এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • গরবিনী - পর্ব ১১

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ নভেম্বর ২০২২ | ১১৮ বার পঠিত
  • রতন বোধহয় ভেবেছিলেন, ওনার বয়স হয়ে যাচ্ছে - কতদিন আর বাঁচবেন কোনো ঠিক নেই। মানিক'দার দেশের জন্য বলিদান হয়তো চিরকালের জন্য চাপা পড়ে থাকবে, উনি না বললে। রতন জানতেন, কুসুম এ ঘটনা কোনোদিন বকুলকে বলবে না। এবং কুসুম মানিক'দার অনেক কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে লিখে রাখলেও - ঐ দিনের ঘটনা কোথাও লিখে রাখতে পারবে না। লিখতে গেলে কুসুমের চোখ ফেটে এতদিনের জমানো জল যে ফল্গুধারার মতো বেরিয়ে আসবে। রতন তো নিজে জানে এবং দেখেছে, বোন কুসুম ৩০ শে জুলাই থেকে একদিনের জন্যও চোখের জল ফেলেনি। মানিক'দার অনুপস্থিতিতে ওর ধ্যান-জ্ঞান শুধু ছিল বকুলের প্রতি।  
    রতন মামা পরের দিন অনেক ভোরে বকুলকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যান সামনের মাঠে। মাঠের ধারে যে অজস্র গাছগুলি দাঁড়িয়ে আছে, তারই একটির তলায় বসেন বকুলকে নিয়ে।
    'বকুল তুই তো জানিস মানিক'দা মানে তোর বাবা বরিশালে বানারীপাড়া অঞ্চলে একটা গেরিলা অপারেশনে লেফটেন্যান্ট আব্বাস এবং তার সঙ্গীদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করেন।'
    'হ্যাঁ জানি রতন মামা। মায়ের নিজের স্মৃতির এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকগুলি লেখার কাগজ আমি পেয়েছিলাম কিছু পুরোনো ট্রাঙ্কে, কিছু বইয়ের পাতার মধ্যে, কিছু আলমারিতে - তার মধ্যে থেকে জানতে পেরেছিলাম।'
    'এরপর মানিক'দাকে নির্দেশ দেওয়া হয় বরিশাল ছেড়ে আগরতলাতে চলে আসার জন্য ওনার সঙ্গীদের নিয়ে। কারণ খবর ছিল লেফটেন্যান্ট আব্বাসের হত্যার পর, ঐ পাকিস্তানী ক্যাম্পের কর্নেল হন্যে হয়ে লোক লাগিয়ে দিয়েছিলো মানিক'দাকে খুঁজে বের করার জন্য। কারণ তোর বাবার দ্বারা সংঘটিত গেরিলা অপেরেশনের পর, বরিশাল জিলার পেয়ারাবাগান বানারীপাড়া অঞ্চলের স্থানীয় লোকেদের মধ্যে বিশাল মনোবল সঞ্চারিত হয়। ঐ সময় কুসুম এবং তোকে, তোর বাবা লোক পাঠিয়ে আগরতলা নিয়ে আসেন। এবং তোর জন্মের দেড় মাস পর প্রথম তোর মুখ দেখেন। তুই যখন ছোট ছিলি তখনিই কুসুম ন্যাপ ত্রাণ শিবিরে নিজেকে নিয়োগ করেন শরণার্থীদের চিকিৎসক হিসেবে। তাছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে যেতেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশুনা করার জন্য। জুলাই মাসের প্রথমদিকে মানিক'দার উপর নির্দেশ আসে, আশুগঞ্জ-কসবা অঞ্চলে গিয়ে লেফটেন্যান্ট ফারুকের অধীনে মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য।'
    রতন মামা সঙ্গে আনা জলের বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেয়ে একটু যেন দম নেন। বোধহয় ভাবছিলেন কতটা বকুলকে বলবেন।
    'আমিও তখন ঐ অঞ্চলে ছিলাম। একবার আমি, মানিক'দা কয়েকজন সঙ্গীর সাথে নাটাই অঞ্চলের বটতলী বাজার সংলগ্ন একটি গ্রামে একজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তখনও পুরোপুরি ভোরের আলো ফোটেনি, মানিক'দা কাউকে কিছু না বলে বটতলী বাজারে একা চলে আসেন। কেউ জানে না কেন আসেন। হয়তো কোনো খোঁজখবর করতে বেরিয়েছিলেন। একটি চায়ের দোকান সবে মাত্র ঝাঁপ খুলেছে। ভাবেন চা খেয়ে ফিরে যাবেন। অন্ধকার ফুঁড়ে হঠাৎ কয়েকজন পাকসেনা ঘিরে ফেলে মানিক'দাকে। ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির সময় খুব সম্ভব একজন পাকসেনা তার রাইফেলের বেয়োনেট দিয়ে মানিক'দার একটি চোখে আঘাত করে। এবং তার ফলে চোখ বেরিয়ে আসে। মারাত্মকভাবে আহত মানিক'দাকে জিপের পেছনের হুকের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায়। রাস্তার সঙ্গে ঘর্ষণ খেতে খেতে মানিক'দার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। রাস্তার পাথর ইটের আঘাতে একসময় মাথার ঘিলু

    বেরিয়ে আসে। ৫ কিলোমিটার দূরে এক কর্দমাক্ত ডোবায় মানিক'দার দেহ ফেলে রেখে চলে যায়। যাওয়ার আগে বেয়োনেট দিয়ে অন্য চোখটিও উপড়ে দেয় এবং প্রাণহীন শরীরের উপর খুঁচিয়ে রক্তাত্ব করে ফেলে। আমরা প্রায় দু'ঘন্টা খোঁজাখুঁজির পর যখন ওনার মরদেহ পাই, বকুল আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি, মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার চোখে আজও মানিক'দার সেই বীভৎস মুখ, ক্ষতবিক্ষত মাথা শরীর ভেসে ওঠে।‘
    রতন মামা কথা বলছিলেন সামনের দিকে তাকিয়ে, আস্তে আস্তে, কষ্ট করে নিজের অতীত স্বরণ করে। একদমই খেয়াল ছিল না, পাশে শ্রোতা বকুল বসে। হঠাৎ জলের ঝাপটার আওয়াজে বকুলের দিকে তাকিয়ে দেখেন,  বোতল খুলে ও চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। মুখটা একদম সাদা কাগজের মতন হয়ে গেছে। মামার দিকে তাকিয়ে বকুল বলে, 'আমি ঠিক আছি মামা, তুমি বলতে থাকো।'
    বকুল একটু স্বাভাবিক হলে কল্পনায় ভাবতে থাকে বাবার রক্তস্নাত ক্ষতবিক্ষত মুখটি। কী সুন্দর দেখতে ছিলেন তার বাবা। যেন একজন দেবত্ব পুরুষ। একমাত্র হিংস্র হায়েনার দলই পারে এরকম একটি শিশুর মতো মুখকে করতে রক্তাত্ব, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। মা ভাগ্যিস বিয়ের অ্যালবাম'টা কেরানীগঞ্জের বাড়িতে রেখেছিলেন। যদি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে রাখা হতো, তাহলে তো সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে যেত ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ সালের রাতেই।
    একটু সময় নেন রতন মামা। উনি জানেন, বকুল মানসিকভাবে বেশ শক্তিশালী। মায়ের গুণটি পেয়েছে।   ( ক্রমশ )
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন