এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  বইপত্তর

  • মাই ইয়ার্স ইন অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিজনঃ মেরি টাইলার। অনুবাদ

    বর্গীয় জ লেখকের গ্রাহক হোন
    বইপত্তর | ০৭ আগস্ট ২০২৩ | ৬১৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • প্রত্যর্পণ
    ~~~~~~~

    মোহিনী চলে যাওয়ার পর কিছুদিন আমার সেলে ছিল রাজকুমারী আর সোমরি। ওরা গনঝু নামে একটা জনজাতি সম্প্রদায়ের মেয়ে। রাজকুমারীকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করতাম। আমার দেখা বেশিরভাগ জনজাতির মানুষদের মতই, রাজকুমারীও ভীষন পরিশ্রমী, সোজাসাপটা আর ঝগড়াঝাটি একেবারে পছন্দ করে না। এমন একজন সৎ মানুষ যাকে কোন কিছু নিয়েঅবিশ্বাস করা কথা ভাবাই যায় না। সন্ধ্যেবেলা গরাদে তালা লাগিয়ে দেওয়ার পর ও কিছুক্ষন লোহার শিকগুলি ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে - ওর ফেলে আসা গ্রাম, ঘরের কথা স্মরণ করে। একটু পর সোমরি ডেকে, সান্ত্বনা দিয়ে খেয়ে নিতে বলে। কোনও কোনও রাতে, একটু রাত গড়ালে ও একটা গান ধরে। ওদের গ্রামের, ওদের জাতির, ভাষার, সুরের গান। এমন অসম্ভব সুন্দর সুরেলা গলা আমি আর কারো শুনিনি। শেখার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কথা, সুর আর ধ্বনির মূর্চ্ছনা মিলিয়ে মিশিয়ে এই সঙ্গীত, আর রাজকুমারীর কন্ঠের ঐ ওঠাপড়া, আবেগ -  আমার আয়ত্তে আসেনি।

    সোমরি বছর পঁয়ত্রিশের সাদাসিধে মহিলা। স্বামী মারা গেছে, পনেরো বছরের ছেলে এই জেলেই আছে। খুব স্নেহপ্রবন মহিলা, আমাকে ডাকে "বাচ্চা" বলে। সোমরি আমার জন্য রান্না করে দেয়, স্নানের সময় আমার পিঠ ঘষে দেয়, শীতের রাতে ওর নিজের কম্বল দিয়ে আমার গায়ে দিয়ে দেয়। সর্বক্ষন পোকামাকড় আর ভূতের ভয়ে অস্থির - পেছনে লাগার জন্য একেবারে আদর্শ লক্ষ্য! আমার প্রতি ওর একেবারে মায়ের মত ব্যবহারে আমিও যেন ওর কাছে বাচ্চা হয়ে যেতাম। কোনদিন হয়তো আমার চিরুনি লুকিয়ে রাখলাম ওর বিছানার তলায়, বা বললাম পায়খানায় একটা ভুত দেখেছি - তাতে সোমরি ভয়ে অস্থির হয়ে হাজার দরকারেও আর ঐদিক মাড়ালো না - দেখে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যেত! কক্ষনো রাগ করতো না- । ওর হাবভাব দেখে একেক সময় এত মজা লাগতো - একটা নথ পরতো নাকে, যেমন এদিককার গ্রামের মেয়েরা অনেকেই পরে। সেই নথের দুলটা দুলতে থাকতো ঠিক ওর ঠোঁটের নীচে - খোয়া যাওয়া সামনের দাঁতের শূন্যস্থানটার ঠিক সামনে! একবার নাকি দেশি মদ খেয়ে মাথায় চালের বস্তা নিয়ে রাতের জঙ্গলের পথ দিয়ে হাঁটার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে দাঁতগুলি গেছে!

    ভারতের মোটামুটি তিন চতুর্থাংশ গ্রামীন মানুষের মতই, সোমরি এমন জায়গা থেকে এসেছে যেখানে কৃষি কাজের জন্য জলের একমাত্র উৎস বৃষ্টি। প্রধান ফসল ধান, বাজরা আর ভুট্টা। চারা বোনো, তারপর ভগবানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকো! সোমরি জীবনে এই তিনটে শস্য আর জঙ্গলে পাওয়া ফল ফুল আর কন্দ ছাড়া কোন খাবার চেনে না। জেলে আসার আগে কোন দিন আলু বা পেঁয়াজ খায়নি; কলা, নারকেল - এসব জিনিসের নামও কখনো শোনেনি। বাইরের জগত নিয়ে জ্ঞান কম থাকলেও সোমরি খুবই বুদ্ধিমতী। সরকারী লোকেদের দু'চোখে দেখতে পারে না। ওদের গ্রামে কখনো কখনো সেনাবাহিনীর জওয়ান ভর্তির ক্যাম্প হয় - সেগুলি ওর মতে বড়লোকের যুদ্ধে লড়াই করে মরার জন্য বোকা লোক জোটানোর ফিকির। এছাড়া আসে পরিবার পরিকল্পনার লোক, কেউ আবার এসে বলে ওদের চাষের জমি দেবে - যা কিনা আসলে কোনদিনই দেওয়া হয় না। ওর চোখে সরকার একটা এমন জিনিস যা গাঁয়ের মানুষকে জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়োতে বাধা দেয়, ঝিল থেকে মাছ ধরতে বাধা দেয়, লোকেদের যখন ধানের দরকার তখন তাদের দিয়ে জোর করে তুলো চাষ করায়।

    জেলের অন্য বেশিরভাগ কয়েদীর মতই, রাজকুমারী আর সোমরির শোনা বাইরের একমাত্র দেশেগুলির নাম হল পাকিস্তান আর চীন। ও শুনেছে চীনেরা নাকি ওদের বুড়ো মানুষদের মেরে কেটে খেয়ে ফেলে, আর খায় সাপ আর বাঁদর - যারা পবিত্র প্রাণী। আমি সোমরিকে বললাম চীনেরা কেমন দীর্ঘ দিন সংগ্রাম করে পুরনো সমাজকে বদলে নতুন রকম নিয়ম কানুন তৈরি করেছে। মনে পড়ে গেল ভারতে ঢোকার পর থেকেই কেমন চীন বিরোধী প্রচার দেখেছি চার দিকে - সে স্টেশনের বইয়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র। মনে হল গ্রামের সরল মানুষের মনে চীনের এই ভয়ানক চেহারা এমনি এমনি আঁকা হয়নি।

    আমরা শুধু রাজনীতি টিতি নিয়েই কথা বলতাম - তা না। এক রাতে সোমরি শোনালো ওর ভাইপোকে জঙ্গলে কাঠ কুড়নোর সময় কী ভয়ানক ভাবে বাঘে টেনে নিয়ে গেছে। বিহারের জঙ্গলে তখনও অনেক হিংস্র জন্তু জানোয়ার - বন্য প্রাণীর সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা এই গ্রামের মানুষদের জীবনের সঙ্গে নিজের নিরাপদ শৌখিন জীবনের তুলনা করে আশ্চর্য হয়ে যেতাম। সোমরি আমাকে বলেছিল এপ্রিল মাস থেকে কীভাবে ওরা দিন রাত এক করে জঙ্গল থেকে ঝরে পড়া মহুয়া ফুল তুলে রোদে শুকিয়ে জমিয়ে রাখে। এর পর কয়েক মাস এই জমিয়ে রাখা মহুয়া ফুল সেদ্ধ অথবা সেঁকা ওদের দুবেলার খাওয়া - যতদিন না জুলাই মাসে ভুট্টার ফসল ওঠে। বাড়ির বাচ্চা বুড়ো সবাই সারা দিন মহুয়া কুড়োয় এই সময় - স্নান করারও সময় থাকে না কারন তাতে অনেক দূর হেঁটে জলের জায়গায় যেতে হবে। সোমরি বলতো প্রতি বছরই মহুয়ার সময় ও উকুনের উৎপাতে ভুগতো - কারন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার কোন সময় থাকতো না।

    সোমরি স্থানীয় এক মহাজনের মনিহারী দোকানে ফাই ফরমাশ খাটার কাজ করতো। তার বিনিময়ে ও খাবার পেত, কখনো হয়তো নিজের বা ছেলের জনয় দুয়েকটা জামা কাপড়ও পেত। ও আটক হয়েছে স্থানীয় ডাকাত দলকে জিনিস পত্র দিয়ে সাহায্য করার অভিযোগে। দলটা কখনো হাটুরেদের জিনিসপত্র লুট করতো, এলাকায় কোন বাড়িতে লোক নেই এমন খবর পেলে ডাকাতি করতো। ঐ দলের কয়েকজন ডাকাতও তাদের আস্তানা থেকে আটক হয়েছিল; তিন ডাকাতের স্ত্রী বেশ কয়েক মাস আমাদের সঙ্গেই জেলে ছিল। ওদের সম্প্রদায়টার নাম পাহাড়িয়া। ঘুরে ঘুরে একেক জায়গায় বসতি করে, চাষবাস করে, আবার অন্য জায়গায় চলে যায়। মেয়েরা খুবই শান্ত  - ওদের দেখে বিশ্বাস করা কঠিন যে ওরা ওদের স্বামীদের ডাকাতি অভিযানের সময় সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়।

    আমাদের সেলের ঠিক উল্টোদিকে একটা কুঁড়ে ছিল, তার ছাঁচের তলায় এক জোড়া পায়রার বাসা - তাদের অতি ঘন ঘন ছানা হয়। দিন দশেক বয়সী এইসব পায়রার ছানা আমাদের মত মাংসলোলুপ কয়েকজনের কাছে অতি উপাদেয় - কিন্তু এদের ওপর প্রথম ও একমাত্র অধিকার মেটিনের। আমরা একেকেদিন অতি সাবধানে মেটিন জানার আগেই পায়রা হাপিস করে দিতাম! তারপর শনিবার রাত করে আমাদের গোপন ভোজের আয়োজন হত। মাটির উনুনটা বেলা থাকতে পায়খানার সিড়ির কাছে এনে লুকনো হত, সন্ধ্যেবেলা তালা লাগানোর ঠিক আগে আর চিফ হেড ওয়ার্ডারের টহলের ঠিক পরে, একজন পাহারায় থাকতো, আর দুজন ধরাধরি করে উনুনটা সেলের ভেতর ঢুকিয়ে নেওয়া হত! পায়রা না পাওয়া গেলে কখনো হয়তো আলুর খিচুড়ি বানাতাম, বা কোন ওয়ার্ডারকে দিয়ে বাজার থেকে মরশুমি সব্জি আনাতাম। 

    এইসবের শেষে রাতে ঘুমনোর জন্য যখন শুয়ে পড়তাম, তখন মনে হত - অমলেন্দু কী করছে? ওর কি কোন সঙ্গী সাথী আছে ওখানে?
    তারপর মনে হত, ও নিজে যে অবস্থাতেই থাকুক, আমি এখানে মানিয়ে গুছিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি জানলে ও খুশি হবে।

    ১৯৭২ সালে বড়দিনের ঠিক আগে আগে, বিহার সরকারের অনেক নন-গেজেটেড কর্মী জেলে এল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানসিক হাসপাতালের কর্মী - বেতন বৃদ্ধি, উন্নততর আবাসন ও চিকিৎসার বিনামূল্যে সরকারী চিৎসার দাবীতে ধর্মঘট করতে গিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার মত চার্জে আটক হয়েছে।

    অনেক সংখ্যক নতুন কয়েদী এলে আমাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হত। নতুন লোকেদের সঙ্গে জীবনে যে বৈচিত্র আসতো তা আমাদের ভালো লাগতো, কিন্তু জল, নর্দমা এসবের দুরবস্থার জন্য খুব অসুবিধেও হত। আশি জন কয়েদী ঐ এক সরু নলের জলের ভরসায়। আমার পাশের এক সেলে চৌত্রিশ জন মেয়ে একসঙ্গে ঘুমোয়। অষ্টপ্রহর ভীড়, গোলমাল, হইচই। আমি পড়াশুনোর চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে নতুন কয়েদীদের সঙ্গে গল্পগাছা করে সময় কাটাই। এরা সব সংগঠনের সদস্য - দলবদ্ধ, রীতিমত জঙ্গী, চিফ হেড ওয়ার্ডারকে দাবি দাওয়া নিয়ে সারাক্ষন ব্যতিব্যস্ত রাখে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে ওদের সাহস ও রোখ দেখে অন্যরাও আস্তে আস্তে সাহস পেতে লাগলো। বিশেষ করে খাবারের মান নিয়ে অন্যরাও গলা তুলতে শুরু করলো। ঐ সময় প্রতিদিন একটা ড্রামের মধ্যে সবার জন্য বেগুন সেদ্ধ করা হতো - সেদ্ধ হতে হতে বেগুন একটা কালো হড়হড়ে মন্ডে পরিনত হতো। মাঝে মাঝেই ঐ বেগুনের মন্ডে পাওয়া যেত মোটা লাল লাল পোকা - অনেকেই ঐ জিনিস খাওয়ার বদলে শুধু ভাত বা চাপাটি খেয়ে থাকতো।

    মানসিক হাসপাতালের নার্স, হাসপাতালের সাফাই কর্মী বা অন্য ছোট খাটো কাজের পেশাগুলিকে প্রায়্শই অপরিষ্কার বা অপবিত্র কাজ বলে মনে করা হতো। এই পেশায় যারা আছে তারা বেশিরভাগ খ্রীস্টান নয়তো হরিজন। এদের মধ্যে একজন ব্যতিক্রম ছিল - হিন্দু, সে নাকি ভক্ত। ওর ওপর নাকি দেবতার ভর হয়। খাওয়ার আগে ও অনেক রকম দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক আচার করতো। ও কোন অহিন্দু বা "নীচু জাতের" রান্না খাবে না, তাই খুব বাছাই দুয়েকজন মেয়ে ওর রান্না করতো। ও যখন কলে জল ভরতে যেত তখন সবাই খুব সাবধানে দূরে দূরে থাকতো - পাছে ওর জল না অপবিত্র হয়ে যায়। একদিন তো ও এক বাল্তি জল উল্টে ফেলে দিল - সোমরি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকি বালতিতে ছোঁয়া লেগেছে। রান্না হওয়ার পর ও খেতে সবার আগে, ওর বাসন পত্রও সাবধানে সবার থেকে আলাদা করে রাখতে হত।

    ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে জাতপাতের গুরুত্ব নিয়ে আমি রোজই বেশি বেশি করে সচেতন হচ্ছিলাম। বইয়ে পড়া চার বর্ণের সাদাসিধে হিসেবটা পড়েই ভাবতাম ভারতের জাতের ব্যাপারটা আমি জানি। আস্তে আস্তে জানলাম এই সব জাত আবার মোটামুটি আড়াই হাজারের মত আলাদা আলাদা সম্প্রদায়, গোষ্ঠী এসবে ভাগ করা - তাদের বিয়ে টিয়ের অতি জটিল এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম কানুন, আচার, সংস্কার আছে। প্রতিটি জাত অন্য জাতের সঙ্গে কীভাবে আর কতদূর সম্পর্ক রাখতে পারবে তার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সোমরি বলেছিল জেলের বাইরে ও ব্রাহ্মণ বা নিজের জাতের বাইরে কারো রান্না করা ভাত খেতে পারে না, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু জাতের তৈরি অন্য কিছু কিছু শুকনো খাবার খেতে পারে।

    একজন ওয়ার্ড্রেস এতদিন জেলের চাকরীর পরেও এইসব নিয়ম কানুন কাজের জায়গাতেও পুরোপুরি মেনে চলতে চাইতো। ও এমন কোন বিছানায় শোবে না যেখানে এমন কেউ শুয়েছে যে আমিষ খায়। আমিষ রান্না হয়েছে এমন উনুনে ওর রান্না চলবে না। আমাদের পায়রা খাওয়ার সময় অতি সাবধানে থাকতে হতো যেন ওর নজরে না পড়ে - আর না হলে অবিরাম গালাগাল হইহল্লা শুরু হয়ে যাবে। ও অন্য কোন কয়েদীর জামা কাপড় ছোঁবে না, নিজের কাঁথা কম্বল এক কোন সাবধানে গুটিয়ে রাখবে যেখানে অন্য কেউ সেসব ছুঁয়ে অশুদ্ধ করে দেবে না। বিছানাপত্র সেলেই রাখতে হত কারন ওয়ার্ড্রেস তো সেলে শোবে আর সন্ধ্যেবেলার চিফ হেড ওয়ার্ডারের টহলের পর সেলে তালা লেগে যাবে।

    নতুন কয়েদী এলেই প্রথম প্রশ্ন - "কোন জাত?" এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা জানা হয়ে গেলেই স্থির হয়ে যাবে সে কোন দলে কোন সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভিড়বে, তার সঙ্গে কে কেমন আচরন করবে। সবারই সব জাত নিয়ে সুচিন্তিত মতামত ও সিদ্ধান্ত আছে। ঠিক যেমন ইংরেজরা মনে করে সব স্কটই বাজে লোক বা সব আইরিশই কিপটে, তেমনি এখানেও জাতের পরিচয়েই মানুষের স্বভাব চরিত্র নিয়ে সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

    আমার সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের ব্যাপারে জাত নিয়ে তেমন কোন অসুবিধে হয়নি। ওদের চোখে আমার আচার আচরন বোধহয় একটু অদ্ভুত আর উল্টোপাল্টা ছিল - মোটের ওপর সেটা সবাই একটা মজার ব্যাপার হিসেবেই দেখতো! তবে দুয়েকজন গোঁড়া হিন্দু জেল কর্মচারীদের কোপে পড়েছি। চিফ হেড ওয়ার্ডার বৃটেন সম্পর্কে যে দুয়েকটা জিনিস জানতো তার মধ্যে ছিল বৃটিশরা গোরু খায়। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে, জিভ দিয়ে চিক চিক শব্দ করে বলতো "খুউব খারাপ জাত"। তাতে করে অবশ্য একটা ভালো জিনিস হয়েছিল, মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে কেউ মিষ্টি টিষ্টি দিলে সেসবে ওর লালায়িত নজর পড়তো না। একবার বৃটিশ হাই কমিশনের সাক্ষাতে ওরা ভাবনা চিন্তা না করেই আমার জন্যে এক টিন কর্নড বিফ আর এক বোতল বিফ পাস্তা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক, যারা কয়েদীদের জিনিস পরীক্ষা করে তারা ওসব ছোঁবে না বলে ওগুলো আর আমাকে দেওয়া যায়নি।

    জাতের দোহাই দিয়ে কী করে এক একদল লোক অন্যদলকে অন্ধকারে নীচে টেনে রাখে তার একটা খুব জলজ্যান্ত গল্প শুনেছিলাম এক ওয়ার্ড্রেসের কাছে। ওদের গ্রামে ব্রাহ্মণরা বিধান দিয়েছে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো যাবে না, কারন স্কুলে যারা পড়ায় তাদের কয়েকজন খ্রীস্টান আর হরিজন আছে। ওদের কাছে পড়লে জাত যাবে।

    আটক চিকিৎসাকর্মীদের জন্য সেই বছরের বড়দিন আমার কাছে আনন্দময় হয়ে ঊঠলো। খ্রীস্টান মেয়েরা সকাল থেকে সন্ধ্যা যতক্ষন না ফাটকে তালা লাগানো হয় ততক্ষন আমার সেলের বাইরে নাচ গান করলো। 

    বড়দিনের ক'দিন পর আমার রেশনের সঙ্গে লুকনো একটা দুমড়ানো কাগজে লেখা চিঠি পেলাম। "আমার প্রিয় বোন" সম্বোধন করে কেউ আমাকে চিঠি লিখেছে - আমার যেকোন প্রয়োজন হলে যেন ওকে জানাই। এই চিঠির থেকে পুরুষ বিভাগের এক অল্পবয়সী কয়েদীর সঙ্গে একটা খুব সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল আমার। বড়দিনের সকালে আমি যে মিষ্টি দিয়েছিলাম তাতেই খুশি হয়ে ও চিঠিটা লিখেছিল। এই চিঠিটা ধরা পড়লে ওর কপালে মার তো ছিলই, ডান্ডাবেড়ি, সলিটারি - এসবও হতো। 
    এরপর বেশ কয়েকমাস আমাদের যোগাযোগ চললো এরকম ভাবে। জেলে থাকাকালীন বাড়িতে ওর শিশুকন্যাটি মারা গেল। ছাড়া পাওয়ার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী জেলার বললো এক মাসের ছুটির জন্য ওকে পঁচিশ টাকা দিতে হবে - দিতে না পারলে আরও এক মাস জেলে থাকতে হবে।  মেয়েটি মারা যাওয়ার পর স্ত্রীর জন্য দুশ্চিন্তায় টাকাটা ওকে দিতেই হলো। যেদিন ও চলে যাচ্ছিল, আমার মনে হলো সত্যিই আমার ভাই চলে যাচ্ছে।

    এই ব্যাপারটার পর আমার আরেকটু সাহল বাড়লো, ভাবলাম নক্শাল বন্দীদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবো। শুনলাম অসীম চ্যাটার্জিও এখানে আছে, ডান্ডাবেড়িতে, কন্ডেমড সলিটারি সেলে। ওর সেলে দুজন ওয়ার্ডার আর একজন হেড ওয়ার্ডারের চব্বিশ ঘন্টার পাহারা। ভারত সরকার পাকিস্তানের জেলে শেখ মুজিবর রহমানকে রেডিও দেওয়া হচ্ছে না বলে খুব নিন্দা করছিল। এদিকে অসীম চ্যাটার্জিকে একটা কাগজ পেন্সিল রাখারও অনুমতি দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক বন্দীদের বিচারের আগে পর্যন্ত এরকমভাবে কন্ডেমড সলিটারি সেলে রাখাটাকে "প্রমানের আগে পর্যন্ত নিরপরাধ" কথাটার প্রতি একটা উৎকট বিদ্রূপ মনে বলে হতো আমার।

    ধীরে ধীরে সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়লো। বেশিরভাগ কাজে ফিরে গেল; অনেকে কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য সরকারে আগের আদেশ অমান্য করার দায়ে চাকরী হারালো। যারা ফিরলো তাদের আন্দোলনের দিনগুলির বেতন কাটা গেল। সত্যি বলতে কী, এত কিছুতে আন্দোলনকারীদের আদৌ কোন লাভ হলো না। কিন্তু ক্রমাগত আন্দোলনের ঢেউয়ে সরকার বিব্রত হয়ে পড়েছিল ঠিকই। 
    মাঝে মাঝেই এক রাতের জন্য বিপুল সংখ্যক বন্দী এসে হাজির হত। আর এদের ওপর জেল কর্তৃপক্ষের অভ্যস্ত জুলুম খাটতো না। এরা সংঘবদ্ধ, আক্রমনাত্মক, নিজেদের অধিকার বোঝে, অধিকার বুঝে নেওয়ার দাবিতে লড়তে ভয় পায় না। এরা কর্তৃপক্ষের জন্য মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ালো, এদিকে সরকারের আদেশ এদের কোন বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। তাতে ফল এই হলো যে এখন কারা বিভাগে অফিসাররা জেল পরিদর্শনে আসা ব্যাপারটাকেই যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • বইপত্তর | ০৭ আগস্ট ২০২৩ | ৬১৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মত | 165.225.8.101 | ০৭ আগস্ট ২০২৩ ০৭:০৫522190
  • রোজ এই লেখাটার জন্যে অপেক্ষা করে থাকি - একটা লেখা যাতে কোন ক্লিফহ্যাঙ্গার নেই, তবুও।  
  • Aranya | 2601:84:4600:5410:11f9:89e2:3f59:b096 | ০৭ আগস্ট ২০২৩ ১০:১০522200
  • দারুণ 
  • Kuntala | ০৭ আগস্ট ২০২৩ ১৮:২২522212
  • খুব ভাল লাগছে। অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করেনা। আরও তাড়াতাড়ি কিস্তিগুলো দিন!  
  • আশীষ নন্দী | 103.133.203.230 | ০৭ আগস্ট ২০২৩ ২৩:৪৫522241
  • মহান ভারতের জেল ব্যবস্থা। বিদেশিনীর লেখায় জানা গেলো ইতিহাসের অজানা তথ্য। অসংখ্য ধন্যবাদ গুরু। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন