বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  রাজনীতি

  •  সাভারকর চর্চা সবে মিলেঃ ৪  (কালাপানি, প্রতিরোধ)

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৩৭৭ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • সাভারকর চর্চাঃ সবে মিলে—৪ (কালাপানি, ভুখ হরতাল)
    রাজবন্দীদের জীবনযাপন( বারীন, সাভারকর এবং রমেশ চন্দ্র মজুমদারের রিপোর্ট থেকে)
    রাজবন্দীদের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে যা জানা গেছে
    উপেন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ
    “উঠতে লাথি, বসতে ঝাঁটা”।
     “রেঙ্গুন চালের ভাত ও মোটা মোটা রুটির সঙ্গে কচুর গোড়া, ডাঁটা ও পাতা, চুপড়ি আলু, খোসাসমেত কাঁচা কলা ও পুঁই শাক, ছোট কাঁকর, আর ইঁদুর নাদি একসঙ্গে সিদ্ধ”।
    রোজকার কাজঃ
    সাতটা টানা লম্বা ব্লক, প্রত্যেকটা তিনতলা, প্রতি তলায় টানা বারান্দা। ব্লকগুলো হাতের পাঁচটা আঙুলের মত সেন্ট্রাল টাওয়ার থেকে ছড়ানো।  প্রত্যেক ব্লকের সামনে রয়েছে আঙিনা, তাতে বন্দীদের জন্য একটা ছোট্ট জলের চৌবাচ্চা, একটা জলের কল এবং প্রতি ব্লকের জন্যে একটা করে শৌচাগার।
    লাইন লাগিয়ে পায়খানায় যাও, ওই কলের জলে ধোও,  মুখ ধোও, লেংটি পরে ওই চৌবাচ্চার জলে সবার সামনে চান কর। কিন্তু কয় মগ জলে ধোবে, মাথায় ঢালবে সব গুণে রাখা।
    ওই আঙিনায় রয়েছে রাজবন্দীদের কাজের ওয়ার্কশপ।
    কাজ বলতে ঘানি ঘুরিয়ে তেল বের করা, নারকোলের ছোবড়া পেটানো, তার থেকে দড়ি পাকানো--তিনটের কোন একটা। প্রথমটি সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমের, দড়ি পাকানোয় তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে কম পরিশ্রম।
    কাজের সময়ঃ
    রোজ সকালে উঠে শৌচকর্মের  ভাত বা কঞ্জি খেয়ে  ল্যাঙোট পরে কাজে লাগো।  বেলা দশটা থেকে বারোটা খাওয়া এবং বিশ্রামের সময়। কিন্তু কাজের কোটা পুরো করার তাড়নায় তাড়াহুড়ো করে খেয়ে ফের কাজে লাগো। তিনটে নাগাদ হিসেব বুঝিয়ে দাও, কম হলে গাল খেয়ে পাঁচটা বা তার বেশি সময় ধরে কাজ কর।
    প্রহরীদের দুর্ব্যবহারঃ
    “রামলাল ফাইলে টেড়া হইয়া বসিয়াছে; দাও উহার ঘাড়ে দুইটা রদ্দা। মুস্তাফা আওয়াজ দিবামাত্র খাড়া হয় নাই, অতএব উহার গোঁফ ছিড়িয়া লও। বকাউল্লার পায়খানা হইতে বিলম্ব হইয়াছে; অতএব তিন ডাণ্ডা লাগাইয়া উহার পশ্চাদ্দেশ ঢিলা করিয়া দাও”। ( নির্বাসিতের আত্মকথা, পৃঃ ১০৩)
    তেলঘানিতে তখন ‘দুইজন পাঠান অফিসার  সেখানকার হর্তাকর্তা’। সেখানে ঢুকিবামাত্র তাহাদের মধ্যে একজন তাহার বদ্ধমুষ্টি আমাদের নাকের উপর রাখিয়া  বেশ জোর গলায় বুঝাইয়া দিল যে, কাজকর্ম ঠিক ঠিক নাকরিতে পারিলে সে আমাদের নাকগুলি ঘুষার চোটে থ্যাবড়া করিয়া দিবে’। (পৃঃ ১০৪)।
    বারীনের রুগ্ন স্বাস্থ্য। হাসপাতাল থেকে রোজ বারো আউন্স দুধ আসত।
    “আমাদের পেটি অফিসার খোয়েদাদ মিঞার মুখে  সেই দুগ্ধটুকু ঢালিয়া তবে সে অত্যাচারের হাত হইতে নিস্তার পাইত। ---তিনি তাঁহার গোঁফছাঁটা মুখখানির মধ্যে দুধটুকু ঢালিয়া দিতে দিতে বলিতেন—ইয়াঃ বিসমিল্লা! খোদানে ক্যা আজব চিজ পয়দা কিয়া”।
    রবিবারও নিষ্কৃতি নেই। নীচের থেকে বালতি বালতি জল এনে নারকোলের ছোবড়া দিয়ে দোতলার এবং তিন তলার বারান্দা ঘষে সাফ করতে হত। একদিন ওইরকম কাজের সময় উপেন্দ্র কাছেই কর্মরত উল্লাসকরকে দেখে ভাবলেন একটু কথা বলি। কিন্তু রাজবন্দীদের মধ্যে কথা বলার হুকুম নেই। তবু চেষ্টা করা।
    পা টিপে টিপে উল্লাসকরকে পেছন থেকে ডাকা মাত্র পিঠে পড়ল গুম করে কিল। মুখ ঘোরাতেই গালে এক ঘুঁষি। যমদূতের মত পাঠান প্রহরী মহম্মদ শা’র ডিসিপ্লিন রাখার পদ্ধতি। (পৃঃ ১০৬)।
    ‘মাঝে মাঝে এক আধজন প্রহরী একটু ভাল কথাও বলিত। একদিন সন্ধ্যার সময় গালাগালি খাইয়া মুখ চুণ করিয়া বসিয়া আছি এমন সময় একজন পাঠান প্রহরী আসিয়া বলিল—“—দেখ বাবু, ------ গালাগালি খেয়ে যারা মন গুমরে বসে  থাকে তারা হয় পাগল হয়ে যায় নয় ত’ মারামারি করে ফাঁসি যায়। ওসব মন থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভাল। খোদাতালার হুকুমে এমন দিন চিরকাল থাকবে না”। অযাচিত উপদেশ প্রায়ই ভাল লাগে না, কিন্তু পাঠানের মুখে খোদাতালার নাম সে রাত্রে বড় মিষ্ট লাগিয়াছিল’। (পৃঃ ১০২)
    হিন্দু-মুসলমান
    সাধারণ বন্দীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান  প্রায় সমান সমান। কিন্তু রাজবন্দীদের জন্য ভারতের উত্তর পশ্চিম প্রান্ত থেকে আনা হয়েছিল পাঠান এবং পাঞ্জাবি মুসলমান অপরাধী প্রহরীদের।  “ধর্মঘটের সময় জেলার আমাদের দাবাইবার জন্য আমাদের উপর পাঠান প্রহরী লাগাইয়া দিত। কিন্তু পাঠান অনেক সময় আমাদের বন্ধু হইয়া উঠিত। জেলে দলাদলির অন্ত নাই। প্রবল দলকে আপনাদের সপক্ষে রাখিয়া আমরা আত্মরক্ষা করিবার চেষ্টা করিতাম”। (পৃঃ ১০৭)
    জেলের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভেদ মাঝেমাঝে তীব্র হয়ে উঠত। ওরা ক্ষমতার  জায়গাগুলো দখল করতে চেষ্টা করত। মুসলমান ওয়ার্ডারেরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে হিন্দুকে মুসলমান করার চেষ্টা করত। ঘানি পিষতে ক্লান্ত হিন্দুছেলেকে  বোঝাত মুসলমান হলে পরমসুখে থাকবে, নইলে ভুগতে হবে।
    আবার আর্যসমাজীরাও জেলের মধ্যে প্রচারকার্য চালায়। ধর্মভ্রষ্ট হিন্দুকে আর্যসমাজভুক্ত করার জন্যে প্রাণপণে লড়ে যায়।
    “সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে সেরূপ কোন আগ্রহ দেখা যায়না। তাহারা দল হইতে বাহির করিয়া দিতেই জানে, নূতন কাহাকেও দলে টানিয়া লইবার সামর্থ্য তাহাদের নাই”।(পৃঃ ১০৮)।
    বাঙালী হিন্দুরা?
    “আমরা হিন্দু-মুসলমান সকলকার হাত হইতেই নির্বিচারে রুটি খাই দেখিয়া মুসলমানেরা প্রথম প্রথম আমাদের পরকালের সদগতির আশায় উল্লসিত হইয়া উঠিয়াছিল। হিন্দুরা কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ হইয়াছিল; শেষে বেগতিক দেখিয়া উভয় দলই স্থির করিল  যে আমরা হিন্দুও নই, মুসলমানও নই—আমরা বাঙালী। রাজনৈতিক কয়েদী মাত্রেরই শেষে সাধারণ নাম হইয়া উঠিল---বাঙালী”। (পৃঃ ১০৯)

    রাজনৈতিক দলাদলি
    “দুঃখের কথা, লজ্জার কথাও বটে যে---- রাজনৈতিক বন্দীদের মধ্যেও দলাদলির অভাব ছিল না। -----
    কোন দল বেশি কাজ করিয়াছে, কোন দল ফাঁকি দিয়াছে, কোন নেতা সাচ্চা আর কোন নেতা ঝুটা—এরূপ গবেষণার অন্ত ছিল না।  এবং প্রায় প্রত্যেক দলই আপনাকে “আদি ও অকৃত্রিম” বলিয়া  প্রমাণ করিবার জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে সত্য মিথ্যা অভিযোগ উপস্থিত করিত। ----
    মারাঠী নেতারা মাঝে মাঝে প্রমাণ করিতে বসিতেন যে যেহেতু বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম গানে সপ্তকোটি কণ্ঠের কথা আছে, ত্রিশ কোটি কণ্ঠের কথা নাই, এবং যেহেতু বাঙালী কবি লিখিয়াছেন “বঙ্গ আমার, জননী আমার” সেইহেতু বাঙালীর জাতীয়তাবোধ অতি সংকীর্ণ।
    একজন পাঞ্জাবী আর্যসমাজী নেতা ---- বলিয়াছিলেন যে, যেহেতু রামমোহন রায় এদেশে ইংরাজী শিক্ষা প্রচলন করিবার জন্য ইংরাজ গভর্ণমেন্টকে পরামর্শ দিয়াছিলেন সেহেতু তিনি দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক।  এরূপ যুক্তির পাগলা গারদ ভিন্ন আর উত্তর নাই।
    মারাঠী নেতাদের মধ্যে এই বাঙালী-বিদ্বেষের ভাবটা কিছুটা বেশী প্রবল বলিয়া মনে হয়। ভারত বর্ষে যদি একতা স্থাপন করিতে হয় তাহা হইলে তাহা মারাঠার নেতৃত্বেই হওয়া উচিত—ইহাই  যেন তাঁহাদের মনোগত ভাব।
    হিন্দুস্থানী ও পাঞ্জাবীরা গোঁয়ার, বাঙালী বাক্যবাগীশ, মাদ্রাজী দুর্বল ও ভীরু—একমাত্র পেশোয়া’র বংশধরেরাই মানুষের মতো মানুষ—নানা যুক্তি তর্কের ভিতর দিয়া এই সুরই ফুটিয়া উঠিত”। (পৃঃ ১১০)
    সাভারকরের অভিজ্ঞতা
    উনি  সেলুলারে ঢুকলেন জুলাই ১৯১১, মানে মানিকতলা বোমার মামলার যুগান্তর দলের চেয়ে দু’বছর পরে। তখনও জেলের ভেতরের অবস্থা একই রকম।
    এঁরা সরকারের চোখে খতরনাক, কিন্তু সিডিশন চার্জ থাকায় পলিটিক্যাল প্রিজনারের স্ট্যাটাস পেলেন না। ফলে ভাল খাবার, শারীরিক বেগার শ্রম থেকে অব্যাহতি, নিজেদের মধ্যে মেলামেশা,  বই-খবরের কাগজ, শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে কাজ (অফিস, প্রেস, কিচেন, সুপারভাইজার ইত্যাদি) থেকে বঞ্চিত রইলেন।
    আবার সাধারণ অপরাধীদের যতটুকু খাবার, বিশ্রাম এবং নিজেদের মধ্যে মেলামেশার সুযোগ তাও দেয়া হল না।  এই ব্যবস্থা কি তখনকার জেলের কানুন এবং সরকারের ক্রিমিন্যাল প্রসিডিওর  কোডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল? একেবারেই নয়।
    এখানে জেলার ব্যারি এবং তার সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও তাদের অধীনস্থ  ওয়ার্ডার, টিন্ডাল , পেটি অফিসারদের মুখের কথা, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, খেয়ালখুশিই আইন।
    জেলার ব্যারি প্রথম সাক্ষাতে সাভারকরের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করলেন। একে তো ছেলেটি লণ্ডন থেকে পাশ করা ব্যারিস্টার, তায়  “ডেঞ্জারাস”! জাহাজ থেকে পালাবার চেষ্টা করেছিল।

     ব্যারি বোঝালেন যে উনি আইরিশ এবং প্রথম যৌবনে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষধর ছিলেন। বয়সের সঙ্গে বুঝতে পেরেছেন ওটা ভুল পথ। সাভারকরের বয়েস অল্প, সামনে উজ্বল ভবিষ্যৎ। এখানে সারা জীবন ক্ষয় না করে অন্য কিছু ভাবা উচিৎ।
    সাভারকরও সমানে সমানে জবাব দিলেন। বললেন যে আইরিশ বা ইংরেজ সবই তাঁর চোখে সভ্য সমাজের লোক। তবে ব্যারির এসব ভালো কথা ওঁর দেশের ‘সিন ফিন’ আইরিশ বিপ্লবীদের কেন শোনাচ্ছেন না ?
    হার মেনে ব্যারি বললেন—ঠিক আছে, জেলের নিয়ম মেনে চল। নইলে শাস্তি পাবে। আর পালাতে চেষ্টা কর না। নইলে জঙ্গলে নরখাদক জংলীদের পেটে যাবে।
    প্রথমে তাঁকে দেওয়া হল ছোবড়া পেটানোর কাজ।  ১৬ অগাস্ট, ১৯১১ নাগাদ তাঁকে চোদ্দ দিনের জন্য তেলঘানিতে লাগানো হল। সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ। ওঁর দশাও অন্য রাজবন্দীদের মত হল। দশ মিনিটের মধ্যে শ্বাস ফুলে উঠল। জিভ শুকিয়ে গেল।  দিনের শেষে সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা, জ্বর জ্বর ভাব নিয়ে নিজের সেলে গিয়ে ওই কাঠের পাটাতনে শুয়ে রইলেন।
    চোদ্দ দিন পরে দেওয়া হল অপেক্ষাকৃত নরম কাজ—দড়ি পাকানো।
    একটা বিশেষ ঘটনা। বিনায়কের দাদা গণেশ বা বাবারাও এক বছর আগে থেকেই (১৯১০) সেলুলারে বন্দী। উনি জানতে পারেন নি যে  ওঁর ছোটভাই তাঁতিয়াও একবছর পরে (১৯১১) একই জেলে এসেছে। একদিন প্রাঙ্গণে বন্দীদের জমায়েতে কাজের হিসেব নেবার সময় দুইভাই মুখোমুখি। বড়ভাই অবাক—‘তাঁতিয়া , তুমি কোত্থেকে এখানে?’
    বিনায়ক লণ্ডনে পড়তে যাবার পর (৫ বছর) এই প্রথম ভরত মিলাপ। কিন্তু কথা বলা গেল না। ওয়ার্ডাররা সরিয়ে দিল। তবে শীগগিরই ওঁরা নিজেদের মধ্যে চিরকুট চালাচালির ব্যবস্থা করে ফেললেন।
    জেলে আসার একমাস পর থেকেই শাস্তির পালা শুরু হল। এর খতিয়ান ওঁর জেল টিকিটে নথিবদ্ধ রয়েছে।
    জেলের ভেতর সাভারকরের শাস্তিগুলোঃ
    •  ২০ অগাস্ট, ১৯১১।  আদেশ হল কয়েদি নাম্বার ৩২৭৭৮, ছ’মাসের জন্য সেল নাম্বার ৫২ তে ‘নির্জন কারাবাস’।  টিকিটে অপরাধ কী লেখা নেই।
    • জুন ১৯১২। অন্যদের কাছে বিনা অনুমতিতে চিঠি লেখার জন্যে ১ মাসের ‘নির্জন কারাবাস’।
    • ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯১২। ওনার কাছে অন্য এক বন্দীকে লেখা চিঠি পাওয়া গেছে। এবার সাতদিনের ‘খাড়া হাতকড়ি’। এর মানে মাথার উপরে হাত তুলে দেয়ালে থেকে ঝুলন্ত কড়ার  সঙ্গে হাতকড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া—প্রায় আট ঘন্টা ওইভাবে। কেউ কেউ দেয়ালে পেচ্ছাপ পায়খানা করে ফেলত।
    • নভেম্বর ১৯১২। তৃতীয় বারের মত ‘নির্জন কারাবাস’, ১ মাসের জন্যে। অপরাধ ওঁর কাছে অন্য কয়েদীর লেখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে।[1] সাভারকর  ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি ১৯১৩ পর্য্যন্ত,  তিনদিন অনশন করলেন। কিন্তু ডিসেম্বর থেকেই অনুমতি মিলল কোলকাতায় মেডিকেল কলেজে পাঠরত ছোটভাই নারায়্ণকে চিঠি লেখার।
                                                      
    • ডিসেম্বর ১৯১৩। কোন কাজ করতে অস্বীকার করায় সাভারকরকে ফের একমাসের ‘নির্জন কারাবাস’। তারপর ১৭ জানুয়ারি ১৯১৪ থেকে দড়ি পাকানোর কাজ দেওয়া হল।
    • ৮ জুন, ১৯১৪। কোন কাজ করতে অস্বীকার করায় এবার সাতদিনের জন্যে ‘খাড়া হাতকড়ি’। হাতকড়ি খোলার দিনও কোন কাজ করতে অস্বীকার করায় ওনাকে ‘চেন গ্যাং’ মানে কয়েকজন কয়েদির সঙ্গে শেকল বাঁধা অবস্থায় কাজে লাগানো।
    •  ১৮ জুন, ১৯১৪।  কাজ করতে না চাওয়ায় ১০ দিনের ‘খাড়া ডান্ডাবেড়ি’। মানে দুই পা  এবং কোমরে একটা ধাতুর তৈরি ত্রিভুজ এমনভাবে বেঁধে দেওয়া যে পা দুটো অমনি করে ফাঁক করা থাকবে, কাছাকাছি আনা যাবে না।
    • কিন্তু জেল টিকেট স্পষ্ট করে লিখেছে যে ঐ ‘খাড়া ডান্ডাবেড়ি’ লাগানোর পরের দিনই সাভারকর কাজ করতে চাইলে তাঁকে দড়ি পাকাতে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে বেড়ি খোলা হয় দশ দিন পরেই।
    • জুলাই ১৯১৪র মাঝামাঝি তাঁকে ফের চেন গ্যাং এ লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং ওই শেকল খোলা হয় তিন মাস পরে অক্টোবরে।
    এরপর থেকে সাভারকরকে বিশেষ শাস্তি দেওয়ার কথা জেল টিকেটে নেই।
    ২০১২ সালের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা
    • 2৯ এপ্রিল ২০১২
    সাভারকরের কালাপানি জীবনের মাত্র ৯ মাস পূর্ণ হয়েছে।
    মানিকতলা বোমার মামলার রাজবন্দী ইন্দুভুষণ রায় (আসামী নং ৩১৫৫৫) জামা ছিঁড়ে ফাঁস বানিয়ে নিজের সেলের উঁচু জানলার গ্রিলের থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। ইনিও সাভারকরের ব্লক নং ৭ এর অধিবাসী। সাভারকর লেখেন যে ইন্দুভূষণের আত্মা জেলের অমানুষিক অত্যাচারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাভারকর তাঁকে একবার আত্মহত্যা না করতে বুঝিয়েছিলেন।
    সাভারকর ভাবতে লাগলেন—এই প্রথম রাজনৈতিক বন্দীর আত্মহত্যা। এর পর কার পালা? ওঁর নিজের? তেলঘানিতে চাকা ঘোরাতে গিয়ে জ্ঞান হারানোর পর ইনিও আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন এবং অতিকষ্টে নিজেকে নিবৃত্ত করেছিলেন।[2]
    • দু’মাস গেল না। ১৫ জুন, ২০১২। ব্লক ৫ এর উল্লাসকর দত্ত পাগল হয়ে গেলেন। ছ’মাস পরে তাঁকে মাদ্রাজের পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উল্লাসকরের স্বপ্নে সাভারকর হাতের গ্লাভস খুলে অব্যর্থ নিশানায় জেলার ব্যারিকে ঘায়েল করলেন!
    • হরিয়াণার হোতিলাল বর্মা তখন সেলুলার জেলে শাস্তিভোগ করছেন। জেলে ওঁর ব্যাজে লেখা ছিল ‘ইনকরিজিবল’। উনি সেলুলার জেলের অরাজকতা এবং অত্যাচারের খবর নিয়ে একটা তিন পাতার চিঠি লিখে তাতে নিজের নাম, সেলের নম্বর লিখে দস্তখত করলেন। তারপর রিস্ক নিয়ে একজন সাধারণ কয়েদির হাত দিয়ে কোলকাতায়  সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির হাতে পৌঁছে দেবার অনুরোধ করলেন।
    • সুরেন্দ্রনাথ সেই খবর নিজের পত্রিকা  ‘বেঙ্গলি’র  তিনটে সংখ্যায় ( ৪, ৮ এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১৯১২) প্রকাশ করলেন। এইখবর  কোলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা, পুণের ‘মারাঠা’, এবং লাহোর এর ট্রিবিউনে প্রকাশিত হল।  এরপর এই খবর লণ্ডনের লেবার নেতা গাই আল্ড্রেডের হেরাল্ড অফ রিভোল্টে বেরল। ভারতের মূল ভূখন্ড এবং ইংল্যান্ডে সবাই জানতে পারল যে সেলুলার জেলের ভেতরে কী চলছে।[3] হোতিলাল কড়া শাস্তি পেলেন।
    • এবার রাজবন্দীরা ভাবলেন ঢের হয়েছে, আর নয়! স্বরাজ্য পত্রিকার সম্পাদক লাদ্ধারাম এবং ১৭ বছরের ইন্দুভূষণ মুখার্জি সেপ্টেম্বর ১৯১২ থেকে ভুখ হরতাল শুরু করল।  চলল তিনমাস।
    প্রতিরোধের গল্পগুলোঃ
       প্রথম ধর্মঘট
    উপেন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ
    “আমাদের নিজেদের অন্তর্বিরোধের ফলে আমরা অনেকদিন পর্য্যন্ত কর্তৃপক্ষের অত্যাচারে বাধা দিতে পারি নাই। শেষে কষ্টের যখন বাড়াবাড়ি আরম্ভ হইল তখন নিজেদের বিরোধ চাপা দিয়া ধর্মঘটের আয়োজন আরম্ভ হইল। এ বিষয়ে প্রধান উদ্যোক্তা শ্রীমান নন্দগোপাল। পাঞ্জাবী ক্ষত্রিয়, দীর্ঘকায় সুপুরুষ”।
     নন্দগোপাল প্রথম দিন থেকেই হাসিমুখে বললেন যে এত পরিশ্রম ওনার পোষাবে না। উনি ধীরে ধীরে খাবেন, ধীরে সুস্থে কাজ করবেন। দুপুরে খেয়ে দেয়ে টানা ঘুমোবেন, টার্গেট চুলোয় যাক।
    এর আগে কোন রাজবন্দী এমন কথা বলেনি।  
    শত গালাগালি তর্জন গর্জনে কোন কাজ হল না। তিনি নির্বিকার হাসিমুখে নিজের হিসেবে দিনযাপন শুরু করলেন। কয়েকবার ডান্ডাবেড়ি, নির্জন কারাবাস –এসবেও কোন কাজ হল না। নন্দগোপাল তেলঘানিতে কাজ করতেই অস্বীকার করলেন। আদেশ হল সমস্ত রাজবন্দীকেই অন্ততঃ তিন দিনের জন্য তেলের ঘানি ঘোরাতে হবে।
    এবার অনেকেই একের পর এক কাজ ছেড়ে দিয়ে হরতালে সামিল হল।
    জেল কর্তৃপক্ষও একের পর এক শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে চললেন। পেনাল খাবার, নির্জন কারাবাস, ডান্ডাবেড়ি চলতে লাগল।
    বন্দীদের মধ্যে ম্যালেরিয়া এবং আমাশা শুরু হল। কর্তৃপক্ষ সম্রাটের রাজ্যাভিষেকের বাহানায় (করোনেশন) কয়েকজনকে বেছে বেছে বাইরের সেটলমেন্টে কাজ করতে পাঠালেন।
    বারীন রাজমিস্ত্রির যোগানদার, উল্লাসকর ইঁটভাটায় মাটিকাটার মজুর, কেউ জঙ্গলে কাঠ কাটতে, কেউ বাঁধ বানাতে, কেউ রিকশা টানতে।[4]
    সাভারকরের আফশোস, ওনাকে বিশ্বাস করে বাইরে কাজ করতে পাঠানো হচ্ছে না। পরে উনি চিঠিতেও এর উল্লেখ করেছিলেন।
    কিন্তু উপেন্দ্রনাথ লিখছেন, “ আমাদের কিন্তু অদৃষ্টগুণে ‘উলটা বুঝিলি রাম’ হইয়া গেল। জেলখানার মধ্যে কাজ যতই কঠোর হোক না কেন , সরকার হইতে নির্দিষ্ট খোরাক পাওয়া যাইত, আর জল-বৃষ্টিতে বেশী ভিজিতে হইত না। বাহিরে গিয়া সে সুখটূকুও চলিয়া গেল।  প্রাতঃকালে ৬টা গইতে ১০টা ও অপরাহ্নে ১টা হইতে সাড়ে ৪টা পর্য্যন্ত কঠোর পরিশ্রম ত’ করিতেই হয়”।
    উনি আরও বলছেন যে পোর্ট ব্লেয়ারে সাতমাস  বর্ষাকাল, জঙ্গলে জোঁকের উপদ্রব। প্রচুর লোক জঙ্গলে কাজ করার ভয়ে পালিয়ে যেত।  তার পর পুরো খোরাক পাওয়া যেত না। ওদের খোরাক চুরি করে স্থানীয় বাজার ও গ্রামে বিক্রি হত।  তারপর জেলের বাইরের চারটে হাসপাতালে বাঙালী সার্জন। তাই আদেশ হল অসুখ হলেও বাঙালী কয়েদিরা ওখানে না গিয়ে  জেলের ভেতরের হাসপাতালে যাবে। মানে, ম্যালেরিয়া জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বিছানা এবং থালা-বাটি ঘাড়ে করে পাঁচ-সাত মাইল হেঁটে আসতে হবে।
    এবারভ এক এক করে সবাই বাইরের কাজ করব না বলে জেলের ভিতরে ফিরে এলেন। তারপর ঘটলা ইন্দুভূষণের আত্মহত্যা এবং উল্লাসকরের পাগল হওয়ার ঘটনা।
    প্রায় সবাই মরিয়া। ব্যবস্থা না বদলালে কেউ কাজ করবেন না বলে আল্টিমেটাম দিলেন আর কর্তৃপক্ষ নানান শাস্তি দেওয়া শুরু করল। (উপেন্দ্র, পৃঃ ১১৭)।
    “আমরা প্রধানতঃ তিনটা জিনিস চাহিলাম—ভাল খাওয়াপরা, পরিশ্রম হইতে অব্যাহতি ও পরস্পরের সহিত মেলামেশার সুবিধা”।
    এক এক জনকে আলাদা আলাদা কুঠরিতে খাড়া হাতকড়ি দেওয়া হল।  বন্দীরা চিৎকার করে গল্প করতে লাগলেন। ধর্মঘট ভাঙল না।
    তখন চীফ কমিশনার “আমাদের জন কয়েককে সহজ কাজ দিয়া জেলের বাহিরে পাঠাইয়া দিবার  ব্যবস্থা করিলেন। আমরা বলিলাম যে সকলেক যদি জেলের বাহিরে পাঠানো হয় তাহা হইলে আমরা বাহিরে পাঠানো হয়---- নচেৎ পুনরায় জেলে ফিরিয়া আসিব”। (পৃঃ ১১৮)
    জেলখানায় ধর্মঘট চলতে লাগল।
     ননীগোপাল  ভাইপার আইল্যান্ডের ছোট জেলে গিয়ে ভুখ হরতাল শুরু করলেন এবং যাদের বাইরে পাঠানো হল তাঁরাও কাজ ছেড়ে দিলেন।  সাজার পর সাজা। তিনমাসের শাস্তি মাথায় নিয়ে তাঁরা যখন জেলে ফিরলেন তখন জেলের ভেতরে ধর্মঘট ভেঙে গেছে। সবাই নিরাশ, শুধু ননীগোপাল অনশনে অটল। নাকে রবারের নল ঢুকিয়ে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা বিফল হল।  দেড় মাসের অনশনে ও কঙ্কালসার, তবু  তাকে দাঁড় করিয়ে খাড়া হাতকড়ার শাস্তি দেওয়া হল।  কারাবাসের শাস্তি আরও একবছর বাড়িয়ে দেওয়া হল।
    ফের শুরু হল সামুহিক অনশন।  রিপোর্ট বেরিয়ে গেল দেশের কাগজে। একটা তদন্ত হল।
    “ ধর্মঘটের প্রথম পর্ব এইখানেই সমাপ্ত হইল।“
    উপেন্দ্রনাথ লিখছেন,” ননীগোপালকেও অনেক বুঝাইয়া তাহার বন্ধু-বান্ধবেরা আহার করিতে স্বীকৃত করান।“ (পৃঃ ১১৯)।
    কিন্তু সাভারকর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন, উনি ননীগোপালকে বললেন যে তুমি যদি অনশন না ছাড় তাহলে আমিও তিনদিন না খেয়ে থাকব।  বলে নিজে অনশন শুরু করলেন। খবর গোটা জেলে ছড়িয়ে পড়ল। জেল কর্তৃপক্ষকে বোঝালাম কেন অনশন করছি, আমাকে ননীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিন।  তখন আমাকে অনশনের জন্য শাস্তি না দিয়ে জেলার নিজে সঙ্গে করে ননীর সেলে নিয়ে গেলেন।
    উনি গিয়ে ননীগোপালকে বোঝালেন, শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে অনশন করে লাভ নেই। “মেয়েছেলের মত একগুঁয়ে হয়ো না। মরবেই যদি, তো লড়াই করে মর”। [5]
    জীবনীলেখক পুরন্দরে মন্তব্য করেছেন যে ঐ তুলনাটা আজকের দিনে পলিটিক্যালি ইনকরেক্ট বলে গণ্য হবে।
    হরতাল চলেছিল ডিসেম্বর ২০১২ পর্য্যন্ত।  সমঝোতার শর্ত ছিল—হালকা কাজ দেওয়া হবে। ছ’মাস পরে জেলের বাইরেও অন্য পেশা নিয়ে জীবনযাপন করতে দেওয়া হবে। কিছু বইপত্র পড়তে দেওয়া হবে। বাস্তবে এত কিছু হয় নি। তাই পরে আবার দুটো হরতাল হয়েছিলে। সেটা পরে বলছি।
    সাভারকরকে বাইরে না পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল জেলের ভেতরে দড়ি পাকানোর কাজ।
    দাদা বাবারাও প্রথম থেকেই হরতালে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বিনায়ক হরতালে যোগ দেন নি। কেন?
    ওঁর ছিল দুটো যুক্তি।
    এক,
    ওনাদের বছরে একটা করে চিঠি লিখতে দেওয়া হত। উনি ছোটভাইকে যে চিঠি পাঠিয়ে ছিলেন অক্টোবরে তার জবাব আসতে পারে।  তাতে দেশের অনেক খবর থাকে।  সেটা পরে অন্যান্য রাজবন্দীদের মধ্যেও সার্কুলেট করা হবে। তাই ভাই নারায়ণের জবাব আসা পর্য্যন্ত উনি হরতালে যোগ না দেওয়াই শ্রেয় মনে করেছিলেন।[6]
    দুই, policy
    কিন্তু এছাড়া উনি ছিলেন অনশনের লাভ নিয়েও সন্দিহান। ওনার মতে অনশন হল ‘সেলফ-ডিফিটিং’।
    “ I was always against the suicidal policy of hunger strike, as I regarded it as ruinous to the individual and ruinous to the cause’.[7]
     

    [1] বৈভব পুরন্দরে, “সাভারকর, দ্য ট্রু স্টোরি অফ দ্য ফাদার অফ হিন্দুত্ব”, পৃঃ ১৩৫।

    [2]  বৈভব পুরন্দরে, “সাভারকর”, পৃঃ ১৩৬।

    [3] বৈভব পুরন্দরে, ঐ, পৃঃ ১৪১।

    [4] উপেন্দ্রনাথ , “নির্বাসিতের আত্মকথা”, পৃঃ ১১৪।

    [5] পুরন্দরে, “সাভারকর”, পৃঃ ১৪১।

    [6]  সাভারকর, ‘মাই ট্রান্সপোর্টেশন ফর লাইফ”, পৃঃ ১৬৩-৬৪।

    [7] Ibid, pp-177.
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | 2405:8100:8000:5ca1::a7:8255 | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৫:৫৪738451
  • দীপচাড্ডির এই ফেকটা বেশ। সব টোয়িতে অপ্রাসঙ্গিক ইচকিনশট চিটিয়ে বেরায়। পুরো ছাগলচোদা মাল
  • Ranjan Roy | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৯:১০738453
  • তিনজনকেই বলছি।
    এটা সাভারকর এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কিছু পাতা নিয়ে আলোচনার টই।
     প্লীজ, ব্যক্তিগত খিস্তি খেউড় ছেড়ে সাভারকর এবং তাঁর সমকালীন ইতিহাস নিয়ে বলুন। নতুন তথ্য দিন । আমার দেওয়া তথ্যের ভুল দেখিয়ে দিন ।
  • Ranjan Roy | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৪০738486
  • এখানে একটা ব্যাপার আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, একটু গুলিয়ে যাচ্ছে। কেউ বুঝতে পারলে ভুল ধরিয়ে দেবেন।
    বৈভব পুরন্দরে জেলের রেকর্ড এবং সাভারকরের মারাঠিতে লেখা জেলের স্মৃতিকথা “ মাঝি জন্মথেপ” পড়ে জানাচ্ছেনঃ
    ক) স্ট্রাইক চলেছিল ডিসেম্বর ১৯১২ পর্য্যন্ত।
    খ) সাভারকর ভাই নারায়ণের থেকে উত্তর পাবার আশায় অক্টোবর ১৯১২তে হরতালে যোগ দিলেন না, যদি রেকর্ড খারাপ হয়ে ওই চিঠি ওনার হাতে না দেওয়া হয়!
    গ) কিন্তু ডিসেম্বর ১৯১২ নাগাদ তাঁকে প্রথম বার দেশে চিঠি পাঠাতে অনুমতি দেওয়া হয়।[1] সেই চিঠির বিষয়বস্তু, অর্থাৎ উনি ভাইয়ের থেকে পারিবারিক খবরাখবর ছাড়াও দেশের রাজনৈতিক খবর কী কী জানতে উৎসুক ছিলেন সবকিছু  সাভারকর তাঁর স্মৃতিকথায় লিপিবদ্ধ করেছেন।
       তাহলে অক্টোবর ১৯১২ নাগাদ, অর্থাৎ প্রথম চিঠি পাঠানোর দু’মাস আগে, কী করে তার উত্তর পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়?  নিঃসন্দেহে আমার কোথাও বুঝতে ভুল হচ্ছে।

    দ্বিতীয় হরতাল
    ক’টা দিন শান্তিতে কাটল। কিন্তু ননীগোপাল ফের অবিচারের প্রতিবাদে কাজ করবে না বলায় তাকে সুতির বদলে চটের তৈরি কুর্তা আর জাঙিয়া পরার শাস্তি দেওয়া হল। জোর করে আগের জাঙিয়া কেড়ে নিয়ে চটেরটি পরিয়ে সেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল।
    সে ওই জাঙ্গিয়া খুলে ফেলে দিয়ে আবৃত্তি করল “ Naked we came out of our mother’s womb and naked shall we return”.  চিফ কমিশনার আসলে উঠে দাঁড়ায়ও না, সেলামও করে না।
    এদিকে লালমোহন সাহা বলে জনৈক রাজবন্দী কর্তৃপক্ষের কানে তুলল যে বাঈরে যারা কাজ করছে তারা লুকিয়ে লুকিয়ে এমন বোমা বানাচ্ছে যে সেলুলার জেল উড়িয়ে দেবে এবং একটা স্টিমার তৈরি আছে, তাতে করে ভারতে পালিয়ে যাবে।
    হঠাৎ সবাইকে জেল পুলিশ ঘিরে ফেলে খানা তল্লাসি করতে শুরু করল।
    উপেন্দ্রনাথের মতে কিছু বাজে চিঠি আর এক-আধটা কবিতা ছাড়া তল্লাশিতে কিছুই পাওয়া যায়নি।  কিন্তু রাজসাক্ষী কোথা থেকে কিছু গ্রামোফোনের পিন, লোহার পাইপের টুকরো এনে বলল—এগুলো দিয়ে বোমা তৈরির প্ল্যান ছিল। জেলের সতর্কতা বেড়ে গেল। তবে এ নিয়ে আর কোন বিচার হয়নি।
    এইসব ঝামেলায় আগের সুযোগ সুবিধে অনেকটা বন্ধ হওয়ায় দ্বিতীয় ধর্মঘট শুরু হল।  শাস্তি দিতে দিতে কর্তৃপক্ষ হাঁপিয়ে পড়ে যারা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের শাস্তি পান নি, কিছু মেয়াদি শাস্তি পেয়েছেন –তাঁদের বিচারের ভার ডেপুটি কমিশনার লুইস সাহেবের উপর দিল।
    তাঁকে সবাই বললেন যে রাজবন্দীদের সাধারণ কয়েদিদের সুবিধাটুকুও কেন দেওয়া হচ্ছে না? যেমন লেখাপড়া জানলে অফিসে ভাল কাজকর্ম পায়, ওয়ার্ডার বা পেটি অফিসারও হতে পারে। পাঁচ বছর মাসে বারো আনা, দশ বছর পরে দ্বীপের গাঁয়ে নিজস্ব পেশাগত উপার্জনের স্বাধীনতা ইত্যাদি। (উপেন্দ্র, ১২৩)।
    দেখতে দেখতে ধর্মঘট অরাজনৈতিক সাধারণ বন্দীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। জেলের অবস্থা একেবারে নরক গুলজার!
    তখন একদিন জেলার ব্যারি ধর্মঘটিদের হরতাল তুলে নিতে অনুরোধ করে বললেন—নাউ য়ু ক্যান রিট্রিট উইথ অনার!
    কারণ মেয়াদি কয়েদিদের দেশের জেলে ফেরত দেবার প্রস্তাব পাশ হয়েছে। আর যাবজ্জীবন বন্দীরা খালি এখানে থাকবেন। তবে তাঁদের কাজকর্ম এবং খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আগের থেকে ভাল হবে। *
    ধর্মঘটিরা বললেন—তথাস্তু। দু’মাসের মধ্যে যদি সেই বিশেষ ব্যবস্থা দেখা না যায় তাহলে কিন্তু ফের--!
    “এইরূপে উভয় পক্ষে ন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ায় ধর্মঘটের দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত হইল”। (উপেন্দ্র, পৃ ১২৫)।
    “অল্পদিনের মধ্যে আলীপুরের বারীন, হেমচন্দ্র ও আমি, ঢাকার পুলিনবিহারী দাস ও সুরেশচন্দ্র এবং নাসিকের সাভারকর ভাতৃদ্বয় ও যোশী ভিন্ন অপর সকলকে দেশের জেলে পাঠাইয়া দেওয়া হইল”। (ঐ)
    এই সমঝোতার পর যাঁরা রইলেন তাঁরা শান্তভাবে দিন কাটাতে লাগলেন। “যখন পোর্ট ব্লেয়ারে থাকিতেই হইবে তখন আর বেশী গোলমাল করিয়া লাভ কি? ছাড়া পাইবার যখন কোন আশাই নাই ,তখন  মরণের অপেক্ষায় শান্তভাবে দিন কাটানোই ভাল!” (ঐ, পৃঃ ১২৫)
    তৃতীয় হরতাল
    ঝাঁসিওয়ালে পরমানন্দ
    ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বমহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর লাহোর কন্সপিরেসি কেস থেকে গদর দলের প্রায় পঞ্চাশ জনের মত শিখ রাজবন্দী (বাবা পৃথ্বী সিং,  ঝাঁসির পরমানন্দ এবং অধ্যাপক পরমানন্দ), লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা ছোঁড়ার কেসে হিন্দুস্থান রিপাবলিকান দলের  বেনারসের শচীন সান্যাল,   এবং পূর্ব বাংলা থেকে অনুশীলন দলের ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী (মহারাজ) ও আরও অনেকে কালাপানির সাজা পেয়ে সেলুলারে এলেন।
    এঁদের যা দশাসই চেহারা, এই দুটো রুটি, একবাটি ভাত এবং কচুর ঘ্যাঁট খেয়ে পেটের এককোণাও ভরে না।  অল্পদিনের মধ্যেই “জেলের কর্তৃপক্ষগণের সঙ্গে ইঁহাদের নরম গরম খটাখটি বাঁধিয়া উঠিল”। ঝাসির পরমানন্দকে এবং আশুতোষ লাহিড়ীকে গাল দেওয়ায় ওঁরাও  পালটা দিলেন। ব্যাপারটা দু’পক্ষের হাতাহাতিতে দাঁড়াল। দুজনের শাস্তি –তিরিশ ঘা বেত। ধর্মঘট শুরু হল, কিন্তু বেশিদিন চলল না। বারীন্দ্র, উপেন্দ্র, সাভারকরের মত সিনিয়ররা এতে যোগ দেন নি।
    ফের গণ্ডগোল বাঁধল। রোববারের ছুটির দিনেও রাজবন্দীদের উঠোনের ঘাস ছিঁড়তে হবে।
    আমেরিকার ‘গদর’ পত্রিকার সম্পাদক লালা জগতরাম ও তার সঙ্গীরা বেঁকে বসলেন।
    শাস্তি হল ছয় মাস ডান্ডাবেড়ি ও সেলে বন্ধ থাকা।
    একজন বুড়ো শিখ বন্দী বলেন ওঁকে ওয়ার্ডারের দল সেলের ভেতরে ঢুকিয়ে বেদম ঠেঙিয়েছে। কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করলেন। কিন্তু ্দু’দিন পরেই ঊনি রক্ত আমাশা হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন এবং অল্পদিনের মধ্যেমারা গেলেন।  প্রতিবাদে পাঁচ জন অনশন শুরু করলেন। তাঁদের অগ্রণী পৃথ্বী সিং। তাঁকে পাঁচ মাস ধরে জোর করে নাকে রবারের নল দিয়ে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা চলল।
    বেশ কয়েকজন শিখ এই সময় যক্ষা হয়ে মারা গেলেন। বালেশ্বরের বাঘা যতীনের লড়াইয়ের সাথী জ্যোতিষ চন্দ্র পাল  পাগল হয়ে গেলেন। তাঁকে ভারতে বহরমপুরের পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
    লায়ালপুর খালসা স্কুলের শিক্ষক ছত্র সিং।  ধর্মঘটের সময় একদিন উত্তেজিত হয়ে জেল সুপারিন্টেন্ডেন্টের গায়ে হাত তোলেন। প্রহরীরা তাঁকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলল। তাঁর শাস্তিস্বরূপ বারান্দার এককোণে জাল দিয়ে তৈরি খাঁচা বানিয়ে তার মধ্যে দু’বছরের বেশি সময় বন্ধ করে রাখা হল। খাঁচার মধ্যেই শোয়া বসা, পেচ্ছাপ পায়খানা! মর মর অবস্থায় দু’বছর পরে খাঁচা থেকে বের করা হল। (উপেন্দ্র, ১২৮)।  
    তারপর লাঠিচার্জে ভান সিং প্রায় মৃত্যুমুখে, পরে মারা যান। প্রতিবাদে জেনারেল স্ট্রাইক ডেকে ৭০ জন ধর্মঘটে যোগ দিল।
    বর্মা থেকে বন্দী পণ্ডিত রামরক্ষা জেলের মধ্যে তাঁর পৈতে কেড়ে নেওয়ায় অনশনে বসে প্রাণ দিলেন।
    মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে চলায় জেল কর্তৃপক্ষের একটু বোধহয় টনক নড়ল। অনেককে একটু সহজ কাজ দেওয়া হল। বহুদিন সলিটারি কনফাইনমেন্টের কারণে ক্রনিক মাথার যন্ত্রণায় ভোগা জগতরামকে দড়ি পাকানোর কাজ দেওয়া হল। এখানে সম্পত এবং পুরন্দরে ঝাঁসিওয়ালে পরমানন্দের ঘটনাটির সঙ্গে আর্য সমাজী ভাই পরমানন্দকে গুলিয়ে ফেলেছেন।
    দয়ানন্দ কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক ভাই পরমানন্দকে, ধর্মঘটে যোগ না দেওয়ায়, হাসপাতালের কম্পাউন্ডার করে দেওয়া হয়েছিল। কিছুদিন পরে ওনার স্ত্রী স্বামীর চিঠিতে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে দেশের পত্রিকায় রাজবন্দীদের দুর্দশা নিয়ে চিঠি লিখলে ভাই পরমানন্দকে হাজতে পোরা হল।
    তৃতীয়বারের ধর্মঘটের ফলে সরকারের সঙ্গে রাজবন্দীদের  “যে রফা হইল তাহার মোদ্দা কথা এই যে আমাদের চৌদ্দ বছর কালাপানির জেলে বন্ধ থাকিতে হইবে। চৌদ্দ বছর পর আমাদের জেলের বাহিরে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে আর তখন আমাদিগকে কয়েদীদের মত পরিশ্রম করিতে হইবে না। জেলখানার  ভিতরেও আমরা বাহিরের কয়েদীর মতো নিজে নিজে আহার রাঁধিয়া খাইতে পারিব ও বাহিরের কয়েদীর মতো পোশাক পরিতে পারিব। অর্থাৎ জাঙিয়া, টুপি ও হাতকাটা কুর্তা না পরিয়া কাপড় ও হাতওয়ালা কুর্তা পরিতে পারিব”।
    আরও আছে। মাথায় পাগড়ি জড়ানো যাবে।
    সবচেয়ে বড় কথা, আগামী দশবছর গুড কন্ডাক্ট -- ধর্মঘটে যোগ না দেওয়া এবং জেলের কর্তাদের সঙ্গে ঝগড়া না করলে  তারপর আরও সুবিধে দেওয়া হতে পারে।(পৃঃ ১২৯)।
    বারীন্দ্র পেলেন বেতের কারখানার সুপারভাইজারি, হেমচন্দ্র লাইব্রেরিয়ান এবং উপেন হলেন তেলঘানির ফোরম্যান।
    হেমচন্দ্র ভাল রাঁধতে পারতেন। ফলে বাঙালী বন্দীরা নিজেদের কিচেন জমিয়ে নিলেন।
    সাভারকরদের পরিশ্রম হালকা করা হল বটে, কিন্তু বিশ্বাস করে জেলের বাইরে খোলা জায়গায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হল না।  বাইরে কাজ করার সময় এঁরা পেতেন মাসিক বারো আনা। কারণ, জেলের বাইরে নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা নিজেদের করতে হত।
     কিন্তু দুধের  জন্যে আট আনা কেটে নেওয়া হত। ফলে চার আনায় মাস চালাতে হত। অনেক লেখালেখির পর সেটা এক টাকা হল। মানে, মাসে আট আনায় সংসার চালাও! (পৃঃ ১৩১)।
    সাভারকর হরতালে যোগ না দিলেও বাইরের কাজ পেলেন না। অনেক পরে ১৯২০ নাগাদ উনিও তেলঘানির ফোরম্যান হয়েছিলেন। [2]
    ক্ষুব্দ সাভারকর হড়তাল করে কিছু সুবিধে পাওয়া  বাঙালী রাজবন্দীদের সম্বন্ধে  লিখলেন –“ এরা মাসোহারা পেয়ে কৃতজ্ঞতায় এমন গলে গেছে যেন ভিখিরি থেকে লাখপতি হয়ে গেছে। যা চায় তার জন্যে  কর্তৃপক্ষের জী হুজুরি করে”।
    তাতে সাভারকরের পক্ষপাতী ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার অবাক হয়ে লিখলেন—“ এ তো অন্য রাজবন্দীদের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ!  আমি  ওই অভিযোগের পক্ষে কোন সাক্ষী বা অন্য প্রমাণ পাই নি। সাভারকরও কোন প্রমাণ বা কোন ঘটনার উদাহরণ দেন নি। বলা মুশকিল, সাভারকরের ওই অভিযোগ কতখানি নায্য। তবে ওই সময়ের একটু পরেই সেলুলার জেলে আসা এক রাজবন্দী একই অভিযোগ বারীন, সাভারকর আদি পুরনো কয়েদিদের একটা গ্রুপের ব্যাপারে করেছেন”। [3]

    ত্রৈলোক্যনাথ  বলেছিলেন,  সেলুলার জেলের বন্দীদের মধ্যে ‘নরম’ এবং ‘গরম’ দুটো ভাগ হয়ে গেল। সাভারকর ভাইয়েরা এবং বারীনবাবুরা অনেক আগে এসেছেন, অনেক কষ্ট সহ্য করে এখন কিছু সুবিধে পেয়েছেন। এখন ওঁরা জেলার এবং সুপারিন্টেন্ডেণ্টের প্রিয়পাত্র হয়েছেন। তাঁরা এখন সেসব সুবিধে ছেড়ে দিয়ে আমাদের লড়াইয়ে সামিল হতে রাজি হলেন না। [4]

    পরে সাভারকরের দাদা বাবারাও এবং বামনরাও জোশী রান্নাঘরে ট্রান্সফার হয়ে সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের রান্নার দায়িত্ব পেলেন। কিন্তু বিনায়ক সাভারকরকে দড়ি পাকানোর একঘেয়ে কাজই করে যেতে হল। কারণ জেলার ব্যারির মতে আন্দামানের সব গোলমাল পাকানোর নাটের গুরু ওই সাভারকর! একে কোন দয়া করা হবে না। (সাভারকরের আন্দামানের স্মৃতিকথা, পৃঃ ২৫৬-৫৭।)
    যুদ্ধ বাঁধার অল্পদিন পরেই ‘কর্তাদের মুখ যেন শুকাইয়া গেল। কয়েদীদের তাড়া করিবার প্রবৃত্তি বড় বেশী রহিল না।

    “জেলে ঘানি চালানো বন্ধ হইয়া গেল। শেষে যখন কয়েদীদের নিকট হইতে নানারূপ প্রলোভন দেখাইয়া যুদ্ধের জন্য টাকা সংগ্রহ ( ওয়ার লোন)  করা হইতে লাগিল তখন পোর্ট ব্লেয়ারে গুজব রটিয়া গেল যে, ইংরাজের দফা রফা হইয়া গিয়াছে। জেলের দলাদলি ভাঙিয়া গিয়া শত্রুমিত্র সবাই মিলিয়া জার্মানীর জয় কামনা করিয়া  ঘন ঘন মালা জপিতে লাগিল। জার্মানীর বাদশা নাকি হুকুম দিয়াছেন যে, সব কয়েদীকে ছাড়িয়া দিতে হইবে”। (ঐ  , পৃঃ ১৩২-৩৩)।
    শেষে যখন এমডেন জাহাজ এসে মাদ্রাজ বন্দরে তোপ দেগে চলে গেল সেই খবর আর কয়েদিদের মধ্যে লুকিয়ে রাখা গেল না।
    জেলার কয়েদীদের জন্য টাইমস্‌ সাপ্তাহিক পড়তে দিতেন। তাতে বলা বাহুল্য, ইংরেজের জয়ের খবরের প্রচার থাকত। কিন্তু ওদের প্রতিদিন যত মাইল করে অগ্রগতির রিপোর্ট বেরোত সে সব সত্যি হলে ওদের কয়েক মাসের মধ্যে জার্মানী পেরিয়ে পোল্যান্ডে পৌঁছে যাওয়ার কথা।
    কিন্তু কোথায় পোল্যান্ড? রাইন নদী পেরোনোরও কোন খবর নেই!
    নতুন কিছু কয়েদী এসে গুজব ছড়ালো যে ওরা দেশের থেকে শুনে এসেছে যে এমডেন জাহাজ এসে সেলুলার জেলখানা ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্ত করে সঙ্গে নিয়ে গেছে।!
    কিন্তু সেলুলার জেলে বন্দীদের চর্মচক্ষে দেখেও ওরা গুজবটাকে মিথ্যে বলে মানতে চাইল না। ওরা যে দেশে থাকতে বিশ্বস্ত সূত্রে শুনে এসেছে!
    এর পর এল পাঠান ও শিখ পল্টনের অনেক লোক, সবাই বিদ্রোহের অপরাধে বন্দী। কেউ কেউ মেসোপোটেমিয়া থেকে বন্দী হয়ে এসেছে।
     গদর পার্টির শিখেরা আসায় সরকার হাঙ্গামার ভয়ে জেলের মধ্যে পাহারা দেবার জন্য অনেক দেশী ও বিলেতী পল্টন নিয়ে এলেন।
    মুসলমান কয়েদীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল চমৎকার সব গল্প। যেমন জনৈক যোদ্ধা এনভার বে’র দৈবশক্তির কথা।  ওনার সামনে নাকি খোদার কুদরতে তোপের মুখ বন্ধ হয়ে যায়! তিনি নাকি পক্ষিরাজ ঘোড়ায় চড়ে মুলতান শরিফে এসে জগৎব্যাপী মুসলমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আশা দিয়ে গেছেন।  “জার্মানীর বাদশাও নাকি কলমা পড়িয়া মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করিয়াছেন”। (ঐ , পৃঃ ১৩৪)।
    গদর পার্টির শিখরাজবন্দীদের নিয়ে সমস্যা শুরু হল। ওরা আমেরিকায় রুটি মাংস খেয়ে এসেছে। এখানে ওসব কিছুই পায়না আর জেলের খোরাকে পেটও ভরে না। তারপর  লম্বা চুল ধোয়ার সাজিমাটি ও সাবান দেয়া হয় না।
    “এবারের ধর্মঘটে যে সকল নেতা শিখদিগকে ধর্মঘট করিবার জন্য উত্তেজিত করিলেন তাঁহারাই  কার্যকালে সরিয়া দাঁড়াইলেন। শেষে দলাদলির সৃষ্টি হইয়া ধর্মঘট ভাঙিয়া গেল।“ ( ঐ, পৃঃ ১৩৫)।
     
    এরপর ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে জার্মানি পরাজিত হল, ইংল্যান্ড বিজয়ী। শ্বেতজাতির দুনিয়ায় আনন্দ উৎসব শুরু হল।
    সেলুলার জেলের রাজবন্দীদের মধ্যে একটা খবর এল যে    সেই আনন্দে নাকি ইংল্যান্ডের সম্রাট অ্যামনেস্টি ঘোষণা করা হবে। রাজবন্দীরা  দেশে বা অন্ততঃ দেশের জেলে ফিরে যেতে ফিরে যেতে পারবেন। ভাল খাওয়া দাওয়া, পরিশ্রমের থেকে মুক্তি এবং আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সুবিধে! 
    তাঁরা আশায় বুক বাঁধলেন।
    সেই আদেশ আর আসে না। প্রথমে ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলের রাজবন্দীদের জন্যে এল। তারপরে একদিন আন্দামানের বন্দীদের জন্যেও এল। কেউ ছাড়া পেলেন, কেউ বা ভারতের জেলে ফিরে চললেন। বাদ পড়লেন সাভারকর ভাইয়েরা এবং আরও দু'একজন--যেমন ঝাঁসিওয়ালে পরমানন্দ। 
     তাঁদের  জন্যে  আরও সময় লাগল।
    ( পরের কিস্তিতে বিতর্কিত মাফিনামা, কারা দিয়েছিলেন এবং তাতে কার কী লাভ হয়েছিল, আদৌ হয়েছিলে কিনা।)

    [1] সাভারকর, “অ্যান ইকো ফ্রম আন্দামান”, পৃঃ ২০।

    [2] আর সি মজুমদার, “ পিনাল সেটলমেন্টস ইন আন্দামান”, পৃঃ ২৩২।

    [3]  ঐ ।

    [4] ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, “জেলে তিরিশ বছর”, পৃঃ ১০৫।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন