ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নতুন বিচারে কলম্বাস ; নতুন বিশ্বের আবিস্কারক নাকি লুটেরা ঔপনিবেশিক শাসক

    AR Barki লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ জুন ২০২২ | ৬৭ বার পঠিত
  • ১৪৯২ সালের কথা। একদল অস্ত্রধারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনটি জাহাজে করে ১২ অক্টোবর আমেরিকার বাহামাস দ্বীপে পৌঁছান ক্রিস্টোফার কলম্বাস। সরলমনা স্থানীয় আদিবাসীরা তাদেরকে অতিথি হিসেবে স্বাগত জানান। কলম্বাসের একটি ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ মেরামতও করে দেন তারা।
    .
    অভ্যর্থনা জানাতে আসা আদিবাসীদের দেহে স্বর্ণের অলঙ্কার দেখে কলম্বাস অনুমান করেন আশেপাশের কোথাও স্বর্ণের খনি রয়েছে। আদিবাসীদের সরলতা কলম্বাসকে মুগ্ধ করে এ জন্য যে, তিনি খুবই কম পরিশ্রমে ওই ভূখণ্ডের সব কিছু নিজের দখলে নিতে পারবেন।
    .
    তিনি আমেরিকার মূল মালিক আদিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করেন এবং স্পেনে গিয়ে আরও এক হাজার দুইশ’ ইউরোপীয়কে সঙ্গে নিয়ে আসেন। শুরু হয় নির্মমতা, চলে গণহত্যা। কলম্বাস বাহিনী হিস্পানিওলা দ্বীপের একটি প্রদেশে ১৪ বছরের উপরের সব আদিবাসীকে তিন মাস পরপর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ জমা দেওয়ার নির্দেশ জারি করেন।
    .
    এই নির্দেশ মানতে যারাই ব্যর্থ হতো তাদেরই দুই হাত কেটে ফেলা হতো। হাত কাটার পর তারা রক্তপাতে মারা যেত। অনেকে বাঁচার জন্য পালানোর চেষ্টা করতো। তাদেরকে হিংস্র কুকুর দিয়ে খুঁজে বের করে নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে মেরে ফেলা হতো। অনেক আদিবাসীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।
    .
    হিস্পানিওলা দ্বীপে বসবাসকারীরা ছিল আরাওয়াক গোত্রের। ঐতিহাসিক সনদগুলো বলছে, কলম্বাসের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় বাহিনীর নির্মমতা সইতে না পেরে ৫০ হাজার আদিবাসী বিষ খেয়ে গণ-আত্মহত্যা করেছিলেন।
    .
    মায়েরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতেন যাতে ইউরোপীয়রা ওই বাচ্চাদেরকে কুকুরের খাবারে পরিণত করতে না পারে। এরপরও যারা বেঁচে ছিলেন তাদেরকে দাসে পরিণত করেন কলম্বাস। নিজের মতো করে সব কিছু গড়ে তুলতে আদিবাসীদের রাত-দিন পরিশ্রমে বাধ্য করেন। কলম্বাসের এই নিষ্ঠুরতার কারণেও মারা যায় হাজার হাজার আদিবাসী।
    .
    আরাওয়াক গোত্র সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, ১৫১৫ সালেও আরাওয়াক গোত্রের ৫০ হাজার সদস্য বেঁচে ছিল। কিন্তু ১৫৫০ সালে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ৫০০ জনে।
    .
    এরই ধারাবাহিকতায় ১৬৫০ সালে দ্বীপটিতে আরাওয়াক গোষ্ঠীর আর কেউ বেঁচে ছিল না। এর বহু আগেই কলম্বাস মারা যান, কিন্তু আমেরিকার দখলদার ইউরোপীয়দের গণহত্যা থেমে থাকেনি। কলম্বাসের উত্তরসূরিরা একই কায়দায় আদিবাসী নিধন অব্যাহত রাখে।
    .
    কলম্বাসের সময়ের কিছু নির্মমতার ইতিহাস উঠে এসেছে তার নিজস্ব জার্নাল ও চিঠিতে। আরও তথ্য পাওয়া যায় স্পেনের ঐতিহাসিক বার্তোলমে দা লাস কাসাস এর লেখা ‘হিস্টোরি অব দ্য ইন্ডিজ’ বইয়ে।
    .
    তিনি লিখেছেন, কলম্বাস বাহিনী তাদের ছুরি ও তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করার জন্যও আদিবাসীদের টুকরো টুকরো করে কাটতো, নিষ্পাপ শিশুদের শিরশ্ছেদ করতো। কলম্বাস যাদেরকে রেড ইন্ডিয়ান বলে নামকরণ করেছিলেন সেই আদিবাসীদের একটা বড় অংশকে নিশ্চিহ্ন করার পর ইউরোপীয়রা নিজেদের বিলাসী জীবন নিশ্চিত করতে একদল সেবকের প্রয়োজন বোধ করে।
    .
    তারা আফ্রিকা মহাদেশে গিয়ে মানুষ ধরে আনতে শুরু করে। এভাবেই আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের আগমন। তারা স্বেচ্ছায় আমেরিকায় আসেননি,তাদেরকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে।
    .
    বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ও সাবেক কোস্ট গার্ড অ্যালেক্স হেলি আমেরিকায় তার নিজের প্রথম পূর্বপুরুষের অনুসন্ধানে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। সেই গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে লেখা ‘রুট্‌স: দ্য সাগা অফ এন অ্যামেরিকান ফ্যামিলি’ বইয়ে আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে আনার কিছু ঘটনার প্রামাণ্য বর্ণনা রয়েছে।
    .
    তিনি দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণার পর জানতে পারেন আমেরিকায় তার প্রথম পূর্বপুরুষের নাম কুন্তা কিন্তে। গাম্বিয়া থেকে কুন্তা কিন্তে-কে ধরে নিয়ে আসে ইউরোপীয়রা। কুন্তা কিন্তে’র আমেরিকায় পৌঁছার খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন অ্যালেক্স হেলি। কুন্তা কিন্তে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে ইউরোপীয়দের অনুচরদের মাধ্যমে অপহৃত হন। এরপর তার আত্মীয়-স্বজনেরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
    .
    ১৭৬৭ সালে এক ইউরোপীয় দাস ব্যবসায়ী অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে গাম্বিয়ার যে ১৪০ জন মানুষকে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল তার মধ্যে কুন্তা কিন্তেও ছিলেন। জাহাজটি অ্যানাপোলিসের বন্দরে এসে থামে। অ্যানাপোলিস হচ্ছে বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত। আমেরিকায় পৌঁছার আগেই পথে মারা যায় ৪২ জন গাম্বিয়ান। বেঁচে যাওয়া ৯৮ জনের একজন হলেন কুন্তা কিন্তে। তিনি ছিলেন মুসলমান।
    .
    কলম্বাস এবং এর পরবর্তী ইতিহাস থেকে এটা স্পষ্ট আমেরিকা আবিষ্কারের পর সেখানে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে যে শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে মজলুম মানুষের রক্ত ও ঘাম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন