এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • খাপ পঞ্চায়েত এবং জনৈক পঙ্কজ দত্ত

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ ডিসেম্বর ২০২৪ | ৫৯৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • তাপস পালকে মনে পড়ে? একদা বাংলার মহানায়ক, তারপর জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে তাঁর একটা ভিডিও ফাঁস হয়। কোনো এক কর্মীসভা বা ওই জাতীয় কিছুতে তিনি গরম-গরম বাণী দিচ্ছেন, ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেব। খুবই নিন্দেমন্দ হয়, আমিও করেছিলাম। তৃণমূল তাপস পালকে আর টিকিট দেয়নি। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু জিনিসটা তারপর জিনিসটা ক্রমশ মিডিয়া এবং সোশাল মিডিয়ার দীর্ঘস্থায়ী খাপে পরিণত হয়। তারপর রোজভ্যালি কাণ্ডতে গ্রেপ্তার হন তাপস, এক বছর পরে ছাড়াও পান, সিবিআই য়ের আর চাট্টি গ্রেপ্তারির মতো এটাও স্রেফ ফালতু। কিন্তু এটাতেও সমর্থন করার মতো কেউ ছিলনা। তাপস জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আরেকদফা ক্ষমাও চান, কিন্তু তখনও বাকি সক্কলে দেখ-কেমন-লাগে মোডে। তারপর মোটে ৬১ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিঃসঙ্গ নায়ক মারা যান।

    তরুণ তেজপালকে মনে পড়ে? ২০১৩ সালে হঠাৎ গোয়ার থিংক ফেস্টিভ্যাল থেকে ভেসে আসে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ। নেহাৎই অভিযোগ ছাড়া তখনও কিছু ছিলনা, তার যথাযথ তদন্তের দাবী অবধি ঠিকই আছে। কিন্তু গোদী মিডিয়া সমস্বরে নেমে পড়ে তেহেলকার কর্ণধার তেজপালের বিরুদ্ধে খাপ বসাতে। প্রগতিশীলরাও নেমে পড়েন টিভিতে মুখ দেখানোর প্রতিযোগিতায়। কে কত বেশি গরম কথা বলতে পারবেন, তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। তেজপাল সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে যান। একমাত্র আংশিকভাবে স্রোতের উল্টোদিকে মুখ খুলেছিলেন, অনুরাগ কাশ্যপ। তাঁরও একঘরে হবার উপক্রম হয়। (আমার নিজেরও একঘরে হবার দশা হয়েছিল, বুঝতেই পারছেন, অভিজ্ঞ লোক, এবারই প্রথম হল তা নয়)। বছর আষ্টেক পরে আদালতের রায় বেরোলে দেখা যায়, সন্দেহ ঠিকই ছিল। তেজপাল শুধু ছাড়া পান তাই নয়, রায়ের ছত্রে ছত্রে অভিযোগের বিরুদ্ধে গাদা-গাদা প্রমাণ দেওয়া আছে। ততদিনে অবশ্য তেহেলকা উঠে গেছে। নিঃসঙ্গ তেজপাল মারা যাননি, কিন্তু তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটেছে। এমনকি ২০২০ তে পাতাললোক নামের একটা সুপারহিট সিরিজ হয়, তার স্রষ্টা বলেছেন, ওটা তেজপালের একটা উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত, কিন্তু সিরিজে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি।

    এসব লিখছি, পঙ্কজ দত্ত প্রসঙ্গে। তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেকেই বলছেন, এ একরকম হত্যা। হত্যা কিনা জানা নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধেও খাপ বসেছিল। পুলিশি হস্তক্ষেপ হয়েছিল। উপরের দুজনের মতোই, যদিও অনেক কম মাত্রায়। অভিযোগটা ঠিক কী, মাথামুন্ডু বোঝা যায়নি। তিনি একটা খুব আপত্তিকর কথা বলেছিলেন, নিন্দে হয়েছিল, হবারই কথা। কিন্তু নিন্দনীয় কথা বললেই তো সেটা ফৌজদারী অপরাধ হয়না। তার চেয়েও বড় কথা, পৃথিবীতে এমন একটিও লোক পাওয়া যাবেনা, যে সারা জীবনে একটিও উল্টোপাল্টা এবং নিন্দনীয় কথা বলেনি। তার জন্য তাদের যা নিন্দে, সেটা হলে কিছু বলার নেই, কিন্তু এই খাপের যুগে, তথাকথিত "দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি"র যুগে নিন্দাকে ছাপিয়ে তার প্রতিক্রিয়া চলে যায় বহু বহু দূরে। চারদিকে ঘিরে ধরে ইট মারার মতো অসভ্য বর্বরতায়।

    এই ঘটনাটায় অবশ্য একটা আয়রনিও জড়িয়ে আছে, যেটা আগের দুটোয় ছিলনা। এই পুরো বর্বরতায় মিডিয়া জড়িত থাকে শিকারী হিসেবে, প্রতিদিন সান্ধ্যকালীন খাপের আসর বসায় তারা, প্রয়োজনে ঘটনা ম্যানুফ্যাকচার করেও। বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়ে আসে পেটোয়া বা অনুগ্রহপ্রার্থী একদল লোককে, যাদের মতামত দেবার যোগ্যতাটা ঠিক কোথায় টের পাওয়া যায়না। মিডিয়ার মনোবিশেষজ্ঞদের দেখা যায়, স্রেফ খবর পড়েই বিশ্লেষণ করে ফেললেন, অপরাধবিশেষজ্ঞদের দেখা যায় গুজব থেকেই সিদ্ধান্ত টেনে ফেললেন, ডাক্তারদের দেখা যায় জেনে বুঝে গুল দিতে। পঙ্কজ দত্ত এই চক্রটার অংশ ছিলেন। তাতে আনন্দ পাবার কিচ্ছু নেই। কোনো খাপই আনন্দদায়ক না। পঙ্কজ দত্তের পরিণতিও, হত্যা যদি নাও হয়, বেদনার। কিন্তু এই চক্রটার দায়, আরও অনেকের সঙ্গে তাঁর নিজেরও।

    যাঁরা পঙ্কজ দত্তকে নিয়ে অশ্রুবিসর্জন করছেন, অবশ্যই করুন। অন্যায় হয়েছে বলছেন, অবশ্যই বলুন। আমিও মনে করি অন্যায়। আগেও লিখেছি সেটা। কিন্তু অবশ্যই তাপস পাল বা তরুণ তেজপালকে নিয়েও একই কথা ভাবুন। আরও বহু লোককে নিয়ে খাপ বসেছে, যদিও মাত্রা কম। তিনি বিনীত গোয়েলই হন, আর তন্ময় ভট্টাচার্য। সব্বাইকে নিয়ে ভাবুন। মিডিয়া খাপ হল বিংশ শতকের অভিশাপ। আপনি আজকে খাপের মজা নিচ্ছেন, কালকে এ জিনিস আপনার ঘাড়েও চড়ে বসবে। এটা লুজ-লুজ গেম ছাড়া আর কিচ্ছু না। না হলেও বছর দশ-পনেরো ধরে লিখে আসছি, সেই টিম হান্টের ঘটনার পর থেকেই, যে, এ থেকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি ছাড়া কারোরই কিছু হবার নেই।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন