ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  অন্য যৌনতা

  • ফ্যাকাশে রামধনুরা

    অভিনব দত্ত (অভি)
    অন্য যৌনতা | ০৪ জুলাই ২০২২ | ৪২২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ছবি -


    পাখির চোখে দেখা: কী চাইছি, কী পাচ্ছি



    সালটা ২০১৮ হবে। কোন মাস সেটা মনে নেই, কিন্তু ২০১৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রীম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৭ সংক্রান্ত যে যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল, সেটার বেশ কিছু মাস পরে – এইটুকু মনে আছে। আমি সেই সময় দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত একটি এনজিও-র সাথে রিসার্চার হিসাবে কাজ করছি। আমাদের কাজ ছিল লিঙ্গ ও যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, মানে যাদেরকে আমরা এলজিবিটিক্যু+ কম্যুনিটি বলে থাকি আর কি - তাঁদের নিজেদের স্বাস্থ্য সচেতনতা, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরণের বাধা কাজ করে, তাঁদের স্বাস্থ্য এবং ওয়েল-বিয়িং সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার বিষয়গুলোকে রিসার্চের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা। মনে আছে, আমরা কলকাতা এবং উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা দু’টিকে প্রাথমিকভাবে বেছে নিয়েছিলাম এই কাজটি করার জন্য।

    গোটা সপ্তাহের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গাতে যেতে হত, যাঁরা ইন্টারভিউ দেবেন তাঁদের সাথে কথা বলার জন্য। কোনো কোনো ইন্টারভিউ তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরেও চলেছে। এই মানুষগুলো তাঁদের জীবনের যাবতীয় না পাওয়ার ক্ষোভ, যন্ত্রণাকে আমাদের সামনে তুলে ধরতেন। ইন্টারভিউগুলো শুধু স্বাস্থ্যের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকত না, বেশিরভাগ ইন্টারভিউই হয়ে উঠেছিল প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের “ভুল” সময়ে, “ভুল” দেশে, “ভুল” শরীরে জন্মগ্রহণ করার জন্য ক্রমাগত নিজেকে বা নিজের ভাগ্যকে দুষতে থাকার এক জীবন্ত আখ্যান!

    যাই হোক, আমি নিজে বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউ নিয়ে একটু দমে গেছিলাম। আমি নিজে ক্যুইয়র হিসেবে আইডেন্টিফাই করি এবং অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নিজের আইডেন্টিটিকে সামনে আনার জন্য, কিন্তু আমি এই বীভৎসতার এই রূপ দেখব – এতটা আশা করিনি। আমি নিজে জীবন এবং আইডেন্টিটি নিয়ে প্রাউড বোধ করতাম, কারণ আমি প্রাইড ওয়াকে হেঁটেছি, প্রাইড ওয়াক অর্গানাইজ করেছি, সমাজের সাথে ‘প্রাউড গে’ বলে লড়ে গেছি, প্রাইড মান্থে সাতরঙা ছবি দিয়েছি – অর্থাৎ, এলজিবিটিক্যু+ রাইটস ম্যুভমেন্টের সঙ্গে আমার যেটুকু সম্পর্ক, সবেতেই ‘প্রাইড’ ব্যপারটা বিরাটভাবে উপস্থিত এবং আর্বান স্পেসে বা বলা ভালো সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমাদেরকে একজিবিটিক্যু+ সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের জীবন-জীবিকা-অধিকার সম্পর্কে যে সমস্ত জিনিস গুলে খাওয়ানো হয়, বাইনারি সেই লেন্সে হয় একদম চূড়ান্ত প্রাউড নাহলে চূড়ান্ত দুঃখিত, কিন্তু প্রাউড বোধ করতে চায় – ট্রান্সজেন্ডার ও ক্যুইয়ার মানুষদের জীবন এবং স্ট্রাগলের যে সূক্ষ্মতা, সেটি কোনোভাবেই ধরা পড়ে না। আমিও বোধহয় সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়টাকে দেখছিলাম ততদিন অবধি। ফলে যখন এক ঝাঁক মানুষ এসে বলছেন, যে, তাঁরা তাঁদের ভাগ্যকে দোষারোপ করেন এইভাবে জন্মানোর জন্য – চাকরি নেই, পয়সা নেই যে ডাক্তার দেখাবে, কাউন্সেলিং করানোর কথা স্বপ্নেও ভাবেন না, কাল কী খাবেন তাঁরা সেটাও জানেন না এবং এগুলো যে খুব তাড়াতাড়ি দূর হবে সেরকমও নয়, তাঁরা এক অদ্ভুত চক্রব্যূহের মধ্যে আটকে পড়েছেন – যাকে আমরা poverty trap – দারিদ্র্যের ফাঁদ বা vicious cycle বলে থাকি – এটা দেখে আমি একটা ভয়াবহ ধাক্কা খেলাম।

    এই মানুষেরা প্রাউড নন, এই মানুষেরা যে তাঁদের আইডেন্টিটি নিয়ে লজ্জিত ঠিক সেটাও নয়, কিন্তু জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে বাঁচার ইচ্ছাটাই এক্কেবারে চলে গেছে। বারবার একই বিষয় নিয়ে মার খেতে খেতে তাঁরা এখন নিজের ভাগ্যকেই দোষ দিচ্ছেন, যে কেন এইভাবে জন্মালাম!

    আমাকে ইন্টারভিউ দিতে আসা অনেকেই আমার থেকে জানতে চেয়েছেন, আমি এরকম কোনো ট্রিটমেন্ট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কিনা, যেটার মাধ্যমে তাঁরা হেটেরোসেক্সুয়াল হয়ে উঠবেন বা সিসজেন্ডার হয়ে উঠবেন। যে কনভার্সন থেরাপি বন্ধ করার জন্য আমরা পার্লামেন্টে বিল নিয়ে আসতে চাইছি, বিভিন্ন কোর্টে মামলা চলছে যাতে সরকারিভাবে কনভার্সন থেরাপিকে ব্যান করা হয়, সেখানে সেই কম্যুনিটর-ই মানুষেরা দলে দলে চেঞ্জ হতে চাইছেন কারণ তাঁরা এই দারিদ্রকে বা অনিশ্চয়তাকে যুঝতে অপারগ!

    এই পরিস্থিতিতে আমাদের এলজিবিটিক্যু+-চালিত এনজিও, কর্পোরেট, সরকারের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, সেই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। কেবল কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরতে চাইব যে কেন এলজিবিটিক্যু+ পপুলেশন মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি বা বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন!

    ১৮৭১ সালে বৃটিশ সরকারের হাত ধরে যে ক্রিমিনাল ট্রাইব অ্যাক্টের সূচনা হয়েছিল, যেখানে একাধিক ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে “ক্রিমিনাল অ্যাট বার্থ”-এর তকমা পেতে হয়েছিল, সেই ট্রাইব অ্যাক্ট ১৯৫২ সালে ভারতের সংবিধান গ্রহণ করার সময় বাতিল হয়ে গেলেও কেবলমাত্র যে জনগোষ্ঠীটিকে ভারত সরকার স্বীকার করে না এবং যাদের মাথা থেকে ক্রিমিনালের তকমা ওঠে না – সেই জনগোষ্ঠীর নাম হল এলজিবিটিক্যু+ কম্যুনিটি! সংবিধান স্বীকৃত হওয়ার পরে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে ভারতের একাধিক পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী – যেমন দলিত-আদিবাসী-বহুজন, মহিলাদেরকে নিয়ে যে সমস্ত কাজ হয়েছে সরকারি, কম্যুনিটি কালেক্টিভ, কর্পোরেট, এবং এনজিও স্তরে, তারপরেও কিন্তু সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান পাওয়া যায়নি।

    ২০২১ সালের সরকারি পরিসংখ্যান বলে, যে ভারতের ২৭% মানুষ এখনও মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টির শিকার। এবং খুব সহজেই এটা অনুমান করা যায় – যে সমস্ত গোষ্ঠীর মানুষেরা যুগ যুগ ধরে সামাজিক নিপীড়ন এবং অবজ্ঞার শিকার, তাঁরাই প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায়, চূড়ান্ত দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন সরকারি সুযোগ-সুবিধার আশায়। বিভিন্ন পরিসংখ্যানও প্রায় একই কথা বলে – তফসিলি উপজাতিরা ভারতের জনসংখ্যার কেবলমাত্র ৮% হলেও, অতি দরিদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে ৪৬% এই জনজাতির মানুষেরা। সেখানে মাত্র ১০ বছর আগেও ট্রান্সজেন্ডার সহ এলজিবিটিক্যু+ সম্প্রদায়ের মানুষেরা যে ভারতের নাগরিক সেটাকেই স্বীকার করা হত না, ধারা ৩৭৭-এর মত আইন দিয়ে তাঁদেরকে ক্রিমিনাল হিসাবে গণ্য করা হত। মাত্র ৮ বছর আগে অবধি ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা আধার কার্ড/রেশন কার্ডের অ্যাপ্লাই করতে পারতেন না, তাঁরা ভোট দিতে পারতেন না, কোনো প্রপার্টি বা সম্পত্তি কিনতে পারতেন না, চাকরি করতে পারতেন না – অর্থাৎ বলা ভাল, একজন মানুষকে নিজের জীবনে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে গেলে যে যে জিনিস করতে হয়, এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা সেগুলোর কিছুই করতে পারতেন না।

    মাত্র চার বছর আগে অবধি আমরা আইনত বলতে পারতাম না, যে আমরা এলজিবিটিক্যু+ সম্প্রদায়ের মানুষ বা তাঁদের অধিকার নিয়ে কাজ করি। একটা লার্জার হিউম্যান রাইটস ছাতার তলায় ‘জেন্ডার’-এর আওতায় আমাদেরকে ফেলা হত। ফলে যা হওয়ার তাই হল – মানবাধিকার কমিশনের এক রিসার্চে যা উঠে এল, তা হল ৯২% ট্রান্সজেন্ডার মানুষ কোনোরকমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত নয়। অথচ সরকারি স্তরে এই মানুষদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার কোনো পরিকল্পনাই নেই। ২০২১ সালে ভারত সরকারের সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট মন্ত্রক সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বশক্তিকরণ বাবদ যদি ১০০ টাকা খরচ করে থাকে, তার মধ্যে মাত্র ৪ পয়সা খরচ করেছিল ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের জন্য – প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র পাঁচ কোটি। অপরদিকে ভারতের কর্পোরেটগুলো সিএসআর বাবদ যে বিপুল অর্থ খরচ করে সামাজিক কারণে, সেখানে নারী কল্যাণ বা উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট জায়গা পেলেও, ট্রান্সজেন্ডার বা লার্জার এলজিবিটিক্যু+ সম্প্রদায়ের মানুষেরা জায়গা পাননি এখনও।

    আমার মনে আছে, ২০১৮ সালে যখন সুপ্রিম কোর্টের ধারা ৩৭৭ রায় নিয়ে সবাই খুব উৎসব করছে, আমি এক টিভি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছিলাম, এই মুহুর্তে যদি একটা মহামারী আসে, তাহলে কী বীভৎস অবস্থা হবে – সেটা বোঝার মত ক্ষমতা আমাদের বেশিরভাগেরই নেই। আমি তৃণমূল স্তরে গিয়ে কাজ করতে গিয়ে যে সমস্ত চিত্র দেখেছি, সেখানে প্রাইড ফ্ল্যাগের রামধনু রঙ ম্লান হয়ে যায়! আমি দেখেছি হাজার হাজার মানুষ কাজ না পেয়ে সেক্স ওয়ার্ক করছেন, বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে/ট্রেনে উঠে ভিক্ষা করছেন বা বিহারে গিয়ে লন্ডা-নাচ করছেন। বহু মানুষ আর ফিরেও আসেন না, তাঁরা হারিয়ে যান। আমি দেখেছি, অর্থের অভাবে এই গোষ্ঠীর মানুষরা মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন এবং অর্থের অভাবেই সেই চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না, আবার চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না বলে তাঁদেরকে কোনো ধরণের ট্রেনিং দিয়ে চাকরির ব্যবস্থাও করা যাচ্ছে না। আমি দেখেছি, দারিদ্র্য কীভাবে এইচআইভি বা যক্ষ্মার মত রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে তুলেছে কম্যুনিটির মধ্যে। সরকারি স্তরে উদ্যোগের অভাবে এই ধরণের রোগ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থাই নেই কম্যুনিটির মধ্যে এবং কোভিড-১৯ প্যানডেমিক আমার আর আমার মত অগুণতি গ্রাসরুটস অ্যাক্টিভিস্টদের আশঙ্কাকে সত্যিতে পরিণত করেছিল। ভারতে ১০ লক্ষেরও এলজিবিটিক্যু+ সম্প্রদায়ের মানুষেরা একবেলা নুন-ভাত জোগাড় করতে পারেননি। এখনও ড্রাই রেশন ডিস্ট্রিবিউশানের উপরে নির্ভর করে আছে অগুণতি ট্রান্সজেন্ডার ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ক্যুয়ার মানুষেরা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সবাই চাল-ডাল দিয়েই ইতি টানছেন। সেই চাল-ডাল ফুটিয়ে খাওয়ার জন্য যে গ্যাসের প্রয়োজন, সেই গ্যাস সিলিন্ডার যদি তাঁরা ₹ ১০০০ দিয়ে কিনতেই পারতেন, তাহলে তাঁরা ₹ ১০০ টাকা কেজি মুসুরির ডালও কিনতে পারতেন! সুতরাং ত্রাণ দেওয়াটা কোনো সমাধান নয়, হতেও পারে না। আর কম্যুনিটির মধ্যে যাঁরা দারিদ্র্যের সাথে যুঝতে গিয়ে এইচআইভি বা যক্ষ্মার মত রোগের সাথেও লড়াই করছেন, শুধু চাল-ডাল বা শুকনো মুড়িতে তাঁদের কীভাবে চলবে?

    এমতাবস্থায়, প্রথম যে কাজটা করা প্রয়োজন, সেটা হল কাজের ব্যবস্থা করা। কিন্তু কাজ বলতেই যদি দশটা-পাঁচটা অফিস ওয়ার্কের কথা ভাবা হয়, সেটা মস্তবড় ভুল হবে। এলজিবিটিক্যু+ কম্যুনিটিকে কেবলমাত্র আর্বান নগরকেন্দ্রিক বা সোশ্যাল মিডিয়ার লেন্স দিয়ে দেখাটা একটু বন্ধ করতে হবে। কাজ মানেই কর্পোরেটের ডাইভার্সিটি-ইনক্লুশান নয়, কাজ মানে মাঠে নেমে চাষ করাও। একজন ট্রান্সজেন্ডার বা ক্যুয়ার মানুষ কি তাঁতি হতে পারেন না? একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষ কি কাপড়ের ব্যবসা করতে পারেন না? একজন ক্যুইয়র মানুষ কি ওয়েস্ট কালেক্ট করে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট করতে পারেন না বা অর্গানিক ফার্মিং করতে পারেন না? ভেবে দেখার সময় এসেছে, যে কেন পলিসি সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের মধ্যেই ট্রান্সজেন্ডার বা এলজিবিটিক্যু+ মানুষদেরকে আনা হয় না। সবেধন নীলমণি একটা ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্ট বানিয়ে বা রাজ্যের তরফ থেকে একটা ট্রান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বানিয়েই দায়িত্ব সারা হয়ে গেছে! কর্পোরেটগুলোর তরফ থেকে প্রাইড মান্থে নিজেদের লোগো রেইনবো করে বা ‘সফল’ কিছু ক্যুয়ার মানুষদেরকে সেমিনারে ডেকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেই ‘সব করে ফেলেছি’ একটা মনোভাব নিয়ে চলছে। স্টার্ট-আপ বা ইনকিউবেশন নিয়ে এই যে এত উন্মাদনা, তার কত অংশ এলজিবিটিক্যু+ সম্প্রদায়ের মানুষদের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? উত্তর নেই কোনো!

    চলে আসি – আমরা কী করতে পারছি তাতে। ২০১৯ সালে আমি এবং আমার একজন ট্রান্সজেন্ডার কলিগ একসাথে এমপ্লয়মেন্টের কথা মাথায় রেখে একটি নট-ফর-প্রফিট কোম্পানি খুলি প্লেক্সাস ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন নামে। আমাদের মূলত দুটি উদ্দেশ্য:
    ❖প্রথমত, আমরা শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের যে গ্যাপ রয়েছে এই কম্যুনিটির মধ্যে, সেটাকে ভরাট করার চেষ্টা করছি আনঅর্গানাইজড সেক্টরে এমপ্লয়মেন্ট তৈরি করে। কারণ আমরা যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সাথে কাজ করি, তাঁদের মধ্যে ৮৭% মানুষ স্কুলছুট এবং রাস্তায় ভিক্ষা করা বা সেক্সওয়ার্ক করা ইত্যাদি প্রফেশনকে তাঁদের অনেকেই অনন্যোপায় হয়ে বেছে নিয়েছেন। এঁদেরকে ট্রেনিং দিয়ে কর্পোরেটে চাকরি দেওয়া প্রায় অসম্ভব এবং সময় সাপেক্ষ। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে কর্পোরেট ভীষণই সেন্সিটাইজড, কিন্তু দীর্ঘদিন সমাজের মূলস্রোতের বাইরে থাকার ফলে এঁরাও যে সব সময় কর্পোরেট কালচারে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন সেটা ভাবাটাও বিলাসিতা। আর যে পরিমাণে ডিম্যান্ড রয়েছে সেখানে গুটিকয়েক চাকরি দিয়ে ডিম্যান্ড মেটানো সম্ভব নয়, চাই মাস-এমপ্লয়মেন্ট বা গণ-নিয়োগ। যেটা দিতে পারে একমাত্র আনঅর্গানাইজড সেক্টরের অধীনে থাকা একাধিক কাজের জায়গা। আমরা শুরু করেছি চাষাবাদ দিয়ে, কোথায় গিয়ে শেষ করব জানি না!
    ❖দ্বিতীয়ত, আমরা পলিসির জায়গাটা আস্তে আস্তে ধরতে চাইছি বিভিন্ন রিসার্চের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ বলব, যে এমপ্লয়মেন্ট তৈরি করার জন্য যে ডেটাবেসের প্রয়োজন – কতজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে আছেন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা স্কিল কী, তাঁরা কাজের জন্য অন্য কোথাও যান কিনা, বা তাঁরা নিজেদেরকে কীভাবে দেখতে চান – ইত্যাদি প্রাথমিক তথ্যগুলো পর্যন্ত আমাদের কাছে বা সরকারের কাছে নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হল একাধিক রিসার্চের মাধ্যমে এই সমস্ত তথ্য জনস্বমক্ষে তুলে ধরা, যাতে সেই তথ্যের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

    অনেকের মত আমরাও প্যানডেমিকে ভীষণভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু একটা কথা আমি জানি – ট্রান্সজেন্ডার সহ এলজিবিটিক্যু+ মানুষদের এক বড় অংশ যে আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তাকে দূর করতে গেলে লং টার্ম প্ল্যানিং-এর প্রয়োজন আছে। শুধু প্রাইড মান্থ বা প্রাইড ওয়াকে রেইনবো পতাকা দিয়ে পেট ভরে না। চাই কাজ, চাই টাকা, চাই খাবার। যতদিন পর্যন্ত ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য থাকবে, ততদিন পর্যন্ত রামধনু-র রঙ ফিকেই থাকবে!


    --

    লেখক ক্যুইয়র গোষ্ঠীর জীবিকা নিয়ে কাজ করা একটি নট-ফর-প্রফিট সোশ্যাল স্টার্ট-আপ সংস্থা প্লেক্সাস ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের কো-ফাউন্ডার


  • অন্য যৌনতা | ০৪ জুলাই ২০২২ | ৪২২ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ইঁদুর-১ - Ranjan Roy
    আরও পড়ুন
    ইঁদুর-১ - Ranjan Roy
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ০৪ জুলাই ২০২২ ২০:৩০509642
  • জনগণনার সময় তো সেক্স্যুয়াল প্রেফারেন্স নেওয়া হয় না কাজেই কোথাও ডেটাবেসে থাকার সম্ভাবনা কমই। 
    তবু কিছু কাজ করছেন অনেকটা করার চেষ্টা করছেন জেনে ভাল লাগল। 
  • Mahua Banerjee | ০৪ জুলাই ২০২২ ২০:৩১509643
  • একটি জরুরি ও সময়োপযোগী আলোচনা .
  • সেখ আমিরুল ইসলাম | 2402:3a80:1c40:4db6:6e2e:80f3:5098:96b0 | ০৬ জুলাই ২০২২ ১৭:৩০509677
  • আমি আসলে ক্যুয়র মানে কি বুঝতেই পারছি না।গুগলেও যা বলছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারছি না।বললেও যেটা বলছে তা গে-এর সমার্থক।কেউ যদি একটু বুঝিয়ে দিতেন?
  • kk | 2601:448:c400:9fe0:f896:e5a5:a294:cf87 | ০৬ জুলাই ২০২২ ২০:২৭509678
  • সেখ আমিরুল ইসলাম,
    এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। এতে বিশদে লেখা আছে -- https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=25025
  • গাজী নুরুল সোহাগ , নোয়াখালী | 2a00:23c4:2400:2c01:64c6:2fb:5c4:494e | ০৭ জুলাই ২০২২ ০১:৩২509680
  • রামধনু না রংধনু ? কোনটা ঠিক ?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন