ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আমার ভুতের ভয়ঃ

    Amlan Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২৪ বার পঠিত
  • আমার ভূতের ভয়

    অন্য অনেকের মত আমিও ভূতে বিশ্বাস করি না কিন্তু ভয় পাই। ছেলেবেলায় আমার ৪-৫ বছর বয়সের কথা যদ্দুর মনে আছে দুপুরে ঘুমিয়ে ওঠার পর একটা কেমন হতভম্ব, ভীতচকিত ভাবে আমি এদিক ওদিক এমন কি খাটের নীচে দেখার চেষ্টা করতাম স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা পর্যন্ত। আবার আরো একটা অদ্ভুত উপসর্গ আমার ছিল যাতে আমার আশেপাশে যত ঘটনা ঘটছে সেগুলি সমস্তই একটা বিশাল পরিবর্ধিত আকারে আমার ইন্দ্রিয় গুলিতে আঘাত করতো। সামান্য শব্দ বা আওয়াজও আমার কানে অনেক গুণ পরিবর্ধিত আকারে প্রবেশ করতো। মনে হত কি যেন একটা ভয়ঙ্কর কান্ড কারখানা ঘটে চলেছে। এই রোগটা আমার অনেক বেশী বয়স পর্যন্ত ছিল। তারপর কোনো এক সময় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ না করেই এই অদ্ভুত উপসর্গ আমাকে কখন মুক্তি দিয়ে গেছে নিজেও বুঝতে পারি নি।

    আমার কৈশোর ও প্রাকযৌবন কালটা কেটেছে মোটামুটি একটা গন্ডগ্রামে। গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মুখ্য সড়কের পাশেই ছিল আমার স্বর্গগত পিতৃদেব নির্মিত আমাদের বসত বাটী। বাড়ি থেকে গঞ্জ বা বাজার এলাকা মাইল খানেক দূরত্বে। কাজে অকাজে, বাজার হাট করতে বা একটু বয়স বাড়ার পর সন্ধ্যার পর আড্ডা মারতে আমার গন্তব্য ছিল এই বাজার এলাকা। সন্ধ্যের পর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা মেরে মাইল খানেক হেঁটে আমাকে বাড়ি ফিরতে হতো বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া এই মুখ্য সড়ক ধরেই। বাড়ি পৌঁছানোর ঠিক আগেই সড়কের উল্টো দিকে ছিল মস্ত বড় এক বাঁশ ঝাড়, প্রস্থে ও দিঘে যেটা কিনা রীতিমত রাক্ষুসে আকৃতির ছিল। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না সেই সময়। সন্ধ্যের পর রাস্তা ঘাট সব ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমাকে আড্ডা মেরে ফিরতে হত এই ঘুটঘুটে গা ছমছম করা অন্ধকার রাস্তা ধরে ওই ভয়ানক আকৃতির বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়েই। রাস্তায় সাপখোপ বা শরীরী বিপদের থেকে ওই অন্ধকারের মধ্যে অশরীরী অস্তিত্বের বিপদটাই বেশী বলে মনে হতো আমার। তবে এই সব অজানা অচেনা, কখনো চাক্ষুস না দেখা বিপদের সম্ভাবনা আমাকে আমার নিয়মিত আড্ডায় উপস্থিত থাকা থেকে কখনো বিরত করতে পারে নি।

    পরবর্তী কালে শিক্ষা ও চাকরী সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় থাকার সময় আমার একাকিত্ব ও কোনো এক অশরীরী অস্তিত্বের সম্ভাবনার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে অনেক সংঘর্ষ হয়েছে। তবে কোনো সময়েই অশরীরী অস্তিত্বে আমার অবিশ্বাস কে এই সব সংঘর্ষ পাল্টে দিতে পারে নি। অর্থাৎ কিনা আমার মনের ভয় কখনই শারীরিক রূপ ধারণ করে বা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য রূপ ধরে আমার অবিশ্বাস কে বিশ্বাসে পরিবর্তিত করতে পারেনি। উদাহরণ স্বরূপ একটা দুটো আরো ঘটনার উল্লেখ করে এই প্রসঙ্গে যবনিকা টানবো।

    ছাত্র জীবনে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী তথা কলেজে জীবন মিলিয়ে মোট পাঁচ বছর আমি বাড়ী থেকে দূরে ছাত্রাবাসে কাটিয়েছি। তার মধ্যে প্রথম দুবছর ছিলাম রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত ছাত্রাবাসে। সেখানে সেভাবে বলার মত উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। তারপরের তিন বছর কাটিয়েছি কলেজ হোস্টেলে। তিনতলা লম্বা ধরণের হোস্টেল বিল্ডিং। সারি সারি ৪ আসন সম্বলিত ঘরের সামনে দিয়ে লম্বা করিডরের আকৃতির বারান্দা হোস্টেলের সামনে থেকে পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত। তৃতীয় বর্ষের পড়া চলাকালীন গরমের ছুটিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ হোস্টেল বিল্ডিং নবীকরণের সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই মর্মে হোস্টেলের সমস্ত আবাসিকদের হোস্টেলের সবার নিজেদের ঘর গুলি খালি করতে বলে দেন। আমি আমার এই কারিগরি শিক্ষা ছাড়াও সন্ধ্যাবেলায় অন্য একটি কলেজ থেকে নিয়মিত বাণিজ্য নিয়ে স্নাতক হওয়ার জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আগের বছর প্রস্তুতি না হওয়ার সুবাদে আমি আমার B. Com ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা থেকে একেবারে শেষ মুহূর্তে বিরত হয়েছিলাম। এবার আবার সেই পরীক্ষা পরেছে আমার কারিগরি শিক্ষায়তনের এই গরমের ছুটির সময়েই। পরীক্ষার দিন গুলি আমার এক জেঠতুতো দিদি জামাইবাবুর বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিয়ে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার ফিরে এসেছি আমার ভবঘুরে জীবনে। সারাটা দিন এদিক ওদিক করে কাটিয়ে রাত্রে ঘুমানোর জন্য একটা আশ্রয়ের দরকার হত। গত্যন্তর না দেখে রাতের বেলা হোস্টেলের মুখ্য দ্বারের পাশের বৃষ্টির জল নিস্কাশনের পাইপ বেয়ে তিনতলা পর্যন্ত উঠে তারপর ছাদে গিয়ে শুয়ে যেতাম। আমার সামান্য বিছানা পত্রও হোস্টেলের ছাদেই রাখা ছিল। লম্বা জনমানব শূন্য রাত্রি বেলাকার ছাদ। সেখানে শুয়ে তো গেলাম কিন্তু চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পরতে পারছিলাম না কিছুতেই। পুরো হোস্টেল জনশূন্য আর সেখানে আমি একা হোস্টেলের ছাদে এক থমথমে স্তব্ধতার মধ্যে শুয়ে। একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ। যাই হোক এক সময় রাত শেষ হয়ে ভোর হলো এবং আমিও অক্ষত শরীর ও মন নিয়ে সে যাত্রা বাকি রাত গুলি কাটানোর জন্য অন্য কিছু পরিবর্ত ব্যবস্থা করলাম।

    এই ঘটনার আরো পরে চাকরী জীবনে দশ জনের মেসবাড়িতে পুজোর সময় সম্পূর্ন একা কাটিয়েছি। একা থাকতে অস্বস্তি আমার সব সময়ই হতো, এখনো এই ছয় দশক পেরিয়ে আসা জীবনেও হয়। একা থাকতে আজো আমি ভয় পাই যদিও ভূতে বিশ্বাস করার মত কিছু আজো আমার জীবনে ঘটেনি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন