ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  উচ্চশিক্ষার আনাচকানাচ

  • উচ্চশিক্ষার বামনাবতার: প্রত্যক্ষদর্শীর কলমে

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
    আলোচনা | উচ্চশিক্ষার আনাচকানাচ | ১২ এপ্রিল ২০২২ | ৫২৮৭ বার পঠিত | রেটিং ৪.৯ (৭ জন)
  • উচ্চশিক্ষায়তনগুলির ঝকঝকে দেওয়াল, চকচকে আসবাব, ছিমছাম পড়ুয়ার দল। ধূলো ঢোকে না - এমন পরীক্ষাগার, মাছি গলে না - এমন পাহারা। খাওয়া ভাল, হাওয়া ভাল, সবচেয়ে ভাল - পরিবেশ। সত্যিই কি সবই পাউরুটি আর ঝোলাগুড়? ছায়া পড়ে না, আলোকোজ্জ্বল করিডরের কোথাও? মেঘ জমে না - সাজানো ক্যাম্পাসের ওপর? নিঃসীম অন্ধকার নেই কোনো ঝলমলে মুখের আড়ালে? আছে হয়তো - খবরে আসে না। কিল খেয়ে কিল হজম করেন - কখনো ছাত্র, কখনো শিক্ষক। অনুচ্চারিত কোড আছে কোথাও - আর্মি ক্যাম্পসদৃশ। চোখের তলায় পরিশ্রমের কালি দেখা গেলেও, পিঠের বিশাল ডিপ্রেশনের বোঝা অদৃশ্যই থাকে। ঘনঘন নষ্ট হয় একেকটা স্বপ্ন। কদাচিৎ, একটা করে জীবনও শেষ হয়ে যায়। কোথাও তো দরকার, এই গুনগুন, ফিসফাস গুলোর জায়গা হওয়ার? অ্যাকাডেমিয়ার কণ্ঠস্বর অনেক, বক্তব্যও বিভিন্ন - এ সব কথা মনে রেখেই, গুরুর নতুন বিভাগ, "উচ্চশিক্ষার আনাচকানাচ" ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী - উচ্চশিক্ষার অঙ্গনের যে সব কথা এতদিন জানাতে পারেননি কোথাও - লিখে পাঠান গুরুচণ্ডা৯-তে। নিজের কথা, পাশের কিউবিকলের কথা, পরিবারের লোকের কথা। এমন কাউকে চেনেন - যাঁর আছে এমন অভিজ্ঞতার সঞ্চয়? লিখতে বলুন তাঁদের। সব লেখাই প্রবন্ধ হতে হবে তার মানে নেই। প্রবন্ধ আসুক, অভিজ্ঞতার ভাগাভাগি হোক, বিতর্ক জমুক। ফিসফিসগুলো জোরে শুনতে পাওয়া গেলেই হল।


    এই লেখাটা পড়ে অনেকেই হয়তো সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন এবং একপাক্ষিক ভিত্তিহীন কাঁদুনি গাওয়া বলে যথেচ্ছ গালাগালও দিতে পারেন – কারণ এ লেখায় প্রকাশিত বক্তব্যের সমর্থনে দেওয়ার মত তথ্য বা ডেটা লেখকের কাছে নেই। এর অন্যতম কারণ এই যে, এ লেখার সমস্তটাই লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা – যা লেখকের সাথে ঘটেছে অথবা সে হতে দেখেছে এবং সে সময় লেখকের মানসিক অবস্থা বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাকে ‘জনসমক্ষে তুলে ধরবার মত প্রমাণ স্বরূপ তথ্য’ রাখার অবস্থায় রাখেনি। এই মুখবন্ধটুকু দেওয়াটা জরুরি, কারণ আমরা যারা সামান্য হলেও গবেষণা বা রিসার্চ করি, তারা ‘প্রত্যক্ষই শ্রেষ্ঠ প্রমাণ’-এ বিশ্বাস করি এবং হাত নেড়ে ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’ বলে চালানোর চেষ্টা করি না। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই অপারগতা লেখকের সদিচ্ছায় নয়। আশা করি সেটুকু মার্জনা করা হবে।

    ২০১২ সালে আমি দেশের একটি অন্যতম রিসার্চ ইন্সটিট্যুটে গবেষণা করবার সুযোগ পাই পিএইচডি স্টুডেন্ট হিসেবে। সত্যি বলতে কি, তার আগে রিসার্চ কী, সেখানে ঠিক কী করতে হয় বা সেটা প্রথাগত পড়া-মুখস্থ করে পরীক্ষা দেওয়ার থেকে কতটা আলাদা – সে বিষয়ে আমার সম্যক কোনো ধারণা ছিল না। নিজের সিনিয়র, আত্মীয়, বন্ধুদের থেকে শুনে এবং ফিজিক্সের প্রতি একটা আকর্ষণ থেকে মনে হয়েছিল – এই পথে চললে হয়তো কিছু একটা করতে পারব। সেই আশা নিয়ে আমি উক্ত ইন্সটিটিউটে ঢুকি। তা, প্রথম ছ’মাস কোর্সওয়ার্ক ইত্যাদি করে কেটে যায় এবং সেখানে অসাধারণ কিছু শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসবার সুযোগ পেয়ে অনেক কিছু শিখি। আমি কোনোকালেই মারাত্মক প্রতিভাবান ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু ভাল শিক্ষক পাওয়ার সুবাদে বিষয়ের প্রতি বেশ একটা আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তখনও আমার ছাত্রদশা কাটেনি এবং বুঝিনি ‘রিসার্চ’ বিষয়টা কী এবং তা ক্লাস করে পরীক্ষা দিয়ে নম্বর পাওয়ার থেকে কী ভয়ানকভাবে আলাদা। আমার সুপারভাইজারের সঙ্গে এর মধ্যে আমার দেখা হয়েছে, তিনি আমাকে তাঁর গবেষণা সম্পর্কে অবগত করেছেন এবং আমি বুঝতে পেরেছি তাঁর বিষয়টি সিমুলেশন-নির্ভর – অর্থাৎ, সেখানে কাগজ-কলমের থেকে কম্পিউটারের ব্যবহার বেশি। এবার, এই বিষয়টিতে আমার চিরকালই একটা ভয় ছিল, কারণ আমি ‘কোড’ ব্যাপারটা একদমই বুঝতাম না। এই বুঝতে না পারার সিংহভাগ কারণ অবশ্যই আমার নির্বুদ্ধিতা এবং তারই সাথে ভাল একজন পথপ্রদর্শকের অভাব। যাইহোক, আমি ভয় পেলেও মনে মনে ভাবি – লড়ে যাব, যখন পিএইচডি করতেই ঢুকেছি আর গাইড যখন আছেনই, নিশ্চয়ই তিনিও সাহায্য করবেন। মুশকিল হচ্ছে, ‘লড়ে যাব’ ভাবলেই হয় না, কোথা থেকে লড়াইটা শুরু করব – সেটাও ভাবতে হয়। সেই ধরতাইটা একবার কেউ ধরিয়ে দিলে তারপর বাকিটা বুঝে নেওয়া গেলেও যেতে পারে। আমার গাইড আমার ‘কোড’ না লিখতে পারার এই অপরাগতা কয়েকদিনেই বুঝে যান এবং তার পর থেকে শুরু হয় তাঁর ‘বুলি’ করা। তিনি বিভিন্ন সময় তাঁর অফিসে আমাকে ডাকতেন, নানারকম ‘কোড’ লিখতে দিতেন এবং বলতেন পরদিন এসে সেটা দেখাতে। অত্যন্ত সাধু ফ্রয়েডিয়ান উদ্যোগ – যে জিনিসে ভয়, সেটাই বারংবার করে ভয় কাটানো। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ‘কোড’ লিখতে গেলে আগে জানতে হবে তার অন্তর্নিহিত ফিজিক্সটা কী। তবেই তো বুঝব – কেন লিখছি, কী লিখছি আর কীভাবে লিখতে হবে। আমার উদ্দেশ্য তো স্রেফ ‘কোড’ লেখা নয়, বরং সেটিকে একটা ‘টুল’ হিসেবে ব্যবহার করা। সেইটা আমাকে কখনই বলা হত না। ফলস্বরূপ সেইসব ‘কোড’-এর কোনোটাই আমি লিখতে পারতাম না এবং গাইডের অফিসে রুদ্ধদ্বার কক্ষে যৎপরোনাস্তি অপমানিত হতাম। সেইসব ‘অপমান’-এর মধ্যে আমার বুদ্ধি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ, পিএইচডি ছেড়ে অন্য চাকরির ব্যবস্থা দেখা এবং ‘আমি সত্যি চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি’ – এই বাক্যের পুরোটাই যে মিথ্যে এবং আমি সারাদিন খেলে বেড়িয়ে কাটাই – এই দাবিতে আমাকে প্রকাণ্ড মিথ্যেবাদী প্রমাণ করা ইত্যাদি – সবই থাকত।

    তারপর থেকে আমার যেটা শুরু হল, সেটা ভয় পাওয়া। আমি আমার গাইডের ‘কাল সকালে দেখা করবে’ ইমেল পাওয়া মাত্র কীর’ম একটা ‘নাম্ব’ হয়ে যেতাম। রাতে ঘুমোতে পারতাম না এই ভেবে, যে, কাল আমাকে যেটা করে দেখাতে বলেছে – সেটা আমি পারিনি এবং তার জন্যে আমাকে অপমানিত হতে হবে। এবং বলাই বাহুল্য, হতও তাই। গাইডের সাথে মুখোমুখি দেখা হয়ে যাবে – সেই ভয়ে ইন্সটিটিউটে আমি লুকিয়ে ঢুকতাম আর বেরোতাম। ভদ্রলোক বোধহয় রোজ বসে বসে নতুন নতুন অপমান করবার পন্থা ভেবে বের করতেন। একদিন আমাকে সকালে ডাকলেন অফিসে। আমি ঢুকতেই একগাল হেসে ‘গুড মর্নিং’ বলে জিজ্ঞেস করলেন চা খাব কি না। আমি মাথা নেড়ে না বললাম। তো, উনি নিজের জন্যে এককাপ চা বানিয়ে আমার সামনের চেয়ারে বসলেন। আমাদের মাঝে দুটো কম্পিউটার স্ক্রিন। তার একটাকে আমার দিকে ঘুরিয়ে বললেন, ‘আজ তোমাকে একটা জিনিস শেখাব।’ আমি ভাবলাম আজ বোধহয় ওঁর ‘মুড’ ভাল আছে, কিছু একটা নতুন কাজ-টাজ দেবেন। উনি কম্পিউটার স্ক্রিন-এ গুগল-এর হোমপেজ খুলে আমাকে বললেন, ‘বল তো এইটা কী?’ আমি মিনমিন করে বললাম ‘সার্চ ইঞ্জিন’। উনি বললেন, ‘বাহ্! তুমি তো জানো দেখছি। এবার আমি তোমাকে দেখাব কীভাবে সার্চ করতে হয়। তুমি সেইটা জানো না, নইলে ‘ওই কাজ’টা করে ফেলতে পারতে।’ আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। উনি চায়ের সাথে বিস্কুটের অভাব আমাকে দিয়ে পূরণ করলেন। এসবের ফলস্বরূপ – যে বিষয়ের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল, তার প্রতিই প্রবল বিতৃষ্ণা তৈরি হল এবং সাথে সাথেই প্রবল হীনমন্যতা। ক্রমাগত মনে হত, সত্যিই আমি আমার নিজের এবিলিটিকে ওভারএস্টিমেট করে ফেলেছি, রিসার্চ চূড়ান্ত প্রতিভাবান মানুষদের জায়গা এবং আমি তাদের ধারকাছ দিয়েও যাই না। এখন এই সমস্যা আমি কাকে জানাব? অনেকেই বলেন, ডিপ্রেশান হলেই কথা বলতে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমি কী বলব? যে আমি কীভাবে কোড লিখব বুঝছি না বলে আমার গাইড আমাকে হেনস্থা করছে? কাকে বলব এ কথা? সে শুনেই বা কী সাহায্য করবে? কোডটা লিখে দেবে? স্বভাবতই আমি ইন্সটিটিউট ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সেখানেও বয়েলিং ফ্রগ সিনড্রোম কাজ করে। একটা জায়গায় সুযোগ পেয়েছি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, সেটা ছেড়ে দিলে যদি আর কোথাও না পাই? দোষ নির্ঘাৎ আমারই, আমাকেই আরও পরিশ্রম করতে হবে, গাইড কীভাবে ভুল হতে পারেন? এত ছেলেমেয়ে তো কাজ করছে – কই কারুর তো আমার মত অবস্থা না? দেখাই যাক না, যদি পরিস্থিতির উন্নতি হয়? এইসব দোলাচলতার মধ্যে আমার প্রায় আড়াই বছর কেটে যায় ইন্সটিটিউট ছাড়বার স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে। আমার গাইডের সঙ্গে আমার শেষ এনকাউন্টারটি আরও চমকপ্রদ। এক সন্ধেবেলা, আমার নির্বুদ্ধিতায় হতাশ-উনি আমাকে অফিসে ডেকে পাঠান। আমাকে একটি স্টেপলারের মত জিনিস দেখিয়ে জিগেস করেন, ‘বল তো এইটা কী?’ আমি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বুঝতে না পেরে ওঁকে বলি, যে, আমি জানি না এর কী কাজ। উনি বলেন, ‘তোমাকে আমি চব্বিশ ঘণ্টা দিলাম, তার মধ্যে তুমি জেনে এসে বল – এইটা কী কাজে ব্যবহার করা হয়। তুমি এটা সঙ্গে নিয়ে যাও, অন্যদেরকে দেখাও, কিন্তু কাল যেন আমি তোমার থেকে সঠিক উত্তর পাই।’ এমনই দুর্ভাগ্য, যে সেটারও উত্তর আমি দিতে পারিনি পরদিন। উনি তখন বেশ একটা হাইক্লাস হাসি হেসে আমাকে বলেন, ‘একেই বলে রিসার্চ, বুঝেছ?’

    আমি এই ঘটনার একমাস পর ইন্সটিটিউট ছাড়ি। পরে জানতে পারি, যে জিনিসটির আত্মার স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে উনি আমাকে দিয়েছিলেন – সেটি একটি বিদগুটে দেখতে স্টেপলারের পিন তোলবার যন্ত্র। এর মধ্যে অবশ্য আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। একটি অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের কোর্স করাবার জন্যে আমাকে আমার গাইড বলেন। সেখানে প্রথম বা দ্বিতীয় দিন ক্লাস শুরু হতেই প্রফেসর বলেন, উনি কয়েকটি বিষয় দেবেন এবং গ্র্যাজুয়েশন ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের (BS -MS) ছাত্রছাত্রীদের তার মধ্যে থেকে একটিকে বেছে নিয়ে প্রজেক্ট করতে হবে। কিন্তু পিএইচডি করছে যারা – তাদের ক্ষেত্রে সেটা বাধ্যতামূলক না, কেউ ইচ্ছে করলে করতে পারে যদিও। তো তিনি ক্লাসে জিগেস করছেন, কে কে কোন বিষয়টি নিতে চায়, ক্রমে আমারও পালা এল। আমি তখন এমনিতেই নিজের কাজ নিয়েই জর্জরিত, বোঝার ওপর শাকের আঁটি নেওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। আমি বললাম, যে, না আমি করতে চাইনা। উনি তৎক্ষণাৎ আমাকে জিগেস করলেন, ‘তাহলে ক্লাসে এসেছো কেন? আমার মুখ দেখার জন্যে?’ আমি কী আর বলব, কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে, ‘আমি তো স্যার পিএইচডিতে’ বলে বসে পড়লাম। বেশ এক ঘর ছাত্রছাত্রীর মাঝে সুন্দর একটা হেনস্থা-দৃশ্য তৈরি হল। এর কিছুদিন পর একটি সেমিনারে উক্ত প্রফেসর তাঁর নিজেরই সিনিয়র রিসার্চ স্কলারকে পাঁচ মিনিট দেরি করে ঢোকার জন্যে আমাদের সামনেই বললেন (ইংরিজিতে), ‘তোমার হাতে ঘড়ি আছে দেখছি, তুমি ওটা দেখতে জানো? গাধা কোথাকার! আর জীবনে যেন দেরি না হয়।’ তারপর শুনলাম উনি নাকি ওর’ম বলেই থাকেন, ওটাই ওঁর বিশেষত্ব। রিসার্চ স্কলারদের সর্বসমক্ষে যা খুশি বলে দেওয়া। থিওরেটিক্যাল কনডেন্সড ম্যাটারের এক ‘প্রতিভাধর’ অধ্যাপক, আমারই সমসাময়িক এক বন্ধুকে শুধু ঘাড় ধরে নিজের গ্রুপ থেকে বের করে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, সাথে উনি এটাও এনশিওর করেন, যে, সে যেন ইনস্টিটিউটে আরে কারোর কাছেই কাজ না করতে পারে।

    আমার সমসাময়িক যারা আমার সাথেই পিএইচডি করতে ঢুকেছিল, ইনস্টিটিউট ছেড়ে চলে আসার পর শুনলাম, তাদের অনেকের জীবনই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তাদের গাইডদের কল্যাণে। তাদের মধ্যে অনেকের সাথেই এখনও কথা হয় এবং তারা যে থিসিস জমা করে শেষ অবধি ওই ইনস্টিটিউট থেকে বেরোতে পেরেছে – এতেই যথেষ্ট খুশি হয়। তাদের মধ্যেই একজনকে – সে-ও ঢুকেছিল থিওরিটিক্যাল কনডেন্সড ম্যাটারে পিএইচডি করতে – তার গাইড বলেছিলেন, ‘তোমার জ্ঞান এতটাই কম – তুমি নিজেই জানো না যে তুমি কতটা কম জানো।’ তার মনের যথেষ্ট জোর ছিল বলে সেখানেই দাঁত কামড়ে পিএইচডি শেষ করে এবং বিদেশে পোস্টডক করতে চলে যায়। এর’ম উদাহরণ যে আরও কত আছে – লিখতে গেলে বছরখানেক লাগবে মনে হয়। এ হেন একটি বিষাক্ত পরিবেশ যে ইনস্টিটিউটে সযত্নে লালন করা হয়, সেখানে একজন রিসার্চ ফেলো আজ যখন আত্মহত্যা করেন – সেই সংবাদ আমাকে খুব একটা আশ্চর্য করে না। বরং এইটা ভেবে দুঃখ হয়, যে এই পরিবেশটিকে সেখানে নর্ম্যালাইজ করে ফেলা হয়েছে। সেখানে ধরেই নেওয়া হয়েছে, একজন অধ্যাপক তাঁরই সিনিয়র রিসার্চ স্কলারকে সর্বসমক্ষে ‘গাধা’ বলতেই পারেন, কারণ ওটাই ওঁর ‘স্টাইল’। সেখানে ধরেই নেওয়া হয়েছে, পিএইচডি করতে যারা এসেছে – তারা সকলেই নির্বোধ, অপোগণ্ড, অলস এবং তাদের উচিৎ ছিল আগেভাগেই সবকিছু জেনে আসা আর এখানে এসে স্রেফ ডিগ্রিটি নিয়ে কেটে পড়া। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেখানকার প্রবীণ অধ্যাপকরা এসব জেনেও দু’চোখে ঠুলি আর কানে তুলো দিয়ে বসে থাকেন। প্রসঙ্গত, সেই সর্বসমক্ষে ‘গাধা’ বলে দেওয়া অধ্যাপক, রিসার্চ স্কলারের আত্মহত্যার এক-দু’দিন পরই নিজের গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে (তাঁর একটি আবার আলাদা গালভরা নামের গ্রুপ আছে) একটি পার্টি করেন গেস্টহাউসের ঘরে। সেই গেস্টহাউসেরই ওপর-তলাতেই মৃত ছেলেটির মা ছিলেন তখন। কতটা নির্লজ্জ হলে অধ্যাপক হওয়া যায়?

    আমি এখনও বিশ্বাস করি, সেইসব দিনগুলোতে আমার গাইড আমাকে দুচ্ছাই করে হ্যাটা না করে যদি দুটো ভাল কথা বলতেন, একটু দেখিয়ে দিতেন – কোন পথে হাঁটলে সুবিধে হয়, আমার হয়তো আড়াইটে বছর নষ্ট হত না। শুধু সময়ের দিক দিয়েই নয়, আমাকে এই অহেতুক মানসিক পীড়াও সহ্য করতে হত না। এর মানে কি উনি কাউকেই গাইড করতে পারেননি? উনি নিজে একজন খারাপ গবেষক? মোটেই না। অনেক ছাত্রছাত্রী ওঁর সাথে কাজ করেছে, ভাল ভাল জায়গায় পৌঁছে গেছে – এখনও করছে, ভবিষ্যতেও করবে। কিন্তু যারা সেইসব অসামান্য প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীদের দলে পড়ে না, যারা আমার মত – তাদের ‘তুমি অপদার্থ, তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না’ বলে কি এত সহজেই দাগিয়ে দেওয়া যায়? নাকি তাকে দিনের পর দিন নিজের অফিসে ডেকে ‘বুলি’ করলেই তার আজ্ঞাচক্র উন্মুক্ত হয়ে হু-হু করে অতিমানবীয় ব্রেনওয়েভ জেনারেট করতে শুরু করে? আমাকে আমার তত্কালীন গাইড বলেছিলেন, ‘তোমার পিএইচডি – তোমার দায়িত্ব। আমাকে বলে কী হবে, তুমি কেন প্রব্লেম সল্ভ করতে পারছ না?’ এখন মনে হয় এ তো মারাত্মক অক্সিমোরন! উনিই ‘গাইড’ আর উনিই বলছেন, ওই যে সামনে হিমালয় – কোনদিক দিয়ে উঠবে নিজে বুঝে নাও, আমাকে বাপু জ্বালাতে এসো না! আরও বেশি ভয় লাগে, যে, এঁদের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে যেসব ছাত্রছাত্রী হাটে-বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তারাও একইরকম স্যাডিস্ট হয় না তো? এভাবেই বংশপরম্পরায় এই ‘কালচার’ চলতেই থাকে।

    ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে, অ্যাকাডেমিয়া-তে কীভাবে এর’ম সংকীর্ণ মনের মানুষ তৈরি হয়? শিক্ষা তো মনের প্রসার ঘটায়, মানুষকে বিনয়ী করে, এম্প্যাথেটিক হতে শেখায়। তাহলে এঁরা এর’ম কেন? আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা কাজ করে, যে, যিনি বেশ নামী জায়গা থেকে বড় বড় ডিগ্রি, উপাধি ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন এবং কথায় কথায় ‘আমি অমুককে চিনি’ বা ‘তমুক আর আমি একই টেবিলে বসে খেতাম’ – ইত্যাদি বলেন, তাঁর সাতখুন মাফ। তিনি ইচ্ছে করলেই হাতে মাথা কেটে নিতে পারেন, ইচ্ছে হলেই ডেকে নিয়ে দু’গালে চড় কষিয়ে দিতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে চুপচাপ মেনে নেওয়াটাই শ্রেয়, কারণ তাঁর অনেক ক্ষমতা। IISER Kolkata-র অফিসিয়াল স্টেটমেন্টটি দেখে ঠিক সেটাই মনে হল। ভাবটা অনেকটা “এর’ম ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু মাথায় রাখবেন, যে উনি অমুক জায়গা থেকে গামছা কিনতেন এককালে” ইত্যাদি, অতএব উনি সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। এই ক্ষমতার সুযোগ নিয়েই বহু উচ্চপদে আসীন অ্যাকাডেমিশিয়ানরা বিভিন্ন রিসার্চ ইনস্টিট্যুটে বছরের পর বছর কাজ না করে নানাবিধ ইতরামি করে চলেন, যার খেসারত দিতে হয় রিসার্চ স্কলারদের। ‘কাজে প্রগ্রেস হচ্ছে না?’ রিসার্চ স্কলারের দোষ, ‘সময়মত থিসিস জমা করতে পারনি?’ রিসার্চ স্কলারের দোষ, ‘সে কী! মারা গ্যালে নাকি?’ রিসার্চ স্কলারের দোষ; কারণ সুপারভাইসার তো সাধক, তিনি জ্ঞানসাগরে সেই যে ডুব মেরেছেন, তারপর থেকে ওঠার নামটি নেই, স্কলারের পেটি ইমোশান ধুয়ে কি তিনি জল খাবেন? এখানে শুধু একজন বা দশজন গাইডকে দুষে অবশ্য লাভ নেই, আঙুল তোলা উচিত সেই সিস্টেমের দিকে – যা চোখের সামনে এগুলি ঘটছে দেখেও এইসব মানুষদের(?) পোষে, যথেচ্ছ লাই দেয় আর আত্মহত্যায় পরোক্ষে প্ররোচনা দেয়।

    রিসার্চার হিসেবে আমি নিজে খুব সাধারণ মানের, কোনোভাবে টিকে গেছি বহু প্রতিভার এই জঙ্গলে। কিন্তু প্রায় বছর আষ্টেক কাজ করবার সুবাদে এ’টুকু বুঝেছি, পিএইচডি বিষয়টা নিরানব্বই শতাংশ পরিশ্রম (বুদ্ধি তো কমবেশি সকলেরই থাকে, তাই না?)। আর এক শতাংশ অনুপ্রেরণা, যেটা একমাত্র একজন গাইডই দিতে পারে। আর ওই এক শতাংশ অনুপ্রেরণাই বহু প্রতিভাকে ম্লান করে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট।




    IISER Kolkata-র অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট (মূল ট্যুইট)


    ছবি - Elīna Arāja
  • | রেটিং ৪.৯ (৭ জন) | বিভাগ : আলোচনা | ১২ এপ্রিল ২০২২ | ৫২৮৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Somnath | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২১:০৯506334
  • যেহেতু সাবজেক্টিভ আলোচনা হচ্ছে, দশ বছরে এদেশের পিএইচডি ছাত্রছাত্রীদের একটা ভিজিবল  (যদিও ছোট) অংশে একটা ইন্টারেস্টিং ট্রেন্ড দেখেছি।  এদের গাইডরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফ, কেউ কেউ অ্যাসোসিয়েটও। এইবার বহু আই আই টিতেই প্রোমোশন পেতে গাইডকে একটা ন্যূনতম সংখ্যায় পি এইচ ডি সুপারভাইজ করাতে হয়, ছাত্রর থিসিস সাবমিট হলে তবেই গাইড প্রোমোটেড হবে। এই ব্যাপারটা ছাত্র ছাত্রীরা অনেকে জানে এবং একটা জায়গায় গাইড তাদের থিসিস লিখে দেয়।  আমি এরকম ছাত্রও দেখেছি যে এক্সপ্লিসিটলি গাইডকে বলেছে আপনার প্রোমোশনের ব্যাপারও তো আছে।
    বেশিরভাগ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফই তাদের প্রথম কিছু ছাত্রের থিসিস লিখে দিয়েছে। করাপশনটা দুদিক থেকেই এখানে। এইটা আমি যেটুকু বিদেশ দেখেছি জাস্ট চিন্তার অতীত।
  • Swarnendu Sil | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২১:১৪506335
  • @সোমনাথদা, এইটা লিখতে চাইছিলাম না। এইটা শুধু আইআইটিগুলোতে নয়, সম্ভবত সবগুলোতেই আছে। এবং শুধু থিসিস লিখে দেওয়া না, ছাত্র কিসস্যু করে নি তাই তাকে ডিগ্রিটা দিতে এক্সটার্নাল রেফারি হওয়ার জন্যে বন্ধুবান্ধবদের বলছে এসবও দেখেছি। কিন্তু এসব লিখলে কার আবার কখন 'পক্ষপাতটা স্পষ্ট বোঝা যায়' মনে হবে কে জানে, তাই লিখিনি। তুমি লিখেই দিলে, তাই যোগ করে দিলাম।  
  • Somnath | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২১:১৯506336
  • এক্সটার্নাল রেফারি বন্ধুবান্ধবদেরই করতে হয়। নইলে থিসিস জমা পড়বে ২২-এর মে-তে আর রিপোর্ট আসবে ২৪-এর জানুয়ারিতে এরকম কেস হয়ে যেতেই পারে।
  • Swarnendu Sil | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২১:২৩506337
  • সেটা না, মানে বলেই যে কিছুই করেনি, কিন্তু ডিগ্রিটা দিয়ে দিতে হবে, একটু দেখিস, এই মর্মে। 
  • Somnath | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২১:২৫506338
  • যাই হোক, একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে কথা হচ্ছে। তার থেকে কম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কম ঘটছে না, পাশাপাশি পাবলিক মানির হিউজ অপচয় তো ঘটছেই। সেইটা দেখিয়ে আবার বিজেপি সরকার টাকা বরাদ্দ বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু ইন্ডিভিজুয়াল ফ্যাকাল্টির দিকে আঙুল না তুলে সিস্টেমের দিকে আঙুল তোলা দরকার। যেমন প্রোমোশন পলিসি, যেমন ছাত্রের কাজ নিয়ে ডক্টরাল কমিটির শূন্য-ইন্টারেস্ট থাকা,গাইড বা ইনস্টির অন্য কারুর জন্য তার সমস্যা হলে সেটা জানানোরই জায়গা না থাকা (আমি বিদেশে এইটা করার প্রসেস দেখেছি), যেমন অ্যাডমিশন পলিসিতে রিসার্চ পোটেনশিয়াল জাজ না করা, - এইগুলো নিয়ে স্পেসিফিকালি কথা হওয়া দরকার। 
    তবে, আইসারের নোটিশ দেখার পর ইন্সটিটিউট আসলে এই সিস্টেম পাল্টাতে চায় না তা পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে।
  • প্যালারাম | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২১:৩৯506339
  • যদুবাবু 
    হ্যাঁ, সেইটে ভাবতে গিয়েই, স্বর্ণেন্দুবাবুর মতামতের খেইটা হারিয়ে গিয়েছিল। উনি, স্বাভাবিকভাবেই, খারাপ ব্যাপারগুলোর বিরোধিতা করছিলেন, কিন্তু তারপর কেন যে একটা কথাও বুঝতে পারছিলাম না, সেটা এই শেষের মন্তব্যটা দেখে, বুঝলাম। ওঁর দেখানো কারণটায় কোথাও - আমাদের দেশে কারা, কোন সমাজ থেকে, প্রতি মাসে কত টাকা পেয়ে, কোন পরিস্থিতিতে রিসার্চ করে - তার উল্লেখ নেই।
     
    আমি কোনোদিন বিদেশ যাইনি। তবু, এটুকু বোঝার হয়তো ক্ষমতা আছে, যে বিদেশ হলেই, সেখানে অ্যাকাডেমিয়ায় সমস্যা নেই - এমন নয়। বিদেশ বলতে এখানে প্রথম বিশ্ব বোঝানো হচ্ছে। হ্যাঁ,  চায়না সহ (কত করে টাকা পায় প্রতি মাসে লোকজন দেখলে বোঝা যাবে)। আমার দেশ তো তা নয়। তাই সেখানে একই মডেল খাটবে, এটাও প্রথম থেকে ধরে নেওয়াটা বায়াসড ডিশিসন হবে। "তোমার পিএইচডি তুমি করবে" - কথাটার প্রসার কতদূর, তার একটা মিনিমাম মাপকাঠি ঠিক না করলে, এর অপব্যবহার যে হবে, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে?
     
    স্বর্ণেন্দুবাবুর মন্তব্য বুঝলাম। শেষ মন্তব্যের শেষ প্যারার সঙ্গে আমি একমত নই। মাঝে 'প্রিমিয়ার ইন্সটিটিউট ' নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। সেগুলির সঙ্গেও নই। কেন, তা নিয়ে বলতে গেলে আরও ভাবতে, পড়তে, লিখতে হবে। চেষ্টা করছি, করবো সময় বের করার। ইত্যবসরে, এই লিঙ্কটা রেখে গেলাম।
  • Swarnendu Sil | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২২:০৪506343
  • @প্যালারাম, 

    বিদেশের অ্যাকাডেমিয়ায় সমস্যা নেই এইটা আবারও আমার বক্তব্য নয়। বাকি যে কথাগুলো লিখলেন সেসবে বহু কথা লিখতে হবে। প্রসঙ্গত আমিও এই দেশে এই সমাজ থেকেই প্রতি মাসে এখন যা পায় ছাত্রছাত্রীরা তার প্রায় তিনভাগের একভাগ টাকা পেয়ে ( তখন JRF স্কলারশিপ ছিল ১২০০০ টাকা, আমার পড়ার সময় বেড়ে ১৬ হয়) এদেশে ইন্টিগ্রেটেড পিএইচডি করতাম, তারপর দেশ ছাড়ি। আরও একটা কথা, ফ্যাকাল্টিরাও এই দেশের হারেই টাকা পান কিন্তু। যাই হোক, বাদ দিন। যদিও আমরা পরস্পরকে আদৌ চিনি না, তবুও আপনার কোন কারণে যখন ধারণা আমার পক্ষপাত স্পষ্ট যখন তখন আপনার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ আমার আর বেশি বাকি নেই। 

    আপনার শেয়ার করা পোস্টটা পড়লাম, খুবই ভাল পয়েন্ট। আরও বহু কথাই ওখানে লেখা যেত, তবে ৯ তারিখের পোস্ট, প্রায় নী-জার্ক রিয়াকশন, তাতে অত গুছিয়ে লেখাটা কারোর পক্ষেই সম্ভব না, অ্যালুমনিদের পক্ষে তো আরও না। 

    ও হ্যাঁ, সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ই, তবু আমার ঘটনাটা শোনার পর নী-জার্ক রিয়াকশনের পোস্টের লিঙ্কও রেখে গেলাম। আমার পক্ষপাত সম্পর্কে এ থেকে আপনার ধারণা কিছু পালটালে তাহলেই আপনার সাথে আলোচনা চালিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা, অন্যথায় তিক্ততা বাড়ছে শুধু। 
    https://www.facebook.com/sswarnendu/posts/5633122976704035  
  • জবরখাকি | 181.56.28.82 | ১৩ এপ্রিল ২০২২ ২৩:২২506344
  • যে রেটে লোকজন প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ, পয়েন্ট করে, রেফারেন্স দিয়ে, সুন্দর প্লট করে মোশানের পক্ষে এবং বিপক্ষে বক্তব্য রাখছেন দেখে বেশ আশা জাগছে যে মানুষের মধ্যে যুক্তি জিনিসটা এখনো বেঁচে আছে। একটু আবার চিন্তাও হচ্ছে। আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত পোটেনশিয়াল গাইড, এক-দুটো স্টুডেন্ট হয়ত পিএইচডি করছে আপনাদের কাছে। আপনারা যখন এখানে এর ওর ভুল ধরাতে ব্যস্ত, আপনাদেরই কোন স্টুডেন্ট 'গাইড আমাকে সময় দেয়না' ভেবে সিলিং ফ্যানে দড়ি ঝোলাচ্ছে না তো? গাইড এদিকে বৃহত্তর স্বার্থের জন্যে গুরুচন্ডালীতে কোমর বেঁধে ঝগড়া করছেন। একটু খেয়াল রাখবেন সেটা যেন না হয়।  
  • যদুবাবু | ১৪ এপ্রিল ২০২২ ০১:০৩506345
  • প্যালাদার শেয়ার করা অর্চিস্মিতা-র লেখাটি ভালো লেগেছে।  স্বর্ণেন্দু-র ফেসবুক পোস্টটিও। 

    ইনস্টি-র দায়িত্ব তো থাকবেই, তবে তার বাইরে কিছু ইনফর্ম্যাল পিয়ার সাপোর্ট গ্রূপ তৈরি করা যায়? মানে কয়েকজন কনসার্ণড, দায়িত্ববান, সেনসিটিভ ফ্যাকাল্টি এবং সিনিয়র স্টুডেন্ট নিয়ে একটা গ্রূপ টাইপের, যেখানে চাইলে কোনো স্টুডেন্ট/ফ্যাকাল্টি এসে কথা বলতে পারবেন এবং তাঁদের ঘাড়ে ইনস্টির খাঁড়া নেই? কী সমস্যা হচ্ছে, কিছু করা যায় কি না ইত্যাদি নিয়ে কথাও বলতে পারবে, বা দরকার হলে কেরিয়ার কাউন্সেলিং বা অন্য কিছু। অবশ্য এতো বিশাল সংখ্যক ছাত্র/ফ্যাকাল্টি-র জন্য গুটিকয়েক লোক একেবারেই বালির বাঁধ + কয়জন সময় দেবে সেও এক চিন্তা  -- কিন্তু তাও কোথাও একটা শুরু করা যায়? বা অলরেডি কি এরকম আছে? নেহাত-ই কপোলকল্পনা মনে হলে ইগনোর করুন প্লীজ। 
    (আমি ফেসবুকের স্টেম-পিয়ার্স নামে একটি গ্রূপের কথা জানি, তারাও ভালই তবে আমি ওদের কর্মকাণ্ডের সাথে পরিচিত নই সেভাবে।) 

    @জবরখাকিঃ সবাইকে একসাথে প্রশ্ন করলে তো উত্তর দেওয়া মুশকিল, তবে, না আমার কোনো স্টুডেন্ট 'সময় দেয়নি' বলতে পারবে না এ কথা দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি। 
  • Swarnendu Sil | ১৪ এপ্রিল ২০২২ ০৯:০২506353
  • @জবরখাকি, 

    আগেও লিখেছি, গ্রস মিসহ্যান্ডলিং ছাড়া এসব ঘটনা ঘটে না। 'গাইড সময় দেয় না বলে ঝুলে পড়ল' -- এভাবে বিষয়টা পুট করার মধ্যে একটা ট্রিভিলাইজেশন আছে। বিষয়টা আদৌ অত ট্রিভিয়াল না। 

    তাছাড়া এই 'সময় দেওয়া' নিয়ে আমার পজিশন সম্ভবত আমার লেখায় এমনিই বোঝা যাচ্ছে। আমি বসে অঙ্ক করে না দিলে আমার স্টুডেন্ট যদি ভাবে যে তার অঙ্কটা হবে না, তাহলে কোথাও একটা I failed in my job already. আর অল্প কদিন বাদেই তাকে কেউ অঙ্ক করে দেবে না, তার আর কদিন বাদে তার স্টুডেন্টরা এক্সপেক্ট করবে যে সে তাদের অঙ্ক বসে করে দেবে। স্টুডেন্ট যখন 'এটা পারছি না', 'ধুর এটা আমার দ্বারা হবে না'  ভাবে, তখন তাকে ' আরে হবে হবে, ঠিকই হবে। অমুকভাবে চেষ্টা করো, তমুকভাবে চেষ্টা করো, আমার খুব মনে হচ্ছে এটা হয়েই যাবে' বললেই দিব্যি হয় বলেই তো দেখি। তাকে অঙ্কটা করে দিয়ে বামন করে রাখতে হওয়ার দরকার তো এখনো ফীল করিনি। আর আমার অল্প অভিজ্ঞতায় স্টুডেন্টরা নিজেরাই 'পারছি না, হচ্ছে না' বলে ও ভাবে। এই লেখার ঘটনার মত যেসব গাইড সেইটাই রিইনফোর্স করেন আরও, তাঁদেরকে আমার নিদেনপক্ষে গাড়ল ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।  

    আর আপনার কোমর বেঁধে ঝগড়া মনে হতেই পারে, কিন্তু কাউকে না কাউকে তো কথা বলতে হবে এসব নিয়ে। স্টুডেন্টরা বলে তাদের মত করে, কিন্তু এদেশে এডুকেশনের কালচার বেশ গুরুবাদী, স্টুডেন্টদের কোথায় কর্ণপাত করার রেওয়াজ বিশেষ নেইকো। ইন্সটিটিউটগুলো যা যা করে, সেগুলো ডাউনরাইট ন্যক্ক্বরজনক ( যেমন এই আইসার কলকাতা ) থেকে শুরু করে অ্যাট বেস্ট ইনেফেক্টিভ ( যেমন আমার ইন্সটিটিউট এ সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেল, সেখানে যে সাইক্রায়াটিস্টরা বসেন তাঁরা অসম্ভব ভাল, সংবেদনশীল মানুষ, সেটাকে দাঁড় করাতে ওনাদের সত্যিকারের সৎ চেষ্টা আছে, কিন্তু সোশ্যাল ট্যাবুর পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এখনো স্টুডেন্টরা খুব তার সুবিধে নিতে যাচ্ছে এমন নয় বলেই তাঁদের থেকেই শুনেছি, ফলত এখনো ইনেফেক্টিভ ) কিম্বা হাস্যকর ( যেমন আমার ইন্সটিটিউট হস্টেল থেকে সব সিলিং ফ্যান খুলে নিয়ে গিয়ে স্ট্যান্ড ফ্যান দিয়েছে, যেন সিলিং ফ্যান না থাকলেই ঝাঁপ দেওয়ার জন্যে উঁচু জায়গার অভাব পড়বে )। 

    তাই ততদিন আমরা 'ভিলেন' রাই কথা বলি নাহয়। এমনিতেও দিনের শেষে আমরাই পিএইচডি স্টুডেন্টদের সবচেয়ে কাছাকাছি, অল্প কদিন বাদেই তারা আমাদের পজিশনে আসবে।     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন