• প্রতিবাদে ঢাকি সর্বাঙ্গ (শেষাংশ)

    শর্মিষ্ঠা নাহা লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৬ মে ২০১৬ | ৮১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • আজ কোনও বিশেষ তিথি নয়। তবু বিকেল হতে না হতেই চন্ডিকাপুরে রাধামাধবের মন্দিরপ্রাঙ্গণে বহিরাগত মানুষের ঢল। রিসর্টের গ্যারেজ গাড়িতে ভর্তি। কিন্তু কই, তারা তো এল না! কখন আসবে তারা?
    উত্তেজনা চাপতে না পেরে রাধারাণি স্বপ্নলোক রিয়েলটি এস্টেটমুখো হলেন। প্রত্যয়ী- জয়স্মিতা ওখানকার ফ্ল্যাটেই থাকে।
    মন্দির কর্তৃপক্ষ যেন আগে থেকেই এত অতিথির আগমনবার্তা জানতেন। তড়িঘড়ি মন্দিরপ্রাঙ্গণ বিশেষভাবে সাজানোর ব্যবস্থা করলেন। মূল সান্ধ্য অনুষ্ঠান ঠাকুরদালান থেকে সরিয়ে নাটমন্দিরে নিয়ে আসা হল। ব্যবস্থা হল উইংস, দু দুটো স্ট্যান্ড মাইক এবং উজ্জ্বল আলোর। নাটমন্দিরের সামনে ত্রিপল খাটানো হল। অতিথিদের বসার জন্য ব্যবস্থা করা হল প্রচুর চেয়ারের।
    - দিদি, আপনি এখনও ওই ইভেন্টের কথা ধরে বসে আছেন! এই ক ঘন্টায় কি না কি ঘটে গেছে। বললেন জয়স্মিতার ঠাকমা দীপ্তি ঘোষ
    - ফেসবুকে ইভেন্ট ঘোষণা হল। কত লোক আসবে বলে জানালো। সকাল দশটা নাগাদ কোনও এক মনোজ পান্ডে নিজেকে চন্ডিকাপুর রাধামাধব মন্দিরের ট্রাস্টিবোর্ডের সেক্রেটারি পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় ইভেন্টে যোগদানকারীদের সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। পোস্টটা অল ফ্রেন্ডস ট্যাগ করে দিয়েছে। মানে সবাইকে ডেকে ডেকে শুনিয়েছে আর কি।
    দীপ্তি ঘোষ পড়ে শোনালেন পোস্টটা। ছিঃ কি অকথ্য গালিগালাজ।
    - শুধু এই ভাষা সহ্য করতে না পেরে ভদ্রলোকের ছেলেরা ঘরে বসে গেছে!
    - না দিদি, বললেন প্রত্যয়ীর ঠাকমা অর্চনা পাল।
    সাড়ে বারোটা নাগাদ মীনাক্ষি লিখেছে, ওদের অফিসের বস ওকে ফোন করে বলছেন, যেহেতু পুলিশ ওদের ডায়েরি নিতে অস্বীকার করেছে, ইভেন্ট চলাকালীন কোনও অশান্তির জেরে যদি ওরা অ্যারেস্ট হয়, তবে ওদের চাকরির সুরক্ষা দেওয়ার কোনও দায়িত্ব অফিসের নয়। ওরা তিনজন আসতে পারবে না বলে দুঃখপ্রকাশ করেছে।
    - আর বাকিরা?
    - কেউ কিছু বলে নি। কিন্তু যেখানে ওই গুন্ডাবাহিনী আর পুলিশ এককাট্টা, সেখানে এসে প্রতিবাদ জানানোর মত বুকের পাটা কার আছে?
    - আপনাদের নাতনিরা....
    - জয়স্মিতার বাবা মা দুপুর দুটো নাগাদ আমাদের কলকাতার বাড়ি চলে গেছে। সঙ্গে জয়স্মিতা আর প্রত্যয়ীকেও নিয়ে গেছে। পাছে অাবেগের বশে কোনও অঘটন ঘটিয়ে বসে।
    ' হা গোবিন্দ ' বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল রাধারাণির।
    দুপুর থেকে আকাশ মেঘলা। চারদিক কেমন থমথম করছে। মনে হয় ঝড় উঠবে।
    ব্যর্থ মনোরথ রাধারাণি অবশেষে মন্দিরের দিকেই ফেরা মনস্থ করলেন। চারদিক অন্ধকার করে এসেছে। নিভে গেছে সব আলো। বুকের মধ্যে কত কত আগুন ছিল, সব কি নিভে ছাই হয়ে গেছে? রাধারাণি ভাবতে লাগলেন।
    যুগ যুগ ধরে রাধামাধবের মন্দিরে নারীদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। সেবক নিত্যানন্দ রায়ের অকালপ্রয়াণের পর পনেরো বছরের কিশোরী রাধু সকলের সামনেই অনায়াসে নিত্যসেবার ভার নিজ হাতে তুলে দিয়ে ভেঙে দিয়েছিল সেই অচলায়তন। আজ মন্দিরে নারীরাই বেশি করে আসেন। কীর্তনিয়া দীনবন্ধু দেববর্মণ বার্ধক্যজনিত কারণে অবসর নেওয়ার পর নামগানের ভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিল একুশের তরুণী রাধারাণি।
    গ্রামের শেষ প্রান্তে হরিজন পল্লী। সেখানকার বাসিন্দাদের ছায়া পর্যন্ত একদা অশুচি বলে মানা হত। পঁয়তাল্লিশের প্রৌঢ়া রাধারাণি দেবী মন্দিরের কার্যভার হাতে পাবামাত্র একার সিদ্ধান্তে বন্ধ করেছিলেন সেই অমানবিক প্রথা। আজকের বাহাত্তুরে বুড়িমাকে কি এত বড় অনাচার চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে!
    কড়কড় করে মেঘ ডেকে উঠল। যে কোনও সময় বৃষ্টি নামবে। ' তুমি গান টান করো, ওই নিয়েই থাকো না, বুড়িমা' কালীপদর কথাটা চাবুকের মত কষালো তাঁর চেতনায়। দু চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল।
    ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। রাধারাণি মাথা বাঁচাতে সুইমিং পুলের অফিসে ঢুকে গেলেন। পেছনদিকে বাচ্চারা পুলে নামার আগে কস্টিউম পরে শাওয়ার নিয়ে রেডি হচ্ছিল। হঠাৎ মাইকে ঘোষণা হল, বৃষ্টি নামায় সাঁতার বন্ধ। বৃষ্টির জল পুলের জলে মিশে ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। মায়েরা বাচ্চাদের গা মুছিয়ে ফেরার তোড়জোড় করতে লাগলেন।
    খানিক দেরি করেই ঢুকছিল বাড়ন্ত চেহারার কিশোরী মেয়েটি। তার আর শাওয়ার নেওয়া হল না। বৃষ্টি ধরতে ফেরার উপক্রম করছে, এমন সময় পথ আটকালেন রাধারাণি। "ও মেয়ে, ও মেয়ে, শোনো।"
    শেষ বিকেলে এক পশলা বৃষ্টির পর এখন আবহাওয়া খুবই মনোরম। রাধামাধবের পূজা পাঠ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে। সেই তথাকথিত প্রতিবাদীর দলের কেউ ই এখনো এসে পৌঁছয় নি। মনে হয় আর আসবে না। তবু যদি আসে, তাদেরকে রুখে দেওয়ার সব রকমের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। কাছেই একটি বাড়ির উঠোনে জড়ো করা আছে প্রচুর লাঠি, লোহার রড, সাইকেলের চেন। স্থানীয় থানা টানটান উত্তেজনায়। আশেপাশের থানা থেকে ধার করা মহিলা পুলিশে ছয়লাপ।
    বোর্ড মেম্বাররা খুব খুশি। একটা অত বড় আন্দোলনের গলা টিপে দিতে পেরে। আজকের অনুষ্ঠান কার্যত বহির্জগতের চোখের সামনে তাদের বিজয়োৎসব। সব সুষ্ঠুভাবে চলছে। শুধু একটাই কাঁটা গলায় খচখচ করছে। সবাই বারবার বুড়িমার কথা জানতে চাইছে। ওদিকে বুড়িমা সেই বিকেল থেকে ঘরের দরজা এঁটে ভেতরে সেঁধিয়ে রয়েছেন।
    কি আর করা। বুড়িমাকে ছাড়া কিছু তো থেমে থাকতে পারে না। পন্ডিতজী মৃত্যুঞ্জয়ের
    স্ত্রী অম্বিকা রাধামাধবের অঙ্গসজ্জার ভার নিলেন। আরতি, প্রসাদ বিতরণের পর পন্ডিতজী যথাসাধ্য ধর্মালোচনা ও করলেন। শ্রীকৃষ্ণের প্রণাম মন্ত্র ও গীতগোবিন্দের কিছু পদ গাইলেন তরুণ গায়ক রবি দাস। এরপর মঞ্চসজ্জার জন্য কিছুক্ষণের জন্য পর্দা পড়ল। চার গায়কের নামগানের দল প্রস্তুত থাকলেও সবাই মনে মনে চাইছিল নামগানটা বাইরের অতিথিদের সামনে বুড়িমা ই করুন। তাঁর অনুপস্থিতি অনেকের মনে অনেক প্রশ্নের উদ্রকে করছে।
    সখা হে.......
    যথাসময়ে পর্দার আড়ালে শুরু হল নামগান। বিশেষ বিশেষ তিথিতে এমনটি হয়েই থাকে।
    'সখা হে..........
    নিশিদিন....... জলেস্থলে......
    বাজে তব বাঁশি......
    স্থির জানি, তাহা......
    আমারেই ভালোবাসি......
    আমি, বন্দী তব চরণারবিন্দ......

    হৃদে ভক্তিরসের ফল্গুধারা......
    আমি কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা......
    সবাই কলঙ্কিনী বলে করে নিন্দেমন্দ......'
    ওই তো, ওই তো গাইছেন বুড়িমা। রাধামাধবের টান অগ্রাহ্য করে সত্যিই থাকতে পারেন নি তিনি। তাঁর গানের আবেশে চোখ বুজে আসে সকলের।
    সখা হে......
    যবে, পাদপদ্ম ভজি তব, তোমারই স্মরণ লব,
    জানি, প্রশ্নবাণে বিঁধিবে অসংখ্য।
    আমি, তব চিন্তা মনে রাখি দেহে ও অন্তরে মাখি,
    দিবারাতি তোমারই কলঙ্ক।
    এই পদগুলি পূর্বে শুনেছেন বলে কেউ মনে করতে পারলেন না। এগুলি কার রচনা!
    সখা, ডাক যবে বাহুপাশে, ছুটি গো মিলনআশে,
    জড়াইতে সে প্রণয়ডোরে,
    যাই গো বারংবার, পিছে ফেলে সংসার,
    রুধিবে কে ই বা বল মোরে!
    ডাকো সে যমুনাপারে, চলি তব অভিসারে,
    দুই পায়ে দলি যত বাধা।
    সব সংশয় ভুলি, বিপদের পথে চলি,
    একেলা কলঙ্কিনী রাধা।
    হরিবোল....হরিবোল.....
    হরিবোল....... হরিবোল......
    প্রথমবার হরিনাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি পর্দা খুলে গেল।
    উজ্জ্বল আলোর নীচে নামগানের সঙ্গে উদ্বাহু নৃত্য রত অবস্থায় তাঁকে দেখে সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়াল জনতা। মুহূর্তের বিহ্বলতা কাটিয়ে কেউ কেউ ক্যামেরাবন্দী করলেন সেই বিরল দৃশ্য।

    - হ্যালো মিসেস ঘোষ, কখন থেকে মোবাইলে ট্রাই করে শেষে ল্যান্ডে করলাম।
    - এফ এম শুনে শুনে চার্জ শেষ। চার্জে বসিয়েছি।
    - তার মানে নেটও নেই? দরজা জানালা বন্ধ করে কি এসি চালিয়েছেন? একবার ব্যালকনিতে এসে দেখুন কি হচ্ছে।
    গভীর অন্ধকার, অযুত বিপদ,আর
    পন্থা কুটিল অতি ঘোর
    কত না ভীষণ ভয়, হৃদিমাঝে সংশয়
    দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব ঘোরতর.....
    ওহ, বক্সের সাউন্ড কোয়ালিটি কি খারাপ! কানের মাথা খেয়ে ফেলছে একেবারে।
    আরে, এ সব হচ্ছেটা কি? সামনের রাস্তায় অদ্ভূত অদ্ভূত শর্ট ড্রেস পড়ে সি ব্লকের পাপিয়া মৈত্র, এইচ ব্লকের অপর্ণা ঘোষদস্তিদার, কে ব্লকের ছন্দা পুততুন্ড দল বেঁধে ইভনিং ওয়াক করতে বেরিয়েছে না কি! সন্ধেবেলা সিরিয়াল ছেড়ে তো কেউ নড়ে না।
    ওরা যা খুশি করুক। এফ ব্লকের প্যারালাইজড শিবানী পাঁজা হুইলচেয়ারে চড়ে ইভনিং ওয়াকে যাচ্ছে না নিশ্চয়। ওঁর হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে যাওয়া আশালতা দেব চোখে খুব কম দেখে। শিবানীর মুখে পথের বর্ণনা শুনে শুনে এগিয়ে চলছে। কোথায় যাচ্ছে ওরা? কেনই বা যাচ্ছে!

    শুনি তব আহ্বান, পণ করি মনপ্রাণ,
    চলি তব মঙ্গলকাজে,
    সকল বিপদভয়, সব দ্বিধাসংশয়, মঞ্জিরসম পদে বাজে।

    নেট এর কথা কি বলছিলেন মিসেস পাল? মোবাইল অনেকটা চার্জ হয়েছে। নেট অন করে ফেসবুকে ঢুকলেন দীপ্তি।
    Naba Kumar Das added 3 new photos. feeling excited with Ratna Das and 165 others.মাত্র দশ মিনিট আগের পোস্ট। নাটমন্দিরের মঞ্চে স্ট্যান্ড মাইকের সামনে উদ্বাহু নৃত্যরতা রাধারাণি দেবী। কোমর ছাপানো এক ঢাল খোলা চুলে প্রায় নগ্নিকাবেশে তাঁকে ঠিক সংহারকারিনী দেবী কালিকার মত দেখাচ্ছে। এই নেভি ব্লু কালারের টু পিস সুইমসুটটা কোথায় পেলেন তিনি!
    Shyamali Sen Sharma added 25 new photos with সাহানা তরফদার and 26 others. just now. বাড়ির পুরুষদের গেঞ্জী-হাফপ্যান্ট জাতীয় পোশাক পরে এক এক করে নাটমন্দিরের সামনে জমায়েত হচ্ছেন গ্রাম্য বৃদ্ধারা।দশ মিনিটের মধ্যে নাটমন্দির প্রাঙ্গণে ছেয়ে গেছেন তাঁরা। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখে দেখে রিয়েল এস্টেটের বৃদ্ধারাও যোগ দিতে চলেছেন তাঁদের সঙ্গে।
    প্রচুর কমেন্টস পড়ছে ছবিগুলোয়। এখন পড়ার সময় নেই। গতকালের ঘটনাটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সবাই ধরে নিয়ে দু দিন পরে ভুলেই যেত। কিন্তু আজ সকালে রাধারাণি দেবীকে যে ভাষায় যে ভঙ্গীতে আক্রমণ করা হয়েছিল, অনেকে তার সাক্ষী আছে। এই মানুষটিই যখন আজ এত বিপন্ন, তখন বাকি পাঁচজন এই চন্ডিকাপুরে কোন সুখে বাস করবে? ওই অহংকারী মানুষগুলোর মর্মস্থলে এইভাবে আঘাত করার খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
    খুব দ্রুত নিজের কর্তব্য ঠিক করে নেন দীপ্তি। নাতনীর ওয়ার্ডরোব ঘেঁটে একটা জিমে পরার স্পোর্টস ব্রা আর হট প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে নেন। অনভ্যস্ত পোশাকের সব অস্বস্তি জয় করে লিফটে করে একতলায় নেমে উর্ধশ্বাসে নাটমন্দিরের দিকে ছুটতে থাকেন তিনি।
    খবর ছিল শহর থেকে নোংরা নোংরা ড্রেস পরা অনেক মেয়েছেলে আসবে। তাদের শায়েস্তা করার জন্য বাগদীবাড়ির উঠোনে লাঠিসোঁটা জড়ো করাই ছিল। তারা তো কই এলই না। তাদের জায়গায় নিজেদের মেয়ে, বোন কিংবা নিদেনপক্ষে বৌ হলেও বীরপুঙ্গবরা তাদের যা করার করে নিত। কিন্তু যত অমানুষ ই হোক, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা বুড়ি মা কিংবা ঠাকমার গায়ে হাত তুলতে তাদের কোথায় যেন বাধল। লাঠিসোঁটাগুলো আর কারুর হাতে উঠল না।মরিয়া হয়ে পুলিশে ফোন করল তারা।

    যবে সংসারকাজে ঘোর সঙ্কটমাঝে
    শুনি তব শঙ্খধ্বনি,
    হৃদিপথে লেখা তব রথরেখা
    দিকচিহ্ন তায় গনি।
    হরিবোল....হরিবোল....
    হরিবোল.....হরিবোল....
    একা একা গাইলে নামগানের স্পিরিটটা ঠিক আসে না। রাধারাণির গানে অবশ্য পুরো গ্রাম নাচছে। তবু, স্টেজে উঠে এককোণে অবহেলায় পড়ে থাকা স্ট্যান্ড মাইকটার দখল নিলেন দীপ্তি। দর্শকদের মধ্যে স্প্যাগেটি টপ আর টেনিস স্কার্ট পরা অর্চনাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় তাঁকে ডেকে নিলেন তিনি।
    হরিবোল....হরিবোল...
    হরিবোল....হরিবোল...
    তিনজনে একসঙ্গে কন্ঠ দেওয়ায় নামগানের জোশ তিনগুণ বেড়ে গেল।
    সকাল থেকে এ ব্যাপারে থানায় খবর ছিল। ফোন পেয়ে পুরো ফোর্স নিয়ে অকুস্থলে এসে পড়লেন পুলিশ অফিসার অভিরূপ গোস্বামী।
    ইনফরমেশন অনুযায়ী কোনও বহিরাগত ব্যক্তি কোনও কুরুচিকর পোশাক পরে আসেন নি।তাঁদের আচরণ ও খুব নম্র। গ্রাম্য বৃদ্ধারা আর তাঁদের রিয়েল এস্টেটের প্রতিবেশিনীরা যে পোশাক পরে এসেছেন, তাতে তাঁদের এমন কিছু বিসদৃশ দেখাচ্ছে না। হয়ত নতুন নতুন দেখে একটু অস্বস্তি হচ্ছে। সত্যিকারের অশ্লীল পোশাক পরে আছেন রাধারাণি দেবী আর তাঁর নৃত্যগীতরতা দুই সঙ্গিনী। গতকাল ভদ্রমহিলার ডায়েরি না নেওয়ায় অনেক কথা শুনতে হয়েছে মিঃ গোস্বামীকে। আজ ফোন পেয়েও কোনও অ্যাকশন নেন নি এ অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে তড়িঘড়ি অকুস্থলে পৌঁছে বড় ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন তিনি। । এই চন্ডিকাপুরের রাধামাধবের নাটমন্দির থেকে নামগান রত অবস্থায় বুড়িমাকে অ্যারেস্ট করে আস্ত ফিরতে পারবেন, নিজের ওপর এমন বিশ্বাস ছিল না তাঁর। তার ওপর পৃথিবীর সব সমস্যা ছেড়ে দুনিয়ার ফেসবুক-শকুনগুলো এই চন্ডিকাপুরের দিকে তাকিয়ে আছে। মিডিয়াও বুম নিয়ে হাজির। বুড়িমাকে অ্যারেস্ট করলে ধর্মস্থানে হিংসা ইত্যাদি সংবাদ শিরোনাম হতে হবে। কিছু না করলেও কর্তব্যের গাফিলতির দোষে দুষ্ট হতে হবে। এমত উভয়সঙ্কটে পড়ে মিঃ গোস্বামী পুরো ফোর্স নিয়ে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করার অভিনয় করে যেতে লাগলেন। সুন্দরভাবে।
    মঞ্চে এখন আর বুড়িমা একা নন। ওঁরা তিনজন। বুড়িমা গাইছেন, তাঁর দুই সঙ্গিনী ধুয়ো ধরছেন। কয়েকগুণ তীব্র হয়ে ফেটে পড়ছে প্রতিবাদ।

    প্রেম-সখ্য ঘেরা যৌবরাজ্য তব, সন্ত্রাস-শেল হানে কারা!
    শত পঙ্কিলাবর্তে কলুষিত করে পূত
    ধর্ম-স্রোতস্বিনী ধারা।
    (ঐ) ধর্ম স্রোতস্বিনী ধারা।
    শাসনযন্ত্র যবে দুর্বৃত্তের হাতে লাগে যবে ধর্মে গ্লানি,
    (সখা) লাগে যবে ধর্মে গ্লানি,
    অন্তরাত্মা কহে,"সংহারো,সংহারো,
    আপন পর নাহি মানি।"
    (হানো) আপন পর নাহি মানি।
    দ্বিধা ভয় থাক আজ, ছুঁড়ে ফেলি মিছে লাজ,
    অন্তরে ঘৃণার তরঙ্গ,
    বৃথা সংসার ভুলি, সমরাঙ্গনে চলি,
    প্রতিবাদে ঢাকি সর্বাঙ্গ।
    (চলি) প্রতিবাদে ঢাকি সর্বাঙ্গ।
    (শুধু) প্রতিবাদে ঢাকি সর্বাঙ্গ।
    হরিবোল......হরিবোল.....
    হরিবোল..... হরিবোল......
    হরিবোল.....হরিবোল.....
    হরিবোল.....হরিবোল.....
    সারা পৃথিবীর চোখের সামনে পশুশক্তির আস্ফালনের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ করেই ছাড়লেন চন্ডিকাপুরের বুড়িমা রাধারাণি দেবী। তাঁর নগ্নপদের দিকে লজ্জায় নতনেত্র মনোজ-কালীপদ- নারায়ণ-কেষ্টর দল। প্রতিবাদের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে তাদের অহঙ্কার।

    সমাপ্ত
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৬ মে ২০১৬ | ৮১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত