ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হোটেল ম্যানেজার - ২

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ জানুয়ারি ২০২২ | ২১৭ বার পঠিত
  • বেলা এগারোটা নাগাদ বরানগরে বাড়িতে পৌঁছল দুলাল। বড় মেয়ে ঈশিতা বাড়িতে আছে। প্রিয়াঙ্কা কলেজে গেছে। তার শ্যালক দিব্যেন্দুকে দেখা গেল খাটের ওপর বসে চা খাচ্ছে। শর্মিষ্ঠা বসে আছে বালিশে হেলান দিয়ে। মুখে তেমন রোগের চিহ্ন নেই আপাতত:। দুলালকে হঠাৎ দেখে একটু অবাক  হয়ে গেছে। ‘একি তুমি ! ....’  শর্মিষ্ঠার স্বরে বিস্ময় ও আনন্দ একসঙ্গে মাখামাখি। 
      — ‘ এ..ই চলে এলাম.... ফুচার ফোন পেলাম ... এখন কেমন ? ‘ 
    বড় মেয়ে ঈশিতার ডাক নাম ফুচা।
     দিব্যেন্দু সি ই এস সি-তে চাকরি করে। শর্মিষ্ঠার থেকে তিন বছরের ছোট। সে বলল, ‘ না না... দুলালদা এসে গেছেন ভালই হয়েছে। ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস টার্ন নিয়েছিল। সব কিছু টেস্ট করতে হবে। ক্লিনিক্যাল, প্যাথলজিক্যাল সবরকম টেস্ট দিয়েছে। ভাল খরচ আছে ....  জেনারেল ব্লাড টেস্ট, মানে টিসি ডিসি ইএসআর, হিমোগ্লোবিন, সুগার এসবের জন্য ব্লাড দেওয়া হয়েছে। রুটিন টেস্টের জন্য ইউরিনও দেওয়া হয়েছে। রাত্রে রিপোর্ট দেবে।’
    — ‘ এ: ... এর মধ্যে এত কিছু হয়ে গেল ! আমি তো কালকেই .... ‘
    দুলাল বেশ বিপন্ন বোধ করতে থাকে।
     ঈশিতা বলল, ‘ না বাবা, হয়েছে আগেই।মা আগেও দুবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তুমি চিন্তা করবে বলে তোমাকে জানাইনি। ‘
     দুলাল চিন্তিত মনে চুপ করে বসে থাকে। শর্মিষ্ঠা বলল, ‘ নাগো, আমার অত কিছু হয়নি। হঠাৎ মাথাটা একটু ঘুরে গিয়েছিল। ও প্রেসার ফল করার জন্য বোধ হয়।ইসিজি রিপোর্টও ঠি ক  আছে। পিনাকি দত্ত দেখে গেছে। বলেছে 
    ভয়ের কিছু নেই। তুমি কদিনের ছুটি পেলে ?’
     পিনাকি দত্ত সাধারণ এমবিবিএস হলেও যথেষ্ট গভীর বোধসম্পন্ন। এদের পারিবারিক চিকিৎসক । এ পাড়াতেই চেম্বার।  তার ওপর দুলালের ভরসা আছে।
    শর্মিষ্ঠার কথার উত্তরে বলল, ‘ এসেছি তো তিনদিনের ছুটিতে। এখন অবস্থা বুঝে .... দেখা যাক কি হয়।’

      দিব্যেন্দু শ্যামবাজারে থাকে। রাত আটটা নাগাদ টেস্টের সব রিপোর্টগুলো নিয়ে একেবারে ডাক্তার দত্তকে দেখিয়ে দিদির বাড়িতে এসে ঢুকল। 
     ইউরিনটা কালচার করতে বলেছেন ডাক্তারবাবু। ইনফেকশানের  লক্ষ্মণ আছে । আর সব রিপোর্ট মোটামুটি নর্মাল। অজ্ঞান হয়ে যাবার কারণটা কিন্তু স্পষ্ট হল না। ডাক্তারবাবু বললেন ইসিজি রিপোর্ট দেখে কোন সিদ্ধান্তে আসা যায়না। ওরকম আবার হলে একটা সিটি স্ক্যান করাবার কথা বলেছেন ডাক্তার দত্ত । 
     দিব্যেন্দু বলল, ‘ এই যে প্রেসক্রিপশান.... অনেকগুলো ওষুধ দিয়েছেন। কিছু নিয়ে এসেছি । আরো কিছু কিনতে হবে।’
    দুলাল বলল, ‘ দাও আমাকে দাও। ওগুলো আমি নিয়ে আসবখন। তোমার কত খরচ হল ?’
    — ‘ থাক না এখন। ওসব পরে হবেখন দুলালদা। এই নিন প্রেসক্রিপশানটা.... ‘

      তিনদিন নির্বিঘ্নে কেটে গেল। শর্মিষ্ঠার আর কোন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়নি। দুই মেয়েও নিয়মিত কলেজে যাচ্ছে।দিব্যেন্দু প্রতিদিন রাত্রেই একবার করে ঘুরে যায়। ব্রজগোপাল ফার্মেসি থেকে একজন সকালের দিকে এসে প্রেসার চেক করে যায়। প্রেসার মোটামুটি স্বাভাবিক আছে। দুলাল সোমবার বাড়ি এসেছে। বুধবার রাত্রে সে বলল, ‘ এখন তো মোটামুটি ঠি কই আছে । কালকের দিনটা থেকে শুক্রবার সকালে আমি চলে যাই। নইলে ওদিকে আবার..... সব সামলাবার  মতো তেমন তো কেউ নেই। এখানে দিব্যেন্দু তো রইলই.... ফুচা আর তুলিও আছে। দরকার হলেই আমাকে ফোন করবে ।’
     শর্মিষ্ঠা কি একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে দুলালের মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রীনে দেখা গেল , নিখিল কলিং .....।
       — ‘ দুলালদা .... কি খবর ? পৌঁছে ফোন করলে নাতো ! আমরা খুব চিন্তা করছিলাম। আমি কি টাকা পাঠাব তোমার অ্যাকাউন্টে ? দরকার হলে জানাতে হেজিটেট কোর না।সুভাষদা জিজ্ঞেস করছিল তার দেওয়া ওষুধগুলো খাইয়েছিলে কিনা।’
     দুলাল নিখিলকে জানাল যে সে শুক্রবার ফিরে যাচ্ছে । লজ্জায় বলতে পারল না যে নানারকম টানাপোড়েনের ফলে আয়ুর্বেদিক ওষুধের মোড়কই খোলা হয়নি। নিখিলকে বলল, নানারকম ক্লিনিক্যাল এবং প্যাথলজিক্যাল টেস্ট চলছিল বলে ওষুধটা শুরু করা যায়নি। কাল থেকে খাবে।এও বলল যে , আপাতত: টাকার দরকার নেই। পরে দরকার হলে জানাবে। 
       ওদিক থেকে নিখিল বলল, ‘ বুঝে সুঝে এস। তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। এখানে সুরেশ জানা ভালই চালাচ্ছে। মাখনবাবু একদিন ফোন করেছিল। তাকে জানা সব জানিয়েছে। মাখনবাবু কিছু আপত্তি করেনি।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
      দুলাল শুক্রবারই কাঁথি ফিরে গেল। দুই মেয়েকে বলে গেল তারা যেন শর্মিষ্ঠাকে এখন কিছুদিন বিশ্রামে রাখে। দিব্যেন্দুকেও বারবার বলতে লাগল একটু দেখাশোনা করার জন্য। দিব্যেন্দু বলল, ‘ আমি তো ঘরেরই ছেলে..... আমাকে এত বলতে হবে না ..... তাছাড়া দিদি তো এখন ভাল আছে ।’
      দুলাল তিলোত্তমায় পৌঁছতে ওখানে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সুরেশ জানা এ ক’দিন ভালভাবেই চালিয়ে নিয়েছে। শুধু ক্যাশটা একটু মিলিয়ে নিতে হবে।
      
       বিকেলের দিকে দুজন বোর্ডার এল। তিনতলায় বাইশ নম্বর  ঘরে ঢুকল। ননীগোপাল বলল, ‘কলের কারবার আছে। দুজন পার্টনার। হলদিয়ায় থাকে। প্রচুর পয়সা। এখানে অর্ডার ধরতে আসে মাঝে মাঝে। আগে মেঘমালায় উঠত। ওখানে কি সব ক্যাঁচাল হয়েছে ..... তাই, মানে এখানে.....’
    — ‘ কিসের কারবার বললি ?’ দুলাল জিজ্ঞাসা করে।
    — ‘ কলের .... কলের । জলের কল। প্লাস্টিকের ।’
    — ‘ অ-অ ..... ‘
    সন্ধে সাতটা থেকেই নীচে ডাইনিং-এ কাস্টমার আসতে আরম্ভ করে। কেষ্ট আর বিকাশের সঙ্গে বাপিও হাত লাগায় খাবার পরিবেশনে । দুলাল দেখতে পেল ওর ডিউটি শুরু হবার আগে, সাতটা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে বাপি পলিথিনের প্যাকেটে দুটো বোতল নিয়ে ঝড়ের বেগে ওপরে ছুটল। দুলাল আন্দাজ করল বাপির গন্তব্য হল তেতলায় বাইশ নম্বর। 
      লজের উল্টোদিকে ননীগোপালের ভাই শরৎ একটা রোল, চাওমিন, মোগলাই পরটার দোকান দিয়েছে। এখনও তেমন চালু হয়নি।তবে শরতের চেষ্টা আছে। দাঁড়িয়ে যাবে নিশ্চয়ই। দুলাল ওর দোকানে একদিন মোগলাই পরটা খেয়েছিল। দারুন বানিয়েছিল। দুলালের মনে হল ছেলেটা শীগ্গির দাঁড়িয়ে যাবে। ব্যবহারও খুব ভদ্র। শরৎদের বাড়ি খেজুরিতে। ওখানে তার মা বাবা থাকে। নীচে আরও দুই ভাই আছে। আগে স্কুলে যেত। এখন আর যায়না। অন্য কোন কারণ নেই । পড়াশোনা করতে ভাল লাগে না তাই। অবস্থা খারাপ না। চাষের জমিজমা আছে কিছু। চার ভাইয়েরই লেখাপড়ার সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই।
     রাত সাড়ে নটা নাগাদ বাইশ নম্বর ঘর থেকে হুড়ুম দুড়ুম করে একজন দোতলায় ক্যাশ কাউন্টারে নেমে এল। দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। কাউন্টারের ওপর দিয়ে দুলালের দিকে ঝুঁকে পড়ল। দুলাল বুঝতে পারল কল ব্যবসায়ীর এক্সেস লোড হয়ে গেছে। আর একজন কোন হাওলতে আছে কে জানে। দুলাল গলা তুলে বলল, ‘হারু .... এ..ই হারু একে ওদিকে বসা। বমি টমি করে দিলে মুশ্কিল .... এ: ‘
    দুলাল কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। হারুকে  লজের সিকিউরিটি গার্ড বলা যায়। জয়রাজ নামে এরকম আরও একজন আছে। যাই হোক, হারু এসে লোকটাকে ধরাধরি করে ওপাশে নিয়ে গিয়ে একটা চওড়া পেছনে হেলান লাগানো বেঞ্চের ওপর বসাল। ভদ্রলোক বসে থাকার অবস্থায় নেই। কার উদ্দেশ্যে কে জানে ‘ সা..ল্লা ...... মাদা.......দ ‘ বলে একটা অশ্রাব্য মুখখিস্তি দিয়ে বেঞ্চের ওপর শুয়ে পড়ল চোখ বুজে। দুলাল আবার বলল, ‘ হারু ওপরে গিয়ে বাইশ নম্বরে দেখ তো আর একটার কি হাল । হারু দুলালকে খুব মান্যিগন্যি করে। সে তাড়াতাড়ি ওপরে ছুটল। একটু পরেই বিকট চেঁচামেচির আওয়াজ উঠল ওপর থেকে। কে যেন কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করছে। বাইশ বছরের হারু বাইশ নম্বর ঘর থেকে হুড়হুড় করে নেমে এল। হাতে একটা আধখাওয়া রামের বোতল। ‘ এ..ই যে .... নিয়ে এসেছি .... সেই জন্যে খিস্তি করছে । ফুল লোডেড হয়ে গেছে তাও সালা টেনে যাচ্ছে .... কি ক্যাঁচাল...’ হারু কাউন্টারে বোতল জমা রাখে। ওদিকে বাপি লুব্ধ চোখে প্রায় ভর্তি ভ্যাট সিক্সটিনাইনের বোতলটার দিকে তাকিয়ে রইল। 
    ওপর থেকে মাঝে মাঝে জড়ানো  গলায় গালাগালির আওয়াজ আসছে। অন্য রুমের বোর্ডারদের অসুবিধে হতে পারে চিন্তা করে দুলাল হারুকে বলল, ‘ দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে আয়। ও এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়বে। 
    এদিকে আর এক পার্টনার এতক্ষণে বেঞ্চের ওপর শুয়ে নাক ডাকাতে শুরু করেছে। একটু পরেই সব চুপচাপ হয়ে গেল। দু একজন বোর্ডার কৌতূহলবশত: ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তারা যে যার ঘরে ঢুকে গেল।
     দুলাল বলল, ‘ আজ আর এদের নাড়াচাড়া করার দরকার নেই । এভাবেই থাক। কাল সকালে দেখা যাবে ।’ 
     ননীগোপাল খুব ভোরে ওঠে। তারপর এদিক ওদিক তালা খোলা, গেট খোলা এইসব করতে করতে সকাল ছটা বেজে যায়। চারতলায় ট্যাঙ্কের জল পরখ করে টরে দোতলায় নেমে দেখল কাল রাত্রের সেই মাতাল কল ব্যবসায়ী প্রদীপ মাইতি দুহাত জড়ো করে কোলের ওপর রেখে চুপচাপ বসে আছে। কখন ঘুম ভেঙেছে কে জানে। নেশা কেটে গেছে । এখন নিপাট ভালমানুষ।ননী হাসিমুখে বলল, ‘ আপনার শরীর ঠি ক  আছে তো ? চা খাবেন নাকি ? ‘ 
     — ‘ হ্যাঁ .... এই.... দিও একটু। হলে ভালই হয় .... ‘ প্রদীপ মাইতি আড়ামোড়া ভাঙে। তারপর বলে, ‘ সে ব্যাটা কেমন আছে কে জানে !’
    — ‘ চিন্তা করবেন না, তিনি বিলকুল ঠিক আছেন। আমি নামার সময় বাইশ নম্বরে উঁকি মেরে দেখে এসেছি। তিনি বসে বসে সিগারেট টানছেন।’ ননীগোপাল জবাব দেয়।

      নিখিল দাসের মোটামুটি স্থায়ী আস্তানা তিলোত্তমার দোতলায় এগারো নম্বর ঘর। ওই ঘরে আবার একটা মেয়ে এনে তুলেছে কাল রাত্তিরে। কারো ঘরের বৌ বলে মনে হয়। মেয়েটা কোন ধান্দায় নিখিলের সঙ্গে ভিড়েছে কে জানে। সে মহিলা সকাল বেলায় জামাকাপড় কাচাকুচি করে  দিব্যি ছাতে গিয়ে মেলে দিয়ে আসল। কোন সংকোচ জড়তা কিচ্ছু নেই। দুপুরে নিখিলের সঙ্গে কোথায় বেরিয়ে গেল কে জানে।
       মদন বেরা এ লজে মাসে অন্তত দুবার আসে। রসুলপুরে বাড়ি। জমিজমা নিয়ে কি সব শরীকি মামলা চলছে কাঁথি কোর্টে। আজকাল একটু ঘনঘনই আসছে। মনে হয় শুনানির পরপর ডেট পাওয়া যাচ্ছে। দুপুরবেলায় উকিল মনোতোষ সারেঙ্গীকে বগলদাবা করে নীচের হোটেলে খেতে আসে। মিল সিস্টেমে খাওয়া। দুজনেই পর্বতপ্রমাণ ভাত ডাল তরকারি সাঁটায়। তারপর উল্টোদিকে শরতের মোগলাই পরটার ফাঁকা দোকানে বসে দুজনে মিলে কিসব শলাপরামর্শ করে আধঘন্টা খানেক ধরে। মদন, মনোতোষ সারেঙ্গীকে টাকাপয়সা দেয়। পান খাওয়ায়। মনোতোষ উকিল সিগারেটে সুখটান দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে বলে, ‘ কাগজপত্তর সব রেডি । এবার এমন প্যাঁচ ঝাড়ব না.... শালা পালাবার পথ পাবে না। আর দুটো হিয়ারিং-এ ফাইনাল ভার্ডিক্ট বার করব।এ একেবারে শিওর।
    মদনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।বলে, ‘ হ্যাঁ স্যার .... দ্যাখেন তো... যত তাড়াতাড়ি হয় । আর সহ্য হচ্ছে না। ওদিকে মেয়েটাকে নিয়ে এত চিন্তা....’
     উকিলবাবু পান চিবোতে চিবোতে উদাস চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টেনে যেতে লাগলেন।
     মদনবাবুর মেজমেয়ে একটা হার্টে ফুটো নিয়ে জন্মেছে। বেঁচে আছে এখনও। মরে যেতে যেতেও বেঁচে আছে এখনও। এইভাবে বছরের পর বছর গেল। চোদ্দ বছর বয়স  হল রোগে ঝাঁঝরা কোনমতে বেঁচে থাকা মেয়েটার। মদন যতটা সম্ভব চিকিৎসার ঘেরাটোপে রেখেছে মেয়েকে। কিন্তু ডাক্তারদের মতে, ‘লাভ কিছু নেই অপারেশনের রাস্তায় গিয়ে । শুধু মেডিসিনের ওপর রাখুন .... আর কিছু করার দরকার নেই ‘।
     মদনের মন হু হু করে এসব কথা শুনে। সন্তানের সম্বন্ধে কেই নিতে পারে এমনি নিদান। মদনের মন অষ্টপ্রহর হু হু করে। কাজকর্মের পাথর চাপা দিয়ে রাখে কষ্টের ফাটলে । মদনের বৌ বরং অনেক শক্ত। মনকে তৈরি করে ফেলেছে। বলে, ‘ তুমি এত ভেঙে পড় না.... মনকে শক্ত কর। কি করবে বল, সবই আমাদের ভবিতব্য। বরাতের লিখন কি আর খন্ডানো যায় ? ‘ ইশশ্ ... মদন যদি এমন শক্ত হত ! সে এখনও মাসে দুবার করে কলকাতায় যায় বড় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে।

      নিখিল একেবারে রাত্রে খেতে নামল ওই ভদ্রমহিলাকে সঙ্গে করে। খাওয়ার পরে পেমেন্ট কাউন্টারে এসে মৌরি তুলে মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে বলল, ‘ দুলালদা, পরিচয় করিয়ে দিই ... অনিন্দিতা। নিউ দীঘার কাছে থাকে।’
      ভদ্রমহিলার পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর বয়েস হবে। হাতজোড় করে নমস্কার করল দুলালকে। দুলালও প্রতি নমস্কার করল। মনে মনে বলল, ‘ ঢ্যামনা.... ‘। ভাতের হোটেলে ব্যস্ত সময় এখন। দুলালকে জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব সামলাতে হয়। খদ্দেরদের দেখভাল থেকে পেমেন্ট দেওয়া নেওয়া সব করতে হয়। আপাতত: এদের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য বলল, ‘ ঠি ক আছে নিখিল ... পরে ভালভাবে আলাপ হবে ... ‘
    নিখিল বলল, ‘ হ্যাঁ সেই ভাল । ‘ 
    তারপর দুলালকে দেখিয়ে ভদ্রমহিলাকে বলল, ‘ এ হল আমাদের দুলালদা ..... বুঝলে তো ..... এই লজের চার্জে আছে। ঠি ক আছে পরে ভাল করে পরিচয় হবে। চল এখন ..... ‘।
     দুজনে এগারো নম্বরের দিকে গেল। 
       তিলোত্তমা লজে  ছমাসে একবার করে এক সাধু আসেন। এক সপ্তা থাকেন। জামা কাপড় সব গেরুয়া। মাথায় জট। গাল ভর্তি দাড়ি। চোখ দুটো চতুর ও চঞ্চল। তিনি আসলে তমলুকের মানুষ। সারা বছর হরিদ্বারের দিকে কোথায় যেন থাকেন। তিনি আসার পর দোতলার বারান্দায় হাত দেখাবার আসর বসে। হাত দেখা ঠি ক নয়। মুখ দেখা। শঙ্করী বাবা মুখ দেখে ভূত ভবিষ্যত বর্তমান সবকিছু বলে দেন। দক্ষিণা কিছু নেই । যে যা দেয়। তাতেই ডেলি হাজার পাঁচেক হয়ে যায়। লজের লোক শুধু নয়, কাঁথির এদিক সেদিকের লোক যারাই খবর পায় তারাই এসে হামলে পড়ে। কারো কারো ভাগ্য  বৃত্তান্ত এমন মিলিয়ে দিয়েছেন যে তারা একেবারে থ হয়ে গেছে। 
       নিখিলকে শঙ্করীবাবা চিনতেনও না জানতেনও না। বছর দুই আগে নিখিলের মুখ  দেখে যা যা বলেছিলেন তা হুবহু মিলে গেছে। তখন একটা কথা বলেছিলেন — কোন বিবাহিতা  মহিলা থেকে সাবধানে থাকবে।এবারে শঙ্করীবাবাকে দেখে সেই কথাটা বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল নিখিলের মনে।  অনিন্দিতা কি তার পক্ষে ক্ষতিকর ! দীঘায় সার্কিট হাউসে এক সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অনিন্দিতার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের লোক শুনে অনিন্দিতা নিখিলের সঙ্গে ভিড়ে
     গেল । তারপর দিব্যি কাঁথি পর্যন্ত চলে এল বাসে নিখিলের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। মাত্র পনের মিনিটের আলাপ। নিখিল এসব অনেক দেখেছে। সে ওই মাঠেরই সিনিয়র খেলোয়াড় । 
    সেদিন সন্ধেবেলায় দুলাল নিখিলকে বলল, ‘ তুই বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস। শঙ্করীবাবা তোকে কি বলেছিল মনে নেই ?’
    — ‘ কেন, কি বলেছিল ? ‘
    — ‘ ওই যে ..... বিবাহিত মহিলা থেকে সাবধান । ‘
    — ‘ আরে দূর দূর .... ফালতু সাধু সব..... যত্ত দু নম্বরী মাল ‘ নিখিল মুখ বেঁকিয়ে দুলালের কথা উড়িয়ে দেয়। তারপর বলে , ‘অনিন্দিতার অনেক কোয়ালিটি আছে।  রবীন্দ্রনাথের অন্তত এক ডজন কবিতা ওর ঝাড়া মুখস্থ। দারুন গানও গায়। ওই যে ওই গানটা....কি যেন ....’ বলে নিখিল ‘ আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে’ গানটা 
     বেসুরো ফাটা গলায় গেয়ে উঠল।
     দুলাল বলল, ‘ আচ্ছা আচ্ছা.... বুঝতে পেরেছি ..... বুঝতে পেরেছি। অ্যা...ই কেষ্ট পাঁচ নম্বরে দুটো ওমলেট হবে.... ‘। মনে মনে বলল— গুণের গুণনিধি। কিন্তু তার পরের মুহুর্তেই তার বিপদের সময় নিখিলের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। লোকটার ওপর মন নরম হয়ে পড়ে। বরানগরে নিয়মিত যাওয়া আসা করছে । শর্মিষ্ঠার আর কোন শারীরিক সমস্যা হয়নি এখন পর্যন্ত। দিব্যেন্দুর মতো কর্ত্তব্যপরায়ণ মানুষ কমই আছে। শ্যামবাজার থেকে রোজ আসে বরানগরে দিদির খোঁজখবর নিতে।
      
      শঙ্করীবাবার বৈঠক একেবারে জমজমাট। বেলা এগারোটা বাজে। বাইশ নম্বর থেকে দুই কল ব্যবসায়ীও বাবার টেবিলের সামনে বসে গেছে। বাবার চতুর চঞ্চল চোখ তীক্ষ্ণভাবে মেপে চলেছে প্রদীপ মাইতির চোখমুখ।তার পার্টনারকেও অন্তর্ভেদী চোখ দিয়ে জরিপ করল বেশ   খানিকক্ষণ। তারপর বলল, ‘তোমরা দুজনে দুজনের থেকে সাবধানে থেক। আর কিছু বলব না।’ কল ব্যবসায়ী দুজন হাঁ করে তাকিয়ে রইল শঙ্করীবাবার মুখের দিকে। তারপর ওখান থেকে সরে গিয়ে নীচের রাস্তায় নেমে গেল চা খাবার জন্য। প্রদীপ মাইতির পার্টনার বলল, ‘ সাল্লা ধড়িবাজ মাল..... হেব্বি সেয়ানা .... সাধু না ছাতার মাথা ..... খালি কামাবার ধান্দা .... ‘।
       
     এক সপ্তা পর। আজ সারা দিন মেঘলা। রোদের মুখ দেখা গেল না। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে শঙ্করীবাবা বিদায় নিলেন। কোথায় গেলেন কে জানে। 
      মদন বেরার মামলার এ সপ্তাহে আর শুনানী হবার সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেল। উকিলবাবু বললেন, ‘ এ সপ্তাহেই হোক আর  সামনের সপ্তাহেই হোক আর দুটো হিয়ারিং..... ব্যস তারপরেই ভার্ডিক্ট আসবে শিওর .... ‘।
    মদন বলল, ‘ দ্যাখেন যদি এট্টু তাড়াতাড়ি হয়। ওদিকে মেয়েটার শরীর মোটে ভাল যাচ্ছে না।’
    উকিল মনোতোষ সারেঙ্গী বলল, ‘আমি তো আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। চিন্তা করবেন না.... ইয়ে বলছিলাম.... পাঁচ হাজার লাগবে। মুহুরীকে দিতে হবে .... ‘।
    ‘ ঠিক আছে । আজ  কাছে নেই । আমি লজেই আছি । কাল সকালে যদি যোগাড় হয় .... ‘
    — ‘ ঠিক আছে । কাল দুপুরে তালে ....  কোর্টে থাকব । ‘

      পরদিন সকাল নটা নাগাদ নিখিল উদভ্রান্তভাবে সারা লজে ছোটাছুটি করতে লাগল। সে নাকি ঘুমোচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখে অনিন্দিতা বিছানায় নেই। বিছানা থেকে উঠে দেখল বাথরুমে কেউ নেই। ঘরের দরজা খোলা। নিখিল দেখল টেবিলের ওপর রাখা সুটকেসের ডালায় ফাঁক। নিখিল পোড় খাওয়া লোক। তার বুক ছ্যাঁত করে উঠল।
      ( ক্রমশ : )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন