
ইতালিয়ান বৈজ্ঞানিক আসকানিনো সবরেরো নাইট্রো গ্লিসারিন নামক বিস্ফোরক পদার্থের বিধ্বংসী শক্তির বিষয়ে অবগত ছিলেন কিন্তু একে পোষ মানিয়ে সঠিক ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে পারেননি। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং ততজনিত প্রাণহানির পরে আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল সেটিকে নিরাপদ প্রতিপন্ন করে তাকে সেটি বাক্স বন্দি ও দেশে দেশে রপ্তানি দ্বারা প্রভূত অর্থ উপার্জন করলেন – এর নাম ডিনামাইট। শেষ বয়েসে তিনি একদিন খবরের কাগজে পড়লেন কে বা কারা তাঁকে ‘মৃত্যুর ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়েছে। নোবেল স্থির করলেন তাঁর অর্জিত বেশির ভাগ ধন সম্পত্তি (সাত মিলিয়ন ডলার,আজকের হিসেবে অনেক বিলিয়ন) তিনি তুলে দেবেন সুইডিশ নোবেল ইনসটিটিউটের হাতে। এই অর্থের সুদ হতে ইনসটিটিউট প্রতি বছর পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সফল মানুষদের সম্মানে দান করবেন চারটি পুরষ্কার, তার চয়ন ও প্রদানের দায়িত্ব নেবে সুইডিশ নোবেল সংস্থা। কিন্তু এই সঙ্গে তিনি আরেকটি ক্লজ জুড়ে দিলেন- বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করার এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তুলে শান্তিকে নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেছেন এমন মানুষকে সম্বর্ধিত করার জন্য দেওয়া হবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার, তার প্রাপক নির্বাচন করবেন নরওয়ের পার্লামেন্ট দ্বারা বেছে নেওয়া পাঁচ জনের একটি কমিটি। মনে রাখা দরকার সময়টা উনবিংশ শতকের শেষ দশক, নরওয়ে তখন সুইডেনের অধীনে একটি অঙ্গরাজ্য মাত্র; তাঁদের পার্লামেন্ট আছে বটে কিন্তু সুইডেনের রাজা থাকেন তার মাথার ওপরে। কেন যে আলফ্রেড নোবেল তাঁর নামাঙ্কিত এবং ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কারের সঙ্গে অসলো তথা নরওয়েকে জুড়ে দিলেন তার কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। নরওয়ে সে সময়ে মাঝারি আয়ের ছোট দেশ, ইউরোপে তার স্থান অনেকেরই পিছনে, এমনকি ১৯৩৬ সালে রোমানিয়ার পেছনে। অসলোর জনসংখ্যা আমাদের শ্যামবাজার আর বরানগরের মাঝে গুঁজে দেওয়া যায়। ... ...

মনে পড়ছে সত্তর দশকের ১৯৭১-এ ইনফ্যান্ট বা শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমরা বলতাম ইনফিন। ক্লাস টু পর্যন্ত নিজেদের বসার আসন বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে হতো। ইনফিনে ছিলাম ১৫৭ জন। বেশিরভাগ জন স্কুলে আসতো না। শুধু শনিবার খুব ভিড় হতো। ওইদিন আমেরিকার সরবরাহ মাইলো গম রান্না করে খাওয়ানো হতো। কখনও গুড় থাকতো কখনও নয়। বেশিরভাগ ছেলে মেয়ে থালা নিয়ে আসতো খাবার বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। পরে অবস্থা বুঝে আমার প্রধান শিক্ষক মামা মাইলো রান্না না করেই বাড়িতে দিতে থাকেন। কত গরিব পরিবার যে মাইলো খেয়ে বেঁচেছে। ... ...

এই মরুভূমিতে হালদার আমার মরুদ্যান। সময় পেলে ওর সঙ্গে বসে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও রবীন্দ্রচর্চা করতাম। … কোনো মানুষকে আমি অশ্রদ্ধা করিনা। বরং আমি জানি তথাকথিত উপরতলার মানুষগুলোর থেকে এদের মধ্যে মনুষ্যত্বের অংশ বেশী। এই মানুষগুলো স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই কৃতি ও দক্ষ। এরা মুখ্যতঃ টাকা আর মেশিন ছাড়া আর কিছু জানে না। এদের কাছে পৃথিবীর অন্য কিছুর অস্তিত্ব সপ্রমাণ করতে গেলে এরা বাঁকা হাসি হেসে এমন ভাবে তাকায় যেন মনে হয় আমি একটা নির্বোধ, এখনো সার বস্তু জানতে পারিনি বলে কৃপার যোগ্য। বুঝি পৃথিবী জুড়ে এই দারুন অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে শিক্ষা, রুচি,সংস্কৃতি --- এগুলো শুধু কথার কথা, প্রহসনের নামান্তর। কিন্তু তবুও আমি বুঝতে পারছি না। প্রতি মুহূর্তে আমি চেষ্টা করছি এই অমিলটাকে মানিয়ে নিতে আর প্রতি মুহূর্তেই হারছি। ভয় হচ্ছে ক্রমশঃ এই হারটা আমার চরিত্রের উপর একটা কুৎসিত স্ফোটক হয়ে দেখা দেবে। হয়ত সিনিক হয়ে যাব, মানুষের উপর শ্রদ্ধা ভালবাসা হারাব, নির্লজ্জ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে সুরুচি সবকিছু বর্জন করব। হয়ত এমন কিছু হব যা এখন অকল্পনীয় তখন অনিবার্য। ... ...

মনে পুরোনো দিনের কথা আসে। আমার কন্যা স্কুলে যাবে। তার ভবিষ্যত ভালো হবে, অনেক আশা নিয়ে বেসরকারী ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তাকে ভর্তি করেছি। পড়ানোর অনেক খরচ। সকালে খুব তাড়াহুড়োয় স্কুল ব্যাগে বই গোছাতে বসি। রুটিনে আজ ভূগোল আছে দেখে স্কুল অ্যাটলাসটা ব্যাগে পুরে দিই। ... ...

হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়-বন্ধুদের অপেক্ষা করার জায়গায় অনলাভ বসে আছে। মাঝে মাঝে লাউডস্পীকারে কিছু ঘোষণার অস্পষ্ট শব্দ শোনা যায়, তাছাড়া এই ধরণের জায়গার স্বাভাবিক গুঞ্জনধ্বনিও শ্রোতার কানে আসে, এরই মধ্যে হঠাৎ শোনা যায় স্পষ্ট একটি ঘোষণা। ... ...

রণরক্তে স্নাত বাংলাদেশ নির্বাসনে আছি, বেঁচে আছি স্বর্ণপ্রসূ আমার অভ্যেস লেজারের খোপে ফেলি মাছি- আমি জানি সমস্ত ব্যথাই একদিন সহনীয় হয় অঙ্ক কষে দূর করি তাই অতিরিক্ত বেদনার ভয়! ... ...

বলুন দেখি, পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা দুটো কী কী? দেখুন, সেই বিরানব্বুই সালে মনমোহন সিংজী লাইসেন্স রাজের অবসান ঘটিয়ে সর্বত্র দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তারপর ভাগীরথির বুক দিয়ে কত জল বয়ে গেল, দেশী-বিদেশী শিল্পপতিরা কত চেষ্টাই করলেন, কিন্তু এ পোড়া রাজ্যে একটাও বড় মাপের কারখানা বানানো গেল না। বুদ্ধবাবুও পারেননি, মমতা ব্যানার্জীও পারলেন না। প্রতি বছর প্রচুর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শিল্প-সম্মেলন হয়, হাজার-কোটি লক্ষ-কোটি বিনিয়োগের গল্প শোনা যায়, তারপর সময়কালে দেখা যায় সব ঢুঁ ঢুঁ। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের তো বসে থাকলে চলে না। নাই বা হল শিল্প, বিরাট একটা বাজার তো রয়েছে এ রাজ্যে। মোটামুটি সম্পন্ন একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা সব সময়ই এ রাজ্যে বিপুল। ... ...

দেওয়ালিতে এবার তার বাজি পোড়ানো বারণ, ঝিমলির তাই মুখ বেজার। সেই টেনের বোর্ডের আগে থেকে এ এক আপদ শুরু হয়েছে। এবার তো আবার তার সাথে কলেজে ভর্তির সব পরীক্ষা, বারো ক্লাস বলে কথা, কত দায়দায়িত্ব, বাজিটাজিতে হাত পুড়ে কিছু একটা হলে! কলেজে উঠে যাও তারপরে যত খুশী আশ মিটিয়ে বাজি পোড়াও, দোল খ্যালো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারো, আমরা কিচ্ছু বলতে যাবনা। কথার ওপর কথা বলতে গেলে মা বলবে সবকিছুতে ঝিমলির নাকি যত কুযুক্তি, আর নিজেদের এইসব যুক্তি তাহলে কী? কলেজে উঠে গেলে বন্ধুরা তখন কে কোথায় থাকবে তার কোনো ঠিকানা আছে, নিজেই বাড়িতে আর থাকবে কিনা কে জানে! দেখছে তো অন্যদের অবস্থা, সিনিয়রদের সবাইকে। কার কখন ছুটি হয় কে কখন বাড়ি আসছে, কোনো ঠিক নেই, এর সেমিস্টার একসময় শেষ হয় তো ওর প্রজেক্ট তখন মাঝখানে। ... ...

উত্তরগোলার্ধ্বে শীতকাল শেষ হয়ে বসন্তের উঁকিঝুঁকি, দক্ষিণ গোলার্ধ্বে সবে শরৎ। বাইরে তাপমাত্রা এখনো গায়ে ছ্যাঁকা না দিলেও দোকানে জিনিষপত্র কিনতে গেলেই হাতে ছ্যাঁকা খাচ্ছেন গৃহস্থ। রোজার দিন শেষ হয়ে এলো প্রায়, গাজনের সন্ন্যাসীদের এখনো দিন কুড়ি চলবে। দু:খী মানুষ সুখী মানুষ উদাসীন মানুষেরা ঘোরেফেরে দোকান বাজারে। কেউ বাধ্য হয়ে কেউ বা শখে কেউ কেনে ঝোলা উপচিয়ে কেউ বা দেখেশুনে রাখে 'পরেরবার ঠিক দেখিস... ' ... ...

দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে যেভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বাঙালি মধ্যবিত্ত, ঠিক সেভাবেই ওরা তাকিয়ে ছিল মসজিদের বিরাট গেটটার দিকে। ‘ওরা’ মানে, একেবারে বিশুদ্ধ হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবার – কর্তা, গিন্নি, একটি বছর বারোর ছেলে আর একটি বছর আটেকের ফ্রক পরা মেয়ে। রমজানের সন্ধ্যা, তখন রোজা ভাঙা নামাজের সময়, জাকারিয়া স্ট্রীটের নাখোদা মসজিদের সামনে তখন চিলুবিলু ভিড়। সেই ভিড়ে স্পষ্ট দুটো ক্যাটাগরি – সংখ্যাগরিষ্ঠ ফেজ টুপি বা বোরখা পরা নামাজী মুসলমান আর তুলনামুলক সংখ্যায় কম সাদামাটা প্যান্ট-শার্ট বা জিনস-সালোয়ার-টি-শার্টের হিন্দু বাঙালি যুবক-যুবতী। দ্বিতীয় দলটিকে চেনা যায় মোবাইলে ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে দেখলে। মসজিদের প্রবেশপথের ওপর পরপর পাঁচটা বড় বড় ঘড়ি। সেদিকে দেখিয়ে অবিকল লালমোহনবাবুর স্টাইলে ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের বোঝাচ্ছিলেন, ‘ওই যে দেখছ ঘড়িগুলো, ওতে মুসলিমদের বিভিন্ন দেশের সময় দেখাচ্ছে। মক্কার সময়, মদিনার সময়… এই সব।‘ পাশে দাঁড়িয়ে দুধ-তরমুজের সরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ভদ্রলোকের ভুলটা শুধরে দিয়ে বললুম, ‘না দাদা। ওই পাঁচটা ঘড়িতে দিনের পাঁচবার নামাজের সময়গুলো দেখানো আছে। ভাল করে দেখুন, ঘড়ির গায়ে বাংলায় নামাজের নামও লেখা আছে – ফজর, জোহর, এষা, মগরিব…।‘ ‘ও আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি।’ ভদ্রলোকের মুখে বিব্রত হাসি। ... ...

আমি করলাম সেই দুঃসাহসিক কাজটা। না, টিকেট কাটি নাই ট্রেনের। কারণ যে ট্রেনের টিকেট কেটে সিটে বসা যায় না, সেই ট্রেনের টিকেট কেটে লাভ কী? কমলাপুর থেকে এক বড়ভাই যাবে শেরপুর, তাকে বললাম, ভাই আপনে আমার জন্য জায়গা ধরে আসবেন, আমি বিমানবন্দর স্টেশন থেকে উঠব। আমি সেই চিল মুডে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্টেশনে বসে আছি, আমার কোনো চিন্তাই নাই, আমার জন্য জায়গা ধরে আসছে একজন কমলাপুর থেকে। বিমানবন্দর স্টেশনে গিজগিজ করছে মানুষ, তার মধ্যে আমার একবারের জন্য চিন্তা হচ্ছে না এর মধ্যে কিছু তো যাবে জামালপুর, এরা কই উঠবে, কীভাবে যাবে? তাদের চিন্তা তারা করবে, আমার তো এই সব নিয়ে ভাবনা নাই! ভাবনা শুরু হলো যখন ট্রেনকে আসতে দেখলাম! ও আল্লাহ গো! ট্রেন কই? আগাগোড়া ট্রেন দেখা যায় না, মানুষ আর মানুষ! তখন আমি ফোন দেয়া শুরু করলাম সেই বড়ভাইকে। তিনি ফোন ধরে বললেন, ঠ বগিতে আসো। বগির নম্বরও তো দেখা যায় না! আরেক মুশকিল না? আমি দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিয়েছি তখন। কারণ এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না ট্রেন। এর মধ্যে আমাকে উঠতে তো হবে। একসময় পাইলাম ঠ নম্বর বগি। আবার ফোন, ভাই কই? আমি দেখছি একচুল জায়গা নাই বগিতে। এখন? তিনি বললেন মাঝামাঝি আসো। গেলাম, আবার ফোন, কই ভাই, যামু কেমনে? তিনি বললেন, আরে নিচে কী দেখো? উপরে দেখো! আমি উপরে তাকিয়ে দেখি ভাই আমার আরাম করে ছাদে বসে আছে, একটা ব্যাগ দিয়ে আমার জন্য জায়গা রেখেছে ছাদে! ... ...

হিমালয়ঘেরা এই শহরটাতে পুজো আসার সাথে সাথে চারদিক থেকে হিমেল হাওয়ার দল উঁকিঝুঁকি মারে।সারাদিন নানা শোরগোলে আর লোকের ভিড়ে, পুজোমন্ডপের চারধার বেশ সরগরম থাকলেও সন্ধ্যে হতে না হতেই ঠিক শীত না, তবে হিম ভাব। আরতি শেষে ফাংশন শুরু হলে প্রথম দিকটায় ভিড়টা চারিদিকে মাঠের ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও আস্তে আস্তে ঘন হয়ে আসে শামিয়ানার নীচে। একটু রাতে বাড়ি ফেরার সময় হাল্কা একটা পাতা পোড়ার গন্ধ মেশে হাস্নুহানার মাতাল গন্ধে। টুপটাপ হিম ঝরে গন্ধরাজের পাতায়, আর ঝিমলির মন কেমন করে, কারণ ভালো বোঝা যায়না, তবু করে। অন্তত ওই সরস্বতী মন্দির থেকে বাড়ির আধো অন্ধকার পথ চলার ক্ষণে তো করেই। পুজোয় তার তেমন কিছু করার ছিলনা। এমনিতেও সে কোনো বছরই পুজোর ফাংশনের দিকে ঘেঁসেনা খুব একটা, ওই অনন্ত রিহারসাল পর্ব তার মোটেই পছন্দ নয়। আসলে বাঁধাধরা সময়ে কোন কিছু করতেই ঝিমলির ভালো লাগেনা। সেই কারনে এতকাল কোথাও ঠিকমত টিউশনই পড়ে উঠতে পারল না। এবার বারো ক্লাস বলে জোর করে শরাফ স্যরের কাছে অংক করতে পাঠানো হচ্ছে, খুব নিমরাজী হয়েও যাচ্ছে, এন্ট্রান্সের গরজ বালাই! ... ...

নো-এর আদর্শ যে রূপটির প্রতি জেয়ামির লক্ষ্য ছিল তা হল এই নাট্যরূপের এক সুক্ষ্ম কমনীয়তা প্রদান। জেয়ামি বিশ্বাস করতেন যে কমনীয় নো নাটকে অভিনয় করার সময় অভিনেতাদের আরও সৌন্দর্য প্রদর্শন করা উচিত ফুলের মাধ্যমে। এখানে ফুল একটি রূপক অভিব্যক্তি যা অভিনবত্বের প্রতিনিধিত্ব করে,এবং যা সদা আকর্ষণীয় ও সদা সতেজ। জেয়ামি জোর দিয়েছিলেন যে প্রতিটি নো নাটক পরিবেশনায় এবং অভিনেতাদের সাথে অবশ্যই ফুল থাকতে হবে এবং “সারুগাকু দাঙ্গি” এবং “ফুশিকাদেন” সহ ২১ রকম নো-পরিবেশনের উপর তাত্ত্বিক বই লিখেছিলেন। তিনি ৫০টির-ও বেশী নো গানের প্রবক্তা। এগুলি আধুনিক নো-তেও ব্যবহৃত হতে শোনা যায়। ... ...

ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন। একদিন বিকাল বেলা গোলাগুলির শব্দ শুনে আমরা অনেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। দেখি কয়েকটা গাড়ী এক সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এতদিন পরে স্পস্ট মনে পড়ছে না, তবে আবছা মনে হছে দেখেছিলাম একটা পতাকা, তাতে লেখা ছিল – আর সি পি আই (R C P I – Revolutionary Communist Party of India)। গাড়ী গুলো ভর্তি মানুষ। সকলের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, রাইফেল বা রিভলবার। সব বাড়ি থেকে লোক বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়, তাই একটা ছোটখাট ভীড়। আমাদের দেখে একটা গাড়ি থেকে এক যুবক নামল – হাতে রাইফেল। আমাদের সামনে এগিয়ে এসে উঁচু স্বরে বলল – আপনারা সকলে বাড়ির ভিতরে চলে যান। আপনাদের কোন ভয় নেই। আমি অবাক হয়ে দেখলাম সেই যুবক আমাদের তারাপদদা। গাড়ি গুলো কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হল। পরে শুনেছিলাম এরা বসিরহটের কোর্ট কাছারি ট্রেজারী থানা দখল করে বন্দুক গোলা গুলি হস্তগত করে, বসিরহাটকে স্বাধীন ঘোষনা করে এগিয়ে গেছে। কলকাতা যাওয়ার পথে প্রায় পয়ত্রিশ মাইল দূরে ডানলপ ফ্যাক্টরি অধিকার করে ও সেখানকার এক স্বেতাংগ ফোরম্যানকে জ্বলন্ত ফারনেসের মধ্যে ফেলে দেয়। এ ঘটনা সেসময় দেশে খুব উত্তেজনার সৃস্টি করে। বলা বাহুল্য, অচিরেই এই উত্থানকে দমন করে তারাপদদা সহ সব বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে সরকার। এদের নেতা পান্নালাল দাসগুপ্ত অবশ্য পলাতক হন এবং প্রায় দুবছর আত্মগোপন করে ছিলেন। সরকারের গোয়েন্দারা কিন্তু বসিরহাটের ক্লাব আর যুবকদের উপর সর্বদা নজর রেখেছিল। আমি যখন কলকাতায় স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্র তখন কেন যেন আমার মনে হত কেউ যেন আমায় চোখে চোখে রেখেছে। ... ...

হোস্টেলের মন্টুদা বিডিও হয়েছিল। গণিতের। দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে ইংরেজির নামী শিক্ষক। সদ্য অবসর নিল। প্রজিত পড়ায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিহাস। অনাথ ইংরেজিতে ভালো ছাত্র। আমার জীবনে বহু মানুষের অবদান। দেবাশিসদা আমার শক অ্যাবজরবার। অনাথ আমি খেতে না গেলে খাবার নিয়ে এসে থাকতো। আমি ওদের সঙ্গে খেতাম। টিউশন করে আমি পাঁচ লিটারের একটা হকিন্স প্রেসার কুকার কিনেছিলাম ১৯৮৪ তে। ২২০ টাকা দামে। কিস্তিতে। প্রথমে ৬০ টাকা তারপর প্রতি মাসে ২০ টাকা। ... ...

হিন্দুস্থানে বাবর মোঘল সালতানাতের প্রতিষ্ঠা করলেন ঠিকই কিন্তু তাকে এক স্থায়ী অনন্য, বিশিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন আকবর। সমসময়ে কি ছিল তাঁর মুল্যায়ন ? নিজের সম্প্রসারণের প্রকল্পকে হিন্দুস্থানের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন তিনি কেমন করে ? সালতানাতের আরেক বিশিষ্ট সম্প্রসারণকারী ঔরঙ্গজেব আলমগীরের সঙ্গে তাঁর তফাৎ কিসে ? ... ...

সক্কাল সক্কাল খবরের কাগজে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে বার্নিহাট এই নামটা দেখে বেশ অবাক হয়ে গেছিলাম।পাশে তিরঙ্গা জাতীয় পতাকার ছবি ধন্দ আরও বাড়িয়ে দিল সঙ্গে প্রবল অস্বস্তি, জায়গাটা চিনতে না পারায়। হাতের সামনে পাওয়া এ্যাটলাসের পাতা হাতড়াতে হাতড়াতে হাত ব্যাথা, চোখ বিগলিত। তবুও তেনার দেখা নাই। উপায়ান্তর না দেখে আমার এক ছাত্রকে ফোন করলাম। ও এখন কর্মসূত্রে অসম রাজ্যের বাসিন্দা। প্রথম প্রচেষ্টায় ওদিক থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে আবার তার নম্বর মেলাতে যাব, এমন সময় আমার মুঠোফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠতেই বাটন টিপে কানের কাছে ফোনটা ধরতেই ওদিক থেকে কথা ভেসে আসে – “বার্নিহাট কোথায় ? -তা জানতেই বোধহয় ফোন করেছেন দাদা ? জায়গাটা আমাদের গুয়াহাটি থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে। অবশ্য শিলং থেকে এই শহরের দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। অসমের গায়ে গা লাগিয়ে থাকা মেঘালয় রাজ্যের রি- ভোই জেলায় মেঘালয় পাহাড়ের ঢাল যেখানে এসে গুয়াহাটির সমতলে মিশেছে সেখানেই এই বার্নিহাট শহর।” খট্ করে আওয়াজ তুলে কলটা কেটে যায়। বুঝতে পারি অসমে থাকার দরুণ বেচারিকে হয়তো শহরের অবস্থান জানাতেই নাজেহাল হতে হচ্ছে। ... ...

ভুয়ো এপিক নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, নির্বাচন কমিশন তখন তাঁদের গাফিলতি ঢাকার উদ্দেশ্যে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে ডেকে মিটিং করে ঘোষণা করলো, তাঁরা আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযোগ করিয়ে এই ভুয়ো ভোটার কার্ড সমস্যার সমাধান করতে চায়। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সমাজ মাধ্যমে এই বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হলো। সংসদের বিরোধী দলনেতা নিজে টুইট করে লিখলেন, অবশেষে নির্বাচন কমিশন তাঁদের অভিযোগকে মান্যতা দিল এবং আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযোগ ঘটানোর মধ্যে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয়। সঙ্গে অবশ্য তিনি আরও একটা কথা যুক্ত করলেন, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে কোনও ভোটার যেন বাদ না পড়েন, তা দেখতে হবে এবং সাধারণ মানুষের এই সংযোগ প্রক্রিয়ায় কোনও অসুবিধার সম্মুখীন না হন, সেদিকে নজর দিতে হবে। ... ...

'আমাদের দিনগুলিও অপূর্ণ, অপূর্ণ আমাদের রাত্রি, তবুও হাত ফস্কে জীবন চলে যায় যেন অকম্পিত ঘাসের মধ্যে একটি মেঠো ইঁদুর।' লিখেছিলেন এজরা পাউন্ড। জীবনের দিকে, এবং বারবার এই সন্ধেবেলায় নিজেদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে সত্যিই অদ্ভুত ঘটনাহীন জীবন যেন নিস্তরঙ্গ দুপুরের উঠোন। পুকুরের বুক চিরে ব্যাঙাচি খেলার মত একটা করে ঢিল ছুটে যায় মাঝেমাঝে - সত্যিই কি জলের স্তর চিরে যায়? চেরে না। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন যেন ঐরকম, কত কিছু হয়ে যায় দাগ পড়ে না। তবু সেইসব নিস্তরঙ্গ দিনগুলোর মধ্যে একদিন একটা বিপর্যয় ঘটে যায়। আমরা বোঝার আগেই একটা অন্য পৃথিবীতে গিয়ে পৌঁছুই। আর জেনে যাই - সময় দুইরকম হয়। বিপর্যয়ের আগে, আর বিপর্যয়ের পরে। 'যেমন অসত্য ছিল দীর্ঘ গতকাল, যেমন অসত্য হবে অনন্ত আগামী'। ঋতেনদার সাথে আমার আলাপ ২০০৩ সালের আগস্ট মাসের কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে। আমাদের বিস্ট্যাটের ক্লাস শুরু হয়েছে সেদিন, লাঞ্চব্রেকের আগেই অমর্ত্য দত্তর ক্লাসে গ্যালোয়ার টাওয়ার অফ ফিল্ড-টিল্ড শুনে তখন কান দিয়ে ধোঁয়া-টোঁয়া বেরোচ্ছে, এই অবস্থায় ক্যান্টিনের রাস্তায় আকর্ণবিস্তৃত নিষ্পাপ হাসি মেখে একজন ভালোমানুষ গোছের দাদা এগিয়ে এলেন। ঋতেনদা। ... ...

সাতগাঁয়ের পুরাতাত্ত্বিক ইতিহাসের মতই এই কাহিনীতে বাস্তবের সাথে মিলেমিশে আছে পরাবাস্তব, ইতিহাসের টুকরো টাকরা। এখানে কলার মান্দাসে ভেসে আসা মেয়ের পাছায় থাকে হার্মাদদের ক্রীতদাসত্বের সিলমোহর, পর্তুগিজ ভাষায় খিস্তি করা কাকাতুয়া মানুষমেয়েকে গর্ভবতী করতে পারে। বাপ্পার দিদিমা গঙ্গায় ডুব দিয়ে দূরবর্তী আত্মীয়া, বান্ধবীদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারেন, সাতগাঁয়ের অন্য মেয়েদের সে কৌশল শিখিয়ে দিতেও পারেন। ... ...