অনেকদিন আগে যাদবপুর ৮বি বাস ট্যার্মিনাস এর সামনে থেকে অটো ধরে সেলিমপুরের প্রায় কাছে এসেই প্রায় চলন্ত অটো থেকেই ঝাঁপ মেরেছিলাম! অটোওলা বলেছিল, আমি পাগল। অটোয় বসে থাকা মেয়েটার সে কী হাসি! আর রাস্তার লোক চমকে গিয়ে আমাকে খানিকটা ধমকে দিয়েছিল... সেই প্রথমবারই একা একা ট্রেনে ক'রে কলকাতায় যাওয়া। আমার তখনও পর্যন্ত ধারণা ছিল, কলকাতায় অটো চলে চিতার দৌড়ের মতোই। আগের অভিজ্ঞতা ছিল চলন্ত অটোয় ওঠার কলকাতায়। তাই ভেবেছিলাম, অটো তো দাঁড়াবে না। আমাকে নামতে হলে প্রায় চলন্ত অটো থেকেই নামতে হবে! বোকার মতো ভাবনা। তখন ছোট ছিলাম। এখন ভাবি, সেদিন যদি মারা পড়তাম কলকাতায়— মৃত্যুর পরে অচিরেই বিখ্যাত হয়ে যেতাম এই দুঃসাহসিক মনোবলের জন্য... ... ...
শিল্প কীভাবে আসে, কেউ জানে না।আমি যে পরিবার থেকে আসছি, সে পরিবারের শিল্পে কোনও পূর্ব ইতিহাস নেই। এমনকী, আমি যে কবিতা লেখার চেষ্টা করি, সে সম্পর্কেও আমার বাড়ির লোকের কোনও ধারণাই নেই। কয়েকমাস আগে আমাদের বাড়িতে জেঠিমা আর পিসিমা এসেছিলেন। তো আমাকে ডাকলেন, আমিও গেলাম। 'এখন কী করছ?' জানতে চাওয়াতে জানিয়েই দিলাম যে, বাংলায় কবিতা লেখার চেষ্টা করছি। বন্ধুদের পড়াই, ওরা তারিফও করে, সমালোচনাও করে। এইই চলে যাচ্ছে। ওঁরা বললেন যে, তাহলে কি কোনও বাচ্চাদের পড়াচ্ছ? এর জবাবে বললাম, একেবারেই না। এই একটাই কাজ করছি সারাদিন— বাংলায় কবিতা লেখার চেষ্টা। মাঝে মাঝে অবাক লাগে, যখন দেখি এত ডাইরি জমে গেছে! কী ক'রে লিখলাম? এত এত কবিতা ... ...
কিছু ঘটনা এতবেশি ভেবেছি যে ভুলতে পারিনি। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই একজন ক’রে ‘সে’ থাকে। আমারও ছিল, কিন্তু একতরফা। ‘ছিল’ কেন সেই প্রসঙ্গে আসছি। মেয়েটি কোনওদিনই আমাকে প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কিন্তু আমিই আশায় আশায় এতদিন এই ভেবেই পড়েছিলাম, একদিন সে ফিরবেই। সে মেয়ে আমাকে কতবার জানিয়েওছে, তার কোনও তেমন অনুভূতি হয় না আমার প্রতি। এই মেয়ের সঙ্গে এখনও আমার যোগাযোগ আছে। যদিও নিয়মিত কথা হয় না। কিন্তু আমি এই মেয়ের কাছে কতভাবে যে চিরঋণী! আমার দুঃসময়গুলোয়— পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছে আমার।কিন্তু সম্প্রতি একটা বড় পরিবর্তন ঘটে গেল আমার নিজেরই ভেতরে। সেই মেয়ের প্রতি আমার আর কোনও টান নেই। এমনকী, ভালোবাসাও নেই। মিথ্যে বলছি না। যা অনুভব ... ...
ঐ যে ঐ যে গল্পটা যাচ্ছে দেখুন— ওখানে কিন্তু এখনও জীবনানন্দের যাওয়া আসা আছে। ব্যাপারটা হল যে, ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। পাখিতে আছে। নদীইইইইইই,– এই সন্ধে হলেই ঘরে ফিরবে। যদিও সন্ধে হয়েই এসেছে। ঘাড়টা সামান্য ডানদিকে ঘোরান— ঘুড়িটাকে দেখুন, কীভাবে মেঘ টপকাচ্ছে! আর কী যেন... হ্যাঁ হল হচ্ছে জীবনানন্দ, জীবনানন্দ, জীবনানন্দ কিন্তু ট্রামের চেয়েও ধীর গতিতে চলতেন... না না চলতেন না, চলছেন তো এখনও! বেশ চলছেন...হিঃ হিঃ হিঃ মেয়েটাকে দেখে এক্ষুনি বমি বেরিয়ে আসছিল আমার। ছেলেটা পাত্তাই দিচ্ছে না। এভাবে প’ড়ে থাকে কেউ? না বিয়ে এখনও হয়নি আমার। কিন্তু এই মেয়েটাকে... মেয়েটাকে দেখতে বড্ড...তেমন অবকাশ নেই, নইলে মেয়েটাকে প্রোপোজ ক’রে আসতাম। কী হতো তবে? এমনই হয়তো হতো, ওদিকে মেয়েটাকে ছেলেটা পাত্তা দিচ্ছে ... ...
সবসময় একটা ভয় ভেতরে কাজ করে— যখন দেখি কত মানুষ এত সুন্দর একটা জীবন পেয়েও সেটাকে নিজের হাতেই ধ্বংস করছে, ধ্বংস করেছে। আমার কেবলই মনে হয়, এই মানুষগুলোর মতো আমি হ’য়ে যাব না তো? নিজেকে কি প্রতি মুহূর্তে ধ্বংস করছি নিজের হাতেই? কী আমার করণীয়? কী আমি করতে চাই?— এমনসব প্রশ্ন রাখি নিজের কাছে। নিজেকে আরও ভেঙে ফেলে নতুন ক’রে গ’ড়ে তোলার চেষ্টায় মগ্ন থাকি নিজের গভীরে। ভাল খেতে পাওয়া, ভাল পরতে পাওয়া পরিবারের ছেলে হয়েও নিজেকে রাখি একেবারেই সাধারণ। আর এই সাধারণ হতে পেরেছি ব’লেই, সমাজের সবচেয়ে শিক্ষিত, সফল, রঙিন জীবন যাপন করা মানুষকে যেমন দেখেছি; তেমনই দেখেছি এমন মানুষকেও যার আজ সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি ... ...
তুই আমার পাঁউরুটিআমি তোর জেলি — লেখাটা এখানেই থামল। ঘাড় ধ'রে যদি আরও এগোতে বলি, কিচ্ছুতেই এগোবে না! সন্তান যখন কথা শোনে না, তখন অভিভাবককেও কঠোর হতে হয়। ঠিক করেছি, ওকে এভাবেই রেখে দেব। থাকুক নিজের মতো, এই আমি চললাম... ... ...
বাচ্চা মেয়ের আরও বাচ্চা একটি মা। দু'জনেই পাশাপাশি ব'সে আছে চায়ের দোকানের বেঞ্চে। বাচ্চা মেয়ের মুখের ধুলোময়লা,আরও বাচ্চা একটি মা তাঁর আঁচল দিয়েমুছিয়ে দিচ্ছে। ঠিক মুছিয়ে দিচ্ছে না, ভালবাসা লাগিয়ে দিচ্ছে বাচ্চা মেয়ের মুখে। মায়েদের আঁচলে ভালবাসা জমানো থাকে। যখন যেমন দরকার হয় হাতখুলে খরচ ক'রে দেয়। বাচ্চা একটি মেয়ে—তার চোখে বিস্ময়তারমনে কৌতূহলতার হাসিতে আলোর ঝলকানি। বাচ্চা একটি মেয়ে আর তার আরও বাচ্চা একটি মা,– ভালবাসা নিয়ে খেলেই চলেছেমুহূর্তের পর মুহূর্ত।— আর এদিকে দর্শক হ'য়ে, আমি ভাবছি— খেলা খুব জরুরি। ভালবাসা নিয়ে যে খেলতে জানে, সে বড় অদ্ভুতসুখী! ... ...
অভ্যেসের মধ্যেও কতরকমের বাজে অভ্যেস থাকে। ভাবনার মধ্যেও চুপচাপ শুয়ে থাকে কতরকমের রঙিন রঙিন মেঘেরা। এমনকী কথার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে কতরকমের নিরীহ সম্ভাবনা! এক লাইন... দু'লাইন... তিন লাইন... এভাবেই কত কত লাইন লিখে রাখা যায়, লেখার ইচ্ছে হলেই। আমার বেড়ে ওঠার দিনগুলোকে ভুলতে পারি না। এখনও দেখতে পাই,— স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি। মা ব'সে আছে, আমি না খেলে মা-ও খাবে না। সন্ধে হ'য়ে এল, আমি চুপচাপ ভাবছি– কেন আমার মনখারাপ হয়? কেন আমি পিছিয়ে আছি আরও অন্য সকলের চেয়ে? জবাব নেই। আকাশে তারা উঠছে, পাখিরা ঘরে ফিরছে, অথচ আমি ঘরে থেকেও ফিরতে পারছি না নিজের ঘরে... ... ...
কালকে রাতে অনেকদিন পরে একটা দারুণ ঘুমকে পেলাম। শেষমেশ ঘুমোনোর লোভ সামলাতে না পেরে নিজেকে সঁপে দিলাম ঘুমের কাছে। ঘুমের নিজস্ব একটা গন্ধ আছে। যেমন ঘুমের মধ্যে পাওয়া স্বপ্নের আছে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। এমনিতে নিজের ঘুমের দিকে সেভাবে তাকানোর অভ্যেস হয়নি এখনও আমার। এর বদলে বেড়ালের ঘুমকে ব’সে থেকে উপভোগ করি। সে ঘুম যে দেখেছে, সেইই জানে। আরও অন্যসকল কাজের মতোই আমার প্রিয় একটা কাজ, বেড়ালের ঘুম দেখা। বিছানা ছাড়তে কিন্তু কিছুতেই ইচ্ছে করছিল না আজকে সকালবেলায়। ঘুম যখন ভাঙল তখনও দেখি আমার চোখে ঘুম কিছুটা লেগে আছে। কিন্তু উঠতেই হল। ঘুমখরচ না ক’রে ঘুমজমিয়ে রেখে দিলাম। রাত বাড়লে কাজে লেগেও ... ...
অনেক বছর আগে শ্রীজাত ওঁর এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন– যত কবিতা জীবনে লেখার চেষ্টা করেছেন, তার চেয়েও বেশি কবিতা সম্ভবত হারিয়েছেন। উনি বলেছিলেন, অনেক লেখা ভেতরে তৈরি হয় কিন্তু উনি লেখেন না সেইসব কাগজ কলমে। কেননা, সেই কবিতা লিখে উনিও কোথাও এগোবেন না, কবিতাও কোথাও এগোবে না। জানিয়েছিলেন, বাংলায় আরেকটা কবিতা লেখার জন্য লেখার হয়তো আর প্রয়োজন নেই। কেন বলছি এ কথা? আসলে এই সময় আমিও তেমন একটা পর্বে রয়েছি। তাই বারংবার ওঁর এই কথা আমাকে ভাবাচ্ছে। শ্রীমল্লারকৃষ্ণনগর, ১৪ অগস্ট ২০২৫ ... ...