎ লাগবে। এতবার ভাত গেলার জন্যই সাহেবরা আমাদের কি বলে জানিস? ভেতো বাঙালী’।
    হিতেনের সাহেবদের নিয়ে আরও কিছু গুণকীর্তন করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তার আগেই বলরাম বলে ওঠে, ‘ওমা উনুনে তো আঁচ গনগনিয়ে উঠে গেছে। আমি চায়ের জলটা চাপিয়ে দেই। মাসীও চলে গেছে। এখন এই এত বড়ো মাছ আমাকেই কুটতে হবে কিনা’।
    শেখর কাঁঠালিচাঁপা গাছটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিশ্চিন্ত হয় বিমান তার দ্বিতীয় বিবাহের কথা কিছু বলে নি। মনে মনে সে কৃতজ্ঞ বোধ করে বিমানের প্রতি। সত্যি বিমান তার প্রকৃতই বন্ধু।
    হিতেন তার বিশাল পাঞ্জার হাতের পাতাখানা শেখরের ডান কাঁধে বাঘের থাবার মতো খপ করে ধরে বলে, ‘জন্ম মৃত্যু বিধাতার লিখন। তা নিয়ে মন খারাপ করো না ভায়া। তাছাড়া তোমার গ্র্যান্ড ফাদারের তো বয়সও হয়েছিল। তবে কি জানো ঐ জলা জঙ্গলের অশিক্ষিত জায়গা বলেই মানুষ অমন টুপটাপ মরে যায়। নতুবা এখন ভেদবমিতে কেউ মরে না। তবু তোমার মায়ের পিতৃবিয়োগ বলে কথা। সব সম্পর্কে দ্বিতীয়বারের একটা সুযোগ থাকলেও বাবা মা নির্বাচনে দ্বিতীয় সুযোগ থাকে না’।
    শেখর এতক্ষণে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। মনে মনে বিমানের বুদ্ধির তারিফ করে। না, খাসা ভাবনা। শেখরের ঠাকুরদা বললে শেখরকে মুণ্ডিত মস্তক না দেখলে অনেকেরই কৌতূহল জাগত। সেখানে মায়ের বাবা বলে বিমান একরকম শেখরকে সব দিক থেকে বাঁচিয়েই দিয়েছে।
    হিতেন পকেট থেকে ঘড়িটা বার করে একবার সময় দেখে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে, ‘এ হে। কথায় কথায় অনেক দেরী হয়ে গেল। নিবারণ তাস সাজিয়ে বসে থাকবে। আমি ঘরে গেলাম ভায়া’।

    উঠোনে দাঁড়িয়ে শেখর দোতলায় নিজের ঘরের দিকে তাকায়। এতক্ষণে নজরে পড়ে ঘরটায় তালা দেওয়া। ঘরের মধ্যে দুধারে রাখা দুটো চৌকিতে বিমান আর শেখর থাকে। এই মেস বাড়িতে যারা ছাত্র তারাই একমাত্র একটা ঘরে দুজন করে থাকে। নতুবা সবাই যে যার মতো আস্ত এক একখানা ঘরে নিজেদের ইচ্ছামতো সংসার পাতিয়ে নিয়েছে। যেমন তারিণী ভট্টাচার্য্য নিজের ঘরের প্রায় তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে এক দেড়শ জনকে ঠাই দিয়ে ফেলেছে নিজের ঘরে। তার ঘরে ঢুকলেই সবসময় একটা ফুল বেলপাতা ধুপ ধুনোর গন্ধ পাওয়া যায়। হিতেনের ঘরে চুরুটের সুবাস, বিলিতি মদের গন্ধ ভুড়ভুড় করে। সমর আর বিষ্ণু ডাক্তারির ছাত্র। তাদের পড়ার টেবিলে মানুষের মাথার খুলি রাখা আছে। দেওয়াল জুড়ে একটা কঙ্কালের ছবি। সেখানে প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম টিকচিহ্ন দিয়ে লাল কালিতে লেখা। প্রথমবার মানুষের মাথার খুলি অমনভাবে দেখে শেখর শিউড়ে উঠেছিল। তারপর একটা ঘিনঘিনে অনুভূতি হয়। সমর কিন্তু বেমালুম খুলিখানা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলে, ‘জানো শেখর এটা একটা পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মানুষের মাথার খুলি। বেঁচে যখন ছিল তখন এই মাথার চুল নিয়ে হয়তো তার কতই না গর্ব ছিল। আজ দেখো সব মিথ্যে’।
    এসব কথা শেখরের ভালো লাগে নি সেদিন। ঘরে এসে বিমানকে বলেছিল, ‘আচ্ছা বিমান আমাদের ঘরে কিসের গন্ধ বাতাসে ভাসে?’
    বিমান একটু সময় শেখরের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে সেদিন বলেছিল, ‘দিন বদলের’।
    শেখর বুঝতে পারে নি। ফের শুধিয়েছিল, ‘মানে?’
    বিমান সেদিন দুহাত উপরে তুলে অদ্ভুত গলায় বলেছিল, ‘সময় আসলে একদিন ঠিক তুমি নিজেও সেই গন্ধ পাবে’।
    বন্ধ ঘরের তালাটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শেখরের বিজয়ের কথা মনে হয়। চাঁপা ফুলের সুবাসকে ছাড়িয়েও সে যেন সত্যি সত্যি অন্য ধরণের গন্ধ পেতে শুরু করে। এটাই কি সেই দিন বদলের গন্ধ। নাকি নিজের ভেতরকার বদলের গন্ধ।
    বলরাম এসে বলে, ‘দাদাবাবু যাও না সেই কখন এসেছ নিজের চাবি দিয়ে ঘর খুলে ভেতরে যাও’।
    স্মিত হাসে শেখর। বড়ো করুণ সে হাসি। কারণ চাবিখানা তো ভবানিপুরে বাড়িতে তার ঘরের দেরাজের ড্রয়ারে রয়ে গেছে। তাই বলরামকে বলে, ‘তাড়াহুড়োয় চাবি ফেলে এসেছি বলরামদা। বারান্দাতেই বসে বিমানের জন্য অপেক্ষা করি। তুমি বরং চা হয়ে গেলে আমাকে একটু দাও। মাথাটা ধরেছে’।
    আসল কথা আন্নাদের বাড়ি চায়ের পাট থাকায় এবং তা নিয়মিত এ কদিন খেতে খেতে এই উষ্ণ তরলটির প্রতি তার কিঞ্চিৎ মোহ জন্মে গেছে। বারান্দায় বসে বিমানের বলা কথাটা মাথার ভেতর ফের কয়েকবার ঢালা উপুড় করে, ‘দিন বদলের গন্ধ’।

    শেখরেরও এতক্ষণে খেয়াল হয় একটু আগেই বলরাম তাকে বলেছিল বিমান ঘরে আছে। সে তাই জিজ্ঞাসা করে, ‘বলরামদা তুমি তো একটু আগেই বললে বিমান ঘরে আছে’।
    বলরাম বাঁ হাত দিয়ে বাঁ কান মুলে জিভ বার করে বলে, ‘হেই জগন্নাথ শেখরবাবু, বিমানবাবু দুপুরেই বেরিয়ে গেছে বেমালুম ভুলে গেছি। আসলে এ কারণেই তো খাঁটি মধুর দরকার ছিল’।
    শেখর হা হয়ে তাকিয়ে থাকে বলরামের দিকে। বলরামের কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারে না। আজ দুপুরে বিমানের বাইরে যাওয়ার সাথে 'মধু'র কি সম্পর্ক। বলরাম মাথা চুলকে নিজেই খোলসা করে। বেশ গুরুগম্ভীর গলায় বলে, ‘আমার অসুখ করেছে শেখরবাবু’।
    শেখরের সবকিছু ঘুলিয়ে যায়। সে এবার জিজ্ঞাসা না করে পারে না, ‘তোমার কথার কিছু বুঝতে পারছি না আমি’।
    বলরাম একটু কাছে এগিয়ে এসে রহস্যময় গলায় ফিসফিস করে বলে, ‘আমার ভুলে যাওয়ার অসুখ করেছে শেখরবাবু। কিছু মনে রাখতে পারছি না’।
    শেখর ভ্রূ কুঁচকে বলে, ‘তোমার ভুলে যাওয়া ......, বিমানের দুপুরে বাইরে যাওয়ার সাথে ভুলে যাওয়ার সম্পর্ক ..............., তুমি আমাকে সবকিছু একটু খোলসা করে বলতো বলরাম’।
    বলরাম অভ্যস্ত দুঃখকাতর গলায় জানায়, কে নাকি বলেছে, খাঁটি কালো মধু, তুলসীপাতা, গোলমরিচ দানা একসাথে থেঁতো করে খেলে ভুলে যাওয়া অসুখ সেরে যাবে। আকাশ থেকে পড়ে শেখর, এ তো সর্দি, কাশিতে খায়। বলরাম প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় জানায়, গতকাল তারিণীবাবু নাকি বলেছিল তার জন্য আলু, উচ্ছে, পেঁয়াজ দিয়ে আচ্ছা করে ভাজতে আর হিতেনবাবু বলেছিল তার জন্য আলু, উচ্ছে সিদ্ধ করতে, আর বাকিদের জন্য উচ্ছের শুক্তো। সে নাকি সব ভুলে উচ্ছে আর পেঁপে দিয়ে তরকারি করে রেখেছিল। সে নিয়ে চরম অশান্তি। হিতেনবাবু বলে দিয়েছে সামনে মাস থেকে চাকরি নট। বিমান এসে না দাঁড়ালে এ জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াত তার ঠিক নেই।
    বলরামের কথা শুনে শেখর হাহা করে হেসে ওঠে। বলরাম মাথার টিকিতে হাত বোলায়। হা জগন্নাথ, সে হাসির কথাটা কি বলল। তবে কি দেশে গিয়ে শেখরবাবুরও মাথার ব্যামো হয়ে গেল। মধু, তুলসীপাতা, গোলমরিচ তবে তো শেখরেরও খাওয়ার দরকার। শেখর হাসতে হাসতে সিমেন্টের টানা লাল রঙের বারান্দাটায় বসে পড়ে। বলে, 'বলরামদা তোমার জায়গায় আমি থাকলে আরও ভুল হতো। একই উচ্ছের অতরকম রান্না ভুল হওয়া তো স্বাভাবিক'।
    বলরামের চোখমুখে অপার বিস্ময়।
    শেখর অভয় দেয়, ‘তুমি কিছু ভেবো না বলরামদা, তোমার মাথায় ভুলে যাওয়ার কোনও অসুখ বাসা করে নি এবং এর জন্য তোমায় কোনরকম মধু, তুলসীপাতা, গোলমরিচ খেতে হবে না। তবে তোমাকে আমি মধু আনিয়ে দেবো’।
    বলরামের মুখে হাসি ফোটে। ভুলু সদর দরজার দিকে তাকিয়ে ‘কেউ’ করে আদরের ডাক ডেকে ওঠে। লেজ নাড়তে থাকলে শেখরও তাকায়। বেশ অনেকগুলো ঝুলি-ঝোলা নিয়ে বিমানকে আসতে দেখে শেখর ছুটে গিয়ে বিমানকে জড়িয়ে ধরে। বিমান আপ্লুত হয়ে পড়ে। চোখে জল এসে পড়ে, ‘শেখর তুমি এতদিন পরে এলে। তোমার জন্য চিন্তায় আমার অস্থির অস্থির লাগতো’।
    শেখর কেঁদেই ফেলে, ‘তুমি তো সব জানো বিমান, আমি কি আতান্তরে পড়েছিলাম’।
    বিমান থামিয়ে দেয় শেখরকে, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আগে ঘরে চল, বিশ্রাম নাও। এতটা পথ এসেছো’।
    দুই বন্ধুর এমন অন্তরঙ্গ মিলন দৃশ্যে বলরামের খুব আনন্দ হয়। সে বলে, ‘যাও যাও ঘরে যাও তোমরা, আমি চা মুড়ি, তেলেভাজা দিয়ে আসছি’।
    ভুলুও লেজ নাড়তে নাড়তে তার খুশি প্রকাশ করে। অনেক অনেক দিন বাদে প্রিয় বন্ধুর সঙ্গ শেখরকে যেন সত্যিকারের খুশির সন্ধান দেখায়। (ক্রমশ)

    ২২

    নিজেদের ঘরে ঢুকে বিমান শেখরকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলে, “শেখর এই প্রবন্ধখানা লিখেছি, শোনো। তোমার মতামতের আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব আছে ...... মুঘল তথা দেশীয় শক্তিসমূহের অবক্ষয়ের সহিত ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বে সমগ্র পৃথিবীতেই ভারতীয় নীলের বাজার বিস্তৃত হয়। ফরাসী বণিক লুই বোর্ণড ছিলেন হুগলী অঞ্চলের প্রথম নীলকর। ১৭৮০ অব্দের মধ্যভাগে কোম্পানির উদ্যোগে প্রায় একডজন ইউরোপীয় নীলকর বাংলায় নীল উৎপাদনের কাজে যুক্ত হইয়াছিলেন। ১৭৯০-এ গভর্ণর ইন কাউন্সিলকে লেখা চিঠিতে একজন নীল কুঠিয়াল ক্যারল ব্লুম সরকারের নিকট হইতে নীল চাষ সম্পর্কে সকল প্রকার সহযোগিতা প্রার্থনা করেন ও তা মঞ্জুর হয়। সে সময়কার নবজাগরণের অন্যতম মুখ রাজা রামমোহন, দ্বারকানাথ ঠাকুর চাহিয়াছিলেন নীল চাষের মাধ্যমে জনগণের উন্নতি হউক।
    প্রাচীন গ্রীক পণ্ডিত প্লীনি প্রভৃতি মনীষীরা ইন্ডিকাম বলিয়া নীলের বর্ণনা করিয়াছিলেন। নীল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Indigofera tinctoria। Indigo নামের সহিত হিন্দুস্থান নামের একটি সম্পর্ক আছে। ইংরেজ আমলে প্রথম ভাগে আমেরিকা হইতে নীল উৎপাদনের নূতন প্রণালী এদেশে আসে এবং উহার প্রবর্তক ফরাসী বণিক লুই বোর্ণড। তিনি ১৭৩৭ অব্দে ফ্রান্সের অন্তর্গত মাসেই শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে গিয়া দৈবক্রমে নীলের ব্যবসা শিক্ষা করেন। তিনিই ১৭৭৭ অব্দে বঙ্গদেশে আসিয়া চন্দননগরের নিকটবর্তী তালডাঙ্গা ও গোন্দলপাড়ায় দুইটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। ক’বছর পর মালদহে একটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। সেখানে চুনের অভাব দেখিয়া একটি মুসলমান কবরখানা হইতে মনুষ্যাস্থি উঠাইয়া পুড়াইয়া চুন প্রস্তুত করেন।
    এমন কি ১৮১৫-১৬ অব্দে বঙ্গদেশ হইতে সমস্ত পৃথিবীতে নীল সরবরাহ হইত, বিশেষত নদীয়া, যশোহর জেলার নীল ছিল সে সময় জগতের ভেতর বিখ্যাত। প্রথম দিকে জমিদারদের অধীনে অল্প জমিতে নীলকর সাহেবেরা রায়তের সাহায্যে নীলের চাষ করিত। ১৮১৯ অব্দের অষ্টম আইনে জমিদারদিগের পত্তনী তালুক বন্দোবস্ত করিবার অধিকার দেওয়ায় এক এক পরগণার ভেতর অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হয়। দেশের ধনী ব্যক্তিরাও নিজের অথবা পরের জমিদারির মধ্যে পৃথকভাবে পত্তনী লইয়া নীলের ব্যবসায় যোগ দিতেন। নড়াইয়েলের জমিদার ‘সাহেব’ ম্যানেজার পর্যন্ত রাখিয়াছিল”।
    শেখর বড়ো উশখুশ করছিল কিছু বলবার জন্য। তা লক্ষ্য করে বিমান বলে, ‘তুমি কি কিছু বলতে চাও শেখর?’
    শেখর এতটা পথ পরিশ্রমে সত্যি ক্লান্ত ছিল। এছাড়া সে বিমানের মতো সত্যি বাইরের জগতের খবর খুব কিছু রাখে নি কোনদিন। তবু বিমানের সঙ্গে তার অদ্ভুত বন্ধুত্ব ছিল। বিমানের প্রতি মুগ্ধতাও আছে শেখরের। বিমানের মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু বিমানের চৌখস জ্ঞান, বাস্তব বুদ্ধি, অপরিমেয় পৌরুষের দৃঢ়তা সবসময় আকৃষ্ট করে শেখরকে। অর্থ, বিত্তে প্রাচুর্যের মোড়কে ঢাকা থেকেও বিমানের পাশে শেখর যেন এলেবেলে দুধভাত। তবে বিমান শেখরকে পছন্দ করে তার সহজ সরল মনোবৃত্তির জন্য। অত প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও বড়ো সাধারণ, নিরহংকার। মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে, ভালোবাসে।
    শেখর বলে, ‘না বিমান আমি তেমন কিছু বলতে চাইছি না। শুধু বলতে চাইছি নীল চাষ তো আইন করে বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে তুমি এই প্রবন্ধ লিখছ কেন? এখন কি দরকার এসব দিয়ে?’
    বিমান নিজের বিছানার ওপর আধশোওয়া হয়ে বলে, ‘ভায়া নিজের ব্যক্তিজীবনের বাইরে তো কোনও কিছুর খোঁজ রাখলে না, এখনও নদীয়া, যশোহরে কত চোরাগোপ্তা নীল চাষ হচ্ছে জানো? নীলকুঠিগুলো দেখলে আমার বুকের ভেতর আগুন জলে শেখর। তবে সব থেকে যন্ত্রণার কথা কি জানো, বাংলার রায়তরা যখন নীলকরদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছিল তখনও কিন্তু দেশীয় জমিদাররা কৃষকের লড়াইয়ে তার পাশে দাঁড়ায় নি। নদীয়ার ম্যাজিস্ট্রেট হ্যাসেল নীল কমিশনে সাক্ষ্যে এইসব জমিদারদের নোংরা ভূমিকাকে লক্ষ্য করে বলেন - তারা ইচ্ছা করলে কৃষকদের সাহায্য করতে পারতো কিন্তু তা না করে নীলকরদেরই সাহায্য করে। ভাবতে পারো নদীয়ার কুখ্যাত নীলকর লারমুরকে বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করে জমিদার শ্যামচন্দ্র পাল ও হাবির উল হোসেন’।
    এ আলোচনা হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলতো, বাধ সাধল বলরামের এক হাতে খোপ খোপ পাত্রে ঝোলানো চায়ের গ্লাস আর অন্য হাতে বেগুনি মুড়ির সুগন্ধ। বিমান, শেখর দুজনেই উসখুস করে ওঠে। বিদ্রোহ ভুলে দুজনেই বলরামের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসে। বলরাম অভিভাবকের সুরে বলে, ‘অনেক দিন বাদে দুই বন্ধু একে অপরকে পেয়ে গল্প আর শেষ হচ্ছে না তাই তো? তা বেশ। কিন্তু একজন সেই কত পথ এয়েছে পথে কি পেটে পড়েছে জগন্নাথই জানে। আর একজন তো কলেজের পড়া কি করে জানি না তবে দেশ উদ্ধার করে বেড়ায় মুখ্যু সুখ্যু হলেও বেশ বুঝি। পেটে কিল মেরে ঘোরা তো তার অভ্যাস। নাও এখন এগুলোর সদগতি করে আমাকে উদ্ধার করো দিকি। মেলা কাজ আমার। ওদিকে তারিণীবাবু ফিরেছে। তিনি তো আমাকে চোখে হারান’।
    বলরামের বলার ধরনে শেখর, বিমান দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে। বিমান বলে, ‘না বলরামদা, এত বছর কলকাতায় থেকে থেকে তুমি বাংলা ভাষাটা এত ভাল শিখে গেছো যে যেকোনও বাঙালীর কান কেটে নেবে’।
    বলরাম ‘না বাপু আমার ধাই কিরিকিরি আছু’ বলে একপ্রকার ছুট লাগায়। বিমান শেখর দুজনেই আর এক প্রস্থ হেসে ওঠে। চায়ে চুমুক দিয়ে বিমান বলে, ‘তুমি চলে এসে খুব ভাল কাজ করেছো শেখর, এমনিতেই তুমি পরীক্ষার পড়ায় অনেক পিছিয়ে গেছ। তাছাড়া এমন তাড়াহুড়ো করে চলে গেলে যে দুচারটেও বই যে নিয়ে যাবে তাও করতে পারলে না। আমি মাঝে মাঝে তোমার বই খাতাগুলো মুছে রাখতাম। নচেৎ এমন ধুলোর আচ্ছাদন তৈরি হচ্ছিল যে তুমি আঙ্গুল দিয়ে তার উপরে আন্নাকালির নাম লিখতে পারতে’।
    বিমান কথাটা রসিকতা করে বললেও শেখর বিমানের দু’হাত চেপে ধরে, ‘সত্যি বিমান তোমার সাথে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক, গত জন্মের কোনও পুণ্যফলে তোমায় বন্ধু হিসাবে পেয়েছি এ জন্মে। আমি তোমার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। তুমি যদি আমাকে চিঠি না লিখতে এখনও হয়তো ...............’। কথা শেষ করে না শেখর। বিমানের এমন লঘু পরিহাসে শেখরের আবেগ তাড়িত হয়ে পড়া দেখে বিমান ভারী অবাক হয়ে যায়। সে শেখরের হাতের পাতা দুটি চেপে ধরে বলে, ‘থামলে কেন? হয়তো কি শেখর। বল .........’।
    শেখরের গলা বুজে আসে, কোনরকমে বলে, ‘হয়তো আন্নাকালিতেই বুদ হয়ে থাকতাম ..................। আমাকে তোমার সাথে নাও বিমান। আমিও দেশের কাজ করতে চাই’।

    সমাজ পরিবর্তন, বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষজনেরও সাজ-পোশাক, চিন্তা-ভাবনা সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কিন্তু শেখরের ভেতর এ পরিবর্তন যেন অচানক। যে শেখরকে বিমান চিনতো তা যেন বদলে গেছে। শেখরের দেশের জন্য কাজ করতে চাওয়ার এমন আকুল প্রার্থনায় বিমান খুশি হলেও ভেতরে একটা ধন্দ থেকে যায়। সত্যি কি দেশমাতার এই দুর্দিনে তার পাশে বিমান, শেখরদের মতো যুবকের থাকা প্রয়োজন বলেই এই মানসিক পরিবর্তন? নাকি দুই স্ত্রীকে নিয়ে হাঁসফাঁস করা জীবনে থিতু হতে না পেরে এই পলায়ন মনোবৃত্তি। যাই হোক বিমান খুশিই হয়।

    রাতে সেই বোয়াল মাছের ঝাল দিয়ে আহারের পর শেখর বলে, ‘বিমান তোমার প্রবন্ধের সবটুকুতো শোনা হল না’।
    বিমান খুব মন দিয়ে কি যেন একটা কাগজ দেখছিল। সে বলে, ‘আর একদিন শোনাবো’।
    শেখর আবার শুধোয়, ‘আচ্ছা বিমান এই যে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামমোহন রায় যে নীলচাষকে সমর্থন করলেন, কেন? তারা প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ মানুষ ছিলেন’।
    বিমান তার বন্ধুবরটির মুখের দিকে তাকায়। কি যেন পড়বার চেষ্টা করে। তারপর নিজের মনেই বলে, না শেখরের ভেতর সত্যি একটা পরিবর্তন ঘটেছে। নতুবা এতটা পথ এসে যার ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসার কথা তার কিনা মনে এখন এ সব প্রশ্নের উদয় হচ্ছে। হাতের কাগজটা বিমান যত্ন করে দেরাজে তুলে রেখে উঠোনের দিকের জানলাটা খুলে দিয়ে দাঁড়ায়। জানলা দিয়ে এক ঝলক কাঁঠালিচাঁপার সুবাস ভেসে আসে। বিমান এসে নিজের বিছানায় পা মুড়ে বসে। তারপর বলতে শুরু করে, “দেখো শেখর, দিনেমারদের হাত থেকে সিংহল যখন ইংরেজদের হাতে গেল তখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতেই সিংহলের শাসনভার ন্যস্ত হল। আর অমনি সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানি এমন আইন করলো যাতে কোম্পানির সাহেব ব্যতীত সিংহলে আর কেউ ব্যবসা–বাণিজ্য ও বসবাস না করতে পারে। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট সিংহলের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে নিজের হাতে নিল। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার আলেকজান্ডার জন্‌স্টনের দেওয়া রিপোর্টে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট জানতে পারে সিংহলের যদি ব্যবসা, বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতি সাধন করতে হয় তাহলে বিজ্ঞান, যান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালী ও ইউরোপীয় মূলধনের প্রয়োজন সিংহলে। তারজন্য সকল ইচ্ছুক ইউরোপীয়বাসীকে সিংহলে এসে বসবাস ও বাণিজ্যের অনুমতি দিতে হবে।
    ১৮১০ সালে সিংহলে অবাধ বাণিজ্যনীতি প্রবর্তনের আর একটি নাম ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’। ঠিক তেমনি বাংলাতেও অর্থনৈতিক জীবনের সম্প্রসারণের সব পথঘাট বন্ধ করে দিয়েছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৮২৪ সাল পর্যন্ত এই বাঁধন একটুও আলগা হল না। নীলকর সাহেবদের জমির মালিকানা পাওয়ার জন্য বারবার আর্জি বিফল হল। শেষে তারা বাংলাদেশে কফির চাষ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু জমির মালিকানা না দিলে কিছুতেই তা হওয়া সম্ভব নয় বুঝতে পেরে কোম্পানি অনেক রকম শর্ত দিয়ে জমির মালিকানা দিতে রাজি হয়। শুরু হল কফি চাষ। আবার দেখো শেখর, ঠিক তার তিন বছর পরে ৭ই নভেম্বর কলকাতাবাসী ইউরোপীয়রা একটা সভা ডাকে টাউন হলে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, বাণিজ্যের উন্নতি ও কৃষির উন্নতি সাধন করতে ইংরেজ বণিকরা যে সাহায্য করছে তার উচ্ছ্বসিত বর্ণনা নিজেরাই করলো। কিন্তু ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইশারাতেই তখনও গভর্ণমেন্ট ওঠে বসে। এই মিটিং-এর মাস তিনেক পরে ১৮২৮ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘একজন জমিদার’ এই স্বাক্ষরযুক্ত একটি বিবৃতি প্রকাশ হয় ‘সংবাদ কৌমুদী’ পত্রিকায়। এই একজন জমিদারটি আর কেহ নন - স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লেখেন, ‘এদেশে যাঁর ভূসম্পত্তি আছে এবং যিনি নিজে তাঁর জমিদারী দেখাশোনা করেন তাঁরই কাছে একথা সুবিদিত যে নীলচাষের জন্য কি বিরাট পরিমাণ পতিত জমিতে আবাদ হয়েছে এবং নীলচাষের মালিকরা যে দেশ জুড়ে টাকা ছড়াচ্ছেন তাতে দেশের নিম্ন শ্রেণীরা কেমন স্বচ্ছন্দে দিনপাত করছে। আগেকার দিনে যেসব চাষি জমিদারের জবরদস্তিতে বিনামূল্যে বা অল্প পরিমাণ ধানের বিনিময়ে কাজ করতে বাধ্য হত তাঁরা এখন নীলকরদের আওতায় খানিকটা স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করছে। তাঁরা প্রত্যেকেই নীলকরদের কাছ থেকে মাসিক চার টাকা বেতন পাচ্ছে এবং অনেক মধ্যবিত্তও যাঁরা নিজেকে ও পরিবারকে প্রতিপালন করতে পারতো না, তাঁরা নীলকরদের দ্বারা উঁচু বেতনে সরকার প্রভৃতি পদে নিযুক্ত হচ্ছে। এখন তাঁরা জমিদার বা বেনিয়ার খামখেয়ালী ও মর্জি দ্বারা নির্যাতিত হয় না। অবশ্য এই অবস্থা আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর জমিদারদের নিশ্চয়ই দুঃখের কারণ হবে কেন না তাঁরা নিজ নিজ গণ্ডিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে নিপীড়িত করতেই ইচ্ছুক। সে সময়কার সরকারের কাছে বিচারকরা যে রিপোর্টগুলি দাখিল করেছেন তা দেখলেই রায়তদের প্রতি জমিদারদের নিষ্ঠুর আচরণের কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে। এছাড়া খুব কম জমিদার আছেন যাঁরা ক্বচিৎ নিজের জমি পরিদর্শনে যান। ম্যানেজারের উপরই তাঁদের যত বিশ্বাস। আর ম্যানেজাররা সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে এবং নিজেদের সুবিধার জন্য রায়তদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত করে। চাষিরা ভয়ে গ্রামান্তরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ম্যানেজাররা তাঁদের মনিবের কাছে যে মিথ্যা অজুহাত দেয় তা হচ্ছে এই যে নীলকরদের অত্যাচারে খাজনা কমে গেছে, চাষ হচ্ছে না। এভাবেই মনিবদের অন্ধকারে ফেলে রাখে। এ অবস্থায় আমার এ কথা বলা নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত যে ব্রিটিশ সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেক ইয়োরোপীয় যে এ দেশের লোকদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার করছেন এরা তার বিরোধী অথবা যে ইয়োরোপীয়দের এদেশে অবাধ বসবাসের বিরুদ্ধাচরণ করে, এই বসবাস অবশ্য বিচার পদ্ধতির কতকগুলি পরিবর্তন সাপেক্ষ, সে লোক এ দেশের লোকদের এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের শত্রু’।
    দেখো শেখর দ্বারকানাথ নিজে একজন জমিদার হয়েও জমিদারদের অত্যাচারের কথা অকপটে বলেছেন। নীলকর সাহেবদের যখন অত্যাচারের কথা চারিদিকে ছিছিক্কার তুলছে, সে সময় দ্বারকানাথ বলছেন নীলকর সাহেবরা ‘মহাজন যেন গত সহি পন্থা’ এই মহামন্ত্র জপতে জপতে চাষিদের জিভ বার করে দেবে তাঁদের বুট জুতোর চাপে এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? জমিদারদের নাগরা জুতোর জায়গায় নীলকর সাহেবদের বুট জুতো চাষির বুকে, মুখে লাঞ্ছনা চিহ্ন আঁকছিল এই যা তফাৎ। দ্বারকানাথের সত্যনিষ্ঠ মনের দৌলতেই এ তথ্য জানতে পারি আমরা”।
    শেখর বন্ধু বিমানের দিকে চেয়ে একটা কথা ভাবতে থাকে তা হল বিমানের ভেতরও একটা পরিবর্তন ঘটেছে। যে বিমান নীলকরদের অত্যাচারে মুখর ছিল সে আজ এ কি কথা বলছে। বিমান বুঝি শেখরের মন পড়তে পারে। তাই বলে, ‘দেখো শেখর যেখানে ঝড়ের প্রয়োজন সেখানে কি দখিনা বাতাস দিলে চলে? অন্ধ কুসংস্কার আর মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণায় আমাদের দেশের মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠছে তখন তো নবজাগরণের দরকার। আর তারজন্য চাই একটা জোর ধাক্কা। বলতে পারো উলোটপুরাণ রচনার দরকার। আমাদের সবকিছুকে নবজাগরণের আলোকে আলোকিত করে দেখা উচিত’।
    শেখর বিমানের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই আঁধার রাতেও বিমানের মুখে যেন নতুন ভোরের আলোর দীপ্তি। (ক্রমশ)

    ২৩

    কাঁচপোকা গ্রামটায় কমলার রাধামাধবের মন্দির প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় গ্রামের সবার কাছে এক ধাপে সে মানবী থেকে দেবীতে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সে নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। বদু বেটাও আজকাল শ্মশানের চৌহদ্দি মাড়াতেই চায় না। কোত্থেকে দু’খানা চাঁড়ালের বাপ-মা’হারা ছেলে জোগাড় করে মড়া পোড়ানোর কাজে শিক্ষে দেওয়া শুরু করেছে। ছেলেগুলো কাজের। অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ বেশ রপ্তও করে ফেলেছে। শুধু খুলি ফাটানোর সময়টা বদুকে হাঁক পাড়ে, ‘অ বদুদাদা, দেও দিনি মোক্কম একখান বাড়ি’। বদুর আর এসব একদম ভালো লাগে না। তার মন সারাক্ষণ কমলার শ্রীচরণের তলায় পড়ে থাকতে চায়। মনে কি ভয় কম? ভদ্দর নোকের মুখোশ পরা ঐ যে কায়েত বাবুটা যোগেন না কি নাম যেন যে কিনা বিধবা পুকুর ধারে বদুর জিনিসে ভাগ বসাতে এসেছিল লোকটা মোটেও সুবিধের নয় কো। মা জননীর পাশে পাকা কাঁঠালের মাছির মতো সারাক্ষণ ভনভনিয়ে বেরাচ্ছে। বদুর খুব ইচ্ছা লাশের খুলি ফাটানো তেল চুকচুকে গড়ান গাছের লাঠিটা দিয়ে দেয় মাথাটা দুভাগ করে। কিন্তু সাহসে কুলায় না। তাইতো সে তার মা জননীকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পাহারা দিয়ে রাখে। কমলা বদুর দেওয়া এই পাহারাটুকু মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। সত্যি বলতে কি যোগেনকে তার আর প্রয়োজন নেই। যতটুকু ছিল ততটুকুর কাজ ফুরিয়েছে। ছেলে দুটো শঙ্করীর জীবন। আর শঙ্করীও ওদের কাছে মা বই কিছুই না। এই একটা ব্যাপার বুকের ভেতর নিশপিশ করলেও দেবীর মহিমা অর্জনের জন্য সেটুকু ত্যাগ করতে রাজী কমলা।

    আর এদিকে যোগেন অস্থির চিত্তে ছটফটিয়ে মরছে। এ কোন কমলা বৌঠান। মানুষ এত বদলে যেতে পারে! যোগেন যে কমলার কোনও নাগালই পাচ্ছে না। যত ধরতে যাচ্ছে পারদের মতো ততই কমলা পিছলে যাচ্ছে। আর ঐ শ্মশানের ডোম হারামজাদা বদু সারাক্ষণ শকুনের মতো দৃষ্টি মেলে রয়েছে কমলার দিকে। যোগেন যেন ওর কত জন্মের শত্তুর। একটা শ্মশানের ডোমকে নিয়ে এই আদিখ্যেতা মোটেই কেউ ভালো চোখে নিচ্ছে না সেটা বোঝাতেই পারছে না যোগেন কমলাকে। এখন তো নাকি বাবুর আবার কমলার পেসাদেই অন্ন ভোজন হয়। সে নাকি মদ মাংস তো দূরের কথা পেঁয়াজ রসুনটুকুও খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ভণ্ডামি। ভণ্ডামি। হার বজ্জাত। যোগেনের সমস্ত শরীর গায়ে ছারপোকা ওঠার মতো চিরবিরিয়ে ওঠে শয়তানটাকে দেখলে। সেই জন্য যোগেন ঠিক করে গয়ায় পিণ্ড দিতে যাওয়ার আগে এ নিয়ে সরাসরি কমলা বৌঠানের সাথে কথা বলবেই বলবে। ওদিকে ঘোষাল মশাইয়ের সঙ্গে যে কিছু শলা করবে তারও উপায় নেই। ফোকটে বিষ্ণুর ত্রিপাদ ভূমি দর্শন করতে যেতে পারবে, ফল্গুর জল মাথায় ছেটাতে পারবে, অক্ষয় বটে ধাগা বাঁধতে পারবে, নিজের পূর্বপুরুষের জন্য বালির পিণ্ড দিতে পারবে - সেই আহ্লাদেই খোঁড়া পা সোজা হয়ে জগাই মাধাইয়ের মতো নেত্য করে বেরাচ্ছে। আরে বাবা প্রেত শিলায় তো যেতে হবে সেই যোগেনকেই। মহিমের পিণ্ড তো প্রেত শিলা ছাড়া অন্য কোথাও দেওয়া যাবে না। তখন বুড়ো বামুন তুই কি ভাঙবি পাথরের অতগুলো সিঁড়ি? এই ধরনের চিন্তা মাথায় উদয় হতেই যোগেনের মনে হয় শালা বদু বেটার কথা সারাক্ষণ চিন্তা করতে করতে মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে। নতুবা বৃদ্ধ ঘোষাল মশাইয়ের সম্পর্কে এই ধরনের ভাষা প্রয়োগ করে কিছু ভাবতে পারতো না।

    সকাল সকালই যোগেন ঘোষাল মশাইয়ের উঠোনে এসে উপস্থিত হয়। খুব আন্তরিক গলায় ডাক দেয়, ‘কাকা বাড়ি আছেন নাকি?’
    মনের ভেতরকার সুপ্ত ইচ্ছা বদুর ব্যাপারটা ঘোষাল মশাইকে দিয়েই কমলা বৌঠানকে বোঝাতে হবে।
    ঘোষাল মশাই হাতে একটা লম্বা ফর্দ নিয়ে বাইরে আসে। এসে হাসিমুখে বলে, ‘এই যে বাব যোগেন, তুমি এসেছো? খুব ভালো হয়েছে। নতুবা আমিই যেতাম তোমার কাছে। ফর্দটা করেছি। কিছু জিনিস বসিরহাট বাজার থেকে আনতে হবে। কিছু জিনিস কলকাতা থেকে নিতে হবে। গয়ায় পিণ্ড দেওয়া বলে কথা। চাড্ডিখানি ব্যাপার না’।
    যোগেন উশখুশ করে ওঠে, ‘আসলে আমি বলছিলাম কি ঘোষাল কাকা আমরা দুজনেই এতগুলো দিন গ্রামে থাকবো না, বৌঠানের কি ব্যবস্থা করে যাবেন কিছু ভেবেছেন?’
    বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ফোকলা দাঁতে দ্বিতীয় শৈশবের হাসি হাসে, ‘চিন্তা করো না। বদু তো রইলোই’।
    এমন একটা উক্তি শুনে যোগেনের মুখে একগাল মাছি। তার বিস্ময়ের আর শেষ থাকে না। হা মুখ আর চোখের পলক দুটোই বন্ধ করতে ভুলে যায়।
    ঘোষাল মশাই নাতিকে নিমগাছতলায় চাটাই বিছিয়ে দিয়ে গুড় মুড়ি দিতে বলে। উৎসাহের সঙ্গে যোগেনকে বদুর বীরত্ব নিয়ে বলতেই থাকে, ‘তুমি একদম ভেবো না যোগেন। বদু থাকতে আমার মায়ের ধারেপাশে পিঁপড়েটিও ঘেঁষতে পারবে না’।
    তবু যোগেন শেষ বারের মতো মরীয়া চেষ্টা করে, ‘কিন্তু কাকা, সারাদিন শ্মশানের মড়া ঘাঁটাঘাঁটি করে মহিমের মতো সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণের বাস্তুতে ঐ চাঁড়ালের আনাগোনায় কি পাপ হচ্ছে না?’
    হাই হাই করে ওঠে ঘোষাল মশাই, ‘বলো কি যোগেন, মা আমাদের বলেই দিয়েছে তো রাধামাধবের মন্দির হবে সকল জেতের জন্য। তুমি ওসব নিয়ে কিছু ভেবো না। এই ফর্দটা রাখো। আমি পঞ্জিকা দেখে যাত্রা কবে করা যায় দিনক্ষণ খুঁজে বার করি। ও আর যদি খুব অসুবিধা মনে করে সে তোমার বউ তো রইলোই। তবে বদু আমাদের একাই একশো। তুমি জানো নি, মড়া পোড়ানোর কাজ থেকে ও ক্রমশঃ হাত গুটিয়ে নিয়েছে। দুটো চ্যালা তৈরি করছে। শুধু খুলি ফাটানোয় তারা পোক্ত হয়ে গেলে বদু চিরকালের মতো শ্মশান ছেড়ে তার মা জননীর আঙিনার এক কোণে পড়ে থাকবে’।
    আঁতকে ওঠে যোগেন, ‘কি সর্বনাশ!’
    বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ সে কথায় খেয়াল না করে বলে, ‘খাও যোগেন খাও। টাটকা মৌ-ঝোলা গুড়। গতবারের জিরেন রসে বানানো। এই শেষ এক কলসি ছিল। মুড়ির সাথে বড়ো ভালো খেতে লাগে। আমিতো দাঁত নেই বলে পারি না’।
    জীবনে এমন বিস্বাদ তেঁতো মৌ-ঝোলা গুড় এই প্রথম যেন খাচ্ছে বলে মনে হয় যোগেনের।

    নদীর যখন এক পাড় ভাঙে তখন অন্য পাড় গড়ে। এ হল প্রকৃতির খেলা। মানুষের অন্তরাত্মার ভেতরেও অমন প্রকৃতি বাস করে। যে কিনা ঠিক সময়ে সময়ে জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন ঘটিয়ে দেয়। নতুবা মহিমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাঁচপোকা গ্রামের এই দরিদ্র চট্টোপাধ্যায় পরিবারে যে ভাঙন দেখা দিয়েছিল তা হাবির বিয়েকে কেন্দ্র করে কমলার মানসিক উত্তরণের মাধ্যমে জোড়া লাগতে শুরু করে। এক সময়কার কুচুটে, মুখরা, কলহপ্রিয় কমলা যেন শীতঘুমের মাধ্যমে পুরনো খোলস ত্যাগ করে নতুন ভাবে জেগে উঠেছে। কিন্তু এই জেগে ওঠায় বিষতোলা ফণার হিসহিসানি শব্দ নেই। যা আছে তা বড়ো মিঠে। নতুবা গাঁয়ের মানুষ কাতারে কাতারে কমলার আঙিনার ধুলো মাথায় ঠেকাতে চাইছে কেন! একেই বোধহয় বলে নদীর এক পাড় গড়া।
    কিন্তু যোগেনের অন্তরাত্মা গুলি খাওয়া ঘুঘুর মতো ছটফটিয়ে মরে। সে তার নিজের মনের কোণে জমে থাকা কালো মেঘের চাদরে এ পাড় থেকে ও পাড়টা দেখে। তাই বদুর মধ্যে মাংসাশী মনই খুঁজে পায়। বড় অসহ্য এই আখাম্বা চাঁড়ালটা। তার থেকেও বেশী অসহ্য কমলা বৌঠানের এই অতিরিক্ত বদুপ্রীতি।
    হনহন করে যোগেন মহিমের বাড়ির দিকে চলতে শুরু করে। কিন্তু খানিক দূর গিয়ে তাকে থমকে যেতে হয়। কেননা কমলা বৌঠান কিছু একটা নিয়ে খিলখিল করে হাসছে। তার হাসিতে যোগেনের সর্বাঙ্গ জ্বলে যায়। কতদিন বাদে সে কমলা বৌঠানের এমন ভুঁইয়ে লুটিয়ে পড়া হাসি শুনতে পাচ্ছে। আর উঠোনে ইয়া বড়ো পেল্লাই সাইজের একটা গভ্‌ভ মোচা নিয়ে বদু ব্যাটা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে। কমলা তাকে ফুলে ফুলে হেসে হেসে বলছে, ‘ও বদু তুই এটা করেছিস কি? এত বড়ো মোচা আমার তো সাতজন্ম খেলেও ফোরাবে না’।
    তারপরেই যোগেনকে খেয়াল হয়ে কমলা বলে, ‘যা বদু এই মোচাখানা কায়েত ঠাকুরপোর বাড়ি দিয়ে আয়। সেখানে মেলা লোক, সৎব্যবহার হয়ে যাবে। আমি না হয় শঙ্করীকে বলবোখুনি আমাকে একবাটি তরকারি পাঠিয়ে দিতে। তুই এসে সেটা পরে নিয়ে যাসখোনে’।
    বদু বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে পিঠে গন্ধমাদন পর্বত তোলার মতো করে মাটি থেকে মোচাখানা কাঁধে তুলে নেয়। কিন্তু যোগেন হাইহাই করে ছুটে এসে আগল দিয়ে বদুর সামনে দাঁড়ায়, ‘এই খবরদার না। ও মোচা আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় নিয়ে যাবি না’। তারপর কমলাকে কটাক্ষ করে বলে, ‘কিছু মনে কোরো নে বৌঠান, আমি তোমার মতো পুণ্যির লোভে উদার হতে গিয়ে ম্লেচ্ছ, ডোম, চাঁড়ালের ছোঁয়া জিনিস খেতে পারবো না। আর পরিবারকেও খাওয়াতে পারবো না’।
    কয়েক মুহূর্ত স্থির, অপলক তাকায় কমলা যোগেনের দিকে। তারপর মিঠে হেসে বলে, ‘বেশ তো নাই বা পুণ্য কুড়োলেন। যা বাবা বদু মোচাখানা তাহলে উঠোনের উই কোণে সুপুরি গাছতলায় রেখে যা। বৃহস্পতিবার ছোলা নারকোল দিয়ে রাধামাধবের ভোগেই লাগিয়ে দেবো’।
    মোচার এ হেন গৌরবময় উত্তরণে যোগেনের সর্বাঙ্গে যেন কে জলবিছুটি লেপে দেয়। সে প্রায় তিড়িংবিড়িং করে লাফ দিয়ে ওঠে। স্থানকাল ভুলে চীৎকার করতে লাগে, ‘এ তোমার ভারী অন্যায় কমলা বৌঠান। তুমি এ মোচা দিয়ে রাধামাধবের ভোগ দেবে! গ্রামের সবাই তোমাকে মান্যি করতে শুরু করেছে বলে ধরাকে সরা জ্ঞানে দেখবে নাকি?’
    কমলা শান্ত গলায় বলে, ‘বদু তুই এখন যা। হ্যাঁ আর শোন, তোর চ্যালাদুটোকে যত তাড়াতাড়ি পারিস দাহকার্যে দড় করে আমার উঠোনে পাকাপাকি উঠে আয় তো বাবা। একা মেয়েমানুষ থাকি। সোমত্ত ব্যাটা পাহারা দিলে আর কোনও ভয় নেই। গাঁয়ে যত লোকসংখ্যা বাড়ছে শেয়ালের গর্তগুলো বুজে গিয়ে শেয়ালের উপদ্রব বেড়ে চলেছে’।
    পাথরের মূর্তির মতো বদু নিরুত্তর থেকে ঘাড় নেড়ে ফের সায় দিয়ে রাস্তামুখো অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাঁটতে শুরু করে। দুপা গিয়েও কায়েত বাবুমশাই লোকটার চিন্তায় সে আবার তার মা জননীর কাছে ফেরত আসে।
    কমলা শুধায়, ‘কিছু বলবি বাবা?’
    ঘাড় নাড়ে বদু, ‘হ্যাঁ, মা তুমি কাটারীখানা পাশে নিয়ে বোসো’।
    এক গাল হাসে কমলা, ‘আচ্ছা। তাই হবে’।
    এদিকে যোগেনের মাথার ভেতর জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝাঁঝালো রোদ বগবগিয়ে জ্বলে ওঠে। কোনরকম শালীনতার ধার না ধেরে সে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে কমলার মাটির বারান্দায় উঠে এসে খপ করে কমলার ডান হাতটা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে, ‘এটা তুমি কি শুরু করেছো বৌঠান? এই চাঁড়ালটাকে নিয়ে কেন তোমার এতো বাড়াবাড়ি? এতো দূর ভেবে ফেলেছো যে সে এ বাড়ির উঠোনের পাকাপাকি বাসিন্দা হয়ে যাবে?’
    কমলার ধৈর্যচ্যূতি ঘটে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘হাত ছাড়ুন কায়েত ঠাকুরপো। আপনারা আমার ছেলেদুটোকে মানুষ করছেন, বিপদে-আপদে পাশে থাকেন। তা বলে মাথা কিনে নেন নি। আমার বাড়িতে আমি কাকে আশ্রয় দেব আর কাকে দেব না সেটা আমিই ঠিক করবো। নাঃ যাই দেখি ঘর থেকে কাটারীটা নিয়েই আসি। বদু ঠিকই বলেছে। ওটাকে এবার থেকে আমার কাছাকাছিই রেখে দিতে হবে’।
    অপমানে যোগেনের কান মাথা ঝাঁঝাঁ করতে থাকে। কমলার চোখে চোখ রেখে আগুন হেনে বলে, ‘কাজটা তুমি ঠিক করলে না বৌঠান’।
    কমলা যেখানে কাঁঠাল গাছটা ছিল সেই শূন্য স্থানটার দিকে তাকায়। কি যেন ভাবতে চায়। কিন্তু হঠাৎ করেই মাথার ভিতরটা বরফের চাঙড়ের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যায়। সে খুব বিনীত গলায় বলে, ‘আচ্ছা ঠাকুরপো, ঘোষালমশাইয়ের সাথে আপনাদের গয়ায় পিণ্ড দিতে যাওয়ার তিথি নক্ষত্র দিনক্ষণ নিয়ে কিছু কথা হল?’
    যোগেনের এতক্ষণে সেই ফর্দের কথা মনে পড়ে। বলে, ‘হ্যাঁ, আমি সেখান থেকেই আসছি’।
    খুশীতে কমলার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘যত তাড়াতাড়ি পারেন যাত্রা করুন আপনারা। মানুষটার আত্মা বড়ো কষ্ট পাচ্ছে। পিণ্ড দেওয়া হলে পড়ে পাপের বোঝা কিছু লাঘব হবে আমার’।
    কমলার দুচোখে জল টলটল করে। সেদিকে চেয়ে যোগেন বাক রহিত হয়ে যায়। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। একটু আগে বৌঠানের সঙ্গে কি অমার্জিত, অসভ্য, নির্দয় ব্যবহারখানাই না করে ফেলেছে। অলক্ষ্যে বিধাতা পুরুষ পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে চোখ-কান খোলা রেখে মনেমনে হেসে উঠে বলে – হায় মানুষের মন! (ক্রমশ)

    ২৪

    গাছের যখন পাতা ঝরে যায় তখন তাকে খুব বেশী শূন্য লাগে। মনে হয় এ শূন্যতা বুঝি কোনোদিন কাটবে না। বড়ো রিক্ত, শীর্ণ, দীর্ণ মনে হয়। বড়ো হাহাকার করে। সোহাগীর মৃত্যু রামতনুর লাটে এমন এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। যে মৃত্যু শশীর কাছে এত প্রয়োজনীয় ছিল, এত কাম্য ছিল, সে মৃত্যু শশীকে এক উলঙ্গ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তা হল রামতনুর প্রলাপ। বিকারের ঘোরের মতো সে বকেই চলেছে, ‘সোহাগী আমি আসছি, তুমি কোনও চিন্তা করো না। তোমার চুল কেটে দিয়ে শশী খুব অন্যায় করেছে। শশী বরাবর খুব নিষ্ঠুর। আমরা এই বাদার নোনা দেশ ছেড়ে চলে যাব সোহাগী’। কখনও বা হাসছে। বলছে, ‘বাঃ আলতা পরলে তোমার পা দুটি বেশ সোন্দর দেখায় তো। এবার বসিরহাট গেলে আমি তোমার জন্য মাথায় মাখার গন্ধ তেল, মুখে মাখার স্নো এনে দেব’। আবার কখনও বা বাচ্চা ছেলের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, ‘তোমাকে কতবার বললাম সোহাগী বেশী করে খয়ের দিয়ে পান খেয়ে শশীর মতো ঠোঁট জোড়া রাঙিয়ে আমার সামনে আসবে, তুমি একবারও তা করলে না’। একটা কাঙ্ক্ষিত মৃত্যু শশীকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিয়েছে। শশীর বুকের ভেতর কামারশালার লাল আগুনের মতো ধক্‌ ধক্‌ করছে কাঁচা ঘায়ের যন্ত্রণা। কিন্তু তা এমন বেআব্রু যে কিছুতেই কারও সামনে কোনোদিন দেখানো যাবে না। শুধু মাঝে মাঝে টগরমণিকে বুকের ভেতর চেপে ধরে গোঙানির মতো শব্দ করে কি সব বলে, ছোটো বালিকার পক্ষে কিছু বোঝা সম্ভব হয় না। শুধু মনে হয় মা, সাবুর মা পিসিকে কত ভালোবাসতো। তার মায়ের মতো মা আর কোত্থাওটি নেই। কাঁচপোকা গ্রাম, সেখানে ফেলে আসা তার জীবনটা আস্তে আস্তে করে একটা ধূসর চাদরের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেতে থাকে। ব্যথা ভোলানোর প্রকৃতির আশ্চর্য মলম সময়। সময়ের প্রলেপ পড়তে পড়তে সব দগদগে ক্ষত একদিন শুকিয়ে যায়। হয়তো কোথাও কোথাও দাগ থেকে যায়। যেমন থেকে গেছে হাবির মনে মহিমের স্মৃতি। সেই সঙ্গে দুঃসহ অভিমান – বাবা তাকে একটিবারও দেখতে আসে না, এমন কি যোগেন কাকাও না। ঠিক আছে হাবিও যাবে না বাবার কাছে। আবার মনে হয় বাবা তাকে বলেছিল বিয়ে হয়ে গেলে মাছ, মণ্ডা খেতে দেবে। কিন্তু বরটা পালিয়ে যেতেই তো সব গোল বাঁধলো। বাবার কি দোষ। আর তাছাড়া মাছ, মণ্ডা খেতে খেতে সত্যি অরুচি ধরে গেছে। বরং সাবুর এনে দেওয়া টকটক গাব, খেতের থেকে টাটকা তেউড়ির দানা অনেক সুস্বাদু, লোভনীয়।
    সাবুকে ফেলতে পারে নি শশী। অন্তর্দাহে পুড়ে খাক হতে হতে কোথায় একটা প্রায়শ্চিত্য করতে মন চায়। নিঃসন্তান, বিধবা নাপিত বউকে এ বাড়ির দক্ষিণ কোণে চারচালা মাটির ঘর তুলে থাকতে দিয়েছে শশী। বলেছে, ‘ছোটো ছেলে একা শুতে রাতে যদি ডরায়, নিশিতে ডাকে, বোবায় ধরে, তুমি ছেলেটাকে নিয়ে থাকো নাপিত বৌ। মা মরা ছেলে, তোমারও কোল ভরবে’। নাপিত বৌ মহা খুশি। সাবু, সাবুর মাকে থাকতে দেওয়া ঘরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শশী সেখানে নিজে দাঁড়িয়ে হরেক রকম ফুল গাছ লাগিয়েছে। না হলে জায়গাটা কেমন খাঁ খাঁ করছিল। শশীর এ ধরনের আচরণে গ্রামের লোক, এ বাড়ির ঝি চাকর কেমন বিস্মিত হতে থাকে। আহা ঠাকরুনের কলজেটা যে বাদার কাদার মতো নরম তা কেউ বুঝতেই পারে নি এতদিন। শুধু রামতনু নামে এ বাড়ি, এ লাটের মনিবটিকে কেউ আর দেখতে পায় না। কি করে সে। ঘুমায়। হ্যাঁ শশী তাকে চব্বিশ ঘণ্টাই আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। মাঝে মাঝে উল্টেপাল্টে নেড়েচেড়ে দেয়। ঘেন্না করে শশী এই লোকটাকে। ঘেন্না করে শশী তার স্বামীকে। ঘেন্না করে শশী তার সন্তানের বাবাকে। আর যত ঘেন্না করে তত তার সিঁথির সিঁদুর চওড়া হয়। পায়ের আলতা লক্ষ্মীমণি জবার রঙকেও হার মানায়। মানুষ ভাবে আহা সতী লক্ষ্মী। সাক্ষাৎ জগৎজননী মা। শশীর ‘কলা’ উপচে পড়ে। শশী বলে, ‘সাবু তো আমার সন্তান বৈ কিছু তো নয়। হতভাগী তো আমার কাছে রেখেই নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পেরেছে। আমি আমার ঘরেই মাটিতে ছোঁড়ার বিছানার ব্যবস্থা করতে পারতাম, কিন্তু বুঝিস তো ছেলের বৌ নে থাকি ঘরে। আজ শোকে তাপে লোকের মুখ বন্ধ থাকলেও খুলতে কতক্ষণ’। নাপিত বৌ হাতে চাঁদ পায়। সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পর্কও বদলায়। এই যেমন মহিমের দ্বিতীয় পক্ষ তুচ্ছ কমলা তার বোন হল। নিজের একমাত্র সন্তান পর হল। ছেলের বৌ হাবিরানী থেকে সাধের প্রাণের কোলজোড়া সন্তান টগরমণি হল। আবার এখন টগরমণি থেকে ছেলের বৌ হল।

    কবিরাজ মশাই একদিন অন্তর তার শেকড়, বাকড়, পাচন বড়ির ঝুলিখানা নিয়ে আসেন রামতনুকে দেখতে। তখন রামতনুর ঘরে একমাত্র শশীর হুকুম ছাড়া কারও থাকার হুকুম নেই। এমন কি টগরমণিরও তখন সে ঘরে ঢোকা নিষেধ। একদিন খেলতে খেলতে বেখেয়ালে ঢুকে গিয়েছিল রামতনুর ঘরে। শশীর প্রচণ্ড বকুনিতে প্রথমটা জড়সড় হয়ে যায় বেচারি। তারপর কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। শশী তাকে কক্ষনও বকে না। হয়তো কখনও কখনও শাসন করে। কিন্তু সে শাসনের ভেতরেও থাকে প্রশ্রয়, আদরের সুর। টগরও জানে শশী তার সত্যিকারের মা। এ বাড়িতে এসে এই প্রথম টগরের ভেতর থেকে হাবি জেগে ওঠে। বাগানের বাতাবীলেবু গাছটার নীচে যেখানে হাবির আর সাবুর খেলনা বাটির সংসার পেতেছে সেখানে এসে হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে। আজ সকালেই সাবু বাবলা গাছের আঠা আর ছোটো ছোটো ইটের কুচি এনে দিয়েছে। মাংস, বাবলা গাছের আঠা ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস আর ইটের কুচি দিয়ে হাড়গোড় হবে। আহা ছোট ঠাকরুন কাদা জল দে কি সোন্দর করি রাঁধবে আর সাবু মিছিমিছি সেগুলো তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাবে।
    ছোট ঠাকরুন হেসে বলবে, ‘আর একটু দিই সাবু’। সাবু হেসে ঘাড় কাৎ করবে আর টগর সাবুর কলাপাতায় বালির ভাত আর বাবলা গাছের আঠার তৈরি মাংস ঢেলে দেবে। এ বড়ো তৃপ্তির খেলা তাদের, পরম শান্তির খেলা। শশীর কঠিন নিষেধ আছে, ‘খবরদার সাবু, ছোট ঠাকরুনের সঙ্গে খেলা করবি, দেখাশোনা করবি, ও যা বলে ফাইফরমাশ খাটবি কিন্তু আঙুল দিয়েও ওকে কক্ষনো ছুবি না। তালে বলো মা কালী ঘুমিয়ে থাকলে যে হাত দে ওকে ছুবি সে হাত কেটে নেবে’। সাবু তাই কক্ষনো ছোট ঠাকরুনের সাথে ধরাধরি খেলে না। ছোট ঠাকরুন একটু ছুটোছুটি করে খেলতে ভালোবাসে। বেচারি তো গাঁয়ের আর কোনও বাচ্চার সাথে খেলবার সুযোগ পায় না। শশীর নিষেধ। তাই শুধু সাবুর সাথেই খেলে। সাবুও তাই এখন এ বাড়ির সীমানার বাইরে আর খুব একটা যায় না। একমাত্র ছোট ঠাকরুনের কিছু আদেশ হলে তখন যায় বাড়ির বাইরে। এ বাড়ির বাগানে গাব গাছটা নেই কিন্তু টগর টকটক গাব ফল খুব পছন্দ করে। সেই গাব ফল সংগ্রহের জন্য মাঝে মাঝে চণ্ডী খুঁড়োর বাগানে ঢুঁ দিতে হয়। সেই গাব ফল ভেঙে নুন দিয়ে জিভ দিয়ে টাগরায় চকাস চকাস শব্দ তুলে চোখ বন্ধ করে কেমন সুন্দর করে চোখ বুজিয়ে বুজিয়ে খায়, তা দূরে উবু হয়ে বসে সাবুর দেখতে ভারী ভালো লাগে। ছোট ঠাকরুন সাবুর কাছে পরম বিস্ময়, মুগ্ধতার খনি।
    শশীর কাছে বকুনি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসে টগরের সব রাগ গিয়ে পড়ে ঐ খেলনা বাটির সংসারটার উপর। একটা একটা করে টান মেরে মেরে সব ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এমন কি সাবুর এনে দেওয়া সেই বাবলা আঠার মাংস। টগরের ভেতর থেকে এক ঝটকায় হাবিরানী বেরিয়ে আসে। বে’র পরদিন সেই যে কাঁচপোকা গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল, সেই গ্রামটার সব সবকিছু, বাবা, মা, ভাই দুটো, যোগেন খুঁড়ো, শঙ্করী খুঁড়ি, ওবাড়ির ঠাকমা, খেলার সাথী মানী, বেঁচু, গাছগাছালি, পাখপাখালি, ঘরবাড়ি সবকিছু। সাবু কি কারণে যেন বাগানে ঘুরঘুর করছিল। দূর থেকে ছোট ঠাকরুনকে কাঁদতে দেখে ছুটে আসে। এমন দৃশ্য সাবুর চোখে দেখা প্রথম। সে কোনোদিন ছোট ঠাকরুনকে কাঁদতে দেখে নি। শুধু হাসতেই দেখে। তাছাড়া তাদের খেলনা বাটির সংসারটার ছত্রখান অবস্থা দেখে আরও কষ্ট পায়। এ সংসারখানায় সে কে সে জানে না, শুধু জানে কিন্তু সংসারখানা সাজাতে তার মেহনতও তো কম নয়। তার খুব ইচ্ছা করে হাত দিয়ে ছোট ঠাকরুনের চোখের জল মুছিয়ে দিতে। কিন্তু ঘুমের ঘোরে মা কালী হাতখানা কেটে নিয়ে গেলে সে খাবে কোন হাত দিয়ে। তাই না ছুঁয়েই শুধোয়, ‘এমন করে কানছো কেন ছোট ঠাকরুন?’
    শুধোতে গিয়ে তার নিজেরই কান্নায় গলা বুজে আসে। সাবুকে কাছে পেয়ে টগরের দুঃখ দ্বিগুণ হয়। সে হিক্কা দিয়ে কেঁদে ওঠে। কান্নার দমকে তার ছোট্ট ফর্সা টুলটুলে মুখখানা লাল হয়ে যায়। সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, ‘আমি এ বাড়ি থাকবো না সাবু, তুমি আমাকে কাঁচপোকা গ্রামে আমাদের বাড়ি দিয়ে এস। আমি বাবার কাছে যাব, ভাইদের কাছে যাব’।
    সাবু ছোটো হলেও টগরের থেকে বড়ো। তাছাড়া বিভিন্ন জীবন অভিজ্ঞতা তাকে পরিপক্ক করে দিয়েছে। সে শুধোয়, ‘তোমার কি হয়েছে ছোট ঠাকরুন?’
    টগর নিজেই নিজের আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে বলে, ‘মা বকেছে’।
    সাবু বলে, ‘তুমি নিশ্চয়ই কিছু করেছিলে। ঠাকরুন তো শুধু শুধু বকবে না’।
    টগর আত্মপক্ষ সমর্থন করে, ‘আমি কি জানতাম বলো, বাবার ঘরে কবরেজ এসেছে তা আমি কেমন করে জানবো। আমি তো পুতুলের কাপড় খুঁজতে গিয়েছিলাম’।
    সাবু বেশ বয়স্ক অভিভাবকের মতো করে বলে, ‘সে তো তুমি অন্যায় করেছিলে বটে ছোট ঠাকরুন। তুমি জানো না ঠাকুরের কঠিন ব্যামো। ঠাকরুনের কত মনে কষ্ট। তাকে একা সব সামলাতে হয়। এত বড়ো তালুক সামলানো কি চাড্ডিখানি মুখের কথা। কবরেজ মশাই দেখতে এয়েছেন। কত জরুরী কথা, কাজ সেখানে। আর তুমি কিনা সেখানে পুতুলের শাড়ি খুঁজতে গে গোল করছিলে। ঠাকরুন বলে তোমাকে বকুনি দিয়েছে আমার মা হলি তো দু ঘা ......’। কথা শেষ করতে পারে না। তার আগেই দু’চোখ জলে ভরে যায়।
    টগর নিজের দুঃখ ভুলে ছুটে আসে। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে সাবুর চোখের জল মুছিয়ে দিতে চায়। সাবু লাফ দিয়ে দু’পা সরে যায়। আতঙ্কিত মুখে বলে, ‘করতেছো কি ছোট ঠাকরুন, আমাকে ছুঁয়ো নে। ঠাকরুনের নিষেধ আছে’।
    টগর দুষ্টু হাসি হেসে বলে, ‘জানি তো সাবু। কিন্তু সে তো তোমার। তুমি আমারে ছুঁয়ে দিলি, মা কালী ঘুমের মধ্যি এসি তোমার হাত কেটে দেবে’।
    অগত্যা হার স্বীকার করতে হয় সাবুকে। টগর তার কচি কচি আঙুলগুলো দিয়ে সাবুর চোখের জল মুছিয়ে দেয়। আর সাবুর সমস্ত শরীর-মন জুড়ে নাম না জানা এক অদ্ভুত শিহরণে শিহরিত হতে থাকে। প্রচণ্ড দিনের পর দিন দাবদাহের পর মাটিতে জল পড়লে যেমন সোঁদা গন্ধ বের হয় এও তেমনি। কিন্তু ভবী ভোলবার নয়। শশীর বকুনি এক ঝটকাতে টগরমণির খোলস ভেঙে হাবির জাগরণে সে আবার বলে, ‘আমি আমার গাঁয়ে যাব সাবু’।
    সাবু বলে, ‘এটাই তো তোমার গাঁ’।
    টগরমণি এক বগ্‌গা, ‘না, কাঁচপোকা গ্রামই আমার গাঁ। সেখানে আমার বাবা, ভাইরা, মা, যোগেন খুঁড়ো, শঙ্করী খুঁড়ি, ঠাকমা সবাই আছে’।
    সাবু আবার অভিভাবকের ভূমিকা নেয়, ‘ওমা তুমি জানো না ছোট ঠাকরুন, মেয়েদের বে হয়ে গেলে সেটাই তার নিজের বাড়ি, সে গাঁই তার নিজের গাঁ’।
    কপাল কুঁচকে তাকায় টগর – বে? হ্যাঁ। তা বটে, বে’র মতো কি যেন একটা ঘটেছিল তার জীবনে। কিছুই তো মনে নেই। শুধু ঐ মাছ মণ্ডার কথা ছাড়া। কিন্তু সেও তো অরুচি ধরে গেছে।
    সাবুই উপায় বাতলে দেয়, ‘তোমাকে সেখানে নে যাওয়া কোনও মতেই সম্ভব না। তাই আমিই একদিন সেখানে গে সেখানকার সব খোঁজ এনে দেব তোমাকে’।
    হাসি ফোটে টগরমণির মুখে।
    সাবু এবার অভিমান করে, ‘তবে তুমি আমাদের খেলাঘরটা ভেঙে দে ঠিক করো নি ছোট ঠাকরুন’।
    ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙা খেলাঘরটার দিকে টগরেরও খুব খারাপ লাগে। দু’হাতে কান ধরে দুধের দাঁত দেখিয়ে হেসে বলে, ‘আর কোনও দিন আমাদের খেলাঘর ভাঙবো নি সাবু’।
    হাসিমুখে অবুঝ দুই বালক-বালিকা নিজেদের খেলনাবাটির ভাঙা ঘর গোছাতে বসে। পাকা গিন্নীর মতো টগর বলে, ‘কি আর করা যাবে, মাংসটা তো ফেলে দিয়েছি। আজ ডাল-ভাত খাও। কাল আবার মাংস এনোখনে, রেঁধে দেব’।

    কবিরাজ নিয়মিত আসে। এটা সবাই দেখে। কিন্তু কি ওষুধ দেয় সে সবার অজানা। অবশ্যি জানার কথাও নয়। মাঝখানে গৌরি এসেছিল খুঁড়োকে দেখতে। বাপ সমান খুঁড়োর এ হেন দুর্দশা দেখে স্থির থাকতে পারে নি। চীৎকার চ্যাঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করেছিল। বারবার শশীকে বলেছে, ‘ও তোমার কবরেজ কি ভুসি ওষুধ দিচ্ছে যে খুঁড়ো আমার রাতদিন মরার মতো পরি থাকে। তুমি অন্য কবরেজ দেখাও। বসিরহাট নে যাও। আর তাছাড়া মানের গুমোরে তালা না মেরি রেখে শেখরকে খপর দেও। তোমাদের জামাইকে গে বলি আমি। সে নিজে গে কলকাতা থেকি ভায়েরে ধরি আনবানে। কোথাকার কোন ছুঁড়িকে বউ করি এনি গলার মালা করি ঝুলায়ে রেখেছো। কেন আমি সেই ছোট্ট বয়স থেকি সতীন নে ঘর করছি, তাতি কি আমি পচে গলে গেছি? কম ঠ্যাঙানি খেয়েছি বরের কাছে। সেখানে শেখর তো শিব ঠাকুরটি’।
    শশী নিজের অন্তর্দ্বন্দে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। সেও গৌরীর এই ঠোনা মারা কথা সহ্য করতে পারে না। তুলোধোনা করে গৌরীকে। গৌরী স্পষ্ট জানিয়ে যায় তার এবার বাপের বাড়ির সম্পত্তি চাইই চাই।

    রামতনু ঢুলুঢুলু চোখে শশীর দিকে তাকায়। শশীর দুচোখে হিস্রতার আগুনের ফিনকি দিয়ে আগুন ছোটে। রামতনু ছোট ছেলের মতো টলমল করে উঠে বসে। শশীর দিকে চেয়ে বলে, ‘তুমি শশী না?’
    শশীর ভেতরে আগুনে জল পড়ে ভাপ সৃষ্টি হয়। আঁচল দিয়ে রামতনুর মুখ মুছিয়ে দিয়ে বলে, ‘কেন আমারে চিনতে পারতেছো না?’
    ভয়ে জড়সড় হয়ে যায় প্রতাপশালী মানুষটা। বলে, ‘চলে যাও, চলে যাও তুমি। তোমার কথা শুনে আমার ছেলে আমার একমাত্র সন্তানকে আমি ত্যাজ্য করেছি। তুমি সোহাগীকে বিধবা বানিয়ে চুল কেটে দিয়েছো। তুমি নিষ্ঠুর’।
    শশীর অন্তরাত্মা ছটফটিয়ে মরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘বড়ো দরদ না তোমার ঐ মাগীর প্রতি’।
    রামতনু একটু ঝুঁকে শশীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘দরদ হবে বইকি। আমি যে তাকে ভালোবাসি। তোমার তো খালি শরীর আছে। আর তার যে শরীর মন দুটোই আছে’।
    শশী হাতের পুড়িয়ায় রাখা আফিমের ঢ্যালাখানা রামতনুর মুখ চেপে ধরে ভরে দেয় হা-মুখে। হাসে। বলে, ‘ন্যাও এবার স্বপন দেখো সে মরা মাগীর’। (ক্রমশ)
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০২ মার্চ ২০২০ | ৭৯৬ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • Tanwi,. Halder | 162.158.23.4 | ০৯ এপ্রিল ২০২০ ১২:৪৮92115
  • ২২

    নিজেদের ঘরে ঢুকে বিমান শেখরকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলে, “শেখর এই প্রবন্ধখানা লিখেছি, শোনো। তোমার মতামতের আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব আছে ...... মুঘল তথা দেশীয় শক্তিসমূহের অবক্ষয়ের সহিত ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বে সমগ্র পৃথিবীতেই ভারতীয় নীলের বাজার বিস্তৃত হয়। ফরাসী বণিক লুই বোর্ণড ছিলেন হুগলী অঞ্চলের প্রথম নীলকর। ১৭৮০ অব্দের মধ্যভাগে কোম্পানির উদ্যোগে প্রায় একডজন ইউরোপীয় নীলকর বাংলায় নীল উৎপাদনের কাজে যুক্ত হইয়াছিলেন। ১৭৯০-এ গভর্ণর ইন কাউন্সিলকে লেখা চিঠিতে একজন নীল কুঠিয়াল ক্যারল ব্লুম সরকারের নিকট হইতে নীল চাষ সম্পর্কে সকল প্রকার সহযোগিতা প্রার্থনা করেন ও তা মঞ্জুর হয়। সে সময়কার নবজাগরণের অন্যতম মুখ রাজা রামমোহন, দ্বারকানাথ ঠাকুর চাহিয়াছিলেন নীল চাষের মাধ্যমে জনগণের উন্নতি হউক।
    প্রাচীন গ্রীক পণ্ডিত প্লীনি প্রভৃতি মনীষীরা ইন্ডিকাম বলিয়া নীলের বর্ণনা করিয়াছিলেন। নীল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Indigofera tinctoria। Indigo নামের সহিত হিন্দুস্থান নামের একটি সম্পর্ক আছে। ইংরেজ আমলে প্রথম ভাগে আমেরিকা হইতে নীল উৎপাদনের নূতন প্রণালী এদেশে আসে এবং উহার প্রবর্তক ফরাসী বণিক লুই বোর্ণড। তিনি ১৭৩৭ অব্দে ফ্রান্সের অন্তর্গত মাসেই শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে গিয়া দৈবক্রমে নীলের ব্যবসা শিক্ষা করেন। তিনিই ১৭৭৭ অব্দে বঙ্গদেশে আসিয়া চন্দননগরের নিকটবর্তী তালডাঙ্গা ও গোন্দলপাড়ায় দুইটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। ক’বছর পর মালদহে একটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। সেখানে চুনের অভাব দেখিয়া একটি মুসলমান কবরখানা হইতে মনুষ্যাস্থি উঠাইয়া পুড়াইয়া চুন প্রস্তুত করেন।
    এমন কি ১৮১৫-১৬ অব্দে বঙ্গদেশ হইতে সমস্ত পৃথিবীতে নীল সরবরাহ হইত, বিশেষত নদীয়া, যশোহর জেলার নীল ছিল সে সময় জগতের ভেতর বিখ্যাত। প্রথম দিকে জমিদারদের অধীনে অল্প জমিতে নীলকর সাহেবেরা রায়তের সাহায্যে নীলের চাষ করিত। ১৮১৯ অব্দের অষ্টম আইনে জমিদারদিগের পত্তনী তালুক বন্দোবস্ত করিবার অধিকার দেওয়ায় এক এক পরগণার ভেতর অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হয়। দেশের ধনী ব্যক্তিরাও নিজের অথবা পরের জমিদারির মধ্যে পৃথকভাবে পত্তনী লইয়া নীলের ব্যবসায় যোগ দিতেন। নড়াইয়েলের জমিদার ‘সাহেব’ ম্যানেজার পর্যন্ত রাখিয়াছিল”।
    শেখর বড়ো উশখুশ করছিল কিছু বলবার জন্য। তা লক্ষ্য করে বিমান বলে, ‘তুমি কি কিছু বলতে চাও শেখর?’
    শেখর এতটা পথ পরিশ্রমে সত্যি ক্লান্ত ছিল। এছাড়া সে বিমানের মতো সত্যি বাইরের জগতের খবর খুব কিছু রাখে নি কোনদিন। তবু বিমানের সঙ্গে তার অদ্ভুত বন্ধুত্ব ছিল। বিমানের প্রতি মুগ্ধতাও আছে শেখরের। বিমানের মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু বিমানের চৌখস জ্ঞান, বাস্তব বুদ্ধি, অপরিমেয় পৌরুষের দৃঢ়তা সবসময় আকৃষ্ট করে শেখরকে। অর্থ, বিত্তে প্রাচুর্যের মোড়কে ঢাকা থেকেও বিমানের পাশে শেখর যেন এলেবেলে দুধভাত। তবে বিমান শেখরকে পছন্দ করে তার সহজ সরল মনোবৃত্তির জন্য। অত প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও বড়ো সাধারণ, নিরহংকার। মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে, ভালোবাসে।
    শেখর বলে, ‘না বিমান আমি তেমন কিছু বলতে চাইছি না। শুধু বলতে চাইছি নীল চাষ তো আইন করে বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে তুমি এই প্রবন্ধ লিখছ কেন? এখন কি দরকার এসব দিয়ে?’
    বিমান নিজের বিছানার ওপর আধশোওয়া হয়ে বলে, ‘ভায়া নিজের ব্যক্তিজীবনের বাইরে তো কোনও কিছুর খোঁজ রাখলে না, এখনও নদীয়া, যশোহরে কত চোরাগোপ্তা নীল চাষ হচ্ছে জানো? নীলকুঠিগুলো দেখলে আমার বুকের ভেতর আগুন জলে শেখর। তবে সব থেকে যন্ত্রণার কথা কি জানো, বাংলার রায়তরা যখন নীলকরদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছিল তখনও কিন্তু দেশীয় জমিদাররা কৃষকের লড়াইয়ে তার পাশে দাঁড়ায় নি। নদীয়ার ম্যাজিস্ট্রেট হ্যাসেল নীল কমিশনে সাক্ষ্যে এইসব জমিদারদের নোংরা ভূমিকাকে লক্ষ্য করে বলেন - তারা ইচ্ছা করলে কৃষকদের সাহায্য করতে পারতো কিন্তু তা না করে নীলকরদেরই সাহায্য করে। ভাবতে পারো নদীয়ার কুখ্যাত নীলকর লারমুরকে বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করে জমিদার শ্যামচন্দ্র পাল ও হাবির উল হোসেন’।
    এ আলোচনা হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলতো, বাধ সাধল বলরামের এক হাতে খোপ খোপ পাত্রে ঝোলানো চায়ের গ্লাস আর অন্য হাতে বেগুনি মুড়ির সুগন্ধ। বিমান, শেখর দুজনেই উসখুস করে ওঠে। বিদ্রোহ ভুলে দুজনেই বলরামের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসে। বলরাম অভিভাবকের সুরে বলে, ‘অনেক দিন বাদে দুই বন্ধু একে অপরকে পেয়ে গল্প আর শেষ হচ্ছে না তাই তো? তা বেশ। কিন্তু একজন সেই কত পথ এয়েছে পথে কি পেটে পড়েছে জগন্নাথই জানে। আর একজন তো কলেজের পড়া কি করে জানি না তবে দেশ উদ্ধার করে বেড়ায় মুখ্যু সুখ্যু হলেও বেশ বুঝি। পেটে কিল মেরে ঘোরা তো তার অভ্যাস। নাও এখন এগুলোর সদগতি করে আমাকে উদ্ধার করো দিকি। মেলা কাজ আমার। ওদিকে তারিণীবাবু ফিরেছে। তিনি তো আমাকে চোখে হারান’।
    বলরামের বলার ধরনে শেখর, বিমান দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে। বিমান বলে, ‘না বলরামদা, এত বছর কলকাতায় থেকে থেকে তুমি বাংলা ভাষাটা এত ভাল শিখে গেছো যে যেকোনও বাঙালীর কান কেটে নেবে’।
    বলরাম ‘না বাপু আমার ধাই কিরিকিরি আছু’ বলে একপ্রকার ছুট লাগায়। বিমান শেখর দুজনেই আর এক প্রস্থ হেসে ওঠে। চায়ে চুমুক দিয়ে বিমান বলে, ‘তুমি চলে এসে খুব ভাল কাজ করেছো শেখর, এমনিতেই তুমি পরীক্ষার পড়ায় অনেক পিছিয়ে গেছ। তাছাড়া এমন তাড়াহুড়ো করে চলে গেলে যে দুচারটেও বই যে নিয়ে যাবে তাও করতে পারলে না। আমি মাঝে মাঝে তোমার বই খাতাগুলো মুছে রাখতাম। নচেৎ এমন ধুলোর আচ্ছাদন তৈরি হচ্ছিল যে তুমি আঙ্গুল দিয়ে তার উপরে আন্নাকালির নাম লিখতে পারতে’।
    বিমান কথাটা রসিকতা করে বললেও শেখর বিমানের দু’হাত চেপে ধরে, ‘সত্যি বিমান তোমার সাথে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক, গত জন্মের কোনও পুণ্যফলে তোমায় বন্ধু হিসাবে পেয়েছি এ জন্মে। আমি তোমার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। তুমি যদি আমাকে চিঠি না লিখতে এখনও হয়তো ...............’। কথা শেষ করে না শেখর। বিমানের এমন লঘু পরিহাসে শেখরের আবেগ তাড়িত হয়ে পড়া দেখে বিমান ভারী অবাক হয়ে যায়। সে শেখরের হাতের পাতা দুটি চেপে ধরে বলে, ‘থামলে কেন? হয়তো কি শেখর। বল .........’।
    শেখরের গলা বুজে আসে, কোনরকমে বলে, ‘হয়তো আন্নাকালিতেই বুদ হয়ে থাকতাম ..................। আমাকে তোমার সাথে নাও বিমান। আমিও দেশের কাজ করতে চাই’।

    সমাজ পরিবর্তন, বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষজনেরও সাজ-পোশাক, চিন্তা-ভাবনা সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কিন্তু শেখরের ভেতর এ পরিবর্তন যেন অচানক। যে শেখরকে বিমান চিনতো তা যেন বদলে গেছে। শেখরের দেশের জন্য কাজ করতে চাওয়ার এমন আকুল প্রার্থনায় বিমান খুশি হলেও ভেতরে একটা ধন্দ থেকে যায়। সত্যি কি দেশমাতার এই দুর্দিনে তার পাশে বিমান, শেখরদের মতো যুবকের থাকা প্রয়োজন বলেই এই মানসিক পরিবর্তন? নাকি দুই স্ত্রীকে নিয়ে হাঁসফাঁস করা জীবনে থিতু হতে না পেরে এই পলায়ন মনোবৃত্তি। যাই হোক বিমান খুশিই হয়।

    রাতে সেই বোয়াল মাছের ঝাল দিয়ে আহারের পর শেখর বলে, ‘বিমান তোমার প্রবন্ধের সবটুকুতো শোনা হল না’।
    বিমান খুব মন দিয়ে কি যেন একটা কাগজ দেখছিল। সে বলে, ‘আর একদিন শোনাবো’।
    শেখর আবার শুধোয়, ‘আচ্ছা বিমান এই যে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামমোহন রায় যে নীলচাষকে সমর্থন করলেন, কেন? তারা প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ মানুষ ছিলেন’।
    বিমান তার বন্ধুবরটির মুখের দিকে তাকায়। কি যেন পড়বার চেষ্টা করে। তারপর নিজের মনেই বলে, না শেখরের ভেতর সত্যি একটা পরিবর্তন ঘটেছে। নতুবা এতটা পথ এসে যার ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসার কথা তার কিনা মনে এখন এ সব প্রশ্নের উদয় হচ্ছে। হাতের কাগজটা বিমান যত্ন করে দেরাজে তুলে রেখে উঠোনের দিকের জানলাটা খুলে দিয়ে দাঁড়ায়। জানলা দিয়ে এক ঝলক কাঁঠালিচাঁপার সুবাস ভেসে আসে। বিমান এসে নিজের বিছানায় পা মুড়ে বসে। তারপর বলতে শুরু করে, “দেখো শেখর, দিনেমারদের হাত থেকে সিংহল যখন ইংরেজদের হাতে গেল তখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতেই সিংহলের শাসনভার ন্যস্ত হল। আর অমনি সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানি এমন আইন করলো যাতে কোম্পানির সাহেব ব্যতীত সিংহলে আর কেউ ব্যবসা–বাণিজ্য ও বসবাস না করতে পারে। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট সিংহলের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে নিজের হাতে নিল। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার আলেকজান্ডার জন্‌স্টনের দেওয়া রিপোর্টে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট জানতে পারে সিংহলের যদি ব্যবসা, বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতি সাধন করতে হয় তাহলে বিজ্ঞান, যান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালী ও ইউরোপীয় মূলধনের প্রয়োজন সিংহলে। তারজন্য সকল ইচ্ছুক ইউরোপীয়বাসীকে সিংহলে এসে বসবাস ও বাণিজ্যের অনুমতি দিতে হবে।
    ১৮১০ সালে সিংহলে অবাধ বাণিজ্যনীতি প্রবর্তনের আর একটি নাম ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’। ঠিক তেমনি বাংলাতেও অর্থনৈতিক জীবনের সম্প্রসারণের সব পথঘাট বন্ধ করে দিয়েছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৮২৪ সাল পর্যন্ত এই বাঁধন একটুও আলগা হল না। নীলকর সাহেবদের জমির মালিকানা পাওয়ার জন্য বারবার আর্জি বিফল হল। শেষে তারা বাংলাদেশে কফির চাষ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু জমির মালিকানা না দিলে কিছুতেই তা হওয়া সম্ভব নয় বুঝতে পেরে কোম্পানি অনেক রকম শর্ত দিয়ে জমির মালিকানা দিতে রাজি হয়। শুরু হল কফি চাষ। আবার দেখো শেখর, ঠিক তার তিন বছর পরে ৭ই নভেম্বর কলকাতাবাসী ইউরোপীয়রা একটা সভা ডাকে টাউন হলে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, বাণিজ্যের উন্নতি ও কৃষির উন্নতি সাধন করতে ইংরেজ বণিকরা যে সাহায্য করছে তার উচ্ছ্বসিত বর্ণনা নিজেরাই করলো। কিন্তু ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইশারাতেই তখনও গভর্ণমেন্ট ওঠে বসে। এই মিটিং-এর মাস তিনেক পরে ১৮২৮ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘একজন জমিদার’ এই স্বাক্ষরযুক্ত একটি বিবৃতি প্রকাশ হয় ‘সংবাদ কৌমুদী’ পত্রিকায়। এই একজন জমিদারটি আর কেহ নন - স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লেখেন, ‘এদেশে যাঁর ভূসম্পত্তি আছে এবং যিনি নিজে তাঁর জমিদারী দেখাশোনা করেন তাঁরই কাছে একথা সুবিদিত যে নীলচাষের জন্য কি বিরাট পরিমাণ পতিত জমিতে আবাদ হয়েছে এবং নীলচাষের মালিকরা যে দেশ জুড়ে টাকা ছড়াচ্ছেন তাতে দেশের নিম্ন শ্রেণীরা কেমন স্বচ্ছন্দে দিনপাত করছে। আগেকার দিনে যেসব চাষি জমিদারের জবরদস্তিতে বিনামূল্যে বা অল্প পরিমাণ ধানের বিনিময়ে কাজ করতে বাধ্য হত তাঁরা এখন নীলকরদের আওতায় খানিকটা স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করছে। তাঁরা প্রত্যেকেই নীলকরদের কাছ থেকে মাসিক চার টাকা বেতন পাচ্ছে এবং অনেক মধ্যবিত্তও যাঁরা নিজেকে ও পরিবারকে প্রতিপালন করতে পারতো না, তাঁরা নীলকরদের দ্বারা উঁচু বেতনে সরকার প্রভৃতি পদে নিযুক্ত হচ্ছে। এখন তাঁরা জমিদার বা বেনিয়ার খামখেয়ালী ও মর্জি দ্বারা নির্যাতিত হয় না। অবশ্য এই অবস্থা আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর জমিদারদের নিশ্চয়ই দুঃখের কারণ হবে কেন না তাঁরা নিজ নিজ গণ্ডিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে নিপীড়িত করতেই ইচ্ছুক। সে সময়কার সরকারের কাছে বিচারকরা যে রিপোর্টগুলি দাখিল করেছেন তা দেখলেই রায়তদের প্রতি জমিদারদের নিষ্ঠুর আচরণের কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে। এছাড়া খুব কম জমিদার আছেন যাঁরা ক্বচিৎ নিজের জমি পরিদর্শনে যান। ম্যানেজারের উপরই তাঁদের যত বিশ্বাস। আর ম্যানেজাররা সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে এবং নিজেদের সুবিধার জন্য রায়তদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত করে। চাষিরা ভয়ে গ্রামান্তরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ম্যানেজাররা তাঁদের মনিবের কাছে যে মিথ্যা অজুহাত দেয় তা হচ্ছে এই যে নীলকরদের অত্যাচারে খাজনা কমে গেছে, চাষ হচ্ছে না। এভাবেই মনিবদের অন্ধকারে ফেলে রাখে। এ অবস্থায় আমার এ কথা বলা নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত যে ব্রিটিশ সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেক ইয়োরোপীয় যে এ দেশের লোকদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার করছেন এরা তার বিরোধী অথবা যে ইয়োরোপীয়দের এদেশে অবাধ বসবাসের বিরুদ্ধাচরণ করে, এই বসবাস অবশ্য বিচার পদ্ধতির কতকগুলি পরিবর্তন সাপেক্ষ, সে লোক এ দেশের লোকদের এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের শত্রু’।
    দেখো শেখর দ্বারকানাথ নিজে একজন জমিদার হয়েও জমিদারদের অত্যাচারের কথা অকপটে বলেছেন। নীলকর সাহেবদের যখন অত্যাচারের কথা চারিদিকে ছিছিক্কার তুলছে, সে সময় দ্বারকানাথ বলছেন নীলকর সাহেবরা ‘মহাজন যেন গত সহি পন্থা’ এই মহামন্ত্র জপতে জপতে চাষিদের জিভ বার করে দেবে তাঁদের বুট জুতোর চাপে এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? জমিদারদের নাগরা জুতোর জায়গায় নীলকর সাহেবদের বুট জুতো চাষির বুকে, মুখে লাঞ্ছনা চিহ্ন আঁকছিল এই যা তফাৎ। দ্বারকানাথের সত্যনিষ্ঠ মনের দৌলতেই এ তথ্য জানতে পারি আমরা”।
    শেখর বন্ধু বিমানের দিকে চেয়ে একটা কথা ভাবতে থাকে তা হল বিমানের ভেতরও একটা পরিবর্তন ঘটেছে। যে বিমান নীলকরদের অত্যাচারে মুখর ছিল সে আজ এ কি কথা বলছে। বিমান বুঝি শেখরের মন পড়তে পারে। তাই বলে, ‘দেখো শেখর যেখানে ঝড়ের প্রয়োজন সেখানে কি দখিনা বাতাস দিলে চলে? অন্ধ কুসংস্কার আর মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণায় আমাদের দেশের মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠছে তখন তো নবজাগরণের দরকার। আর তারজন্য চাই একটা জোর ধাক্কা। বলতে পারো উলোটপুরাণ রচনার দরকার। আমাদের সবকিছুকে নবজাগরণের আলোকে আলোকিত করে দেখা উচিত’।
    শেখর বিমানের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই আঁধার রাতেও বিমানের মুখে যেন নতুন ভোরের আলোর দীপ্তি। (ক্রমশ)
  • স্বাতী রায় | 117.194.45.134 | ০২ জুন ২০২০ ০০:২৬93878
  • পড়ছি। টানটান উত্তেজনা। কবে পরের পর্ব আসবে সেই অপেক্ষায় থাকি।
  • | 2401:4900:188a:b22d:4bf:a9d6:b844:8760 | ০২ জুন ২০২০ ১৫:২৭93891
  • পড়ছি।

    কিন্তু কমেন্টে এসে গেছে পর্বটা। মূল লেখার সাথে যোগ হলে ভাল হয়।
  • শঙ্খ | 116.206.220.59 | ০২ জুন ২০২০ ১৭:০২93892
  • বাহ নতুন পর্ব, খন্ড এসে গেছে দেখে ভালো লাগলো।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত