• খেরোর খাতা

  • সাগর ও বেলার চিরকালীন গল্পগাথা

    Mousumi Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২১০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • "বেলা!! আসবে কি তুমি এবার? সময় কি হল তোমার?"

    "সাগর, আবার! আবার !! কেন বারবার এমনভাবে হাতছানি দিয়ে যাও? অবুঝ তুমি বড়। কবে বুঝবে?"

    "বেলা, তুমি কি অবুঝ নও? আর কতদিন? আরোও কতদিন সাগর ফিরে ফিরে যাবে?"

    "তুমি বড় অস্থির ,সাগর! দিন নেই, রাত নেই – এত চঞ্চল কেন তুমি? একটু শান্ত কি হতে পার না কখনও? "

    "তোমার ঐ এক কথা, বেলা! তুমি কেন নিজের ভাবনায় অনড় থাক? সে বুঝি তোমার দোষ নয়? সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সাগরের সঙ্গে আসা কি এতই অসম্ভব?"

    "তুমি কী ছেলেমানুষ, সাগর! বেলার কি এমন সবকিছু ফেলে চলে যাওয়া চলে? না, সাগর ! বেলা পারবে না চলে যেতে।"

    অনন্তকাল ধরে সাগরের বুকভরা কষ্ট গুমরে গুমরে লক্ষ লক্ষ ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ে বেলাকে জানাতে চায়‌। কেন এমন হয় তার সঙ্গে? বেলা কেন বোঝে না তাকে? কিসের এত পিছুটান বেলার যার আকর্ষণে সাগরের অসীমতাকে সে অস্বীকার করে? বারেবারে ফিরে যেতে হয় সাগরকে? সাগর কিছুতেই পারে না বেলাকে ছেড়ে যেতে। অনন্ত জলরাশির ভার বয়েই চলেছে সে যুগ যুগ ধরে। শত সহস্র বছর ধরে সাগর আর বেলা দুটিতে এমনভাবেই দিনের পর রাত আর রাতের পর দিন পার করে যাচ্ছে।

    শেষরাতে অন্ধকারের বুকে ভোরের আলো তার আলতো পরশ বুলিয়ে দেয় , ধীরে ধীরে নতুন দিনের শুরু হয়, নবারুণের রাঙা রঙে ওরা একইসঙ্গে রাঙিয়ে নেয় নিজেদেরকে। জেলে মাঝিরা নৌকা নিয়ে ফিরে আসে। ওরা প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে ঢেউয়ের মাথায় চড়ে সেই যেখানে আকাশ আর সাগর কানাকানি করে , সেখানে মিলিয়ে যায়। বেলা পথ চেয়ে বসে থাকে ওদের ফিরে আসবার। বেলা উদ্গ্ৰীব হয়ে থাকে সেই দূরের কথা শোনবার। ওরা কি দেখল, কিভাবে কাটাল ওরা সাগরের বুকে বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে!! ... হ্যাঁ, বাতাস!!! সেও বড় চঞ্চল। মুহূর্তের জন্যও বাতাসের স্থিরটি হওয়ার জো নেই। প্রহরের পর প্রহর, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ....এমনি ভাবেই কখনোও সে শান্ত , কখনোও সে উচ্ছল, কখনোও বা অস্থির। সাগরকেও সে মোটেও শান্ত হয়ে থাকতে দেয় না। যখন এই অস্থিরতা মাত্রা ছাড়িয়ে যায় .... কি ভয়ানক হয়ে ওঠে সে তখন! উফ্ ! কি বিভীষিকাময়! সাগরকেও তখন সে পাগল করে দেয়। সেই সময় লাগামছাড়া আক্রোশে সাগর বেলার বুকে আছড়ে পড়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে যায়।

    বেলা জেনেছে অনেক দূরে আকাশের সঙ্গে সাগরের এক অদ্ভুত সখ্যতার কথা। দুজনেরই কোনোও সীমা পরিসীমা নেই। সাগর সেখানে অশান্ত নয়। বরং তখন তার সর্বাঙ্গে অসীমের ছোঁওয়া। সেখানে সাগরের গভীরতার হিসাব পাওয়া যায় না। হয়তো তা আকাশের উদারতার পরশ পেয়েই । এইজন্যই তো জেলে মাঝিদের ফিরে আসবার অপেক্ষায় সে থাকে। নয়তো সে জানবে কেমন করে? সে শুধু কান পেতে থাকে। ঐ অনেকদূরে বড় নদীটা কেমন নিজে নিজেই সাগরের বুকে মিশে একাকার হয়ে যায় ,বেলা ভাবে সেকথাও। আর ওপাশের ঝাউগাছের ওদিকের লাজুক নদীটার কথাও বেলা ভাবে। নদীটা বড় শীর্ণ। সর্বাঙ্গে তার দীনতার পরশ। তাই সে তিরতির করেই বয়ে যায়। সাগর আর তার জন্য অপেক্ষায় থাকে নি। জোয়ারের সময় উঁচু ঢেউ হয়ে সাগর সেই তিরতির করে বয়ে যাওয়া নদীর ঘরে গিয়ে পৌঁছেছে। ক্ষীণকায়া জলধারা উদ্দাম সাগরকে ফেরাতে পারে নি। সমর্পণ করেছে নিজেকে।

    বেলাও কি এইভাবে একদিন দুরন্ত সাগরের মাঝে , হারিয়ে ফেলবে নিজেকে? মাঝেমাঝে এমন সাধ যে জাগে না তা নয়। কিন্তু তার যে বিরাট এক সংসার। মানুষজন, পশু পাখি, গাছপালা , ঘরবাড়ি ...... কতো কিছু!

    এক একবার বাতাসও তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। উন্মাদের মতো সাগর ও বাতাস ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছিল । বেলা প্রাণপণ শক্তি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করবার চেষ্টা করেছিল। এরপর দুজনের আক্রোশের পরিণামে চারিদিকে ধ্বংসের ছবি । জেলেদের জোয়ান ছেলেটা মাছ ধরতে সাগর পাড়ি দিয়েছিল। সাগর তাকে নিয়ে গেল । আর ফিরল না সে। তার বুড়ি মায়ের কান্না, বাচ্চা বৌটার সর্বস্ব হারানোর যন্ত্রণার সাক্ষী তো বেলাই। ছেলেটা বিয়ে করে বৌকে যখন ঐ চালাঘরে এনেছিল সেদিন কত আনন্দই না ছিল ! বেলা সব আনন্দ, বেদনার সাক্ষী হয়ে থাকে।

    বেলারই তো সংসার! সাজানো মায়ার সংসার। কেউ জানে না, কেউ বোঝে না সে কথা।
    তাই তো বেলার মনের খবর কেউ রাখে না। যুগ যুগ ধরে গোপনে বুকের গভীরে পরতে পরতে জমে ওঠা অভিমান, অশ্রুর হিসাব কারোও কাছে কি আছে? ধূ ধূ বালির চরায় বাষ্প হয়ে হাওয়ায় মিশে যায় সে কান্না। কে জানে সে কথা?

    সাগরেরও অন্তহীন আকাশ বা বাতাস কেউই সঙ্গী হল না। একমাত্র বেলার কাছেই সে ধরা দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলল।

    বেলা কি সে কথা বুঝতে পারল?
  • আরও পড়ুন
    বাণী - Mousumi Banerjee
  • বিভাগ : অন্যান্য | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২১০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৭:১৯498179
  • কেউ কাউকে বোঝে না, বেলা ও সাগর একে অপরকে ছাড়া অর্থহীন! 
    শুভ 
  • Mousumi Banerjee | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৯:৫২498182
  • @বিপ্লব রহমান
     
    অর্থহীন ঠিকই। তবুও সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়েছে যেন কত কথা হচ্ছে এদের মাঝে। 
    অর্থহীন কি? কারণ , দুজনেই দুজনের জন্য নয় কি?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন