ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হোটেল ম্যানেজার - ৯

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৭৩ বার পঠিত
  • বাপি ঘরে ঢুকে চায়ের গ্লাসটা ঠক করে ছোট নীচু টেবিলটার ওপর রাখল। অমিতাভকে জিজ্ঞেস করল, ‘ বিস্কুট খাবেন? ’
    অমিতাভ বলে ‘ না: , লাগবে না । তারপর তোর কি খবর? নতুন কিছু রিপোর্ট আছে ?’
    — ‘ না.... খবর আর কি হবে.... আমাদের লজে একজন বড় সাইনটিস এসেছে। কাল সকালে চলে যাবে । ওপাশে দুলালবাবুর সঙ্গে কথা বলছে কাউন্টারের সামনে বসে । ’
    — ‘ তাই নাকি ! বড় সায়েনটিস্ট এসেছে? কলকাতা থেকে? নাম কি ? ’
    — ‘ অত জানি না। গিয়ে দেখনা ওখানে। আমি কি অত জানি নাকি। ননীদা বলল আমাকে তাই জানলাম। ’
    — ‘ না থাক। আমি ওখানে গিয়ে কি করব? আদার ব্যাপারী....হুঁ : ’
    বাপি হঠাৎ বলল,  ‘সাত নম্বরের মনীষা বৌদি আর এসেছিল নাকি? ’
    — ‘ কে? ওই সামনের ঘরের ওই..... না  না .... আমার কাছে আসবে কেন ? ওরা তো সকালে বেরিয়ে গেল দেখলাম।’
    বাপি বলল, ‘হ্যাঁ , শঙ্করপুরে গেছে বেড়াতে। রাত্রে ফিরবে।’
    — ‘ তুই সেদিন ভদ্রলোকের নামে কি সব বললি..... আমার তো শুভঙ্কর পালকে ভাল লোকই মনে হল। ভাল করে না জেনে কারোর নামে কিছু .....’
    — ‘ আরে .... কালীর দিব্যি.... সব জেনেই বলছি। ও শালাকে আমি অনেক ছোটবেলা থেকে চিনি। এগরা পটাশপুর এরিয়ায় আড়কাঠির গ্রুপ চালায়। মেয়ে চালানের কারবার। আগে ওখানে ছিল সীতুবাবু। সেই কারবার ম্যানেজ করত। সে ব্যাটা মরে গেছে বছর দুই আগে। এখন এই শুভঙ্কর ..... সাবধানে থাকবে .... বহুৎ খতরনাক। যেদিন মওকা পাব না .... স্যাট করে গলার নলিতে ব্লেড চালিয়ে দেব অন্ধকারে। কেউ জানতেও পারবে না।’
    অর্জুন লস্কর মানে বাপি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে একটা অশ্বথ্থ গাছের দিকে তাকিয়ে রইল। বাপির চোখের সামনে ভেসে উঠল ফুলির মুখ। মনে পড়ে গেল ফুলির মার কথা — সন্ধেবেলায় কলমি শাকের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
    বাপির চোখের মনি দুটো গরম কয়লার টুকরোর মতো জ্বলতে লাগল। নাকের পাটা ফুলে উঠতে লাগল ভয়ঙ্কর ক্রোধে। ডান হাত দিয়ে ঘুসি মারল বাঁ হাতের তালুতে।
    অমিতাভ বেশ ঘাবড়ে গেল বাপিকে এরকম করতে দেখে। বলল, ‘ আরে .... এ..ই  কি .. কি হল! এরকম করছিস কেন? বস বস .... বস এখানে। ’
    অমিতাভ আর কি করে জানবে, ফুলি কে এবং সে আজও তার মার কাছে ফিরে আসে নি।
    বাপি কয়েক সেকেন্ড বসল অমিতাভর বিছানায়। তারপর খালি চায়ের গ্লাসটা তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
    অমিতাভ মাথা নীচু করে নানা কথা ভাবতে থাকল। ঘুরে ফিরে চাকরি চলে যাবার দুশ্চিন্তাটা পাক দিচ্ছে মনের মধ্যে। চিন্তার জটটা ছাড়ানো যাচ্ছে কিছুতেই।
    কাল কলকাতা থেকে কানাঘুষায় খবর পাওয়া গেছে কোম্পানি ভি আর এস চালু করতে চলেছে। খুব সম্ভবত: এককালিন কিছু টাকা পাওয়া যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা মন্দের ভাল। আপাতত: কিছুদিন ঠেকা দেওয়া যাবে। রাতে খাওয়ার টেবিলে অলোকের সঙ্গে বহুক্ষণ কথা বলল এই সব ব্যাপারে। সমস্যার কথা সোচ্চারে কারো সঙ্গে আলোচনা করলে মন অনেক হাল্কা হয়। এবারে পুজোটা কেমন  কাটবে তা বোঝাই যাচ্ছে।

    রাত দশটা নাগাদ যে যার ঘরে চলে গেল। অমিতাভ ঘরে গিয়ে আজকের বাসি খবরের কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। কিন্তু চোখে ঘুম নেই একদম। এই অবস্থায় সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা খুব বিরক্তিকর ব্যাপার। অমিতাভ তাই করিডোরে বেরিয়ে এল। ঝলমলে আলো জ্বলছে। দু একজন ঘোরাঘুরি করছে ব্যস্তভাবে। দুজন বোর্ডার এল ন’ নম্বরে। দুটো বড় ট্রাঙ্ক ঢোকানো হচ্ছে ঘরে। লোকদুটোকে দেখে মনে হচ্ছে চিংড়ি মাছের ব্যবসায়ী। এদিকে চিংড়ি ভেড়ির কাজ  খুব গুরুত্বপূর্ণ পেশা। লোকদুটো একেবারে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে।  অমিতাভ ভাবল এরা ঘরে গিয়ে থিতু হলে করিডোরে একটু পায়চারি করবে। ন’ নম্বরটা অ্যাটাচড্ বাথওয়ালা।সুতরাং  ওরা এখন আর বাইরে বেরোবে না আশা করা যায়। কেষ্ট এসে একবার ঘুরে গেল। কোন কিছু লাগবে কিনা খোঁজ নিয়ে গেল ওই ঘরে মাথাটা গলিয়ে । অমিতাভকে দেখে একটু হেসে বলল, ‘ দাদা এখনও শোননি ? ’
    — ‘এ..ই শোব .... ঘুম আসছে না।’
    অমিতাভ ব্যালকনির দিকে যায় হেলেদুলে। ব্যালকনি থেকে রাস্তায় নজর যেতে দেখতে পেল শুভঙ্কর পালের পরিবার লজের দিকে আসছে। বান্টি লাফাতে লাফাতে লজে ঢুকে গেল। এক্ষুণি সবকটা ওপরে আসবে। বিরক্তিকর ব্যাপার। একে মন মেজাজ ভাল নেই। এই সময়ে এসব আমড়াগাছি অসহ্য লাগে— অমিতাভ ভাবল। সে ওখান থেকে সরে গিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ার তালে ছিল। কিন্তু তার আগেই শুভঙ্করেরা দোতলায় উঠে এল। বান্টি আগে উঠে এসে দমাদ্দম লাথি মারতে লাগল নিজেদের ঘরের দরজায়। ছেলেটা কেমন অদ্ভুত ধরণের ! অমিতাভর মনে হয়, ওর কাউন্সেলিং দরকার। বান্টির বাবা চেঁচাতে লাগল— ‘ বান্টি .... বান্টি .... তুমি কিন্তু চরম বাড় বাড়িয়েছ ...... সেই সকাল থেকে জ্বালাচ্ছ। এবার কিন্তু মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেব একেবারে .... ’
    একথা শুনে বান্টি একটু ক্ষান্ত হল। শুভঙ্কর পাল অমিতাভর দিকে তাকিয়ে একটু হাসি ছুঁড়ে দিয়ে তালা খুলে বান্টিকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। আর অমিতাভ পড়ল বান্টির মা মনীষার সামনে। মনীষা অন্তরঙ্গ স্বরে বলল, ‘ আরে .... আপনি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে!  শোননি? ’ যেন   ব্যালকনিতে রাত সাড়ে দশটার সময় দাঁড়ানোটা খুব গর্হিত কাজ এবং সকাল সকাল শুয়ে ঘুমিয়ে পড়াটা যেন অমিতাভর বাধ্যতামূলক কর্ত্তব্যের মধ্যে পড়ে। গা পিত্তি জ্বলে যায় এসব ন্যাকামি দেখে।
    সে ভদ্রতা বজায় রেখে নরম স্বরে বলল, ‘ হ্যাঁ .... এখনও তো বেশি রাত হয়নি .... তাই ..... একটু ....’
    — ‘ আমরা.... জানেন, শঙ্করপুর থেকে ঘুরে এলাম। জলেশ্বর মন্দিরেও গেছিলাম। বেশ ভাল লাগল। আপনি গেছেন শঙ্করপুরে? ’
    — ‘ না, আমার এখনও যাওয়া হয় নি। আসলে, আমি খুব একটা কোথাও যাই টাই না। এই এখানেই বেশ আছি ।’ অমিতাভ বলে।
    — ‘ ওমা, কেন ! এটাই তো ঘোরবার বেড়াবার বয়েস .... ’
    অমিতাভ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকে। কিন্তু মনীষা অমিতাভর উত্তরের অপেক্ষায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।সে আবার বলে, ‘আমি বিয়ের আগে অনেক ঘুরেছি। বিয়ের পরও বছরে অন্তত দুবার কোথাও না কোথাও যাই ..... কাছেই হোক আর দূরেই হোক। আমার কর্ত্তাকে ভ্রমণপিপাসু বলা যায়।’
    অমিতাভর আচমকা বাপির কথা মনে পড়ে গেল। মনে মনে শিউরে উঠল সে। আপাতত এই ভদ্রমহিলার হাত থেকে নিস্তার পেলে বাঁচে। ঘুমের ঘোরও আসছে ধীরে ধীরে। ওদের ঘরের ভিতর থেকে  ঠং... করে কোন একটা ধাতব জিনিস ফেলার আওয়াজ হল। সঙ্গে সঙ্গে শুভঙ্কর পালের গলা পাওয়া গেল— ‘ হতচ্ছাড়া শয়তান.... ফের বদমায়েশি ! বেদম মার খাবি বলে দিলাম ....শুয়ে পড় বলছি .... ’
    এসব হট্টগোলে মনীষাদেবীর কোন চাঞ্চল্য হল না। তিনি অমিতাভর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। অমিতাভর মনে হল ভদ্রমহিলার মধ্যেও বেশ কিছুটা অস্বাভাবিকত্ব আছে। যেমন দ্যাবা  তেমনি দেবী। যে হাড়ির যে সরা ।
    অমিতাভ শেষ পর্যন্ত বলে ফেলল, ‘ ঠিক  আছে .... তা’লে আজকের মতো গুড নাইট।’   অমিতাভ ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
    মনীষা বলে, ‘ হ্যাঁ ... গুড নাইট । শুয়ে পড়ুন ..... আবার কাল দেখা হবে। ও হ্যাঁ ..... আমরা পরশুদিন এখান থেকে চলে যাচ্ছি মেচেদায়। বান্টির বাবা অবশ্য কিছুদিন পরেই আবার ফিরে আসবে এখানে।’  বলে অমিতাভর মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন অলস গভীর দৃষ্টি মেলে। অমিতাভর কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। শুভঙ্কর পাল বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের ভিতর থেকে নাক ডাকার আওয়াজ অসছে। বোঝাই যাচ্ছে নিজের বৌকে নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। ছেলেটা মনে হয় দুজনেরই গলার কাঁটা।
    ‘ আচ্ছা আসি তা’লে ’, বলে অমিতাভ দ্রুতবেগে সরে গেল সেখান থেকে নিজের ঘরের দিকে। 

    খুব তাড়াতাড়িই ঘুম এসে গেল অমিতাভর। কিন্তু ঘুমের মধ্যে অবচেতনের গভীর থেকে বারবার ভেসে উঠতে লাগল একটা লালচে ফাইবারের চশমা পরা দুটো চোখ — তার চোখে চোখ রেখে অপলকে তাকিয়ে আছে অলস গভীর দৃষ্টি মেলে।

    ওদিকে অনিন্দিতা কিন্তু আজ রাত্তিরে শেষ পর্যন্ত নিখিলের ঘরেই থেকে গেল। নিখিল ওকে অনেক চেষ্টা করেও ঘাড় থেকে নামাতে পারল না। কে বলবে যে অনিন্দিতার একটা বারো বছরের ছেলে আছে।

    নিখিলের ঘরের পাশের ঘরেই আজ রাতের অতিথি অধ্যাপক ও সমাজসংষ্কারক সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
     
    সকাল আটটা নাগাদ সূর্যকান্তবাবু তিলোত্তমা থেকে বেরোলেন। তিনি কলকাতায় ফিরবেন। কাঁথি কলেজ থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
    গাড়িটা লজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দুলাল তাকে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল। লজের সুরেশ, ননী, বাপিরা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। নিখিল অনিন্দিতা এখনও ঘর থেকে বেরোয়নি। সূর্যকান্ত স্যার গাড়িতে ওঠার আগে একটু দাঁড়ালেন। দুলালের কাঁধে হাত রেখে বললেন,  ‘ চিন্তা কোর না। আমি তোমার জন্য নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। সপ্তাখানেক পরে আমাকে একবার ফোন কোর। আচ্ছা আসি তা’লে। আর হ্যাঁ .... তোমাকে তুমি বলছি বলে কিছু মনে কোর না।তুমি আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট ।’
    —- ‘ না না স্যার .... এ কি বলছেন ! তুমিই তো বলবেন। কোথায় আপনি আর কোথায় আমি ..... ’ দুলাল তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে।
    —- ‘ তোমাদের সকলকে খুব ভাল লাগল আমার।ভাল থেক।’
    সূর্যকান্তবাবু গাড়িতে উঠে গেলেন। গাড়ি ছেড়ে দিল।অমিতাভ সেই সময়ে টুথপেস্ট কিনতে নীচে নেমেছিল।সে দুলালকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ ওনার নাম কি ?’
    — ‘ সূর্যকান্ত ব্যানার্জী ’, দুলাল জবাব দেয়।
    — ‘ সূর্যকান্ত ব্যানার্জী ! তাই নাকি ! এ: হে .....  বিরাট ভুল হয়ে গেল ।এত বড় একটা সুযোগ পেয়েও পরিচয় করা হল না ওনার সঙ্গে । উনি শুধু দেশের একজন সেরা বৈজ্ঞানিক নন, একজন মানবতাবাদী সমাজসংষ্কারকও বটে। এ:, এমন সুযোগ আর পাব না ....’, অমিতাভ আফশোষ প্রকাশ করতে থাকে। দুলাল অমিতাভর দিকে তাকিয়ে সহানুভূতিসূচক মাথা নাড়ে। কিন্তু স্যারের কাছ থেকে কার্ড পাওয়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি চেপে যায়।

      নিখিলের ঘরের দরজা খুলল সকাল নটার পরে। অনিন্দিতা বাথরুমে ঢুকেছে। নিখিল আজ অফিসে যাবে না। অনিন্দিতাকে নিয়ে কোন উকিলের কাছে যাবে। এই কাঁথিতেই উকিলের চেম্বার। উকিলবাবু নিখিলের খুবই পরিচিত। এখন এ মামলাটা কতখানি সামলাতে পারবেন সময়ই বলবে। অনিন্দিতা জটে নিখিল অনিচ্ছাসত্ত্বেও নতুন করে জড়িয়ে গেল। ভবিতব্য ঠেকায় কে ? মানুষ তো পুতুলনাচের পুতুল মাত্র ।

    **********   ******    ********

    বেশ গরম পড়েছে। নির্জনতা মাখানো রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা মাথায় টুপি পরা একটা লম্বা লোক  প্ল্যাটফরমের একপাশে বসে আছে। সুঠাম দেহের কাঠামো। রঙ ফর্সা ঘেঁসা। পাশে রয়েছে একটা মাঝারি মাপের কিটস ব্যাগ।পায়ে কালো রঙের বুট জুতো। বেঞ্চে একাই বসে আছে। আর কেউ নেই। 
    এ স্টেশনে লোকজন বিশেষ নেই।দুচারটে লোকাল ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। বর্ধমান এখান থেকে এক ঘন্টার রাস্তা। স্টেশনের নাম ঝাপটের ঢাল। 
     কোথা থেকে দুজন রেল পুলিশের লোক প্ল্যাটফর্মের একধারে মাটির ঢাল দিয়ে উঠে এল।
     প্ল্যাটফরমের এদিক থেকে ওদিক দুবার টহল দিল। গায়ে খাকি রঙের ওভারকোট পরা। একপাশে বেঞ্চে বসে থাকা লোকটার দিকে দু একবার তাকাল। কিন্তু ওর সামনে দাঁড়াল না। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে উল্টোদিকের ঢাল বেয়ে নেমে গেল। 
    লোকটা আসলে আর এক জনের জন্য অপেক্ষা করছে। সে তাকিয়ে আছে রেললাইনের ওদিকে। ওদিক থেকেই অর্ণাশ্রীর আসবার কথা। অর্ণাশ্রী যে ঠি ক  সময়েই হাজির হবে তাতে কোন সন্দেহ  নেই। সময়ের হেরফের তার হয়না বললেই চলে। 
     স্বচ্ছল পরিবারের সুখের নীড়  ছেড়ে এক কথায় বেরিয়ে এসেছে অর্ণাশ্রী ব্যানার্জী। যতটা পারে এ সমাজের জঞ্জাল সাফ করবে। তার দল বা গোষ্ঠী কিছু নেই।   পিনাকপাণির সঙ্গে আকস্মিকভাবে যোগাযোগ হয়ে গিয়েছিল।
       পিনাকপাণি রায় একটা  এন জি ও চালায়। তার সংগঠনের মূল লক্ষ্য হল দেশ থেকে নারী পাচার বন্ধ করা।সারা বাংলায়, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় এই সংগঠন যথেষ্ট শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তবে প্রতিনিয়ত সমাজের নানা দিক থেকে নানারকম বাধা বিঘ্ন ভয় ভীতির মোকাবিলা করতে হয়। অনেক দুষ্ট শক্তির সম্মুখীন হতে হয়। এসব কাজ করতে নামলেই দেশের জল হাওয়া যে কতটা বিষ বাষ্পে ঢাকা সেটা উপলব্ধি করা যায়। পিনাকপাণিরা অবশ্য অনেক জেলাতেই প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা  পেয়েছে। ঢাল বর্ম একেবারে কিচ্ছু না থাকলে এ রাস্তায় এক পাও এগোন যেত না। বিরুদ্ধ শক্তি ভয়ংকর এবং আন্তর্জাল বিস্তৃত সারা দক্ষিণ এশিয়াব্যাপী ।
       
       পিনাকপাণি বলল, ‘ একদম ঠিক সময়েই এসে গেছ। আমাদের একটু পূর্ব মেদিনীপুরের দিকে যেতে হবে।’
    — ‘ পূর্ব মেদিনীপুরে কোন জায়গায়?’, অর্ণাশ্রী জিজ্ঞাসা করে।
    — ‘ ওই নন্দকুমার দীঘা রুটে। একজ্যাক্ট স্পটটা আমি ঠিক জানিনা। ওখানে গিয়ে মেসেঞ্জারের সঙ্গে মিট করলে তবে জানতে পারব’, পিনাকপাণি অর্নাকে জানায়।
    — ‘ কোথায় মিটিং হবে ? মেসেঞ্জারের নাম কিছু জানা গেছে ?’
    পিনাক বলে, ‘ মেসেঞ্জারের নাম তো জানা যায় না আমাদের গ্রুপে। কন্টাই বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে একটা মিসকল দিতে হবে। ’
    — ‘ ও আচ্ছা .... আমরা কোন ট্রেন ধরব ? ’ 
    — ‘ ট্রেনে না । বাসে যাব ডায়রেক্ট কন্টাই, মানে কাঁথিতে। এটা অবশ্য কোন বর্ডার এরিয়া নয়, সেই সেন্সে লেস ডেঞ্জারাস। ’
    পিনাকপাণি পেশায় একজন ক্রিমিনাল লইয়ার। কলকাতা বার অ্যাসোসিয়েশানের সদস্য এবং সক্রিয় কর্মী। আর অর্ণা বি টেক করার পর এম বি এ করছে। বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং ডিজিটাল মাধ্যম থেকে নারী পাচার সংক্রান্ত নানা হৃদয় বিদারক খবর জেনে সংকল্পবদ্ধ হয় এর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় হবার জন্য। ইন্টেলেকচুয়ালদের মতো শুধু বাণী বিতরণ করা তার দু চক্ষের বিষ।

     ( ক্রমশ : )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন