• খেরোর খাতা

  • বড় গীতাদি 

    Sara Man লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ আগস্ট ২০২১ | ১৬৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • স্কুলে আমাদের দুজন বড় গীতাদি ছিলেন। আবার দুজনেই আমার মায়ের শিক্ষয়িত্রী। একজন ছোটোবাড়ির মানে প্রাথমিক বিভাগের, আর একজন বড়বাড়ির মানে মাধ্যমিক বিভাগের। ছোটোবাড়িতে দুই গীতাদি। সন্ন‍্যাসিনী প্রব্রাজিকা ত‍্যাগপ্রাণা - প্রাথমিকের অধ‍্যক্ষা - তিনি ছোটোবাড়ির বড় গীতাদি। আর যিনি অঙ্ক করান, তিনি হলেন ছোটো গীতাদি। বড় বাড়িতে উল্টো। ব্রহ্মচারিনী গীতাদি গম্ভীর হয়ে অঙ্ক করান তিনি ছোটো গীতাদি। বোর্ডে কিছু লেখার আগে একেবারে ওপরে তিনি কিছু চিহ্ন আঁকতেন বা হয়তো মন্ত্র লিখতেন, সেটা যে কী আমরা বুঝি নি‌। জিজ্ঞাসা করলেও তিনি বলেন নি। একবার আমরা যখন সিক্সে পড়ি আমাদের ক্লাসের শর্বরী হোস্টেলে ওনার খাটে উঠে নেচেছিল। আসলে শর্বরী তো ছোটো থেকে এই ইস্কুলে পড়ে নি। ভর্তি হয়ছিল ফাইভ সি তে। সিক্সে বাড়ির লোক ওকে হোস্টেলে ভর্তি করে দিলেন। রাগে দুঃখে সে একবার খালি পায়ে ছুটির পর বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিল। জুতো পরতে গেলে যে চোখে পড়ে যাবে। সে যাত্রা অনেক খোঁজাখুঁজি করে দারোয়ান দাদারা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এল। এরপরে তার মন ভালো করার জন্য হোস্টেলের সিনিয়র দিদিরা বলল, তোকে একটা চকলেট দেব, কিন্তু ঐ খাটে উঠে নাচতে হবে। চকলেটের জন্য শর্বরী চোখ বুজে খাটে উঠে নেচে চলেছে, হঠাৎ চোখ খুলে দেখে ঘরে সিনিয়র দিদিরা কেউ নেই, ভোঁ ভা। খালি যাঁর খাট, সেই ছোটোগীতাদি একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। ক্লাসের ফাঁকে এই রুদ্ধশ্বাস গল্প শুনতে গিয়ে আমাদের প্রাণবায়ু তো গলায় উঠে এসেছে, আর হৃদপিণ্ড এমন লাফালাফি করছে, যে বুকের খাঁচাটা ফাটোফাটো। কেউ আমরা খেয়ালই করি নি, যে বড় গীতাদি ক্লাসে ঢুকে পড়েছেন। ক্লাস বা শুরু হল। ঐ গল্পের হ‍্যাং ওভার কাটলো না। সেদিন ভয়েস চেঞ্জ, ট্রান্সলেশন সব ভুলভাল হয়ে গেল। ঝুলিভরা বকুনিও পেলাম।  সে যা হোক। হ‍্যাঁ, বড়বাড়ির বড় গীতাদি ইংরেজি পড়াতেন। তাঁকে নিয়েই আজ গল্প বলতে বসেছি। ছোটোখাটো মানুষটি ফিটফাট। শাড়ির প্লিট কোনদিন অগোছালো দেখি নি। মূলত সাদা বা হাল্কা বেসের শাড়িগুলি, কিন্তু সাধারণ ছাপা নয়, বেশ অভিজাত ঘরানার। গীতাদির গায়ের রঙটি নজরকাড়া ফর্সা। মাথার পিছনে কাঁচা পাকা চুলে ছোটো একটি বেণী। মুখের সামনের দিকের চুলে পাক ধরলেও ঘন এবং কোঁকড়া। পাকা চুলের মাঝখানে সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর দিতেন। কিন্তু টিপ পরতেন খুব ছোটো। চশমাটি মোটা কাচের, কিন্তু ফ্রেমটি সেই হাল্কা বেসের। সব মিলিয়ে ওনার চেহারায় একধরণের অভিজাত সৌন্দর্য ফুটে উঠত। সবচাইতে আকর্ষণীয় ছিল চশমার কাচের আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আর অননুকরণীয় বাচনভঙ্গি। আমাদের পাংচুয়েশন শিখিয়ে শিখিয়ে তিনি নাজেহাল হয়ে যেতেন। বলতেন যাই শেখাই না কেন, খাতার পাতায় দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনগুলো তোমরা একমুঠো মৌরির মতো ছিটিয়ে দাও। একমুঠো বলার সময়ে ডানহাতটি মুঠি করে তুলে ধরে আঙুলগুলি খুলে ছড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে দেখিয়ে দিতেন। ছিটিয়ে শব্দটিতে জোর দিতেন। আসলে লিখে তো আর অভিনয় করা যায় না। তাঁর বক্তব্যগুলি ছিল রসবোধ, স্লাইডিং স্ট্রেস, ভয়েস মডিউলেশন আর শারীরিক অভিনয়ের সমাহার।  প্রতিটি বাক‍্য আজও পাঁজরে খোদাই করা আছে। মুছে দেয়, কালের সাধ‍্যি কি? ওঁর ক্লাসে আর একটা জিনিষ ছিল বোর্ডে গিয়ে ক্লাস ওয়ার্ক করা, যেটাকে আমরা যমের মতো ভয় পেতাম। কারণ নিজের ডেস্কে বসে এর ওর খাতা দেখাদেখি, জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়ার উপায় থাকত না। বোর্ডে গিয়ে পরাস্ত হলে গীতাদি সুর করে ছড়া কাটতেন - 'সর্ব্ব অঙ্গে ব‍্যথা! ওষুধ দেব কোথা?' অবস্থা অনুযায়ী আরো কিছু বলতেন, যা শুনে বন্ধুদের বিরিঞ্চিবাবার সত‍্যব্রতের মতো কানের ভেতর গঙ্গা ফড়িং আর নাকের ভেতর গুবরে পোকা কুরে কুরে খেত। নইলে হাসি চেপে নির্বিকার থাকা সম্ভব হতনা। আর যে বেচারা বোর্ডে যেত, সে প্রাণপনে কল্পনা করতো, যে সে ইনভিসিবল ম‍্যানের মতো অদৃশ্য হয়েছে। আমার অনেকবার এমন হয়েছে। রোজ গ্রামার ক্লাসের পরে, ইংরেজি বিশ্বসাহিত্য থেকে মণিমুক্তা খুঁজে একটি করে কোটেশন রাফ খাতায় লেখাতেন। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এতদিন ধরে লেখাচ্ছি, একটা অন্তত বলো দেখি। কিছুই বলতে পারি নি আমি। সেভাবে পড়িনি কোনদিন। ওগুলির মূল্য বোঝার মতো মনের পরিণতি ছিল না। দুঃখ পেয়েছিলেন। পরে আবার যদি ধরেন, সেই ভয়ে, ছোটো দেখে একটা মুখস্থ করে রেখেছিলাম -  'Distant hills are always blue'। আমার মা গীতাদির লজিক পড়ানোর ফ‍্যান ছিল। মার সময়ে 10+2 ব‍্যবস্থা ছিল না। একাদশ পাশ করে একেবারে কলেজ। নাইনে শাখা ভাগ হয়ে যেত। মা কলাবিভাগের ছাত্রী তো, লজিক ছিল।


    ক্লাস এইটের টিফিনের পরে ফিফ্থ পিরিয়ডে ইংরেজি ক্লাস। সেদিন মাধ‍্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, এবারে কেমন হল। বড় গীতাদি আমাদের মন বুঝে, কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সেই অনন্য ভঙ্গিতে ফল ঘোষণা করে দিলেন, 'ফিজিকাল সায়েন্সে লেটার এসেছে একঝুড়ি, লাইফ সায়েন্সে লেটার এসেছে দুঝুড়ি। লজিকেও ঝুড়ি পাঠানো হয়েছিল, খালি ফেরত এসেছে'। টেন পর্যন্ত দেখেছি, সিলেবাসের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি গল্প, কবিতা, নাটক পড়ে শোনাতেন। সব কিছু ভালো করে শুনিও নি। আজ দেখি মেয়েদের শেখানোর ঐ চেষ্টাটা মনের মধ্যে গভীর রেখায় আঁকা আছে। বসে ভাবি, 'ছোটো হাসির ছোটো খুশির ফেলে দেওয়া' দিনগুলি যদি ফিরে পেতাম, কোটেশন লেখা রাফ খাতাটি যদি মন্ত্রবলে আবার ফিরে আসত, সত্যি বলছি দিদি, বুকে করে তুলে নিতাম। মুঠোফোনে খবর এলো গীতাদি আর নেই, শুধু RIP লিখে ছাড়তে পারলাম না। পঞ্চাশ পেরিয়ছি। কিছু প্রায়শ্চিত্ত তো করার দরকার আছে নাকি। দিদির উদ্দেশে কলমের নৌকোয় ভাসালাম আমার প্রণাম।

    শারদা।

  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৭ আগস্ট ২০২১ | ১৬৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • π | ০৭ আগস্ট ২০২১ ০১:৫৪496512
  • কত কী যে মনে পড়ল!!  


    একসঙ্গে ভাল আর খারাপ লাগার অনুভূতি কমই হয়! 

  • বিপ্লব রহমান | ০৭ আগস্ট ২০২১ ০৭:০৮496518
  • এই সব ব্যক্তিগত গীতাদিরা আজন্ম ভালবাসায় বাঁচেন,  সেল্যুট। 


    লেখাটি সম্পাদনা করে লাইন স্পেস ঠিক করে দিলে পড়তে আরও সুবিধা হয়। 


    আরো লিখুন  

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন