• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • গোলাপী শহর

    শুচিস্মিতা লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৬ জুলাই ২০১০ | ৮২ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • বছর পঁয়তিরিশের বিজয় যেদিন মধ্যপ্রদেশের সাগর গ্রাম থেকে দিল্লী এল সেদিন দিল্লী শহর ভেসে যাচ্ছে। অথচ ট্রেনে জল ছিল না একটুও। বাচ্চারা কাঁদছিল অসহ্য গরমে। জলের অভাবে। ফ্যানগুলো কাজ করছিল না। বিজয় আসছিল আসন্ন কমনওয়েলথ গেমসের জন্য দিল্লী শহরকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে। বৌ আর চার বাচ্চা সমেত। যে ঠিকাদারটি তাদের গ্রামে গ্রামে দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক সংগ্রহ করে বেড়ায় সে অবশ্য তাকে বলেনি শ্রমিক আইন অনুসারে দিল্লী আসার ট্রেনভাড়াটা প্রাপ্য হয় তাদের। বিজয় তাই নিজের গাঁটের কড়ি খরচ করেই আসছিল দিল্লীতে, শহর সংস্কারের কাজে। ট্রেনের যা কিছু দুর্ভোগ তা তো তার মত হতদরিদ্র আহিড়ওয়ারের কাছে কিছুই না। কিন্তু দিল্লী এসে যে পরিস্থিতিতে পড়তে হল সেটা তারও চিন্তার বাইরে ছিল।

    পুরোনো দিল্লী স্টেশনে ওরা যখন পৌঁছল তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ছ'মাস থেকে নয় বছরের চার বাচ্চাকে নিয়ে একটা নতুন শহরে বিজয় আর ওর বৌ সুমন - যে শহরে লোকে সামান্য ভদ্রতাকে মানসিক দুর্বলতা মনে করতে অভ্যস্ত। ওরা যখন শেষ পর্যন্ত দিল্লী ইউনিভার্সিটি চত্বরে পৌঁছাল তখন বেশ রাত। যে লোকটা গ্রামে গিয়ে ওদের সাথে কথা বলেছিল কাজের ব্যপারে, সে বলেছিল ওদের থাকার কোয়ার্টার দেওয়া হবে। এমনকি সেদিন চায়ের দামটাও মিটিয়েছিল সেই লোকটা। একটা ঠিকাদার গোছের লোককে দেখে বিজয় তাই জানতে চাইলো - রাতে থাকার বন্দোবস্ত কোথায়। নতুন বাড়িতে গিয়ে দু'দণ্ড জিরোনো, চান, বিশ্রাম - বাচ্চাগুলো খুব ক্লান্ত! ঠিকাদার তাকে নিয়ে গেল খালসা কলেজের সামনের ফুটপাথে - বেশ কিছু খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে সেখানে - এটাই বিজয়ের নতুন অফিস - এই ফুটপাথকেই গোলাপী পাথরে মুড়ে তাকে স্বপ্নপুরী বানাতে হবে - আর এই ফুটপাথই রাত্রি বেলায় তার মাথা গোঁজার আস্তানা। কোয়ার্টারের বদলে ফুটপাথ পেয়ে সেদিন রাতে বিজয় কোন বিপ্লব করতে যায় নি। সে জানে এমন হয়েই থাকে। যদিও ১৯৭৯ সালে পাশ হওয়া Interstate Migrant Workmen's Act অনুযায়ী থাকার জন্য কোয়ার্টার এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধে পাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। একই আইন অনুসারে বিজয়ের মত অদক্ষ শ্রমিকের মজুরী হয় দৈনিক ২০৩ টাকা। দিনে আট ঘন্টা কাজ। সপ্তাহে একদিন ছুটি। বিজয় অবশ্য হাতে পাচ্ছে দেড়শো।

    খুব মেপেজুখে হিসেব করলেও অন্তত দেড়লাখ অদক্ষ শ্রমিক কাজ করছে দিল্লীতে (একসময় সংখ্যাটা চার লাখের ওপরে ছিল) ন্যূনতম মজুরীর থেকে গড়পড়তা পঞ্চাশটাকা কমে। দেড়লাখকে পঞ্চাশ দিয়ে গুণ করুন। দিল্লী শহরের সুসভ্য সমাজ-হিতৈষী মালিক-ঠিকাদার-ক¾ট্রাকটারদের দৈনিক আয়ের একটা ধারণা পাওয়া যাবে। তাও তো কমিশন, কনসাল্টেশন ফি - এইসব ধরা হয় নি এই হিসেবে! একটা সভ্য সমাজে আপনি আশা করবেন এমনটা হবে না। হলেও এর প্রতিকার হবে। অন্তত ধরা পড়লে তা নিয়ে হৈ চৈ হবে। PUDR ( People's Union of Democratic Rights) এই বিষয়টা প্রকাশ্যেও এনেছে। কিন্তু আমরা তো সৌন্দর্যের পূজারী, বিচারের নই! শ্রমিকদের ফাঁকি দেওয়া টাকায় তৈরী হবে আমাদের গোলাপী সৌধ। আমরা আহা-বাহা করবো। এ তো নতুন নয়। এই দিল্লী শহরেরই পুরোনো অংশে এক শাসক যেদিন তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতিরক্ষার্থে তাজমহল বানাচ্ছিলেন সেদিনও ছবিটা একই রকম ছিল। শুধু মাঝে মাঝে কমনওয়েলথ গেমসের আদর্শগুলৈ বিশ্রী ব্যঙ্গ করে! কি যেন ছিল কথাগুলো! হিউম্যানিটি-ইকুয়ালিটি-ডেস্টিনি। মানবতা! সাম্য!!

    বিজয় জানে না যদি ওকে কোনদিন চারঘন্টা ওভারটাইম করতে হয় তাহলে ওর প্রাপ্য হয় ৪০৬ টাকা। কি প্রমাণ আছে বিজয়ের নাম করে ওর ক¾ট্রাকটার বাড়তি টাকা পকেটস্থ করছে না? বিজয়ের নামে তো কোন কাগজই নেই যে ও কমনওয়েলথ গেমস প্রোজেক্টে দিল্লীতে কাজ করছে। লেবার ওয়েলফেয়ার কমিশনে নথিভুক্ত হয়নি বিজয়দের নাম। গেমের বাজেট সাত হাজার কোটি। সেই উপলক্ষে শহর সাজানোর জন্য বরাদ্দ আরো কুড়ি হাজার কোটি। এর মধ্যে বেশ কিছুটা বিজয়ের হকের টাকা। দিল্লী হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারক জাস্টিস এ পি শাহ মে মাসে Housing and Land Rights Network (HLRN) -এর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী কমনওয়েলথ গেমসের বাজেটের ২৬৪.৯৫ কোটি টাকা আসছে সংরক্ষিত শ্রেনীর জন্য বরাদ্দ কোটা থেকে। অর্থাৎ দিল্লী শহরের শোভাবৃদ্ধির টাকা যোগাচ্ছে মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা বিজয়ের মত শ্রমিকেরা। শহর গোলাপী হচ্ছে। যদিও দারিদ্রমুক্ত হলে হয়তো তাকে সুন্দরতর দেখাতো!
    তথ্যসূত্র: http://timesofindia.indiatimes.com/india/Slave-labour-in-svelte-Delhi/articleshow/6182947.cms

    ২৬শে জুলাই, ২০১০
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৬ জুলাই ২০১০ | ৮২ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত