ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ভ্রমণ  শনিবারবেলা

  • পায়ের তলায় সর্ষে (এবং কোভিড) - পুয়ের্তো রিকো পর্ব - ২

    মিঠুন ভৌমিক
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ২৭ নভেম্বর ২০২১ | ৮৫৯ বার পঠিত
  • রাতের স্যান হুয়ান। হুয়ান পন্সে দে লিয়ঁ এর মূর্তি নিয়ে স্কোয়ার।


    গভীর জলের দিকে এগোতে এগোতে (এবং মাঝে মধ্যেই বেসামাল অবস্থায়) বুঝলাম আবারও সংকোচ জয় করে প্রশ্ন করতে হবে। লাইফ জ্যাকেট পরে হয়তো ডুববো না, কিন্তু ডুবে ভেসে তো থাকতে পারি। ত্রিশঙ্কুর মত সেই ভেসে থেকে তো তেমন লাভ নেই, জলফল খেয়ে একসা হবে। লিবিকে একবার থামিয়ে জিগ্যেস করলাম, আচ্ছা যদি এরকম পরিস্থিতি হয়, যে জল খেয়েই চলেছি, কিছুতেই সোজা হতে পারছি না, তাহলে তোমাকে কীভাবে ডাকব? লিবি বলল, ডাকতে হবে না, আমি কাছেই থাকব। বস্তুত হলও তাই, বাকি প্রায় পুরোটা সময় আমাদের পাঁচজনের সাথে ছায়ার মত লেগে ছিল সে। পরবর্তী আধ ঘণ্টা ধরে বিস্তর প্র্যাকটিস হল, এবং সেইসঙ্গে দিব্যি জল প্যাডল করে এগোনো যাচ্ছিল। একসময় সভয়ে দেখলাম - সেই দূরবর্তী ডুবো পাথরগুলো, যা দিয়ে সমুদ্রের সেফ এবং "আনসেফ" অঞ্চল আলাদা করা - সেখানে চলে এসেছি। দেখলাম সেখানে একটা দড়িও টাঙানো আছে। স্রোতের টান বেশ ভালো, দড়ি ধরে না থাকলে আমার মত ক্যাবলাকান্ত হুশ করে ভেসে গিয়ে কিসের না কিসের খাদ্য হয়ে যাবে। যদিও লিবি খুব দুঃখ করে বলল, সে নাকি গত এক বছর ধরে ঐ জল চষে ফেলেও কোনো হাঙর দেখেনি, কিন্তু অত স্রোতের মধ্যে একগলা জলে ভেসে আমার সেকথা বিশ্বাস হল না। লিবি দড়িটা ধরে আমায় ভাসতে বলে একটু দূরে অন্য দুজনকে ছবি তুলে দিতে গেল। আমি দড়িটা ধরে কোনোক্রমে ভেসে রইলাম, আমার শরীরটা রথের পতাকার মত হরাইজন্টাল হয়ে রইল স্রোতের টানে। বুঝলাম, জীবন-মরণের সীমানায় থাকা এই জায়গাটায় আসা কেন আমার মত আনাড়ির পক্ষেও এত সহজ হয়েছে। প্যাডল যা করেছি, তা নিমিত্তমাত্র, আসলে ঐ স্রোতে টেনে এনেছে । তবে বেশ কিছুটা সময় জলে কাটিয়ে, ততক্ষণে ব্যাপারটা খানিকটা সয়ে এসেছে। কয়েক মাস কেটে গেলে অসহ্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও সহ্য হয়ে যায়, এ তো খালি জল। ইতিমধ্যে জলের নিচে দিব্যি ডুবে থেকে সমুদ্রের তলার জিনিসপত্র দেখতে পেয়েছি। এক এক সময় এতক্ষণ টানা জলের নিচের জগৎ দেখতে পেরেছি এইবার, যে কী দেখলাম-এর থেকেও এই স্নরকেলিং জিনিসটার মজাই অবাক করে দিয়েছে। সমুদ্রের জলের একটা মাদকতা আছে, নেশার মত। জলের নিচের পৃথিবী তো আরো অনন্য। রোদে ভেসে যাচ্ছে চারদিক, কিন্তু তার মধ্যেই নানা রঙের আলোর খেলা, তরঙ্গ, কোথাও পাথর, মাছ তার মধ্যে দিয়ে আসা যাওয়া করছে, কোথাও শ্যাওলা, কোথাও কাশফুলের মত হয়ে আছে। বহুবর্ণের পাথর, এক জায়গায় দেখি একটা পাখির ডিম। লিবি দেখতে পেয়ে একডুবে তুলে নিয়ে এসে বলল, ভাঙা।

    ঐ স্রোতের জায়গাটা থেকে ফিরতে ভয়ানক সমস্যা হল। আনাড়ি সাঁতারুর প্যাডেলের চেয়ে প্রচুর বেশি জোর ঐ স্রোতে। তবুও একসময় সবাই মিলে সেও হল। যে অর্ধচন্দ্রাকৃতি জায়গাটা অসম্ভবের মত লাগছিল, সেটা পুরো বেড় দিয়ে আমরা ঘুরে অর্ধবৃত্তের অন্যদিকে চলে এলাম, হাতে তখনও আধঘণ্টা বাকি। লিবি বলল, চল, এবার অন্যদিকটাও দেখে নেওয়া যাক। সবে ভাবছিলাম, সসম্মানে ব্যাপারটা এবার মিটে যাবে, এই নতুন প্রস্তাবটা একেবারেই ভালো লাগল না। এই "অন্যদিক" মানে সীমানা পেরিয়ে, আমার কাছে যা "আনসেফ" অঞ্চল, তাই। ততক্ষণে অন্য দলটি সেই অগাধ সমুদ্রে সাঁতার দিয়ে দূরে চলে গেছে, কে জানে তাদের কেউ হয়তো টম হ্যাঙ্কসের মত কোন ছোট দ্বীপে থেকেই যাবে আগামী কয়েক বছর। যাই হোক, তীরে এসে তো আর প্রেস্টিজ ডোবাতে পারি না, তাই মুখে হিন্দি শেখা ডাকাবুকো অভিনেতার মত হাঁ হাঁ কিঁউ নেহি টাইপের ভাব করে ভেসে পড়তে হল। এই অঞ্চলটা প্রায় একইরকম, তবে বৈচিত্র্য আরো বেশি। মিনিট কুড়ি ধরে সেখানেও কুস্তি করে তারপর একসময় মুক্তি পেলাম। বীরের মত জল থেকে উঠে এলাম, মুখের ভাবটা আরো ঘণ্টা-দুই জলে থাকতে পারলেই ভালো হত। শুনলাম ৫০-৫৫ বছরের ঐ ভদ্রলোক, যিনি সপরিবারে স্নরকেলিং করতে এসেছেন, তিনি অগাধ সমুদ্রে সাঁতার দিয়ে একটা কচ্ছপের পেছনে ধাওয়া করেছিলেন। তারপর এতদূরে চলে যান (এবং কচ্ছপটা এতই দ্রুতগামী) যে তাঁর ভয় হতে থাকে ফিরতে পারবেন না। অতঃপর বুদ্ধিমানের মত ফিরে এসেছেন। বুঝলাম, যে লড়াইটা আদপেই সংস্কৃত আর হিন্দির না, বস্তুত তারা হল "অলসো র‍্যান" ক্যাটাগরি। আসল হিরো হল হলিউড, সেখানে সবই সম্ভব। কচ্ছপটা জোর বেঁচে গেছে।

    কচ্ছপ প্রসঙ্গে কেন জানি না, মনে পড়ল বহুক্ষণ কিছু খাইনি। সকালে খাওয়া ডিমসেদ্ধ, টোস্ট কখন হজম হয়ে গেছে। সৌভাগ্যের বিষয়, এখন আমাদের বাকি দিন, এবং বাকি ট্রিপটাই, ডাঙাতেই থাকতে হবে। পরবর্তী উদ্দেশ্য স্যান হুয়ানের কবলস্টোনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে শহর দেখা।
    যথারীতি আমাদের ভয়ঙ্কর স্প্যানিশ হাতড়ে হাতড়ে একে তাকে জিগ্যেস করে পৌঁছনো হল একটা পেল্লায় স্কোয়ারে। আগে এর নাম ছিল স্যান্টিয়াগো স্কোয়ার, এখন নাম হয়েছে প্লাজা কোলন। ঘাবড়ানোর কিছু নেই, মানুষের পৌষ্টিকতন্ত্রের একটি বিশেষ অংশের কথা হচ্ছে না, এ হল অনেকটা জায়গা জুড়ে বাঁধানো চত্বর, তার মাঝে প্রসিদ্ধ অভিযাত্রী ওরফে কলোনিশিল্পী ও দাস ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মূর্তি। এই স্কোয়ার ঘিরে অনেক খাবারের দোকান, কফিশপ, স্যুভেনির-এর স্টল। আর অনেক ট্যুরিস্ট। আমাদের হাতে অল্প সময় ছিল, ভাবলাম এইবেলা কিছু খেয়ে নেওয়া যায় কিনা, কিন্তু দেখা গেল, চট করে কোনো কাজ ঐ চত্বরে সারা সম্ভব নয়। অতএব কফি নিয়ে আমরা পদযাত্রায় চললাম।

    প্লাজা কোলন থেকে শুরু হয়ে, নানা অলিগলি হয়ে, একের পর এক ঐতিহাসিক সৌধ, স্থানীয় দোকানপাট, চার্চ, ইউনিভার্সিটি দেখতে দেখতে আমরা চললাম। এবারেও দলে দশ বারো জন, একজন গাইড সঙ্গে আছেন। পথে আম, কৃষ্ণচূড়া, নারকেল এইসব গাছ দেখে বেশ অনেকদিন পরে বাড়ি এসেছি মনে হল। ওল্ড স্যান হুয়ানে বেড়াল খুবই জনপ্রিয়। বেড়ালদের জন্য উৎসর্গীকৃত একটা পার্কই আছে, সেখানে লোহার দুটো সিংহাসনের মত আছে, দুটোই আসলে প্রমাণ সাইজের ধাতব বেড়ালমূর্তি। ঐগুলোই বসার জায়গা, অর্থাৎ ঐ পার্কে আপনাকে বসতে গেলে বেড়ালের কোলেই বসতে হবে। আমগাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে, কিছু এদিক ওদিক পড়েও আছে দেখলাম।

    সৌধগুলো নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। সবই স্প্যানিশ কলোনির কোনো না কোনো ঐতিহাসিক দলিল। কয়েকটি স্কোয়ার, গির্জা এবং কেল্লা। এর মধ্যে প্লাজা দে আর্মাস আরেকটি একইরকম স্কোয়ার, এর বিশেষত্ব হল, এটি পূর্বতন আর্মারির গায়ে তৈরি। চার্চগুলো বেশ সুন্দর। একে একে পথে পড়ল সান্তা আনা, চ্যাপেল অফ ক্রাইস্ট, স্যান হুয়ান চ্যাপেল, এবং স্যান হোসে চার্চ। সান্তা আনা চমৎকার দেখতে, বিশেষ করে গোলাপি আর সাদা রঙের, আশপাশের আর পাঁচটা বাড়ির মধ্যে মিশে থাকা এমন চার্চ আমি আগে দেখিনি। স্যান হোসে একেবারে সাদামাটা। ডলার ট্রিলজি যারা দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই আর্কিটেকচার চেনা লাগবে। আর স্যান হুয়ান চ্যাপেল এদের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত, এর মধ্যে রাজকীয় ব্যাপার আছে, যদিও গঠনশৈলীতে সেই সাদাসিধে ব্যাপারটা এখানেও পাওয়া যায়। স্যান হুয়ান চ্যাপেলে একটা মজার ব্যাপার দেখলাম। পুরনো মূর্তি সব একটা গ্রিলের দরজা-আঁটা হলঘরে রেনোভেট করা হচ্ছে। এদিকে গির্জায় মূর্তি সব জায়গারটা জায়গায়। বুঝলাম ভগবানের দুটো সেট করে রাখা আছে, শিফটিং ডিউটি। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছুটিতে থাকা শায়িত যিশু ও অন্যান্যদের ছবি তুলে রাখলাম। একদল ভগবান আক্ষরিক অর্থেই নিদ্রা গিয়েছেন, অন্য একদল নানা দেওয়াল এবং ছাদ থেকে ঝুলে ঝুলে নকল বুঁদির গড় রক্ষায় ব্যস্ত।

    পাথুরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, রঙবেরঙের বাড়ি দেখতে দেখতে, হঠাৎ একটা গলি এল, যেখানে সার দিয়ে শিল্পসামগ্রীর দোকান। আমরা মূলত আকৃষ্ট হলাম হাতে আঁকা ছবির দোকানগুলোর দিকে। এরকম গ্যালারি পুরনো স্যান হুয়ানে বেশ কিছু আছে। আমরা এরকম একটা দোকানের ডিসপ্লেতে এক কোণে ছোট একটা পোস্টকার্ডের মত ছবি দেখে মুগ্ধ হলাম। একটা ছোট মেয়ে, বাঁশি বাজাচ্ছে। পরে হেঁটে শহর ঘোরা সাঙ্গ করে আমরা ঐ দোকান খুঁজে বের করে ছবিটা ভালো করে দেখতে গেছিলাম, যাতে কে এঁকেছেন, ছবিটার গল্প কী - ইত্যাদি জানা যায়। গ্যালারির মালিক খুব কিছু বলতে পারলেন না, জানালেন বহু অনামী শিল্পী এইসব দোকানে এসে ছবি বিক্রি করে যান, তাঁদের সাথে অনেক সময়ই দোকানদারের পরে আর যোগাযোগ হয় না।

    জুন-জুলাই মাস পুয়ের্তো রিকোতে বেশ বৃষ্টি হয়। আগেরদিন কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় কোথাও কোথাও জল জমেছে। তার মধ্যে দিয়ে সারিবদ্ধ গোরুর মত আমরা ইতিউতি চাইতে চাইতে হাঁটছি, গাইড নানা গল্প বলছেন। এর মধ্যেই দেখি, আমাদের দলেরই একজন তরুণী আগে আগে হাঁটছেন দৃপ্ত ভঙ্গিতে। তাঁর পরনে একটা লম্বা আলখাল্লার মত ড্রেস, যার একেবারে শেষপ্রান্ত প্রায় ফুটখানেক মাটিতে লুটিয়ে লুটিয়ে চলেছে। যাবতীয় ছোট নদীনালা কাদা ও বর্ষার আরো যা খাদ্যাখাদ্য রাস্তায় পড়েছিল, তাঁর পোষাক সবই ঝাঁট দিতে দিতে চলেছে। শশব্যস্ত হয়ে তাঁকে সেকথা জানালাম, আরো বললাম আমাদেরও এক বন্ধু আছে, সেও এরকম নানা কাজে রাস্তায় বেরোলে এভাবেই পরোক্ষভাবে রাস্তা সাফ করে। এইসব করতে করতেই আমরা সরু সরু আরো কয়েকটা গলি পেরিয়ে এলাম।

    চ্যাপেল অফ দ্য ক্রাইস্টকে অনেকেই ছবিতে দেখে থাকবেন, দুর্দান্ত ফোটোজেনিক এই খুদে চ্যাপেলটি। গাইড চার্চটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা মিথের কথা জানালেন। একদল অশ্বারোহী নাকি রাতের অন্ধকারে ঘোড়া সমেত প্রচন্ড গতিতে ঐ রাস্তা দিয়ে ছুটে যেতে যেতে ঠিক সময়ে মোড় ঘুরতে না পেরে সোজা সমুদ্রে পড়ে যান। চার্চের গায়েই এক বিশপের বাড়ি, তিনি জানলা দিয়ে এইসব দেখে জাদুবলে সবাইকে জল থেকে অক্ষত তুলে আনেন। চ্যাপেলের উল্টোদিকের রাস্তায় আরেকটু এগিয়েই পড়লো গভর্নরের বাড়ি, সেখানে দেখি গুটি গুটি কিছু লোক জড়ো হয়েছে হাতে গভর্নর নিপাত যাও গদি ছাড়ো জাতীয় প্ল্যাকার্ড নিয়ে। ভারি কৌতূহল হলো। একটু খোঁজটোজ করে জানলাম গত তিন চার মাস ধরেই অগ্নিগর্ভ হয়ে রয়েছে স্যান হুয়ান। কিন্তু সেসব কথা পরে।



    চ্যাপেল অফ দ্য ক্রাইস্ট


    এদিকে আমাদের হাঁটা চলছে। আরো খানিক এগিয়ে, স্যান হুয়ান চ্যাপেল পেরিয়ে এসে গেল প্লাজা লা রোগাতিভা, এবং সেখানকার বিখ্যাত ভাস্কর্য "দ্য প্রসেশান"। ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিংবদন্তি। ১৭৯৭ সালের বৃটিশ আক্রমণের সময় নাকি স্প্যানিশ সেনা প্রায় হেরে যাচ্ছে, এমন সময় জনৈক ক্যাথলিক বিশপ কয়েকজন সঙ্গী সহ , হাতে ক্রশ এবং মশাল নিয়ে মিছিল করে বৃটিশ সেনাদের দিকে এগোতে থাকেন। বৃটিশ সেনা এই পাদ্রিদের মনে করে অকুতোভয় স্প্যানিশ সেনা, এবং নাকি এতে তারা এতই ভয় পেয়ে যায় যে রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে যায়।



    রোগাতিভা প্লাজা, স্যান হুয়ান বে'র ধারে। এই ভাস্কর্য্যের নাম "দ্য প্রসেশান "।


    দেখতে দেখতে দিনের আলো কমে আসতে লাগলো। আমাদের প্রথম দিনের শেষ গন্তব্য এল মোরো নামের কেল্লা, যেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখিয়ে গাইড বিদায় নেবেন। ষোড়শ আর আঠারোশ শতকের মাঝামাঝি তৈরি এই কেল্লার বিশেষত্ব হলো এটি স্যান হুয়ান বে'র দারোয়ানের মত কাজ করে। বিশাল একটা মাঠ পেরিয়ে কেল্লার চত্বর। বিকেলের দিকে এই মাঠে মানুষের ঢল নামে। বাচ্চারা ঘুড়ি ওড়ায়, খেলে। বড়োরা ঘাসে বসে গল্প করে। কেউ কেউ সমুদ্রের ধারে কেল্লার পাঁচিলে বসে সূর্যাস্ত দেখে, কেউ বই পড়ে। সাঁই সাঁই করে সমুদ্রের হাওয়া দেয় সারাদিন। সব মিলিয়ে খুবই আরামদায়ক জায়গা।

    মুশকিল হলো, মানুষ নামের প্রজাতি যেকোন স্বর্গীয় জায়গাকেই মুহূর্তে হাস্যকর করে তুলতে পারে। এখানেও তার দূর্দান্ত নমুনা দেখা গেল। আমরা কেল্লাকে বেড় দেওয়া (চার ফুট চওড়া, দুদিকেই প্রশস্ত জমি) পাঁচিলে জুত করে বসতে না বসতেই তিন জনের একটি দল এসে ট্রাইপড ইত্যাদি বের করে রীতিমত প্রফেশনাল ছবিছাবা তোলার আয়োজন করে ফেললো। একটা সাদা স্ক্রীণও বসিয়ে দিলো, সেদিকের সমুদ্র আর দেখা যায়না। আমরা মুগ্ধ হয়ে তাদের কান্ডকারখানা দেখছিলাম। একজন ফোটোগ্রাফার, আর অন্য দুজন দম্পতি বলে মনে হলো। এরপর ফোটোগ্রাফার নানা কায়দায় মেয়েটির পরে থাকা ওড়নার একপ্রান্ত উড়িয়ে, তার সাথে অস্তমান সূর্যকে এক ফ্রেমে রেখে ছবি তুলতে থাকলো। অত হাওয়ায় ওড়না ঠিকমত উড়ছিলো না বলে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুটি হতভাগ্য ছাত্রছাত্রী (সম্ভবত তাদের প্রেম বিঘ্নিত করেই ) ওড়না ওড়ানোয় হাত লাগালো। তারপর যতক্ষণ সূর্য দেখা গেল, পুরো সময়টাই নানা কৌণিক বিন্যাসে আকাশে ওড়না উড়িয়ে ছবি তোলা হলো। আমরাও ততক্ষণে সারাদিনের পথশ্রমে অস্তমান। বিশেষ করে জল স্থল দুই মিডিয়ামেই চলাচল করে আমার ঘুম পেতে শুরু করেছে।

    রাতের স্যান হুয়ান জাগছে ধীরে ধীরে। এখন বারে, রেস্তোরাঁয়, স্কোয়ারগুলোতে অল্পবয়সীরা ভিড় করবে। গানবাজনা হবে খুব। আলো ঝলমলে শহরে বহিরাগত ট্যুরিস্ট আর ঘরের লোকেদের আলাদা করা যাবেনা। এসব দেখতে দেখতে আমরা হোটেলে ফিরে চললাম। পরের দিন পুরোটাই আবারো স্যান হুয়ানে কাটবে। আর তারপর আমরা যাব এল জুঙ্কে, ট্রপিকাল রেইনফরেস্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফরেস্ট সিস্টেমে রেইনফরেস্ট এই একটিই।


    (চলবে)


  • | বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৭ নভেম্বর ২০২১ | ৮৫৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সম্বিৎ | ২৭ নভেম্বর ২০২১ ১২:০৮501472
  • আমার প্রথম অংশটাখুব ভাল লাগল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্লাস চোরা হিউমার। খাসা লেখা। কিন্তু যেই শিল্পবস্তুর কথা এল, আমার মন ইতিউতি চলে গেল। খুবই অগভীর মন।
  • | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ১১:১৮501497
  • শিল্পবস্তু ত মাত্র একপ্যারা। আমার ত পুরোটাই দিব্বি লাগল। 
  • 4z | 184.145.8.124 | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ১২:১৫501499
  • "আরো বললাম আমাদেরও এক বন্ধু আছে, সেও এরকম নানা কাজে রাস্তায় বেরোলে এভাবেই পরোক্ষভাবে রাস্তা সাফ করে।" - হ্যা হ্যা ​​​​​​​হ্যা ​​​​​​​
  • π | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ১২:৪৭501500
  • angryangryangryangrysadcrying
  • | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ১৪:৩৮501502
  • 'ঠাকুরঘরে কে রে?  থুড়ি রাস্তা ঝাঁদ্দেয় কে রে?  খিখিখি হ্যাহ্যা
  • সুকি | 49.207.198.162 | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ১৭:৪৯501505
  • বাঃ চলুক - 
  • dc | 122.174.110.105 | ২৮ নভেম্বর ২০২১ ১৮:৫৫501506
  • দুটো পর্বই পড়ে ফেললাম, ভালো লাগলো পড়তে। আর একটু মন খারাপও হলো, কবে আবার ঘুরতে বেরোতে পারবো কে জানে! এই করোনাভাইরাস তো গ্রিক অ্যালফাবেট শেষ করে রোমান অ্যালফাবেট ধরে ফেলবে মনে হচ্ছে। 
  • kk | 68.184.245.97 | ০১ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:৩০501577
  • খুব ভালো লাগছে। স্কাল্পচার, মনুমেন্ট্স ছাড়াও ঐ রকম হাতে আঁকা ছবি বা অন্য কোনো স্থানীয় আর্টের ছবি দেখতে পেলেও বেশ হতো।
  • Tim | 2603:6010:a920:3c00:a8c7:911e:e44c:731d | ০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০৩501804
  • সব্বাইকে ধন্যবাদ পড়ার জন্য। 
    কেকে, 
    পরের পর্বে ছবিটা দিচ্ছি। খুঁজে পাচ্ছিলাম না আগের পর্ব লেখার সময়। :)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন