বিদ্রোহী শাসক: মমতা মডেলের রাজনৈতিক রসায়ন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২৬ সালের নির্বাচনী কৌশলটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত কোনো তত্ত্বে ধরা পড়ে না, কারণ তিনি এখানে 'সেলফ-ক্যানিবালাইজেশন' বা নিজের তৈরি করা ব্যবস্থাকে নিজেই গ্রাস করার এক অকল্পনীয় সাহস দেখিয়েছেন। সাধারণত কোনো শাসক তাঁর প্রশাসনকে নিজের শক্তির উৎস মনে করেন, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেছেন। নির্বাচন কমিশন যখন একের পর এক প্রশাসনিক রদবদল ঘটালো — ডিজিপি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যন্ত সরিয়ে দিল — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মুহূর্তটিকে নিজের প্রশাসনিক দায়মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ... ...
নাগরিকের কাঁধে হাত যারা ফতোয়া দিচ্ছে তারা অন্ধ, আর যারা তদারকি করছে তারা জন্ম থেকেই বধির।অথচ রাজপথে পুলিশের ব্যারিকেড আর নাকা-চেকিংয়ে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।রাষ্ট্রের চোখে আমরা সবাই সম্ভাব্য অপরাধী, পকেটে ভোটার কার্ড নিয়েও আমরা ‘পরদেশি’।কেন এই বন্দিদশা আর কার আদেশে এই অপমান—তার উত্তর কারোরই জানা নেই। ঠিক তখনই আদালত হাত রাখল আমার কাঁধে—এক নিমেষে এই আজব দেশের জাদুমন্ত্র যেন সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।আমি বুঝতে পারলাম, আমি মরে যাইনি, আমি কেবল ফাইলে বন্দি কোনো নম্বরও নই—আমি এ দেশের মালিক, যার নিজের চাকার ওপর নিজেরই পূর্ণ অধিকার আছে।এখন আর আমাকে ‘দেশদ্রোহী’ মনে হচ্ছে না, আয়নার সামনে আমি এখন একজন শান্ত নাগরিক। ... ...
ভোটের 'লাইফ সার্টিফিকেট': শতাংশের সার্কাস আর অস্তিত্বের লড়াই গবেষক থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের জিতেন কাকা—সবাই এখন ক্যালকুলেটর নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এবারের ভোটের এই ৯২ শতাংশের গগনচুম্বী ফিগার দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা যেন একটা পেল্লায় সাইজের অংকের ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। সোজা কথায় বললে, রাষ্ট্র যখন ডাস্টার দিয়ে ভোটার তালিকার ‘হর’ কমিয়ে ছোট করে দিল, তখন লাইনে চারটে লোক বাড়লেও ‘লব’ এমন লাফ মারল যে স্বয়ং আর্যভট্টও দ্বিতীয়বার জিরো আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হতেন। কিন্তু এই সংখ্যার ভেল্কির আড়ালে উঁকি দিলে দেখা যায় এক অদ্ভুত মনের লড়াই—যার পোশাকি নাম ‘বিস্মৃতির ভয়’। সবচেয়ে করুণ অথচ কড়া দৃশ্যটা দেখা ... ...
নিরাপদ জ্যান্ত লাশঅখিল রঞ্জন দে শহরে আজ উৎসবের স্তব্ধতা,খুনিরা রাজপথে বুক ফুলিয়ে হাঁটে—অথচ হুকুম হয়েছে:সাধারণের বাইকের চাকা যেন না ঘোরে,গতিই নাকি আজ সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রদ্রোহ! অন্দরমহলে আজ অদৃশ্য সেন্সরের নজরদারি,নিজের ছায়াকেও আজ ‘বহিরাগত’ সন্দেহ হয়;রাজা বললেন, "রক্তের টান ষড়যন্ত্রের আঁতুড়ঘর, স্বজন আজ বারণ—নিরাপদ থাকতে হলে আজ থেকে তোমরা কেবল একে অপরের ‘ভোটার’! ছায়া যাতে শরীর ছেড়ে না পালায়—রাজা তাই সূর্যটাকেই আজ আকাশ থেকে নামিয়ে দিয়েছেন;এখন জমাট অন্ধকারে আমরা মুখ থুবড়ে পড়ে আছি—আর রাজা বলছেন, "দেখো, আজ থেকে তোমাদের কোনো শত্রু নেই!" পায়ের তলায় শিকল নেই, অথচ আমাদের নড়াচড়া আজ নিষেধ—কারণ স্থির থাকতে পারাই নাকি এই রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ নাগরিকত্ব।আমরা যারা অনেকদিন আগেই মরে গিয়েছি,তারা এই জমাট অন্ধকারেও ... ...
রাইত আটটার ঝটকাআরে মশয় শোনেন, এখন তো আর ভাষণ নাই, এখন হইলো গিয়া ‘ইভেন্ট’! আমাগো আগের কারবার আছিল আলাদা। প্রধানমন্ত্রী মুখ খুললে আমরা বুঝতাম দেশটা বুঝি কোনো বড় বিপদে পড়ছে কি না। বুকটা একটু ধড়ফড় করলেও একটা ভরসা আছিল। আর এখন? এখন রাইত আটটা বাজলে যদি টিভির পর্দায় ওই চেনা মুখ আর ‘মেরা পেয়ারে দেশবাসীয়োঁ’ ডাক শুনেন, তাইলে বুঝবেন পকেটের শেষ সম্বলটুকুও বুঝি গিয়াছে! আমাগো রাজা মশয় তো আবার পুরাপুরি ডিজিটাল। সংসদ-ফংসদ এখন যাদুঘরে পাঠাইয়া দিছে, সব কাম এখন একলাই সারেন টিভির ক্যামেরার সামনে।আরে কর্তা, গণতন্ত্রে তো একটা ‘চেইন অফ কমান্ড’ থাকে, না কি? সংসদে গিয়া কথা কবেন, বিপক্ষ দল ... ...
বাংলার নীরব জনপদ: এক রাজনৈতিক বিবর্তনের গল্প পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর নির্বাচনী আবহে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে জনপদ রাজনৈতিক তর্কে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করতে ভালোবাসে, আজ তার এই ‘সাইলেন্ট মোড’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক বিরাট ধাঁধা। আপাতদৃষ্টিতে একে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধী’ হওয়া বলে মনে হলেও, গভীরে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এটি আসলে এক ধরণের রাজনৈতিক বিবর্তন। দুর্নীতি বা বেকারত্বের মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলোতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ থাকলেও, প্রকাশ্য প্রতিবাদের মঞ্চে আজ এক আশ্চর্য শূন্যতা। এই নীরবতা কি তবে কোনো বিরাট ঝড়ের পূর্বাভাস, নাকি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক গভীর অনীহা ও মোহভঙ্গের প্রকাশ? এই নীরবতার একটি বড় কারণ হলো ‘পরীক্ষিত ইস্যুর পুনরাবৃত্তি’ ... ...
নির্বাক ইশতেহারবাতাসে উড়ছে প্রতিশ্রুতির খইতুমি ভাবলে উৎসবের আবিরআর বুক ফুলিয়ে মেতে উঠলেএক রঙিন মিছিলে।আকাশে ঘুরছে SIR-এর চিলতুমি ভাবলে নিছক প্রশাসনিক ভুল,অথচ ভোটার তালিকার কাটাছেঁড়ায়তোমারই নাম আজ ‘রিজেক্টেড’ জঞ্জাল।এইভাবেই—তুমি আরজি করের রক্তকে ভেবেছিলে স্রেফ নিউজ ফিডতাই কাদা ছোড়াছুড়ির ভিড়ে বিচার হারিয়ে গেল।তুমি গিরগিটির প্রতিশ্রুতিকে ভেবেছিলে পাথরের দাগঅথচ দেখলে— অন্যান্য রাজ্যে সেই দাগ স্রেফ জলের আলপনা।তুমি দেখেছ— চিৎকার করে শুধু মান-সম্মান খোয়ানো সারটুনটুনির ফাঁকা বুলিতে আজ আর চিঁড়ে ভেজে না,তাই ‘মন্দের ভালো’র আশ্রয়ে তুমি এখন এক নীরব শিকার।ঘরে ফেরা মানুষটি জানে—যমুনার জলে প্রতিশ্রুতি ভাসে, আর গঙ্গার পাড়ে নামে অন্ধকার।"তোমাকে বোকা বললেপুরোটা বলা হলো না ওয়েস্টপেপার বাস্কেটরাও চিৎকার করে বলছে—"তোমার ইশতেহার তারা নিতে চায়না। ... ...
জলঙ্গীর বাঁকে নধরের ভেলা: এক অস্তিত্বের মন্থর প্রতিবাদ আজ কৃষ্ণনগর পৌরসভার হলে ‘নধরের ভেলা’ সিনেমাটি দেখার সুযোগ হলো। প্রথাগত মাল্টিপ্লেক্সের চাকচিক্য ছেড়ে মিউনিসিপ্যাল হলের এই সাদামাটা পরিবেশে সিনেমাটি দেখা যেন গল্পের ‘নধর’-এর মতোই এক সহজ ও মাটির কাছাকাছি অভিজ্ঞতা। তবে এই ছবি দেখার পর আমার মনের ভেতর কিছু অন্যরকম ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব আমার কাছে মনে হয়েছে এর ‘ধীরতার রাজনীতি’। যখন পুরো পৃথিবী জেতার জন্য দৌড়াচ্ছে, তখন নধর যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—তাল মেলাতে না পারা কোনো অপরাধ নয়। অভিনেতা অমিত সাহার অসামান্য অভিনয় নধর চরিত্রটিকে এক ... ...
নাগরিকত্বের গোলকধাঁধা ও ২০২৬-এর পাটিগণিত: বাংলার উদ্বাস্তু রাজনীতির এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ‘উদ্বাস্তু’ পরিচয়টি কেবল দেশভাগের ক্ষত নয়, বরং এটি এক চিরস্থায়ী অস্তিত্বের লড়াই। দশকের পর দশক ধরে যারা এদেশের মাটিতে নিজেদের শিকড় গেড়েছেন, আজ তারা এক অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। বিজেপি যখন ‘নিঃশর্ত নাগরিকত্ব’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে মতুয়া ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মন জয় করেছিল, তখন সেই আশ্বাসের পেছনে ছিল এক ধরণের আধ্যাত্মিক স্বস্তি। কিন্তু সিএএ কার্যকর হওয়ার পর সেই স্বস্তি আজ আতঙ্কে রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে, একজন মানুষকে তার বর্তমান নাগরিক পরিচয়কে ‘অবৈধ’ বলে স্বীকার করতে বাধ্য করে ভবিষ্যতের নাগরিকত্বের টোপ দেওয়া আসলে ... ...
হোমো সেপিয়েন্স থেকে ডি-ভোটার: মানচিত্রের জঠরে হারানো মানুষবিবর্তনের আদিম লগ্নে মানুষ ছিল এক নিখাদ যাযাবর, যার কাছে গোটা পৃথিবীটা ছিল অবারিত বৈঠকখানা আর নীল আকাশটা ছিল উন্মুক্ত ছাদ। কিন্তু বিবর্তনের এক কুক্ষণে মানুষ শিকার ছেড়ে লাঙল ধরল, আর সেই সঙ্গেই জন্ম নিল ‘সীমানা’ নামক এক অদ্ভুত ভূত। যাযাবর যুগের সেই অবাধ মস্তানি থমকে গেল জমির সংকীর্ণ আলপথে; মানুষ ভাবল মাটি চাষ করে সে প্রকৃতিকে জিতছে, কিন্তু আসলে সে নিজেকেই এক-একটা ‘রাজনৈতিক খোপে’ বন্দি করে ফেলল। শুরু হলো ‘আমার জমি-তোমার জমি’র সেই আদিম ক্যাচাল, যা আজ আধুনিক রাষ্ট্রে এসে এক চূড়ান্ত ‘বেনাগরিক সার্কাসে’ পরিণত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মানুষ কাঁটাতার দিয়ে ... ...