এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • এক যে ছিল ট্রাম / পর্ব - ১

    Tirtho Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ আগস্ট ২০২২ | ২০০ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)
  • এক যে ছিল ট্রাম
    পর্ব - ১

    "শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ,
    কলকাতা এখন
    জীবনের জগতের প্রকৃতির
    অন্তিম নিশীথ"


    এক গ্রীষ্মের বিকেল হবে - সন্ধ্যা নামার খানিক আগে | আগের দিন কালবৈশাখী সহ বৃষ্টি হওয়াতে গরম টা একটু কম | বেহালা ব্লাইন্ড স্কুল | রবিবারের বিকেল | তাই রাস্তায় ভীড় কম | এক মাস ও হয়নি | পশ্চিম বাংলায় ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নতুন সরকার গঠন করেছে তৃণমূল কংগ্রেস | ৩৪ বছর পর বামফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটেছে | আমি দাঁড়িয়ে আছি, ডায়মন্ড হারবার রোড পেরিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যাবো |
    এমন সময় একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম সেই বিকেলের পড়ে আসা ফিকে আলোয় | বড়ো বড়ো কয়েকটা কন্টেইনার ট্রাক আসছে বেহালা চৌরাস্তার দিক থেকে | আর সেই ট্রাকের খোলা পিঠে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে কিছু ট্রামের বগি | উল্টে পড়ে থাকা অসহায় ট্রামের বগিগুলোর সারি-সারি খোলা জানলাগুলো যেন এক একটা ফেলে আসা সময়ের ঝাঁপি - এই শহরের গল্প- কথা, আমাদের মতন শেষ প্রজন্মের লোকেরা যাদের দৈনন্দিন যাতায়াতে একটা সময় ট্রাম অপরিহার্য ছিল, তাদের কাহিনী |

    কোনো একটি ট্রামের বগির সিলিঙে দাড়ি দিয়ে বাঁধা ঘন্টা টা কেউ হয়তো খুলতে ভুলে গেছিলো | তাই ট্রাকের ঘর-ঘর শব্দের সাথে সাথে ওই উল্টে পড়া বগির থেকে টং টং শব্দ মিশে একটা অদ্ভুত ঝংকার তৈরী হয়েছিল | শুধু আমি না, রাস্তার দু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি অটো, রিক্সা, সাইকেল, বাইক, পথচারী, হকার সবাই দেখছিলো এই অদ্ভুত শোভাযাত্রা | ট্রাক গুলো ধীরে ধীরে আমাকে, আমাদেরকে পেরিয়ে চলে গেলো | সঙ্গে নিয়ে গেলো একগাদা অচল সময়ের লাশ |

    এক যুগের পতন, আরেক যুগের শুরু - রাজনৈতিক ভাবে, সামাজিক ভাবে, সাংস্কৃতিক ভাবে | কলকাতাকে জুড়ে ফেলার যে মানচিত্র আঁকা হয়েছে নতুন, দ্রুতগতির পাতাল রেল দিয়ে, তাতে পুরোনো, জরাজীর্ণ, ধুঁকতে থাকা শ্লথ ট্রামেদের কোনো স্টপ থাকার কথা নয় | ঢেলে সাজানো হবে এ শহরকে | চারিদিকে তাই সাজ-সাজ রব | ভীষণ চেনা পুরোনো বিংশ শতাব্দীর নড়বড়ে, চনমনে পুরোনো কলকাতা টা ঝকঝকে , চকচকে একবিংশ শতাব্দীতে ঢুকে যাচ্ছে | সেই মুহূর্তটা, সেই বিকেলের পড়ে আসা ফিকে আলোয় মনে হয়েছিল এ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, ব্যক্তিগত ও সামাজিক, উভয় চেতনাতেই |

    এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধি আন্দোলন

    একটু ফিরে যাওয়া যাক বিশ শতকের সেই উত্তাল বছরগুলিতে যখন সদ্য জন্ম নেয়া এই পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে জেরবার | ব্রিটিশরা রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেদের দেশে পাড়ি জমালেও, ব্রিটিশ পুঁজি ভারতবর্ষে, বিশেষত কলকাতা ত্যাগ করেনি তখন | The Calcutta Tramways কোম্পানিটি ছিল তেমনই একটি ব্রিটিশ অধিকৃত সংস্থা | স্বাধীনতা-উত্তর সেই সময় ট্রাম হয়ে উঠেছিল কলকাতার মুখ্য জন-পরিবহন সংস্থা | বিশেষত ছাত্র-যুবাদের কাছে এর জনপ্রিয়তা ছিল অপরিসীম |

    ১৯৫৩ সালের ২৫ শে জুন The Calcutta Tramways তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্যে এক পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করে | এর আগে ১৯৪৭ এ প্রথম শ্রেণীর ভাড়া বৃদ্ধি করতে চাইলেও বেশ শোরগোল হয় | সদ্য গঠিত রাজ্য সরকার সেইসময়ে প্রাক্তন বিচারপতির দ্বারা একটি কমিশন গঠন করে যারা সব দিক খতিয়ে দেখে এর বিরুদ্ধে রায় দেয় | তা সত্ত্বেও ১৯৪৯ এ The Calcutta Tramways প্রথম শ্রেণীর ভাড়া বৃদ্ধি করে | তা নিয়ে প্রবল প্রতিবাদ হলেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল | এর মধ্যে আরো কয়েকটি বছর কেটে গেছে |

    কলকাতা শহরে পিল-পিল করে প্রবেশ করছে ছিন্ন-মূল মানুষ ওপার বাংলা থেকে | কলোনি গড়ে উঠছে শহরের প্রান্তসীমা গুলোতে, বিশেষ করে দক্ষিণ শহরতলি তে | তা নিয়ে মাঝে-মধ্যেই সংঘর্ষ বাঁধছে | এই উদ্বাস্তু স্রোত সামলাতে না পেরে ভেঙে পড়ছে কলকাতার পারিকাঠামো ব্যবস্থা | বেকারি বেড়ে গেছে কয়েক গুণ | শহরের আদি অধিবাসী বা নব্য, কেউই খুশি নয় | বিক্ষোভ তলে তলে বাড়ছিলোই সমাজের, শহরের বিভিন্ন স্তরে | এই সময় ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়া বৃদ্ধি ঘোষণা | পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তাতে সমর্থন জানায় | যে বিক্ষোভের বারুদ তলে তলে জ্বলছিল তাতে বিস্ফোরণ ঘটে এবার | কলকাতা ফেটে পড়লো প্রতিবাদে |

    " ট্রামের ভাড়া বাড়ায় কে, ব্রিটিশ কোম্পানি আবার কে "

    এই সময় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা ক্রমশ কমতে থাকে | শহরের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে সামলাতে না পারায় | এই সুযোগের পুরোপুরি সদ্ব্যাবহার করে বিরোধী আসনে থাকা বাম-পন্থী পার্টিগুলো | ট্রাম-ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ-কে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসে তারা | ফরওয়ার্ড ব্লকের বর্ষীয়ান নেতা হেমন্ত বসুর নেতৃত্বে গঠিত হয় ট্রাম ও বাস ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ কমিটি যাতে আরো ছিলেন জ্যোতি বসু, সুবোধ ব্যানার্জি, সুরেশ ব্যানার্জি প্রমুখ বিরোধী বিধান সভার সদস্য-বৃন্দ | ট্রাম কোম্পানি ১লা জুলাই থেকে বর্ধিত ভাড়া চালু করার বিজ্ঞপ্তি দেয় |

    প্রতিরোধ কমিটি প্রথম দিনেই তার বিরোধিতার ডাক দেয় | প্রঙ্গত উল্লেখযোগ্য, বাম-পন্থীরা এই প্রতিরোধ কমিটি গড়লেও, এই অসন্তোষ পার্টি-রাজনীতি নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এই প্রতিবাদের সমর্থনে পথে নামেন | হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক সারা শহর জুড়ে যাত্রীদের বোঝাতে পথে নামেন যাতে তারা এই বর্ধিত ভাড়া না দেয় | ছেলেপুলেরা কোনো একটি স্টপে ট্রামে উঠে গিয়ে যাত্রীদের কাছে নিবেদন করতো বর্ধিত ভাড়া না দেবার, তারপর দু কি তিন স্টপ পরে নেমে গিয়ে আবার পরের ট্রামটি তে উঠতো | পরের দিনে থেকে আরো অভিনব পন্থা গ্রহণ করা হয় | প্রতিরোধ কমিটির সমর্থকরা পুরোনো ভাড়া গুনে গুনে কন্ডাক্টরদের হাতে দিতেন বা অন্য যাত্রীদের সাহায্য করতেন যাতে কন্ডাক্টর বেশি ভাড়া না নিতে পারে |

    অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় এই অবস্থা সামলাতে কড়া দাওয়াইএর হুঁশিয়ারি দেন | ৩ জুলাই প্রতিরোধ কমিটি পিকেটিং, মিছিল শুরু করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে | প্রতিরোধ কমিটির নেতা জ্যোতি বসু, গনেশ ঘোষ, সুবোধ ব্যানার্জি সহ প্রায় ৬০০ জন কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ | প্রতিরোধ কমিটি ৪ জুলাই হরতালের ডাক দেয় কলকাতায় | দলে দলে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে প্রতিরোধ কমিটির সমর্থনে ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে | তাদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় শহর জুড়ে সংঘর্ষ ঘটতে থাকে | এর মধ্যে আশুতোষ কলেজের ভেতর ঢুকে পুলিশ লাঠি চালালে বেশ কিছু ছাত্র আহত হয় | এরপর জনতা কে সামলানো মুশকিল হয়ে পরে | সারা শহরে অবরোধ, ব্যারিকেড ও পিকেটিং চলতে থাকে | প্রতিরোধ কমিটি ট্রাম বয়কটের ডাক দেয় | মানুষ ট্রামে ওঠা সত্যি বন্ধ করে দেয় | কলকাতা ও হাওড়াতে ফাঁকা ট্রাম চলতে দেখা যায় যা তাখানার দিনে অভূতপূর্ব ছিল |
    (ক্রমশ:)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন