
পিচকারী টিচকারী ও শুধু কিছু দুধেভাতে বাচ্চাদের জন্য, বেলুনও তাই, কারণ এ বাড়ির দোলে রঙ ঢালা হয় বালতি বালতি। বালতির সাইজ অবশ্য ছেলেমেয়েদের সাইজ অনুযায়ী হয়। রঙ গোলাই হয় চৌবাচ্চাতে। বড় বাড়ির কলতলার বড় চৌবাচ্চা খালি করে সেখানে সারা পাড়ার রঙ গোলা হয়। তবে রঙই, কাদা গোবর ইত্যাদি এ দোলে কড়াভাবে বারন। এক এক টার্গেট ঠিক হয় আর পুরো দল প্রায় সেই "আক্রমণ" স্টাইলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বালতি উপুড় করে দেয়। রঙ বরষে তো সত্যিই এ রঙের বর্ষা। কোথাও কোনো শুকনো অবকাশ নেই,আপাদমস্তক রঙে চোবানো হয় এই ভিজে দোলে। বড়রা রঙ খেলেনা তবে রঙ মাখে খুশীমনে আর ছোটোদের নানান ফন্দী বাতলে দেয়। কোনো কোনো গিন্নী অল্প বিরক্তি দেখায়, সন্ধ্যেবেলা আবার চান করতে হবে, তবে সেসবে কেউ পাত্তা দেয় না। ... ...

ধীরে ধীরে টের পেতে শুরু করেছি আমি লিখে চলেছি ক্রমাগত। বিভিন্ন রঙের পেন ফেলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি কালো কালির দামী কলমে। অহরহ দোলের কলম তখন পিচকারী। শুকনো ঘাসের শহরে বেদনার সার সার বোতলগুলিতে জমা রেখেছি ছোট খাট হাফ ও কোয়ার্টার প্রেম। গানশোনা শেষে ক্লাস ঘরে ঢুকে বুঝবার চেস্টা করেছি সাদা দেওয়ালেতে লেখা বৈষ্ণব পদাবলী। কোনদিন যদিও বা বৃষ্টি নামে এই নয়ডা শহরে, তুঘলকী কায়দায় ঘুরে বেড়াই শূন্যমাঠে, ললিতকলা আকাডেমির করিডোরে। এক গভীর চোখের মালায়ালী একদিন তুমুল ঝড় বাগিয়ে বল্লো, এই কাঁচ আর পাথর সব ভেঙ্গেচুরে দাও। যমুনা নদীতে অথচ তখন শুধুই সাবানের ফেনা। এরপর একদিন কাঁচ পাথর ও ভ্রম ভেঙ্গে গেলে কোন এক পূর্ণিমার অস্থির রাতে চলে যাই জয়পুরে। ময়ুরেরা লাফিয়ে পার হয় রাস্তা আর আমি যাই উড়ে উড়ে। ঝকঝকে রাস্তার পাশে ঠান্ডা বিয়ারের আয়োজন ও মেলা প্রলোভন। কাঁদতে গেলে এমনই শুনশান রাত লাগে, এমন শুকনো চারিপাশ আর ওই দরজা ঢাকা চাঁদ। সকাল হতে না হতে সব রঙে ভরে যায়, রাস্তা ঘাট ও ঘর। কানে সর্বদা বাজে তামাটে সারিন্দার সুর, চারপাশে রামধনু দেখি আর বুঝতে পারি অনর্গল যা এতদিন লিখে চলেছি আমি তা আসলেই আমার মফস্বলী বর্মে ফিরে আসার উপাখ্যান, লালজুতো পরা খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তনের সাদামাটা একঘেয়ে কাহিনী। এমনটাই লেখা হবে জানি শুকনো কাঁটায় ঘেরা ঊষর দিন, একা সপ্তহান্তে পাহাড়ে যাই, একা ঘরে কাঁদতে কাঁদতে কলম বন্ধ করে হাসি। ছাত্র- ছাত্রী, টু বি স্পেসিফিক, প্রশান্ত ও পারমিতা এসে ঘরে বসে থাকে দীর্ঘায়িত অন্ধকারে। ... ...

সভ্যতা এভাবেই ভাবে- ক্রিয়া করে, অর্থের শাস্ত্রই ধর্ম তার। বিনিময়ের অতীত যা যা, তাকে অতীত করে দিয়ে নিয়ে আসে শিল্পবিপ্লব, কলোনি-বানানোর লড়াই, ইনকুইজিশনের নেড়াপোড়া। তবু সেই যজ্ঞের কালি আবির হয়ে গুঁড়োগুঁড়ো মিশে যায় সব চেয়েছির রাজত্বে। বেদবিরোধী শূন্য উপাসক বৌদ্ধ নাগার্জুনের মায়ায় ধর্মসংস্থাপক শঙ্কর ধর্মকেই মায়া ভেবে বসেন। স্তূপের আদল রেখে শিবলিঙ্গ পুঁতে যান মানুষের বাড়িতে বাড়িতে, অবধারিত করে যান খাদ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ব্রতয় ব্রহ্মচর্য, কর্মে আত্মনির্যাতন। নেড়া বৌদ্ধের মতই শিখা কেটে ফেলেন ব্রাহ্মণ বিশ্বম্ভর মিশ্র। উপবীত ছিঁড়ে ফেলে ভূলুণ্ঠিত হন মোক্ষের উপাস্যে। ভারতের প্রান্তে প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে বেদ-বিমুখ জাতবিহীনদের হোলিখেলা। সম্বলে বাঁদরের রঙ, ভাঙের সিদ্ধিদ্রব্য। ক্রমশ: মন্দির বহির্ভূত:, যজ্ঞরহিত উচ্ছ্বাসের সামাজিক সংশ্লেষ তৈরি হতে থাকে আশূদ্র ভারতসমাজে। হোলিকা নিধনের ফাগোৎসবের দিন ইতিহাস মুখ ঘুরিয়ে দেয় লালন সাঁইজির সাধুসঙ্গের উৎসবে, একব্রহ্মের উপাসক রবিঠাকুরের বসন্ত উৎসবে। শূদ্রভারত তো এভাবেই ব্রাহ্মণ্য উৎপাদনতন্ত্রের অত্যাচারের সমস্ত দাগ গায়ে রেখেও, কান্না-অবিচারের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে শেখে আনন্দের উপাসনায়। ... ...

কমলাদেবী মেয়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার শোক বেশিদিন বুকে ধরে রাখতে পারেননি। একদিন হঠাৎই ঘাট থেকে ফেরার সময় আমবাগানের মধ্যে পড়ে যান তিনি। সঙ্গে তখন কেউ ছিল না। পরে একজন ভিস্তিওয়ালা দেখতে পেয়ে চিনতে পারে কমলা দেবীকে। এসে খবর দেয় বাড়িতে। বিশ্বনাথ আর শ্যামাসুন্দরী আর সুখময়ী ছাড়া বাড়িতে তখন আর কেউ নেই.. বিধবার দল তো আর কমলা দেবীকে ঘাট থেকে তুলে আনতে পারবেন না.. তাই বিশ্বনাথ আর সুখময়ী মৃত ঠাকুমার দেহ ঘাট থেকে টেনে হিঁচড়ে দাওয়ায় নিয়ে এসে ফেলে। সুখময়ী নাড়ী টিপে দেখার আগেই যে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল! কমলা দেবীর ইচ্ছে অনুযায়ী বাড়িতে ২০০ ব্রাহ্মণ খাওয়ানো হয়েছিল। দশ জোড়া গোদান করা হয়েছিল। শ্যামাসুন্দরী সেই কথা বর্ণনা করে লিখছেন (পৃষ্ঠা ১৫০) "এমন জাঁক জমক সুখময়ীর বিয়েতে করলে আমার আত্মার শান্তি হত। মৃত মানুষের জন্য আমাদের সমাজে শোকের থেকে আনন্দ বেশি।' সেই সময়ে একজন গ্রাম্যবধুর কলম থেকে এরকম কথা যে বের হয়েছিল সেটা ভাবতেই আমার সমস্ত শরীরে শিহরণ জেগেছিল। ! শুধু নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি নয়। শ্যামাসুন্দরী প্রকৃত অর্থে একজন চিন্তাশীল এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্না মহিলা ছিলেন। ওনার ডায়েরি শুধু তখনকার মহিলাদের কথাই ব্যক্ত করেনি। বরং সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে আমার কাছে ধরা দিয়েছে। ওই ডায়েরির মধ্যে নিহিত শুধুই একজন নির্যাতিত বাংলার বধূ নয়। ওই ডায়েরি সে সময়ের সমাজের ইতিহাসের সাক্ষ্যও বটে। ... ...

চলচ্চিত্রেও এই বাক্যের আগেই একাধিকবার দেখেছি আমরা বৃন্দাবনকে ঠাকুরঝির প্রতি একটা সস্নেহ প্রশ্রয় নিয়ে একটা আগলে রাখার ক্রিয়ায়। তাই কোনও অসুখী দাম্পত্য থেকে যে পরিপূরণের বা ক্ষতিপূরণের মত করে নিতাইয়ের প্রতি ঠাকুরঝির আগ্রহ এসেছিল তা নয়, এসেছিল ওই যাদু-উপাদান থেকে, ""কই এমনি মুখে মুখে বেঁধে গান করুক দেকি?'' এর পরের কিছু বাক্যেও একাধিকবার এসেছে "কবি' নিতাইয়ের প্রতি ঠাকুরঝির এই বিস্ময়। পরেও এসেছে। নিতাই একটা কিছু পারে যা সাধারণ নয়, অন্যরকম। নিতাইয়ের সেই অন্যরকমত্বটাকে গোড়া থেকেই সম্মান দিয়ে আসছে কেবল দুইজন, রাজন আর ঠাকুরঝি। ঠাকুরঝি তাকে সবসময়েই ডাকে "কবিয়াল' বলে। "কবি' উপন্যাসে যেমন, চলচ্চিত্রেও তেমনি, কবিকে গোড়া থেকেই কবি বলে চিনে আসছে ঠাকুরঝির এই প্রেম। বারবার ঠাকুরঝিকে নিয়ে বাঁধা পংক্তি চলে আসছে কবিগানে, "ছটায় ছটায় ঝিকিমিকি তোমার নিশানা' বা "কাল যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে' এই দুই গানেরই আবিষ্কারের আধার ঠাকুরঝি। আমরা পরে দেখব, এই গানগুলি এতটাই ব্যক্তিগত ঠাকুরঝির কাছে যে নিতাই সেটা কবিগানের আসরে গাওয়ায় ঠাকুরঝি তাকে মন্দ লোক বলে ডাকবে। আমি এটা বলতে চাইছি না যে দাম্পত্য অসুখ থেকে সঞ্জাত প্রেম প্রেম হত না, এটাই বলতে চাইছি যে এই প্রেমটা বরং একটা বাড়তি কিছুর দ্যোতক, চিহ্নিত করছে কবিয়ালের কবিগান গাওয়ার ওই বাড়তি ক্ষমতাকে। ... ...

এইটুকু বুঝতে বাকি ছিল না যে শ্যামাসুন্দরী বিয়ের পরে ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। অর্থাৎ যদি ৬ বছর বয়সে ওনার বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে ৭/৮ বছর বয়সে প্রথম ডায়েরি লেখা শুরু। ডায়েরির প্রথম পাতায় যে "শিশু' শব্দটি আছে.. তা যে লেখিকার স্মৃতি রোমন্থন তাও বুঝতে অসুবিধা হলো না। ভাবতে অবাক লাগে যে সেই সময় শ্যামাসুন্দরী নিজে একটি ৮ বছরের শিশু তবুও তিনি তার লেখার মধ্যে তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব কে খুঁজে বেরিয়েছেন। ওই ফুরিয়ে যাওয়া শৈশবের সঙ্গে যে একবুক নি:সঙ্গতা যে হাহাকার তাও ধরা দেয় ওই সাদা পাতায়। শুধুই শৈশব তার সঙ্গে আর কিচ্ছুই নেই! হয়ত ভাবতে চান নি লেখিকা.. হয়ত মনে রাখার মত ছেলেবেলাও ছিল না ওনার। তাই হয়ত সাদা পাতায় শুধুই ওই একটি শব্দ। পরের পাতার খাট, উনুন, ঝাঁটা, এই সব যখন এঁকেছেন তখন বুঝেছি পলক ফেলার আগেই শৈশব পেরিয়ে মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি সংসার সংগ্রামে নেমেছেন। খাট, উনুন, ঝাঁটা এই সবই তো মধবিত্ত গ্রাম্য সংসারের একটা প্রতীক.. তাই হয়ত ওইগুলি তখন তার জীবনের বেঁচে থাকার উপকরণ! আর বাইরের জগৎ তো তখন দেখতে শেখার বয়স হয় নি.. সমাজ তখন তাকে সেই সম্মতিও দেয় নি.. যত পড়ছিলাম ততই Radice র কথা গুলো কানে বাজছিল। "Arthur Symons felt that the Impressionist in verse should record his sensitivity to experience, not the experience itself; he should express the inexpressible' ... শ্যামাসুন্দরী সেই inexpressible কেই তুলে ধরেছেন। তার এই ডায়েরি পড়বার জন্য ভাষার দরকার হয় না। দরকার একটা মননের।! ... ...

"কিছু মনে কোরোনা, তুমি বাঙালী বলেই বলছি। এসব জায়গা কোনো ভদ্র মেয়েদের কাজের উপযুক্ত নয়। মেয়েদের পক্ষে ঐ ইস্কুল বা কলেজে কাজ করাই ঠিক আছে। তোমার বাড়ির লোকই বা কী ধরণের, মেয়েকে এরকম একটা চাকরি করতে পাঠিয়েছে। তা আজকাল কম্পিউটার টম্পিউটার কম্পানি খুলছে তো কলকাতা দিল্লী বম্বেতে শুনি। তুমি তো সেসব জায়গায় চাকরি খুঁজলেও পারতে।" স্থান : পশ্চিমবঙ্গে স্থিত একটি সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট। কাল: উপরোক্ত ঘটনার একবছর পর। পাত্র: ট্রেনিং শেষে জয়েন করতে আসা উল্লিখিত দুটি মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারের একটি। যে লোকটি এরকম সুমধুর সম্ভাষণে প্রথম দিন মেয়েটিকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন তিনি ঐ প্রজেক্টের মেন্টেনান্স বিভাগের প্রধান। মেয়েটি এরকম অভ্যর্থনায় নির্বাক, প্রথম কাজ শুরু করার আগে বিভাগীয় প্রধানের এধরণের উৎসাহ প্রদানের বহরে মনে একরাশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব। তবু মরিয়া হয়ে জানায় যে তার ইচ্ছা এরকম জায়গায় কাজ করা, পড়াতে তার ভালো লাগেনা। প্রচুর বিরক্তিতে ভদ্রলোক খুঁজে পেতে একটি অদরকারী বিভাগে মেয়েটিকে পাঠালেন মুখ দিয়ে অনর্গল বিরক্তিসূচক নানা শব্দ বার করতে করতে। তারপরের কাহিনী, দীর্ঘ লড়াইয়ের, বারে বারে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা। জরুরী কাজের পারমিট হাতে নিয়ে টেকনিশিয়ান ও মজদুরকে ডাকতে গেছে ফিল্ডে যাবার জন্য, সেখানে তাদের বক্তব্য, "আপনার লিখিত অর্ডার টা দেখি এই গ্রুপে পোস্টিংয়ের, নাহলে আপনার সাথে কাজ করতে যাব না। কিছু গণ্ডগোল হলে তো মেয়েছেলেকে কেউ কিছু বলবেনা, আমাদেরই ধরবে।" ... ...

নতুন নারী-নির্মাণের কাজটি বাঙালি হিন্দুরা এর একশো বছর আগে করেছিলেন। আকিমুন এই তথ্যটি দিলেও তার ইতিহাসটি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন। শিক্ষিত সহধর্মিণীর জন্য এক প্রজন্মের পুরুষের চাহিদা তৈরি হওয়া মাত্র হিন্দু পরিবারের গুরুজনেরা তাঁদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে, তাদের জন্য মেম গভর্নেস রেখে বিটোফেন সম্পর্কে শিখিয়ে, খোলা গাড়িতে স্বামীর পাশে বসে হাওয়া খাওয়ার উপযুক্ত করে তুলেছিলেন - এ চিত্র আদৌ ঐতিহাসিক নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে ইতিহাস পাঠ করলেই আকিমুন বুঝতেন যে অন্দরমহল থেকে মহিলাদের সদরে আসার পথ তৈরি করার জন্য কয়েক প্রজন্মকে হিন্দু সমাজের নানান অর্গল ভাঙতে হয়েছে। সে লড়াই যে সব সময়ে পুরুষের উদারতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল, তাও নয়। ... ...

প্রথমে চলচ্চিত্রে প্রসঙ্গটা কিভাবে এল সেটা দেখে নেওয়া যাক। প্রথমে রাজনের মন্তব্যে ইঙ্গিত আছে সেই অতিনির্ণয়ের, আগেই যেটা আমরা দেখেছি, আধুনিকতার পেশা থেকে জীবিকা অর্জন আর ঐতিহ্যের সক্রিয়তা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেটা নয়, কৌতূহলটা অন্য জায়গায়। এই একমাত্র জায়গা "কবি' চলচ্চিত্রের যেখানে খুব স্পষ্ট একটা নির্মাণের গরমিল পেয়েছি আমি, এবং যা একটুও ছিল না "কবি' উপন্যাসে। এতটাই বেমানান লেগেছে এটা অবশিষ্ট চলচ্চিত্রটা তৈরির সুচারু সুপরিকল্পিত রকমের সঙ্গে যে, "কবি' চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনও কেউ যদি আজও বেঁচে থাকেন, এবং তার স্মৃতিতে থেকে থাকে এই খুঁটিনাটি তো সেটা আমি জানতে আগ্রহী। গরমিলটা কোথায় সেটা আগে দেখে নেওয়া যাক উপন্যাস থেকে। ... ...

অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস ঘোষণার প্রাক্মুহূর্তে প্রকাশিত হল একটি বুলবুলভাজা, চলচ্চিত্রচঞ্চরী। আগের কিস্তির সূত্র ধরে ফিরে আসি টলিউডে। লেখার একদম শেষের দিকে উল্লেখ করেছিলাম যে সত্তর দশকেও আমরা পেয়েছি "নিশিপদ্ম', "থানা থেকে আসছি', "এখানে পিঞ্জর', "ধন্যি মেয়ে'র মতন সিনেমা যেগুলি তথাকথিত আর্টহাউস্ ফিল্ম না হয়েও পেয়েছিল সমালোচকদের প্রশংসা এবং সাথে বক্স-অফিস সাফল্য। সত্তরের "এখানে পিঞ্জর' (প্রফুল্ল রায়), "শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' (বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় ), আশির "দাদার কীর্তি'র (শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) মতন প্রভূত জনপ্রিয় সিনেমাগুলি স্বনামধন্য সাহিত্যিকদের কালজয়ী ছোট গল্প বা উপন্যাস আবলম্বনে তৈরি। "নিশিপদ্ম' বা "ধন্যি মেয়ে'র চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন অরবিন্দ মুখার্জ্জী যিনি নিজে সাহিত্যিক ছিলেন এবং "দেশ' বা "নবকল্লোল'এ তাঁর একাধিক ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। সাহিত্যিকদের রূপোলী পর্দার জগতে বিচরণের যে ট্র্যাডিশন প্রেমেন্দ্র মিত্র-শৈলজানন্দরা তৈরি করে দিয়ে গেছিলেন, সত্তর-আশির দশকে সেটাই বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন অরবিন্দ। যাই হোক্, মূল প্রসঙ্গে ফিরি - বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লের-ই রমরমা, অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে সেভাবে এল কই? সত্যজিৎ রায় থেকে তপন সিনহা, অগ্রদূত থেকে তরুণ মজুমদার - জনপ্রিয় সিনেমাগুলি প্রায় সব সময়েই অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লের ওপর তৈরি। ... ...

সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর এই তিন যুগে তপস্যা ক্রমান্বয়ে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন বর্ণকেই আশ্রয় করিয়াছিল। কিন্তু এই তিন যুগে শূদ্রের তাহাতে অধিকার হয় নাই। এই নীচ বর্ণ ভবিষ্যতে ঘোরতর তপস্যা করিবে। কলিযুগই তাহার প্রকৃত সময়। শূদ্রজাতির দ্বাপরে তপস্যা করা অতিশয় অধর্ম। সেই শূদ্র আজ নির্বুদ্ধিতাবশত: তোমার অধিকারে তপস্যা করিতেছে। সেই জন্য এই বিপ্রবালক অকালে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছে। রাজা রাম তখন এর নিরসনে গেলেন পঞ্চসপ্ততিতম সর্গে। কোথায় ঘটছে এই শূদ্রের তপস্যা তার তদন্তে গিয়ে রাম শেষ অব্দি খুঁজে পেলেন। দেখিলেন শৈবল পর্বতের উত্তর পার্শ্বে একটি সুপ্রশস্ত সরোবরের তীরে কোন এক তাপস বৃক্ষে লম্বমান হইয়া আছেন এবং তিনি অধোমুখে অতিকঠোর তপস্যা করিতেছেন। তদ্দৃষ্টে রাম তাঁহার সন্নিহিত হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, তাপস! তুমি ধন্য, বল, কোন্ যোনিতে জন্মিয়াছ। ষট্সপ্ততিতম সর্গে আমরা পাই কাহিনীর শেষটুকু। ... ...

তর্ক উঠতে পারে, তাহলে দাম বাড়ার সাথে চাহিদা কমে যাবার মত অর্থনৈতিক ব্যাপার যা মানুষের সমাজে হামেশাই চলে, সেটাও যে ঐ বাঁদরেরা দেখিয়ে দিল, তার ব্যাখ্যা কি হবে? এই ব্যবহারও তো বাঁদরদের শেখানো হয়েছে। তাদের বারবার করে দেখানো হয়েছে যে একই সংখ্যক চাকতি দিয়ে আর একই পরিমাণ জিনিষ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে দিয়ে অর্থনৈতিক নীতির প্রাকৃতিক ভিত্তি কিভাবে প্রমাণ হল? আর চাকতির বদলে সেক্স, সেটার কি ব্যাখ্যা হবে? সেটা তো এটাই দেখায় যে বেশ্যাবৃত্তি প্রকৃতিতেও রয়েছে। তাই কি? আগেই বলেছি যে গবেষণাগারের খাঁচায় পোরা বাঁদরের শেখানো-পড়ানো ব্যবহারকে প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি বলে ধরে নেওয়ার মধ্যে গোলমাল আছে। যদি বলা হয়, চাকতি দিয়ে সেক্স কেনাটা তো শেখানো হয়নি। ঠিক কথা। কিন্তু "কেনা'-টা তো শেখানোই। চাকতি দিলে বদলে কিছু পাওয়া যায়, এটা তো বিলক্ষণ শেখানো হয়েছে ওদের। সেই কিছুকে বাঁদররা নিজের পছন্দমত ভেবে নিয়েছে। এতে এটা হয়তো প্রমাণ হয় যে কোনো একধরণের ক্রিয়া শেখালে তার সাধারণ বিধিটা বাঁদরগুলো শিখে নিতে পারে। অর্থাৎ চাকতির বিনিময়ে আঙ্গুর পাওয়া যায় এটা শেখালেই ওরা বুঝে যায় যে ঐ চাকতি দিয়ে যেকোনো জিনিষ-ই পাওয়া যেতে পারে। ... ...

কেন্দুলি সন্ধান অতনু ব্যানার্জী পাটাতনের এক আধভাঙ্গা চৌকিতে চোখের ওপরে রাতজাগা হলুদ বাল্বের আলো নিয়ে ছিটকিনিহীন দরজার ঘরে শুয়ে পড়লাম আমি; মাঝে মাঝে উড়ে আসছিল অবাক অবাক সব প্রশ্ন "আপনি চাদর আনেননি!! শোবেন কি করে!!' "সকালে নদীর ধারে "সারতে' যেতে পারবেন তো'!! "ওমা জুতো পরে শুলেন যে বড় !! খুলে শোবেন না!!' বাইরে তখন আনন্দমেলা। মানুষের ভিড়ের কলকল শব্দ। অস্থায়ী আখড়ায় আখড়ায় তীব্র নাম সংকীর্তনের ভক্তিরস। নানা ছাউনিতে ঘুমিয়ে থাকা মকর স্নানের অপেক্ষায় থাকা মানুষ। স্বপ্নে বিশাল বড় এক মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। জিলিপি, পাঁপড়ভাজার দোকানের পাশেই ঝাঁ চকচকে মাদার ডেয়ারীর দুধের কাউন্টার! এক জায়গায় চোখ স্থির হয়ে গেলো বেশী ভিড় দেখে; একটা মাংসের দোকানে একটা লোককে পিছমোড়া করে বেঁধে বেদম মারছে একটা লোক। গা কেটে যাচ্ছে মারের চোটে, রক্ত পড়ছে দরদর করে। আমার বন্ধু বললো "এটাই নিয়ম এখানকার'! টাটকা টাটকা পড়ুন হরকিসিমের কেন্দুলির জয়দেবের মেলা আর দু-এক ছটাক বাউলগান। ... ...

ব্যাপারটি গুরুতর! প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী রাজধানী রায়পুরের সদর পুলিস লাইনের কাছে যখন খবর পৌঁছুলো ততদিনে লীজা ও সীমা প্রায় ষাটদিনের গর্ভবতী। রাস্তার ছোঁড়ার সঙ্গে প্রেম? তায় ওদের বাচ্চার মা হওয়া? কমান্ডেন্ট ড: সঞ্জীব শুক্লা ও আরেকজন কোম্পানী কম্যান্ডেন্ট মহা খাপ্পা! লীজা ও সীমার র্যাশন ও অন্য পার্কস্ ও কম করা হল। আর ওদের সাসপেন্ড করে বেস্ স্ট্যান্ড সেল এ নজরবন্দী করে রাখা হল। এর ফল ভাল হয়নি। লীজা যুবতী বটেক কিন্তু সীমা¡ যে মাঝবয়সী। ফলে লীজা জন্ম দিল দশটি বাচ্চার; মা ও সন্তানেরা সবাই সুস্থ। কিন্তু সীমা প্রসব করল সাতটি সন্তান। ওর মধ্যে চারটি বাচ্চা আঁতুড় ঘরেই মারা গেল। সীমার শরীরও বিশেষ ভাল নয়। ... ...

গুরুদেব আমায় খুলে দিলো পাবলিশিং হাউস - মহাগুরু সাহিত্য মন্দির। সুর্য সেন স্ট্রিটে পাল বস্ত্রালয়ের উপর বিশাল ঘর নিলাম। কাঠ দিয়ে আমার আলাদা চেম্বার। আমি নিভৃতে বসে লেখালিখি করতে পারব। সামনের ঘরে বস ট্রেড সামলাবে। গুরুই বলল, তোর তো অনেকদিন লেখালিখির অভ্যেস নেই, আগে কয়টা মানে বই লিখে হাতটা সড়গড় করে নে, পরে ওষুধ-চিকিৎসা নিয়ে ৩০/৪০টা খন্ডে জাব্দা জাব্দা বই লিখিস! দেখলাম আইডিয়াটা খারাপ না। আগে লেখাটা দরকার। লেখাটা রেডি থাকলে প্রয়োজন মত ক্যারেক্টারের নাম বদলে দিলেই হল। রাম-লব-সীতা হলে রামায়ন। অনিমেষ-অর্ক-মাধবীলতা হলে কালপুরুষ। এই রকম। নাউ উই নিড ফিউ নেমস। বসই সেসব যোগাড় করে আনলেন আশেপাশের স্কুল কলেজ থেকে। ই সি বিদ্যাসাগর, আশু ভট্টাচার্য, ভূ চৌধুরী, ক্ষে গুপ্ত, পি আচার্য। ট্রিপল এম.এ.। বি.এড, বি.টি, পিএইচডি, স্বর্ণপদক। আমি চুটিয়ে মানে বই লিখতে লাগলাম, হু হু সেল। প্রকাশকের তকমার আড়ালে যে মেঘনাদের মত লেখক বসে আছে তা নিশ্চয়ই কেউ ভাবেনি। আমাদের বাঙালদের "র' আর "ড়' এ একটা চিরকালীন ঝাড় আছে, এই সময় আমার কোম্পানীতে যোগ দেয় পরিতোষ, তার দায়িত্ব হল এই বানানের ঝাড়গুলো ঠিক করা। ... ...

এদের তাকে বাঁধিয়ে রাখা যেতে পারে, বুকে নয়। "ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিটিউড'-এর প্রভাব "মিডনাইটস চিলড্রেন'-এও পাই, কিন্তু সেক্ষেত্রে রুশদির টানটান গল্প বলার পটুত্ব বেঁধে রাখে শেষ অব্দি। প্রভাব থাকেই, কিন্তু তার সাথে থাকে কিছু নতুনত্ব, বক্তব্যে এবং লিখনভঙ্গীতে, সামঞ্জস্য প্রয়োজন তাদের। অন্যথায় বিপদ, যা ঘটেই থাকে। বন্ধুবর বলেছিল দেবর্ষী সারগি পড়তে, নাকি দারুণ! পড়ে ফেললুম, মনে হল মন্দ না, অন্য রকম ভাবে লিখছেন, ভালো কথা, কিন্তু কী লিখছেন, কথা নয় কাহিনি নয়, দর্শন, ঈশ্বর-মনুষ্য চিন্তা, গভীরতা কতখানি, ডোবা যায় না, চুল ভেজে না, শুধু গায়ে একটু ছিটে লাগে মাত্র। "দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিইং' পড়ে বুঁদ হয়ে ছিলুম কয়েক মাস, এই পার্থক্য, আমি বরং কুন্দেরায় ফিরে যাব বার বার। স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র বা অনিল ঘড়ুই খুব একটা খারাপ না লাগলেও সেই অনূভুতি আসেনি যা প্রথম এবং মাঝের দিকের শীর্ষেন্দু পড়ে আসত। শুধু মোটামুটি, খারাপ না, ঠিকঠাক, এসব পড়ে আর শুনে হতাশ! পাগল করে দেবে কে, আবার? ... ...

কবিতায় ""সবুজ রহস্যময় আত্মা''-র রহস্য তৈরি করার রাস্তা খুঁজে পেতে হয়, পেরেক ঠুকে হয় না। অতএব সজ্ঞানে কবিতা কে কঠিন করে, একটু বাঁকিয়ে চুরিয়ে লিখে আত্মপ্রসাদ লাভ করবেন না তাতে আখেরে, আপনার বা আমাদের কারুর ই লাভ হবে না, বাংলা সাহিত্যের দু:খের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। এরকম কঠিন করে দেওয়ার ইচ্ছাধারী রা যেমন আছেন, তেমন ই আছেন সহজ করে দেওয়ার অবতারেরাও। এদের লেখা পড়তে গিয়ে যে মাঝে মধ্যে ভালো একেবারেই লাগেনি তা নয় (উদা: পিনাকী ঠাকুর), তবে এত বেশী সহজ, স্মার্ট এবং নতড়ঁ ফষ করে দেওয়ার সফল চেষ্টা, যে সেটাই বেশী করে চোখে পড়ে, কানে আসে। উদাহরণ দিতেই হবে? বেশ, হাতের কাছে শ্রীজাত আছে তো নাকি, পড়ে ফেলুন। শব্দের কারুকাজ, ঝিন্চ্যাক লাইন আর খেলা খেলা ছন্দের চৌকাঠ পেরিয়ে যখন ভিতরে যাবেন, তখন দেখবেন বাড়ি তৈরি ই হয়নি, শুধু দরজা আর চৌকাঠ। হায় তবে যে কোথায় পড়েছিলুম, মাঠের ধারে হলুদ বাড়ি গড়েছে মিস্তিরি! ... ...

রমা তার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে এই অনুযোগ করেই, যে অমর ঐ উপন্যাসে তাকে "কাঁচামালের' মত ব্যবহার করেছে। কিন্তু অমরের মতে সমস্যা এটাই - ""যে সম্বন্ধ সে তুলে ধরবার চেষ্টা করছে তা নিয়ে যদি সে নাটক করত তাহলে এ আলোড়ন হত না। সে যদি এমন আষ্টেপৃষ্টে নিজেকে বেঁধে না ফেলত তার বইয়ের সঙ্গে, তাহলে তার মা এমন মর্মান্তিকভাবে অভিভূত হতেন না, আত্মীয়স্বজনেরা এমন ভাবে চাইত না তার দিকে। লোকে জানত অমর আজকাল সাহিত্য করছে। সেখানেই চুকেবুকে যেত ব্যাপারটা, কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামাত না। কিন্তু তার বই পড়ে এ কথা সুস্পষ্ট যে এ বই লেখকেরই এক অবিচ্ছিন্ন ডায়েরী। ডায়েরীর মত নগ্নভাবে প্রায় শিল্পকে বিপন্ন করে নিজেকে মেলে দেওয়ার চেষ্টা অনেকেই নিতে পারেনি।'' অংশটিতে আমার চোখে পড়ে "আষ্টেপৃষ্টে নিজেকে বেঁধে না ফেলত' এবং "অবিচ্ছিন্ন ডায়েরী' শব্দগুলি। এই শব্দ কটি জীবনানন্দ দাসের সমগ্র গদ্যকর্মের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারি কারণ এ আমরা পড়েছি যে জীবনানন্দ দাস উপন্যাস সম্বন্ধে 'diversified autobiography' - র প্রসঙ্গ এনেছিলেন এবং তাঁর দিনলিপি ও "লিটারারি নোটস'-এর মধ্যে কোন ফারাক থাকে না। বলতে পারি, উপন্যাসের অমর আর জীবনানন্দ দাস দুজনের প্রকল্পই যেন উপন্যাসের মাধ্যমে কীভাবে নিজের জীবনকেই অনুসরণ করা যায়, কীভাবেই বা নিজের জীবনকে আবিষ্কারের বিষয় করে তোলা যায় তারই অনুসন্ধান। অসীম রায়ের অন্বিষ্টও কী এটাই ছিল? ... ...

আমাদের চারপাশের সুবিচারবিহীন দুনিয়া এবং সুবিচারের আকাঙ্ক্ষায় যে প্রতিবাদী আন্দোলনগুলি গড়ে উঠেছে সেগুলির দিকে তাকালে আরেকটি প্রশ্ন জেগে ওঠে যার উত্তর শ্রী সেনের আলোচনায় পাওয়া গেল না। যদি সুবিচার খুঁজতে গিয়ে কোন ব্যক্তি বা সমষ্টি হিংসার পথ অবলম্বন করে তাহলে তা ন্যায়সঙ্গত কিনা। বাস্তব দুনিয়ায় "public sphere' বা "public reasoning' জাতীয় উদারনৈতিক(liberal) তত্ত্ব খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় না, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে। আমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে হিংসার বিরুদ্ধে কিন্তু নিপীড়িত মানুষ যদি হিংসার পথ বেছে নেয় তাহলে তা সবসময় অনৈতিক এটাও বলতে পারব না। এখানেই আবার মনে হয় যে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম - মানুষের সুবিচার পাবার পথ যদি গ্রাম সংসদ খুলে দিতে পারে তাহলে হয়ত গরীব মানুষ হাতিয়ার তুলে নেবার কথা ভাববে না। কিন্তু যেখানে পঞ্চায়েত বা ব্লক অফিস বা রাষ্ট্রের বিচারালয় গরীব মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয় সেখানে হিংসার পথে গরীব মানুষ হাঁটতে বাধ্য হয়। অতএব সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সুবিচার যে প্রতিষ্ঠানগুলি দিতে পারে সেই প্রতিষ্ঠানগুলিকে উন্নত করা প্রয়োজন হতে পারে। ... ...

মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরবর্তী অংশে যে প্রসঙ্গগুলি এসেছে তার দু-একটা এখানে উল্লেখ করে রাখি। এর পরেই মহাদেব কবিয়াল উল্লেখ করবে নিতাইয়ের জাত-ব্যবসার কথা। সেটা বলতে এখানে চুরি-ডাকাতির কথা তুলেছে মহাদেব। যেমন নিতাইয়ের বাবার কথা বলেছে সে, সিঁদ কেটে বাড়ি বাড়ি চুরি করত, বা তার ঠ্যাঙাড়ে ঠাকুর্দার কথা, এবং তার মায়ের বাবার কথাও যে কিনা দ্বীপান্তরে মরেছে। এছাড়া নানা জায়গায়, ডোমদের আর একটা পেশা ছিল শ্মশানে। ডোমদের এই ধরনের পেশাগুলির একটা ইতিহাস ছিল। বাংলার সামাজিক ইতিহাস নিয়ে কোনও খুব স্পষ্ট মতামত দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু নানা সময় যা কিছু শুনেছি বা পড়েছি, তার থেকে এইটুকু মাথায় আসছে যে, বোধহয় ব্রিটিশ আমলে ডোমদের এইসব অপরাধ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক পেশার সূচনা প্রাকব্রিটিশ বাংলায়। সেখানে ডোমরা ছিল একটি যোদ্ধা জাতি। বিভিন্ন রাজার হয়ে যুদ্ধ করত এই ডোমরাই। এই ইতিহাসই বোধহয় ধরা আছে ওই ছেলেভোলানো ছড়ায়: "আগে ডোম, বাগে ডোম, ঘোড়াডোম সাজে'। আগে এবং পিছনে ডোম সৈন্যদের নিয়ে, অশ্বারোহী ডোম যোদ্ধাদের নিয়ে, "ঢাক মেঘর ঘাঘর' ইত্যাদিতে যুদ্ধের বাজনা বাজাতে বাজাতে যুদ্ধে যেতেন তখনকার বাংলার রাজারা। তারপর রুল ব্রিটানিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপে, রাজশেখরের ভাষায়, "আন্ডার দি সুদিং ইনফ্লুয়েন্স অফ দি বিগ রড', রাজারা ভ্যানিশ, রাজায় রাজায় যুদ্ধও ভ্যানিশ। ফলত বহু জায়গাতেই ডোমরা তাদের যুদ্ধবিদ্যা সম্পৃক্ততা থেকে সহজেই রত হল চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি পেশায়। ডোমদের যেটা পোষাকি নাম, "রাজবংশী' বা "বীরবংশী', যার একটি মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরেই এসেছে, অন্যটিও এসেছে চলচ্চিত্রের অন্যত্র, তারও শিকড়টা তাই রাজা বা বীর, যা এদের সেই লুপ্ত হয়ে যাওয়া পেশাকেই চিহ্নিত করে। ... ...