এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • দত্ত জুয়েলার্স - ৩ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ২০৭ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  •      
    দুপুর প্রায় আড়াইটে বাজে । কলতান বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল । বৌবাজারের মোড়ে এসে বাঁ দিকে ঘুরল । ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার মোড়ে এসে থামল । যাবার রাস্তায় দেখল দত্ত জুয়েলার্সে শাটার নামানো , তালা মারা । কলতান লক্ষ্য করল দত্ত জুয়েলার্স আর তার পাশের  দোকানের মাঝখান দিয়ে একটা সরু গলি গেছে ছানাপট্টির দিকে । দীনবন্ধুবাবুরা   নিশ্চয়ই বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছে এতক্ষণে ।  
    হ্যা ... ওরা ঠিকই বলেছে । মোড়ের মাথায় ওদিকের ফুটপাথে একটা পান সিগারেটের গল্লা আছে । ওপরে ছোট একটা টিনের সাইনবোর্ড । তাতে লাল রঙে লেখা আছে -- কস্তুরী । একজন নীল রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি পরা ফর্সা মতো মাঝবয়েসী লোক একমনে পান সেজে চলেছে । তার পাশেও একজন  কাছাকাছি বয়সের লোক বসে আছে ধুতি পাঞ্জাবী পরে । সে একজন ক্রেতাকে এক প্যাকেট সিগারেট দিল । আরও দুজন দাঁড়িয়ে আছে কিছু কিনবে বলে ।
    কলতান দোকানের সামনে রাস্তার ধারে বাইক রেখে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দোকানের ধুতি পাঞ্জাবী পরা লোকটা বলল ,
    ----- ' বলুন স্যার ..... '
    ----- ' জর্দা পান কত করে পিস ..... লালবাবা বা গোপাল ? '
    ----- ' আমাদের জর্দা স্যার লকনো থেকে আসে..... লালবাবা, গোপালের থেকে অনেক হাই এসট্যানডাড ..... একটা পান খেলেই বুঝতে পারবেন ..... '
    ----- ' তাই ? '
    ----- ' হ্যা .... বাবু .. '
    ----- ' পঞ্চাশটার মতো নিলে কিরকম পড়বে ? '
    ----- ' এমনি তো বারো টাকা পিস ..... পঞ্চাশ পিস নিলে পানশো টাকা পড়বে ..... কবে লাগবে ? '
    ----- ' কাল দুপুরে লাগবে ..... আমিই আসব .. '
    ----- ' ঠিক আছে ... অসুবিধে হবে না .... যদি পারেন একশোটা টাকা অ্যডভান্স করে দিয়ে যান ..... '
    ------ ' না না .... আমি পুরো টাকাটাই দিয়ে যাচ্ছি ..... বাকি রেখে লাভ কি ..... '
    বলে কলতান পার্স থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে দোকানদারের হাতে দিল । 
    ----- ' আচ্ছা .... ঠিক আছে ..... কোন অসুবিধে হবে না ..... বারোটা লাগাদ চলে আসবেন .... মাল রেডি থাকবে .... আচ্ছা দাঁড়ান ..... ' বলে দোকানদার একটুকরো কাগজে হিজিবিজি করে  'পেড 500 ' লিখে কলতানকে দিল । স্যান্ডো গেঞ্জি একমনে পান সেজে যেতে লাগল । বোধহয় কোন বড় অর্ডার আছে ।
    চিরকুটটা হাতে নিয়ে কলতান বলল,  ' এর কোন দরকার ছিল না ..... ওই  দত্ত জুয়েলার্সের সতীনাথ দত্ত .... ও আমার খুব বন্ধু । ও.. ই আমাকে তোমাদের দোকানে পাঠাল .... বলল এরকম জর্দা পান সারা কলকাতায় পাওয়া যাবে না ..... '
    শুনে উচ্ছ্বসিত হল কস্তুরী-র দোকানদার ......
    ----- ' ও আচ্ছা .... তাই নাকি ..... দত্ত জুয়েলার্সের ছোটবাবু আপনার বন্ধু ..... বলবেন তো .... উনি আমাদের দোকানে ডেলি আসেন জর্দা পান খেতে । ওনাকে জিজ্ঞেস করলেই ..... '
    ------ ' হ্যা .... ও..ই তো আমাকে বলল আপনাদের দোকানের কথা । ও এখানে রোজ পান খেতে আসে ? '
    এবার নীল রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি পরা লোকটি পান থেকে মুখ তুলে বলল , ' একদম ..... রোজ । আমাদের পান না খেয়ে উনি থাকতেই পারবেন না ..... '
    ----- ' ও কি রবিবারেও আসে ? ' 
    ----- ' না রবিবারে আসে না ..... রবিবারে তো দোকান বন্ধ ..... তবে হ্যা .... কাল তো রবিবার ছিল না ? ..... কাল কিন্তু  এসেছিল দত্তবাবু .....তাই না মুকুন্দদা ? '
    মুকুন্দ মানে ধুতি পাঞ্জাবী বলল, ' হ হ ..... কালও এসেছিল পান খেতে .... পরিষ্কার মনে আছে ..... '
    ----- ' ওরে বাবা ..... পান খাওয়ার কি নেশা ..... এদিকে কোন কাজ ছিল নিশ্চয়ই ..... তা কখন এসেছিল ..... দুপুরেই ? ' কলতান প্রশ্ন বাড়িয়ে ধরে । 
    মুকুন্দ ভেবেচিন্তে বলল, ' না ..... দুপুরে না .... কাল রাত্রে এসেছিল .... এ..ই ধরেন রাত আঠটা লাগাদ হবে .... তাই না সতীশ ? '
    সতীশ সে কথায় সায় দিয়ে বলল, ' হ্যা ... ওইরকমই হবে ..... '
    কলতান বলল, ' ও ....তা হবে .... এদিকে কোন দরকারি কাজ ছিল নিশ্চয়ই ..... আচ্ছা আমি এখন আসি ..... '
    ----- ' হ্যা ..... স্যার ..... '

         কলতান, দত্ত জুয়েলার্স থেকে বেশ খানিকটা দূরে বাইকটা রাখল । প্রায় চল্লিশ মিটার হেঁটে  গিয়ে  দোকানের কাছে পৌঁছল । দত্ত জুয়েলার্স আর তার পাশের দোকানের মধ্যে একটা ফাঁক আছে। খুব সরু একটা মাটির গলি মতো । ঠিক তার পাশেই গাড়িবারান্দার নীচে একজন ফলওয়ালা বসেছে পেয়ারা বিক্রি করতে । কলতান পেয়ারাওয়ালার পাশে গিয়ে মুখে  কাতর ভাব ফুটিয়ে ডান হাতের কণিষ্ঠাঙ্গুলি তুলে সন্তর্পণে জিজ্ঞাসা করল , ' ইঁহা কই জাগা হ্যায় কেয়া ? ' 
    পেয়ারাওয়ালা প্রশ্নকর্তার বিপন্ন অবস্থা উপলব্ধি করে তাকে দ্রুত দিক নির্দেশ করে সরু গলিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,  ' অন্দর যাইয়ে ...... '
    কলতান বেগ নিয়ন্ত্রণ করার ভঙ্গীতে আড়ষ্ট পদক্ষেপে গলির ভিতর সেঁধিয়ে গেল । 
    গলির মাঝামাঝি এসে দেখল বাঁ দিকে একটা শাখা গেছে । কলতানের মনে হল এটা ধরে একটু এগোলে মনে হয় দত্ত জুয়েলার্সের পিছনের ইমার্জেন্সি দরজাটা পাওয়া যাবে । এখানটায় আলো ঢোকে না বললেই হয় । লোকজনও এই মুহূর্তে কেউ নেই । একটুখানি যেতেই বাঁ দিকে নীচু লোহার দরজাটা পেয়ে গেল । বেশ খাটো প্রবেশ ( বা প্রস্থান ) পথ। গেটে জম্পেশ দুটো তালা মারা । কলতান মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে উন্মুখ চিত্তে মহামূল্যবান এক রক্তরাঙা তাম্বুলরসচিহ্ন খুঁজতে লাগল । যা রাস্তাঘাটে যত্র তত্র ছড়িয়ে আছে দগদগে ঘায়ের মতো  সেটা এখন কলতানের কাছে এক মূল্যবান দিকচিহ্ন ।
    এই তো .....।  কলতানের  মন উল্লাসে নেচে উঠল .....
    মোবাইলের টর্চে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চড়াৎ করে ফেলা এক ছড়া প্রায় টাটকা রক্তরাঙা পানের পিক রাঙিয়ে রেখেছে কুটুরি গেটের একপাশ । কলতান নীচু গেট সমেত এমন অপরূপ একটা চিত্রকর্মের একটা ফটো না নিয়ে পারল না তার মোবাইলে । 
    বেরিয়ে এসে পেয়ারাওয়ালাকে বলল, ' বহুৎ বহুৎ সুক্রিয়া ..... ইয়ে লো ..... ' বলে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে ধরল পেয়ারাওয়ালার দিকে । বেচারি ফলওয়ালা রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল । সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ' ইয়ে .... কিউ !  কিস লিয়ে ....'
    ------ 'আরে রাখ লো না ..... তুমনে মেরা মদত তো জরুর কি  .... ওয়ার্না ..... অ্যয়সা মদত করতে রহোগে তো অওর জ্যায়দা ভি মিল সকতা ..... করোগে মদত ? ' 
    গরীব ফলওয়ালা মহা বিভ্রন্তিতে পড়ে গেল । কলতান ঠিক কেমন লোক এবং কিসের চক্করে তার মতো তুচ্ছ মানুষের মদত চাইছে কিছুই আন্দাজ করতে পারছে না । সে একটু ভয়ও পেয়ে গেল । তবে নগদনারায়ণের এমন  অপ্রতিরোধ্য দুর্নিবার আকর্ষণ যে পরক্ষণেই তার মনে হল , এভাবে বেঁচে থেকেই বা লাভ কি ! তার চেয়ে একটু ঝুঁকি নিয়ে দেখা যাক না ...... যদি কিছু রোজগার হয় .....'
    তাই ভেবেচিন্তে সে শেষ পর্যন্ত বলল, ' ঠিক হ্যায় বাবু .... আপ য্যায়সা বলিয়েগা ..... লেকিন মুঝে কই খতরা তো নেহি ইসে ? '
    ----- ' বিলকুল নেহি ..... বিলকুল নেহি ..... ম্যায় তুমকো বচন দেতা হুঁ ...... ভগবানকি নাম পর .....' কলতান ওকে আশ্বস্ত করে ।
    ------ ' ফির বলিয়ে বাবু .... মুঝে কেয়া করনে হোগা ..... '
    ----- ' বাতাতা হুঁ ..... আরামসে .... ক ই পরেশানি নেহি হোগা ..... আরামসে ..... বাতাতা হুঁ .....  
     ( ক্রমশঃ )

      
    ************************************************************************************
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন