• খেরোর খাতা

  • রূপসী বারাণসী 

    Bratin Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ আগস্ট ২০২১ | ২৯৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)


  • বারাণসী বাঙালীর সংস্কৃতি আর মননের সাথে মিশে আছে। একে বাঙালীর দ্বিতীয় বাড়ি বললেও অত্যুক্তি হয় না। বারাণসী নামের সৃষ্টি হয়েছে বরুণা এবং অসি এই দুই নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থানের কারণে।

    আমাদের ভারতবর্ষের অনেক সাধক তাদের মুল্যবান জীবন এখানে অতিবাহিত করেছেন। যেমন ভাস্করচার্য্য, তৈলঙ্গস্বামী প্রমুখ। আমাদের বহুদিনের ইচ্ছা ছিল কাশী যাবার সেটা এবারে পূর্ণ হল। আমরা এলাম লখনৌ থেকে ট্রেনে। ট্রেন লেট করে করে বারাণসী পৌঁছল যখন, তখন সময় রাত ৯ঃ৩০। টুক করে একটা রিক্সা চেপে হোটেলে চেক ইন করলাম তার আধঘন্টার মধ্যেই। আমাদের বুকিং ছিলো "ইন্ডিয়া" তে। এটি একটি চার তারা হোটেল। বিদেশীদেরই ভিড় বেশী।

    প্রচন্ড টায়ার্ড ছিলাম তাই তন্দুরি রুটি আর মাটন কষা খেয়েই শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো সকাল ৮ টায়। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেক্ফাস্ট। প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন অনেকই বেশী। পেট ভরে খেয়ে দেয়ে টুক করে একটা রিক্সায় উঠে পড়লাম। গন্তব্য গোধুলিয়া ঘাট। সেখানেই বাবার মন্দির আর গঙ্গা তীরের অজস্র ঘাট।

    তথ্যসূত্র বলছে এদের মধ্যে ১৪টা ঘাটের বয়স ৩৫০ বছরের বেশী আর ৫১টা ঘাটের বয়স অন্ততঃ পক্ষে ১৫০ বছর। এর থেকে বোঝা যায় বেনারস কত পুরোনো শহর। লেখার কলেবর বৃদ্ধির কথা মাথায় থেকে আমি শুধু ১০টা ঘাট সম্পর্কে লিখছি।

    আমরা একটা নৌকা ভাড়া করে গঙ্গাবক্ষে পাড়ি দিলাম।



    (১) নারদ ঘাটঃ এই ঘাটে দুজন একসাথে স্নান করলে তাদের মধ্যে ঝগড়া নাকি অনিবার্য। বলাবাহুল্য আমরা সেই রিস্ক নিই নি।

    (২) দশাশ্বমেধ ঘাটঃ এই ঘাটের জল পবিত্র পঞ্চতীর্থের মধ্যে গণ্য করা হয়। কথিত আছে ভগবান ব্রহ্মা একবার কাশীর রাজার সহায়তায় ১০টি অশ্ব বলি দেন এখানে। সেই থেকে এই ঘাটের নাম এইরূপ।

    (৩) রাজা ঘাটঃ পেশোয়া অমৃত রাও এই ঘাট নির্মাণ করেন। এখানে একটা বিশাল ছাতা আছে বলে এই ঘাটের আরেক নাম "ছত্তর" ঘাট।



    (৪) মানমন্দির ঘাটঃ রাজা মান সিংহ এই ঘাটটি তৈরি করেন। এর ওপর একটি সৌধও তিনি নির্মাণ করান।

    (৫) চৌষট্টি যোগিনী ঘাটঃ কাছেই চৌষট্টি যোগিনীর মন্দির থাকার জন্যে এইরূপ নামকরণ।

    (৬) মনিকর্ণিকা ঘাটঃ কথিত আছে শিব এবং পার্বতী একদিন এই ঘাটে স্নান করতে এসেছিলেন। দেবী পার্বতীর একটা দুল নাকি এখানে হারিয়ে যায়। অনেক খুঁজেও তা না পেয়ে শিব অভিশাপ দেন এই ঘাটে সব সময় শবদাহ হতে থাকবে।

    (৭) হরিশচন্দ্র্র ঘাটঃ কথিত আছে অভিশাপগ্রস্ত রাজা হরিশচন্দ্র নাকি এখানে মড়া পোড়াতেন। সত্যনিষ্ঠ হরিশচন্দ্র্র নিজ পুত্র রোহিতাশ্বকে দাহ করার জন্যে স্ত্রী শৈব্যার অর্ধেক বস্ত্র দাবি করেন। তখন ভগবান আর্বিভুত হন এবং তাঁকে সশরীরে স্বর্গে যাবার অনুমতি দেন। এই ঘাটে অজস্র শবদাহ করা হয়। লোকে বলে এই ঘাটের চিতার আগুন কখন নাকি নেভে না।

    (৮) রাণী অহল্যাবাঈ ঘাটঃ ইন্দোরের রাণী অহল্যাবাঈ এই ঘাটটি তৈরী করেন।



    (৯) সঙ্কাটা ঘাটঃ নিকটস্থ সঙ্কাটা দেবীর মন্দিরের উপস্থিতির কারণে এইরকম নামকরণ।



    (১০) ললিতা ঘাটঃ নেপালের মহারাজা এই ঘাটটি তৈরী করেন।

    অনেকগুলো ঘাট ঘোরা হয়ে গেল। এতক্ষন ঘুরে বেজায় খিদে পেয়ে গেছে আর ভোজনরসিক হিসাবে আমার একটু নামডাক আছেই। তার ওপর বেনারসের বিখ্যাত রাবড়ির কথা কে না জানে? অতএব মিষ্টির দোকানে গিয়ে আমি ২ বাটি রাবড়ি সাবড়ে দিলাম। কেয়া অবশ্য খুব কষ্ট করে এক বাটিই খেল।

    এইবার আমরা চোখ রাখব ধর্মস্থান হিসাবে বেনারসের ভূমিকায়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান সব ধর্মের উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব থাকলেও এটি প্রধানতঃ হিন্দু তীর্থস্থান। বারাণসী বা কাশীকে চিরকালই বাঙালীরা বেশী গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তাদের বিশ্বাস চতুরাশ্রমের তৃতীয় অর্থাৎ বাণপ্রস্থ যদি এখানে কাটানো যায় এবং এখানেই দেহত্যাগ করলে ভগবান শিবের আর্শীবাদে তাদের মুক্তি ঘটবে আর জন্মগ্রহণ করতে হবে না।

    কাশীর কয়েকটি বিখ্যাত মন্দিরঃ
    -------------------------------------------



    বিশ্বনাথ মন্দিরঃ - এখানে প্রধান দেবালয় স্বর্ণচুড়া শোভিত বাবা বিশ্বনাথের মন্দির। বাইরের শত্রুরা বার বার এই মন্দিরকে আক্রমন এবং ধ্বংস করেছে। কিন্তু প্রতিবারই আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে এই মন্দির তার দুরন্ত প্রাণশক্তি দিয়ে। এর স্বর্ণচূড়াটি করে দেন পঞ্জাব কেশরী রাজা রণজিত সিং। নেপালের রাজা উপহার দেন এক বিশাল সোনার ঘন্টা।

    অন্নপুর্না মন্দিরঃ - বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮১ সালে তৈরী করেন মহাদেব বলে জনৈক মারাঠী। এই মন্দিরে একটি গম্বুজ ও একটি চূড়া আছে। যার মাথায় রয়েছে স্বর্ণকলস। মন্দিরের চারপাশে রয়েছে অসংখ্য বেদী যেখানে ব্রাহ্মণদের ভোজনের ব্যবস্থা আছে।

    এছাড়া শিব মন্দির গুলো হল আদি বিশ্বেশ্বর, ওঁকারেশ্বর, কেদারেশ্বর, বীরেশ্বর, বৈদ্যনাথ, আদি মহাদেব, কামেশ্বর, তিলভান্ডেশ্বর ইত্যাদি।

    বারাণসীকে আমরা অন্য যে কারণে জানি তা হল এটি জ্ঞানচর্চার একটি প্রাচীন পীঠস্থান।

    পন্ডিত সমাজ এবং সংস্কৃতচর্চাঃ-

    বারাণসীর পন্ডিতকুল সারা দেশে সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক জীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতেন। তারা পাঠশালা এবং চতুষ্পাঠীকুলে ছাত্রদের মধ্যে বিদ্যাচর্চার ধারা বজায় রেখে, বইপত্র লিখে, পান্ডুলিপি নকল করে শাস্ত্রগ্রন্থ সম্পর্কে বিতর্কে অংশগ্রহণ করে শাস্ত্রগ্রন্থ চর্চা প্রভৃতির উন্নতি সাধন করতেন। বারাণসীতে বেশ কিছু বৈদিক পাঠশালা গড়ে উঠেছিল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল ঃ- দিনকর বালাকৃষ্ণ যোশী (১৮১০-১৮৭০), বিনায়ক ভট্ট ডোংরে (১৮৩০-১৯০৪), পন্ডিত রাজারাম শাস্ত্রী (১৮০৫-১৮৭৫), পন্ডিত বিধ্যাধর লেলে (১৮৩৮-১৯১৮), পন্ডিত কৃপাকৃষ্ণ জানি (১৮০৩-১৮৬৩) প্রমুখ।

    সমসাময়িক কয়েক্জন পন্ডিতের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। আহোবাল শাস্ত্রী, অচ্যুতানন্দ পরিব্রাজক, কাশীনাথ শাস্ত্রী, কৃষ্ণদেব পন্ডিত, কাশীনাথ ভট্টাচার্য, নারায়ন শাস্ত্রী, কালিশঙ্কর ভট্টাচার্য, বালাজি পন্ডিত, বলরাম বাচস্পতি, বৈদ্যনাথ ভট্ট প্রমুখ।

    হুজুগে বাঙালী বেড়াতে গিয়ে কিছু কিনবেই। উৎকৃষ্ট পান মশালা কিছু সংগ্রহ করার হল। কেয়া একটি বেনারসী শাড়ি কিনল। তাতে খসে গেল বেশ কিছু টাকা।

    পরের দিন বিদায়ের পালা। পুরোনো এই শহরটির প্রতি এক আন্তরিক টান অনুভব করলাম। হয়ত এই কারণেই বারাণসী বাঙালীর দ্বিতীয় বাড়ি। মনে মনে বললাম আবার আসতে হবে। কবে কে জানে?


    তথ্যসুত্রঃ

    ১। Varanasi : The Cross Road - স্বামী মেধসানন্দ (উদ্বোধন)
    ২। ঊনিশ শতকের বারাণসীঃ স্বামী মেধসানন্দ

    অনুবাদক : ডঃ বিশ্বনাথ দাস (উদ্বোধন)
  • বিভাগ : অন্যান্য | ২১ আগস্ট ২০২১ | ২৯৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২১ আগস্ট ২০২১ ১১:২৪496948
  • বেশ মানস ভ্রমন হলো। কিন্তু আরও বিস্তারিত বর্ণনা দিলে পারতেন, তথ্যের খুব ভিড়। শুভ 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন