• বুলবুলভাজা  আলোচনা  স্বাস্থ্য

  • স্বাস্থ্যের অধিকার: অর্জন ও বঞ্চনা

    দিলীপ ঘোষ
    আলোচনা | স্বাস্থ্য | ২৮ জুলাই ২০২১ | ৮২১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • স্বাস্থ্যের অধিকার: অর্জন ও বঞ্চনা

    (সোসাইটি ফর রিসার্চ অল্টারনেটিভস আয়োজিত “স্বাস্থ্যের অধিকার: অর্জন ও বঞ্চনা” শীর্ষক আলোচনাসভায় পেশ করা প্রারম্ভিক বক্তব্য)

    প্রথমেই স্বীকার করে নিই, যে আজকের আলোচনার শিরোনাম এবং বিষয়বস্তু ওপরে অমর্ত্য সেন এবং জঁ দ্রেজ-এর ভারত বিষয়ক লেখালেখির প্রভাব খুবই প্রবল। ২০১৩ প্রকাশিত তাঁদের বই "ইণ্ডিয়া অ্যান আনসার্টেন গ্লোরি-তে (অনির্বান চট্টোপাধ্যায় এবং কুমার রাণার বাংলা অনুবাদে "ভারতঃ উন্নয়ন ও বঞ্চনা) যে বিষয় গুলো ধরে বিশদে আলোচনা করেছিলেন, তারই একটা ছোট অংশ ঘিরে আজকের আলোচনার সূত্রপাত। সচেতন ভাবেই চেষ্টা করেছি ঐ বইতে উল্লেখিত হয়নি, এমন কিছু তথ্য ধরে এগোবার, এবং ঐ বইতে আলোচিত তথ্যের পুনরাবৃত্তি না করার। 

    সংবিধানের প্রতিশ্রুতি
    দেশের সংবিধান যখন লেখা হল, তখন স্পষ্ট করে স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভূক্ত না হলেও, যে সব অধিকারগুলি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল, দেশের উচ্চতম ন্যায়ালয় নানা সময়ে সেগুলির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে এই সব অধিকারগুলিকে মান্যতা দিতে গেলে স্বাস্থ্য পরিষেবাও এ দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। সংবিধানের ২১ (Right to life), ৩৮ (securing social order with justice social, economic and political), ৩৯ (right to livelihood, resource distribution, safety and healthy development), ৪২ (just and human condition of work and maternity relief), ৪৭( directive principle on raising levels of nutrition and improving public health and prohibition of alcohol, ৪৮(ক) (Protect and safeguard environment. ধারাগুলির প্রসঙ্গেই এই ব্যাখ্যা করেছেন ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। এছাড়াও নানা রাজ্যের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে যা বলেছেন তার অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্রকে অবশ্যই সব নাগরিকের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার দায়িত্ব নিতে হবে। 

    স্বাধীনতার পরে
    স্বাধীনতার আগে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস যে জাতীয় প্ল্যানিং কমিটি গঠন করেছিলেন সেখানে স্বাস্থ্য বিষয়ক সাবকমিটি সোখে কমিটি নামেই পরিচিত। সেই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়। 
    মনে রাখা দরকার সেই সময়ে, ভারতে মোট হাসপাতাল বেড ছিল ৭৩০০০, প্রতি ১০০০ জন পিছু ০.২৪ টি শয্যা। ইংল্যান্ড আর ওয়েলেসের তুলনীয় সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭.১৪'এবং ১০.৪৮। মাথা পিছু রোজগার ছিল প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭টাকা। ইংল্যাণ্ডে সেই সময়ে ছিল ৯০ থেকে ১০০, আর আমেরিকায় ১১০ থেকে ১২০।

    এঁদের সুপারিশগুলির মধ্যে ছিল 
    ক) দেশে প্রতি হাজার জনসংখ্যা পিছু একজন ডাক্তার আর প্রতি ৬০০ জনসংখ্যা পিছু একটা হাসপাতাল শয্যা থাকা উচিত। প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে তাঁরা বলেছিলেন তাঁদের সুপারিশ রিপোর্টের সময় থেকে দশ বছরের মধ্যে অন্তত ৩০০০ জন পিছু একজন ডাক্তার আর ১৫০০ জনসংখ্যা পিছু একটা হাসপাতাল শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে।
    খ) প্রতি বছর সেই সময়ের দামে প্রায় ৫ কোটি টাকার ওষুধ আমদানি করতে হতো ভারতকে। কমিটি দেখছিলেন যে এখানে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। কিন্তু কমিটি সেই সঙ্গে এটাও সুপারিশ করেছিলেন যে মানুষ বা পশুর স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা বিষয়ক কোনো উদ্ভাবনের জন্য কোনো ব্যক্তি বা কর্পোরেট কোনো পেটেন্ট নিতে পারবেন না।
    গ) স্বাস্থ্য পরিষেবার পুরোপুরি বিনামূল্যে দেওয়া হবে দেশবাসীকে। স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সুষ্ঠ সমন্বয়ের জন্যেই এই ব্যবস্থা পুরোপরি রাষ্ট্রের হাতে থাকা প্রয়োজন। 

    এর পর, স্বাধীনতার ঠিক আগের বছরে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল স্যার ভোর এর নেতৃত্ব গঠিত কমিটির চারখণ্ডের বিশাল রিপোর্ট। কিছু কিছু বিষয়ে মতান্তর থাকলেও একটা বিষয়ে এই সব রিপোর্ট একমত ছিল, সেটা হল নাগরিকদের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। এঁদের সুপারিশ ছিল প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার একত্রীকরণ। তখনও পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আর চিকিৎসা আলাদা ছিল। (তামিলনাডু এই সুপারিশটি মানেন নি, আর না মানায় কিছু সুফলও পেয়েছেন)। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য প্রতি ৪০০০০ হাজার জনসংখ্যার জন্য ২ জন ডাক্তার, এক জন নার্স, ৪ জন পাবলিক হেলথ নার্স, ৪ জন মিডওয়াইফ, ৪ জন প্রশিক্ষিত দাই, ২ জন স্যানিটারি ইন্সপেকটর, ২ জন হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন ফার্মাসিস্ট আরও ১৫ জন নানা ধরনের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সহ একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এঁদের তত্ত্বাবধান করার জন্য একটি করে মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। 
    দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল প্রতি ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ জন সংখ্যার জন্য একটি ৭৫ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, এবং উচ্চতর পরিষেবার জন্য একটি করে ২৫০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, যেখানে সব ধরনের স্পেশালাইজেশন থাকবে। 
    স্বাস্থ্যশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের অন্যতম ছিল তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স উঠিয়ে দিয়ে কেবল ডিগ্রি কোর্স চালু করা। চিকিৎসকদের সবাইকে তিন মাসের প্রিভেন্টিভ ও সোশ্যাল মেডিসিনের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। 
    সংবিধানের আর্টিকেল ২৪৬ এর ৭ম তপশিল নির্ধারন করে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন আর রাজ্য সরকারের মধ্যে স্বাস্থ্য বিষয়ক দায়িত্বের ভাগাভাগি। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সিংহভাগ দায় রাজ্যগুলির। কয়েকটি বিষয় কনকারেন্ট, মানে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ দায়িত্ব, যেমন মেডিকেল এডুকেশন, মেডিকেল প্রফেসন, ওষুধ, মানসিক স্বাস্থ্য, খাবারে ভেজাল প্রতিরোধ, মায়েদের পরিচর্যা, সংক্রমক রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যের তথ্য, জন্ম মৃত্যু নিবন্ধীকরণ ইত্যাদি। ক্ষমতার বিচারে এই বিষয়গুলোতে কেন্দ্র বেশী শক্তিশালী।
    হাসপাতাল, ডিসপেন্সারি জনস্বাস্থ্য এ সব রাজ্যের দায়িত্ব। রাজ্যের কাঁধে স্বাস্থ্যের দায়িত্বের সিংহভাগ, আর আয়ের উৎসের সিংহভাগ কেন্দ্রের, সব রাজ্যের আর্থিক সংগতিও একরকম ছিল না। তাই স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অসংগতি বাড়তেই থাকল। 
    ভোর কমিটির সুপারিশ ছিল সরকারের সামগ্রিক বিনিয়োগের অন্তত ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে খরচা হবে। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কখনোই ৫ শতাংশের ওপর ওঠেনি।
    সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য বিষয়টা ক্রমশই গুরুত্ব হারালো, জনস্বাস্থ্য ভাগ হয়ে গেল নানা সংক্রমক রোগকেন্দ্রিক কর্মসূচীতে। অন্তত তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পর্যন্ত স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের ৫০ শতাংশ ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকল ম্যালেরিয়া, টিবি, কলেরা ইত্যাদি সংক্রামক রোগগুলি সামলাতে, ২৫ শতাংশ সাধারণ স্বাস্থ্য খাতে, আর বাকি ২৫ শতাংশ মেডিকেল এডুকেশনে। সাধারণ স্বাস্থ্যের খাতে এত কম বিনিয়োগ যে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে যাঁরা বেরোতেন, তাঁদের সবাইকে নিতে পারা যেত না সরকারি ব্যবস্থাপনার মধ্যে।
    ১৯৫০ এ ভারতে ছিল ২৭টা সরকারি + ১ টা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, মোট ৪২৩৫ টা সিট। তারপর, বিশেষ করে, ‘৯০ দশকের উদারীকরণের পর বাড়তেই থেকেছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। ২০১৪ য় ১৭৬ (৪৫.৭%) সরকারি কলেজ + ২০৯ (৫৪.৩%) বেসরকারি কলেজ, ৫০,০৯৩ টা সীট। 
    তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৬১-১৯৬৬) শুরুতে দেখা গেল স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে গ্রাম শহরে ফারাক বেড়েই চলেছে। গ্রামীণ এলাকায় প্রতি ১,৪০০০০ জন পিছু তৈরি হয়েছিল একটা প্রাথমিক হাসপাতাল, আর নগরাঞ্চলে প্রতি ৩৬০০০ জন পিছু একটা হাসপাতাল আর প্রতি ৪৪০ জন শহরবাসী পিছু একটা হাসপাতাল শয্যা ছিল সেই আমলে। গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে হাসপাতালের সংখ্যা ভোর কমিটি যে সুপারিশ করেছিলেন ১৯৪৬ সালে তার থেকে প্রায় চোদ্দ গুন কম। ব্যাপারস্যাপার বুঝে নিতে অনেক সময় লেগে গেল কর্তাদের। 
    সরকারি ব্যবস্থার বিনিয়োগ ছিল অপ্রতুল আর ব্যবস্থাপনাও নড়বড়ে। ডাক্তার নার্সের রেশিও যা হওয়া উচিত তার চেয়ে কম, নার্সদের প্রশিক্ষণও কমজোরি; একজন ডাক্তার বিশিষ্ট প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি, এবং ওপরের তলার হাসপাতালগুলিতেও অপ্রতুল পরিকাঠামো। সব মিলে প্রবল চাপের মুখে পড়তে হতো প্রাথমিক স্তরের ডাক্তারের। নানা শর্টকাট নিতে বাধ্য হতেন তাঁরা। এক শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক সহকর্মীর কাছে শুনেছিলাম ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকার সময় মরণাপন্ন এক রোগীকে বাঁচাতে তিনি স্যালাইন না থাকায় গাছ থেকে ডাব পাড়িয়ে সেই জল দিয়ে স্যালাইনের কাজ চালিয়েছিলেন। রোগী বেঁচে যায়, তবে তাঁকে অনেকরকম জবাবদিহি করতে হয়েছিল। রোগীকে মারা যেতে দিলে এত সমস্যা হতো না হয়তো। এই সব অপ্রতুলতার সঙ্গে যুক্ত হতো দৈনন্দিন কাজের মধ্যে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। 

    ১৯৮৩ সালে, স্বাধীনতার প্রায় ৩৫ বছর পরে ভারত তার প্রথম স্বাস্থ্য নীতি ঘোষণা করল। ভাল করে পড়লে দেখা যাবে ‘সস্তায় পুষ্টিকর’ নানান প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়েছিল এই নীতিতে। প্রধানত যে সব বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল, তা হচ্ছে 
    ১) রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা বা প্রিভেন্টিভ কেয়ার, সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার অনুকূল পরিবেশ বা প্রোমোটিভ কেয়ার, আর কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা, 
    ২) কম খরচের সমাধানসূত্র খোঁজা 
    ৩) স্বেচ্ছাসেবক এবং অল্প শিক্ষিত লোকজনকে স্বল্প ভাতায় নিয়োগ করে পরিষেবা ব্যবস্থা তৈরি করা (‘ডিপ্রফেশনালাইজেশন’ বা বি-পেশাদারীকরণ বলেন কেউ কেউ) আর 
    ৪) স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনায় জনগণ কে যুক্ত করার একটা উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ছিল এই নীতিতে, যদিও সেটা খুব কাজে লাগানো হয়েছে এমন নয়। 
    ৫) আমরা এখন যে নিরিখে স্বাস্থ্যপরিষেবা কেন্দ্রগুলির বিন্যাস ঠিক করি এ দেশে, যেমন প্রতি ৫০০০ জন সংখ্যা পিছু একটা স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, প্রতি ৩০০০০ জন সংখ্যা পিছু একটা পাঁচ শয্যা বিশিষ্ট প্রাথমিক হাসপাতাল, আর প্রতি একলাখ পিছু একটা ৩০ শয্যা বিশিষ্ট কমিউনিটি হাসপাতাল থাকতে হবে, সেটাও এই নীতিতেই ঘোষিত হয়েছিল। 

    প্রথম জাতীয় নীতিতেই বোঝা গেল প্রতিরোধ ব্যবস্থার দায়িত্ব, প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব, এইসবের ওপর জোর দিয়ে রাষ্ট্র মূল চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা তুলে দিতে চাইছেন বেসরকারি হাতে। নীতিতে বলা হচ্ছে রাষ্ট্রের ‘অর্থসঙ্কটের’ কারণের সাধারণের মানুষের জন্য ‘ব্যয়সাধ্য’ চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা। অর্থাৎ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘ফেল কড়ি মাখ তেল’ – নীতি অনুসরণ করার কথা।
    পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৭৪-১৯৭৯) সময় ঠিক হল প্রতি ব্লক পিছু একটা করে ব্লক প্রাথমিক হাসপাতাল তৈরি করা হবে। সেই সময়ে একটা ব্লকের গড় জনসংখ্যা ছিল ১,২৫০০০।
    ষষ্ঠ (১৯৮০-১৯৮৫) এবং সপ্তম (১৯৮৫-১৯৯০) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পর্ব জুড়ে এই এই লক্ষ্য মাত্রা পূরণের চেষ্টা চললো। 

    সরকারি মদতে বেসরকারি ব্যবস্থার নীরব উত্থান
    ভোর কমিটি প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বিষয়ে খুব কিছু আলোচনা করেন নি। হয়তো আশা ছিল আস্তে আস্তে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাইভেট ব্যবস্থা লোপ পাবে! 
    প্রথম থেকেই সরকারি ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতির পূর্ণ সুযোগ নিতে শুরু করেছিল বেসরকারি ব্যবস্থা। ১৯৪২ -৪৩ এ সরকারি চাকরিতে ছিলেন ১৩০০০ (২৭.৪%) অ্যালোপাথিক ডাক্তার, আর বেসরকারি তে ছিলেন ৩৪,৪০০ (৭২. ৬%)। ১৯৯৭ -৯৮ তে ১,২০,০০০ (২২.৯%) সরকারি সংস্থায় আর ৪,০২,৬৩৪ (৭৭.১%) বেসরকারিতে। 

    ফার্মাসিউটিক্যাল এবং সার্জিকাল শিল্পের বাড়তে থাকা প্রভাব
    একদা পাবলিক সেক্টরে ওষুধ, ভ্যাকিসিন, সার্জিকাল ইনস্ট্রুমেন্ট তৈরি করার একটা চেষ্টা হয়েছিল। ইন্ডিয়ান ড্রাগ অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড, হিন্দুস্তান অ্যান্টিবায়োটিক্স, হ্যাফকিন ইন্সটিটিউট। পেটেন্ট অ্যাক্ট ১৯৭০ এর সহায়তায় তুলনামূলক ভাবে কম দামে ওষুধ তৈরি করতে শুরু করেছিলেন বেসরকারি উদ্যোগেরাও। কিন্তু জনস্বাস্থ্য আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় পিছিয়ে, অন্যান্য মন্ত্রক, যাঁরা সরকারি সংস্থাগুলি নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাঁরা দেখতে শুরু করলেন এই কোম্পানিগুলো মুনাফা করতে পারছে কি না, তাদের আর্থিক বৃদ্ধির ইত্যাদি হচ্ছে কিনা? যাকে সোশ্যাল কস্ট বেনিফিট বলে সেই হিসেবটি করা হ'ল না। ধীরে ধীরে নির্জীব হয়ে গেল সরকারি সংস্থাগুলি। 
    এই নির্জীবীকরণের পাশাপাশি একধরণের সরকারি মদতেই বেসরকারি ফার্মাসিউটাক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ক্রমাণ্বয়ে সরকারি নীতি উপেক্ষা করা শুরু করল। যেমন ধরুন ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেন্সিয়াল মেডিসিন এর তালিকায় ২০ টি ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন (এফ ডি ডি) সহ ৩৭৬ টা ওষুধ আছে। ভারতীয় বাজারে এই কুড়িটির বাইরে অসংখ্য এফ ডি সি চালু আছে যেগুলোর কার্যকারিতা সম্বন্ধে কিছু জানা নেই। এগুলো উৎপাদক সংস্থাকে প্রচুর লাভ এনে দেয় বটে কিন্তু রোগীদের ক্ষতি করে। ২০১৬ র মার্চ মাসে এরকম ৩৪৪ টি ক্ষতিকর ওষুধ ব্যান করা হয়েছিল। প্রত্যেকটির উৎপাদনের লাইসেন্স দিয়েছিলেন বিভিন্ন স্টেট লাইন্সেসিং অথোরিটি। ২০১২ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ এর ভারপ্রাপ্ত পার্লামেন্টারি কমিটির ৫৯ তম রিপোর্ট ফার্মাসিউটাক্যাল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশনের (CDSCO) অশুভ আঁতাতের ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন বহু ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট ওষুধ বিষয়ে CDSCO-এর সুপারিশের খসড়া তৈরি করে দিয়েছেন ওষুধ উৎপাদক সংস্থাই। এই সুপারিশগুলো উৎপাদকই আবার নিজস্ব ব্যবস্থায় পৌঁছে দিয়েছেন ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার দপ্তরে। কমিটি দেখছেন দিল্লি, মুম্বাই, চণ্ডীগড় এবং সেকেন্দ্রাবাদ থেকে আলাদা আলাদা সুপারিশ একই দিনে একই সময়ে ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেলের অফিসে পৌঁছেছে।
    আরেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশনের এক আধিকারিক থোরিয়াম মেডিকেয়ার নামক একটা ওষুধ উৎপাদক সংস্থাকে লিখিত পরামর্শ দিচ্ছেন যে তাঁরা যেন নিজেরাই বিশেষজ্ঞ ঠিক করে তাঁদের পরামর্শ ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেলের অফিসে পৌঁছে দেন।
    ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের কুপ্রভাবের আর একটা বড় ক্ষেত্র হল ক্লিনিকাল ট্রায়াল। আগে ভারতের ড্রাগস অ্যাণ্ড কসমেটিক্স আইন অনুযায়ী বিদেশি ওষুধ আর কসমেটিক্সের ক্ষেত্রে একটা ‘ফেজ ল্যাগ’ এর বাধা ছিল। অর্থাৎ কোনো দেশে যদি ফেজ ৩ সম্পূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে ভারতে ফেজ ২ থেকে শুরু করতে হত। ২০০৫ এর ড্রাগস অ্যাণ্ড কসমেটিক্স অ্যাক্টের একটি সংশোধনীর বলে বিদেশি কোম্পানিরা তাঁদের নিজেদের দেশের সঙ্গে একই সময়ে এখানে ট্রায়াল করতে পারবে। ফলে দেখা গেল ২০০৩ যেখানে ৪০ - ৫০টা ট্রায়াল হতো, ২০১১ সেখানে ১৮৫০ টা ট্রায়াল হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১২ কালপর্বে ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে ৩৪৫৮ জন মারা গেছেন। এঁদের মধ্যে ৮৭ জনের মৃত্যু প্রত্যক্ষ ভাবে ক্লিনিকাল ট্রায়াল জনিত কারণে। ট্রায়ালের নিয়ম শিথিল করে দেওয়ার সময়ে বলা হয়েছিল প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাবে দ্রুত। আলোচ্য সময়ে ৪৭৫ ট নতুন ওষুধের ট্রায়াল হয়েছিল, ভারতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়েছিল ১৭ টি। 
    ফার্মাসিউটিক্যাল এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। অনেক অদরকারি যন্ত্রও আসছে অদরকারি ওষুধের মতো। সব মিলে বাড়ছে খরচ।

    ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
    এই সহস্রাব্দের প্রথম দশকে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল হকিকৎ বোঝার জন্য রাষ্ট্রের উদ্যোগেই নানান ধরনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর ম্যাক্রোইকনোমিক্স অ্যান্ড হেলথ’। তাঁরা সবদিক দেখেশুনে ২০০৫ সালে তাঁদের রিপোর্টে জানালেন, 


  • ১) রাজ্যগুলি যখন অর্থকষ্টে ভুগে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কমিয়েছে, তখন কেন্দ্রও ক্রমশ কমিয়ে গেছে রাজ্যকে সাহায্যের পরিমাণ 
    ২) ১৯৯১ তে যেখানে রাজ্যের বাজেটের ২৫ শতাংশ ব্যয় করা হত রাষ্ট্রীয় হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদির খাতে, ২০০১-এ সেই বিনিয়োগ কমে দাঁড়াল ৬ শতাংশে
    ৩) কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের বাজেটের ১৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘সেন্ট্রাল গভর্মেন্ট হেলথ স্কীমে’- মানে দেশের জনসংখ্যার ০.৫ শতাংশেরও কম মানুষের জন্য দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ১৮ শতাংশ খরচ হচ্ছে, 
    ৪) সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যখাতের ব্যয়ের ০.৫ শতাংশ খরচ হয় প্রিভেন্টিভ এবং প্রমোটিভ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়
    ৫) সংক্রামক রোগ ইত্যাদির জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন বছরে ১১২১০ কোটি টাকা আর রাষ্ট্র বিনিয়োগ করছেন ৫৫৬৩ কোটি টাকা। ফলে মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছেন অনেক বেশি, সুস্থ হতে মানুষের নিজেদের পকেট থেকে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে
    ৬) গ্রাম শহরের ব্যবধান ঘোচার বদলে বেড়েছে – ৮৮ শতাংশ শহরে আর কেবল ২৪ শতাংশ গ্রামে একটা চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে 
    ৭) গ্রামাঞ্চলের ৯০ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রেই পরিষেবা দেবার জন্য কেবল একজন থাকেন
    ৮) বিশেষজ্ঞদের ৮৫ শতাংশ আর উন্নত যন্ত্রপাতির ৭৫ শতাংশই বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে নিযুক্ত
    ৯) গ্রামাঞ্চলে প্রতি হাজার জনসংখ্যা পিছু ০.৪ জন চিকিৎসক আর ০.৩২ জন নার্স থাকেন, (জাতীয় গড় ছিল ১০০০ জন পিছু ০,৫৯ চিকিৎসক আর ০.৭৯ নার্স, ঐ সময়ে আন্তর্জাতিক গড় ছিল ১০০০ জন পিছু ২.২৫ জন চিকিৎসক) মোট চিকিৎসকদের দুই তৃতীয়াংশই নগরাঞ্চলে পুঞ্জীভূত  
    ১০) মনের, দাঁতের, হাড়ের, হৃৎপিন্ডের অসুখ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসার ৭৫ শতাংশ এবং সংক্রামক রোগের চিকিৎসার ৪৪ শতাংশের করছেন বেসরকারি হাসপাতালগুলি। নানান সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছিল যে দুরারোগ্য ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভারে বহু পরিবার নেমে যাচ্ছেন দারিদ্ররেখার তলায়। সোজা হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় না করে যে অর্থ বাঁচাচ্ছেন বলে সরকার মনে করছেন, সেটা ঘুরে আবার দারিদ্র দূরীকরণের কাজে লাগাতে হবে বা হচ্ছে। 

    এই সব মাথায় রেখেই রাষ্ট্র জাতীয় গ্রামীন স্বাস্থ্য মিশন শুরু করলেন ২০০৫ সাল থেকে, যার বর্তমান নাম জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন। 
    জাতীয় গ্রামীন স্বাস্থ্য মিশন মা ও শিশু কেন্দ্রিক সূচক গুলোতে বেশ খানিকটা উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। স্বাস্থ্যের অন্যান্য দিক গুলোতে কতটা কী করতে পেরেছে গেছ সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়, তবে সাম্প্রতিক অতিমারী মোকাবিলায় সরকারি ব্যবস্থাপনায়, তাঁদেরই সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, এক ধরনের সক্ষমতার পরিচয় রেখেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে। 

    স্বাস্থ্যকে অধিকার করে তুলতে গেলে

    প্রথম চ্যালেঞ্জ হল বেসরকারি এবং সরকারি ব্যবস্থার অসম মিশ্রনে এই যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটি তৈরি হয়েছে সেটিকে একটা স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকলাপ প্রসঙ্গে উদাহরণ স্বরূপ কেবল দুটিকে উল্লেখ করছি আপাতত, 
    ক) মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া
    ১) কারিকুলাম প্রস্তুত করা, ২) মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও স্বীকৃতি, ৩) কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশন, ৪) মেডিকেল কলেজ গুলি পরিদর্শনের একটি স্বচ্ছ এবং বিধিসম্মত ব্যবস্থা বজায় রাখা, ৫) পেশাদারি নৈতিকতার মান নির্ধারণ করা, এবং ৬) নির্ধারিত মান লঙ্ঘনকারী চিকিৎসকদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। 
    মেডিকেল কাউন্সিল প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতির ছাপ রেখেছিলেন। ১৯৯৫ সালে এই সংস্থার প্রধান হয়েছিলেন ডাঃ কেতন দেশাই। তাঁর আমলে কলঙ্কের ছাপ আরো গাঢ় হয়ে উঠেছিল। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণের ভারপ্রাপ্ত পার্লামেন্টারি কমিট তাঁদের ৯২তম রিপোর্টে তীব্র নিন্দা করেছিলেন এই সংস্থার রীতিনীতি নিয়ে। রিপোর্টে অনেক বক্তব্যের মধ্যে থেকে উদাহরণস্বরূপ কয়েকটা উল্লেখ করা যায়, ১) ইণ্ডিয়ান মেডিকেল রেজিস্টারটি হালনাগাদ করা হয় না বহুকাল। রেজিস্টারে থাকা অনেকেই মারা গেছেন, অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, খাতায় কলমে তাঁরা সবাই আছেন। ২) রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা তারাও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, এবং তাঁদের কারুর কারুর বিরুদ্ধে নিয়মবিরুদ্ধ কাজের অভিযোগ আছে। ৩) অভিযোগ আছে এরকম লোক জন কেবল এম সি আই র সদস্যপদে বসে আছেন তাই নয়, তাঁদের অপসারণের কোনো ক্ষমতাই নেই কেন্দ্রীয় সরকারের। 
    পার্লামেন্টারি কমিটি এরকম আরো অনেক কিছুর প্রমাণ পেয়েই সংস্থাটি বিলোপ করার সুপারিশ করেছেন।
    তাঁর বদলে যে সংস্থাটি তৈরি হয়েছে, সেই ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের কার্যকলাপ সম্বন্ধে এখনো বিশেষ কিছু স্পষ্ট হয়নি আমার কাছে, তাই মন্তব্য করছি না। 
    খ) ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট
    বেশির ভাগ রাজ্যই বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাপ্রদায়ক সংস্থাগুলি নিয়ন্ত্রনের জন্য নিজেদের ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইন তৈরি করে নিয়েছেন, অথবা কেন্দ্রের মডেল ক্লিনিক্যাল এস্ট্যাবলিশমেন্ট অ্যাকট ২০১০ অ্যাক্ট অ্যাডপ্ট করেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া, আমি যতদূর জানি, কোনো রাজ্যই এই আইন প্রয়োগ করার কোনো নির্দিষ্ট মেকানিজম তৈরি করেন নি। পশ্চিমবঙ্গ ২০১৭ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এস্ট্যাবলিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিসন অ্যাক্ট প্রণয়ন করেন। ১৩ জন সস্য বিশিষ্ট এই কমিশনের চেয়ারপার্সন একজন একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। এছাড়া আছেন দুজন আই এ এস, দুজন আই পি এস, একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট আর বাকিরা চিকিৎসক। কমিশনের ওয়েবসাইট খোঁঁজাখুঁজি করে পেলাম না, কোনো বার্ষিক রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে বলে দেখিনি, তবে সংবাদ মাধ্যমে মাঝে মধ্যে কমিশনের রায় নিয়ে প্রতিবেদন চোখে পড়েছে। একটি সাক্ষাৎকারে চেয়ারপার্সন জানিয়েছেন ২০১৭ থেকে ২০২১এর মে মাসে তাঁরা দেড় দুহাজার অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছেন। 

    আর দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হল সরকারি সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহার 
    কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাক্তন স্বাস্থ্য সচিব ডঃ সুজাতা রাও সরকারি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের সমস্যা গুলিকে এই ভাবে চিহ্নিত করেছেন-
    প্রথমত, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আর্থিক অপ্রতুলতা নিছকই অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনামাত্র। স্বাধীনতার পর থেকেই উন্নয়নের যে মডেল নেওয়া হয়েছিল, অর্থনীতিবিদরা বিনিয়োগের অগ্রাধিকার যে ভাবে ঠিক করেছিলেন, এটা তারই ফসল।
    দ্বিতীয়ত, আর্ন্তরাজ্য স্বাস্থ্যের সূচকগুলিতে যে বৈষম্য দেখতে পাই সেটির উৎস সাংবিধানিক ক্ষমতার ও দায়িত্বের বিন্যাস; স্বাস্থ্যেব্যবস্থার বেশির ভাগ কাজের দায়ই রাজ্য সরকারগুলির আর আর্থিক উৎসগুলি পুঞ্জীভূত হয়ে আছে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। 
    তৃতীয়ত, সাংবিধানিক সংস্থা জাতীয় অর্থ কমিশন আর নিছক সরকারি আদেশনামায় গঠিত প্ল্যানিং কমিশন কেন্দ্র এবং রাজ্যের মধ্যে যে ভার্টিকাল বৈষম্য আর রাজ্যেরগুলির মধ্যে যে হরাইজন্টাল বৈষম্য তা দূর করতে সক্ষম হননি। 
    (উদাহরণ স্বরূপ সপ্তম অর্থ কমিশনের বরাদ্দ কৃত ১৬০৯ কোটি দ্বাদশ অর্থ কমিশনে বেড়ে হয়েছিল ১,৪২,০০০ কোটি। কিন্তু এই সবকটি বছর মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১০৮০০ কোটি। ২০১২ সালে ইন্ডিয়ান পাবলিক হেলথ স্ট্যান্ডার্ড কী হবে তা স্থির হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী ভারতের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রতিষ্ঠানগুলিকে এই স্ট্যন্ডার্ডে উন্নীত করতে গেলে এককালীন বিনিয়োগ লাগবে ১,১১,০০০ কোটি টাকা আর রেকারিং খরচ হবে প্রতি বছরে ৪৮২২১ কোটি টাকা। এই অর্থের ৭০% খরচ করতে হবে উত্তর ভারতের সেই সব রাজ্যে যাঁরা স্বাস্থ্যের সূচকে এখন সবচেয়ে পিছিয়ে আছেন। এই প্রয়োজনের পাশাপাশি ১১তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সর্বমোট বিনিয়োগ হয়েছিল ৬০,০০০ কোটি টাকা।) 
    চতুর্থত সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং অর্থ বরাদ্দ করার প্রক্রিয়াটাই কেন্দ্রীকৃত হয়ে বসে আছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের স্তরে। কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকাটি অনেকটাই অডিটরের মতো, ব্যবস্থাপনার ঝোঁক হচ্ছে যতো দেরিতে অর্থ বরাদ্দ করা যায় ততো যেন ভালো। বাজেটিং সাইকেলের সীমাবদ্ধতা এবং যখন তখন বরাদ্দ কেটে নেওয়া্র প্রবণতা, এসব মিলে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়, পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থারই বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। 
    পঞ্চমত, স্বাস্থ্য খাতে আউট অফ পকেট খরচ বাঁচানোর নামে বিমাকরণ এবং অন্যান্য চাহিদা ভিত্তিক ব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিত এবং অত্যুৎসাহী বেসরকারি ক্ষেত্রের আধিপত্য বাড়িয়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরো দুর্বল করে তুলছে।” 

    এগুলো একটাও আমার কথা নয়, এক কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব, যিনি দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকে কাজ করেছেন তাঁর কথা। এ বিষয়গুলিতে আমি তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করি বলেই উল্লেখ করলাম কথাগুলো। 
    এখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা বলতে এখন যে বিমাকেন্দ্রিক প্রাইভেট ব্যবস্থাপনা ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে সেটি নানা কারণেই অবাঞ্ছিত এবং বিপজ্জনক বলে মনে হয়। এতে সুরাহা হবে না আমাদের সমস্যার।
    এই ব্যবস্থায় আরোগ্য কে পণ্যে পরিনত না করে থাকতে পারে না। এখন প্রায় সব রাজ্যই নিজেদের মতো স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প নিয়েছেন সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার নামে। কেন্দ্রও একই পথে চলেছেন। 
    এর ফলে স্বাস্থ্য বাজেটের একটা বড় অংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কার্যকর না করে চলে যাচ্ছে বেসরকারি পুঁজির হাতে। 
    বিমাকে সঠিক পথ বলে মনে করছেন না অমর্ত্য সেন এবং জঁ দ্রেজের মতো দার্শনিক-অর্থনীতিবিদরাও। তাঁদের মতে এ পথে অনেক সমস্যা, 

    যেমন, দক্ষতার সমস্যা – বিমা কোম্পানি কেবল সেইসব গ্রাহকদের বেছে নেবে যাদের ঝুঁকি কম, তারপরে,
    নৈতিক সমস্যা  – রোগী এবং পরিষেবাদাতা দু পক্ষই খরচ কমাতে একই ভাবে অনাগ্রহী হবেন 
    বিকৃতির সমস্যা – বিমার ঝোঁক মূলতঃ হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর, হাসপাতাল বহির্ভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গুরুত্ব হারাবে, অথচ স্বাস্থ্যখাতে পারিবারিক খরচের বড় অংশটাই ঘটে হাসপাতালের বাইরে। 
    লক্ষ্যনির্ধারণের সমস্যা – বাছাই করে গরিবদের প্রিমিয়াম সরকার দেবেন, কিন্তু বিপিএল নিয়ে যে প্রবল না মেটা বিতর্ক চলে আসছে এত কাল ধরে সেটা রাতারাতি মিটে যাবে এবং গরিবরা সঠিক ভাবে চিহ্নিত হবে এটা ধরা উচিত হবে কী? 
    এছাড়া আছে সমতার প্রশ্ন – সবাই কী সমানভাবে বিমার সুযোগ ব্যবহার করতে সক্ষম হবেন?
    এবং 
    অ-প্রত্যাবর্তনযোগ্যতার সমস্যা – বিমা পরিষেবা সরবরাহকারীরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন যে এই ব্যবস্থা –‘অ-কার্যকর’ প্রমাণিত হলেও হয়তো ফেরার পথ খোলা থাকবে না।

    সাম্প্রতিক অতিমারী এই বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করার দুর্বলতা যথেষ্ট প্রকট করে তুলেছে। এই নির্ভরশীলতা বিপর্যস্ত করে তুলেছে সাধারণ মানুষকে। যে সব মধ্যবিত্ত পরিবার কখন সরকারি পরিষেবা নেওয়ার কথা কখনো ভাবেননি সংক্রমিত হয়ে তাঁদের একটা বড় অংশ বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে গেছেন, এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। 
    অতএব প্রশ্ন যদি এটাই হয় যে “স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সবই কি সরকার করবেন?” আমার উত্তর হবে, হ্যাঁ। কারণ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে তো বটেই, যে সব ধনতান্ত্রিক দেশে স্বাস্থ্যের সূচকগুলি সবচেয়ে ভাল (আমেরিকা তাদের মধ্যে পড়ে না) সেই স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশগুলিতেও স্বাস্থ্যের সব ব্যবস্থাই সরকারই করেন। স্বাস্থ্য সব মানুষেরই মৌলিক এবং মানবিক অধিকার। 



    সোসাইটি ফর রিসার্চ অল্টারনেটিভের আলোচনায় প্রদত্ত বক্তৃতা থেকে।
    স্বাস্থ্যের অধিকার: অর্জন ও বঞ্চনা
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৮ জুলাই ২০২১ | ৮২১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ramit Chatterjee | ২৯ জুলাই ২০২১ ১৫:৩১496186
  • খুব জরুরি আলোচনা। আরও মানুষের কাছে পৌছানো দরকার এবং সার্বিক আলোচনা ও রূপায়ন দরকার।


    এই অদরকারী ওষুধ ও ইকুইপমেন্ট গুলি কে কি চিহ্নিত করে তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব ? সব না হলেও অন্তত বহুল ব্যবহৃত গুলির তালিকা পাওয়া গেলেও অনেক।

  • S | 110.227.65.163 | ০৪ আগস্ট ২০২১ ১৫:৪৩496408
  • স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশগুলির সাথে আমাদের দেশের তুলনা টা বোদহয় ঠিক হল না। population স্বাধীনতার সময়  ৩০ কোটি থেকে এখন ১৪০ কোটি। আমাদের নাগরিকদের কর্তব্য কুকুর-বিড়াল এর মতো সন্তান জন্ম দেওয়া। জন্ম দিয়েই খালাস। ব্যস বাকি সব রাস্ত্রের দায়িত্ব্য। খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, mobile.... সব আমাদের অধিকার!! সব রাস্ট্র কে দিতে হবে। 


    একবারও কি ভেবে দেখেছি population ঐ স্কানডিনেভিয়ান দেশের মতো হলে আমাদের দেশের লোকেরাও কি ভাবে থাকতো? 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন