এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  রাজনীতি

  • নির্মোহ সাভারকর চর্চা, সবে মিলে - ২ (লন্ডন পর্ব)

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৫৮৪ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • সাভারকর চর্চাঃ  সবে মিলে –২ (লণ্ডন পর্ব)
    ১৯০৬ সালের জুলাই মাসে বিনায়ক দামোদর সাভারকর (ডাক নাম তাঁতিয়া) যখন  লণ্ডনে আইন পড়তে গেলেন তখন তাঁর বয়েস মাত্র ২৩।
    অল্প বয়েসে বাবা-মাকে হারিয়ে মাত্র পাঁচ বছরের বড় দাদা গণেশ দামোদর সাভারকরের (ডাকনাম বাবারাও) অভিভাবকত্বে বড় হওয়া মেধাবী ছাত্রটির ম্যাট্রিক পাশ করার অল্প আগে যমুনাবাঈয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। উনি কোন পণ নেননি। কিন্তু সম্পন্ন শ্বশুরের কাছে একটিই শর্ত রেখেছিলেন—কলেজে পড়ানোর খরচা দিতে হবে।
      শ্বশুর কথা রেখেছিলেন। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে দেখলে এটি খুব স্বাভাবিক এবং ভদ্র প্রস্তাব। খেয়াল করুন, রবীন্দ্রনাথের তিন জামাই বিলেত যাওয়ার শর্ত রেখেছিলেন।
    পুণের ফার্গুসন কলেজে সাভারকর একই সঙ্গে বিএ এবং আইন পড়তে থাকেন।  ১৯০৫ সালে বাংলার বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের  এবং বিলেতি কাপড় পোড়ানো  প্রভাব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।  পুণেতে তিলক এর সমর্থনে ডাক দিলে সাভারকর ওঁর সঙ্গে দেখা করেন।
     সাভারকর কলেজের ছাত্রদের নিয়ে বিজয়াদশমীর দিন বিলেতি  কাপড়ের  বহ্নুৎসব করেন। তাঁকে  কলেজ কর্তৃপক্ষ ১০ টাকা ফাইন করে এবং হোস্টেল থেকে বের করে দেয়।   ইতিমধ্যে তিনি দুটো সংগঠন তৈরি করেছিলেন—মিত্র মেলা, যারা শিবাজী মেলা এবং গণেশ উৎসবের আয়োজন করত, আর গুপ্ত সংগঠন ‘অভিনব ভারত’। তিলক তাঁর কেশরী পত্রিকায় ছাত্রদের পক্ষে কলম ধরলেন। ওঁর রাগের একটা বড় কারণ উনি  ফার্গুসন কলেজের একজন সংস্থাপকও বটেন।
    সাভারকর ১৯০৬ সালে  বিএ পাশ করে অসমাপ্ত আইন পড়া বিলেতে করবেন ঠিক করলেন।
    কিন্তু ওই খরচা দেওয়া শ্বশুরের পক্ষে সম্ভব নয়। তিলকের  এবং শিবরাম পরাঞ্জপের অনুশংসায়  লণ্ডনে ওঁর থাকার ব্যবস্থা হল শ্যামজী কৃষ্ণবর্মার ইন্ডিয়া হাউসে। শ্যামজী কৃষ্ণবর্মা ছিলেন জাতীয়তাবাদী।
    উনি  ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে যারা ভাবে বা উৎসুক এমন ছাত্রদের স্কলারশিপ দিতেন এবং নামমাত্র খরচায় তাঁর হোস্টেল ইন্ডিয়া হাউসে থাকতে দিতেন। এছাড়া প্যারিস থেকে তাঁর আরেক বন্ধু সর্দার সিং রাণার সঙ্গে মিলে দেশের ছাত্রদের স্কলারশিপ দিতেন—ছত্রপতি শিবাজী, রানা প্রতাপ, বাহাদুর শাহ জাফর ইত্যাদি অনেক নামে।[1] কিন্তু একটা শর্ত থাকত,যারা স্কলারশিপ নেবে তাদের শপথ নিতে হবে যে কখনও বৃটিশ সরকারের কোন চাকরি করবে না। সাভারকর তাঁকে কথা দিলেন এবং গ্রে’জ ইন এ আইন পড়তে ভর্তি হলেন।

    জাহাজে ওঠার সময় সাভারকর ছেড়ে এসেছেন  স্ত্রী যমুনা ও শিশুপুত্রকে, বোম্বাই বন্দরে হাত নেড়ে।
     ওঁর মনে হল যেন  “শত্রুপুরী”তে চলেছেন।  তখন তাঁর মনে কলোনিয়ালিস্ট বৃটিশের প্রতি অসম্ভব ঘৃণা।
    কৃষ্ণবর্মা ছিলেন ‘পূর্ণ স্বরাজ’এর পক্ষধর। সম্পাদনা করতেন ইন্ডিয়ান সোশিওলজিস্ট বলে একটি পত্রিকা। উনি কংরেসের হোম রুল, অহিংস পন্থা এবং আবেদন নিবেদনের একেবারেই সমর্থক ছিলেন না। বাইরে ওসব বলতেন পুলিশের চোখে ধুলো দিতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্যারিস নিবাসী দুই সহযোগী – জুয়েলারীর ব্যবসায়ী সর্দার রাণা এবং মাদাম  ভিকাজী কামা। কিন্তু এঁদের সবার বয়েস হয়েছে।
    সাভারকরকে পেয়ে উনি যেন বর্তে গেলেন। একে তো নতুন করে কিছু শেখাবার নেই। সাভারকর অচিরেই হয়ে উঠলেন ইন্ডিয়া হাউসের অবিসংবাদী নেতা।
    এরপর যে ঘটনাগুলো সাভারকরের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলঃ
    এখানে যাঁরা আসতেন তাঁরা অধিকাংশই রাজনৈতিক বিচারে বামপন্থী।  যেমন সরোজিনী নাইডু এবং হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ভাই বীরেন্দ্রনাথ , ‘চট্টো’ নামেই সুপরিচিত। মাদাম কামা এবং খোদ শ্যামজী কৃষ্ণবর্মার কথা আগেই বলেছি। আর এঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ব্রিটেনের সোশ্যালিস্ট নেতাদের।  অন্য ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেনাপতি বাপট, হেমচন্দ্র দাস এবং ভবিষ্যতে গদর পার্টির প্রমুখ নেতা লালা হরদয়াল এবং ভবিষ্যতের কমিউনিস্ট নেতা এম পি টি আচার্য।
    একবছরের মধ্যে সাভারকর এখানে গঠন করলেন “ফ্রি ইণ্ডিয়া সোসাইটি” এবং অভিনব ভারতের লণ্ডন শাখা।
    এরপর ঘটল চারটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
    ১৯০৭ সাল।  ইন্ডিয়া হাউস মে মাসে উদযাপন করল সিপাহী বিদ্রোহের পঞ্চাশ বছর পূর্তি এবং  জুন মাসে অজিত সিং ও লালা রাজপত রায়কে বন্দী করে বর্মার মান্দালয় জেলে পাঠানোর প্রতিবাদ সভা।
    তারপরে  ২২শে অগাস্ট তারিখে জার্মানির স্টুটগার্টে ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেস (যাতে জার্মানির কমিউনিস্ট নেতা রোজা লুক্সেমবার্গ এবং কার্ল লিবনেখট উপস্থিত ছিলেন) সম্মেলনে ভিকাজী কামা ভারতের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিলেন। সঙ্গে ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টো।
    এরপর লণ্ডনের হাইগেট এলাকায় ইন্ডিয়া হাউস হয়ে উঠল ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখে রহস্যজনক।
    লণ্ডন টাইমস ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় ইণ্ডিয়া হাউসের বিরুদ্ধে লেখা বেরোতে লাগল। বিপদ বুঝে মাদাম কামা এবং  শ্যামজী কৃষ্ণবর্মা গ্রেফতার এড়াতে চলে গেলেন প্যারিসে।
    সাভারকর হয়ে গেলেন ইণ্ডিয়া হাউসের সর্বময় নেতা। কিন্তু তিনিও অবস্থা বুঝে রাত্রে বিপিন চন্দ্র পালের বাড়িতে থাকতে লাগলেন। ওঁর ছেলে সাভারকরের বন্ধু।
    হেমচন্দ্র দাস বোমা বানানোর রাশিয়ান ম্যানুয়াল অনুবাদ করিয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে  সেনাপতি বাপট ও হোতিলাল বর্মার সঙ্গে ভারতে গিয়ে কোলকাতার মুরারিপুকুরে অরবিন্দ ঘোষের  বাড়িতে  বোমা বানাতে লাগলেন। অভিনব ভারত ও অনুশীলন সমিতি এভাবে খানিকটা যুক্ত হল বলা যায়।
    সাভারকরের আদর্শ ইতালির প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামী ম্যাজ্জিনি। উনি তাঁর জীবনী অনুবাদ করলেন। চেষ্টা করতে লাগলেন আইরিশ বিপ্লবীদের যোগসাজশে অস্ত্র সংগ্রহ করে ভারতে পাঠানোর। ইন্ডিয়া হাউসের রাঁধুনি চতুর্ভজ আমিনের মাধ্যমে উনি কুড়িটি ব্রাউনিং অটোম্যাটিক পিস্তল পর্তুগিজ গোয়া এবং ফ্রেঞ্চ পণ্ডিচেরিতে পাঠাতে সক্ষম হলেন। ( বৈভব পুরন্দরে, পৃঃ ৭৭)।
    এরপরে ১৯০৯ সালের ১লা জুলাই তারিখে  ইন্ডিয়া হাউসে নিয়মিত যাতায়াত করা ছাত্র মদনলাল ধিংড়া রাত এগারটায় ইম্পিরিয়াল ইন্সটিট্যুটের একটি হলে সভার শেষে তাঁর পিতৃবন্ধু পলিটিক্যাল সেক্রেটারি উইলিয়াম কার্জন উইলিকে এবং সঙ্গে একজন পার্শি ডাক্তারকে গুলি করে হত্যা করে ধরা পড়ে।  পরে তার ফাঁসি হয়।
    কিন্তু রাজ-সমর্থক এলিট ভারতীয়দের সভায় যখন এই হত্যাকান্ডের জন্যে শোক প্রস্তাব এবং মদনলাল ধিংড়ার জন্যে নিন্দা প্রস্তাব পেশ করে –একমতে পাশ করা হল ঘোষণা করা হয়, তখন একটি উদাত্ত কন্ঠস্বর শোনা গেল—না, সবাই সহমত নয়। 
    হল্লা শুরু হল—ধর ওকে, এখান থেকে বের করে দাও!
    ব্যারিস্টার পামার উত্তেজিত হয়ে সাভারকরকে ছাতার বাড়ি মারলেন, আঘাত চোখে লাগল।   সঙ্গে সঙ্গে সাভারকরের সঙ্গী এম পি টি আচার্য হাতের ছড়ি দিয়ে পামারকে পালটা আঘাত করলেন। গাল কেটে রক্ত বেরিয়ে গেল। পুলিশ এসে সাভারকর এবং তাঁর সঙ্গীদের বাইরে বের করে দিল।
    এরপরে উত্তেজিত জনতা বিপিন পালের বাড়ি ধাওয়া করে বলল—সাভারকরকে বের করে দাও!
    উনি বললেন—এখন এখানে নেই। আমি ওকে পরে বুঝিয়ে দেব।
    দি টাইমস পত্রিকায় সাভারকরের দীর্ঘ পত্র প্রকাশিত হল। তাতে উনি আইনের চোখ দিয়ে ধিংড়াকে ডিফেন্ড করলেন। ধিংড়া নিজের সমর্থনে কিছুই কবুল করেন নি। কিন্তু তাঁর ঘর থেকে হাতে লেখা একটি কাগজ উদ্ধার হয়। পুলিশ ওটা চেপে দেয়, আদালতে পেশ করে না।
    কিন্তু সেই গোপন চিঠি তাঁর ফাঁসির ঠিক একদিন আগে টাইমসে প্রকাশিত হয়ে পুলিশের লজ্জার কারণ হয়।
    পুলিশ বলে- ধিংড়ার পত্রটি মূলের কপি মাত্র। মূলটি যারা একে উসকেছে তাদের কাছেই আছে।  লেখার স্টাইলও ধিংড়ার নয়। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ধিংড়ার জবানবন্দীর সঙ্গে মেলে না।
    সাভারকরের পেছনে গোয়েন্দারা ভাল করে লেগে গেল।
    এর আগে উনি আরও একটা  গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। একবছর ধরে ইণ্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে পড়াশুনো করে সিপাহী বিদ্রোহের উপর মারাঠিতে বই লিখলেন যাতে ওই বিদ্রোহকে উনি ‘ভারতের প্রধান স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করলেন।
    বইটি দুই বন্ধু আইয়ার এবং ফাড়কে ইংরেজিতে, মাদাম কামা ও আচার্য ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনুবাদ করলেন।
    তাতে সাভারকর অনেক তথ্য দিয়ে দেখালেন যে ওটা আদৌ শুধু সেপাইদের বিদ্রোহ ছিল না। এটি আসলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অসাধারণ উদাহরণ।
    বইটির ভূমিকাতে উনি লিখলেন—শিবাজীর সময় মুসলমানের প্রতি ঘৃণা উচিত ছিল, কিন্তু সেটা যদি আজও ধরে রাখা হয় তবে সেটা অন্যায় এবং মূর্খামি হবে।
    আশ্চর্য্যের কথা , ২০২০ সালে হিন্দিতে প্রকাশিত ‘সাভারকর সমগ্র”তে এই ভুমিকাটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাভারকরের লেখা নিয়ে উৎসর্গীকৃত ওয়েবসাইটে পিডিএফে ওটি এখনও দেখা যাচ্ছে।
    বইটি জুলাই ১৯০৯এ ভারতে (ইংল্যাণ্ডে নয়) নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
    ইতিমধ্যে বিদ্রোহী কবিতা লেখার ‘অপরাধে’ সাভারকরের বড়ভাই বাবারাওয়ের আন্দামানে আজীবন কারাবাসের শাস্তি ঘোষণা হয়েছে( ৮ জুন, ১৯০৯)।  তারপরে ১ জুলাই কার্জন উইলির হত্যা! পুলিশের সন্দেহের সূঁচ সাভারকরের দিকে।
    এই হত্যার সমর্থনে দু’একজন ইংরেজ সোশ্যালিস্ট নেতা ও সাংবাদিকেরা , যেমন গাই অল্ড্রেড, বক্তব্য রাখলেন এবং শীঘ্রই বন্দী হয়ে একবছর কারাবাসের শাস্তি পেলেন।
    নিন্দে করলেন একজন যিনি সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের নেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন এবং প্রিটোরিয়ায় তিনবার জেল খাটার পর তাঁর স্বীকৃতি আরও বেড়েছে। তিনি এভাবে প্রাণ নেয়ার পক্ষে নন।
    গান্ধী লণ্ডনে এলেন ৯ দিন পরে, ১০ জুলাই।
    স্কটল্যান্ড ঈয়ার্ড ইন্ডিয়া হাউসে তালা ঝোলাল। গ্রে’জ ইনে আইন পরীক্ষা পাশ করা সত্ত্বেও ওরা একটি মিটিং এর পর  সাভারকরকে বার লাইসেন্স দিতে অস্বীকার করল।
    বিজয়া দশমীর দিন কিছু মিলে বেজওয়াটার এলাকায় নিজামুদ্দিনের রেস্তরাঁয় একত্রিত হলেন। তাতে গান্ধী সাভারকরের প্রশংসা করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। সাভারকর বেশ বড় এবং উদ্দীপক ভাষণ দিলেন।  দুজনেই হিন্দু-মুসলিম ঐক্য নিয়ে বললেন। সাভারকর পরে ওখান থেকে পুণের “কাল”পত্রিকায় যে রিপোর্ট পাঠালেন তাতে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যারিস্টারকে ‘দেশভক্ত’বলে বর্ণনা করলেন। (সাভারকর, লন্ডনচি বাতমিপত্রে, পৃঃ ১৪০-৪১;  পুরন্দরের বইয়ে পৃঃ ৮৮)।
    • এটাই লণ্ডনে সাভারকর ও গান্ধীজির প্রথম এবং একমাত্র বৈঠক।
    [এ’ব্যাপারে অনেক জীবনীলেখক ভুল বশতঃ ১৯০৬ সালে লণ্ডনে ওনাদের দেখা হওয়ার কথা লিখেছে। যেমন সম্পত ১৯০৬ বলে সোর্স বলছেন –২০১৮ সালের ছাপা একটি বইয়ে প্রত্যক্ষ দর্শীর বর্ণনা হিসেবে বিপ্লবী ঝাঁসিওয়ালে পরমানন্দের কথা বলা হয়েছে।
    অথচ, পরমানন্দ জন্মেছিলেন ১৮৯২ সালে। ১৯০৬ সালে  ওনার বয়েস ১৪ এবং তখন উনি গাঁয়ের পাঠশালার ছাত্র। আর সাভারকরের লেখায় এবং গান্ধীজির লেখায় ওই ১৯০৯ সালের কথাই আছে, ১৯০৬ সালের নয়।  গান্ধীজি নিজে ২০ জুলাই ১৯৩৭ সালে একটি চিঠিতে লিখেছেন যে ওনাদে একমাত্র সাক্ষাৎকার ১৯০৯ সালেই হয়েছিল। ]

    সে যাই হোক, নভেম্বর ১৯০৯ এ , দাদা বাবারাওয়ের কালাপানির সাজার বিরুদ্ধে আপিলের রায় তখনও বেরোয়নি,  নাসিকের কালেক্টর এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জ্যাকসনকে মারাঠি নাটক দেখে হল থেকে বেরোনোর সময় অনন্ত কানহারে তাঁকে গুলি করে হত্যা করল।
    তিনিই বাবারাওকে গ্রেফতার করে বিচার করেছিলেন। সাভারকর তখন নিউমোনিয়া থেকে সেরে উঠছেন। খবরটা পেলেন এবং জেনে গেলেন যে  তাঁকেই এই হত্যাটির এবং ক’দিন আগে আমেদাবাদে  লর্ড মিন্টোর ওপর দুটো বোমা ছোঁড়ার (যদিও ফাটে নি),  প্রধান ষড়যন্ত্রকারী ধরা হচ্ছে এবং ছোটভাই নারায়ণকেও এতে যুক্ত ভাবা হচ্ছে।
    সাভারকর যার হাত দিয়ে পিস্তল পাঠিয়েছিলেন সেই রাঁধুনি আমিন ধরা পড়ে রাজসাক্ষী হয়ে গেল। সে বলল যে সাভারকরই পিস্তলগুলো ওর হাত দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন এবং হত্যায় প্রযুক্ত পিস্তলটির নম্বরও ওই লটের সঙ্গে মিলে গেল।
    কিছুদিন পরে চঞ্জেরি রাও বলে একজন পুলিশের ট্রাংক থেকে সাভারকরের লেখা বন্দে মাতরম বলে একটি প্যাম্ফলেট পাওয়া গেল যাতে পুলিশ হত্যার আহ্বান এবং আগামী কয়েক বছর ধরে ভারতে রাজনৈতিক হত্যা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা লেখা রয়েছে।
    রাও জানাল যে সাভারকরের দলের সদস্য এবং উনি ওকে মন্ত্রগুপ্তির শপথ দিইয়েছেন।
     সাভারকরের লন্ডনে গ্রেফতারের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ায় উনি বন্ধুদের পরামর্শে প্যারিসে গিয়ে মাদাম কামার আশ্রয়ে উঠলেন। (চলবে)

    [1] বৈভব পুরন্দরে, সাভারকর, দ্য ট্রু স্টোরি অফ দ্য ফাদার অফ হিন্দুত্ব, পৃঃ ৬৪।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • এলেবেলে | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২৩:২২738350
  • হেঁইয়ো।
  • Ranjan Roy | ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪:০৫738351
  • সাভারকর ধরা পড়লেন
    প্যারিসে মাদাম কামার সংরক্ষণে সাভারকরের দিন ভালোই কাটছিল।  মাদাম কামা নামের পার্শি মহিলাকে ব্রিটিশ বলত ‘নটোরিয়াস লেডি’, সমর্থকেরা বলত ‘ বিপ্লবীদের মাতৃস্বরূপা’। তিনি সাভারকরের অসুখ সারিয়ে স্বাস্থ্য ঠিক করে লেখার সুযোগ করে দিলেন।
    বীরেন চট্টো  তখন বার্লিনে সরে গেছেন। উনি শহীদ মদন লাল ধিংড়ার স্মরণে “মদন’স তলোয়ার “ নাম দিয়ে মাসিক ম্যাগাজিন শুরু করেছেন। সাভারকর সেখানে নিয়মিত লিখতে লাগলেন। মাদাম কামা’র সান্নিধ্যে সাভারকরের সুযোগ হল রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইজিপ্টের বিপ্লবী বুদ্ধিজীবিদের সঙ্গে পরিচয় করার। রাশিয়ায় তখন জারের শাসন এবং স্তলিপিন প্রতিক্রিয়ার অধীনে দমন চলছে।
    কিন্তু হঠাৎ সাভারকর ঠিক করলেন যে উনি লণ্ডনে ফিরে যাবেন। কেন ? স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না।
    শ্যামজী কৃষ্ণবর্মা, মাদাম কামা, বীরেন চট্টো , লালা হরদয়াল সবার মাথায় হাত । আরে ওখানে তো পুলিশ জাল বিছিয়ে বসে আছে। নামলেই ক্যাচ! খবর্দার যেও না।
    সবাই অনেক করে বোঝাল, কিন্তু ব্যর্থ হল। 
    হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় লিখছেনঃ বীরেন অনেক বোঝাল—এ তো ডাহা পাগলামি আর মুখ্যুমি! কিন্তু সাভারকর কারও কথা না শুনে ফিরে চললেন—তাঁর বিশ্বাস ছিল তাঁকে কেউ চিনতে বা ধরতে পারবে না।[1]
        ফলটা এই হল যে সাভারকর লন্ডনে ট্রেন থেকে নামা মাত্র প্ল্যাটফর্মেই গ্রেফতার হলেন। অর্থাৎ গোয়েন্দারা আগে থেকেই তাঁর ফিরে আসার দিনক্ষণ, স্থান সবই জেনে জাল বিছিয়ে ছিল।
       তাঁকে বো স্ট্রীট কোর্টে তুলে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ পেশ করল।
    • সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা তাতে সাহায্য করা।
    • ব্রিটিশ ভারতে সম্রাটের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।
    • জ্যাকসন হত্যার অস্ত্র সংগ্রহ এবং সরবরাহ করে হত্যায় সহযোগ।
    • লণ্ডনে অস্ত্র জোগাড় করে বিতরণ এবং লন্ডন থেকেও যুদ্ধ ঘোষণা।
    • ভারতে ১৯০৬ সালে এবং লন্ডনে ১৯০৮ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের বক্তৃতা।
    আইনি লড়াই শুরু হল। মাদাম কামা এবং বীরেন চট্টো টাকা জোগাড় করে সাভারকরের জন্যে নামকরা আইনজীবী রেজিনাল্ড ভগানকে নিযুক্ত করলেন। সরকার পক্ষে দাঁড়ালেন মিঃ রাউলাট, যিনি এক দশক পরে ভারতে রাউলাট অ্যাক্টের জন্য নিন্দিত হবেন।
     কিন্তু ইংরেজ পক্ষ দেখল যে এক, দুই এবং পাঁচ নম্বর অভিযোগে (সিডিশন চার্জ) খুব বেশি হলে দুই থেকে ছ’বছর অব্দি জেল হবে।
    কথাটা ঠিক।
    পরের দশকেও তিলক, গান্ধী এবং নেহেরুকে সিডিশনের চার্জ লাগিয়ে এর বেশি শাস্তি দেওয়া যায়নি। আর পাঁচ নম্বর তো পুরনো ব্যাপার। এরজন্যে এতদিন সাভারকরকে লণ্ডনে গ্রেফতার করা  হয়নি।  
    সাভারকরের বাক্স-প্যাঁটরা হাটকিয়ে কিছু কাগজ পত্র, “ ওহ মার্টিয়ার”স" বলে নিজের লেখা কবিতাটি –এটুকুই পাওয়া গেছে। লন্ডনে কার্জন-উইলি হত্যায় সাভারকরকে  আইনের চোখে যুক্ত করা শক্ত। ধিংড়া ফাঁসির কাঠে চড়ার আগেও কারও নাম নেন নি। আর কানহারে সুদূর নাসিকে ম্যাজিস্ট্রেট জ্যাকসনকে যখন হত্যা করল তখন সাভারকর লণ্ডনে এবং তাঁদের মধ্যে কোন পূর্ব-পরিচয় নেই।
    তাহলে? ওঁর বিরুদ্ধে হার্ড এভিডেন্স কোথায়?
    এমন সময় ওদের হাত শক্ত করল তিনজন রাজসাক্ষী। বরাবরই বিপ্লবী আন্দোলন, বিশেষ করে গুপ্ত সংগঠন , মার খায় নিজেদের লোকের বিশ্বাসঘাতকতায়—ভয়ে অথবা প্রলোভনে। এখানেও ব্যতিক্রম হল না।
    একনম্বর, ইন্ডিয়া হাউসের পাচক চতুর্ভুজ আমিন, যাঁর হাত দিয়ে উনি কুড়িটি ব্রাউনিং পিস্তল  ১৯০৮ সালে ভারতে পাঠিয়েছিলেন। ও পুলিশকে বয়ান দিল যে বিনায়ক সাভারকর তাঁর হাতে পিস্তলগুলো দিয়ে ভারতে পাঠাতে বলেছিলেন।
    দু’নম্বর, তাঁর দাদা বাবারাওয়ের নাসিকের বাড়িতে তল্লাসি করে বোম বানানোর ম্যানুয়াল এবং যেসব বোমা মানিকতলা বোমার মামলায় অরবিন্দের বাড়ি থেকে ধরা পড়েছিল, তাঁর ফর্মূলা পাওয়া গেল। আর চঞ্জেরি রাও বলে কোয়েম্বাটুরের পুলিশটি , যে অল্প কিছুদিন লন্ডন প্রবাসের পর মুম্বাই বন্দরে নেমেছিল সে বন্দী হল। তার ট্রাংকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক যেসব লেখাপত্তর পাওয়া গেল তা সাভারকরের লেখা এবং তাঁর কাছ থেকে পাওয়া।।
    তিন নম্বর, আর একজন রাজসাক্ষী হল ইন্ডিয়া হাউসে থাকা সাভারকরের ঘনিষ্ঠ  হরিশচন্দ্র কোরগাঁওকর,  যে সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে সাভারকরের লেখার মারাঠি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিল।[2]
    এছাড়া ছিল কীর্তিকর নামের একজন গুপ্তচরকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ আগেই ইন্ডিয়া হাউসে প্ল্যান্ট করেছিল। লোকটি  মুম্বাই হাইকোর্টের অনুবাদকের কাজ করত। তাতে গোয়েন্দা বিভাগ রিক্রুট করে এক বছরের জন্যে লণ্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে ছাত্র সেজে থাকতে বলে। সে সাভারকরকে  নিজের পরিচয় দেয় এক অভিজাত মারাঠি পরিবারের সন্তান এবং সে এখানে দাঁতের ডাক্তারি শিখতে এসেছে।
    ও যে গুপ্তচর সেটা সাভারকরের সঙ্গে আইয়ার এবং রাজন পরে ধরে ফেলেছিলেন। কিন্তু ততদিনে ও অনেক ক্ষতি করে সরে পড়েছে।[3]
    এদিকে সাভারকরের নামে নাসিকেও ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে।
    বৃটিশ পক্ষ চাইছিল –ওই ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সাভারকরকে ভারতে পাঠিয়ে ওখানকার কলোনিয়াল আইনে বিচার হোক। কারণ, জ্যাকসন মার্ডার তো ভারতের নাসিকে মুম্বাই আদালতের এলাকায় হয়েছে।
    আসল কারণ হল ইংরেজের দুমুখো নীতি। ইংল্যান্ডের আইন এবং পদ্ধতি তুলনামূলক ভাবে অনেক লিব্যারাল। ভারতে অনেক কঠোর।  তাঈ ওখানে বিচার হলে  শাস্তি বেশি কড়া হবে।
    ডিফেন্স চাইছিল ওঁর বিচার লণ্ডনেই হোক।  কারণ কথিত অপরাধ ঘটার সময় সাভারকর লণ্ডনেই ছিলেন।  এবং উনি ভারতে আদৌ ন্যায়বিচার পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু আদালত ওঁকে জামিন না দিয়ে এবং ডিফেন্সের যুক্তি না মেনে  ফিউজিটিভ অফেণ্ডার্স অ্যাক্ট ১৮৮১ এর অধীন বিচারের জন্যে ভারতে পাঠানোর রায় দেয়।
    ১ জুলাই, ১৯১০। জাহাজ এস এস মোরিয়া সাভারকরকে নিয়ে মুম্বাইয়ের জন্য যাত্রা শুরু করল। তাতে একটি কেবিনে সাভারকর ছাড়া একজন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টর এবং আরও দুজন ভারতীয় মূলের কনস্টেবল।
    জাহাজ ৭ জুলাই সকাল দশটায় ফ্রান্সের মার্সাই বন্দরে নোঙর করল।
    সরকারি দস্তাবেজ অনুসারে সাভারকর সকাল ৬টায় উঠে বাথরুম যাবেন বলায়  হাতকড়ি খুলে দিয়ে বাথরুমের বন্ধ দরজার বাঈরে একজন কনস্টেবলকে পাহারায় রাখা হল।  দরজার উপরে তিন ইঞ্চি ফাঁক, সেখানে জামা কাপড় রাখা এবং নীচ দিয়ে উঁকি মারলে ছাড়া চপ্পল জোড়া দেখা যাচ্ছে। তাহলে উনি বোধহয় কমোডে, পুলিশ নিশ্চিন্ত। কিন্তু অনেকক্ষণ সারাশব্দ নাপেয়ে ওও দরজার উপর দিয়ে উঁকি মেরে অবাক। তারপর চেঁচাতে লাগল। কারণ সাভারকর ততক্ষণে গায়ে সাবান লাগিয়ে পায়খানার পোর্টহোল দিয়ে আদ্দেকের বেশি নীচে নেমে গেছেন।
    সবাই মিলে দরজা ভাঙার পর দেখা গেল উনি জলে নেমে সাঁতরাচ্ছেন।  নোঙর থেকে জেটি কতদূর ছিল?  কেউ বলে ১ কিলোমিটার কেউ বলে তিরিশ গজ।  কলোনিয়াল পুলিশের হিসেবে ওনাকে ১২ফুট সাঁতরে জেটিতে উঠতে হয়েছিল। [4]
    যাইহোক উনি আগে উঠে দৌড়ুতে লাগলেন।  ওদিকে জাহাজ থেকে খালাসী এবং পুলিশের দল ধর ধর, ওই চোর! ওই চোর ! চিৎকার করে জেটিতে নেমে তাড়া করেছে। সাভারকর প্রায় ২০০ গজ দৌড়ে হাঁফিয়ে পরে বন্দরের ফরাসী নৌ-পুলিশকে বললেন আমি রাজনৈতিক আশ্রয় চাই। আমাকে গ্রেফতার করে তোমাদের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পেশ কর।
    দুর্ভাগ্যবশ, সে ব্যাটা একবর্ণ ইংরেজি বুঝত না। সে ওনাকে জাপটে ধরে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দিল।
    জাহাজ সাভারকরকে মুম্বাই পৌঁছিয়ে দিল।
    তারপর আন্তর্জাতিক জগতে তুলকালাম লেগে গেল। মাদাম কামা এবং তাঁর সোশ্যালিস্ট বন্ধুরা প্রশ্ন তুললেন কী করে ফ্রান্সের জমিতে ইংরেজ পুলিশ কাউকে বন্দী করতে পারে? কোন সন্ধির জোরে?
    সমর্থন করলেন লণ্ডন ও আমেরিকায় লেবার ও সোশ্যালিস্টরা।
    কার্ল মার্ক্সের নাতি শার্ল লঙ্গে , যিনি  সাংবাদিকও বটেন, ল্যু’ মানিতে পত্রিকায় সাভারকরের  ব্রিটিশ জাহাজে করে ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুললেন।
    ফলে দি হেগ এ ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে আপিলের শুনানী শুরু হল।  তারা অনেক তানানানা করে স্বীকার করল যে ভুল হয়েছে কিন্তু এখন আর সাভারকরকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনার মানে হয় না। তাতদিনে মুম্বাইয়ে সাভারকরের বিচার শেষ।

    ************************************************************
    প্রশ্ন ওঠে, সাভারকর কেন কারও কথা না শুনে এমন করলেন? জানাই ছিল যে ধরা পড়বেন।
    এ নিয়ে বাজারে তিন-চারটে থিওরি চলে। কোনটাই নিশ্চিত নয়।
    এক,
    উনি যখন জানতে পারলেন যে ওঁর  দাদা নাসিকে গ্রেফতার হয়েছে এবং ওঁর খোঁজে পুলিশ পরিবারের লোকজনকে হয়রান করছে, তখন উনি ভাবলেন যে প্যারিসে আরামে না থেকে ধরা দেবেন, নিজেও জেলে থাকবেন।
    তাহলে প্রশ্ন, উনি ব্রিক্সটন জেলে থাকার সময় কেন ব্রিটিশ বন্ধু গার্নেটের সাহায্যে জেল থেকে পালাবার প্ল্যান আঁটছিলেন? বা পরে জাহাজ থেকে পালাতে গেলেন?
    দুই,
    ওনার বিরুদ্ধে অভিযোগ উনি নিজে সামনে নাএসে চ্যালাদের এগিয়ে দেন। তাই উনি সামনে এলেন।
    তিন,
    ব্রিটিশ গোয়েন্দারা একটা গল্প চালিয়ে দিল যে উনি মার্গারেট লরেন্স বলে এক ইংরেজ মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। গোয়েন্দারা সেই মহিলাকে দিয়ে গোপনে দেখা করার অনুরোধ ভরা চিঠি লিখে বিপ্লবীকে ট্র্যাপ করল।  তাই ওরা স্টেশন, ট্রেন সময় সব আগে থেকে জানত।  কৃষ্ণবর্মা প্রতিবাদ করে বললেন যে এমন কিছুই ঘটেনি। এগুলো ব্রিটিশের অপপ্রচার।[5]
    চার, মনোহর মালগাঁওকর , যিনি অধিকাংশ মারাঠিদের মত সাভারকরের ভক্ত, ওই মার্গারেট লরেন্সের কথিত চিঠিকেই আসল কারণ বলে মনে করেন।[6]
    পাঁচ,  দেখা যাক এ নিয়ে সাভারকর নিজে কী বলেছেন?  যার সংক্ষেপ হল,
    --হরদয়াল আমাকে অনেক বোঝাল। তুমি আমাদের নেতা, আন্দোলনের আত্মা।  তুমি গেলে চলবে কী করে? আমি বললাম, ওখানে আমার আত্মীয় পরিজন ভুগছে, অত্যাচার হচ্ছে আর আমি এখানে ফ্রান্সে বাগানে আরাম করব? এ হয় না। আমি যাবই, ওদের মত আমিও অত্যাচার সহ্য করব।[7]
    কিন্তু এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সম্পাদকের টিপ্পনিঃ
    “লণ্ডনের অভিনব ভারত সংগঠনের মধ্যে ঘাপ্টি মেরে থাকা ব্রিটিশ গুপ্তচরেরা  তাঁর প্রিয়তম মিত্রের নামে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জরুরী কাজের অছিলায় সাভারকরকে লণ্ডনে ডেকে নিল। এতদিন ধরে পুলিশকে বোকা বানিয়ে আসছিলেন, এবার ওদের জালে ফেঁসে গেলেন।“[8]

    প্যারিস থেকে লণ্ডন ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত সাভারকরের বিপ্লবী জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ওঁর জীবনের অভিমুখ স্বপ্ন সব এর পর বদলে গেল।
    কৃষ্ণবর্মা আর লণ্ডনে ফেরেন নি।  সুইজারল্যান্ডের কোন অজানা প্রান্তে ৭৩ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে মারা গেলেন। ভিকাজী কামার স্বাস্থ্য ভেঙে গেছল। তিনি ইউরোপের নির্বাসন থেকে ১৯৩৫ সালে ভারতে ফিরে পরের বছর মারা গেলেন।
    বীরেন চট্টো ১৯২০ সালের গোড়ায় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে বার্লিনে নেহেরুর প্রতিনিধি হলেন। কিছুদিন পর উনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে মস্কোতে থাকতে লাগলেন।  কিন্তু স্তালিনের ‘গ্রেট পার্জ’এর সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয় দু’মাস পরে ঘাতকেরা তাঁকে মেরে ফেলে।
    তিলকও ১৯২০ সালে চলে গেলেন।
    লণ্ডনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ইণ্ডিয়া হাউসে তালা লাগিয়ে দিল। অভিনব ভারত বা ফ্রি ইণ্ডিয়া সোসাইটির কোন খবর আর পাওয়া যায়নি।
    ভাবতে ইচ্ছে করে, যদি সাভারকর তখন লণ্ডনে ফিরে নাযেতেন তাহলে তাঁর জীবন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র পন্থার ইতিহাসে কিরকম বাঁক বদল হত? (চলবে)

    [1]   লাইফ অ্যান্ড মাইসেলফ, ভল্যুম ১, পৃঃ ২০১।

    [2] পুরন্দরে, পৃঃ ৯৮।

    [3] ঐ, ৭৯।

    [4] পুরন্দরে, পৃঃ ১০৮।

    [5] পুরন্দরে, পৃঃ ৯৫।

    [6] মালগাঁওকর, “দ্য মেন হু কিল্ড গান্ধী”, পৃঃ ৫২, ৫৫। নিউ দিল্লি, ২০১৯।

    [7] সাভারকর সমগ্র, খন্ড পাঁচ, পৃঃ ৬১১-১২, সম্পাদক অধ্যাপক নিশিকান্ত মিরাজকর, নিউ দিল্লি, ২০২০।

    [8] সাভারকর সমগ্র, খন্ড এক, পৃঃ ৬১৫, সম্পাদক অধ্যাপক নিশিকান্ত মিরাজকর, নিউ দিল্লি, ২০২০।
     
  • guru | 103.151.156.158 | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২১:২৮738365
  • গান্ধী ও সাভারকার এর লক্ষ্য একই ছিল | কিন্তু তাদের পথ আলাদা | দুজনেই মূলত হিন্দু আধিপত্য বাদে ও অখণ্ড ভারত তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন পার্থক্য শুধু এটাই যে গান্ধী নরম হিন্দুত্ব ও সাভারকার সশস্ত্র হিন্দুত্বে বিশ্বাসী ছিলেন |
     
    গান্ধী চাইতেন মূলতঃ তার গুজরাটি জৈন বানিয়া জাতি ভারতে রাজত্ব করবে অন্যদিকে সাভারকার চাইতেন মারাঠা সাম্রাজ্য ভার্সন ২ |  
    বর্তমান ভারত কে দেখলে মনে হয় দুজনেই সফল তাদের লক্ষ্যে | সত্যি এখন ৪ জন গুজরাটি বানিয়া সমগ্র দেশ শাসন করছে অন্যদিকে এই ৪ জনকে নিয়ন্ত্রণ করে আরএসএস নতুন মারাঠা সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখছে |
  • kc | 37.39.214.69 | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২২:১৬738467
  • রঞ্জনদা, ম্যাৎসিনিকে আনুন, যিনি একই সঙ্গে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে উদ্বুদ্ধ করছেন অনেককেই, গান্ধীজি সাভারকার নেহরু কিছুটা নেতাজি সুভাষকেও, টানুন ম্যাৎসিনি আর গ্যারিবল্ডিকে, মার্ক্সকেও, সাভারকারের চিন্তার গঠন বুঝতেই তো আমরা আপনার কাছে এসেছি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন