এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হোটেল  ম্যানেজার - ১০ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২১৫ বার পঠিত
  • মনীষা যেমন বলেছিল, তার পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ শুভঙ্কর পালেরা তিলোত্তমা লজ ছেড়ে মেচেদার দিকে রওয়ানা দিল। অমিতাভ আর অলোক অফিসে চলে গেছে। মনীষা বেরোবার সময় দেখল ছ নম্বর ঘরে তালা মারা। বান্টি আর শুভঙ্কর আগেই নীচে নেমে গেছে। মনীষা ছ নম্বর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড কি ভাবল তারপর দ্রুতপায়ে নীচে নেমে গেল।
    দুলালের মনটা বেশ ফুরফুরে আছে । বরানগরে বাড়িতে একবার ফোন করে খবরাখবর নিল।শর্মিষ্ঠা এখন ভাল আছে। ওষুধপত্তর এখনও চলছে অবশ্য। শর্মিষ্ঠার ভাই দিব্যেন্দু অনেকটাই সামলে নিচ্ছে সব দিক দিয়ে। দুলালবাবুর দুই মেয়ের ওপরও চোখ বুঝে ভরসা করা যায়। তাদের দুজনের  টি উশানির কিছু রোজগার আছে। একটা সুসংবাদও পেল দুলাল। বড় মেয়ে ঈশিতা একটা টিভি চ্যানেলে গানের রিয়ালিটি শো-এর প্রাথমিক রাউন্ড পেরিয়েছে। অনেকেই নাকি বলেছে মূল পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ঈশিতার। এইসব ছোট ছোট সুখের খবর মানুষের মনে মনোরম ফাল্গুনী হাওয়া বইয়ে দেয়। দুলাল লজ থেকে বেরিয়ে থানা পেরিয়ে একটুখানি গিয়ে একটা দোকানে বসল।কাঁথির বিখ্যাত দুটো মিষ্টি হল মাখা সন্দেশ আর ছানাপোড়া। দুটোই একশ গ্রাম করে দিতে বলল দুলাল । মধুর মিষ্টান্ন মনের স্নিগ্ধতায় মিশে আরো বেশি সুস্বাদু লাগতে লাগল। তার মনে, কে জানে কেন নানা স্বপ্ন বাসা বাঁধতে লাগল। তার মনে হল, সে একটু ফাঁকা জায়গা দেখে দেড় দু কাঠা জমি কিনেছে। সেখানে বাগান সমেত একটা সুন্দর ছোট বাংলো গড়নের বাড়ি বানিয়েছ। তারপর ঘিঞ্জি বরানগর থেকে বেরিয়ে সেখানে চলে গেছে বাকী জীবনের জন্য। ঈশিতা প্রিয়াঙ্কা অনেক অনেক টাকা রোজগার করছে। ওরা দুজনেই গাড়ি কিনেছে। শর্মিষ্ঠার আর কোন কষ্ট নেই। তাকে বাড়ির  কোন কাজ করতে হয় না। দুটো লোক রাখা হয়েছে। একজন রান্না করে । আর একজন অন্য সব কাজ করে।তার কাছে রাতদিন ফোন আসে। অনেকে ধরাধরি করে ঈশিতা প্রিয়াংকাকে তাদের অনুষ্ঠানে গান গাইতে রাজি করানোর জন্য। মেয়েদের বিয়ে নিয়েও নানা সুখস্বপ্ন ভেসে উঠতে লাগল। দুলাল কল্পনেত্রে দেখতে লাগল সূর্যকান্ত স্যার বর কনেকে আশীর্বাদ করছেন। মানে, প্রিয়াঙ্কা এবং ঈশিতা আর তাদের বরদের। থানার বড়বাবু কমলেশ্বর হাজরা আর তিলোত্তমার মালিক মাখনলাল শীলকে আর পাত্তা দেবার দরকার নেই। বাড়ির একতলার গোলাকার বারান্দায় একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে সে সামনের বাগানের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবে। দুটো বড় নিমগাছ আর একটা তেঁতুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে বাগানে । একটা লম্বা সপ্তপর্ণী ফুলের গাছও আছে। পাঁচিলের ধারে দুটো টগর ফুলের গাছ হয়েছে। একটা নারকেল গাছ একটু একটু করে বড় হয়ে উঠছে। শর্মিষ্ঠা পাঁচিলের ধারে টগর গাছ থেকে টগর ফুল তুলছে। তার মা-ও টগর ফুল তুলত।তারা তখন বাগনানে থাকত। বাগনানে থাকতে থাকতেই মা তাদের ছেড়ে চলে গেল । তলপেটে কি একটা হয়েছিল। জোরদার চিকিৎসা করলে হয়ত মা বাঁচত। পয়সা ছিল না। দু বছর পরে বাবাও চলে গেল। ঘুমের ঘোরে হার্টফেল করে গেল। ডাক্তার এসে মায়োকার্ডিয়াক রেসপিরেটরি ফেলিওর না এই গোছের কি একটা বলল। তার বয়েস তখন কুড়ি বছর ।তার দুটো ভাই ছিল। একটা ওপরের, একটা নীচের। তারা দুজন করিতকর্মা ছেলে।একজন নয়ডায় আর একজন মুম্বাইয়ে কি সব কাজকর্মের ব্যবস্থা করে চলে গেল। দুলাল একেবারেই নি:সঙ্গ হয়ে গেল। কিন্তু নিয়তি কোন প্রাণীকে জিইয়ে রাখার জন্য জিয়ল মাছের মতো বেঁচে থাকার মতো একটু জলের ব্যবস্থা করে রাখে। সেটার জন্য তাকে মঙ্গলময় বলা যায়, না গূঢ় উদ্দেশ্যপ্রবণ বলা উচিৎ সেটা অন্য কিস্যা। দুলাল ওসব নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায়নি ।যাই হোক, শর্মিষ্ঠা নিয়তি প্রেরিত সেই জল হয়ে দুলালের জীবনে এল। হাওড়া স্টেশনে নিয়তির বিধান অনুসারে পরিচয় হয়েছিল। পরিচয় ফাঁকতালে হতেই পারে। কিন্তু দুলালকে কি করে তার মনে ধরল সেটাই আশ্চর্য। দুলাল সেকেন্ড ডিভিশানে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর আর পড়াশোনা চালাবার অবস্থায় ছিল না। হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছিল। তার একটা পুরণো সাইকেল ছিল। তাতে চড়ে অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ করতে লাগল। তার স্কুলের এক বন্ধু লাইনটা ধরিয়ে দিয়েছিল। শর্মিষ্ঠাদের অবস্থা মোটেই খারাপ ছিল না। তার বাবা মা একদমই রাজি ছিল না এ সম্পর্কে। কিন্তু ওই.... যার যেথা মজে মন..... ।দুলালের ওপর শর্মিষ্ঠার আকর্ষণের মূল কারণ বোধহয় দুলালের নির্ভেজাল সারল্য ও সততা। বাবা মার অমতে বিয়ে করার ফলে শ্বশুরবাডির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই দুলাল সরকারের। অনেক এ পথে সে পথে ঘুরে ঘুরে শেষে তিলোত্তমায় এসে ঢুকল। বড় মেয়ে ঈশিতার বয়স তখন দশ বছর। চাকরিটা হল বাগনানে ক্ষিতীশ সাঁতরার মাধ্যমে। মাখনলাল শীলের সঙ্গে তার ভালরকম দহরম মহরম ছিল। ক্ষিতীশ সাঁতরা স্বর্নব্যবসায়ী। বহুবছর ধরে মাখনলাল পরিবারের গয়না গড়াবার কাজে যুক্ত। যাই হোক তার সুপারিশেই দুলাল তিলোত্তমার ম্যানেজার হল।তারপরেই বাগনান ছেড়ে বরানগরে এল।দুই মেয়ে হয়ে গেছে ততদিনে। তারা বড় হচ্ছে আস্তে আস্তে। তাদের পড়াশোনার কথা চিন্তা করে প্রধানত শর্মিষ্ঠার ইচ্ছেতে ঠাঁই বদল করে কলকাতায় চলে গেল তারা। এ ব্যাপারেও ক্ষিতীশ সাঁতরার যথেষ্ট অবদান আছে। দুলালের বাবার ওপর তার একটা অন্তরের টান ছিল।তার থেকেই তার ছেলের ওপর স্নেহের টান।

    — ‘ চা খাবেন নাকি দাদা ? আর কিছু দেব ? ‘ দোকানের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।
    — ‘ চা ? হ্যাঁ দাও। দুধ চা হবে তো ? ‘ দুলাল বলে ।
    — ‘ হবে ‘
    — ‘ দে একটা ‘
    তা , পঞ্চাশ টাকার ওপর খরচ হয়ে যাবে , দুলাল ভাবে। তারপর ভাবে ও একদিন হচ্ছে হোক । রোজ তো আর এত খাচ্ছি না। দুলাল নিজেকে বোঝায়। মায়ের কথা মনে পড়ল দুলালের — ‘ বেশি কষ্ট করিস না রে দুলাল..... বেশি কষ্ট করলে ভগবান তাদের অারও কষ্ট দেন....। ভগবানের এই ধরনের নিয়ম কানুন সংক্রান্ত নানা কথা মায়ের মুখে হামেশাই শোনা যেত। যেমন, ‘ যার কেউ নেই তার ভগবান আছে ‘ বা ‘ভগবানের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না’ কিংবা ‘ কষ্ট দিয়ে দিয়ে ভগবান কোন মানুষকে তার কাছে টেনে নেন’ এইরকম আর কি । ভগবান স্যার ঠি ক কেমন স্বভাবের দুলাল তা এখনও ভাল বোঝে না। তবে মায়ের কথাগুলো খুব ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে মস্তিষ্কে মিশে গেছে। সে ভেবে পায় না, যার জীবনে কষ্ট ছাড়া আর কিছুর জায়গা নেই সে কষ্ট না করে যাবে কোথায়। অদৃশ্য অচেনা অজানা শত্রুর সঙ্গে সে লড়বে কি করে !  এই শত্রুকে চেষ্টা করলেই দূরে ভাগিয়ে দেওয়া যায় না। সে মহা পরাক্রমশালী। তার সঙ্গে মানুষের লড়াই অনেকটা অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত কারও সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করার সমান।
    কাকে কোথায় জড়িয়ে দেওয়া হবে কেউ জানে না। সেখান থেকে বেরোবার জন্য ছটফট করতে থাকলে পাকে পাকে আরও জড়িয়ে যেতে হবে। যেমন এই নিখিল দাস গেছে। 
    দোকান থেকে বেরিয়ে দুলাল দেখল নিখিল আর অনিন্দিতা একটা রিক্সা করে যাচ্ছে। দুলালকে দেখে নিখিল চলন্ত রিক্শা থেকে ডান হাতটা ওঠাল। যার মানে হল, এখন একটু ব্যস্ত আছি । পরে সব বলব ....।প্রত্তুত্তরে দুলালও হাত ওঠাল।

       উকিলের নাম সৌম্যশেখর দিন্দা। বয়স বেশি না। বড় জোর চল্লিশ। এর মধ্যেই ফৌজদারি মামলার উকিল হিসেবে যথেষ্ট পশার হয়েছে। নিখিলের সঙ্গে ভালরকম পরিচয় আছে। কি করে পরিচয় হল এবং ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল সেটা অন্য কাহিনী । 
       সব শুনে সৌম্যশেখর বললেন, ‘আপনাদের দুজনের কদিনের পরিচয় ? ‘
     নিখিল বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, ‘ এ..ই মাসখানেক ‘
    সৌম্যশেখর আবার বললেন, ‘ আপনি কিন্তু একটু অ্যালুফ হয়ে যান এখন থেকে। মানে, আপনারা এখন এত মেলামেশা করবেন না।’
    — ‘ মানে ? ‘
    — ‘ মানে , আদারওয়াইজ আপনি ইনক্রিমিনেটেড হয়ে যেতে পারেন। অনিন্দিতাদেবীর  হাসব্যান্ডের এগেনস্টে পুলিশ যেমন আই পি সি তিনশো দুই আর্টিকেল-এ চার্জ এনে রিম্যান্ডে নিয়েছে শুধু প্রাইমা ফেসি এভিডেন্স-এর বেসিসে। সেই বেসিসে পুলিশ কিন্তু আপনাকেও কালপ্যাবল কগনিজেন্সে নিতে পারে , যদি পুলিশ এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ারে আপনাকেও একজন  পার্টি হিসেবে সাসপেক্ট করে ।তখন আপনিও সাসপেক্ট লিস্টে এসে যাবেন।
    শুনে নিখিলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বাকরুদ্ধ হয়ে হাঁ করে সৌম্যশেখরের দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক বাদে কাঁপা গলায় বলল, ‘ সে...ক্... কি !  মার্ডার হয়েছে দীঘায় .... আমি তো এখানে ..... ‘
    — ‘ মার্ডার নিজে না করেও কাউকে দিয়ে করানো যায়। অবশ্য ট্যানজিবল এভিডেন্স চাই। কিন্তু স্পটে আপনি ছিলেন না এটা কোন অ্যালিবাই হিসেবে ভ্যালিড হবে না। তবে আমার কথাগুলো আপনি ফেস ভ্যালুতে নেবেন না। আমি শুধু আপনাকে সতর্ক করলাম। অ্যাজ ইয়োর লইয়ার এটা আমার রেসপন্সিবিলিটি।’
    বিভ্রান্তিতে জড়সড় নিখিল বলে, 
    ‘এ...তো মহা মুশ্কিল। আপনি আমাকে কি করতে বলেন ? ‘
    — ‘ ওই যে বললাম ওনার সঙ্গে ডিসট্যান্স মেনটেন করুন। আপনাকে চেষ্টা করতে হবে আপনি যাতে এই কেসে পার্টি হয়ে না যান । এই পসিবিলিটিটা যে  ভাবেই হোক   অ্যাভয়েড করতে        হবে। না হলে পুলিশ ধরে নেবে ওনার ভাসুর খুনের পিছনে আপনার প্যালপ্যাবল মোটিভ আছে। ‘
    বলে সৌম্যশেখরবাবু একটু চুপ করে রইলেন। কি একটা দরকারি কাগজ মন দিয়ে পড়তে লাগলেন। ঘরে ফুল স্পীডে ফ্যান চলছে । ফিরফির করে আওয়াজ হচ্ছে। ঘামে নিখিলের শার্ট ভিজে গেল। অনিন্দিতা এতক্ষণ কোন কথা বলেনি। কি চিন্তা ভাবনা করছিল বলা মুশ্কিল। শুধু রুমাল দিয়ে বারবার মুখের ঘাম মুছছিল। নিখিলের মনে বারাসাতে তার ফ্যামিলির সদস্যদের মুখগুলো ভেসে উঠল।সেখানেও এক ঝঞ্ঝাট পাকিয়ে রেখেছে বড় মেয়েটা।
    পুরো পাতাটা পড়া হয়ে গেলে উকিলবাবু মুখ তুললেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিরে এলেন— ‘ হ্যাঁ যেটা বলছিলাম। আমরা আমাদের মুট পয়েন্ট থেকে সরে যাচ্ছি। অনিন্দিতাদেবীর হাসব্যান্ডের বেল-এর পিটিশান সাবমিট করা। আচ্ছা, বায় দা বায় ওদিকে প্লেনটিফ কে ? মানে, কেস কে লজ করেছে ? ‘
    অনিন্দিতা এতক্ষণে কথা বলল। বলল, ‘ আমার জা। মানে, ভাসুরের ওয়াইফ ।’
    একপরে প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সৌম্যশেখরবাবু সমস্ত ডিটেলস নোট করলেন । তারপর বললেন, ‘ঠি ক আছে। আজ আর কিছু কাজ নেই। আমি পিটিশান সাবমিট করার পর আপনাদের জানাব। ঠি ক আছে..... ‘ বলে চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন।
     কলসাল্টেশান ফি লাগল চার হাজার টাকা। তাও নিখিলের সঙ্গে পরিচয়ের সৌজন্যে। নাহলে আরও বেশি লাগত। বলাই বাহুল্য টাকাটা খসল নিখিলের পকেট থেকে।

      বেলা প্রায় একটা বাজে। শরতের জমজমে রোদ্দুর। ভ্যাপসা গরম। বিনবিনে ঘাম জমছে নাকে মুখে শরীরে। রাস্তায় বেরিয়ে নিখিল বলল, ‘ তুমি এখন বাড়ি ফিরে যাও । উকিলের কাছ থেকে খবর পেলে তোমার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করে নেব। এর মধ্যে আমাকে একদম ফোন করবে না। আর লজে তো আসবেই না। ‘ এই অব্দি বলে নিখিল একটা কটু কথা বলল, ‘ শালা তোমার পীরিতের নাঙ খালাস হয়েছে তার জন্য যত হ্যাপা আমার ..... আমি উকিল ধরিয়ে দিয়েছি , ব্যাস.... এবার মামলা সামলাবে তুমি। টাকাও দিতে পারব না আমি। রাস্তা দেখ। বেকার লাফড়ায় জড়িও না আমায় বলে দিলাম। খুব খারাপ হয়ে যাবে ..... ও..ই তোমার বাস আসছে উঠে যাও।’ নিখিল যে এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সেটা যে ভয়ের তাড়নায় সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
    অনিন্দিতা কোন প্রতিক্রিয়া দেবার আগেই নিখিল একটা রিক্শায় উঠে বলল, ‘ চল চল ‘।
    রিক্শাওয়ালা বোধহয় পরিচিত। সে তিলোত্তমা লজের দিকে প্যাডেল মারতে  লাগল।

     এর একঘন্টা পরে বেলা দুটোর সময় অমিতাভদের ব্রাঞ্চ অফিসে কলকাতার হেড অফিস থেকে একটা সার্কুলার এসে পৌঁছল। সঙ্গে ভি আর এস-এর অ্যাপ্লিকেশান ফর্মও পাঠিয়ে দিয়েছে। এই কোম্পানিতে অফিস জীবনের শেষ দিন হতে চলেছে তিরিশে  সেপ্টেম্বর। আজ থেকে ঠি ক একমাস। পুজোর আর দুমাস বাকি।
    অমিতাভ বাড়িতে আঁচ দিয়ে রেখেছে ঠি কই  তবে শেষের সে দিন এত তাড়াতাড়ি এসে যাবে সেটা আশা করেনি। কোম্পানি কি দেবে না দেবে সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে মুখে মুখে খবর পেয়েছে এককালীন থোক টাকা কিছু দেবে। আর ওই পি এফ-এর সামান্য কিছু টাকা।কালকে থেকেই অ্যাপ্লিকেশান নেওয়া শুরু হয়ে যাবে। অমিতাভ ঠি ক করল এক্ষুণি বাড়িতে কিছু জানাবে না। তিরিশে সেপ্টেম্বরের তিন চার দিন আগে সব জানাবে।
      অমিতাভ পাঁচটা নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।হাঁটতে হাঁটতে বাইপাসের মোড়ের দিকে যেতে লাগল। তারপর পশ্চিম দিক বরাবর হাঁটতে লাগল। বেলা অনেক ছোট হয়ে গেছে। এর মধ্যেই আলো পড়েছে ঝিমিয়ে।  সাঁঝের ছায়া আসছে ঘনিয়ে। রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায় চাষের জমি। আকাশ লাল করে সূয্যি পাটে যাচ্ছে। চাষীরা কেউ কেউ এখনও ক্ষেতে কাজ করছে। দু একজন আলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক ফাঁকা, শুনশান।অত দূর থেকে চাষীরা কেউ কথা বললে তা রাস্তা থেকে শোনা যাচ্ছে। বাতাস বইছে  হু হু করে। দীঘার সাগর পার  থেকে ঝুর ঝুর করে বয়ে আসছে অনাবিল হাওয়া। ক্রমে ক্রমে আলো কমে যাচ্ছে। লঙ্কা ক্ষেতে লঙ্কা, ঝিঙে ক্ষেতে ঝিঙে ভরে আছে। ছড়িয়ে আছে আদিগন্ত চরাচর। মনেই হচ্ছে না এ ধরণীতে কোথাও কিছু কম পড়েছে বলে। 
    অমিতাভ হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছে। একবার পিছন ফিরে দেখল বাইপাসের মোড়টা অস্পষ্ট আবছা দেখাচ্ছে। দুটো লোক সাইকেলে করে গেল খড়গপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে।রাস্তার পাশে একটা সিমেন্টের বেদী করা রয়েছে। অমিতাভ একটানা অনেকটা হেঁটে এসেছে। ভাবল এখানে একটু বসলে কেমন হয় ।  সে বেদীটায় ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করল বসার জন্য। 
    এমন সময়ে তার মোবাইল বেজে উঠল। অমিতাভ দেখল আননোন নাম্বার। বিভিন্ন কোম্পানির নানা অফারের ঠেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। ওসব কথা বলার মেজাজে নেই এখন অমিতাভ। সে লাইন কেটে দিল। বেদীটার ওপর বসে সুদূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল শূন্যমনে। এই সময়ে আবার তার মোবাইল ডেকে উঠল। অমিতাভ এবারে লাইন কাটল না। ভাবল, ধরেই দেখি।
    অমিতাভ মৃদুস্বরে বলল, ‘হ্যালো ... ‘।
    ওপার থেকে আগ্রহভরা আওয়াজ এল, ‘ হ্যাঁ .... হ্যা...লো। আমি মনীষা বলছি .....মনীষা পাল..... ফোন কেটে দিচ্ছেন কেন ! ‘
    ( ক্রমশ: )
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন