এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শৈশবের স্মৃতিমালা এবং তাহাদের কথা - পর্ব ৬

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ | ৮৯ বার পঠিত
  • যদিও দাদাভাই বড় আমার থেকে সাত-আট বছরের, কিন্তু ছিল একটা আলাদা টান দাদা এবং ভাইয়ের  দুজনের মধ্যে। দশমীর সকালে দুর্গামায়ের বিসর্জন অনুষ্ঠানের পর, দই-চিড়ে মাখা খেতে খেতে  অপেক্ষা করতাম ওই মুহূর্তের জন্য, যখন দেবে দাদাভাই ইশারা আর আমি তুলে আনবো নারকেল-ডাব ঘট থেকে পূজারীর অনুপস্থিতিতে। বকাও খেতাম মা-পিসিদের থেকে। দাদাভাইকেও বকতেন পিসিমণি - আমাকে এই দুষ্টু-বুদ্ধি দেওয়াতে। কিন্তু এইগুলো ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে আনন্দ-ঘন মুহূর্ত।
    আমাদের বাড়ির দুর্গাপুজো হয় বৈষ্ণব মতে। দশমীর দিন হয় নিরামিষ ভঙ্গ পুকুরের মাছ দিয়ে। সকাল থেকেই জেলেরা ধরতো মাছ জাল ফেলে, আর আমরা সব পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম জেলেদের মাছধরা উৎসব।
    দশমীতে মায়ের বিদায় দুঃখ মনে, সাথে মায়ের বরণ আর সিঁদুর খেলা।
    দশমীর সন্ধ্যায়, কাকারা ভাঙ্গ তৈরি করতেন। আমিও সেই বয়সে খেয়েছি কয়েক চুমুক।
    ছোটোকাকুর ডান হাতে কেরোসিনের বোতল, বাঁ হাতে কাঠের ডান্ডার উপর কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে মশাল - মুখ থেকে কেরোসিন ছুড়ে জ্বালাতেন মশাল, তার সাথে  ধুনুচি নাচ, ঢাকের বাদ্দি কাঁসর ঘন্টা   - সঙ্গে সমবেত চিৎকার 'আসছে বছর আবার হবে'; সে সময় আমাদের বয়সে দেখার মতো ছিল এই দৃশ্য। এরপর শান্তির জল, গুরুজনদের প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ।
    একাদশীর সন্ধ্যেবেলায় মা-বাবা, বড়পিসো-পিসিমণি, মেজোপিসো-মেজপিসি, রাঙাপিসো-রাঙাপিসি এবং আরও অনেকে মিলে করতো পিকনিক। আমাদের বাড়ির পিছনে পুকুরের ধারের আমবাগানে অথবা পুজোমণ্ডপের পিছনের মাঠটিতে। আমাদের যদিও অনুমতি ছিল না ঐ পিকনিকে যোগদান করার, কিন্তু আমাদের আটকাবে কে ? শুরু থেকেই আমরা সব ভাই-বোনেরা ভিড় লাগিয়ে দিতাম, উৎসাহ দেখাতাম ফাই-ফরমাশ খাটার। শেষে বাধ্য হয়ে মেজোপিসো রাজি হয়ে যেতেন। বাগানের মধ্যিখানে মাটির উনুন তৈরী করা, যার উপর হবে রান্না বড় বড় কড়াই-গামলা চাপিয়ে। বাড়িতে ঘুটে-কয়লা থাকলেও, বাগানের গাছের ডাল-পাতা দিয়ে উনুন জ্বালানো হতো। জ্বালানো হতো হ্যাজাক, আলোর জন্য। ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে মাটির উপর শতরঞ্চি পেতে আমরা সবাই বসে পড়তাম খেতে। সামনে কলাপাতা, তার উপর গরম গরম ভাত, মুগের ডাল মাছের মাথা দিয়ে, সাথে লম্বা লম্বা বেগুন ভাজা। তারপর পাতলা মাংসের ঝোল। ঝোল গড়িয়ে যে চলে যায় মাটিতে। অপেক্ষা করার সময় নেই, হাপুস-হুপুস করে চোখের জল বাম হাতে মুছতে মুছতে ডান হাতের সদ্ব্যবহার। শেষপাতে রসগোল্লা, দই। আর কী ফিরে পাবো ঐ দিনগুলিকে !      
    এই ভাবেই শেষ হতো আমাদের বাড়ির দুর্গাপুজো। এখনও চলেছে সেই রীতি। দশমীর দিন দুই রকমের মাছ। আর একাদশীতে পাঠার মাংসের ঝোল। বাগানে পিকনিক করে নয়, চেয়ার টেবিলে বসে। তবে একসাথে সব আত্মীয়-স্বজন মিলে গল্প-গুজব করে খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ, সেটা অব্যাহত। আর নেই আমাদের দাদুভাই, ঠাম্মা, বাবা, মা, কাকুমণি এবং আরও অনেকে। কিন্তু আছে ওনাদের প্রাণভরা ভালোবাসা আর আশীর্বাদ আমাদের সকলের মাথার উপর।
    ****
    যখন আনুমানিক সাড়ে-চার বৎসর বয়স আমার, আমার বাবার  কিছুদিনের জন্য বদলি হয় গেদেতে । গেদে ভারত-পূর্ব পাকিস্তানের (এখন বাংলাদেশ) শেষ বর্ডার স্টেশন। ঐসময় আমি কয়েক মাসের জন্য গেদেতে গিয়ে থাকি। আমার যতদূর মনে পড়ে – মা-বাবা-দিদি এবং ছোটভাই এর সাথে আমার জীবনের প্রথম সুদীর্ঘ জীবনযাপন গেদেতে একসঙ্গে, আমার জন্মের পর।
    গেদে একটা ছোট্ট গ্রামঘেঁষা মফস্বল টাউন। খুব অল্প লোকের বাস। আমরা রেল কোয়ার্টারে থাকতাম, স্টেশন থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্ত্বে। আমার খুব পছন্দ ছিল এই রেল কলোনিটা - শান্ত, নিরিবিলি। ভারী গ্রাম্য ভারী আপন একটা ভাব ছিল। বেশ একখানা সবুজ মাঠ পিছন দিকে, তার চারধারে মেলা গাছগাছালি। ভারী ঠান্ডা আর গভীর একটা মমতায় মাখানো যেন। বাজারের পাশে একটা কালীবাড়ি আর মনসাবাড়ি, সাথে একটা বড় বটগাছ, তার নিচে একটা বাঁধানো গোল বসার জায়গা।
    আমি যদিও খুব ছোট ছিলাম তখন, কিন্তু আমার স্মৃতিতে ছোট ছোট টুকরো অনেক ঘটনা গেঁথে আছে। মায়ের পাশে শুয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া, রোববারে বাবার সাথে গিয়ে মাংস কেনা, দিদির সাথে গেদের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো (যেমন পথের পাঁচালীতে দুর্গা আর অপু নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের অজানা অদেখা জায়গাগুলোতে চষে বেড়াতো), আরোও কত টুকরো টুকরো স্মৃতি।
    ছয় সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ এর প্রাক্কালে, তখন দুটো ট্রেন শিয়ালদহ থেকে গেদের উপর দিয়ে ইস্ট পাকিস্তান যেত। ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস যেত গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত, আর ইস্ট বেঙ্গল মেইল পার্বতীপুর পর্যন্ত। গোয়ালন্দ ঘাট থেকে স্টিমারে করে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে ঢাকা যাওয়া যেত, আর পার্বতীপুর থেকে ট্রেন পাওয়া যেত ঢাকা যাওয়ার জন্য। তখন গেদে স্টেশনে কাস্টম কাগজপত্তর চেক হতো, আর ইস্ট পাকিস্তানের তরফে দর্শনা স্টেশনে। আর একটি ট্রেন বরিশাল এক্সপ্রেস চলতো তখন শিয়ালদহ থেকে খুলনা পর্যন্ত। এরপর এই ট্রেন গুলি বন্ধ হয়ে যায়, যখন 'বাংলাদেশ' আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দাবির জন্য আন্দোলন শুরু হয়।
    চৌদ্দ এপ্রিল (বাংলা নববর্ষর দিন) ২০০৮ সালে প্রায় ৪৪ বছর পরে আবার মাইত্রী (ফ্রেন্ডশিপ) এক্সপ্রেস চালু হয় কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত গেদের উপর দিয়ে।
    ঐসময় রোজ বিকেলে একটা ট্রেন শিয়ালদহ থেকে গেদেতে আসত, আর কয়েক ঘন্টা পর আবার শিয়ালদহ অভিমুখে যাত্রা করত এবং তারজন্য ইঞ্জিনটা ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে আবার উল্টোদিকে লাগানো হতো। প্রত্যেকদিন বিকালে দিদি, আমি এবং পাড়ার আরো অনেকে মিলে একসঙ্গে ঐসময় স্টেশনে যেতাম এবং যখন ইঞ্জিনটা ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতো - আমরা লাস্ট কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়তাম। যখন ইঞ্জিনটা উল্টো দিকে লাগানো হতো ট্রেনের সাথে, একটা-দুটো-তিনটে ধাক্কা দিয়ে - আমাদের যে কি আনন্দ হতো, মুখগুলো সব আমাদের ঝলমল করে উঠতো। ছোটবেলার এই অনাবিল আনন্দ ট্রেনে চড়ার, লিখে বোঝাতে পারব না। মাঝে মাঝে আমরা ধরা পড়ে যেতাম স্টেশন মাস্টারের কাছে এবং ভয় দেখাতেন বাবাকে বলে দেবেন বলে। আমরা কি আর ওনার কথা শুনতাম, দু-তিন দিন পর আবার আমরা লুকিয়ে ট্রেনে চড়তাম। কী করে আমরা আমাদের এই আনন্দ বিসর্জন দেবো !       ( ক্রমশ )
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন