
দেওয়ালিতে এবার তার বাজি পোড়ানো বারণ, ঝিমলির তাই মুখ বেজার। সেই টেনের বোর্ডের আগে থেকে এ এক আপদ শুরু হয়েছে। এবার তো আবার তার সাথে কলেজে ভর্তির সব পরীক্ষা, বারো ক্লাস বলে কথা, কত দায়দায়িত্ব, বাজিটাজিতে হাত পুড়ে কিছু একটা হলে! কলেজে উঠে যাও তারপরে যত খুশী আশ মিটিয়ে বাজি পোড়াও, দোল খ্যালো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারো, আমরা কিচ্ছু বলতে যাবনা। কথার ওপর কথা বলতে গেলে মা বলবে সবকিছুতে ঝিমলির নাকি যত কুযুক্তি, আর নিজেদের এইসব যুক্তি তাহলে কী? কলেজে উঠে গেলে বন্ধুরা তখন কে কোথায় থাকবে তার কোনো ঠিকানা আছে, নিজেই বাড়িতে আর থাকবে কিনা কে জানে! দেখছে তো অন্যদের অবস্থা, সিনিয়রদের সবাইকে। কার কখন ছুটি হয় কে কখন বাড়ি আসছে, কোনো ঠিক নেই, এর সেমিস্টার একসময় শেষ হয় তো ওর প্রজেক্ট তখন মাঝখানে। ... ...

উত্তরগোলার্ধ্বে শীতকাল শেষ হয়ে বসন্তের উঁকিঝুঁকি, দক্ষিণ গোলার্ধ্বে সবে শরৎ। বাইরে তাপমাত্রা এখনো গায়ে ছ্যাঁকা না দিলেও দোকানে জিনিষপত্র কিনতে গেলেই হাতে ছ্যাঁকা খাচ্ছেন গৃহস্থ। রোজার দিন শেষ হয়ে এলো প্রায়, গাজনের সন্ন্যাসীদের এখনো দিন কুড়ি চলবে। দু:খী মানুষ সুখী মানুষ উদাসীন মানুষেরা ঘোরেফেরে দোকান বাজারে। কেউ বাধ্য হয়ে কেউ বা শখে কেউ কেনে ঝোলা উপচিয়ে কেউ বা দেখেশুনে রাখে 'পরেরবার ঠিক দেখিস... ' ... ...

দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে যেভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বাঙালি মধ্যবিত্ত, ঠিক সেভাবেই ওরা তাকিয়ে ছিল মসজিদের বিরাট গেটটার দিকে। ‘ওরা’ মানে, একেবারে বিশুদ্ধ হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবার – কর্তা, গিন্নি, একটি বছর বারোর ছেলে আর একটি বছর আটেকের ফ্রক পরা মেয়ে। রমজানের সন্ধ্যা, তখন রোজা ভাঙা নামাজের সময়, জাকারিয়া স্ট্রীটের নাখোদা মসজিদের সামনে তখন চিলুবিলু ভিড়। সেই ভিড়ে স্পষ্ট দুটো ক্যাটাগরি – সংখ্যাগরিষ্ঠ ফেজ টুপি বা বোরখা পরা নামাজী মুসলমান আর তুলনামুলক সংখ্যায় কম সাদামাটা প্যান্ট-শার্ট বা জিনস-সালোয়ার-টি-শার্টের হিন্দু বাঙালি যুবক-যুবতী। দ্বিতীয় দলটিকে চেনা যায় মোবাইলে ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে দেখলে। মসজিদের প্রবেশপথের ওপর পরপর পাঁচটা বড় বড় ঘড়ি। সেদিকে দেখিয়ে অবিকল লালমোহনবাবুর স্টাইলে ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের বোঝাচ্ছিলেন, ‘ওই যে দেখছ ঘড়িগুলো, ওতে মুসলিমদের বিভিন্ন দেশের সময় দেখাচ্ছে। মক্কার সময়, মদিনার সময়… এই সব।‘ পাশে দাঁড়িয়ে দুধ-তরমুজের সরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ভদ্রলোকের ভুলটা শুধরে দিয়ে বললুম, ‘না দাদা। ওই পাঁচটা ঘড়িতে দিনের পাঁচবার নামাজের সময়গুলো দেখানো আছে। ভাল করে দেখুন, ঘড়ির গায়ে বাংলায় নামাজের নামও লেখা আছে – ফজর, জোহর, এষা, মগরিব…।‘ ‘ও আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি।’ ভদ্রলোকের মুখে বিব্রত হাসি। ... ...

আমি করলাম সেই দুঃসাহসিক কাজটা। না, টিকেট কাটি নাই ট্রেনের। কারণ যে ট্রেনের টিকেট কেটে সিটে বসা যায় না, সেই ট্রেনের টিকেট কেটে লাভ কী? কমলাপুর থেকে এক বড়ভাই যাবে শেরপুর, তাকে বললাম, ভাই আপনে আমার জন্য জায়গা ধরে আসবেন, আমি বিমানবন্দর স্টেশন থেকে উঠব। আমি সেই চিল মুডে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্টেশনে বসে আছি, আমার কোনো চিন্তাই নাই, আমার জন্য জায়গা ধরে আসছে একজন কমলাপুর থেকে। বিমানবন্দর স্টেশনে গিজগিজ করছে মানুষ, তার মধ্যে আমার একবারের জন্য চিন্তা হচ্ছে না এর মধ্যে কিছু তো যাবে জামালপুর, এরা কই উঠবে, কীভাবে যাবে? তাদের চিন্তা তারা করবে, আমার তো এই সব নিয়ে ভাবনা নাই! ভাবনা শুরু হলো যখন ট্রেনকে আসতে দেখলাম! ও আল্লাহ গো! ট্রেন কই? আগাগোড়া ট্রেন দেখা যায় না, মানুষ আর মানুষ! তখন আমি ফোন দেয়া শুরু করলাম সেই বড়ভাইকে। তিনি ফোন ধরে বললেন, ঠ বগিতে আসো। বগির নম্বরও তো দেখা যায় না! আরেক মুশকিল না? আমি দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিয়েছি তখন। কারণ এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না ট্রেন। এর মধ্যে আমাকে উঠতে তো হবে। একসময় পাইলাম ঠ নম্বর বগি। আবার ফোন, ভাই কই? আমি দেখছি একচুল জায়গা নাই বগিতে। এখন? তিনি বললেন মাঝামাঝি আসো। গেলাম, আবার ফোন, কই ভাই, যামু কেমনে? তিনি বললেন, আরে নিচে কী দেখো? উপরে দেখো! আমি উপরে তাকিয়ে দেখি ভাই আমার আরাম করে ছাদে বসে আছে, একটা ব্যাগ দিয়ে আমার জন্য জায়গা রেখেছে ছাদে! ... ...

হিমালয়ঘেরা এই শহরটাতে পুজো আসার সাথে সাথে চারদিক থেকে হিমেল হাওয়ার দল উঁকিঝুঁকি মারে।সারাদিন নানা শোরগোলে আর লোকের ভিড়ে, পুজোমন্ডপের চারধার বেশ সরগরম থাকলেও সন্ধ্যে হতে না হতেই ঠিক শীত না, তবে হিম ভাব। আরতি শেষে ফাংশন শুরু হলে প্রথম দিকটায় ভিড়টা চারিদিকে মাঠের ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও আস্তে আস্তে ঘন হয়ে আসে শামিয়ানার নীচে। একটু রাতে বাড়ি ফেরার সময় হাল্কা একটা পাতা পোড়ার গন্ধ মেশে হাস্নুহানার মাতাল গন্ধে। টুপটাপ হিম ঝরে গন্ধরাজের পাতায়, আর ঝিমলির মন কেমন করে, কারণ ভালো বোঝা যায়না, তবু করে। অন্তত ওই সরস্বতী মন্দির থেকে বাড়ির আধো অন্ধকার পথ চলার ক্ষণে তো করেই। পুজোয় তার তেমন কিছু করার ছিলনা। এমনিতেও সে কোনো বছরই পুজোর ফাংশনের দিকে ঘেঁসেনা খুব একটা, ওই অনন্ত রিহারসাল পর্ব তার মোটেই পছন্দ নয়। আসলে বাঁধাধরা সময়ে কোন কিছু করতেই ঝিমলির ভালো লাগেনা। সেই কারনে এতকাল কোথাও ঠিকমত টিউশনই পড়ে উঠতে পারল না। এবার বারো ক্লাস বলে জোর করে শরাফ স্যরের কাছে অংক করতে পাঠানো হচ্ছে, খুব নিমরাজী হয়েও যাচ্ছে, এন্ট্রান্সের গরজ বালাই! ... ...

নো-এর আদর্শ যে রূপটির প্রতি জেয়ামির লক্ষ্য ছিল তা হল এই নাট্যরূপের এক সুক্ষ্ম কমনীয়তা প্রদান। জেয়ামি বিশ্বাস করতেন যে কমনীয় নো নাটকে অভিনয় করার সময় অভিনেতাদের আরও সৌন্দর্য প্রদর্শন করা উচিত ফুলের মাধ্যমে। এখানে ফুল একটি রূপক অভিব্যক্তি যা অভিনবত্বের প্রতিনিধিত্ব করে,এবং যা সদা আকর্ষণীয় ও সদা সতেজ। জেয়ামি জোর দিয়েছিলেন যে প্রতিটি নো নাটক পরিবেশনায় এবং অভিনেতাদের সাথে অবশ্যই ফুল থাকতে হবে এবং “সারুগাকু দাঙ্গি” এবং “ফুশিকাদেন” সহ ২১ রকম নো-পরিবেশনের উপর তাত্ত্বিক বই লিখেছিলেন। তিনি ৫০টির-ও বেশী নো গানের প্রবক্তা। এগুলি আধুনিক নো-তেও ব্যবহৃত হতে শোনা যায়। ... ...

ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন। একদিন বিকাল বেলা গোলাগুলির শব্দ শুনে আমরা অনেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। দেখি কয়েকটা গাড়ী এক সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এতদিন পরে স্পস্ট মনে পড়ছে না, তবে আবছা মনে হছে দেখেছিলাম একটা পতাকা, তাতে লেখা ছিল – আর সি পি আই (R C P I – Revolutionary Communist Party of India)। গাড়ী গুলো ভর্তি মানুষ। সকলের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, রাইফেল বা রিভলবার। সব বাড়ি থেকে লোক বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়, তাই একটা ছোটখাট ভীড়। আমাদের দেখে একটা গাড়ি থেকে এক যুবক নামল – হাতে রাইফেল। আমাদের সামনে এগিয়ে এসে উঁচু স্বরে বলল – আপনারা সকলে বাড়ির ভিতরে চলে যান। আপনাদের কোন ভয় নেই। আমি অবাক হয়ে দেখলাম সেই যুবক আমাদের তারাপদদা। গাড়ি গুলো কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হল। পরে শুনেছিলাম এরা বসিরহটের কোর্ট কাছারি ট্রেজারী থানা দখল করে বন্দুক গোলা গুলি হস্তগত করে, বসিরহাটকে স্বাধীন ঘোষনা করে এগিয়ে গেছে। কলকাতা যাওয়ার পথে প্রায় পয়ত্রিশ মাইল দূরে ডানলপ ফ্যাক্টরি অধিকার করে ও সেখানকার এক স্বেতাংগ ফোরম্যানকে জ্বলন্ত ফারনেসের মধ্যে ফেলে দেয়। এ ঘটনা সেসময় দেশে খুব উত্তেজনার সৃস্টি করে। বলা বাহুল্য, অচিরেই এই উত্থানকে দমন করে তারাপদদা সহ সব বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে সরকার। এদের নেতা পান্নালাল দাসগুপ্ত অবশ্য পলাতক হন এবং প্রায় দুবছর আত্মগোপন করে ছিলেন। সরকারের গোয়েন্দারা কিন্তু বসিরহাটের ক্লাব আর যুবকদের উপর সর্বদা নজর রেখেছিল। আমি যখন কলকাতায় স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্র তখন কেন যেন আমার মনে হত কেউ যেন আমায় চোখে চোখে রেখেছে। ... ...

হোস্টেলের মন্টুদা বিডিও হয়েছিল। গণিতের। দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে ইংরেজির নামী শিক্ষক। সদ্য অবসর নিল। প্রজিত পড়ায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাস। অনাথ ইংরেজিতে ভালো ছাত্র। আমার জীবনে বহু মানুষের অবদান। দেবাশিসদা আমার শক অ্যাবজরবার। অনাথ আমি খেতে না গেলে খাবার নিয়ে এসে থাকতো। আমি ওদের সঙ্গে খেতাম। টিউশন করে আমি পাঁচ লিটারের একটা হকিন্স প্রেসার কুকার কিনেছিলাম ১৯৮৪ তে। ২২০ টাকা দামে। কিস্তিতে। প্রথমে ৬০ টাকা তারপর প্রতি মাসে ২০ টাকা। ... ...

হিন্দুস্থানে বাবর মোঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠা করলেন ঠিকই কিন্তু তাকে এক স্থায়ী অনন্য, বিশিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন আকবর। সমসময়ে কি ছিল তাঁর মুল্যায়ন ? নিজের সম্প্রসারণের প্রকল্পকে হিন্দুস্থানের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন তিনি কেমন করে ? সালতানাতের আরেক বিশিষ্ট সম্প্রসারণকারী ঔরঙ্গজেব আলমগীরের সঙ্গে তাঁর তফাৎ কিসে ? ... ...

সক্কাল সক্কাল খবরের কাগজে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে বার্নিহাট এই নামটা দেখে বেশ অবাক হয়ে গেছিলাম।পাশে তিরঙ্গা জাতীয় পতাকার ছবি ধন্দ আরও বাড়িয়ে দিল সঙ্গে প্রবল অস্বস্তি, জায়গাটা চিনতে না পারায়। হাতের সামনে পাওয়া এ্যাটলাসের পাতা হাতড়াতে হাতড়াতে হাত ব্যাথা, চোখ বিগলিত। তবুও তেনার দেখা নাই। উপায়ান্তর না দেখে আমার এক ছাত্রকে ফোন করলাম। ও এখন কর্মসূত্রে অসম রাজ্যের বাসিন্দা। প্রথম প্রচেষ্টায় ওদিক থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে আবার তার নম্বর মেলাতে যাব, এমন সময় আমার মুঠোফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠতেই বাটন টিপে কানের কাছে ফোনটা ধরতেই ওদিক থেকে কথা ভেসে আসে – “বার্নিহাট কোথায় ? -তা জানতেই বোধহয় ফোন করেছেন দাদা ? জায়গাটা আমাদের গুয়াহাটি থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে। অবশ্য শিলং থেকে এই শহরের দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। অসমের গায়ে গা লাগিয়ে থাকা মেঘালয় রাজ্যের রি- ভোই জেলায় মেঘালয় পাহাড়ের ঢাল যেখানে এসে গুয়াহাটির সমতলে মিশেছে সেখানেই এই বার্নিহাট শহর।” খট্ করে আওয়াজ তুলে কলটা কেটে যায়। বুঝতে পারি অসমে থাকার দরুণ বেচারিকে হয়তো শহরের অবস্থান জানাতেই নাজেহাল হতে হচ্ছে। ... ...

ভুয়ো এপিক নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, নির্বাচন কমিশন তখন তাঁদের গাফিলতি ঢাকার উদ্দেশ্যে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে ডেকে মিটিং করে ঘোষণা করলো, তাঁরা আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযোগ করিয়ে এই ভুয়ো ভোটার কার্ড সমস্যার সমাধান করতে চায়। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সমাজ মাধ্যমে এই বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হলো। সংসদের বিরোধী দলনেতা নিজে টুইট করে লিখলেন, অবশেষে নির্বাচন কমিশন তাঁদের অভিযোগকে মান্যতা দিল এবং আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযোগ ঘটানোর মধ্যে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয়। সঙ্গে অবশ্য তিনি আরও একটা কথা যুক্ত করলেন, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে কোনও ভোটার যেন বাদ না পড়েন, তা দেখতে হবে এবং সাধারণ মানুষের এই সংযোগ প্রক্রিয়ায় কোনও অসুবিধার সম্মুখীন না হন, সেদিকে নজর দিতে হবে। ... ...

'আমাদের দিনগুলিও অপূর্ণ, অপূর্ণ আমাদের রাত্রি, তবুও হাত ফস্কে জীবন চলে যায় যেন অকম্পিত ঘাসের মধ্যে একটি মেঠো ইঁদুর।' লিখেছিলেন এজরা পাউন্ড। জীবনের দিকে, এবং বারবার এই সন্ধেবেলায় নিজেদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে সত্যিই অদ্ভুত ঘটনাহীন জীবন যেন নিস্তরঙ্গ দুপুরের উঠোন। পুকুরের বুক চিরে ব্যাঙাচি খেলার মত একটা করে ঢিল ছুটে যায় মাঝেমাঝে - সত্যিই কি জলের স্তর চিরে যায়? চেরে না। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন যেন ঐরকম, কত কিছু হয়ে যায় দাগ পড়ে না। তবু সেইসব নিস্তরঙ্গ দিনগুলোর মধ্যে একদিন একটা বিপর্যয় ঘটে যায়। আমরা বোঝার আগেই একটা অন্য পৃথিবীতে গিয়ে পৌঁছুই। আর জেনে যাই - সময় দুইরকম হয়। বিপর্যয়ের আগে, আর বিপর্যয়ের পরে। 'যেমন অসত্য ছিল দীর্ঘ গতকাল, যেমন অসত্য হবে অনন্ত আগামী'। ঋতেনদার সাথে আমার আলাপ ২০০৩ সালের আগস্ট মাসের কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে। আমাদের বিস্ট্যাটের ক্লাস শুরু হয়েছে সেদিন, লাঞ্চব্রেকের আগেই অমর্ত্য দত্তর ক্লাসে গ্যালোয়ার টাওয়ার অফ ফিল্ড-টিল্ড শুনে তখন কান দিয়ে ধোঁয়া-টোঁয়া বেরোচ্ছে, এই অবস্থায় ক্যান্টিনের রাস্তায় আকর্ণবিস্তৃত নিষ্পাপ হাসি মেখে একজন ভালোমানুষ গোছের দাদা এগিয়ে এলেন। ঋতেনদা। ... ...

সাতগাঁয়ের পুরাতাত্ত্বিক ইতিহাসের মতই এই কাহিনীতে বাস্তবের সাথে মিলেমিশে আছে পরাবাস্তব, ইতিহাসের টুকরো টাকরা। এখানে কলার মান্দাসে ভেসে আসা মেয়ের পাছায় থাকে হার্মাদদের ক্রীতদাসত্বের সিলমোহর, পর্তুগিজ ভাষায় খিস্তি করা কাকাতুয়া মানুষমেয়েকে গর্ভবতী করতে পারে। বাপ্পার দিদিমা গঙ্গায় ডুব দিয়ে দূরবর্তী আত্মীয়া, বান্ধবীদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারেন, সাতগাঁয়ের অন্য মেয়েদের সে কৌশল শিখিয়ে দিতেও পারেন। ... ...

যে তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে মহম্মদবাজারের এই কয়লা খনি এলাকা ধরা হচ্ছে, সেখানে আদিবাসী, তফসিলি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস বেশি শুধু নয়, তারাই প্রায় ৯০ শতাংশ। দেওয়ানগঞ্জ, হরিণসিঙ্গা অঞ্চলের তিন হাজার পরিবারের প্রায় ২১ হাজার মানুষ প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের জন্য নিজের এলাকা থেকে উৎখাত হবেন। যদিও তাঁরা বিকল্প বাসস্থান এবং খোলা মুখ খনিতে কাজের সুযোগ পাবেন বলে সরকার জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আবার জুনিয়র কনস্টেবলের চাকরি পাবেন - সরকার এমনও ঘোষণা করেছে। বিবাদ বেঁধেছে এখানেই। সরকারের এই প্রতিশ্রুতিতে গ্রামবাসীদের অধিকাংশের সায় নেই। তাঁরা কোমর বেঁধে নেমেছেন। খোলা মুখ খনিতে কতটা দূষণ হবে, কয়লা উত্তোলন ও পরিবহনের ফলে যে দূষণ হবে, তার জন্য কতটা জমির ফসল নষ্ট হবে, সে তো পরের কথা। মমতার সিঙ্গুর আন্দোলনের যে মূল কথা ছিল, মানুষ না চাইলে সরকার কোনও শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করবে না, সেই আপ্তবাক্যই এখন মমতা সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, বিকল্প বাসস্থান - কোনও কথাতেই চিঁড়ে ভিজছে না। মহিলারা সামনে এগিয়ে এসে পুলিশের সামনেই বলছেন, আমরা ভিটে জমি দেব না। তার জন্য দরকারে প্রাণ দেব। এটা আসলে আদিবাসী গাঁওতার সিদ্ধান্ত। ... ...

আমরা দু'বোন এক বাড়িতে থাকি/ অনেক সুখের সেই একটি সুখ,/ অ্যাস্ট্রোনমির অঙ্ক কষে দিদি/ সেই গর্বে নাচে বোনের বুক। সূর্য-তারা বোনের কবিতায়/ দিদির অঙ্কে তারাই আসে-যায়,/ আমরা জানি আমরা কেমন দেখি/ অন্যে বলে অন্ধ? ― তা বলুক! ... ...

এরিক ফান রিবেকের ডাচ অনুগামীরা সিদ্ধান্ত নিলেন ওই দ্বীপে জেলখানা বানিয়ে শাস্তি প্রাপ্ত অপরাধী, অবাঞ্ছিত, পূর্ব এশিয়া, মাদাগাস্কার ও কেপ কলোনির রাজনৈতিক বন্দিদের যদি সেখানে নির্বাসন দেওয়া হয় তাহলে ডাঙ্গায় ইট গেথে কাঁটা তার ঘিরে জেলখানা বানানো ও ডজন ডজন প্রহরী পোষার খরচাটা বাঁচে। রোবেন আইল্যান্ড কেপ টাউন থেকে দূরে নয়, বাইনোকুলার দিয়ে নজর রাখা যায়, কিন্তু পথ দুর্গম; তার আশে পাশে অজস্র মগ্ন মৈনাক, ঝোড়ো হাওয়ায় আকস্মিক উচ্ছলিত আটলান্টিকের জলরাশি, পালাবার পথ নাই। অন্তত দু ডজন জাহাজ ডুবেছে এখানে নোঙর বাঁধতে গিয়ে। কারাগারে পাহারাদার লাগবে কম। ওই দ্বীপ থেকে কেউ সাঁতরে কেপ টাউন পৌঁছুতে তো পারবেই না বরং হাঙরের মেনুতে পরিণত হবে। চিন্তাটি সঠিক। তিনশো বছরে নৌকা যোগে মাত্র দুটি সফল পলায়নের কাহিনি জানা যায়, তবে কোন বন্দীর সাঁতরে কেপ টাউন পৌঁছুনোর রেকর্ড নেই। ... ...

আমি ভূগোলের প্রেমে পড়েছিলাম পঞ্চম শ্রেণীতে, সেই যেবার নিবেদিতা ইস্কুলের ছোট বাড়ি মানে প্রাথমিক বিভাগ পেরিয়ে বড় বাড়িতে অর্থাৎ মাধ্যমিক বিভাগে এলাম। কাকলিদি ভূগোল পড়াতেন। সেই সময় প্রথম জানলাম ক্লাসের ঘণ্টা পড়লেই দিদি আসার আগে ব্ল্যাকবোর্ডের হুকে মানচিত্র টাঙিয়ে রাখতে হয়। আর ভূগোল ক্লাসে খাতা আনতে ভুলে গেলে তাও কোনোদিন ক্ষমা পেতেও পারি, কিন্তু চণ্ডীচরণের ম্যাপ বই না আনলে ক্ষমা নেই। ... ...

নদীর নাম ইছামতী। খুব বড় নদী নয়, খুব ছোটোও নয়; এপার ওপার দুপারই পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে এই শান্ত নদী মাতাল হয়ে উঠে। কালবৈশাখী ঝড়ে এর রূদ্র রূপ চমক লাগায়। বর্ষায় এ হয়ে উঠে ভয়ংকর – পাড়ের জমি ভেঙ্গে পড়ে নদীর বুকে, গাছপালা বাড়ী ঘর কারো রেহাই নেই। বসিরহাটে আমাদের বাড়ী ছিল এই নদীর ধারে। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়ীর সামনে বেশ বড় একটা বাগান, গাছ পালা ভর্তি। সেই বাগানে আমরা খেলাধুলা করতাম। বাগানের শেষে নদীর পাড়। প্রতি বছরই ইছামতী এই বাগানের ভাগ নিত একটু একটু করে। প্রতি বর্ষায় নদীর পাড় ভাঙত; ইছামতী গ্রাস করত জমি। নদীর ধারে একটা বকুল গাছ ছিল। গ্রীষ্ম কালে প্রচণ্ড গরমে গুমোট ঘরে থাকা যেত না; পড়ায় মন বসত না। সন্ধ্যাবেলা এই বকুল গাছের নীচে মাদুর বিছিয়ে হারিকেনের আলোতে পড়শুনা করতাম। নদীর ধারে মৃদু হাওয়া শরীর জুড়িয়ে দিত --- কি অভাবনীয় প্রশান্তি! একদিন সকালে উঠে দেখি সেই বকুল গাছটার শিকড় উপড়ে গেছে; পদচ্যুত বৃক্ষ মুখ থুবড়ে ইছামতীর জলে পড়ে আছে। মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। পরে সরকার নদীর পাড় বাঁধাবার কাজে উদ্যোগী হয়েছিল। ইছামতী করুণা করে আমদের বাড়ী গ্রাস করে নি; কিন্তু মানুষ করেছিল। মানুষের হাত থেকে আমরা রেহাই পাই নি। ... ...

“মা বাইরে তাকিয়ে দ্যাখো না, বৃষ্টি হচ্ছে?” “হচ্ছে, কিন্ত জোরে নয়, উঠে পড়।“ “আর পনের মিনিট, মা। তুমি দশ মিনিট পরে আবার জানালায় যেও। যদি দেখ প্রাইমারির ছেলেমেয়েরা ফিরছে, তাহলে ডেকো না, তাহলে রেনি ডে। যদি না ফেরে তাহলে ডেকো। “রেনি ডে হলেই বা কী? সকাল সকাল উঠে পড়, বাড়িতেই পড়বি। আর এক মাস পরে তোর ফার্স্ট টার্ম না? এ কথার জবাব দিতে গেলে সকালের মিষ্টি আলতুসি ঘুমটা মাটি হয়। ঝিমলি মুখের ওপর চাদরটা টেনে দিয়ে পাশ ফিরে শুল। মা গজগজ করতে করতে মশারি খুলতে থাকে। ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভের পড়া, এত কম পড়ে কী করে হয় কে জানে। স্কুলটুকু বাদ দিলে সারাদিনই তো হয় ঘুরে বেড়াচ্ছে নয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, অথবা গল্পের বইয়ে মুখ দিয়ে বসে আছে। এত বন্ধু যে কোত্থেকে আসে? আবার কারুর না কারুর জন্মদিনের পার্টি লেগেই আছে। আজকাল নাকি এরপরে সব আলাদা হয়ে যাবে বলে, জন্মদিন পালনের বেশী ঘটা। রাত্রি দশটা এগারোটায় সবাই ঘুমোতে গেলে, তিনি আলো জ্বালিয়ে বই খাতা নিয়ে নাকি পড়তে বসেন। অত রাতে কী ছাই পড়া হয় অমন করে কে জানে! ... ...

আগে ছেলেরা বিয়ে করত আর মেয়েদের বিয়ে হত। মেয়েদেরকে ছোটবেলা থেকেই নানারকমের রাজপুত্রের গল্প শুনিয়ে চাগিয়ে দেওয়া হত। সে নাকি পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসবে। সঙ্গে বলা হত যে মেয়েরা আধ হাত ঘোমটা টেনে দশভুজার মতো সংসারের সব কাজ করবে; সেবা করবে। যেন বিবাহেই তাদের মোক্ষ। আর ছেলেদের পছন্দ ছিল টুকটুকে বউ। “টুকটুকে বউ আনবে আমার ভাই / গলা ছেড়ে গান গেয়ে যাই”। এখন অবশ্য বাইক একটা ব্যাপার হয়ে উঠেছে। তখনকার দিনে কারুর বিয়ে না হলে মনে করা হত যে সে হতভাগ্য; তার জীবনের আর কোনও মানেই নেই। বিবাহিত কুলীনদের মধ্যে সে ম্লেচ্ছ! আবার কুলীন ব্রাহ্মণেরা একগাদা বিবাহ করতেন। কমল কুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রার কথা মনে পড়ছে। এখন অবশ্য আবার যারা ‘একবার’ বিয়ে করেছেন তাদেরকে অবাক চোখে দেখেন ‘চার-পাঁচবার’ বিবাহ করা মানুষজনেরা। বিয়েতে গায়ে হলুদ একটা বিরাট ব্যাপার। সেইরকমই এক বিয়েতে বরকে হলুদ মাখাচ্ছে। একজন ইওরোপীয়ান গেস্ট ব্যাপারটা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিলেন। শেষে নিজেকে আর সামলাতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, “হোয়াই হি হ্যাজ বিন স্মিয়ারিং উইথ স্পাইস? টারমেরিক, অয়েল?” একজন উত্তর দিলেন, “হি হ্যাজ বিন ম্যারিনেটেড ফর রোস্টিং”। ... ...