• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • তিনটি গল্প : এক ভণ্ড সাধুর বিচিত্র পাঠ

    Purusattam Singha
    আলোচনা : বিবিধ | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৫০৩ বার পঠিত

  • আজ মধ্যমোহনবাটী গ্রন্থাগারে গল্পপাঠের আসর ছিল। গল্পপাঠে অংশ নিয়েছিলেন সৌরেন চৌধুরী, দেবেশকান্তি চক্রবর্তী, সুনন্দা গোস্বামী ও শুভব্রত লাহিড়ী। গল্পের আলোচক হিসাবে ছিলেন অধ্যাপক দীপকচন্দ্র বর্মন ও এই অধম। অধমের এক পাঠ অভিজ্ঞতা এ লেখা।

    সৌরেন চৌধুরী আমার অন্যতম প্রিয় গল্পকার। কিন্তু আজকের গল্পটি তেমন মুগ্ধ করতে পারেনি। এ গল্প পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে পড়েছে শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের কথা। এ বুঝি আমারই মুদ্রাদোষ। শরৎচন্দ্র ‘মহেশ’ গল্প যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন মনোজ দে নিয়োগী ‘আবারও মহেশ’ গল্প। সেসব প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমরা সৌরেন চৌধুরীর আজকের গল্প ‘ভূতনাথ’ এর দিকে নজর দেব। ভুতনাথ একটি বলদের নাম। সে আজ বিক্রি হয়ে যাবে। গ্রামীণ জীবনের অভাবী মানুষের কাছে এ বাস্তব সত্য। লেখকের গল্পের উপাদান এটুকুই। এরপর লেখক নিজের মতো করে গল্প সাজিয়ে নিয়েছেন। আসলে তিনি একটি গল্প লিখতে চান। উপাদান হিসাবে এই সত্যটিকে ধরলেন। এরপর নিজের দক্ষতা গুণে উড়ান দিলেন। এ গল্পের মধ্যেও লুকিয়ে আছে অভাব, মানুষ ও পশুর এক আশ্চর্য স্নেহের সম্পর্ক। কিন্তু অভাবের কাছে সেই স্নেহ হার মেনেছে। গফুর মহেশকে বিক্রি করে দিতে পারেনি, কিন্তু এ গল্পের ভূপেন ভূতনাথকে বিক্রি করে দিয়েছে। দারিদ্র্যতাই এ জন্য দায়ী। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কোন চিহ্ন এখানে নেই। কেননা গ্রামীণ জীবনে মানুষ পশুপালন করে নিজের অর্থের জন্য। সেখানে স্নেহ থাকে ঠিকই কিন্তু মাঝেমাঝে সেই স্নেহকেও বিসর্জন দিতে হয়। সৌরেন চৌধুরীরা গল্পের আঙ্গিকে কোন নজর দেন না, আর কেনই বা দেবেন, হাতের সামনেই শত শত উপাদান। চোখের সামনেই যেন ঘটে যাচ্ছে বহু গল্প। মহাকাল যেন তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে তা নিজের ভাষায়, নিজের উপলব্ধিতে লিপিবদ্ধ করার। ফলে নিজের ভূগোলকে সামনে রেখেই তিনি গল্পগুলিকে সাজান। শুধু এ গল্প নয় সৌরেন চৌধুরীর প্রায় সব গল্প সম্পর্কেই এ কথা সত্য।

    এ গল্পের কাহিনি ভূপেনের বলদ গরু ভূতনাথকে। ভূতনাথ ছোট থেকেই সীমাহীন অত্যাচার করে চলেছে। আজ স্ত্রীর অসুখের টাকার জন্য ভূপেন গিয়েছে ভূতনাথকে বিক্রি করতে। পিতৃসত্তার যে আর্তনাদ ভূপেন তা উপলব্ধি করেছে। কিন্তু সেও এক নিঃস্ব মানুষ। ভূতনাথকে বিক্রি ছাড়া অন্য কোন পথ তাঁর কাছে খোলা নেই। কিন্তু বারবার মনে মনে ভেবেছে ভূতনাথকে যেন বলি দেওয়া না হয়। আবার ভূতনাথ বিক্রি হয়েছে হিন্দু নবীন বর্মনের কাছে। মুসলিমদের উৎসব বলেই ভূতনাথের এত দাম হয়েছে। লেখক সময়ের বিবর্তনের চিত্র আঁকেন। নবীন হিন্দু হলেও গোরুর পাইকার। সে গোরু বিক্রি করে মুসলিমদের কাছে। সময়ের বিবর্তনে মানুষের শ্রেণির বিবর্তন ঘটে গেছে। নবীনরা গোরুর পাইকার হয়ে গেছে, অভাবই এজন্য দায়ী। কৃষিতেও পরিবর্তন এসেছে, ফলে বলদ গোরুর তেমন চাহিদা নেই। মাধবীদের রাখালও নেই। কেননা প্রযুক্তি জমি দখল করার মাধবীরাও রাখালকে বিদায় দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে যে ভূতনাথের জন্মতে মাধবী সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্ধ হয়েছিল সেই ভূতনাথই আজ মাধবীর আরোগ্য জীবনে সহায়ক হয়েছে, এও বুঝি মানুষের নিয়তি।

    সৌরেন চৌধুরীর গল্প বলার একটি নিজস্ব কৌশল আছে, যেমন সকল লেখকের থাকে। তিনি নিজেই গল্প বলেন। গল্পের বিরাট ক্যানভাসে যান না। গল্পের শাখা প্রশাখা বাড়াতেও আগ্রহী নন। গল্পটিকে তিনি নিটোল করে তোলেন। চরিত্রের মুখে আঞ্চলিক সংলাপ বসিয়ে দেন। তবে তা কৃত্তিম করে তোলেন না। তবে গল্পের ফর্ম কে কেন ভাঙছেন না তা জানি না। এ গল্পের শেষ হয়েছে সেই চিরাচরিত রীতিতে। ভূপেনের চোখে জল আর নবীনের প্রশ্ন। একজন গল্পকার শেষ সত্য হিসাবে যা জেনেছেন তাই লিখেছেন, তবে পাঠক হিসাবে আমাদের আরও কিছু যেন দাবি করে ! তবে সে দাবির অবকাশের সুযোগ লেখক দেননি।

    সৌরেন চৌধুরীর এই গল্পের যে আখ্যান তা কিন্তু আরও গল্পে আমরা পাব। মনে করা যেতে পারে ‘ধলি’ গল্পের কথা । বা সেই কুঞ্জবালার ছাগল পালনের কথা। সবই বিবর্তিত সমাজের ছবি, বিবর্তিত সময়ের ভাষ্য। এখানে আরও একটি পশুকেন্দ্রিক গল্পের কথা বলব, সেটি নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের। তাঁকে আর মেলানো গেল না অন্য গল্পকারদের সঙ্গে। আজকের এই বিচ্ছিন্ন সময়ে আরও একবার জরুরি পাঠের দাবি রাখে নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের ‘শিবমঙ্গল’ গল্পটি। আজকের লেখককে ভারতীয়ত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি জাগরণের প্রেরণা ছাড়া অন্য উপায় নেই। এক ভয়ংকর সময় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আজকের ভারতবাসীকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ‘শিবমঙ্গল’ আপাত দৃষ্টিতে একটি পশুকেন্দ্রিক গল্প। কিন্তু পশুকেন্দ্রিক গল্পকে লেখক মানবতার মেলবন্ধনের সীমায় বেঁধেছেন। বাংলা সাহিত্যে অজস্র পশুকেন্দ্রিক গল্প লেখা হয়েছে। তারপরও নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত একটি গল্প লিখলেন। কিন্তু লেখক সচেতনভাবেই পূর্বের গল্পগুলিকে এড়িয়ে গেলেন। আসলে হাতের সামনেই গল্পের শত শত উপাদান। ফলে প্রভাবিত হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসেনা। জাহ্নবীবাবুর ষাঁড়ের নাম ‘শিবমঙ্গল’। কৃষিভিত্তিক গ্রাম। মুসলিম নিয়ামত কাজীর জমিতে ফসল নষ্ট করেছিল শিবমঙ্গল। নিয়ামতের সন্তান হালিমের আঘাতে শিবমঙ্গল আহত হয়। উত্তপ্ত হয়ে যায় পরিবেশ, দাঙ্গা সৃষ্টি হতে যায়। পুলিশের সাহায্য নিতে যায় দুইপক্ষই। কিন্তু ভারতবর্ষের গ্রাম বাংলা তো হিন্দু মুসলমানের মিলিত সহচার্যে সৃষ্টি। তা মিলিত সংস্কৃতির বার্তাবাহক। শিবমঙ্গল ফসল নষ্ট করেছে সত্য, কৃষকের ক্ষতি করেছে এও সত্য। এখানে কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, দুই জাতির উত্তপ্ত পরিস্তিতিকে থামিয়েছে জাহ্নবী ও নিয়ামত কাজী। ‘শিবমঙ্গল’ এখানে ধর্মের বার্তাবাহক, কিন্তু যেখানে হিন্দু মুসলমানের মিলিত অবস্থান সেখানে ধর্ম ও ধর্মীয় গোঁড়ামি পিছু হাঁটতে বাধ্য। দূর বহুদূরে চলে গেছে শিবমঙ্গল, পিছুপানে তাকিয়ে দেখেছে ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপ –“ক্রমে ক্রমে হিন্দু মুসলমানের একটি মিলিত দল ধবমান মিছিলের মত ছুটতে লাগল অনন্তকোঠা, মহাদেবপুর, মালোন, ধামসার পথ ধরে।“

    দেবেশকান্তি চক্রবর্তীর ‘ব্রজসুন্দরী উপাখ্যান’ দেশভাগের পটভূমিকার লেখা। দেশভাগে উদ্বাস্তু হওয়ার যে যন্ত্রণা তাঁকে সামনে রেখে এ গল্পের প্লট বিবর্তিত হয়েছে। স্টাইল হিসাবে বেঁছে নিয়েছেন দেশজ রীতিকে। রূপকথা, উপকথা যেমন বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে এ কাহিনিও যেন তেমন। উপকথা যেমন মিথ্যা হয়েও সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়, আবার সত্য হয়েও সম্পূর্ণ সত্য নয়। সেই সত্য-মিথ্যার রূপকের মধ্যে লেখক একটি ভয়ংকর সত্যকে বুনে দিলেন। যে সত্য বাঙালি বিগত পঞ্চাশ বছরেও ভোলেনি। দেশভাগে উদ্বাস্তু মানুষের যে আত্মযন্ত্রণা তা যেন বহন করে চলে রাতের অন্ধকারে। প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে মাতা সন্তানদের শোনান ব্রজসুন্দরীর গল্প। যেখানে লুকিয়ে আছে দেশভাগের নির্মম বাস্তবতা বা ট্র্যাজেডি। সে সত্যকে মাতা বলতে উপকথার আশ্রয় নেন। এই উপকথা গড়ে ওঠে রাতের অন্ধকারে। দিনের ঘোর আলোয় এ কাহিনি যেন গড়ে উঠতে পারে না।

    এ গল্পের দুটি দিক। দেশভাগে ওপার থেকে এপারে আসার সময় ব্রজসুন্দরীর নিখোঁজ হওয়া, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালির জীবনের একটি নির্মম ইতিহাসের সত্য। আর এই সত্যের মধ্যে আরও প্রবল সত্য হল সংসারে অভাব। ঘরে ক্ষুধা, অন্ন নেই। স্বামী রাতের অন্ধকারে ফিরলে মাতা সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেবেন। এখানে দুটি সত্য বর্তমান। আমরা একটিকে ছোট সত্য, অন্যটিকে বড় সত্য বলতে পারি। ছোট সত্য সংসারে নিত্য অভাব, বড় সত্য রায়টে ব্রজসুন্দরীর নিঁখোজ হওয়া। কিন্তু এই দুই সত্যের কোন সত্যই মাতা সন্তানকে বুঝতে দিতে চান না। ফলে আশ্রয় নিতে হয় উপাখ্যান বা উপকথার –
    ‘’সেই অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই ব্রজসুন্দরী উপাখ্যান। তরুবালার যত সুন্দর গল্প বলার কৌশল। যেভাবে দক্ষ গল্পকার গল্পের খেঁজুরি বোনে। বানানো গল্পের ঘোড়া কল্পনায় দুনিয়া চষে বেড়ায় অশ্বমেধের ঘোড়ার মত।‘’ ( মায়ামেঘ, ষষ্ঠ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, এপ্রিল ২০০৩, পৃ. ১২ )

    লেখক আমাদের জানালেন ‘বানানো গল্পের ঘোড়া’। আসলে ঈশ্বরের সত্যের পাশেই গল্পের সত্যের অবস্থান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন –‘সাহিত্যের সত্য বাস্তবের সত্য থেকে সাত হাত দূরে অবস্থান করে’। কিন্তু লেখকের কাজ হল কৌশলে সেই অবাস্তবের মধ্যেই বাস্তবকে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া। আর যিনি তা পারেন তিনি সার্থক গল্পকার। দেবেশকান্তি চক্রবর্তী অন্তত এই গল্পে পেরেছেন। গল্পের প্রথম চরণেই তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন –‘হাঁড়িতে ভাত ফুটছে, মিথ্যে ভাত।‘ (তদেব ) আসলে মাতাকে তো সব গোপন করতে হয়। সন্তানের মুখে হাসি ফোঁটাতে মিথ্যার রঙিন স্বপ্ন বুনতে হয়। কিন্তু এ মিথ্যা ক্ষণিক। ঘরে স্বামী চাল নিয়ে প্রবেশ করলেই আজকের মত গল্প শেষ। আবার শুরু হবে কাল থেকে। রূপকথার কাহিনি যেমন ঘুরে ঘুরে আসে এই ব্রজসুন্দরীর উপখ্যানও যেন তেমনই। প্রতিদিনই নতুন করে শুরু হয়। মাতার গল্পের পুঁজিও স্বল্প। কিন্তু এর থেকেও বড় কথা মাতা গল্পের আসল মোড়কটি ভাঙতে চান না, যেখানে লুকিয়ে আছে আমাদের বাঙালি জাতির এক অস্তিত্বের লজ্জা। কিন্তু লেখককে তো গল্প শেষ করতে হবে। ফলে একসময় প্রকাশ পেয়ে যায় প্রকৃত সত্য –

    ‘’এইসব পারিবারিক উপাখ্যানগুলির বয়স দেশভাগের সময়। বয়স অনেক, তবু গাঁথা থাকে সবার মনেই। ব্রজসুন্দরীর উপখ্যানও পারিবারিক। কে জানে, এখন আর বেঁচে বর্তে আছে কিনা ? কত দিনের কথা ! এখনও কি মানুষটা আগের মতই ফ্যাকাসে ? নাকি রক্তে কিছু তোলপাড় হয় ? এখনও কি শিরার মধ্যে নীল রক্ত বয়ে বেড়ায়, খুব কিছু না ভেবে, স্বাধীনতার পরেও ?’’ ( তদেব, ১৩ )
    এ উপাখ্যান অন্য উপাখ্যান থেকে ভিন্ন। অন্য রূপকথা শেষে পাঠকের বা শ্রোতার কিছু মেলে না। কিন্তু ব্রজসুন্দরীর উপখ্যানের অর্ধপথেই আসে গরম ভাতের গন্ধ। এই গরম ভাতই যেন শেষ করে দেয় উপকথার। আজকের মতো তা শেষ আবার তা কাল থেকে শুরু হবে। এক হিসাবে এটি মাতার গল্পও। মাতা কাহিনি বুনে চলেছেন সন্তানদের সামনে। কিন্তু এ কাহিনির সমাপ্তি বলে কিছু নেই। আবার নতুন করে শুরু হবে। লেখক যেন ইচ্ছাকৃতই শেষ করতে চান না। আর কেনই বা শেষ করবেন, যে শেষের মধ্যে লুকিয়ে আছে রক্তের স্রোত, হিংসার নরবলি। রূপকথার যেমন আশ্চর্য চিত্র থাকে এ গল্পেরও তেমন আছে। গল্পের ভাষা স্বচ্ছ। ছোট ছোট হৃদয়গ্রাহী চিত্ররূপময় গদ্যে তিনি এগিয়ে চলেন –
    ‘’ব্রজসুন্দরী দেখতে ছিল এক আসলী রূপসী। লম্বা গড়ন, মেঘলা রঙের চুল। বড় বড় চোখ, দইনাচার ডানার মত ঘন চোখের পাতা। ফরসা, কিন্তু একটু রক্ত নাই ফেক্‌সা। সাদা বেগুনের মত শরীরের নীল-নীল শিরা স্পষ্ট ভাসতো।‘’ (তদেব, পৃ. ১৩ )
    শেষে একটিই কথা বলার – গল্পটি আর বৃহৎ ক্যানভাসে যেতে পারতো।

    সুনন্দা গোস্বামীর ‘মনস্কামনা’ গল্পটি অনবদ্য। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে তিনি গল্পটি লিখেছেন। একটি গল্পের মধ্যেই তিনি বিবিধ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। কাহিনিকে সামনে রেখে তিনি সময়ের দলিলিকরণ করেছেন। সে সময় বিরাট ক্যানভাসে ধরা দিয়েছে। জমিদারি ব্যবস্থার পতন, লোকবিশ্বাস, লোকশ্রুতি, মূল্যবোধহীনতা, নতুন মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা,পণপ্রথা, বর্তমানের ক্ষয়িষ্ণু সময় ও সময় যন্ত্রণা – এতগুলি বিষয় নিয়ে তিনি একটি কোলাজ রচনা করেছেন। এ গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পণপ্রথা। আর তা ফুটিয়ে তুলতেই লেখিকাকে এতগুলি বিষয়ের অবতারণা করতে হয়েছে। পূর্ণেন্দু বসু পতনশীল সামন্ততন্ত্রের প্রতিনিধি। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আজ আর নেই। নিজেই ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসার সামান্য অর্থও নেই। অথচ গ্রামের সবই তাঁর দান করা। তাঁর কন্যা বিশাখাকে পছন্দ হয়েছিল সুভাষের। কিন্তু পণের জন্য বিবাহ হয়নি। সুভাষের সঙ্গে কন্যা দেখতে গিয়েছিল শুভ। আজ বিবেক দংশনে সে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। একদিকে নষ্ট মূল্যবোধ, সুভাষ সে দলের প্রতিনিধি। আর লেখিকা নতুন আদর্শ, মূল্যবোধ গড়ে তুলতে চেয়েছেন শুভ চরিত্রের মধ্যে। সুভাষ ও তাঁর পরিবার, ববিরা এই নশ্বর ক্ষয়িষ্ণু সামজের প্রতিনিধি। শুভ, বিশাখারা আদর্শ নিয়ে আজও বেঁচে আছে। বিশাখা আজও বিনা অর্থে ছাত্র পড়ায়, আর শুভ স্বপ্ন দেখেছে বিনা পণে বিশাখাকে বিবাহ করার। তেমনি আছে মহান হেডমাস্টার। এ গল্পে নায়ক শুভ, প্রতিনায়ক সুভাষ। শুভ’র নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন –স্বপ্নহীনতার নানা স্তর গল্পকার দেখিয়েছেন। আসলে লেখিকা একটি সম্পূর্ণ সমাজকে ধরতে চেয়েছেন। একটি সমাজের যে বিবিধরূপ তা দেখাতে চেয়েছেন। আবার সময়ের বাস্তব রূপেও নজর দেন। ‘প্যারাটিচার’ এই শব্দের মধ্যেই সেই রূপ লুকিয়ে থাকে। গল্প শেষ করেছেন লোকবিশ্বাসে। গ্রামের প্রাচীন বট গাছের কাছে পানু ও শুভ কামনা করেছে। এ গাছের নাম মনস্কামনা। মানুষের কামনা পূর্ণ হয় কি না তা আমরা জানি না। কিন্তু গ্রাম্য বিশ্বাস হয়। আর যদি হয় তবে বোধহয় পূর্ণেন্দু বসুও আরোগ্য লাভ করতেন। কিন্তু সে ইতিবৃত্ত লেখিকা আমাদের জানার সুযোগ দেননি। এক আদর্শবোধে লেখিকা গল্পের উপসংহারে পৌঁছান। যে আদর্শবোধ এই সময়ে ভীষণ গুরত্বপূর্ণ। কেননা এক মূল্যবোধহীন, নষ্ট বিবেকের মধ্য দিয়ে আমরা আজ এগিয়ে যাচ্ছি। তবে এই মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার জন্য কোন নীতি বা দর্শনের সাহায্যে তাঁকে নিতে হয়নি, কাহিনির সত্যেই তা উপস্থিত হয়েছে।

    এবার এই তিনটি গল্পকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আলো ফেলে দেখবো। বিষয় বিন্যাসে সুনন্দা গোস্বামীর ‘মনস্কামনা’ অন্য দুটি গল্পের তুলনায় এগিয়ে। একটি মাত্র কাহিনিকে সামনে রেখে তিনি বিবিধ বিষয়ের অবতারণা করেছেন কিন্তু কাহিনির ঠাঁস বুনোনকে কখনোই আলগা হতে দেননি।
    এবার তিনটি গল্পের সূচনাবিন্দু গুলি আমরা দেখবো –
    ‘ভূতনাথ’ – ‘ভূপেন, ভূতনাথকে বিক্রি করতে হাটে নিয়ে যাচ্ছিল।‘
    ‘ব্রজসুন্দরী উপাখ্যান’ – ‘লুটেরাদের গল্প গিলতে গিলতে ওদের চোখগুলো ঘুম ভুলতো।‘
    ‘মনস্কামনা’ – ‘সেই বটগাছটার নীচে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে শুভ।‘

    এই সূচনাবিন্দুতে এগিয়ে দেবেশকান্তি চক্রবর্তী। এবার আমরা তা বিশ্লেষণ করে দেখব। সৌরেন চৌধুরী গল্পের সূচনাতেই আমাদের জানিয়ে দিলেন – ভূতনাথ হাটে বিক্রি হবে অথবা নয়। এটুকুই গল্পের সত্য। এবার তিনি পাঠককে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ভক্তের যেমন ঈশ্বর দর্শন তেমনি গল্পপাঠকের যেন এ যাত্রা। কোনদিকে তাকাবার অবকাশ নেই, সোজা সমাপ্তিবিন্দুতে পৌঁছে দেওয়া। সুনন্দা গোস্বামীও জানিয়ে দিলেন এই বটগাছকে ঘিড়েই একটি রহস্য আছে। হে পাঠক মহাশয় সেই রহস্য আমি আপনাদের শোনাবো। কিন্তু দেবেশকান্তি চক্রবর্তী গল্পের শুরুতেই একটা গোলকধাঁধা তৈরি করে দিলেন। তিনি গল্পের মাথাটি ভাঙলেন না। তিনি যেন বলতে চাইলেন – হে পাঠক মহাশয় আপনি নিজে পড়ে নিজেই সেই গোলকধাঁধার উত্তর আবিষ্কার করুন।
    এবার আমরা তিনটি গল্পের সমাপ্তি বিন্দু দেখবো –
    ‘ভূতনাথ’ – ‘নবীন ভূপেনের মুখের দিকে আকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কাঁদতাছেন ?’
    ‘ব্রজসুন্দরী উপাখ্যান’ – ‘জিভটা উল্টে গিয়ে জড়িয়ে আসে, মাপ করে দিও, তারে মাপ করে দিও, ব্রজসুন্দরী।‘
    ‘মনস্কামনা’ – ‘বাইকটা থেমে গেছে সেই পুরনো বাড়িটার সামনে, যার সারা গায়ে অতীতের স্পর্শময় দিনের ইতিহাস।‘
    সৌরেন চৌধুরীর গল্প শেষ হয়েছে বাংলা গল্পের সনাতন রীতিতে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যে সমাপ্তির কথা আমাদের নির্দেশ করে দিয়েছিলেন সেই রীতিতে। দেবেশকান্তি চক্রবর্তী ও সুনন্দা গোস্বামীর গল্প শেষ হয়েছে ইতিহাসের নির্দেশনামায় – একটি দেশভাগের অপরাধের ইতিহাস, অন্যটি সামন্ততন্ত্র বা জমিদারতন্ত্রের ইতিহাসের আভাসে। গদ্যসজ্জায় সৌরেন চৌধুরী বর্ণনাত্মক রীতি, দেবেশকান্তি চক্রবর্তী ছোট ছোট বাক্যসজ্জায় বিন্যাস ও সুনন্দা গোস্বামী হৃদয়গ্রাহী মনোরম গদ্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। চরিত্র বিশ্লেষণে আবার সৌরেন চৌধুরী এগিয়ে। ভূপেন বহুমাত্রিক, সুভাষ, শুভ’রা একমাত্রিক। ব্রজসুন্দরী না থেকেই বিদ্যমান, গল্পের ঘটনা নিয়ন্ত্রক।

    https://kulikinfoline.com/2020/02/23/kulik_robbar_prose_short_story_criticism/
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৫০৩ বার পঠিত
আরও পড়ুন
#আমি - Jinat Rehena Islam
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • পাঠক | 172.68.146.187 | ০১ মার্চ ২০২০ ২০:৩৯91173
  • গল্পগুলো পড়ার আগ্রহ জন্মালো। কোথায় পড়া যাবে?
    তবে প্রায় সব গল্পের শেষটুকু আরেকটু আড়ালে রাখলে ভাল হতনা? শিবমংগল, তার পটভূমির জটিলতায় কোনপ্রান্তে উপনীত হয়, সে কৌতূহলটুকু নিরসন হয়ে যাওয়া হয়ত গল্প পাঠের রস অনেকটাই গেঁজিয়ে দেবে।

    তবে পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল, যেসব শিক্ষকেরা আজ খুল্লমখুল্লা সংঘ সমর্থক, গোহত্যা নিয়ে লিঞ্চিং এর সমর্থন করেন, তাঁ্রা কীভাবে মহেশ পড়ান, জানা গেলে ভাল হত।

    কৃত্তিম, দারিদ্র‍্যতা জাতীয় টাইপোগুলি ঠিক করে দিলে ভাল হয়।
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত