ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  অন্য যৌনতা

  • যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং তাদের সমস্যা

    সূর্যদীপ্ত নাগ
    অন্য যৌনতা | ০৪ জুলাই ২০২২ | ৩৬৩ বার পঠিত
  • ছবি -


    পাখির চোখে দেখা: কী চাইছি, কী পাচ্ছি



    মূলস্রোতের বাইরের লিঙ্গ-পরিচয় এবং যৌন-প্রবণতা নিয়ে খুব বেশি যে কাজ হয়েছে এমন নয়। তাই আপাত উদারবাদী এবং বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে ইচ্ছুক মানুষজনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘যৌন সংখ্যালঘু’ কী জিনিস, তা খায় না মাথায় দেয়, ইত্যাদি মোটেই বোঝেন না। কিন্তু ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’ কী তা তারা বিলক্ষণ বোঝেন! তাই লেখার শুরুতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ধারণাকে রেফারেন্স করেই বরং “লিঙ্গ-পরিচয় এবং যৌন-পরিচয়ের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী”র সমস্যা কোথায় তা বোঝার চেষ্টা করি।

    ধরুন, আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমস্যা কী কী’, তাহলে আপনার উত্তর কী হবে? চেষ্টা করে দেখুন, দেখবেন ব্যাপারটা সম্পর্কে যাই বলুন, বেশিরভাগটাই বাদ থাকছে। (একটু অসাবধান থাকলে দেখবেন কোনো একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যাকেই আপনি সমস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমস্যা ভেবে গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন)। কারণ আর কিছুই না, এই প্রশ্নটাই একটা ভুল প্রশ্ন! ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’ বললে আস্ত এবং অবিভাজ্য বস্তুকে বোঝায় না। বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পার্সি, মুসলমান, জৈন, শিখ এবং অজস্র ট্রাইবাল ধর্মের অবলম্বনকারীর প্রত্যেকেই ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু। কিন্তু, সংখ্যালঘু হিসেবে খ্রিস্টানের সমস্যা আর পার্সির সমস্যা কি এক? নাকি, একজন বৌদ্ধ যেসব অসুবিধা ফেস করে আর একজন মুসলমান যে যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তাদের মধ্যে মিল-অমিল কতটা? তার চেয়েও বড় কথা হল, উপরোক্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সকলেই যে খুব সৌহার্দ্যপূর্ণ চোখে দেখেন পরস্পরকে এমনটাও সবসময় নয়। অর্থাৎ, তাদের সকলকে শুধুমাত্র ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’ হিসেবে ভাবলে কাজ করার একটা কমন গ্রাউন্ড প্রায় পাওয়াই যাবে না। তাহলে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমস্যা’ বলে কি কিছু হয় না? না না, অবশ্যই হয়! আলবাত হয়! কিন্তু প্রশ্নটার উত্তর নির্ভর করছে একজন মানুষ কোন ধর্ম অবলম্বন করে সংখ্যালঘু – তার উপর। অর্থাৎ, তার সংখ্যালঘুত্ব যাপনের অভিজ্ঞতা বা লিভড এক্সপিরিয়েন্স কেমন হতে পারে – তা ধর্ম ভেদে আলাদা আলাদা হবে।

    একইরকমভাবে আপাতদৃষ্টিতে এবং বাইরের লোকের চোখে (অর্থাৎ যারা ইনসাইডার নন, বা ইনসাইডারদের সাথে ভালো করে মেলামেশা করেননি) LGBTQIA+ (লেসবিয়ান গে বাইসেক্সুয়াল ট্রান্স কুইয়ার ইন্টারসেক্স অ্যাসেক্সুয়াল এবং অন্যান্য) একটা বৃহৎ ক্যাটেগরি হলেও এদের প্রত্যেকেরই সমস্যাগুলো আলাদা – যদিও কিছু ওভারল্যাপের জায়গাও থাকে। এই বৃহৎ এবং পৃথক গোষ্ঠীদের একসাথে আনার একটা সাধারণ যোগসূত্র হল, এঁরা মূলধারার যে সংখ্যাগুরু লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয় – হেট্রোসেক্সুয়াল এবং সিসজেন্ডার বা বিষমকামী এবং স্বীয়লৈঙ্গিক – এই পরিচয়গুলো এঁদের নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মত এই বর্গগুলির মধ্যে সম্পর্ক হয়তো সবসময় বৈরিতার নয় (যদিও সেটাও থাকতেই পারে), তবুও প্রত্যেকের সমস্যার লিস্ট এতটাই আলাদা এবং ডিস্টিংক্ট, যে এদেরকে সবসময় একসাথে একটিমাত্র বর্গ হিসেবে দেখাটাই অনেক সময় হয়ে দাঁড়ায় সমস্ত সমস্যার মূল।

    আবার এই LGBTQIA+-এর অন্তর্গত প্রত্যেকটা বর্গের সমস্যাগুলো খানিকটা ভার্টিক্যালিও পৃথক। ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক তুলনাটাকেই বরং আরো একধাপ টানি। ধরুন, হায়দ্রাবাদের কোনো অভিজাত এবং অর্থবান মুসলিম পুরুষ একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবেন, আর আসামের কোনো তস্য গরীব মুসলমান বাচ্চা ছেলের যে অভিজ্ঞতা হবে – দুটো কি এক হতে পারে? আশা করি বুঝতে পারছেন আমার ইঙ্গিত কী। যৌনতা (sexual preference অর্থে) বা লিঙ্গ পরিচয় (gender identity অর্থে) এর দিক থেকে একই ক্যাটাগরির হলেও কোনো মানুষের সমস্যা এবং অভিজ্ঞতা তার শ্রেণী, বয়স, কাস্ট, পারিবারিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয়, জাতি, সে কোন রাজ্যের বাসিন্দা, কোন ভাষায় কথা বলে ইত্যাদি অনুযায়ী আলাদা আলাদা হয়। আকাদেমিক ভাষায় যাকে বলে ইন্টারসেকশানালিটি।

    ভূমিকাটা একটু বেশিই বড় হয়ে গেল হয়তো, কিন্তু এই লম্বা ভূমিকা ছাড়া আমি কিছুতেই নিজের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে পারতাম না। আগেই বলেছি যে LGBTQIA+ বলতে যাদের বোঝায়, তাদের সমস্যা এবং প্রয়োজনগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন ধরনের। যেমন ধরুন, একজন স্পষ্টতই ট্রান্স ব্যক্তি, যার লিঙ্গগত অভিব্যক্তি মূলধারার অভিব্যক্তির থেকে আলাদা, তাকে দেখামাত্র আপনি বুঝে যাবেন যে সে আর পাঁচজন মানুষের থেকে পৃথক। অর্থাৎ, সে যে চিরাচরিত লিঙ্গ-যৌন পরিচয়ের খোপের মধ্যে পড়ে না, সেটা তাকে দেখে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানে, এক কথায় বলতে গেলে, তার ভিজিবিলিটি আছে। কিন্তু একজন সমকামী/উভকামী পুরুষ বা নারীর হামেশাই সেটা থাকে না। তাই, একজন ভিজিবলি ট্রান্স মানুষ যে ধরনের সমস্যা ফেস করেন, তার অনেকটাই সেই ভিজিবিলিটি সংক্রান্ত। অন্যদিকে সমকামী/উভকামীদের সমস্যাটা আকছার অন্যদের থেকে আলাদা হয়েও দৃশ্যত তাদের থেকে অভিন্ন হওয়ার।

    একজন ট্রান্স মানুষ প্রচুর প্রত্যক্ষ ভায়োলেন্সের শিকার হন এবং এর বেশ কিছুটা হয় খোদ নিজের বাড়িতেই (বাড়ির লোকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ঘর ছেড়েছেন এমন ট্রান্স মানুষের সংখ্যা কিছু কম নয়)! এছাড়া স্কুল-কলেজ এবং কাজের জায়গাতে বৈষম্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটতেই থাকে তাদের সাথে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময়ই এমপ্লয়াররা তাদের নিতে চান না। অর্থাৎ, এক কথায় বলতে গেলে, সমাজ তাদের সরাসরি এক ঘরে করে দেবার চেষ্টা করে।

    ট্রান্স মানুষদের ক্ষেত্রে আরেকটা অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হচ্ছে অর্থনৈতিক শোষণ। সহপাঠীদের হাতে দিনের পর দিন হেনস্থা এবং অনেক ক্ষেত্রে খোদ স্কুল কর্তৃপক্ষের দ্বারা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হতে ক্লান্ত কেবল ট্রান্স মানুষ নয়, লিঙ্গ নামক পার্ফর্ম্যান্সে যারা দৃশ্যতই মূলধারার থেকে আলাদা, তাদের অনেকেই সময়ের আগে স্কুল ছেড়ে দেয়। কাজ পাওয়ার কম্পিটিশনে তাই শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক দিয়েও পিছিয়ে পড়ে তারা। স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে। তখন তাদেরকে নির্ভর করতে হয় কয়েকটি এনজিও/সিবিও এবং বিভিন্ন ট্রান্স কমিউনিটির উপর। এ সব জায়গাতে অনেক সময় কাজ করিয়ে নিয়ে যথাযথ পারিশ্রমিক না দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যেকটা জায়গাতেই ঘটে এমনটা বলছি না, কিন্তু এমন উদাহরণ আছে প্রচুর।

    ট্রান্স কমিউনিটির সদস্যদের বেশিরভাগেরই অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই শোচনীয়, যে তাঁদের অন্যান্য প্রয়োজনগুলো সামনে আসেই তুলনামূলকভাবে কম। যারা বাড়ির লোকের সাথে থাকেন, তাঁরা অন্তত অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার আগে পর্যন্ত বাড়ির লোকজনের সঙ্গে অশান্তি এবং বাড়ির থেকে নানারকম মানসিক চাপ দেওয়ার ঘটনা যে প্রতিনিয়তই ফেস করে থাকেন সেটাও আলাদা করে বলার কিছু নেই। এটা একজন মানুষের মানসিক সুস্থতাকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে সেটা আশা করি একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন।

    ট্রান্স মানুষদের মধ্যেও সমস্যাগুলো যথেষ্ট বিভিন্ন। ট্রান্স পুরুষ এবং ট্রান্স মহিলাদের লড়াইটা একদমই আলাদা। আর হ্যাঁ, LGBTর মধ্যে T কিন্তু কিছুটা আলাদা, কারণ এটি একটি জেন্ডার ক্যাটেগরি বা লিঙ্গপরিচয়-ভিত্তিক গোষ্ঠী।

    LGB নির্দেশ করে মানুষের যৌন পছন্দকে। তাদের ক্ষেত্রে সমস্যার ধরনগুলিও বেশ পৃথক। একজন সমকামী/উভকামী পুরুষ বা নারীকে আর পাঁচজনের থেকে দৃশ্যত পৃথক করা যায় না বলে তাদের চাকরি-বাকরি পেতে বা সমাজপ্রদত্ত অন্যান্য সুযোগ সুবিধাগুলো ভোগ করতে আলাদা করে আপাতদৃষ্টিতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু, এই দৃশ্যত indistinguishable থাকার মাশুল তাদের গুণতে হয় অন্যভাবে। তাদের অনেকেই মনের মধ্যে কাজ করতে থাকে যেকোনো মুহূর্তে এসব প্রিভিলেজ বা সুবিধে হারিয়ে মার্জিনালাইজড বা কোণঠাসা হয়ে যাবার ভয়। ফলে অনেকেই সাধারণত বাইরের জগতের কাছে হেটারোসেক্সুয়াল হওয়ার অভিনয় করতে বাধ্য হয়। এমনকি যারা পরবর্তীকালে খোলাখুলিভাবে নিজেদের সমকামিতা বা উভকামিতার কথা জনসমক্ষে ঘোষণা করেছেন, তাদেরও অধিকাংশই জীবনের একটা সময় পর্যন্ত এই অভিনয়টা করতে বাধ্য হয়েছেন। আর, সকলেই মুখোশ খুলে বেরিয়ে আসার মত সাহস অর্জন করতে পারেনও না। এমনকি, সকলের সেই পরিস্থিতিও থাকে না। কিছুদিন আগে একটি মুসলিম ছেলের কথা শুনেছিলাম, যে বাড়িতে আউট হওয়ার পর থেকে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তার পরিবার পুরোদস্তুর অনার কিলিং এর কথা ভাবছিল (তবে এটা অবশ্য ধারা ৩৭৭ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় বেরোনোর আগের ঘটনা)। আশা করি বুঝতে পারছেন, একজন মানুষের পক্ষে আউট হওয়ার পথে বাধাটা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে?

    যাইহোক, এই একটানা অভিনয় হামেশাই একজন সমকামীর মধ্যে জন্ম দেয় ক্লান্তি, লজ্জা এবং আত্মগ্লানির। এছাড়া যাদের ধর্মে সমকামিতা পাপ হিসেবে বিবেচিত, তাদের ক্ষেত্রে অন্য একটা অপরাধবোধও কাজ করে। এর থেকে প্রচুর লোকে চেষ্টা করে নিজের সত্ত্বাকে অস্বীকার করার এবং নিজেকে বদলানোর। এই চেষ্টাটা অনেকটাই নিজের বাপ-মা কে বদলে ফেলার চেষ্টার মতই – অর্থাৎ সাফল্যের সম্ভাবনা কার্যত শূন্য।

    এছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে। যৌন পছন্দ বাইরে থেকে বোঝা যায় না বলে এই গোষ্ঠীর অনেকের রোম্যান্টিক পার্টনার খুঁজে পেতেও অসুবিধা হয়। এছাড়া, এই জগতে প্রেম-ভালবাসা-যৌনতার বেশিরভাগটাই লুকিয়ে-চুরিয়ে হয় বলে, এবং আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট কম বলে, বিভিন্ন রকম অপরাধের ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে প্রতারণা এবং ব্ল্যাকমেইল ভীষণ কমন একটা ব্যাপার। ভিকটিমও প্রায়শই যৌন পরিচয় প্রকাশ্যে এসে যাওয়ার ভয়ে পুলিশের কাছে যান না। আর, এইসব মিলে জন্ম দেয় নানান রকম মানসিক রোগের – বিশেষ করে ডিপ্রেশন বা অবসাদ এবং অ্যাংজাইটির। মনের রোগ সমকামী-উভকামীদের সার্কেলে প্রায় একটা প্যানডেমিকের মত এবং এটার নানান কারণের মধ্যে মাইনরিটি স্ট্রেস, বা সংখ্যালঘুত্বের ফলে উদ্ভূত মানসিক চাপের সাথে সম্পর্ক আছে বলে প্রথম বিশ্বের নানান গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলস্বরূপ আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে থাকে প্রচুর।

    উপরোক্ত সমস্যাগুলোর অনেকগুলোই ক্লজেটেড বা আত্মপরিচয় গোপন রাখা সমকামীদের (সবক’টা নয় যদিও)। আউট হওয়ার পর কী হতে পারে, সেই বিষয়ে একটা উদাহরণ আগেই দিয়েছি। তবে এর বিপরীত উদাহরণের সংখ্যাও কম নয়। বাড়িতে বা কাজের জায়গায় নিজের যৌন পছন্দকে খোলাখুলিভাবে স্বীকৃতি দিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন এমন মানুষের অনেকই আছেন। বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর মধ্যে কয়েকটা সুপ্রিম কোর্টের ৩৭৭ ধারা বিষয়ক রায় বেরোনোর পর LGBT+ সেল খুলেছে। তবে বেশিরভাগ জায়গাতেই গ্রহণযোগ্যতা আসা এখনও বহুদূরের স্বপ্ন। কোনো অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, ডেটা সাইন্টিস্ট বা আইটি প্রফেশনাল যা করতে পারবেন সেটা বড়বাজারের কাপড়ের দোকানে যে খাতা লেখে তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এছাড়া বেশ কিছু কাজের জায়গাও রয়েছে, যেখানে মানুষজন যথেষ্ট রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভ। এসব জায়গায় কোনো মানুষ স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আউট হলে তার কার্যত এক ঘরে হয়ে যাওয়া, পদে-পদে অপমানিত হওয়া এবং হস্টিলিটি ফেস করা একপ্রকার অবশ্যম্ভাবী।

    বাড়িতে আউট হলেও প্রতিক্রিয়া অনেক রকম হতে পারে। অনেকের বাড়িতে ব্যাপারটা সুন্দরভাবে মেনে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে নিমের পাঁচন গেলার মত করে হলেও শেষপর্যন্ত এক প্রকার ‘মেনে’ই নেয়। এবং অনেক সময় আবার ব্যাপারটা অশান্তি, মারধোর এবং এমনকি গলাধাক্কা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়।

    উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলো পুরুষ এবং মহিলা সমকামী নির্বিশেষে প্রায় সবার। কিন্তু লেসবিয়ানদের ক্ষেত্রে এর সাথে যোগ হয় পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চাপ। তাই, যে পরিবারে পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার প্রাবল্য যত বেশি, সেই বাড়ির মেয়ের লেসবিয়ান হিসেবে জীবন কাটানো ততই দুর্বিষহ। বাড়ির থেকে পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া, ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া তো আছেই, এমনকি কারেক্টিভ রেপ বা অনার কিলিং জাতীয় ঘৃণ্য এবং ভয়াবহ সব ঘটনার শিকার হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও খুব কম নয়। এমনকি, এতটা খারাপ কোনো অভিজ্ঞতা যদি নাও হয়, তাহলেও কোনো লেসবিয়ান বা রূপান্তরকামী (অর্থাৎ নারী থেকে পুরুষ হতে ইচ্ছুক) মেয়েকে জোর করে পিতৃতান্ত্রিক জেন্ডার নর্মস মানতে বাধ্য করা হলে তা তার মানসিক স্বাস্থ্যকে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

    আরো একটা ব্যাপার আছে। বৃহত্তর সমাজে মেয়েদের নিরাপত্তা এমনিতেই যথেষ্ট কম। একটু বেশি রাত হলেই রাস্তাঘাটে অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে – এমন রাস্তার সংখ্যা খোদ কলকাতা শহরেই খুব কম নেই। এদিকে, খুচরো ইভটিজিং থেকে শুরু করে বাসেট্রামে ছোটখাটো সেক্সুয়াল হারাসমেন্ট এর শিকার হননি – এমন মহিলা খুব বেশি আছেন কি? সমকামী মেয়েদের ক্ষেত্রে তাই প্রেম করার সেফ স্পেস সমকামী ছেলেদের থেকেও কম।

    উভকামীদের ব্যাপারটা আবার একটু জটিল। আমাদের দেশে পুরুষ বাইসেক্সুয়ালদের একটা বড় অংশই নিজেদের যৌন সংখ্যালঘু হিসেবে দেখতে চান না। তাদের কাছে সমলিঙ্গের কারো সাথে হওয়া যৌনতা আদৌ যৌনতাই নয় (এমনকি সমকামী পুরুষদেরও অনেকেই এই জাতীয় একটা সেল্ফ-ডিসেপশনের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন)। এর দ্বারা তাঁরা সমাজের মূল স্রোতে থাকার আত্মপ্রসাদ লাভ করেন ঠিকই, কিন্তু এরূপ চিন্তার ফলস্বরূপ অসুরক্ষিত যৌন আচরণের দিকে পা বাড়ানোটাও আশ্চর্যের কিছু নয়। তার উপর আবার ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা তো রয়েইছে। তবে একটা বড় সংখ্যক বাইসেক্সুয়াল পুরুষের নিজেকে উভকামী হিসেবে আইডেন্টিফাই না করা এবং তার সমলিঙ্গের রোম্যান্টিক পার্টনারকে বিপরীত লিঙ্গের কারোর জন্য অনায়াসে ত্যাগ করার প্রবণতার কারণে বিশেষ করে পুরুষ সমকামীদের একটা অংশের মধ্যে কাজ করতে থাকে উভকামী-বিদ্বেষ বা biphobia। বিদ্বেষ জিনিসটা বড়ই অন্ধ। বিদ্বেষের কারণে মানুষ একজনের কুকীর্তির দায় অন্যজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে প্রতিহিংসার চরিতার্থ করতে চায়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না। প্রচুর উভকামী মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের উভকামিতার ব্যাপারে যথেষ্ট আউট এবং নিজের আচরণের নৈতিক যাথার্থ্য সম্পর্কে তীব্রভাবে সচেতন। সমকামী কমিউনিটির মধ্যে চলতে থাকা বাইফোবিয়ার শিকার হন এঁরাও। ভার্বাল অ্যাবিউজ বা মৌখিক গালিগালাজ থেকে শুরু করে তাঁদের দীর্ঘদিনের রোমান্টিক পার্টনারকে তাঁদের সম্পর্কের ভবিষ্যত নিয়ে ক্রমাগত সন্দিহান করে তোলা – সবকিছুই চলে এই বিদ্বেষের ফলস্বরূপ। এছাড়া সেলফ আইডেন্টিফাইড বাইসেক্সুয়ালদেরও সমকামীদের মতোই বৈষম্যের শিকার হতে হয় – যার কথা আমি কিছু আগে লিখেছি।

    পুরুষ সমকামী, উভকামী এবং পুরুষ থেকে নারী হতে উচ্ছুক রূপান্তরকামীদের সমস্যার একটা অন্যতম প্রধান উৎস হল বিভিন্ন ধরনের সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ এবং ইনফেকশন। যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি কথাবার্তা বলাকে আমাদের সমাজে এখনো কিছুটা অশ্লীল বলেই মনে করা হয়। ফলে, এই ব্যাপারে সচেতনতার অভাব শুধুমাত্র যৌন সংখ্যালঘুদেরই নয়, সংখ্যাগুরুদেরও অপরিসীম। কিন্তু সংখ্যালঘুদের বিপদ হল, তাদের কাজটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় লুকিয়ে-চুরিয়ে। অর্থাৎ, অন্য লোকের চোখে সেই মানুষটার যৌনজীবন বলেই কিছু নেই! স্বাভাবিকভাবেই তাকে সচেতন করার প্রয়োজনও তাই কারোর নেই। তাছাড়া, সমাজের অধিকাংশ স্তরেই এই ধরনের যৌন তথা রোমান্টিক সম্পর্কের স্বীকৃতি নেই বলে একটা বড় সংখ্যক মানুষের মধ্যে এক প্রকারের ডেসপারেশনও কাজ করে। তার থেকে বিপজ্জনক যৌন আচরণের দিকে পা বাড়ানোটা আশ্চর্যের কিছু নয়। সেই জন্য পুরুষ যৌন সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে হাই রিস্ক জোনের অন্তর্ভুক্ত বলে চিহ্নিত হন। প্রসঙ্গত বলে রাখি, বর্তমানে এইচআইভি/এইডস বা হেপাটাইটিস বি প্রভৃতি ঠিক মারক রোগ না হলেও, সময়মত চিকিৎসার অভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া একজন এইচআইভি পজিটিভ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটা এরকম কাউকে কাছ থেকে না দেখে থাকলে ঠিক বোঝা সম্ভব নয়। তবে এই বিষয়টা নিজেই একটা পৃথক আলোচনার দাবি রাখে বলে আর খুব বেশি গভীরে যাচ্ছি না।

    এই লেখাতে বিশেষত পশ্চিমবাংলায় যৌন সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন অংশ কোন কোন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, তার একটা ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম (যদিও এঁদের মধ্যে কতগুলি হয়তো সারা ভারতেরই ছবি)। LGBTQIA+ এর সব ক’টাকে কভার করা হল না। যেটুকু করতে পারলাম তাদের ক্ষেত্রেও বলাই বাহুল্য লিস্টটা একজস্টিভ হল না। এছাড়া, আগেও বলেছি, যে একজন মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, পারিবারিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয়, বয়স ইত্যাদি অনেকগুলো ফ্যাক্টরের উপরে নির্ভর করে বাস্তবে সে সত্যিই কোন কোন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যাইহোক, উপসংহারে শুধুমাত্র এটুকুই বলব, যৌন সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির মানুষজনের সমস্যা নিয়ে যেটুকু যা কাজ হচ্ছে, তা দরকারের তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের কম। যৌন সংখ্যালঘুদের যে অংশটার ভিজিবিলিটি আছে, তাকে নিয়েই যে কাজ যথেষ্ট হয়নি, তার প্রমাণ এই শ্রেণীর বেশিরভাগ মানুষজনের জীবনযাত্রা। আর যে অংশটার ভিজিবিলিটি নেই, তাদের যে কী হাল তা না বোঝার কিছুই নেই। যাইহোক, লেখাতে আমি শুধুমাত্র সমস্যাগুলোর কথাই বললাম, কিন্তু সমাধান-সূত্র দেওয়ার চেষ্টা করলাম না। তবে আশা করি এতক্ষণে অন্তত এটা বোঝাতে পেরেছি, যে যৌন সংখ্যালঘুদের সমস্যার কোনো one size fits all সমাধান নেই। ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ৩৭৭ ধারা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পর অবস্থার সামান্য উন্নতি অবশ্যই হয়েছে। তবু, যৌন সংখ্যালঘুদের যে অংশটুকুকে দেখতে পাচ্ছেন তা হিমশৈলের চূড়া-মাত্র। অধিকাংশ মানুষই আজও ক্লজেটেড। তাঁরা যে বেরিয়ে আসতে পারছেন না এতেই প্রমাণ হয় গন্তব্য এখনো বহুদূর।


  • অন্য যৌনতা | ০৪ জুলাই ২০২২ | ৩৬৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন