এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিজ্ঞান জিতেছে নাকি কুসংস্কার ?

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫৬ বার পঠিত
  • বিজ্ঞান জিতেছে নাকি কুসংস্কার ?
     
    পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার কৃষ্ণনগরে সন্নিকটে মায়ের মৃতদেহ থেকে চক্ষুদান (কর্নিয়া) করানোর অপরাধে আমীরচাঁদ শেখকে ( যিনি একজন স্কুলশিক্ষক ও সমাজসেবী ) তিন দিন জেল খাটতে হয়েছে। আজ এই নিয়ে এক গভীর বিষাদ ও বিচলন নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই (যা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ)। মরণোত্তর দেহদানের মতো একটি নিঃস্বার্থ ও মহৎ কাজ যখন আমাদের সমাজে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং একটি শোকাতুর পরিবারকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করার বদলে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক কাঠামো কতটা গভীর সংকটে নিমজ্জিত। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই বিড়ম্বনাটি কেবল কিছু মানুষের উন্মাদনা নয়, বরং সামষ্টিক বিশ্বাস বনাম ব্যক্তিগত আধুনিকতার এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। গ্রামবাসীদের মধ্যে যে মারমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, তাকে সমাজ-মনস্তত্ত্বের ভাষায় এক ধরণের গণ-হিস্টিরিয়া বলা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের লালিত প্রথা বা ধর্মীয় আবেগের বাইরে কোনো আধুনিক পদক্ষেপকে যখন মানুষ অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখে, তখন তাঁরা ব্যক্তিগত যুক্তিবোধ হারিয়ে এক ধরণের আউট-গ্রুপ বায়াস বা রক্ষণাত্মক হিংস্রতায় মেতে ওঠে।
     
    তবে এই সংকটের মূলে কেবল কুসংস্কার নেই, রয়েছে এক বিশাল Comunication Gap। প্রথা ভাঙার দীর্ঘ লড়াইয়ে সমাজকর্মীদের মধ্যে যে সংগত কারণেই এক ধরণের রক্ষণাত্মক ভঙ্গি তৈরি হয়, তা অনেক সময় স্থানীয় মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। নথিপত্র দেখানো বা স্বচ্ছতা নিয়ে যখন আস্থার অভাব তৈরি হয়, তখন আদর্শ আর বাস্তবতার মাঝে তৈরি হয় এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। এই আস্থার অভাবই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। এটি আমাদের শেখায় যে, বড় পরিবর্তনের পথে কেবল উন্নত আদর্শ থাকলেই চলে না, বরং স্থানীয় মানুষের অনুভূতি আর সংস্কৃতির প্রতি গভীর সহমর্মিতা এবং ধৈর্যশীল আলাপচারিতার মাধ্যমে আবেগ ও আস্থার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করাও সমান জরুরি।
     
    সবচেয়ে বিড়ম্বনার বিষয় হলো প্রশাসনের কৌশলগত দ্বন্দ্ব। পুলিশ যখন পরিবারটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ হেফাজতে নেয়, তখন তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পরিবারটির জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা, কিন্তু আইনের নিজস্ব যান্ত্রিকতা ও প্রথাগত ধারার মারপ্যাঁচে যখন সেই সুরক্ষাই তিন দিনের হাজতবাসে রূপ নেয়, তখন জনমানসে এক ধরণের কনফার্মেশন বায়াস তৈরি হয় ফলত মানুষ ভুলবশত মনে করতে থাকেন যে, প্রগতিশীল কাজটিই আসলে হয়তো অপরাধ ছিল! আইনের এই যান্ত্রিক প্রয়োগ পরিবারটির শোকাতুর মনে যে "কগনিটিভ ডিসোনেন্স" বা অবিশ্বাসের ক্ষত তৈরি করেছে, তার দায় কে নেবে?
     
    যখন একটি মহৎ কাজকে অপরাধের মাপকাঠিতে বিচার করা হয় এবং "প্রক্রিয়াই যেখানে শাস্তি" (Process is the Punishment) হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমাজ ও প্রশাসনের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। এই আইনি বিড়ম্বনা কেবল একটি পরিবারকে লাঞ্ছিত করে না, বরং সামাজিক বিবর্তনের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। পরিশেষে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রগতির পথটি কেবল যুক্তির ইট দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা এবং বিচারবিভাগের মানবিক ব্যাখ্যা দিয়ে তৈরি হওয়া প্রয়োজন। তবেই সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার এই ব্যবধান ঘুচে গিয়ে এক নতুন ও বিজ্ঞানমনস্ক ভোরের সূচনা হবে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন