• খেরোর খাতা

  • নেড়াদার লিফট বিভ্রাট

    Sayanti Mandal লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৯৮ বার পঠিত
  • নেড়াদা লিফ্ট বিভ্রাট

    নেড়াদা এমনিতে বেশ চালাক চতুর লোক। পাড়ায় সবাই বেশ সমীহ করে। পল্টু জগার কথা তো বলার নেই। নেড়াদা বললে ওরা চাঁদও নিয়ে এনে হাজির করবে এমন। অফিসেও নেড়াদা লিডার গোছের। কেবল বাড়িতেই এখনো সেভাবে নেড়াদার প্রভাব গড়ে ওঠে নি। সে কথা থাক। তবে নেড়াদা বরাবর এমন চালাক চতুর ছিল না।

    প্রথম যখন নেড়াদা চাকরি পেয়ে কলকাতায় আসে তখন কিছুই জানত না। নেড়াদা গ্রামের ছেলে। মার একমাত্র ছেলে। দিব্বি ছিলো গ্রামে। ঘরের খেয়ে। পুকুরের মাছ ধরে। হ্যাঁ, নেড়াদা মাছ ধরতে ভালোবাসত। মাছধরা ছিল নেশার মত। সারা সকাল ধরে মাছের চার তৈরি করত। তারপর দুপুরে খাওয়াটি হল কি নেড়াদা ছিপ নিয়ে বাঁড়ুজ্জ্যেদের পুকুরে হাজির। মা রাগারাগি করত। কান্নাকাটিও করেছে বিস্তর। নেড়াদার ভবিষ্যৎ নিয়ে মা-র দুঃখের শেষ ছিল না।

    সত্য মামা মা-এর দূরসম্পর্কের ভাই। মামা ছিলেন কলকাতার বড় অফিসের দেশি সাহেব। মা গিয়ে পড়ল মামার কাছে। কান্নাকাটি করল অনেক। মামা দুর্বল প্রাণ। মা-র কান্না দেখে নিজেও নাক টেনে বললেন "আহা করিস কি খুকু। আমি এখনও আছি তো"।

    নেড়াদার সুখের দিন শেষ হল। মামা সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কলকাতায় ডেকে পাঠালেন। সাথে চাকরির নিয়োগপত্র। নেড়াদা এক রবিবার দেখে কলকাতায় এল। মামা আগেই থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। নেড়াদা বাক্স বিছানা নিয়ে সেখানে থিতু হল। পরদিন সকাল সকাল ধোওয়া শার্টপ্যান্ট পড়ে নেড়াদা হাজির দশতলা অফিসের সামনে।

    নেড়াদা কিছুক্ষণ ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঘাঢ় টনটন করতে মাথা নামিয়ে অফিসের দরজার কাছে এগোল। গেট দিয়ে সব শুটবুট পড়া লোক হনহন করে ঢুকে যাচ্ছে। গেটের পাশে বসা লোকটা মাঝে মাঝে কাউকে কাউকে উঠে সেলাম করছে। তার চেহারা দেখে ভয় খাবার মত। নেড়াদা ফাঁক বুঝে ঢুকতে গেল। কিন্তু দারোয়ানের কড়া নজর। নেড়াদার কাঁধটা ধরে বলে

    - কিধর জানা হ্যায়?

    নেড়াদা একে গ্রামের ছেলে তার ওপর হিন্দি কিছুই বুঝল না। আমতা আমতা করতে লাগলো। দারোয়ান আরও জোরে কাঁধটা চেপে ধরল। নেড়াদা পালাবে তার উপায় নেই। অগত্যা কোনোমতে বলল,

    - বড় সাহেবের সাথে দেখা করব।

    - আইসা বোলিয়ে। আপকো চ্যাটারজী সাহবসে মিলনা। সিধা যাকে লিফ্ট। আঠবে মালে পে সাহব কা অফিস। এই বলে দারোয়ান নেড়াদাকে লিফ্ট যেদিকে সেদিকে ঠেলে দিল।

    নেড়াদার তখন ঘাড়ের কলকব্জা খুলে যাবার জোগাড়। ভিড়ের সাথে নেড়াদা এগিয়ে গিয়ে খাঁচার মধ্যে ঢুকে গেল। এটাই লিফট। কিন্তু এ কী। নেড়াদা যে চেপ্টে যাবে এবার। এইটুকু জায়গায় কতো লোক ঢোকে। দেওয়ালে সেটে গেলো নেড়াদা। ঘটাঙ করে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। লোকের মাথার ফাঁক দিয়ে নেড়াদা দেখলো দেওয়াল নেমে যাচ্ছে। সাথে নেড়াদার পায়ের তলাটা ফাঁকা লাগছে। পেটের মধ্যে গুড়গুড় করতে লাগলো। নেড়াদা ভিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে ঘামতে থাকলো। "হরি হে রক্ষে করো"।

    একটুক্ষণ পর দড়াম করে খাঁচাটা থেমে গেল। নেড়াদার দু পাশের চাপটা হালকা লাগলো। হুড়মুড় করে কিছু লোক নেমে গেলো। নেড়াদা পা বাড়াতে যাবে কিনা ভাবছে। তার আগেই আরও একদল লোক হুড়মুড় করে ভিতরে চলে এল। আবার নেড়াদা চেপ্টে গেলো। মাথার ফাঁক দিয়ে নেড়াদা দেখল দেওয়াল আবার নেমে যাচ্ছে। কয়েকবার এরকম হবার পর নেড়াদা মরিয়া হয়ে নামবে বলে হাত পা ছোঁড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু বৃথা। সামান্য নাড়াতেও পারল না। নেড়াদার হাত পা ভিড়ের চাপে নিজের আয়ত্তে নেই। নেড়াদা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল। নেড়াদার কান্না পেল। দিব্যি গ্রামে ছিল নেড়াদা। মাছ ধরত সুখে। তার সুখটা মা-র সহ্য হল না। মা-কে এখন সৎমা মনে হচ্ছে। মামাকে কংস মামা মনে হতে লাগলো। পৈত্রিক প্রাণটা বাঁচলে হয়। এই খাঁচা থেকে কোনোদিন বেরোতে পারবে কিনা ভাবতে পারল না।

    বেশ কিছুক্ষণ এরকম চলল। নেড়াদা যে সেই পিছনে চেপ্টে গেছে। আর বেরোতে পারল না। গলা শুকিয়ে গেছে। মামার অফিস কতলায় নেড়াদা মনে করতে পারছে না। খাঁচাটা ওপর নীচ করতে লাগল। ক্লান্ত হয়ে নেড়াদা দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। যারা ওঠা নামা করছে তাদের টুকটাক কথা শুনতে শুনতে নেড়াদার ঝিমুনি এসে গেল।

    ঘণ্টাখানেক পর খাঁচাটা জোড়ে আওয়াজ করে থেমে গেল। নেড়াদা চোখ মেলে দেখল দরজাটা হাঁ করে খোলা। এই সুযোগ। নেড়াদা একটু উঁকি মেরে দেখল কেউ নেই। জয় গুরু। এই যাত্রা তাহলে বেঁচে গেলো প্রাণটা। নেড়াদা চোখ বন্ধ করে দৌড় লাগালো।

    - কিধার ভাগতা বাবু।

    ছুটন্ত নেড়াদাকে থামিয়ে দিলো এক শক্ত হাত। কাঁধটা আবার খূলে যাবে মনে হল। চোখ খুলে নেড়াদা দেখে সেই সকালের দারোয়ান। নেড়াদা বুঝল আর কোনও উপায় নেই। এ এক ফাঁদ। এর থেকে নেড়াদা বেরোতে পারবে না। মামা তাকে চাকরির নামে এ কোথায় আনল। দারোয়ান আরও কিছু বলত। তার আগে একটা বড় গাড়ি এসে থামল দরজার কাছে। আর গাড়ি থেকে যিনি নামলেন তাকে দেখে নেড়াদার সব দাঁত বেড়িয়ে এলো। "মামা..."

    - একি রে নেড়া। আজ অফিসের প্রথম দিন। আর এখনও তুই নিচে কী করছিস। আমার একটা সম্মান আছে কিনা? ছি ছি।

    দারোয়ান ততক্ষণে কিছু একটা বুঝে নেড়াদাকে ছেড়ে মামাবাবুর উদ্দেশ্যে বলল "সেলাম সাহেব"। মামা বিনিময়ে ঘাড় নাড়ে। ঘাড়টা টনটন করলেও নেড়াদা ততক্ষণে বেশ জোর পেয়ে গেছে।

    - মামা এই তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। মা বলে দিয়েছিলেন কিনা তোমার সাথে আগে দেখা করতে।

    - নে নে চল। কাল থেকে যেন আর দেরি না হয়। এই বলে মামা লিফটের দিকে এগিয়ে চলে। নেড়াদার পেটটা আবার গুড়গুড় করে। কিন্তু মামা তাড়া দেন। নেড়াদা জয় মা বলে মামার পিছন পিছন এগিয়ে যায়।
  • আরও পড়ুন
    লিফট - Parikshit Manna
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৯৮ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন