আমি এখনো বেঁচে আছি অয়ন মুখোপাধ্যায় এইসব কথা বাদ দাও—নৈতিকতা, ভবিষ্যৎ, ঠিক-ভুলের হিসেব। শহরটা আজও শিশিরের জলে ভিজে আছে,গতকালের ঘামে আর পুলিশের বাঁশিতে। আমি কোনো দেবতা নই,ক্ষমা করার অভ্যাস আমার নেই। আমার শরীরটা এখনোভাত, সিগারেট আর একটুখানি স্পর্শ চায়। প্রেম মানে কবিতা নয়,প্রেম মানে মাঝরাতেনিজের নাম ভুলে যাওয়া। চারপাশে এত মৃত্যু—বন্ধু, আদর্শ, বিশ্বাসসবাই ধীরে ধীরে সরে গেছে। এইসব কথা বাদ দাও—আমি এখনো বেঁচে আছি,তাই ভালোবাসি। ... ...
স্বামী বিবেকানন্দকে আমি কেন এখনও প্রাসঙ্গিক মনে করি: এক মার্কসবাদী পাঠঅয়ন মুখোপাধ্যায়আমি নিজেকে মার্কসবাদী বলেই স্বামী বিবেকানন্দকে প্রথমে কিছুটা দূর থেকেই দেখেছিলাম। আধ্যাত্মিক ভাষা, ধর্মের উল্লেখ, বেদান্তের পরিভাষা—এই সবই আমার অভ্যস্ত প্রশ্নবোধকে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক করে তুলত। ভাববাদ বনাম বস্তুগত দর্শনের সেই চিরচেনা দ্বন্দ্ব, যেন সাপে-নেউলের সম্পর্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি—কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেবল তাঁর ব্যবহৃত শব্দের খোলসে বন্দি করলে তাঁর প্রকৃত ভূমিকা ধরা পড়ে না। আজ আমি স্বামী বিবেকানন্দকে পড়ি একজন সামাজিক চিন্তক হিসেবে—যিনি ঔপনিবেশিক ভারতের ভাঙা ... ...
আমি একটি সামাজিক অভ্যাস অয়ন মুখোপাধ্যায় -- -- -- নামহীন কুকুরের মতো, যে গন্ধ হেঁটে বেড়ায়, সে তোমার আদেশ নয়। বরং তোমার নাম ডেকে ফেললে হাড়ে হাড়ে ঢুকে পড়ে ভদ্রতা। স্বামী, নাগরিক, কর্মচারী — এইসব বলে কে যেন আমাদের এক একটা লোহার জামা পরিয়ে দিয়েছে। হাসি মাপা হলো স্কেলে, রাগকে বলা হলো অসভ্যতা। আমি শিখে নিলাম চেয়ারের ভাষা, টেবিলের শালীনতা, ভাতের সঙ্গে গিলে ফেললাম স্বপ্ন। এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ... ...
কারখানার বদলে মন্দির অয়ন মুখোপাধ্যায় বুদ্ধবাবু, আপনি মস্ত বড় ভুল করেছিলেন। আপনি জানতেন নাকলকারখানা করলে শব্দ হয়—লোহার শব্দ, ঘাম ঝরার শব্দ, ভবিষ্যৎ বানানোর শব্দ। আপনি জানতেন নাপশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই শব্দে ভয় পায়। কারখানার চিমনি তুললেধোঁয়া ওঠে — আর ধোঁয়া মানেই প্রশ্ন। তারা প্রশ্ন করে মালিক কে মজুরি কেনো কম, আমার ছেলেটা কাজ পাবে তো? কিন্তু মন্দির তুললেধূপের ধোঁয়া ওঠে — আর ধূপ মানেই উত্তর। কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু মাথা নোয়ানো, শুধু হাত জোড় করা, শুধু নীরব সম্মতি। বুদ্ধবাবু আপনি ভেবেছিলেনমানুষ চাকরি চায়। কী আশ্চর্য সরলতা! মানুষ আসলে চায় নিজের দুঃখের জন্য ... ...
বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা: ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতি অয়ন মুখোপাধ্যায় সংস্কৃতি নিরীহ নয় — এই কথাটা যতবার ভুলে যাওয়া হয়েছে, ততবারই রাজনীতি মানুষকে নীরবে গ্রাস করেছে। গান, কবিতা, নাটক, সিনেমা, উৎসব — সবই রাজনীতির অংশ। শুধু সংসদে আইন পাশ নয়, মানুষের কল্পনাজগৎ দখল করাও ক্ষমতার অন্যতম কৌশল। এই প্রেক্ষাপটে “বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা” কোনো রোমান্টিক শিল্পভাবনা নয়, বরং ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতির এক অপরিহার্য লড়াই। মূলধারার সংস্কৃতি আজ রাষ্ট্র ও পুঁজির যৌথ ... ...
হেলিকপ্টারের নীচে চাপা পড়া ভবিষ্যৎ: ভিআইপি কালচারের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোন রাজনীতি? অয়ন মুখোপাধ্যায় হেলিকপ্টারের শব্দে আর শোনা যায় না মানুষের দীর্ঘশ্বাস।বিদেশি গাড়ির কাঁচ এতটাই কালো যে ভেতরে বসে থাকা নেতার চোখে পড়ে না রেশন লাইনের মুখ, বন্ধ স্কুলের গেট, কিংবা বেকার যুবকের ভাঙা স্বপ্ন। দামি সানগ্লাসে সূর্যটা ফিল্টার হয়ে যায়—কিন্তু বাস্তবটা নয়। এই রাজনীতিতে আলো নেই, আছে শুধু ঝলকানি। আপনি কাদের নেতা বানিয়েছেন? চকচকে জামা-কাপড়, লক্ষ লক্ষ টাকার বডিগার্ড ... ...
স্মৃতির ভেতর রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের ভেতর আমি অয়ন মুখোপাধ্যায় আমার প্রথম পরিচয়পত্র দিয়েছিল আমার পাড়া বলাগড় মন্দির তলা যদিও সকলের জীবনে প্রথম পরিচয় পত্র দেয় যে যার পাড়া সেখানে কাউকে কিছু কিছু বলতে লাগতো না এই যে আমি মানে আমার ছোটবেলা থেকে গলির মোড়ে দাঁড়ানো মানুষগুলো জানত আমি কার ছেলে, কোন স্কুলে পড়ি।বাজারে স্টেশনে যেখানেই যাই না কেনো কোথাও কোনো দিন আমার পরিচয়ের জন্য কোনও কাগজ লাগে নি এটাই স্বাভাবিক এবং সবার জন্য এটাই সত্য। মুখটাই ছিল প্রমাণ। ভুল করলে বকা, ভালো করলে মাথায় হাত রাখা—এই ছিল নাগরিকত্বের প্রথম পাঠ।তারপর বড় হলাম। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আমার কিংবা আমাদের জীবনে ঢুকল। প্রথমে পরীক্ষার ফর্মে, পরে চাকরির ... ...
নীরবতা কি নিরপেক্ষ? মৌলবাদ ও আমাদের নৈতিক দায়। অয়ন মুখোপাধ্যায় আমি অনেকদিন ধরেই একটা অস্বস্তি বয়ে বেড়াচ্ছি। এবং কথা বলতে গিয়ে বারবার নিজেকে সংযত করতে হচ্ছে। কখনো কখনো মস্তিষ্কের মধ্যে একটাই ভাবনা চলে শব্দ বেছে বলতে হবে, বাক্য নরম করে বলতে হবে—যেন একটু বেশি স্পষ্ট হলেই কেউ আঘাত পেয়ে যাবে। কিন্তু আজ মনে হয়, এই সংযমটাই আমাদের সময়ের সবচাইতে বড় সমস্যা। কারণ যে বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে নরম ভাষা আর সাবধানী উচ্চারণ আসলে সত্যকে ঢেকে রাখার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা এখনও বলতে ভালোবাসি—“সন্ত্রাসবাদের কোনও ধর্ম নেই।” কথাটা নৈতিকভাবে ঠিক ... ...
ইসলামী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরব হওয়া কেন অনিবার্য।অয়ন মুখোপাধ্যায়আমি বহুবার নিজেকেই এই প্রশ্ন করেছি—“সন্ত্রাসবাদের কোনও ধর্ম নেই” এই বাক্যটা কি সত্যিই আমাদের দায় শেষ করে দেয়? নৈতিকভাবে কথাটি ঠিক। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হয়েছে, এই বাক্যের আড়ালে আমরা অনেক সময় এমন এক নীরবতাকে লালন করি, যা সমস্যাকে চিহ্নিত করার বদলে ঢেকে দেয়। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে সংগঠিত, আদর্শগতভাবে কঠোর এবং গণহত্যাকে পর্যন্ত ‘ধর্মীয় কর্তব্য’ বলে বৈধতা দেওয়া যে সন্ত্রাসবাদ, তার বড় অংশ যে ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যার উপর দাঁড়িয়ে ... ...
আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে চেনা যায়অয়ন মুখোপাধ্যায় গতকাল রাতটা শুধু বাংলাদেশে নয়—এই উপমহাদেশের বিবেকের উপর দিয়ে হেঁটে গেছে। আগুনে পোড়া একটি শরীর, ফাঁসিতে ঝোলানো এক শ্রমিক, আর উল্লাসে ভিডিও তোলা কিছু মানুষ—এই দৃশ্য কোনও “ঘটনা” নয়, এটা এক ভয়াবহ বার্তা। বার্তাটা খুব পরিষ্কার: মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, দেখা হচ্ছে পরিচয়ে, পদবিতে, সংখ্যায়।দিপু চন্দ্র দাস—একজন কাপড় কারখানার কর্মী। তার কোনও অপরাধ ছিল না, কোনও আদালত ছিল না, ছিল না কোনও মানবিক প্রশ্ন। ছিল শুধু হিংসা, আগুন আর উল্লাস। আর সেই উল্লাসের ভিড় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—মৌলবাদ যখন রাষ্ট্র, সমাজ আর রাজনীতির প্রশ্রয় পায়, তখন মানুষ পুড়ে যায়, ... ...