ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • #চলো_রথ_টানিত নি মা হা জ রা 

    Tanima Hazra লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ জুলাই ২০২২ | ১১৭ বার পঠিত
  • রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম, পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, 
    হাসেন অন্তর্যামী।।---রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।। 

    এই যে আমাদের উপলক্ষ্যকে জাপটে ধরে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার স্বভাব, এ নতুন কিছু নয়। আমরা ধর্মকে আঁকড়ে ধরি অন্ধের মতো, কিন্তু একটু যদি চক্ষুষ্মানের মতো ধরতে পারতাম তাহলে হয়তো অনেক মুক্ত চিন্তা দিয়ে বুঝতে পারতাম প্রতিটি লৌকিক উৎসব বা আচরণের প্রকৃত ও অন্তর্নিহিত উদ্ভব জনিত ব্যাখ্যা।। 

    যেমন ধরি অম্বুবাচি উৎসব বা রজ উৎসবের উৎস সন্ধান করে। 

    অম্বুবাচী কথাটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ 'অম্ব' ও 'বাচি' থেকে। 'অম্ব' শব্দের অর্থ হলো জল এবং 'বাচি' শব্দের অর্থ হলো বৃদ্ধি। অতএব গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের পর যখন বর্ষার আগমনে ধরিত্রী সিক্ত হয় এবং নবরূপে বীজধারণের যোগ্য হয়ে ওঠে সেই সময়কেই বলা হয় অম্বুবাচী।

    রঘুনন্দন ভট্টাচার্য  তাঁর 'অষ্টবিংশতি' তত্ত্ব নামক গ্রন্থে তিথিতত্ব ও কৃত্যতত্বে অম্বুবাচি ও তার স্থিতিকাল নিয়ে লিখেছেন -

    "যস্মিন বারে সহস্রাংশু যতকালে মিথুনং ব্রজেত।
    অম্বুবাচি ভবে ন্নিতং পুনঃস্থকাল-বারয়ঃl"

    অর্থাৎ, সূর্য আষাঢ় মাসে যে দিন যে সময়ে মিথুন রাশিতে আদ্রা নক্ষত্রের প্রথম পাদে গমন করে সেই সময়কাল থেকে মাতৃস্বরূপা পৃথিবী ঋতুমতী হয় বা অম্বুবাচির কাল শুরু হয় । 

    "তাবত্কালোবধি-বিংশতিদন্ডাধিক্ দিনত্রয়ম"

    অর্থাৎ, সূর্যের মিথুন রাশি গমনের কাল থেকে শুরু করে বিংশতিদন্ডাধিক্ তিনদিন বা তিনদিন কুড়িদন্ড কাল সময় অম্বুবাচির স্থিতি।

    এই যে অম্বুবাচির সময়টি নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে যে মা কামাখ্যা রজঃস্বলা হচ্ছেন সেটা কিন্তু আর বিশেষ কিছুই নয়। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। 
    রজঃ শব্দের অর্থ যেমন রক্ত, তেমনি রজ শব্দের আর একটি অর্থ হলো ধূলিকণা। 
    মনে আছে কবিগুরুর সেই কবিতার লাইন, যেখানে রূপ সনাতনের মহামিলন মুহূর্তে তিনি লিখছেন :

    ""চারিচক্ষুর ধারায় তিতিল বৃন্দাবনের রজ""

    এই রজ যে ধূলা, এই রজ যে মাটি। 

     আসামের গুয়াহাটি অঞ্চলের মৃত্তিকার প্রকার  বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে অঞ্চলটি বালুমিশ্রিত ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা সমৃদ্ধ। সুতরাং রজঃশ্রাব বলে যা ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে তা আসলে প্রবল বর্ষায় লালমাটিধোয়া জলের স্রোত। 
     
    পৃথিবীকে যদি দেবী বলে মনে করি তবে এই মাটি ধোয়া জল নিশ্চয়ই আমাদের পূজ্য। কারণ এই প্রবল বর্ষার পরেই নরম মাটিতে বীজ বোনার শুরু, যা থেকে ধরিত্রীর উদ্ভিদ সন্তানদের জন্মের সূত্রপাত।। 

    প্রতিটি নারী প্রাণীর  রজঃশ্রাবের রক্তধারায় যে লৌহের উপস্থিতি মাটির স্রোতেও সেই একই লৌহ থাকার জন্য তারও রঙ লাল।। 

    ভারতবর্ষের মতো একটি কৃষিনির্ভর দেশে বর্ষার এই আগমনকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির আরাধনা এক পুরাতন প্রথা।।
    এই প্রথা মাটির জরায়ুতে নতুন প্রাণকে রোপণ করে শ্যামলী পৃথিবীর মাতৃত্বের উৎসব।। 

    কিন্তু আমাদের অনেকেরই অক্ষমতা এই যে আমরা যে কোনো লৌকিক উৎসব বা আচারের বৈজ্ঞানিক উৎস অনুসন্ধান বা ব্যাখ্যা না করেই অযথা কিছু কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে কেবল অন্ধ অনুসরণ বা অনুকরণেই সীমাবদ্ধ হয়ে 
    থাকি। আসামের মতো উড়িষ্যাতেও চলে রজ উৎসব।।

    এই উৎসবের উৎস আসলে মাটি, রক্তের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
    তাই যে কোনো ধর্মের কৃষিজীবি মানুষই এই উৎসব পালনের অধিকারী। 

    কিন্তু  দিনের পর দিন কৃষিসংক্রান্ত লৌকিক প্রকৃতিপূজার ও মাটির উৎসবটিকে যেভাবে অহেতুক ভুল ব্যাখ্যা করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসব বলে দাবি করে হয়ে থাকে এবং  ঋতুঃশ্রাবজনিত আঙ্গিকের আড়ালে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে এবং কোনো শিক্ষিত মানুষ এগিয়ে আসেন না সঠিক উৎসটিকে মানুষের সামনে এনে তাদের জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব পালন করার নিমিত্ত, সেটা মানবসভ্যতার পক্ষে অত্যন্ত বিপদজনক।।

    আমি ব্যক্তিগতভাবে বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি কাজ বলে মনে করেছি।।

     আশাকরি বুদ্ধিমান ও উন্মুক্তমনা পাঠককুল এর যাথার্থ্য অনুধাবন করবেন এবং পোস্টটি শেয়ার করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেবেন।। 

    তাহলেই মনে হয় মানুষের সুবুদ্ধির ও উন্মুক্ত বোধের প্রকৃত রথযাত্রা শুরু হবে আজ এই শুভক্ষণে।।

    ভুলে যাবেন না রথে উপবিষ্ট তিন ভাইবোনকে 
    জগন্নাথ - যিনি জগতের নাথ অর্থ্যাৎ স্রষ্টা বা বীজ 
    হলধর বলরাম অর্থাৎ হাল যা দিয়ে আমরা মাটি কর্ষণ করে থাকি 
    এবং 
    সুভদ্রারূপিনী নারী বা মৃত্তিকা।। 

    এবারে বুঝতে পারলেন তো এই তিন ভাইবোন আসলে কী?  

    বীজ, হাল আর মাটি।। 

    চলুন সবাই মিলে মনের আনন্দে বৃষ্টির ধারায় সব কুসংস্কার ধুয়ে ফেলে পৃথিবীর প্রাণ সংরক্ষণের রথযাত্রায় মেতে উঠি।।।  ত নি মা।।  
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন