এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শৈশবের স্মৃতিমালা এবং তাহাদের কথা - পর্ব ৫

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ | ৭২ বার পঠিত
  • ঐ সময়ে জীবনে বেশি আড়ম্বর ছিল না, অহেতুক বাড়াবাড়িও ছিল না। ছিল সোজাসাপটা স্নেহ-ভালোবাসা-মঙ্গলকামনা, আর এমন একটা পরিবেশে কেটেছে আমার শৈশবকাল আমার দাদুভাইয়ের সাহচর্যে। তাঁর কাছে গেলে মনে হত, একটা শান্ত উন্নত পরিমণ্ডলে যেন প্রবেশ হলো। দাদুভাইকে আমি একটা আশ্রয়ের জায়গা, নির্ভরশীলতার জায়গা হিসেবে অনুভব করতাম । 
     
        ****
    আমাদের বাড়িতে দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতী পুজো ছাড়াও - প্রত্যেক শনিবার দাদুভাই করতেন শনিঠাকুরের পুজো। প্রত্যেক শনিবার আমার কাছে ছিল একটা উৎসবের মতো। আর মাঝে মাঝে করা হতো শনি-সত্যনারায়ণ পুজো। সেদিন দ্বিগুণ মজা, কারণ হবে দুটো সিন্নি। এছাড়াও মাঝ মাঝেই দাদুভাই দিতেন সন্ধ্যেবেলায় বাতাসার হরির লুট। সেদিন খোল-করতাল বাজিয়ে হতো হরির কীর্তন। আসত দাদুভাইয়ের চেনা-শুনা কীর্তনের দল।
    ১৯৫৪ সালে দাদুভাই প্রথম দুর্গাপুজো শুরু করেন, আমার জন্মের অনেক অনেক আগে। ভোরবেলায় দুর্গামায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে। আজও পালিত হয় এই দুর্গাপুজো আমাদের বসতবাড়িতে। আমার মা'ও প্রবেশ করেন আমাদের বসতবাড়িতে ১৯৫৪ সালে, দাদুভাইয়ের বড় পুত্রবধূ হয়ে।
    ২০১৭ সালে আমি এবং আমার স্ত্রী রুপালি, দুর্গাপুজার অষ্টমীতে আমাদের পুত্রবধূ নেহা এবং পুত্রকে নিয়ে আমাদের বারাসাতের বসতবাড়িতে গিয়েছিলাম। বসেছিলাম আমরা সবাই আমাদের পুজোমণ্ডপের বাইরে। ভিতরে চলছে দুর্গামায়ের আরতি - সাথে ঢাকের বাদ্দি, কাঁসরঘন্টা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ধুপ-ধুনোর সুগন্ধে এক পবিত্র বাতাবরণ। অষ্টমী পুজো ও অঞ্জলির সমাপ্তিতে কাকুমণি জানালেন, এক মায়ের পুজো শেষ হলো - এবার আমরা আরেক মায়ের বরণ করব। বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে, আমাদের বাকি পুরো পরিবার (কাকুমণি, কাকিমণি, ছোটকাকি, ফুলপিসি, কুট্টিপিসি) জাঁকজমক সহকারে করলেন প্রথম নাত-বউয়ের বরণ আমাদের বারাসাতের বসতবাড়িতে প্রবেশের সময়। দিদি এবং ভাই-বউও ছিল সেই অনুষ্টানে।
    শৈশব থেকেই সবার মুখে শুনে এসেছি, বারাসাতে আমাদের বাড়ির পুজো 'দারোগাবাড়ি'-র দুর্গাপুজো  নামেই পরিচিত। আমাদের ন'পাড়ায় আরো চারটে দুর্গাপুজো হত তখন - 'চন্ডী বাড়ি', 'কবিরাজ বাড়ি', 'কিরীটি বাড়ি' আর 'সারদা বাড়ি'। এরমধ্যে 'চন্ডি বাড়ি'-র পুজো সবচেয়ে পুরানো, যতদূর মনে আছে ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল। এখন  'সারদা বাড়ি'-র পুজো আর হয় না।
    শৈশবে দেখতাম সাধারণত দুর্গাপুজো শুরুর বেশ কয়েকদিন আগে থেকে,  ঠাম্মার সাথে মা-কাকিমা আর পিসিরা মিলে নারকেল নাড়ু, সন্দেশ, মোদক, তিলের নাড়ু, চিড়ের এবং মুড়ির মোয়া তৈরি করতেন। সকালে  প্রথমে স্নান করে, একটি নতুন শাড়ি পরে তাঁরা  দুর্গাপুজোর জন্য নির্দিষ্ট উনুনে এবং বাসনগুলিতে এই জিনিসগুলি প্রস্তুত করতেন।
    সে সময় আমাদের বাসায় বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের সব আত্মীয় -স্বজনরা আসতেন। একটা মহামিলন নিজেদের মধ্যে, যেটা আজও বজায় আছে।
    ষষ্ঠীতে নবপত্রিকা প্রতিস্থাপন করে সূচনা করা হতো দুর্গাপুজোর। ষষ্ঠীর দিনে, কল্পারম্ভের অনুষ্ঠানটি ভোরবেলা করা হয়। দুর্গা মণ্ডপের এক কোণে ঘট অর্থাৎ একটি জল ভরা তামার পাত্র স্থাপন করে সমস্ত আচার -অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি মেনে সঠিকভাবে পুজো করার জন্য সংকল্প নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় পালন করা হয় আমাদের বাড়ির প্রবেশদ্বারের কাছে বেল গাছের নীচে বোধন, এরপর অধিবাস এবং আমন্ত্রণ। পান, দূর্বা, সিন্দুর, আলতা, শিলা, ধান, কলার ছড়া, ইত্যাদির সহিত সজ্জিত কুলো দিয়ে স্বাগত জানানো হয় দুর্গা মাকে -  ঢাকের বাদ্দি সঙ্গে শঙ্খধ্বনি উলুধ্বনি কাঁসর ঘন্টার মধ্যে। শৈশবে দেখতাম আমার ঠাম্মা মাথায় কুলো নিয়ে পুজো মণ্ডপে যেতেন দুর্গামায়ের অধিবাস এবং আমন্ত্রণ সম্পূর্ণ করার জন্য আমাদের পারিবারিক পূজারীর দ্বারা। এই ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকারটি ঠাম্মার থেকে আমার মায়ের কাছে আসে, তারপর কাকিমারা এবং এখন  আমাদের প্রজন্মের স্ত্রীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
    ২০২১ সালে আমাদের পুত্রবধূ নেহা-কে দেওয়া হয় এই দায়িত্ব এবং সম্মান। আমার চোখে দেখা চারপুরুষের ঐতিহ্যবাহী হস্তান্তর অফ লিগাসি। অধিবাসের কুলো মাথায় আমাদের পুত্রবধূ নেহা-র  প্রবেশ যখন মন্দিরে দেবীর আমন্ত্রণের জন্য, উপলব্ধি করতে পারছিলাম - আমার দাদুভাই, ঠাম্মা, বাবা, মা, কাকুমণির আশীর্বাদ ঝরে পড়ছে ওনাদের বংশের প্রথম নাতবউয়ের উপর অকাতরে।
    আমাদের বাড়ির দুর্গামায়ের বামদিকে থাকেন গণেশ ঠাকুর। ছোটবেলার প্রচন্ড কৌতূহল, গণেশ ঠাকুর আর সবার বাড়িতে দুর্গামায়ের ডানদিকে। তাহলে আমাদের বাড়িতে কেন দুর্গামায়ের বামদিকে গণেশ ঠাকুর ? কৌতূহলের নিরসণ করেন দাদুভাই। আমাদের বংশের পুরোহিত হারাধন ঠাকুরমশাইয়ের উপদেশে এটা পালন করা হয়েছে। ওনার মতে পুজো শুরু করা হয় গণেশ ঠাকুরকে দিয়ে, এবং পুজো শুরু করা উচিৎ পূজারীর ডানদিক থেকে। পরে আমার কুট্টিপিসি জানান আর একটি কারণ, গণেশঠাকুর হচ্ছেন দুর্গামায়ের সবচেয়ে লাডলা - আর সাধারণত মায়েরা তাঁদের সন্তানদের বাম কাঁখে নেন। 
    আরও  একটি প্রশ্ন থাকতো মনে, গণেশ ঠাকুরের কলাবউকে কেন রাখা হয় কার্তিক ঠাকুরের ডানপাশে। অন্য সব জায়গায় দেখতে পাই কলাবউ আছেন গণেশঠাকুরের পাশে, কারণ গণেশ ঠাকুর আছেন দুর্গামায়ের ডানপাশে। কিন্তু আমাদের গণেশ ঠাকুর তো দুর্গামায়ের বামপাশে। তাহলে কলাবউ কেন নেই গণেশ ঠাকুরের পাশে ? দাদুভাইয়ের উত্তর, বউ সবসময় পুরুষের ডানপাশে থাকেন। পরে বড় হয়ে বুঝতে পারি, যে কোনো শুভ কাজে - নববধূর আগমন অথবা গৃহপ্রবেশ - যে কোনো অনুষ্ঠানে সবসময় পুরুষের ডান পাশে থাকেন বধূ, আর যে কোনো শুভ কাজ শুরু হয় বধূর ডান পাঁ দিয়ে - সেটা গৃহপ্রবেশ হোক অথবা নববধূর প্রথম পদার্পণ হোক শ্বশুরবাড়িতে।
    মনে আছে রোজ দুপুরে অনিল ঠাকুরের রান্না করা খিঁচুড়ি খাওয়া বেগুনভাজা পাঁচমিশালি তরকারি অথবা লাবড়ার সাথে পায়েস সহযোগে, পিছনের বারান্দায় ঢালাও আসন পেতে। পাত পড়তো প্রায় দেড়শোজনের, দু-বেলা। আমার বাবা ছিলেন 'বাজার সরকার', রান্নার তত্ত্বাবধানে। তারপর আমাদের লুকোচুরি খেলা পিছনের ধানক্ষেতে। দাদাভাই, দিদিভাই, দিদি, রত্না-দি, বুলু-দি, দুলু, ঝুমঝুম, পল্লব, ভজু এবং আরো অনেকে মিলে। 
    ঘুম-না হওয়া চোখে রোজ কাক-ভোরে যেতাম ফুল তুলতে দিদি, রত্না-দির সাথে। ঘুম তখন আমাদের চোখ থেকে যেত উবে, চাইতাম না এই-কটাদিনের আনন্দ-মুহূর্ত এক চিমটে হারাতে। যদিও পুজোর প্রয়োজন মেটাতে আমাদের বাড়িতে পর্যাপ্ত ফুল ছিল, কিন্তু অন্যের বাগান থেকে ফুল চুরি করা আমাদের জন্য তখন একটি উত্তেজনা ছিল।      ( ক্রমশ )
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন