বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অজ্ঞাতবাস 

    দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ মে ২০২২ | ২০০ বার পঠিত

  •           কোথাও কিছু নেই, আচমকা একদিন চাকরি ছাড়ার ভূতটা চেপে বসল সন্দীপনের মাথায় | প্রথমে সে পাত্তা দেয়নি তেমন | আপদটাকে সে বুঝিয়ে বললও একদিন - "দেখ, আমার তো বৌ মেয়ে আছে | বৌ যদিও সরকারি স্কুলে পড়ায়, আমি তো আর ঘরে বসে তার ঘাড় ভেঙে খেতে পারি না | মেয়েটাই বা স্কুলের বন্ধুদের কি বলবে? তার বাবা বাড়ি বসে ঘুমোয়? তুই চলে যা, আমাকে আর জ্বালাস না |"
              এসব প্রলাপ শুনে কিছুদিন সে সম্ভবত লজ্জাবোধে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছিল | কদিন সন্দীপনের মনেও হচ্ছিল, কি যেন একটা নেই নেই ভাব | কিন্তু তারপর একদিন সকালে উঠে অফিসে বেরোনোর সময় তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে মাছের ঝোলের বাটিতে আপদটাকে হুশ করে ভেসে উঠতে দেখল সে |
                আপদটার অবশ্য দোষ বিশেষ নেই | অফিসটাও বলিহারি, কিছু জ্বালায় বটে সন্দীপনকে | সিনিয়র পজিশনে আছে বলে ছুটিছাটা তো দিতেই চায় না | কাজের সময় বিনামূল্যে যত ইচ্ছে চা, কফি, চিনি বসানো বিস্কিট এসব দেয় কিন্তু মাস গেলে মোটা টাকা ট্যাক্সে কেটে নেয় |
                ইদানিং আপদটা বাড়ি থেকে বেরোলেই তার পিছন পিছন আসে | অফিসের কড়া বায়োমেট্রিক চেকিং কিভাবে যেন অনায়াসে কাটিয়ে ঢুকে পড়ে | অফিসে সন্দীপন জানে, যে কোনো সময়ে ঘাড় ঘোরালেই দেখতে পাবে আপদটা একটা কিউবিকলের ভেতর গুঁড়ি মেরে সেঁধিয়ে গেল, বা টক করে চলে গেল কফি মেশিনের আড়ালে | অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ি পৌঁছলেই কিন্তু আপদটা হাওয়া |
                  তাই সে মাঝে মাঝেই ভাবে চাকরিটা ছেড়ে যদি কিছু চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা যায় | এই তো সেবার সমুদ্রের ধারে ঘুরতে গিয়ে বিজুর শ্যাকে মাছভাজা আর বিয়ার খেতে খেতে গপ্পো জমেছিল | কথায় কথায় সন্দীপন জানতে চেয়েছিল, "এখানে আমিও যদি শ্যাক খুলি, চালাতে পারবো?" বিজু হাসে "নাঃ, শ্যাক চালাতে গেলে অনেককে খুশি করতে হয় স্যার | তার থেকে আপনারা আরো বেশি করে এখানে ঘুরতে আসবেন | ওটাই ভালো সার | কত হুজ্জোত করে কিভাবে দোকান চালাচ্ছি এসব আর জিজ্ঞেস করবেন না, অনেক ঝামেলা | "
                   একদিন অফিস মিটিংয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টের কি একটা সামান্য চাপা ভর্ৎসনায় মেজাজ গরম করে পাতা ফেলতেই ম্যানেজারের ফোন | সব শুনে তিনি তো হেসেই উড়িয়ে দিলেন - "ধুর, তোমার মিড লাইফ ক্রাইসিস চলছে | এর জন্য রিজাইন করার কি আছে এক কাজ করো, তুমি সাবাটিকাল নিয়ে নাও তিন মাস |"
                  মেঘ না চাইতেই জল | ঠিকই, সাবাটিকাল নেবার ব্যাপারটা সন্দীপনের মাথাতেই আসেনি | কোম্পানি পলিসিতে আছে বটে, বিশেষ পরিস্থিতিতে মাইনে ছাড়া লম্বা ছুটি | তবে 'বিশেষ পরিস্থিতি' ক্লজটা গোলমেলে | সেটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে অবশ্য সন্দীপনের ম্যানেজার নিচু গলায় বললেন, "সাবাটিকাল অনুমোদন হয়ে যাবে, কিন্তু এবছরের যে হাইক আর প্রমোশনটা হবার কথা ছিল তা পরের বছর হবে | তা সে যাকগে | এতদিন সাবাটিকাল নিয়ে যাবে কোথায়? বনবাস না অজ্ঞাতবাস?"
                বৌ শুক্তি তেমন অবাক হয়নি | শুধু সন্দীপনের মুখে 'আই নিড দিস ব্রেক টু রেস্টোর মাই সোল' শুনে খিকখিক হেসে বলেছিল- 'কলেজের পর তো আর গাঁজা খাসনি | এবার সুযোগের সদ্ব্যবহার করবি মনে হচ্ছে |'
                 মেয়ে তুলিও এখন বড় হয়েছে অনেক, স্কুলের বন্ধুদের নিয়েই মেতে থাকে, সেও কোন আপত্তি করল না |
                 তুলি আর শুক্তির সাথে গরমের ছুটিতে পাহাড়ে ঘুরতে এসেই এই হোমস্টেটা পছন্দ হয়েছিল সন্দীপনের | হোস্ট মোংপো বলেছিল তিনমাসের জন্য সে ভাড়া দিতে পারে | শুক্তি আর তুলি দুসপ্তাহ পর ফিরে গেল | তারপর সন্দীপন একা |


                হোমস্টের বাগানে সন্দীপন শাকসবজি পুঁতেছে মোংপোর থেকে সাহায্য নিয়ে |
                দিনের বেলা সে ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশ্যহীনভাবে | এই পাহাড়ি গ্রামের ওপরের জঙ্গলে সে যায় মাঝে মাঝে | একটা গাছের নিচে চাতালে ফাঁকা জায়গায় বসে ধ্যান করার চেষ্টা করে | কিন্তু, গাছের নিচে বসে ধ্যান করা খুব কঠিন ব্যাপার | পাখিরা মাথার ওপর বিষ্ঠা ত্যাগ করে | লাল পিঁপড়ে কামড়ায় | বৃষ্টির সময় নিঃশব্দে রক্ত খায় জোঁক | একটু সন্ধে হলেই ছেঁকে ধরে মশা |
                কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেই সন্দীপনের নগ্ন নারী দেহের কথা মনে পড়ে | মনে পড়ে সেই স্বর্গের মত কাঁচঘরের অফিসের কথা, যার পরিখা কাটা দুর্গের ভেতর বসে দিন রাত, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কিছুই বোঝা যায় না | সেখানে নিজেকে মনে হয় পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ মানুষ | এখানে তো দুপা যেতে না যেতেই অজানা অঞ্চল, রাতে কালো জমাট বেঁধে থাকা অন্ধকার |
                 সন্ধেবেলা জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা শুকনো কাঠ আর পাতা দিয়ে বনফায়ার তৈরি হয় | আগুনে ঝলসায় মাংস আর রুটি | আগুনের কুন্ড থেকে ফুলকিগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে মিলিয়ে যায় | গান চালিয়ে সন্দীপন আর মোংপো আগুনের চারপাশে নাচে | নেশার ঘোরে মোংপো দূরের পাহাড়ের আলো জ্বলতে থাকা বাড়িগুলোর দিকে আঙ্গুল তুলে দেখায় | সেসব প্রাগৌতিহাসিক পাহাড় আর তাদের কোলে শুয়ে থাকা আলোর ফুলকিদের দিকে তাকিয়ে সন্দীপনের গা ছমছম করে ওঠে | মনে হয় ওখানে বহুদূরের আরেকটি অগ্নিকুন্ডের পাশে বসে আরেকজন মোংপো যেন আরেকজন সন্দীপনকে তার দিকে আঙ্গুল তুলে একই রকমভাবে দেখাচ্ছে |
                  অল্প রাত হতে না হতেই শুয়ে পড়তে হয়, বিজলি আলো থাকেনা বেশিক্ষণ | ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লে সন্দীপন নেশার ঘুমের ঘোরে নান রকম সব অদ্ভুত স্বপ্নদৃশ্য দেখে আর পরেরদিন সকালে উঠে সেসব যেটুকু মনে পড়ে, লিখে রাখে ল্যাপটপে |

                  দিন যায় | শশা গাছে বেঢপ শশা ফলে | কুমড়ো খেয়ে যায় পোকা | টমেটো আর লঙ্কা গাছ মারাত্মক টক আর ঝাল ফল দেয় | একটা বীজ থেকে একটা ফল তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ, এতদিনে টের পায় সন্দীপন | এবার বাড়ি ফিরে গেলে সে তুলিকে বোঝাবে এক দানা চাল থেকেও যে ভাতের কণা তৈরি হয়, তার পিছনে কতজনের পরিশ্রম কাজ করে |
                  ইন্টারনেট নেই, সময় কাটতেই চায় না | কাহাঁতক আর দিনের বেলা ধ্যান, ঘোরাঘুরি আর রাতে আগুন ঘিরে নাচ করা যায় | পুরো তিনমাস লাগল না, আড়াইমাসের মাথাতেই শেষমেশ সে মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল নিয়ে শহরেই ফিরে গেল শুক্তি, তুলি আর তার আপাত নিরাপদ অফিসের কাছে |
                  যদিও কিছু লাভ হয়েছে | চাকরি ছাড়ার আপদটা সত্যি সত্যি বিদায় হয়েছে, আর তাকে জ্বালাতে আসেনি |
                  আর দর্শনের বই নয়, সন্দীপন বেনামে নেশার ঘোরে দেখা সেই সব স্বপ্নাদেশের টুকরোগুলো মিলিয়ে মিশিয়ে একটা সেলফ-হেল্প বই লিখে ফেলেছে - 'হাউ টেকিং এ লং ব্রেক ক্যান রেস্টোর ইওর সোল’ | বইটা হুলিয়ে বিক্রী হচ্ছে | এ গপ্পোটা তারই উপক্রমণিকা |
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন