• খেরোর খাতা

  • রুবি পাড়ার মাঠে

    Jahar Kanungo লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ নভেম্বর ২০২১ | ২২৫ বার পঠিত
  • রুবি পাড়ার মাঠ।

    ছেলেটা বললো ওর কাকাই নাকি বলেছিল বস্তায় ভরে নিয়ে যেতে। জিজ্ঞেস করলাম বস্তায়  কেন? বললো যাতে ও ফেরার পথ না চিনতে পারে।

    দম বন্ধ হয়ে মরে যায় নি?

    সে কি করে জানি?
    তারপর একটু ভেবে বলে, না না, মরবে কেন? প্লাস্টিকের বস্তা তো নয়। চটের বস্তা। হাওয়া ঢোকে।

    কাঁদে নি ও?

    মিউ মিউ করছিল ।

    ও কি জানতো যে তোরাই ওকে  নিয়ে যাচ্ছিস?

    ও তো গায়ের গন্ধেই বুঝতে পারবে যে আমরাই।  আমাদের গলার আওয়াজে জানবে। কথা বলছিলাম তো আমরা।  ও হয়তো ভেবেছিল এটা কোন এক খেলা।

    খেলা?

    হ্যাঁ  খেলতাম তো ওকে নিয়ে।

    কি খেলতিস?

    মাথায় চাঁটি মারি, আদর করি। বেশি না। ও দূরে দূরেই থাকতো। সবসময রান্নাঘরের আনাচে কানাচে ।

    বস্তা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য ছট্ফট করে নি ?

    না, তবে যখন  রুবি পাড়ার মাঠের কাছাকাছি পৌছে গেছি তখন  ছটফট করে উঠেছিল। কে জানে হয়তো বুঝতে পেরেছিল অজানা কোন রাজ্যে এসে গেছে সে।  নাকি কুকুরের আওয়াজ  শুনেছিল - জানি না।

    ফেলে চলে এলি?

    হ্যাঁ। তাছারা সন্ধ্যা হয়ে গেছিল তো তখন। কাকা বার বার বলে দিয়েছিল  তাড়াতাড়ি ফিরতে।

    বস্তা টার  মুখটাও তো খুলে দিয়ে আসতে পারতিস।

    ভেবেছিলাম। ভাই বললো যদি বেরিয়ে পরে, আবার পিছন পিছন আসবে।

    যদি কোন কুকুর আসে রাতে!

    নীরব ছেলেটি।

    কিছু বলছিস না কেন?
    হয়তো দল বেঁধে কুকুর এসেছিল রাতে।

    জানিনা। বললাম না, কাকা বলে দিয়েছিল তাড়াতাড়ি করে ফিরতে।

    চারপাশ অন্ধকার। তবুও গাছ পালা গুলোকে আলাদা আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়।  ওদিকটায় একট নাকি রেললাইন ছিল। কে জানে কোনো নিশানা আছে কিনা। কেন জানিনা রেললাইন এখনো কেন টানে।  কখনো যদি দিনের বেলার দিকে আসি দেখে আসবো।
    কিছুটা দূরেই বর্ডার।  সীমানা।  অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি  কালভারটার উপর। 

    মানুষ বোঝায় নৌকা আসে।
    হাজার মানুষ তীর্থে আসে।
    আরো নৌকা আরো মানুষ
    মা গঙ্গার বুকে।
    সূর্য যখন মাথার উপর
    মানুষ তখন জিরোয় ।
    গাছের ছায়ায়  নীল চাদরে
    শিশুটি তখন ঘুমোয়।
    সুয্যি নামে জোয়ার আসে
    সবাই ফিরছে ঘরে
    গাছের তলায় ঘুমায় শিশু
    মা গঙ্গার তরে।

    কবিতা বললেন?

    না।

    জানি কবিতা বলছেন।

    তবে জিজ্ঞেস করছিস কেন?

    ছেলেটা চুপ করে গেল।  কিছুক্ষণ পরে নিজের মনেই যেন বলে,  "এমনিই।"

    দূরে  আলোর বিন্দু  এগিয়ে আসে। হারিয়ে যায়। আবার কিছু পরে নজরে আসে। সীমানার ওপারে। কে জানে বাস না লরি ?

    আচ্ছা বেড়ালটা কি মরে  গিয়েছিল?

    আমি জবাব দিই না। ছেলেটি অপেক্ষা করে থাকে।  আবার বলে, মানে দম বন্ধ হয়ে কি মরে যেতে পারে ?

    আমি চুপ করে থাকি।

    না, এমনিই ভাবছিলাম ।  ঠান্ডায় তো মরে না। না বোধ হয়!  তাই না?

    নিজের মনেই বলে। আমি জবাব দিই না। আমি শুধু বললাম তোর ঘুম পেলে ঘুমিয়ে নে। এইতো বেশ জায়গা আছে। ব্যাগটার উপর মাথাটা রেখে ঘুমিয়ে নে।

    না আমি উল্কা দেখছি।

    আকাশে এত তারা এত তারা। চাঁদটা আকাশের কোন দিকটাতে কে জানে? বোধহয় ডুবে গেছে।  চেয়ে আছি। 

    ভাই ওখানে স্কুলে ভর্তি হয়েছে?

    পরের বছর, এখন না।

    আবার চুপ হয়ে গেল।  আকাশের দিকে চেয়ে আছে ও।  এখন আর উল্কা খুঁজছে না। ও ভাবছে।  নিজের মনে কিছু বলে যাচ্ছে।

    কি বিড়বিড় করছিস?

    কাকা ভালো।

    বেচারা ভাবছে এখন। তারা গুলো দেখছে আর ভাবছে। এমন একটি ক্ষন যা  মানুষের  মনকে নরম করে দেয়। কে জানে আরো কতক্ষন অপেক্ষা করতে হবে?

    তুই একটু ঘুমিয়ে নে।

    কাকা কি খুঁজছে আমাকে?

    তোর কাকা তোর ভাই কে খুঁজেছিল?

    কিছুক্ষণ ভেবে বলে, না, শুধু পুলিশ কে বলেছিল। চুপ হয়ে গেল তারপর।

    মায়ের গায়ের ওমে
    চার চারটিতে শুয়ে
    কুন্ডলী পাকিয়ে কি আরামে
    চার চারটিতে  শুয়ে।
    ঐ তুলতুলে টা কালোয় সাদায়?
    মা টা সরুক  আগে। 
    নিঃশব্দে  নিয়ে আসবো
    মা টা সরুক তো আগে।

    ছেলেটা হেসে উঠে। আমি জানি বানালেন এক্ষুনি।

    কি বানালাম?

    পদ্য।

    কিসের পদ্য?

    কিসের আবার, ঐ কুকুর ছানার!

    আবার এক জোড়া আলোর বিন্দু।  এগিয়ে আসছে। হ্যাঁ রাস্তার ছায়াগুলোর উপর আলো ফেলতে ফেলতে এদিক পানেই তো আসে।  ছেলেটা ও লক্ষ্য করেছে।  কিছুক্ষণের মধ্যেই এক্কেবারে সামনে , রাস্তার ওপারে  পাম্প ঘরটার কাছে এসে লরি টা থামলো। ওরা আমাদের দেখেছে।

    তোকে যেতে হবে এবার।

    ছেলেটি বসেই রয়েছে।

    আসবিনে?

    লরি টি একটু এগিয়ে একটু পিছিয়ে রিভার্স করে নিচ্ছে।

    আমি ছেলেটির হাতটা ধরে টেনে উঠালাম ।

    ও বলে আপনি যাবেন না সঙ্গে?

    আমি বলি আমি  সামনের সপ্তাহে আসবো। তুই তোর ভায়ের সঙ্গে থাকবি।

    আমরা দুজন লরির  দিকে এগোয়।
    লরির একটা লোক ঐ অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মত এগিয়ে আসছে।
    ছেলেটি হটাৎ দাড়িয়ে পড়ে। শক্ত করে ধরে থাকে আমার হাত।

    আমি বলি  তোর ভাইকে দেখবি না?    এক মাস হয়ে গেল প্রায়। তাড়াতাড়ি কর।

    ছেলেটা তবুও দাড়িয়ে থাকে।

    লরির লোকটা ওর হাত থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে বললো, তাড়াতাড়ি কর খোকা, অনেকটা দূর যেতে হবে। তোমার ভাই তোমাকে দেখবার জন্য অপেক্ষা করতেছে।

    আমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে ওরা
    ছেলেটিকে নিয়ে চলে গেল।

    ভোর হয়েছে।  একটা লোক  এলো তার চায়ের দোকানটা খুলতে।  পাম্পঘরের পাঁচিল টা র গায়ে তার সাইকেলটা  হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে  ঝাঁপ খুললো।
    গাড়ি ঘোড়া মানুষের চলাচল শুরু হবে এখন। আমি আমার কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে রাস্তা  পেরিয়ে  দোকানটার দিকে অগ্রসর হলাম।

    উনুন জ্বললো। জল চাপালো।  একটা টেম্পো প্রচন্ড আওয়াজ করতে  করতে বেরিয়ে গেল।  একটা রিক্সা এসে থেমেছে। চা খাবে। জিজ্ঞেস করতে জানালো আমার বাস টা আসতে আসতে এখনো পৌনে ঘন্টা। দুধ ফুটছে। পাখীদের কিচিরমিচির শুরু হয়েছে। দুই দুই কাপ চা খেয়ে  আমার ঝোলা থেকে নোট বই আর পেন টা  বার করলাম।

    মনে পড়ে জানালা দিয়ে
    উড়ে আসা পাখি
    পাখার ব্লেডে জখম হল
    এক উড়ে আসা পাখি
    কি কান্না মেয়ের আমার
    চোখ ভরে যায জলে
    আমি বলি চল তাহলে
    এক পাখির হাসপাতালে
    অনেকটা দূর অটো করে
    পাখির হাসপাতালে।
    ________________

       

     

  • আরও পড়ুন
    আঁধি - Jahar Kanungo
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সমর | 2402:3a80:15fb:aa2c:4e5c:24d1:d1d0:8a4f | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ২০:৪৭501510
  • একটি ভিন্ন রকমের লেখা। লেখক কে সাধুবাদ জানাই। 
  • বিপ্লব রহমান | ০২ ডিসেম্বর ২০২১ ০৮:১২501611
  • পাখার ব্লেডে জখম হলো এক উড়ে আসা পাখি... 
     
    এভাবেই ডানা ভাঙে কেবল, ভেঙে যায়, জখম বাড়ছে। অনবদ্য লেখা। 
     
    আরও লিখুন 
  • Jahar Kanungo | ০২ ডিসেম্বর ২০২১ ১০:২৫501614
  • ধন্যবাদ বিপ্লব বাবু। 
    ধন্যবাদ সমর বাবু।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন